মেদিনীপুরের ইতিহাস (প্রথম ভাগ)/প্রথম অধ্যায়

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

মেদিনীপুরের ইতিহাস।

ভৌমিক বিবরণ।

প্রথম অধ্যায়।

ভৌগোলিক অবস্থান।

 সুদূর অতীতকালে যখন সমগ্র বঙ্গদেশ সাগরগর্ভে নিহিত ছিল, তখন বঙ্গোপসাগরের উত্তর-সীমা ছিল রাজমহল-পর্ব্বতমালা। ক্রমশঃ সুদূর অতীতকাল।মহাসমুদ্রের লীলাভূমি দক্ষিণাভিমুখী হওয়ায় ইদানীন্তন বঙ্গদেশের ‘ব’দ্বীপ সহস্র সহস্র নদনদীসহ সাগরগর্ভ হইতে উত্থিত হইতে আরম্ভ করে। ক্রমে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের পলিতে পুষ্ট হইয়া বর্ত্তমান বঙ্গদেশের সৃষ্টি হইয়াছে।[১]

 নবোত্থিতা বঙ্গভূমি প্রথমে ভিন্ন জাতির বাসভূমি থাকিলেও, আর্য্যগণ পরবর্ত্তিকালে এই সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা বঙ্গভূমিতে রাজত্বঅঙ্গ, বঙ্গ ও কলিঙ্গ রাজ্য। বিস্তার করিয়া আর্য্যসভ্যতা সংস্থাপিত করিয়াছিলেন। প্রাচ্য-ভারতে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ নামে তিনটি রাজ্য সংস্থাপিত হইয়াছিল। এই তিনটি প্রাচ্য-জনপদ প্রাচ্য-সভ্যতার কেন্দ্র ছিল। ভূতপূর্ব্ব ভারতের এই তিনটি প্রাচ্য জনপদের ন্যায়, ধর্ম্ম, শিক্ষা ও বাণিজ্যের গৌরব একদিন কেবল ভারতবর্ষে নহে, প্রাচ্য ও প্রতীচ্য সমস্ত জগতের সভ্যপ্রদেশে বিস্তৃত হইয়াছিল।[২] সে দিন চলিয়া গিয়াছে; ইতিহাসে কেবল তার ক্ষীণ স্মৃতিটুকু রাখিয়া গিয়াছে।

 অতীত গৌরবের সঙ্গে সঙ্গে আর্য্যভারতের সেই তিনটি প্রাচীন জনপদের নামও এক্ষণে বিলুপ্ত বলিলেই চলে; তাহাদের সীমানির্দ্দেশও প্রত্নতত্ত্বের তিমিরাবরণের অন্তরালে পড়িয়া নানা জটিল সমস্যার বিষয়ীভূত হইয়াছে। প্রত্নতত্ত্ববিদ্গণ এই তিনটি জনপদের মোটামুটি যে সীমানির্দ্দেশ করিয়া থাকেন, তাহা হইতে জানা যায় যে, বর্ত্তমান রাজসাহী ও ভাগলপুর বিভাগের সন্নিহিত প্রদেশটিই প্রাচীন অঙ্গ-রাজ্যের অন্তর্গত ছিল; উত্তরে ভাগীরথী হইতে দক্ষিণে গোদাবরী নদী পর্য্যন্ত কলিঙ্গের সীমা বিস্তৃত ছিল এবং অঙ্গ ও কলিঙ্গের পূর্ব্ব প্রদেশটিই বঙ্গ নামে অভিহিত হইত। এই সীমানির্দ্দেশানুসারে প্রাচীনকালে বর্ত্তমান মেদিনীপুর জেলার সমস্ত ভূভাগ প্রাচীন কলিঙ্গ-রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। বিশ্বকোষ-সম্পাদক শ্রীযুক্ত নগেন্দ্রনাথ বসু প্রাচ্যবিদ্যামহার্ণব লিখিয়াছেন, “এখনকার মেদিনীপুর, উড়িষ্যা, গঞ্জাম ও সরকার তৎকালে কলিঙ্গ-রাজ্যের অন্তর্গত ছিল।”[৩]

 উত্তরকালে আর্য্যভারতের এই প্রাচ্য বিভাগে অঙ্গ, বঙ্গ ও কলিঙ্গ ব্যতীত পুণ্ড্র ও সুহ্ম নামে আরও দুইটি নূতন রাজ্য সংস্থাপিতপুণ্ড্র ও সুহ্ম রাজ্য। হয়। সুপ্রাচীন সাহিত্যে এই পাঁচটি রাজ্যেরই নামোল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। হরিবংশে একটি আখ্যায়িকা আছে, দৈত্যরাজ বলির পত্নী সুদেষ্ণার গর্ভে দীর্ঘতমা ঋষির ঔরসে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র ও সুহ্ম নামে পাঁচ পুত্র জন্মগ্রহণ করেন, তাঁহারাই এই পঞ্চ-রাজ্যের সংস্থাপয়িতা।[৪] স্বর্গীয় পণ্ডিত উমেশচন্দ্র বটব্যাল মহাশয়ের মতে দীর্ঘতমা ঋষি খৃঃ পূর্ব্ব ১৬৯০ অব্দে বর্ত্তমান ছিলেন।[৫]

 বায়ু, বিষ্ণু, মৎস্য, মার্কণ্ডেয় প্রভৃতি পুরাণগুলিতেও এই পাঁচটি নাম একসঙ্গে দৃষ্ট হয়। প্রত্নতত্ত্ববিদ্‌গণ প্রাচীন পু্ণ্ড্র, ও সুহ্ম রাজ্যের যে সীমানির্দ্দেশ করিয়াছেন, তাহাতে জানা যায় যে, এই দুইটি রাজ্য পূর্ব্বোক্ত অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ এই তিনটি রাজ্যের অংশবিশেষ লইয়াই গঠিত হইয়াছিল। উইলসন্, কানিংহাম প্রভৃতি পণ্ডিতগণের মতে বর্ত্তমান রাজসাহী বিভাগের পশ্চিমোত্তর-প্রদেশটিই অর্থাৎ প্রাচীন অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণাংশই পরবর্ত্তিকালে পুণ্ড্র রাজ্য নামে অভিহিত হয় এবং কলিঙ্গ-রাজ্যের উত্তরপূর্বাংশ লইয়াই সুহ্ম-রাজ্য গঠিত হইয়াছিল। শ্রীযুক্ত বিজয়চন্দ্র মজুমদার মহাশয় বিস্তর প্রমাণাদির দ্বারা সিদ্ধান্ত করিয়াছেন যে, বর্ত্তমান মেদিনীপুর জেলার অধিকাংশই প্রাচীন সুহ্ম-রাজ্যের অন্তর্গত ছিল এবং উক্ত জেলার অন্তর্গত প্রাচীন তাম্রলিপ্ত নগরটি সেই রাজ্যের রাজধানী বলিয়া পরিগণিত হইত। বর্দ্ধমান ও মেদিনীপুর জেলার পূর্ব্বসীমা ধরিয়া যে রেখাটি পাওয়া যায়, তাহারই পূর্ব্বভাগে বঙ্গরাজ্য এবং পশ্চিমে সুহ্মরাজ্য ছিল, ইহাই তাঁহার মতে নির্দ্দিষ্ট। সুহ্মরাজ্যের সীমা ঐ স্থান হইতে আরম্ভ হইয়া দক্ষিণে কলিঙ্গ-রাজ্য পর্য্যন্ত বিস্তৃত ছিল।[৬] ইহা হইতে অনুমান করা যাইতে পারে যে, বর্ত্তমান বর্দ্ধমান বিভাগের প্রায় সমস্ত ভূভাগ সুহ্ম-রাজ্যের অন্তর্গত বলিয়া নির্দিষ্ট হইত।

