মেয়েলি ব্রত ও কথা/অরণ্যষষ্ঠী
অরণ্যষষ্ঠী ব্রত।
জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লষষ্ঠীতে অরণ্যষষ্ঠী ব্রত করিতে হয়। এই মাসে ফল-শ্রেষ্ট পক্ক আমের আধিক্য বশতঃ আম্রফল নৈবেদ্যের প্রধান উপকরণ। এজন্য চলিত কথায় ইহার অপর নাম আমষষ্ঠী ব্রত। বলা বাহুল্য এ দিবস জামাই বাবুদের স্মরণীয় দিন।
স্ত্রীলোকেরা তালবৃন্ত ও পূজার দ্রব্যাদি লইয়া বনে গমন পূর্ব্বক অরণ্যষষ্ঠী দেবীকে পূজা করিবেন, এইরূপ শাস্ত্রের বিধান। অরণ্যে পূজার ব্যবস্থা বটে, কিন্তু অরণ্য বঙ্গীয় পুরুষদের পক্ষেও সুগম নহে। এজন্য গৃহিণীগণ গৃহ মধ্যেই (প্রাঙ্গনেও নহে) অরণ্য কল্পনা করিয়া ষষ্ঠীদেবীর পূজা করিয়া থাকেন। পাহাড় জঙ্গল সুলভ শিলাখণ্ডে যষ্ঠীদেবীর অধিষ্ঠান কল্পিত হয়। অন্য প্রস্তর খণ্ডের অভাবে মশলা পেশণী “নোড়া” দ্বারাই কার্য্য নিষ্পন্ন হয়! কুলবতীগণ সিন্দুর-লিপ্ত একটী ভগ্নাবশেষ নোড় এই বার্ষিক ব্রতের জন্য সযত্নে গৃহে তুলিয়া রাখেন।
গৃহের ভিতর অরণ্য কল্পনা মন্দ নয়! অনেক নিরীহ ব্যক্তি অপ্রিয়বাদিনী ভার্য্যার সঙ্গে কলহ করিয়া শাস্ত্রীয় ব্যবস্থার মর্যাদা রক্ষা করিবার জন্য অরণ্যগমনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। অতঃপর বোধ হয় তাঁহাদের গৃহে রহিয়া গেলেই চলিবে। যথা। গৃহং তথা অরণ্যং!
পুরোহিত যথা-বিধি পূজা করিবেন। ধ্যান যথা;
দ্বিভুজাং হেম গৌরাঙ্গীং রত্নালঙ্কার ভূষিতাং।
বরদাভয়হস্তাঞ্চ শরচ্চন্দ্র নিভাননাং॥
পট্টবস্ত্র পরিধানাং পীনোন্নত পয়োধরাং।
অঙ্কার্পিত সুতাং ষষ্ঠীমার্জারস্থাং বিচিন্তয়েৎ॥
পূজান্তে ব্রত কথা শ্রবণ ও ব্রত নির্দ্দিষ্ট কার্য্যাদি করিয়া সে দিবস ফুলমুলাদি আহার করিতে হয়। ব্রতের ফল, সন্তান লাভ ও পুত্র কন্যার দীর্ঘ জীবন।
ব্রতের সংকল্প বাড়ীর মেয়েদের নামে হয়। যতজন ব্রত করিবেন ততটী (১) বীজন বা পাখা, (২) পক্ক আম্র ও (৩) দুর্ব্বাগুচ্ছ আবশ্যক। এই দুর্ব্বাগুচ্ছ পূর্ব্বদিন অপরাহ্নে বাড়ীর কন্যাগণ দুর্ব্বাক্ষেত্র হইতে সযত্নে সংগ্রহ করেন। “ছয় কুড়ি। ছয় গাছি”[১] দীর্ঘবৃন্ত দুর্ব্বা এবং ছয়টী নূতন বাঁশপাতার অগ্রভাগ একত্র করিয়া কলাগাছের ছোবড়া বা আঁশ দ্বারা বাঁধিতে। হয়। তবেই একটী দুর্ব্বাগুচ্ছ বা এক আটি দুর্ব্বা হইল।
