মোহনলাল/তৃতীয় পরিচ্ছেদ
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
বোর্ডিং হইতে বাহির হইয়া, আমি ও রমানাথ একটা চেনা মুদির দোকানে জিনিষপত্র রাখিয়া, গড়ের মাঠের দিকে চলিলাম। রাগে, দুঃখে ও অপমানে তখন উভয়ের মন এত উত্তেজিত ছিল যে, ভবিষ্যতে কি করিব, কোথায় যাইব, সে কথা আমাদের মনেই আসিল না। গড়ের মাঠের নির্ম্মল বায়ু সেবনে শরীর ও মন কতক শীতল হইলে, একটা গাছতলায় বসিয়া আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ কার্য্য-কলাপের বিষয় আলোচনা করিতে লাগিলাম। রমানাথ জিজ্ঞাসা করিল, “বাড়ী গিয়ে তোমার মাকে এ সব কথা ব’ল্বে না কি?” রমানাথের প্রশ্ন শুনিয়া হঠাৎ মায়ের কথা আমার মনে হইল। মায়ের সেই মলিন মুখ, সেই বেদনাব্যঞ্জক চক্ষের জল, সেই স্নেহভরা আদর, সেই সুমধুর উপদেশ—একে একে সকল কথাই আমার মনে পড়িতে লাগিল। আমি বলিলাম, “ভাই, কোন্ মুখে আর মা’র কাছে যাব! এ সব কথা শুনলে তিনি বিষ খেয়ে ম’র্বেন!”
রমানাথ বলিল, “আচ্ছা, এখন তবে বরিশালে চল; সেখানে আমার কাকা থাকেন।”
আমার কাছে টাকা কড়ি যাহা ছিল, তাহাতে পাঁচ ছয় মাস বেশ সুখে স্বচ্ছন্দে কাটাইতে পারিতাম। কিন্তু কলিকাতায় থাকিতে আমার ইচ্ছা ছিল না এবং বাড়ীতে যাইতেও সাহস হইল না। সুতরাং রমানাথের সহিত বরিশালে যাওয়াই স্থির করিলাম। তারপর রাত্রি আন্দাজ দশটার সময় সেই মুদির দোকানে ফিরিয়া আসিয়া কিঞ্চিৎ জলযোগ করিয়া দুই জনে শয়ন করিলাম; কিছুক্ষণ পরে, আমার বেশ তন্দ্রা আসিয়াছে, এমন সময়, রমানাথ আমার গা টিপিয়া আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করিল, “তোমার কাছে কত টাকা আছে? সাবধানে রেখেছ ত?”
“আমার মানিব্যাগে নোটে ও টাকায় মিলিয়ে প্রায় দেড় শ’ আছে।”—এই বলিতে বলিতে পাশ ফিরিয়া শুইয়া আমি ঘুমাইয়া পড়িলাম।
পরদিন সকালে উঠিয়া দেখি, রমানাথ নাই। মুদিকে জিজ্ঞাসা করিলাম। সে বলিল, “তিনি. একটু আগে বাইরে গেছেন।” তখন পকেটে হাত দিয়া দেখি, আমার মানিব্যাগটি নাই! আমি মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িলাম। কি সর্ব্বনাশ! রমানাথ শেষে এই করিল! এই জন্যই বুঝি কাল রাত্রে টাকার কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছিল? ওঃ, কি ভয়ানক!—আমি একেবারে অস্থির হইয়া নানা বিপদের আশঙ্কা করিতে লাগিলাম। ভাবিতে ভাবিতে হঠাৎ সোণার ঘড়ী ও চেইনের কথা মনে পড়িল। সেগুলি আমার বাক্সের মধ্যে ছিল। তাড়াতাড়ি বাক্স খুলিয়া দেখিলাম, ঘড়ী ও চেইন লইতে পারে নাই।