 অপেক্ষাকৃত পরবর্ত্তিকালে সুহ্ম-রাজ্যের রাজধানী তাম্রলিপ্ত-নগরী একটি বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হওয়ায় রাজধানীর নামানুসারে ঐ রাজ্য ‘তাম্রলিপ্ত’রাজ্য নামেও সময়ে সময়ে পরিচিত হইত। সুহ্ম ও তাম্রলিপ্ত কোন কোন সাহিত্যে এই দুই নামে আবার দুইটি পৃথক্ রাজ্যের নামোল্লেখও দেখিতে পাওয়া যায়। মহাভারতের সভাপর্ব্বে লিখিত আছে যে, ভীম দিগ্বিজয়ে আসিয়া পুণ্ড্র দেশাধিপতি বাসুদেব ও কৌশিকীকচ্ছনিবাসী রাজা মনৌজা এই দুই বীরকে পরাজয় করিয়া বঙ্গরাজ্যের প্রতি ধাবমান হন। পরে তাম্রলিপ্ত ও সুহ্মদিগের অধীশ্বর এবং সাগরকূলবাসী ম্লেচ্ছগণকে পরাজয় করেন।[৭] আধুনিক বঙ্গদেশের পূর্ব্বভাগই তখন বঙ্গদেশ এবং পশ্চিমভাগই পুণ্ড্রদেশ নামে অভিহিত হইত। জানা যাইতেছে, ইহাদের দক্ষিণেই সমুদ্রোপকূলে সুহ্ম ও তাম্রলিপ্ত অবস্থিত ছিল। কবি দণ্ডীর রচিত দশকুমারচরিতেও সুহ্ম-রাজ্যের নামোল্লেখ আছে। দামোলিপ্ত বা তাম্রলিপ্ত তৎকালেও সুহ্ম-রাজ্যের রাজধানী ছিল। তথায় দেশীয় ও বিদেশীয় জাহাজ সকল থাকিত। দশকুমারচরিতে লিখিত আছে যে, তাম্রলিপ্ত হইতে জাহাজে চড়িয়া তিনি রাক্ষসদিগের দেশে উপস্থিত হন এবং তথায় রামেসু নামক এক যবনের সহিত যুদ্ধ করেন। দশকুমারচরিতের ষষ্ঠ উচ্ছ্বাসের নায়ক মিত্র গুপ্তকে রাজপুত্ত্র ভীমধন্বা এই স্থানে সাগরে নিক্ষেপ করিয়াছিলেন।[৮] পণ্ডিতগণ স্থির করিয়াছেন, মেদিনীপুর জেলার অন্তর্গত বর্ত্তমান তমলুক নগরটি প্রাচীন দামোলিপ্ত বা তাম্রলিপ্ত নগরের হীন পরিণতি। [৯]

 সুহ্ম ও তাম্রলিপ্তরাজ্যের উত্তর ও পশ্চিমে পুণ্ড্র রাজ্য, পূর্ব্বে বঙ্গরাজ্য, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে কলিঙ্গ-রাজ্য, এইরূপ নির্দ্দেশই জানা যাইতেছে। নগেন্দ্রবাবু লিখিয়াছেন, “কলিঙ্গ-রাজ্য বর্ত্তমান তমলুকের সীমান্ত হইতে আরম্ভ হইয়া দক্ষিণে গোদাবরী নদী পর্য্যন্ত বিস্তৃত ছিল।”[১০] তাহা হইলে দেখা যাইতেছে, তখন বর্ত্তমান মেদিনীপুর জেলার উত্তর ও পূর্ব্ব ভূভাগের অধিকাংশই সুহ্ম ও তাম্রলিপ্ত রাজ্যের অন্তর্ভূত হইয়াছিল। অবশিষ্টাংশ—যাহা তমলুকের দক্ষিণপশ্চিমে অবস্থিত, উহাই কেবল কলিঙ্গ-রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। উত্তরকালে এই বিভাগেরও পরিবর্ত্তন হয়।

 পরবর্ত্তিকালের সাহিত্যে আমরা উৎকল ও উড্র নামে আরও দুইটি রাজ্যের নিদর্শন পাই। রঘুবংশে কালিদাস কপিশা নদীর পরপার উৎকল-রাজ্য।হইতেই উৎকলের সীমা নির্দেশ করিয়াছেন। কপিশা নদী বর্ত্তমান মেদিনীপুর জেলার মধ্য দিয়া প্রবাহিত কাঁসাই বা কংসাবতী নদীর নামান্তর। কালিদাসের বর্ণনামতে উৎকলদেশের দক্ষিণেই কলিঙ্গ-রাজ্য ছিল। রঘুবংশে দেখিতে পাওয়া যায়, রঘু স্বীয় রাজধানী হইতে সুহ্মদেশ পর্য্যন্ত সমস্ত রাজ্য জয় করিয়া পূর্ব্ব-মহাসাগরের তালীবনশ্যাম উপকণ্ঠে সুহ্মরাজ্যে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিলেন। পরে উৎকলবাসিগণ তাঁহার পথ প্রদর্শক হইলে, তিনি তথা হইতে কলিঙ্গদেশাভিমুখে যাত্রা করেন।[১১] মার্কণ্ডেয়পুরাণেও দেখা যায়, উৎকলবাসীরা একদিকে কলিঙ্গের, অপরদিকে মেকলের (বর্তমান রায়পুর জেলার আদিম অধিবাসী) সহিত সংসৃষ্ট। সুপণ্ডিত পার্জ্জিটার সাহেব (F. G. Pargiter Esq. I. C. S.) এই উক্তি হইতে প্রমাণ করিয়াছেন যে, প্রাচীনকালে উৎকলদেশ মেদিনীপুর জেলার দক্ষিণাংশ ও বালেশ্বর জেলা লইয়া গঠিত হইয়াছিল।[১২] সুতরাং দেখা যাইতেছে যে, উৎকল-রাজ্য প্রাচীন কলিঙ্গ-রাজ্যের উত্তরাংশ লইয়াই গঠিত হইয়াছিল। শ্রীযুক্ত সারদাচরণ মিত্র মহাশয় এই কারণে ‘উৎকল’ শব্দ ‘উত্তর-কলিঙ্গ’ শব্দের অপভ্রংশ বলিয়া মনে করেন।[১৩]

 কলিঙ্গদেশের অংশবিশেষ লইয়া যেরূপে উৎকলদেশ গঠিত হইয়াছিল, আমাদের মনে হয়, পুণ্ড্র-রাজ্যের অংশবিশেষ লইয়াই সেইরূপ উড্রদেশের উৎপত্তি হয়। উড্রদেশ।সম্ভবতঃ আধুনিক ছোটনাগপুর প্রদেশ, ময়ুরভঞ্জ, কেঁউঝর প্রভৃতি গড়জাত মহাল, মেদিনীপুর জেলার পশ্চিমাংশ ও বাঁকুড়া জেলার দক্ষিণাংশ লইয়া উড্রদেশ গঠিত ছিল। শ্রীযুক্ত পার্জ্জিটার সাহেবও এই মতাবলম্বী।[১৪] পরবর্ত্তিকালে উৎকল ও উড্র একই রাজ্য বলিয়া পরিগণিত হয় এবং সে সময় উহার সীমারও অনেক পরিবর্ত্তন হইয়াছিল। উৎকলেরই অন্য নাম উড়িষ্যা।

 উৎকল ও উড্রদেশের পূর্ব্বোক্ত সীমানির্দ্দেশ হইতে জানা যায় যে, প্রাচীনকালে মেদিনীপুরের দক্ষিণাংশ—যাহা কলিঙ্গ-রাজ্যের অন্তর্গত ছিল, পরবর্ত্তী সময়ে সেই অংশই উৎকলের অন্তর্ভূত এবং পশ্চিমদিকের কিয়দংশ উড্রদেশের অন্তর্ভূত হইয়াছিল। উড়িষ্যার সুবিখ্যাত জগন্নাথ দেবের মন্দিরে মাদলাপাঞ্জী নামে কতকগুলি অতি প্রাচীন হস্তলিখিত তালপত্র আছে। সেইগুলি হইতে উড়িষ্যার অনেক প্রাচীন উৎকলের রাজস্ব-বিভাগ প্রাচীন কথা জানিতে পারা যায়। তৎকালে উড়িষ্যা একত্রিশটি দণ্ডপাঠে এবং ঐ দত্তপাঠগুলি আবার ১১০টি বিশিতে বিভক্ত ছিল। তন্মধ্যে নিম্নলিখিত ছয়টি দণ্ডপাঠ বর্ত্তমান মেদিনীপুর জেলার অন্তর্নিবিষ্ট হয়:—(১) টানিয়া, (২) জৌলিতি, (৩) নারায়ণপুর, (৪) নইগাঁ, (৫) মালঝিটা, (৬) ভঞ্জভূম-বারিপাদা। টানিয়া দণ্ডপাঠের মধ্যে কাকরাচোর, জলেশ্বরচোর, দাঁতুনিয়াচোর, নারাঙ্গাচোর, বিনিসারা বা বালিসরাচোর ও বেড়েইচোর নামে ছয়টি বিশি ছিল। এখনও এই নামে কয়েকটি পরগণা বালেশ্বর ও মেদিনীপুর জেলায় বিদ্যমান থাকিয়া প্রাচীন বিশিগুলির পরিচয় দিতেছে। জলেশ্বর অদ্যাপি ‘টুনিয়া জলেশ্বর’ নামে পরিচিত। বর্ত্তমান কাঁথি মহকুমার অধিকাংশই মালঝিটা দণ্ডপাঠের অন্তভুত ছিল। মাদলাপাঞ্জীতে উল্লিখিত নারায়ণপুর ও বর্ত্তমান নারায়ণগড় পরগণা একই স্থান বলিয়া অনুমিত হয়।