পূজা স্থলে পিটুলীর বিচিত্র আলিপনা দিবে। প্রত্যেক ব্রতচারিণীর নির্দ্দিষ্ট পাখার উপর একটা পাকা আম ও পূর্ব্বোক্ত এক আটি দুর্ব্বা স্থাপন করিয়া পূজাস্থলে রাখিবে। পাখায় সিন্দুরের ফোঁটা দেওয়া বিধি। একটী কলা, একটী সুপারি ও একটী পান একত্র করিলে এক ভাগ হইল। এইরূপ প্রতি ব্রতচারিণীর নিমিত্ত ছয় ভাগ দিয়া কুচো নৈবেদ্যের ন্যায় এক খানি বা ততোধিক বড় ডালা সাজাইয়া দিবে। তাম্বুলপত্র দোভাঁজ করিয়া খড়কে দ্বারা আবদ্ধ করিয়া দিতে হয়। অন্য নৈবেদ্যাদিও দিবে।
পূজার পূর্ব্বে (ষষ্ঠীতিথি কাল সংকীর্ণ হইলে পূজার পরে হইলেও চলে) ব্রতচারিণী তাঁহার নির্দ্দিষ্ট পাখা, আম ও দুর্ব্বার আঁটি লইয়া স্নান করিবেন। কেহ গায়ে তৈল মাখিবেন না। এস্থলে বলা আবশ্যক ষষ্ঠীব্রতের দিন তৈল ও আমিষ নিষিদ্ধ। জলে দাঁড়াইয়া পাখা ও আম বা ঁহাতে রাখিয়া দুর্ব্বার আঁটি দ্বারা “ছয় কুড়ি ছয় বার” চোখে জলের ছিটা দিবেন। পর ঐ তিন দ্রব্য ডান হাতে লইয়া বুকে ছয় বার জল দিতে হয়। স্নানান্তে ঐগুলি পূজাস্থলে রাখিয়া দিবেন। পূজা শেষে ফুল খাতে করিয়া রতকথা শুনিতে হয়। কতগুলি অতিরিক্ত দুর্ব্বা (আটি বাঁধা নয়) পূর্ব্বই সংগৃহীত থাকে। ইহাকে “যাট বাছা” দুর্ব্বা বলে। কথা শ্রবণের পর এক এক গাছি দুর্ব্বা লইয়া পূর্বোক্ত নোড়র উপর দিবে এবং এইরূপ বলিবে, যথা;
অগ্রহায়ণে[২] মুলো ষষ্ঠী, ষাট ষাট ষাট (দুর্ব্বাদান)
পৌষে লোটন যষ্ঠী, (ঐ)। মাঘে শীতলা ষষ্ঠী, (ঐ)।
ফাল্গুনে গুণো ষষ্ঠী (ঐ)। চৈত্রে অশোক ষষ্ঠী, (ঐ)।
বৈশাখে দই ষষ্ঠী, (ঐ)। জ্যৈষ্ঠে অরণ্য ষষ্ঠী,
অরণ্যে গেলেও ঝি পুত ফিরে আসে (দুর্ব্বাদান)।
আষাঢ়ে চাপড় ষষ্ঠী, (ঐ)। শ্রাবণে লুণ্ঠন ষষ্ঠী, (ঐ)।
ভাদ্রে অক্ষয়া ষষ্ঠী, (ঐ)। আশ্বিনে বোধন ষষ্ঠী, (ঐ)।
কার্তিকে শ্মশান ষষ্ঠী, শ্মশানে গেলেও ঝি পুত
ফিরে আসে। ষাট ষাট ষাট (দুর্ব্বাদান)।
অতঃপর,
কালী, দুর্গা ও গৃহদেবতার নাম উল্লেখ করিয়া ... ষাট ষাট, ষাট (দুর্ব্বাদান)।
তার পর,
ছেলে, মেয়ে, বউদের নাম করিয়া ... (পূর্ব্ববৎ দুর্ব্বাদান করিবে।)
তৎপর ডালার আম কলা পান সুপারি এক এক ভাগ ভুলিয়া এক জন অপরের হাতে দিবেন। ইহাকে বায়না বদল কহে। ননদ ও ভাই-বৌতে, জা’য়ে জা’য়ে এইরূপ বদল চলে। কিন্তু শ্বাশুড়ী-বৌ’তে হয় না।
অনন্তর নোড়ার উপর আলো চাউল ছিটাইয়া বলিতে হয়, যথা;
নিজ পেটে নাই এলো-মেলো (ঘুরপাক) ষাট ষাট ষাট (চা’ল নিক্ষেপ)
বৌর পেটে নাই (ঐ)। চা’ল নিক্ষেপ। ঝির পেটে নাই। (ঐরূপ)।
অবশেষে একে একে ছেলে মেয়ে ও বাড়ী শুদ্ধ সকলের গায়ে পূর্ব্বোক্ত দুর্ব্বার আটি দ্বারা জল ছিটাইয়া ও পাখার বাতাস দিয়া বলিবে;
“জ্যৈষ্ঠ মাসের ষষ্ঠীপূজা, ষাট ষাট ষাট!”