আমি তখনই আবার বাক্স বন্ধ করিয়া, রমানাথের অন্বেষণে বাহির হইলাম। বেলা প্রায় বারটা পর্য্যন্ত নানা স্থানে খুঁজিলাম, কোথাও তাহার সন্ধান পাওয়া গেল না। পকেটে কয়েক আনা পয়সা ছিল। একটা হোটেলে কিছু আহার করিয়া, আবার রমানাথের অন্বেষণে বাহির হইলাম। এইরূপে দুই তিন দিন ধরিয়া ক্রমাগত নানা স্থানে খুঁজিলাম, তবুও তাহার সন্ধান করিতে পারিলাম না। ক্রমে পকেটের পয়সা কয়টিও ফুরাইয়া আসিল, আমি তখন মহা বিপদে পড়িয়া গেলাম। বাড়ী যাইতে সাহায্য করা দূরে থাক্, এক বেলা খাইতে দিবে, এমন আত্মীয়ও আমার কেহ ছিল না! শেষে অনাহারে মরিতে হইবে ভাবিয়া, আমি চারিদিক অন্ধকার দেখিতে লাগিলাম! এই সময়ে একদিন সন্ধ্যাকালে হঠাৎ পঞ্চাননের সহিত আমার দেখা হইল। আমাকে দেখিতে পাইয়া পঞ্চানন জিজ্ঞাসা করিল, “কি হে মোহনলাল, তুমি এখনও বাড়ী যাও নি? হেড্মাষ্টার মশাই তোমার মাকে পত্র লিখেছিলেন। শুন্লাম, তিনি খাওয়া দাওয়া ছেড়ে শুধু প’ড়ে প’ড়ে কাঁদছেন।”
কয়েক দিন পূর্ব্বে যে পঞ্চাননের উপর নানা অত্যাচার করিয়াছি, তাহার এরূপ ভদ্র ব্যবহারে, লজ্জা ও অনুতাপে আমার মস্তক নত হইয়া পড়িল! আমি মনে মনে আপনাকে ধিক্কার দিতে লাগিলাম! আমাকে চুপ করিয়া থাকিতে দেখিয়া, পঞ্চানন বলিল, “মোহনলাল, তোমার মুখ দেখে বেশ বুঝ্তে পার্ছি যে, লজ্জায় তুমি কথা ব’ল্তে পারছ না; কিন্তু সত্যি ব’ল্ছি, তোমার উপর আমার এক বিন্দুও রাগ নেই। দুষ্টু লোকের কুপরামর্শে চ’ল্লে মানুষ অনেক সময় পশুর চেয়েও হীন হ’য়ে পড়ে। যা হ’ক, সেদিনকার কথা তুমি ভুলে যাও।” পঞ্চাননের মিষ্ট কথায় আমি আরও লজ্জিত হইলাম এবং চক্ষের জল মুছিতে মুছিতে বলিলাম, “ভাই, যা হবার হ’য়ে গেছে, তুমি আমাকে ক্ষমা কর।” এই বলিয়া বোর্ডিং ছাড়িবার পর হইতে যাহা যাহা ঘটিয়াছিল, একে একে সকল কথা তাহাকে বলিলাম। রমানাথ আমার দেড়শত টাকা ফাঁকি দিয়াছে শুনিয়া, রাগে পঞ্চাননের চক্ষু লাল হইয়া উঠিল। সে বলিল, “রমানাথের প্রকৃতি যে অতি নীচ, তা আমি আগেই জান্তাম; কিন্তু সে যে এত বড় পাকা চোর, তা আমার জানা ছিল না। যা হ’ক, এখন আর দুঃখ করা মিছে। আমি তোমাকে পাঁচটি টাকা দিচ্ছি, তুমি আজই বাড়ী চলে যাও।” আমি আর দ্বিরুক্তি না করিয়া পঞ্চাননের নিকট হইতে পাঁচ টাকা লইলাম এবং সেই রাত্রেই বাড়ী যাইবার জন্য ট্রেণে উঠিলাম। ট্রেণে উঠিয়া পঞ্চাননের মহত্ত্বের কথা ভাবিতে ভাবিতে আমি আশ্চর্য্য