পরবর্ত্তিকালের গ্রন্থ আইন-ই-আক্‌বরীতে “নারায়ণপুর ওরফে খান্দার” নামে একটি মহালের উল্লেখ আছে। বর্ত্তমানকালে খান্দার নামেও একটি পরগণা দৃষ্ট হয়। খান্দার ও নারায়ণগড় পরগণা পাশাপাশি অবস্থিত। ভঞ্জভূম নামে শালবনী ও কেশপুর থানায় একটি পরগণা আছে; বারিপাদা এক্ষণে ময়ূরভঞ্জের করদরাজ্যভুক্ত। ময়ূরভঞ্জের রাজার রাজধানী এই বারিপাদায় অবস্থিত। শালবনী হইতে বারিপাদা পর্য্যন্ত সমস্ত প্রদেশটি ভঞ্জভূমি-বারিপাদা দণ্ডপাঠের অন্তর্গত ছিল বলিয়া বোধ হয়। তৎকালে এই দণ্ডপাঠটির অধিকাংশই নিবিড় জঙ্গলাবৃত ছিল; ভূমিজ নামে এক শ্রেণীর আদিম অধিবাসী এই স্থানে বাস করিত। সম্ভবতঃ তাহাদের নামানুসারেই এই স্থান ভূমিজভূম বা ভঞ্জভূম নামে পরিচিত হইয়াছিল। এখনও এই প্রদেশের স্থানে স্থানে নিবিড় জঙ্গল বিদ্যমান; তথায় ভূমিজগণও বাস করিতেছে।

 নইগ ও জৌলিতি দণ্ডপাঠ দুইটি কোন‍্ স্থানে অবস্থিত ছিল, সঠিক বলা যায় না। তবে উক্ত দণ্ডপাঠ দুইটি টানিয়া, মালঝিটা, নারায়ণপুর ও ভঞ্জভূম-বারিপাদা দণ্ডপাঠের সহিত উল্লিখিত হওয়াতে এই দুইটি দণ্ডপাঠও যে উহাদের নিকটবর্ত্তী কোন স্থানে ছিল, তাহা বলা যাইতে পারে। শ্রীযুক্ত মনোমোহন চক্রবর্তী মহাশয় অনুমান করেন, এগরা থানার নেগুঁয়া নামক স্থানটির অপভ্রংশ নামে নইগাঁ বা নাইগাঁ দণ্ডপাঠের পরিচয় পাওয়া যায়। এগরার উল্লেখস্থলে এখনও লোকে 'এগরা নেগুঁয়া' বলিয়া থাকে। ইংরাজাধিকারের প্রথমাবস্থায় নেগুঁয়াতে কাঁথি মহকুমার ফৌজদারী কার্য্যালয় প্রতিষ্ঠিত ছিল; উহা তখন নেগুঁয়া মহকুমা নামে পরিচিত হইত। বর্ত্তমানকালের মেদিনীপুর জেলার যে অংশ উৎকলের অন্তর্ভূত ছিল বলিয়া অনুমান করা যায়, সেই অংশের থানাগুলির সহিত প্রাচীনকালের ছয়টি দণ্ডপাঠের স্থাননির্দ্দেশ করিতে গেলে মোটামুটী দেখা যায় যে, বালেশ্বর জেলার কিয়দংশ ও দাঁতুন থান লইয়া টানিয়া দণ্ডপাঠ এবং নারায়ণগড় থানা লইয়া নারায়ণপুর দণ্ডপাঠ গঠিত ছিল। রামনগর, কাঁথি, খাজুরি ও ভগবান‍্পুর থানা লইয়া মালঝিট দণ্ডপাঠ থাকা সম্ভব এবং মেদিনীপুর, কেশপুর, শালবনী, খড়্গপুর, বিনপুর, ঝাড়গ্রাম ও গোপীবল্লভ পুর থানা এবং ময়ূরভঞ্জ-রাজ্যের অধিকাংশ লইয়াই বোধ হয় ভঞ্জভূম-বারিপাদা দণ্ডপাঠ গঠিত ছিল। তাহা হইলে ঐ প্রদেশের মধ্যে এগরা, পটাশপুর ও সবঙ্গ এই তিনটি থানার ভূভাগ বাকী থাকিয়া যাইতেছে। সুতরাং আমাদেরও মনে হয়, মনোমোহন বাবু যে অনুমান করিয়াছেন, বর্ত্তমান নেগুঁয়া গ্রাম প্রাচীন নাইগাঁ দণ্ডপাঠের পরিণতি, তাহা অমূলক না হইতেও পারে। এগরা ও পটাশপুর থানা দুইটি পাশাপাশি অবস্থিত; দুইটি থানাতে প্রাচীন হিন্দুকীর্ত্তির নিদর্শনও আছে; সম্ভবতঃ এই দুইটি থানা লইয়াই নাইগাঁ দণ্ডপাঠ এবং সবঙ্গ থানা লইয়া জৌলিতি দণ্ডপাঠ গঠিত ছিল। মেদিনীপুর জেলার মানচিত্র হইতে দেখা যায় যে, সবঙ্গ থানার পার্শ্বে নরায়ণগড়, নারায়ণগড়ের পার্শ্বে পটাশপুর এবং তৎপরে এগরা থানা অবস্থিত। মাদলাপাঞ্জীতেও যেরূপ ভাবে দণ্ডপাঠগুলির নাম উল্লিখিত হইয়াছে, তাহাতেও আমাদের অনুমান সমর্থিত হইতেছে। উক্ত তালিকায় যথাক্রমে জৌলিতি, নারায়ণপুর ও নাইগাঁর নামোল্লেখ আছে।

 মাদলাপাঞ্জীর এই দণ্ডপাঠ-বিভাগের মধ্যে তাম্রলিপ্ত বা তমলুকের নাম নাই। আমরা পূর্ব্বেই আলোচনা করিয়াছি যে, তৎকালে তাম্রলিপ্ত একটি স্বতন্ত্র রাজ্য ছিল; উহা উড়িষ্যার অন্তর্গত ছিল না। তাম্রলিপ্তের দক্ষিণ হইতেই উড়িষ্যার সীমা আরম্ভ হইয়াছিল। মাদলাপাঞ্জীর পূর্ব্বোক্ত বিভাগ হইতেও উহাই উপলব্ধি হয়। তমলুকের দক্ষিণেই সবঙ্গ থানা বা জৌলিতি দণ্ডপাঠ ছিল দেখা যায়।

 খৃষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে সুবিখ্যাত চৈনিক পরিব্রাজক ইউয়ান চোয়াং যখন ভারতবর্ষে আগমন করিয়াছিলেন, তখন তিনি তাম্রলিপ্ত-কর্ণসুবর্ণ-রাজ্যরাজ্য দেখিয়া গিয়াছিলেন। সে সময় কিছুদিনের জন্য কর্ণসুবর্ণ নামে আরও একটি রাজ্যের উৎপত্তি হইয়াছিল। মুর্শিদাবাদ নগরীর ছয় ক্রোশ দক্ষিণে ভাগীরথীর দক্ষিণতটে যে একটি প্রাচীন নগরের ভগ্নাবশেষ ভূগর্ভে প্রচ্ছন্ন রহিয়াছে, দেখা যায়, কোনও কোনও ঐতিহাসিকের মতে উহারই প্রাচীন নাম কর্ণসুবর্ণ; অধুনা রাঙ্গামাটী নামে অভিহিত।[১৫] আমাদের কিন্তু অন্যরূপ মনে হয়। উক্ত পরিব্রাজক পৌণ্ড্রবর্ধন হইতে কামরূপ, তথা হইতে সমতট, সমতট হইতে তাম্রলিপ্ত, তাম্রলিপ্ত হইতে কর্ণসুবর্ণ এবং কর্ণসুবর্ণ হইতে উড়িষ্যায় গমন করিয়াছিলেন। তাঁহারই লিখিত বিবরণ হইতে জানা যায় যে, তাম্রলিপ্ত হইতে কর্ণসুবর্ণ ও কর্ণসুবর্ণ হইতে উড়িষ্যার পরস্পর দূরত্ব ৭০০ লি (প্রায় ১৪০ মাইল) ছিল। ইউয়ান চোয়াঙের ভ্রমণকালে জাজপুর উড়িষ্যার রাজধানী ছিল। এই জাজপুর ও তাম্রলিপ্ত উভয়ই সুপরিচিত স্থান। বাঙ্গালার মানচিত্রের উপর জাজপুর ও তাম্রলিপ্ত হইতে ৭০০ লি দীর্ঘ দুইটি রেখা অঙ্কিত করিলে, উভয় রেখা বর্ত্তমান সিংহভূম জেলার মধ্যে কোন স্থানে সংযুক্ত হয়। আমাদের মনে হয়, এই সিংহভূম জেলার কোন স্থানে পরিব্রাজকবর্ণিত “কি-লো-ন-সু-ফ-ল-ন” বা কর্ণসুবর্ণ রাজ্যের রাজধানী ছিল। প্রত্নতত্ত্ববিদ্‌ জেনারেল কানিংহাম সাহেবও এই মতাবলম্বী।[১৬]