এক ছিলেন ব্রাহ্মণ। তাঁর ব্রাহ্মণীর সন্তান হ’য়ে বাঁচে না। সন্তান হ’লেই মা ষষ্ঠীর বাহন কালো বেড়াল মুখে ক’রে নিয়ে ষষ্ঠীঠাক্রুণের কাছে ছেলে দিয়ে আস্তো। ব্রাহ্মণের এজন্য দুঃখের সীমা নাই। তিনি ভাবলেন আমার বা বাহ্মণীর যে কি অপরাধ হয়েছে তা’ কিছুই ঠাওরাতে পাচ্ছিনে। যদি ছেলেই না বাঁচলো তবে আর সংসারে থেকে সুখ কি। শুনেছি ষষ্ঠীঠাক্রুণ পাহাড় জঙ্গলে থাকেন। তাঁকে খুজে বের ক’রে কষ্টের কথা জানাব। আর যদি তাঁর দেখা না পাই তাহ’লে আর ঘরে ফিরবো না। মনের কষ্টে তিনি একদিন ব্রাহ্মণীকে ঘরে রেখে যষ্ঠীদেবীর উদ্দেশে যাত্রা করলেন।
পথে এক গাইগোরুর সঙ্গে দেখা। গোরু বল্লে, ঠাকুর গো! প্রণমি হই; কোথায় যাচ্ছ? ব্রাহ্মণ বলেন, আমান দুঃখের কথা বলতে ষষ্ঠীঠাকরুণের কাছে যাচ্ছি। তাই শুনে গাই বল্লে, ঠাকুর! আমারও দুঃখের কথা আছে। দেখ আমার এত দুধ হয়েছে, তা’ মানুষেও নেয় না, বাছুরেও খায়না। বাঁটের বেদনায় আমি দিন রাত অস্থির আছি। তোমার পা’য়ে পড়ি, ষষ্ঠীঠাকরুণের কাছে আমার কথাটা ব’লো। ব্রাহ্মণ স্বীকার কল্লেন।
জ্যৈষ্ঠ মাস, দারুণ রোদ; ব্রাহ্মণ পথে যেতে যেতে এক আম গাছের তলায় বিশ্রাম করতে গেলেন। তখন আম গাছ বল্লে, ঠাকুর! কোথায় যাচ্ছ? “যষ্ঠীঠাকরুণের কাছে যাচ্ছি”। কেন? “আমার দুঃখের কথা বলতে।” তাই শুনে আম গাছ বল্লে, ঠাকুর গো, আমার গতি কি হবে! আমার দেখ কত ফল হয়েছে, তা’ মানুষেও নেয় না, ঝড়েও পড়ে না, কাকেও খায় না। বোঁটার ব্যথায় আমি অস্থির হয়েছি। তোমার পায়ে পড়ি, ষষ্ঠীঠাক্রুণের কাছে আমার কথাটা মনে ক’রে বলো’। ব্রাহ্মণ সম্মত হ’লেন।
তার পর এক কাঠ কুড়ুণী মেয়ের সঙ্গে দেখা। তার মাথায় এক বোঝা খড় ও কাঠ। সে বল্লে, দাদা ঠাকুর! আমার দুঃখের কথাটা ষষ্ঠীঠাকরুণের কাছে অবশ্য ক’রে বলো। আমার খড় ও কাঠ কেউ কিনে নেয় না, আর মাথা থেকেও বোঝা নামে না।
পথে আবার এক গরীবের মেয়ের সঙ্গে দেখা। তার মাথায় মালশা চুণ। সেও বল্লে, আমার এই চুণ কেউ কিনে নেয় না, আর মাথা থেকেও মালশা নামে না। ঠাকুর, আমার কথাটাও যেন মনে থাকে।
