মেয়েলি ব্রত ও কথা
মেয়েলি
ব্রত ও কথা.
অর্থাৎ
পূর্ব্ববঙ্গের বোষিৎ প্রচলিত কতিপয় ব্রতের
বিবরণ.
শ্রীপরমেশপ্রসন্ন রায়, বি. এ.
সঙ্কলিত.
প্রকাশক
শ্রীগুরুদাস চট্টোপাধ্যায়।
বেঙ্গল মেডিকাল লাইব্রেরী, ২০১নং কর্ণওয়ালিস স্ট্রীট,
কলিকাতা.
All Rights Reserved. মূল্য ৷৹ আনা মাত্র.
Printed by
MUNSHI MAHAMMAD PANAULLAH
At the Dt. Bd. Press, Mymensingh.
বাল্য-সুহৃদ্
অগ্রজপ্রতিম
“বঙ্গভাষা ও সাহিত্য” রচয়িতা
শ্রীযুক্ত দীনেশচন্দ্র সেন
মহাশয়ের করকমলে
প্রদত্ত হইল
মুখবন্ধ
পল্লীগ্রামের রমণী সমাজে বহুবিধ বারব্রত অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে। তাহার অধিকাংশ সম্পূর্ণ যোষিৎপ্রচলিত। শাস্ত্র দ্বারা প্রচারিত নয় বলিয়া মেয়েলি ব্রতগুলি দেশভেদে নানা প্রকার। পশ্চিম বঙ্গের কএকখানি ব্রত-পুস্তক প্রকাশিত হইয়াছে। এই ক্ষুদ্র গ্রন্থে পূর্ব্ববঙ্গের বিশেষতঃ পশ্চিম-ঢাকা অঞ্চলের ব্রাহ্মণ, বৈদ্য ও কায়স্থ সমাজে প্রচলিত কতিপয় ব্রতের বিবরণ লিপিবদ্ধ হইল।
শিক্ষিত সমাজের অনেকেই অন্তঃপুরের বারব্রত ও অন্যান্য ক্রিয়াকলাপের প্রতি অবজ্ঞা-মিশ্রিত কৃপা কটাক্ষপাত করিয়া থাকেন। কিন্তু সৌভাগ্য ক্রমে সম্প্রতি অন্তর্দৃষ্টির কাল উপস্থিত। সেই ভরসায়, এবং পূজনীয় শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের উৎসাহ বাক্য শিরোধার্য্য করিয়া, বাহশোভা-বিবর্জ্জিত এই ক্ষুদ্র পুস্তক জনসমাজে প্রচার করতে সাহসী হইলাম।
শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় কৃপা পূর্ব্বক যে অভিমত জ্ঞাপন করিয়াছেন তাহা নিম্নে উদ্ধত হইল-
“শ্রীযুক্ত পরমেশপ্রসন্ন রায় মহাশয় সঙ্কলিত ‘মেয়েলি ব্রত ও কথার মুদ্রিতাংশ প্রাপ্ত হইয়া বিশেষ আনন্দ লাভ করিলাম।”
বহুদিন হইল সাধনা পত্রিকায় বাংলার এই সকল গ্রাম্য সাহিত্য প্রকাশের জন্য উদ্যোগী ছিলাম। তখন এগুলিকে তুচ্ছ ও লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিবার অযোগ্য বলিয়া অনেকেই অনাদর করিতেন। এই সাহিত্য যে স্বতঃসৃত নদীর ধারার মত সুচিরকাল হইতে বাংলার পল্লী-গৃহের দ্বারে দ্বারে প্রবাহিত হইয়া আসিয়াছে, শিক্ষা এবং আনন্দ ঘরে ঘরে বহন করিয়া দিবার এমন সহজবিহিত, সুন্দর, এমন চিরন্তন ব্যবস্থা যে আর কিছুই হইতে পারে না, এই সাহিত্যের মধ্যেই আমাদের পল্লীজীবন-যাত্রার সরল মূলনীতিগুলি যে নানা আকারে সন্নিবেশিত হইয়া আছে এবং কালের পরিবর্ত্তন বশতঃ এগুলি বিলুপ্ত হইয়া গেলে দেশের পুরাবৃত্তের একটী প্রধান উপকরণ নষ্ট হইয়া যাইবে—স্বদেশের প্রতি একদা ঔদাসিন্য বশতঃ একথা তখন কেহ চিন্তা করিতেন না। এখন যে আমাদের সেই দুর্দ্দিনের অবসান হইয়াছে, দেশকে প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করিবার জন্য আমাদের হৃদয়ে আগ্রহ জন্মিয়াছে, বর্ত্তমান গ্রন্থ তাহারই সূচনা করিতেছে। আর একখানি ব্রত কথার সংগ্রহ অল্প দিন হইল প্রকাশিত হইয়াছে; কিন্তু তাহাতে কথাগুলি পুঁথির ভাষায় লিখিত হওয়ায় তাহার রস নষ্ট হইয়াছে। বর্ত্তমান গ্রন্থে সেরূপ নিষ্ঠুরভাবে বিশুদ্ধি সাধনের চেষ্টা হয় নাই দেখিয়া আশ্বস্ত হইয়াছি।
আশাকরি গ্রন্থকারের সংগ্রহ অধ্যবসায় পাঠকদিগের নিকট হইতে সমাদর লাভ করিয়া স্বদেশের অন্তঃপুরে নূতন নূতন সন্ধান ও আবিষ্কারে সার্থক হউক।”
শিক্ষা ও সংসর্গ দোষে পল্লীগ্রামের ব্রতাচরণ ক্রমশঃ বিলুপ্ত হইবার সম্ভাবনা হইয়াছে। দোল দুর্গোৎসব প্রভৃতি ব্যয়সাধ্য ব্যাপার প্রতিগৃহে অনুষ্ঠিত হয় না। পারিবারিক ক্রিয়াকাণ্ড প্রতিনিয়ত সঙ্ঘটিত হয় না। অপিচ, সঙ্গতিপন্ন ব্যক্তিগণ সহরে বাস করেন এবং সহরেই তাঁহাদের বিবাহোৎসব সম্পন্ন হয়। এমত অবস্থায় বারব্রত ও পার্ব্বণাদি বিদূরিত হইলে পল্লীগ্রামের বালক বালিকাদের জীবন নীরস ও নিরানন্দময় হইয়া উঠিবে। বারব্রত বর্জ্জন করিলে হিন্দুগৃহে একাদশীর নিরম্বু উপবাস ব্যতীত আর কি ধর্ম্মানুষ্ঠান রহিয়া যাইবে তাহাও ভাবিবার বিষয়।