 ইউয়ান চোয়াঙের পরবর্তী সময়ে রচিত মার্কণ্ডেয়পুরাণে কর্ণসুবর্ণের নাম নাই।[১৭] মালভূম বা মল্লভূমি।তবে বাঁকুড়া ও মানভূম জেলায় মালপাহাড়ীদের একটি স্বতন্ত্র রাজ্যের কথা আছে। জানা গিয়াছে, বাকুড়া-বিষ্ণুপুরের প্রাচীন রাজবংশ মাল বা মল্লজাতীয় ছিলেন; মেদিনীপুর জেলার কিয়দংশও অদ্যাপি মালভূম বা মল্লভূম নামে পরিচিত। ইহা হইতে অনুমান করা যাইতে পারে যে, প্রাচীন উড্রদেশের কিয়দংশও পরবর্ত্তিকালে কর্ণসুবর্ণ-রাজ্যের অন্তভূর্ত হইয়াছিল; পরে আবার ঐ ভূভাগের কিয়দংশই মল্লভূম নামে পরিচিত হয়।

 পরবর্ত্তিকালে সুহ্ম বা তাম্রলিপ্ত রাজ্যের স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হইয়া গেলে, উহার কিয়দংশ উৎকলের সহিত মিলিত এবং অবশিষ্টাংশ রাঢ়দেশ নামে পরিচিত হয়।রাঢ়দেশ। এই সময় রাঢ়দেশ বলিতে প্রায় সমস্ত পশ্চিমবঙ্গকেই বুঝাইত। মহাভারতের টীকাকার নীলকণ্ঠ বলেন, “সুহ্মাঃ—রাঢ়াঃ”, সুহ্মই রাঢ়দেশ। খৃষ্টীয় একাদশ শতাব্দীতে রচিত কৃষ্ণ মিশ্রের প্রবোধ-চন্দ্রোদয় নাটকে রাঢ়দেশের নাম পাওয়া যায়।

“গৌড়ং রাষ্ট্রমুত্তমং নিরুপমা তথাপি রাঢ়াপুরী
 ভূরিশ্রেষ্ঠিকনামধামপরমং তত্রোত্তমা ন পিতঃ।”

 রাঢ়দেশ উত্তররাঢ় ও দক্ষিণরাঢ় নামে দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। বর্ত্তমান হুগলী ও হাবড়া জেলা এবং মেদিনীপুর জেলার কিয়দংশ দক্ষিণরাঢ়ের অন্তর্গত বলিয়া পরিগণিত হইত। দক্ষিণরাঢ়ের দক্ষিণসীমা হইতে উৎকলের সীমা আরম্ভ হইয়াছিল। উৎকলের সীমা উত্তরে রূপনারায়ণ নদ পর্য্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় বর্ত্তমান মেদিনীপুর জেলার প্রায় সমস্ত ভূভাগই সে সময় উৎকলের অন্তর্ভূত হয়। চৈতন্যভাগবতে ভাগীরথীর পশ্চিমপার হইতেই উৎকলের সীমা আরম্ভ; চৈতন্যদেব ডায়মণ্ড-হারবারের নিকট নদীপার হইয়াই উৎকলে পদার্পণ করিয়াছিলেন[১৮]

 মুসলমান অধিকারসময়েও উড়িষ্যার সীমা উত্তরে রূপনারায়ণ নদ পর্য্যন্ত বিস্তৃত ছিল। খৃষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে সম্রাট‍্ আক‌্‍বর শাহের আক‍‍্‍বরের সময়ের রাজস্ব-বিভাগ। বিখ্যাত রাজস্ব-সচিব রাজা তোডরমল্ল বাঙ্গালা, বিহার ও উড়িষ্যার রাজস্ব-নির্দ্ধারণকল্পে সুবা বাঙ্গালাকে কতকগুলি সরকারে বিভক্ত করেন। ঐ সরকারগুলিকেও আবার মহাল নামে কতকগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত করা হইয়াছিল। ঐ নির্দ্দেশক্রমে বঙ্গদেশ ১৯টি সরকার ও ৬৮২টি মহালে এবং উড়িষ্যাপ্রদেশ ৫টি সরকার ও ৯০টি মহালে বিভক্ত হয়।[১৯]

 উড়িষ্যাপ্রদেশের ৫টি সরকারের মধ্যে জলেশ্বর সরকার অন্যতম। বর্ত্তমান মেদিনীপুর জেলার অধিকাংশই তৎকালে এই জলেশ্বর সরকারের অন্তর্ভূত হইয়াছিল; অবশিষ্ট অতি সামান্য অংশই বাঙ্গালার সরকার মান্দারণ বা মাদারুণের অন্তর্গত থাকে। সরকার মান্দারণ অর্দ্ধ-বৃত্তাকারে বীরভূম জেলার অন্তর্গত নাগর হইতে আরম্ভ হইয়া বর্দ্ধমান জেলার রাণীগঞ্জ, হুগলী জেলার জাহানাবাদ এবং হাবড়া জেলার পশ্চিমাংশ হইয়া মেদিনীপুর জেলার চিতুয়া ও মহিষাদল পরগণা পর্য্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ১৬টি মহাল সরকার মান্দারণের অন্তর্ভূত ছিল; তন্মধ্যে বর্ত্তমান মেদিনীপুর জেলার পূর্ব্বোক্ত অংশ নিম্নলিখিত ৪টি মহালের অন্তর্ভূত হয়:—[২০]

 (১) চিতুয়া—দাসপুর থানায় এখনও এই নামে একটি পরগণা আছে। (২) সাহাপুর—ডেবরা থানায় এই নামেও একটি পরগণা বিদ্যমান। (৩) মহিষাদল—রূপনারায়ণ ও হলদীনদীর মধ্যবর্ত্তী প্রদেশটি তৎকালে এই মহালের অন্তর্গত ছিল। মহিষাদল নামেও একটি পরগণা আছে। (৪) হাভেলি মান্দারুণ—এই জেলার অন্তর্গত চন্দ্রকোণা ও বরদা পরগণা এবং হুগলী জেলার কিয়দংশ এই মহালের অন্তর্ভূত ছিল।

 উড়িষ্যাপ্রদেশের অন্তর্গত সরকার জলেশ্বর নিম্নলিখিত ২৮টি মহালে বিভক্ত ছিল, দেখা যায়, তন্মধ্যে বর্ত্তমান মেদিনীপুর জেলায় ২০টি মহাল পড়ে।[২১]

 (১) বগড়ী—এই জেলার অন্তর্গত চন্দ্রকোণা ও গড়বেতা থানায় এখনও এই নামে একটি পরগণা আছে।

 (২) ব্রাহ্মণভূম—কেশপুর ও শালবনী থানায় এই নামেও একটি পরগণা বিদ্যমান।

 (৩) মহাকালঘাট ওরফে কুতুবপুর—এই মহালে তৎকালে একটি দুর্গ ছিল। ডেবরা ও পাঁশকুড়া থানায় কুতুবপুর নামেও একটি পরগণা আছে।

 (৪) রাইন‍্‍—এই মহালটিতে তৎকালে তিনটি দুর্গ ছিল। সুপণ্ডিত বীম‍্স সাহেবের মতে মেদিনীপুর জেলার দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত বালেশ্বর জেলার অন্তর্গত রাইবনিয়াগড় ও রাইবনিয়া গ্রামের নামের সহিত এই মহালের সম্বন্ধ আছে। কিন্তু ব্লকম্যান সাহেব অনুমান করেন যে, এই মহালটি মেদিনীপুর জেলার উত্তরাংশে কোন স্থানে অবস্থিত ছিল। আমরাও এই অনুমানের সমর্থন করি। মনোমোহন বাবুও এই মতাবলম্বী। তিনি সিদ্ধান্ত করিয়াছেন, বর্ত্তমান বরদা ও চিতুয়া পরগণার নিকটবর্ত্তী কোন স্থানে এই মহালটি বিদ্যমান ছিল।

 (৫) মেদিনীপুর—এই মহালের অন্তর্গত মেদিনীপুর নগরে তৎকালে দুইটি দুর্গ ছিল। মনোমোহন বাবু অনুমান করেন, এই দুইটি দুর্গের একটি কর্ণেলগোলা পল্লীতে অবস্থিত বর্ত্তমানে পুরাতন জেল নামে এবং অন্যটি সহরের পশ্চিমাংশে অবস্থিত গোপগ্রামে এক্ষণে বিরাটরাজার গোগৃহ নামে পরিচিত হইতেছে।

 (৬) খড়কপুর-খড়্গপুর নামে খড়্গপুর থানায় একটি পরগণা আছে। এখানেও একটি দুর্গ ছিল। এই মহাল হইতে পাঁচ শত তীরন্দাজ ও মসাল-বাহক রাজসরকারে সরবরাহ করা হইত।

 (৭) কেদারকুণ্ড—এই মহালে তিনটি দুর্গ ছিল। সবঙ্গ ও ডেবরা থানায় এই নামে একটি পরগণা আছে।