তারপর পথে যেতে যেতে আরও একজন দুঃখী মেয়েমানুষের সঙ্গে দেখা। তার কোলে এক ছেলে, ঢেঁকির উপর এক পা। সেও বল্লে, ঠাকুর আমার দুর্দ্দশা দেখ; ঢেঁকি থেকে পা কিছুতেই নামাতে পারি না; ছেলেও কোল থেকে নামাতে পারি না। ঠাকুর গো! আমার উপায় কি হবে? তোমায় গড় করি, আমার কথাটা ভুলো না।
ব্রাহ্মণ অনেক কষ্টে খোঁজ খবর ক’রে এক মহা অরণ্যে ষষ্ঠীদেবীর সাক্ষাৎ পেলেন। তিনি দেখলেন, অপরূপ! ষষ্ঠীঠাক্রুণের চাঁদপানা মুখ, সোণার অঙ্গে হীরে মাণিক, সিঁতেয় সিন্দুর, মুখে পাণ, কোলে এক টুকটুকে ছেলে, “সোণর খাটে গা, রূপোর খাটে পা, চা’দ্দিকে বইচে শ্বেত চামরের বা।”
ব্রাহ্মণ প্রণাম ক’রে করযোড়ে দাঁড়ালেন। যষ্ঠীঠাকরুণ। “বল্লেন, তুমি কেন এসেছ তা জানি। তোমার ব্রাহ্মণী ছেলেপুলের আদর যত্ন কিছুই জানে না। আমার-দেওয়া সন্তানকে তুচ্ছু করে। এজন্য তার ছেলে বাঁচে না। তুমি আমার কাছে এই প্রতিজ্ঞা ক’রে যাও, এবার ছেলে হ’লে তোমরা তার গায় মত তুলবে না, কেবল ‘ষাট সোণা’ বলে আদর করবে, আবদার সয়ে থাকবে। তা যদি কত্তে পার তবেই আমি তোমাদের কাছে ছেলে রাখবে, নইলে আমার ছেলে আবার আমার কাছে ফিরে আসবে। ব্রাহ্মণ স্বীকার কল্লেন।
তারপর তিনি সেই গাইগোরু, আম গাছ, আর মেয়ে তিনটির কথা একে একে নিবেদন কল্লেন। যষ্ঠীঠাকরুণ বল্লেন এক বামুন দেব-সেবার জন্যে দুধ চেয়েছিল। যখন দুধ দোয় তখন গাইটা দুধ চুরী করেছিল। এজন্য তার ঐ দুর্দ্দশা। একজন বামুনকে অকাতরে দুধ ছেড়ে দি’ক, তবেই তার ভাল হ’য়ে যাবে এখন।
আম গাছের কথা শুনে যষ্ঠী বল্লেন, এক বামুন দেব-সেবার জন্যে একটা পাকা আম নিতে এসেছিল। গাছটা ফলের বোঁটা শক্ত ক’রে টেনে রেখেছিল, এজন্য তার ঐ দশা হয়েছে। একজন বামুনকে সমস্ত ফল দি’ক, তবেই তার ভাল হবে।
কাঠকুড়ণী মেয়ের কথা। সে একজনের মাথায় খড়ের কুটা দেখেও কিছু বলে নি, এজন্যে তার ঐ দশা। একজন বামুনকে সব খড় কাঠ দি’ক, তবেই তার ভাল হবে।