ব্রতনিয়ম ও উপবাস অবলম্বনে হিন্দু রমণীগণ শৈশব হইতেই গুরুভক্তি, ধর্ম্মে বিশ্বাস, গৃহধর্ম্মে আস্থা ও ইন্দ্রিয় সংযম প্রভৃতি সৎগুণ শিক্ষা ও অভ্যাস করিয়া থাকেন। অধুনা ইউরোপে যেরূপ কিণ্ডার-গার্টেন প্রণালী দ্বারা বিদ্যাশিক্ষাদানের প্রথা প্রবর্ত্তিত হইয়াছে, আমাদের দেশে সেইরূপ কৌশলে বালিকাগণ স্মরণাতীত কাল হইতেই “বারব্রত” পদ্ধতিক্রমে ধর্ম্মনীতি শিক্ষালাভ করিয়া আসিতেছে। এইরূপ অপূর্ব্ব শিক্ষারীতির গুণেই আমাদের সংসার এখনও এত সুধাময়। এতৎসম্বন্ধে স্বনামধন্যা মার্কিণ-মহিলা “ভগিনী নিবেদিতা” The Modern Review নামক মাসিক পত্রে কিয়দ্দিন হইল এক সারগর্ভ প্রবন্ধ লিখিয়াছেন। তাহা হইতে কতিপয় ছত্র নিম্নে উদ্ধত হইল-
“Great men work out knowledge, and give it to the community. Thus each civilisation becomes distinguished by its characteristic institutions. Nothing could be more perfect educationally than the bratas which Hindu society has preserved and hands to its children in each generation, as perfect lessons in worship, so in the practice of social relationships, or in manners. Some of these bratas—like that which teaches the service of the cow, or the sowing of seeds, or some which seem to set out on the elements of geography and astronomy—have an air of desiring to impart which we now distinguish as secular knowledge. They appear, in fact, like surviving fragments of an old educational scheme. But for the most part, they constitute a training in religious ideas and religious feelings. As such their perfection is startling. They combine practice, story, game, and object with a precision that no Indian can appreciate or enjoy as can the European familiar with modern educational speculation. India has, in these, done on the religious and social plane, what Europe is trying, in the Kindergarten, to do on the scientific. When we have understood the bratas, we cease to wonder at the delicate grace and passivity of the Oriental woman."
(Sister Nivedita in an article ‘The place of the Kindergarten in Indian schools’ in The Modern Review, August 1908.)
অতঃপর, আমাদের অন্তঃপুরের বারব্রতাদি সম্বন্ধে যাঁহারা অযথা নিন্দাবাদ করেন, এই ‘মুখবন্ধে’ রবিবাবুর এবং মার্কণ মহিলার মন্তব্য পাঠ করিয়া তাঁহাদের মধ্যে অন্ততঃ দুই এক জনেরও মুখ বন্ধ হইতে পারে এরূপ আশা করা বোধ হয় নিতান্ত অসঙ্গত হইবে না।
এই লেখাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাবলিক ডোমেইনে অন্তর্গত কারণ এটি ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের ১লা জানুয়ারির পূর্বে প্রকাশিত।
লেখক ১৯২৭ সালে মারা গেছেন, তাই এই লেখাটি সেই সমস্ত দেশে পাবলিক ডোমেইনে অন্তর্গত যেখানে কপিরাইট লেখকের মৃত্যুর ৮০ বছর পর্যন্ত বলবৎ থাকে। এই রচনাটি সেই সমস্ত দেশেও পাবলিক ডোমেইনে অন্তর্গত হতে পারে যেখানে নিজ দেশে প্রকাশনার ক্ষেত্রে প্রলম্বিত কপিরাইট থাকলেও বিদেশী রচনার জন্য স্বল্প সময়ের নিয়ম প্রযোজ্য হয়।