 (৮) গাগনাপুর—ব্লক্‌ম্যান ও বীম‍্‌স সাহেব এই মহালটিকে দাঁতন থানার বর্ত্তমান গগনেশ্বর পরগণা বলিয়া বিবেচনা করেন। কিন্তু গাগনাপুর নামে পাঁশকুড়া থানায় এখনও একটি পরগণা আছে। মনোমোহন বাবু সিদ্ধাস্ত করিয়াছেন, আমরাও বিবেচনা করি, এই পরগণাটিই সেই প্রাচীন মহালের নিদর্শন।

 (৯) কাশীজোড়া—ডেবরা, পাঁশকুড়া প্রভৃতি থানায় এই নামে একটি বৃহৎ পরগণা আছে। এই মহালটি হইতে দুই শত অশ্বারোহী, আড়াই হাজার তীরন্দাজ ও মসালধারী সৈন্য রাজসরকারে সরবরাহ করা হইত।

 (১০) সবঙ্গ—এই নামেও একটি পরগণা আছে। এই মহালেও একটি দুর্গ ছিল।

 (১১) তমলুক—তমলুকেও একটি দুর্গ ছিল। তমলুক নামেও একটি পরগণা আছে।

 (১২) বাজার—সম্ভবতঃ মেদিনীপুর সহরের দক্ষিণ-পূর্ব্বে অবস্থিত ঢেঁকিয়া-বাজার পরগণাটিই প্রাচীন মহালের পরিচয় দিতেছে। মনোমোহন বাবুও ঐরূপ অনুমান করেন।

 (১৩) দ্বারশরভূম—বীম‍্স সাহেব অনুমান করেন, এই মহালটি সুবর্ণরেখা হইতে আরম্ভ হইয়া রসুলপুর নদী পর্য্যন্ত সমুদ্রতীরবর্ত্তী লবণাক্ত ভূমিখণ্ডকে লইয়াই গঠিত; কিন্তু মনোমোহন বাবু সে অনুমানের খণ্ডন করিয়া সিদ্ধান্ত করিয়াছেন, এই মহালটি এই জেলার পশ্চিমাংশে দক্ষিণে সুবর্ণরেখা হইতে উত্তরে কংসাবতী নদী পর্য্যন্ত বিস্তৃত এবং বর্তমান গোপীবল্লভপুর, ঝাড়গ্রাম ও বিনপুর থানার অধিকাংশই এই মহালের অন্তভূর্ত ছিল।

 (১৪) নারায়ণপুর ওরফে খান্দার—এই মহালেও একটি দুর্গ ছিল। নারায়ণগড় ও খান্দার নামে এখনও দুইটি পরগণ আছে।

 (১৫) করোই বা কেরৌলি—মনোমোহন বাবু সিদ্ধান্ত করিয়াছেন, ইহা এখনকার দাঁতুন ও এগরা থানার অন্তর্গত কুরুলচৌর পরগণা।

 (১৬) তরকোল—এই মহালে তৎকালে একটি দুর্গ ছিল। সম্ভবতঃ ইহা এখনকার দাঁতুন থানার অন্তর্গত তুরকাচৌর পরগণা।

 (১৭) মালছটা বা মালঝিটা—বর্ত্তমান কাঁথি মহকুমার অধিকাংশই এই মহালের অন্তর্ভুত ছিল।

 (১৮) বালিসাহি:—রামনগর থানায় কালিন্দী-বালিসাহি ও উড়িষ্যা-বালিসাহি নামে দুইটি পরগণা আছে।

 (১৯) ভোগরাই:—এই নামে একটি পরগণার কিয়দংশ এক্ষণে এই জেলার রামনগর থানায় এবং কিয়দংশ বালেশ্বর জেলার অন্তর্গত বালিয়াপাল থানায় আছে। তৎকালে ভোগরাই মহালেও একটি দুর্গ ছিল। এই মহাল হইতে একশত অশ্বারোহী এবং আড়াই হাজার তীরন্দাজ ও মশাল-বাহক সৈন্য সরবরাহ করা হইত।

 (২০) তলিয়া ও কশবা জলেশ্বর:—এই মহালটির মধ্যে সরকার জলেশ্বরের প্রধান নগর জলেশ্বর সহরটি অবস্থিত ছিল। এই মহালের অধিকাংশই এই জেলার মধ্যে পড়িয়াছিল; অবশিষ্ট সামান্য অংশ বালেশ্বর জেলার অন্তর্ভুত ছিল দেখা যায়। নিজ জলেশ্বর সহরটি এক্ষণে বালেশ্বর জেলার মধ্যে অবস্থিত।

 (২১) রাইপুর:—এই নামে বাঁকুড়া জেলায় এখনও একটি পরগণা আছে।

 (২২) সিয়াড়ী:—ব্লকম্যান সাহেব অনুমান করেন, ইহা এই জেলার অন্তর্গত এখনকার চিয়াড়া পরগণা; কিন্তু মনোমোহন বাবুর মতে ইহা বালেশ্বর জেলার অন্তর্গত সিয়ারী পরগণা।

 (২৩) করাই:—বীমস্ সাহেবের মতে ইহা এই জেলার অন্তর্গত কেশিয়াড়ী পরগণা, কিন্তু মনোমোহন বাবু ইহাকে বালেশ্বর জেলার অন্তর্গত কুড়াই পরগণা বলিয়া সিদ্ধাস্ত করেন।

 (২৪) বারপদা বা পারবদা:—উড়িষ্যার গড়জাত মহালের অন্তর্গত ময়ুরভঞ্জ-রাজ্য।

 (২৫) রেমনা:—বালেশ্বর জেলায় এক্ষণে এই নামে একটি প্রাচীন গরাম দৃষ্ট হয়।

 (২৬) বালকুশী বা বালিকুটী:—মনোমোহন বাবু সিদ্ধান্ত করিয়াছেন, উহা বর্ত্তমান বালেশ্বর জেলার অন্তর্গত সোরো পরগণা।

 (২৭) বাঁসদ বা বাসণ্ডা:—বালেশ্বর জেলার অন্তর্গত। জলেশ্বরের নিকট বাঁসডিহা বা বাঁসদা নামে একটি গ্রাম আছে।

 (২৮) পিপ্লী বা বিব্লি:—বালেশ্বর জেলার অন্তর্গত পিপ্লী-সাহা বন্দর। ইহা এক সময়ে সুবর্ণরেখার একটি প্রধান বন্দর ছিল। ডিব্যারোর এবং রেনেলের প্রাচীন মানচিত্রে উহা পোপলাই (Popolai) ও পিপ্লিপত্তন (Piplipatan) নামে উল্লিখিত আছে।

 পূর্ব্বে উল্লেখ করিয়াছি, মাদলাপাঞ্জীতে উৎকলের প্রাচীন রাজস্ববিভাগের মধ্যে তমলুকের নাম নাই; কিন্তু আইন-ই-আকবরীর মহাল তমলুক দেশ। বিভাগে তমলুকের নাম আছে। সুতরাং তৎপূর্ব্বেই যে তাম্রলিপ্ত-রাজ্যের স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হইয়া গিয়াছিল, তাহা অনুমান করা অযৌক্তিক নহে। কিন্তু তাহা হইলেও প্রায় ঐ সময়েই রচিত জগমোহন পণ্ডিতের “দেশাবলী-বিবৃতি” নামক সংস্কৃত পুঁথিতে দেখা যায় যে, তখনও আদিগঙ্গার পশ্চিমে সমস্ত দেশকে লোকে তমলুক দেশ বলিত। বেহালা, বঁড়িশা, মণ্ডলঘাট প্রভৃতি এ সমস্তই তমলুক দেশের অন্তর্গত ছিল। মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় কর্ত্তৃক এই “দেশাবলী-বিবৃতি” নামক গ্রন্থখানি আবিষ্কৃত হইয়াছে। তিনি অনুমান করেন যে, জগমোহন পণ্ডিত ১৬৪৮ খৃষ্টাব্দের পূর্ব্বে পাটনা নগরের সুবাদার কি জায়গীরদার বিজ্বলদেব নামে এক চৌহান রাজার আজ্ঞায় সমস্ত ভারতবর্ষের ভৌগোলিক বৃত্তান্ত-সমন্বিত এই গ্রন্থখানি প্রস্তুত করিয়াছিলেন। শাস্ত্রী মহাশয় ঐ সময়ের রচিত আরও একখানি সংস্কৃত পুঁথিতেও তমলুকের কথা পাইয়াছেন। যথা:—

“মণ্ডলঘট্টদক্ষিণে চ হৈজলস্য চ হ্যুত্তরে।
তাম্রলিপ্তাখ্যদেশশ্চ বাণিজ্যং চ নিবাসভূঃ॥ ৪৪
দ্বাদশযোজনৈর্যুক্ত রূপানাদ্যাঃ সমীপতঃ।
মৎস্যা গব্যানি যত্রৈব সম্পদ্যতে ভৃশং নৃপ॥ ৪৬
কৌচদামলকে দেশং গায়ন্তি দেশবাসিনঃ।
লবণানামাকরশ্চ যত্র তিষ্ঠতি ভূরিশঃ॥ ৪৮
প্রণালী দ্বিত্রিকা তত্র সদা বহতি ভূমিপ।
মালংগণ মনুষ্যাণাং নিবাসং বসতি কিল॥ ৫০
প্রায়ঃ সমুদ্রবেগশ্চ তাম্রলিপ্তনদীষু চ।
দিবানিশং কদাচিন্ন বিশ্রাম্যতি মহীপতে॥ ৫২”