চুণ ওয়ালীর কথায় যষ্ঠী বল্লেন, সে একজনের মুখে চুণের দাগ দেখেও কিছু বলেনি, এজন্যে তার ঐ দশা। একজন বামুনকে চূণের মালশা দি’ক, তবেই তার ভাল হবে।
আর ঢেঁকি থেকে যার পা নামে না। ওই অবাগী এক বামুনের বাড়ীতে দাসীপনা করতো; তখন সে কাজ ফাঁকি দিত। এই জন্যে তার ঐ দুর্দ্দশা। এখন এক বামুনের বাড়ীতে কাজ করুক গে, তবেই তার ভাল হবে।
ব্রাহ্মণ ষষ্ঠী ঠাকরুণের নিকট হইতে বিদায় হ’লেন। ফিরিবার পথে প্রথমে ঐ দাসীর সঙ্গে দেখা। সে বল্লে, ঠাকুর গো! প্রণাম হই। আমি তোমার জন্যে পথের পানে চেয়ে আছি। ব্রাহ্মণ বল্লেন, হাঁ বাছা, তোমার কথা বলেছি। তুমি আগে এক বামুনের বাড়ীতে দাসী ছিলে; কেমন? “হাঁ, ঠাকুর ঠিক বলেছ।” ষষ্ঠী ঠাকরুণ বল্লেন, তখন তুমি কাজে গাফিলি কোরতে। এই জন্যেই তোমার এই দশা। ষষ্ঠী বল্লেন, তুমি এক বামুনের বাড়ীতে কাজ কর গে, তবেই তোমার ভাল হবে। তাই শুনে সে বল্লে, ঠাকুর বাঁচলুম; তুমিই তো বামুন, তোমার বাড়ীতেই আমি কাজে লেগে যাই। ব্রাহ্মণ বলিলেন, আচ্ছা চল।
তারপর চুণওয়ালী, কাঠকুড়ুণী, আমগাছ ও অবশেষে গাইয়ের সঙ্গে দেখা হলো। তারা সব কথা শুনে, তিনিই তো ব্রাক্ষণ এজন্য তাঁকেই চুণ খড়কাঠ, আম ও দুধ দিতে চাইলে। ব্রাক্ষণ অগত্যা স্বীকার কল্লেন। তারা মুক্ত হলো।
ব্রাহ্মণ বাড়ীতে এলেন। কিছুকাল পরে মা ষষ্ঠীর বরে তাঁর এক পরম সুন্দর ছেলে হলো। মা বাপের মুখে সদাই কেবল “যাট, বাছা, সাত রাজার ধন মাণিক আমার” ইত্যাদি। ছেলে একদিন দুষ্টমি ক’রে নাপিতের কান কেটে দিলে। নাপিত চেঁচাইতে লাগিল। ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণী ছুটে এসে “মানিক আমার! দুলাল আমার” ব’লে ছেলেকে কোলে নিলেন, আর নাপিতের হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে বিদায় কল্লেন। তার পর ছেলে একটু বড় হ’লে আদর করে তার বিয়ে দিলেন। একদিন ছেলেটী বউকে মিছিমিছি খুব মা’ল্লে। মার খেয়েও কনে বউটী বল্লে,কিছু দুঃখ নাই মনে, শ্বশুর-নন্দন!
তোমারি প্রসাদে শাঁখা সিন্দুর চন্দন।
একদিন ঘরে ষষ্ঠীব্রত। ছেলে তার মায়ের কাছে গিয়ে। বলে, মা তেল দাও,[৩] নাইতে যাব। মা হাঁসতে হাঁসতে বল্লেন, না বাছা, যষ্ঠীব্রতের দিনে কি গায়ে তেল মাখতে আছে? খুড়ী, জেঠাই, মাসী, পিশি সবাই মিষ্টি কথায় তাই বল্লে। তখন ছেলে মনে কল্লে, অন্ততঃ শ্বশুর বাড়ীতে আমার কথা অবহেলা কত্তে কারু সাধ্য হবে না। এই ভেবে, সে দুটে। শ্বশুর বাড়ীতে চ’লে গেল। সেখানে জামাই আদর; শুধু মিষ্টি কথায় মন ভুলানো নয়, দেখবার, শোনবার, খাবার সবাতেই মিষ্টি। জামাই বল্লে, আমি নাইতে যাবো, তেল দাও। সুন্দরী শালীরা তার চা’দ্দিকে ব’সে হেঁসে হেঁসে বলে, তুমি হঠাৎ এসেছ, রান্নার এখনো ঢের দেরী; তুমি ততক্ষণ একটু জল খাও। এই ব’লে কেউ আমের থালা, সন্দেশের থালা, কেউ পায়েস ও ক্ষীরের বাটী ইত্যাদি, কত নাম বলি, এই সব এনে জামাইকে ঘিরে বসলো। জামাই বল্লে, আমি নেয়ে কিছুই খাব না। তখন শালীরা তেলের বদলে তেলের বাটিতে ক’রে মধু এনে দিলে। তাই মাথায় দিয়ে জামাই ভাবলেন, আহা! শ্বশুর বাড়ীর তেলটুকও মিষ্টি! বেগতিক দেখে “মধুর পুরী” ত্যাগ ক’রে ছেলে এক দৌড়ে কলুর বাড়ী গিয়ে তার ভাঁড় ভেঙ্গে গায়ে তেল মাখলে। তেল মেখেই ছেলে একেবারে ছুটে মা ষষ্ঠীর কাছে উপস্থিত। ষষ্ঠীঠাক্রুণ আশ্চর্য হয়ে বল্লেন, বাছা হঠাৎ এলে কেন? ছেলে গায়ে তেল দেখালে। ষষ্ঠী বল্লেন, তোমার মা, খুড়ী, জেঠাই, মাসী পিশি, শ্বাশুরী, শ্যালীরা কেউ ইচ্ছা ক’রে তোমায় আজ তেল দেয়নি। তুমি নিজেই জোর ক’রে কলুর ভাঁড় ভেঙ্গে তেল মেখেছ। কাজ ভাল হয়নি, এতে ওদের দোষ কি? তুমি এখনি ফিরে যাও। ছেলে তখন স্নান ক’রে বাড়ী গেল। সেই থেকে বাবাজীর মতি ফিরিল। বিদ্যে হলো, বুদ্ধি হলো ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণী ছেলে, নাতি, নাতনী নিয়ে পরম সুখে ঘরকন্না কত্তে লাগলেন।
প্রণাম। জয়দেবি জগন্মাত র্জ্জগদানন্দ কারিণি।
প্রসীদ মে কল্যাণি নমস্তে ষষ্ঠীদেবিকে॥
ষষ্ঠীদেবীকে প্রণাম জ্ঞাপনের সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব্বোক্ত নোড়া ললাটে ও বক্ষে স্পর্শ করিতে হয়।
এ ব্রত কল্লে কি হয়?
হয়ে পুত্র মরবে না।
চোকের জল পড়বে না॥
- ↑ সর্ব্ববিধ ষষ্ঠীতে “ছয়” সংখ্যাটীর বড় সমাদর।
- ↑ অগ্রহায়ণ মাসের নাম সর্ব্ব প্রথমে উল্লেখ করিতে হয়। এই মাসে বঙ্গদেশে প্রাচুর্য্য হেতু সৌন্দর্য্য বর্দ্ধিত হয়। এজন্য বৎসরের অপর মাস অপেক্ষা ইহাকে শ্রেষ্ট (অগ্র) মাস কহে। মেয়েলি বারব্রত অগ্রহায়ণ মাসে যত, আযর কোন মাসে তত নয়।
- ↑ পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে, ষষ্ঠীব্রতের দিন তৈল ম্রক্ষণ ও আমিষ ভক্ষণ নিষিদ্ধ। পরবর্তী ব্রত কথায় (মুলোষষ্ঠী) আমিষ-বিভ্রাট বর্ণিত হইয়াছে।