শাস্ত্রী মহাশয়ের আবিষ্কৃত পুর্ব্বোক্ত পুঁথিখানি হইতে আরও ভানদেশ। জানা যায় যে, ঐ সময় মেদিনীপুর জেলার কিয়দংশ ভানদেশ নামেও পরিচিত ছিল। যথা:—

“কংসাবত্যা হি সরিতঃ শিলাবত্যা হি ভূমিপ।
উভয়োর্মধ্যবর্ত্তী চ ভানকো বিশ্রুতো ভুবি॥
বকদ্বীপাৎ পূর্ব্বভাগে মণ্ডলঘট্টস্য পশ্চিমে।
ত্রয়োদশযোজেনৈশ্চ মিতো হি ভানদেশকঃ॥

কেচিদ্‌বদন্তি ভূপাল ভানকং ক্ষৌমভূমিকম্।
কদলীপট্টসূত্রাণামাকরো হি স্থলে স্থলে॥
পট্টসূত্রস্য জননাৎ ক্ষৌমভূমিশ্চ বিশ্রুতা।
ধীবরাণাঞ্চ নিবাসো বর্ত্ততে যত্র ভূরিশঃ॥
মধ্যদেশিব্রাহ্মণানাং বসতির্বৈ পুরা কৃতা।
বল্লালসেনেন ভূপাল রাজাদিশূরসূনুনা॥
অকুলীন-কুলীনত্ব-ব্রাহ্মণানাং বিভাগশঃ।
স্থানং ত্রিষু হি দেশেষু কৃতং বৈ নৃপসূনুনা॥”

 কংসাবতী, শিলাবতী, বকদ্বীপ (বগড়ী) ও মণ্ডলঘাট এই চতুঃসীমান্তর্ব্বর্ত্তী প্রদেশটি তৎকালে ভানদেশ নামে পরিচিত ছিল। মধ্যদেশী ব্রাহ্মণেরা ভানদেশের অধিবাসী ছিলেন। নানাপ্রকার বহুমূল্য বস্ত্র এই প্রদেশে প্রস্তুত হইত। ভানদেশে তিনটি প্রধান নগর ছিল;— চন্দ্রকোণা, ভূরিশ্রেষ্ঠ ও বলিয়ার। চন্দ্রকোণা নগর মেদিনীপুর জেলার উত্তর সীমায় এখনও বিদ্যমান আছে; ভূরিশ্রেষ্ঠ এখন মেদিনীপুর জেলায় নাই, হুগলি জেলায় গিয়াছে। এক সময় ভূরিশ্রেষ্ঠ বা ভুরসুট দক্ষিণরাঢ়ের রাজধানী ছিল। ৯১৩ শকে ভুরসুটে পাণ্ডুদাস নামে এক রাজা রাজত্ব করিতেন। তাঁহার উৎসাহে শ্রীধর পণ্ডিত বৈশেষিক দর্শনের প্রশস্তপাদ ভাষ্যের এক টীকা লিখেন;—টীকার নাম “ন্যায়কন্দলী।” উহা এখনও বৈশেষিক দর্শনের একখানি প্রধান গ্রন্থ বলিয়া গণনীয়। ১০৯২ খৃষ্টাব্দে যখন কৃষ্ণমিশ্র চণ্ডেল রাজার অভ্যর্থনার্থ নাটক রচনা করেন, তখন ভূরিশ্রেষ্ঠতে নানা শাস্ত্রের আলোচনা হইত। তত্রত্য ব্রাহ্মণেরা কুমারিলের মত মানিতেন না; প্রভাকরমতের শালিকনখী পুঁথি তাঁহাদের পাঠ্য ছিল এবং তাঁহারা আপনাদিগকে অতি পবিত্র ব্রাহ্মণ বলিয়া গর্ব্ব করিতেন। এই ভূরিশ্রেষ্ঠেই বাঙ্গালার মহাকবি ভারতচন্দ্রের জন্ম হইয়াছিল। কিন্তু ভূরিশেষ্ঠের এখন আর সে দিন নাই। তামাকের জন্যই এখন লোকে ভূরিশ্রেষ্ঠের নামোল্লেখ করে। বলিয়ার নগর কোথার ছিল, তাহা এখনও জানা যায় নাই।[২২]

 মাদলাপাঞ্জীতে উৎকলের রাজস্ব-বিভাগে বকদ্বীপ, ভানদেশ, তমলুক, মণ্ডলঘাট প্রভৃতি স্থানের নাম নাই; এ সকল স্থান তখন তাম্রলিপ্ত-রাজ্যের অন্তভূর্ত ছিল। আমাদের বিবেচনায় তাম্রলিপ্ত-রাজ্যও সে সময় ঐ সকল রাজস্ব-বিভাগে বিভক্ত ছিল। মোগল-সম্রাটের রাজস্ব-সচিব সেই সকল প্রাচীন বিভাগের ভাঙ্গাগড়া করিয়াই পূর্ব্বোক্ত মহালগুলি গঠিত করিয়া থাকিবেন।

 খৃষ্টীয় ১৬৪৬ অব্দে সম্রাট‍্ সাজাহানের রাজত্বকালে তাঁহার দ্বিতীয় পুত্র সুলতান সুজা দ্বিতীয়বার বাঙ্গালা, বিহার ও উড়িষ্যার শাসনকর্ত্তা সাহাজানের সময়ের রাজস্ব-বিভাগনিযুক্ত হইয়া আসেন। তিনি রাজা তোডরমল্লের সময়ের উড়িষ্যার অন্তর্গত জলেশ্বর, কটক ও ভদ্রক সরকারকে বিচ্ছিন্ন করিয়া ১২টি সরকার ও ২৭৬টি মহালে বিভক্ত করেন। এই বিভাগানুসারে বর্ত্তমান মেদিনীপুর জেলার অধিকাংশই সরকার জলেশ্বর, সরকার মুজকুরি, সরকার মালঝিটা ও সরকার গোয়ালপাড়ার অন্তর্ভূত হইয়াছিল। মোটামুটি বলা যাইতে পারে যে, বর্ত্তমান তমলুক মহকুমার প্রায় সম্পূর্ণটি এবং জঙ্গলমহালের কিয়দংশ ও দাঁতন থানা ব্যতীত সদর মহকুমার বাকী সমস্ত অংশই সরকার গোয়ালপাড়ার, এগরা ও রামনগর থান দুইটি ব্যতীত কাঁথি মহকুমার অবশিষ্টাংশ সরকার মালঝিটার, রামনগর থানা ও বালেশ্বর জেলার কিয়দংশ সরকার মুজকুরির এবং দাঁতন ও এগরা থানা আর বালেশ্বর জেলার কতকাংশ সরকার জলেশ্বরের অন্তর্ভূত ছিল। এই চারিটি সরকারে তৎকালে (যথাক্রমে ২৮, ২, ১১ ও ২২) ৮২টি মহাল ছিল।[২৩] রাজা তোডরমল্লের সময়ের এই জেলার অন্তর্ভূত পূর্ব্বোক্ত ২০টি মহালের সহিত সাসুজার সময়ের এই ৮২টি মহালের স্থাননির্দ্দেশ করিলে দেখা যায় যে, কেবল দ্বারশরভূম ব্যতীত অন্য ১৯টি মহালকে বিচ্ছিন্ন করিয়া পরবর্ত্তিকালে এই ৮২টি মহালের সৃষ্টি হয়। দ্বারশরভূম মহাল এবং বাঁকুড়া, সিংহভূম ও মানভূম জেলার অধিকাংশই তৎকালে ঝাড়খণ্ড নামে জঙ্গলমহালভুক্ত ছিল।

 সাজাহানের রাজত্বকালে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে এবং দক্ষিণ ও পশ্চিম-বঙ্গে পর্টুগীজ দস্যুগণ ভয়ানক উপদ্রব আরম্ভ করায় সম্রাট‍্ সাজাহান বঙ্গোপসাগরের উপকূলে কয়েকটি ফৌজদারী প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁহার নির্দ্দেশক্রমে উড়িষ্যার অন্তর্গত পূর্ব্বোক্ত চারিটি সরকার হইতে কয়েকটি মহালের কোনটির সম্পূর্ণ, কোনটির বা অংশবিশেষ লইয়া হিজলী ফৌজদারী এবং রেমনা, বস্তা ও মুজকুরি সরকার হইতে কয়েকটি মহাল লইয়া বন্দর বালেশ্বর ফৌজদারী গঠিত হইয়াছিল।[২৪] ঐ সময়ে হিজলী ফৌজদারীকে সুবা উড়িষ্যা হইতে বিযুক্ত করা হয়; তদবধি মেদিনীপুর জেলার উক্ত অংশ বঙ্গদেশের সহিত সংযুক্ত হইয়াছে।[২৫] কিন্তু অবশিষ্টাংশ ইহার

পর বহুদিন পর্য্যন্ত উড়িষ্যার অন্তর্ভূত ছিল। এই সময় উড়িষ্যার পূর্ব্বোক্ত চারিটি সরকার হইতে মোট ৩১টি সরকার বিচ্ছিন্ন করিয়া লওয়া হয়। তন্মধ্যে সরকার গোয়ালপাড়া হইতে ৩টি, সরকার মালঝিটা হইতে ১৭টি, সরকার মুজকুরি হইতে ৪টি ও সরকার জলেশ্বর হইতে ৭টি গৃহীত হয়। শেষোক্ত ৩টি সরকারের ২৮টি মহাল লইয়া হিজলী ফৌজদারী গঠিত হইয়াছিল।

 হিজলী ও বালেশ্বর ফৌজদারী বঙ্গদেশের সহিত সংযুক্ত হইলে পর সুলতান সুজার নির্দ্ধারিত উড়িষ্যার পূর্ব্বোক্ত ৬টি সরকারের প্রত্যেকটি দুই অংশে বিভক্ত হইয়া পড়ে। যে অংশগুলি বাঙ্গালাদেশের অন্তর্ভূত হইয়াছিল, সেগুলি কিস‍্মৎ সরকার (যথা—সরকার জলেশ্বর কিস্‌মৎ, সরকার মুজকুরি কিস‍্মৎ প্রভৃতি) নামে পরিচিত হয়। (এই একই কারণে কোন কোন মহালেরও কিস‍্মৎ সিপুর, কিস‍্মৎ পটাশপুর প্রভৃতি নামও দৃষ্ট হইয়া থাকে)।

 ১৬৫৮ খৃষ্টাব্দে সুলতান সুজা সুবা বাঙ্গালারও রাজস্বের এক নূতন হিসাব প্রস্তুত করেন। উহাতে দেখা যায় যে, তিনি তোডরমল্লের সময়ের বাঙ্গালার পূর্ব্বোক্ত ১৯টি সরকারের সহিত হিজলী ও বন্দর বালেশ্বর ফৌজদারীর ছয়টি কিস‍্মৎ সরকার এবং নুতন গঠিত আরও নয়টি সরকার মিলিত করিয়া সুবা বাঙ্গালাকে ৩৪ সরকারে ও ১৩৫০ মহালে বিভক্ত করিয়াছিলেন।[২৬] ঐ সময় পুরাতন সরকারবিভাগের সীমারও কিছু কিছু পরিবর্ত্তন করা হইয়াছিল।

 রাজা তোডরমল্লের সময়ের সরকার মান্দারুণের অন্তর্গত এবং এই জেলার মধ্যস্থিত পূর্ব্বোক্ত চারিটি মহালের মধ্যে চিতুয়া মহাল নূতন বন্দোবস্তেও সরকার মান্দারুণের অন্তর্ভুতই থাকে। কিন্তু সাহাপুর ও মহিষাদল মহাল দুইটি যথাক্রমে সরকার কিস‍্মৎ গোয়ালপাড়ার ও সরকার কিস‍্মৎ মালঝিটার অন্তর্ভুক্ত হয়। পুরাতন সরকার মান্দারুণের অন্যতম মহাল হাভেলি মাদারুণের অন্তর্গত বরদা ও চন্দ্রকোণা ভূভাগ ঐ সময়ে সরকার পেস্কোসের অন্তর্ভূত হইয়াছিল;[২৭] সরকার পেস্কোস কোন সীমা-নির্দ্দিষ্ট স্থানকে বুঝাইত না। বঙ্গের সীমান্ত প্রদেশের স্বাধীন হিন্দু রাজারা যখন মুসলমানরাজের নিকট পরাভূত হইতেন, তখন তাঁহারা কিঞ্চিৎ উপঢৌকন, কখনও বা কিঞ্চিৎ নজর পেস্কোস অথবা সামান্য করদান স্বীকার করিয়া অব্যাহতি পাইতেন। কেহ কেহ বহিঃশত্রুর আক্রমণ হইতে দেশরক্ষা করিবেন বলিয়া সামান্য নজর পেস্কোস দিয়াই নিষ্কৃতি লাভ করিতেন। সুবা বাঙ্গালায় তৎকালে বিষ্ণুপুর, চন্দ্রকোণা, পঞ্চকোট প্রভৃতি স্থানে এইরূপ যে সকল জমিদার ছিলেন, সুলতান সুজা সেই সকল জমিদারের জমিদারিকে সরকার পেস্কোসের অন্তর্ভূত করিয়াছিলেন।[২৮] মোটামুটি বলা যায়, সরকার মান্দারুণ ও সরকার পেস্কোসের কিয়দংশ লইয়াই বর্ত্তমান ঘাটাল মহকুমা।

 খৃষ্টীয় ১৭২২ অব্দে বাঙ্গালার সুবাদার মুর্শিদকুলি খাঁ সুবা বাঙ্গালার রাজস্বের তৃতীয় হিসাব প্রস্তত করেন; তিনি ব্যয়-সংক্ষেপ করিবার নিমিত্ত সুজার নির্দ্ধারিত ৩৪টি সরকারের সমাহার করিয়া সুবা বাঙ্গালাকে ১৩টি চাকলায় ও ১৬৬০টি পরগণায় বিভক্ত করিয়াছিলেন।[২৯] ঐ সময় হইতে মহালগুলি পরগণা নামে অভিহিত হইয়া আসিতেছে।[৩০] মুর্শিদকুলির বিভাগানুসারে হিজলী ফৌজদারীর অন্তভূর্ত সুজার নির্দ্ধারিত কিস‍্মৎ জলেশ্বর, কিস‍্মৎ মালঝিটা ও কিস‍্মৎ মুজকুরির অন্তর্গত ৩৫টি পরগণা চাক‍্লা হিজলীর অন্তর্ভূত মুর্শিদকুলি খাঁর রাজস্ব-বিভাগ। হয়।[৩১] গ্রান্ট সাহেবের রাজস্ব-বিবরণী হইতে জানা যায় যে, ১৭২৮ খৃষ্টাব্দে (আমলি ১১৩৫ সাল) চাক‍্লা হিজলীতে ৩৮টি পরগণা ছিল এবং তৎকালে হিজলীর পরিমাণফল ১০৯৮ বর্গমাইল নির্দ্ধারিত হইয়াছিল।[৩২] ঐ সময় সরকার পেস্কোসের অন্তর্গত চন্দ্রকোণা ও বরদা পরগণা এবং সরকার মান্দারুণের অন্তর্গত চিতুয়া পরগণা চাক‍্লা বর্দ্ধমানের অন্তর্ভূত হয়।[৩৩]

 চাক‍্লা হিজলী ও চাক‍্লা বর্দ্ধমানের অন্তর্গত পূর্ব্বোক্ত পরগণাগুলি ব্যতীত জলেশ্বর, মুজকুরি ও গোয়ালপাড়া সরকারের অন্যান্য পরগণাগুলি চাক‍্লা মেদিনীপুর। বাঙ্গালার চাক্‌লাবিভাগের পর বহুদিন পর্য্যন্ত উড়িষ্যার অন্তর্গতই ছিল। পরবর্ত্তিকালে সেগুলি নূতন গঠিত চাক‍্লা মেদিনীপুর বিভাগের অন্তর্ভূত হয়। ১৭৬০ খৃষ্টাব্দের সন্ধিসর্ত্তানুসারে নবাব মিরকাশিম ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পনীকে চাক্‌লা বর্দ্ধমান, চাক‍্লা মেদিনীপুর ও চট্টগ্রাম (থানা ইসলামাবাদ) প্রদেশের সম্পূর্ণ অধিকার ছাড়িয়া দিলে, ঐ সকল স্থানে ইংরাজাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।[৩৪] কিন্তু চাক‍্লা হিজলীতে তখনও মুসলমানদিগের আধিপত্য থাকে। ১৭৬৫ খৃষ্টাব্দে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী সমগ্র বাঙ্গালার দেওয়ানী প্রাপ্ত হইলে, চাক‍্লা হিজলীও ইংরাজাধিকারভুক্ত হয়।[৩৫] গ্রান্ট সাহেবের রাজস্ববিবরণী হইতে জানা যায় যে, ১৭৭৭ খৃষ্টাব্দে চাক‍্লা মেদিনীপুরে ৫৪টি পরগণা ছিল এবং উহার পরিমাণফল ৬১০২ বর্গ-মাইল নির্দ্ধারিত হইয়াছিল।[৩৬]

 সমস্ত বঙ্গদেশে ইংরাজাধিকার প্রতিষ্ঠিত হইলে, রাজস্ব আদায়ের সৌকর্য্যার্থ কোম্পানী বাঙ্গালা, বিহার ও উড়িষ্যাকে কয়েকটি জেলায় বিভক্ত করেন।মেদিনীপুর জেলা। মুর্শিদকুলি খাঁর সময়ের চাক‍্লা বিভাগগুলিকে জেলা-বিভাগের মূলভিত্তি বলা যাইতে পারে। দেখা যায়, চাক‍্লা মেদিনীপুর সে সময় জলেশ্বর ও মেদিনীপুর নামে দুই বিভাগের অন্তর্ভূত থাকে। আধুনিক মেদিনীপুর জেলার সমস্ত ভূভাগ তৎকালে বর্দ্ধমান, জলেশ্বর, মেদিনীপুর ও হিজলী, এই চারিটি জেলারই অন্তর্ভূত ছিল। ১৭৮৭ খৃষ্টাব্দে জলেশ্বর জেলাকে মেদিনীপুর জেলার সহিত সংযুক্ত করিয়া দেওয়া হয়। [৩৭] ১৮১৯ খৃষ্টাব্দে বর্দ্ধমান জেলার কিয়দংশ বিচ্ছিন্ন করিয়া হুগলী জেলা গঠিত হইলে, এই জেলার উত্তরাংশের কয়েকটি পরগণা আবার হুগলী জেলার অন্তর্ভূত হইয় পড়ে। উত্তরকালে বর্দ্ধমানের অন্তর্গত বগড়ী পরগণা এবং হুগলীর অন্তর্ভূত পূর্ব্বোক্ত পরগণাগুলি ও সমগ্র হিজলী জেলাকে মেদিনীপুর জেলার সহিত সংযুক্ত করিয়া দেওয়া হয়।

 মেদিনীপুর জেলা বাঙ্গালা ও উড়িষ্যার প্রান্তভাগে অবস্থিত থাকায় নানা কারণে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এই জেলার প্রান্তভাগ হইতে কোন কোন স্থান নিকটবর্ত্তী অন্য জেলায় নীত হইয়াছে, আবার কোন স্থান অন্য জেলা হইতে এই জেলায় আনীতও হইয়াছে। পরে আমরা সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করিব।

 বাঙ্গালার শেষ নবাবদিগের আমলে সুবর্ণরেখা নদী উড়িষ্যার উত্তরসীমা বলিয়া নির্দিষ্ট হইত। সে সময় মহারাষ্ট্রীয়গণ সুবর্ণরেখা নদী পর্য্যন্ত ভূমিখণ্ডকে উড়িষ্যার অন্তর্গত বলিয়া অধিকার করিত; কিন্তু সুবর্ণরেখা ও রূপনারায়ণের মধ্যবর্ত্তী মেদিনীপুর প্রদেশটি তখনও কাগজে-কলমে উড়িষ্যারাজ্য বলিয়াই পরিচিত হইত।[৩৮] কোম্পানীর অধিকারের প্রারম্ভেও সুবর্ণরেখা ও রূপনারায়ণ নদীর মধ্যবর্ত্তী চাক‍্লা মেদিনীপুর বিভাগটি উড়িষ্যার অন্তর্গত ছিল; পরবর্ত্তিকালে ঐ বিভাগ বঙ্গদেশের অন্তভূর্ত হইয়াছে।

 মোটামুটি দেখিতে গেলে রূপনারায়ণ ও সুবর্ণরেখার মধ্যবর্ত্তী প্রদেশটি লইয়াই বর্ত্তমান মেদিনীপুর জেলা। উত্তরে বাঁকুড়া জেলা, পূর্ব্বে হুগলী ও হাবড়া জেলা এবং হুগলী নদী, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, দক্ষিণ-পশ্চিমে বালেশ্বর জেলা, পশ্চিমে ময়ুরভঞ্জ করদরাজ্য ও সিংহভূম জেলা এবং পশ্চিমোত্তরে মানভূম জেলা—এই চতুঃসীমান্তর্ব্ববর্ত্তী প্রদেশটি বর্তমান মেদিনীপুর জেলা নামে পরিচিত এবং উহাই এই পুস্তকের আলোচ্য। মেদিনীপুর জেলা ২২° ৫৬′৪০″ হইতে ২১° ৩৬′ ৪০″ অক্ষাংশ উত্তর এবং ৮০° ১৩′ ৩″ হইতে ৮৬° ৩৫′ ২২″ দ্রাঘিমাংশ পূর্ব্বে অবস্থিত।

 

 
  1. Lyall's Principles of Geology vol. I
  2. বঙ্গীয় সাহিত্য-সম্মেলনের তৃতীয় অধিবেশনের সভাপতি স্বর্গীয় সারদাচরণ মিত্রের পঠিত অভিভাষণ।
  3. জন্মভূমি পত্রিকা-১ম খণ্ড-৪৪৮ পৃষ্ঠা।
  4. হরিবংশ—৩১ অধ্যায়।
  5. গৌড়ের ইতিহাস—রজনীকান্ত চক্রবর্ত্তী—২ পৃষ্ঠা।
  6. নব্যভারত পত্রিকা—অগ্রহায়ণ ১৩১৭—“বঙ্গের ভৌগোলিক বিবরণ।”
  7. মহাভারত - সভাপর্ব্ব, ৩১ অধ্যায়, ২১-২৫ শ্লোক।
  8. অনেকে মনে করেন, দশকুমারচরিত খৃষ্টীয় ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে লিখিত; কিন্তু মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়ের মতে উহা খৃঃ পূর্ব্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে লিখিত।
  9. Asiatic Researches vol VIII. p. 33 I.
    Ancient India as described by P'tolemy by J. Crindle p. 169.
  10. জন্মভূমি পত্রিকা—১ম খণ্ড ৪৪৮ পৃষ্ঠা।
  11. রঘুবংশ ৪র্থ সর্গ ৩৫ শ্লোক।
  12. Journal of the Asiatic Society vol. LXVI. Part I. No 2.
  13. উৎকলে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য-সারদাচরণ মিত্র পৃঃ ৯।
  14. “The eastern part of Midnapore belonged to Tamralipta and Sumbha, hence there remains only the western part of the district which no other nation appears to have occupied; and if to this be added the modern district of Manbhoom, the eastern part of Singhbhoom and perhaps the southern portion of Bankura a well defined tract is obtained which no other tribe appears to have owned and which bordered in Pundra. I would suggest that this must have been Udra in ancient times.” J. R. A. S. Vol. LXVI. Part 1. No 2.
  15. J. A. S. B. Vol. XXII. pp. 281-282.
  16. Archaelogical Survey Report Vol. VIII. p. 9.
  17. সুপণ্ডিত উইলসন সাহেবের মতে মার্কণ্ডেয়পুরাণ খৃঃ নবম কি দশম শতাব্দীতে রচিত হইয়াছিল।
  18. উৎকলে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য পৃঃ ১২।
  19. Prof. Blochman's Ain-i-Akbari Vol. I.
  20. Blochman's Geographical and Historical notes on the Burdwan and Presidency Division in Hunter's Statistical Account of Bengal Vol. I. pp. 369.
  21. Blochman's Notes in Hunter's Statistical Account of Bengal Vol. I. p. 359; J. Beam's notes on Akbari Subas No. II. Orissa in J. R. A. S. 1896 pp. 743-765; Rai Manomohan Chakrabarti Bahadur's “Notes on the Geography of Orissa” J. A. S. B. Vol. XII. 1916 No. 1 pp. 46-56.
  22. বঙ্গীয় সাহিত্যপরিষদের মেদিনীপুর শাখার ৪র্থ বার্ষিক উৎসবের সভাপতি মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর অতিভাষণ।
  23. Grant's Historical and Comparative Analysis of the Finances of Bengal in the Fifth Report on East India Affairs edited by Ven. W. K. Firminger Vol. II. 454-456.
  24. Grant's Analysis—Fifth Report—Firminger Vol. II. pp. 45. 182-183, 189.
  25. Hunter's Statistical Account of Bengal Vol. III. p. 199.
  26. Grant's Analysis pp. 182-183 Vol. II.
  27. Grant's Analysis. Vol. II. pp. 465, 410, 411, 459.
  28. Grant's Analysis Vol. II. p. 184.
  29. Grant's Analysis Vol. II. pp. 188-189.
  30. J. A. S. B. Vol. XIL 1916 No, I. p. 32.
  31. Grant's Analysis Vol. II. p. 189.
  32. Grant's Analysis Vol. II. pp. 364-365.
  33. Grant's Analysis Vol. II. pp. 366, 41o, 411.
  34. H. Verelst's “A view of the English Government in Bengal (1772) App. No. 47. Aitchison Vol. I. pp. 216-217.
  35. H. Verelst's view Vol. I. pp. 225-226.
  36. Grant's Analysis pp. 457-460.
  37. Firminger's Fifth Report Vol. II. p. 734. “Extract from the Proceedings of the Board of Revenue dated 13-4-1787.”
  38. In the last century Orissa included the tract of country between the river Rupnarayan and Subarnarekha”—Bengal Adminstration Report 1872-73 p. 4o.