হইয়া গেলাম! মানুষ এমন করিয়াও ক্ষমা করিতে পারে! যাহার কুমন্ত্রণায় আমি পঞ্চাননকে প্রহার পর্য্যন্ত করিয়াছি, আজ সেই ধূর্ত রমানাথ কোথায়! প্রবঞ্চক সুবিধা পাইয়া আমার সর্বনাশ করিয়াছে! আর পঞ্চানন আমার সকল অপরাধ ক্ষমা করিয়া অযাচিতভাবে আমাকে সাহায্য করিল! এই অসময়ে তাহার সাহায্য না পাইলে, আমার কি দুর্দশাই না হইত! এইরূপ নানা কথা ভাবিতে ভাবিতে আমি ঘুমাইয়া পড়িলাম। ঘুমাইবার পূর্ব্বে ঘড়ী ও চেইন সাবধানে বাক্সের ভিতরে তুলিয়া রাখিতে ভুলি নাই। তারপর, কতক্ষণ ঘুমাইয়া ছিলাম জানি না, হঠাৎ বোধ হইল, যেন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির ফোঁটা আমার মুখে আসিয়া পড়িতেছে। উঠিয়া দরজা জানালাগুলি বন্ধ করিয়া দিবার ইচ্ছা হইল, কিন্তু উঠি উঠি করিয়া আবার ঘুমাইয়া পড়িলাম। কিছু ক্ষণ পরে বড় বড় কয়েকটা ফোঁটা মুখে আসিয়া পড়াতে, আবার আমার ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। তখন আমার সহযাত্রিগণের মধ্যে প্রায় সকলেই নামিয়া গিয়াছিল। সমস্ত গাড়ীখানাতে আর দুইজন মাত্র যাত্রী ছিল। ক্ষীণ আলোকে তাহাদিগকে ভাল করিয়া দেখিবার সুবিধা হইল না বটে, কিন্তু আমার ভয় হইতে লাগিল, কি জানি, যদি তাহাদের মনে কোন কুঅভিসন্ধি থাকে! যদি আমার ঘড়ী, চেইনের সন্ধান পাইয়াই তাহারা আসিয়া থাকে! তাহা হইলে কি উপায়ে সেই গুলি রক্ষা করিব, এবং কি উপায়েই বা প্রাণ বাঁচাইব! আমি এইরূপ ভাবিতেছি, এমন সময় তাহাদের একজন বলিয়া উঠিল, “আর দেরী কেন? তুমি ক্লোরোফর্মের শিশি বের কর।” দ্বিতীয় ব্যক্তি বলিল, “লোকটা অজ্ঞান হ’লেই কাজ শেষ ক’রতে হবে। সাবধান, ও যেন দড়ী ধ’রে ঘণ্টা টান্বার সুবিধা না পায়।”
এইরূপ আলাপ করিতে করিতে তাহারা আমার কাছে আসিয়া বসিল। তখন রাগে ও ঘৃণায় আমার সর্ব্বশরীর জ্বলিয়া উঠিল! দেখিলাম, দস্যু দুইজন আর কেহই নয়, আমার চিরশত্রু নেপাল ও গোপীনাথ! কি, ইহারা আমার সর্ব্বনাশ করিতে আসিয়াছে! এত বড় বুকের পাটা! আমার সর্ব্বাঙ্গ রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল! কর্কশস্বরে বলিলাম—“তোমাদের এই কাজ! ভদ্রলোকের ছেলের ডাকাতি ব্যবসা! ছি ছি, তোমাদের কি লজ্জা নেই!”
নেপাল। মিছে গোলযোগ ক’রো না! যদি বাঁচবার সাধ থাকে, বাক্সটি ছেড়ে দেও। তা না হ’লে, ঘড়ি, চেন ত যাবেই, এমন কি, তোমার প্রাণও যেতে পারে! পিস্তল দেখ্ছ ত? আমাদের কাছে ছোরাও আছে!
নেপালের কথা শুনিয়া, ভয়ের পরিবর্ত্তে আমার মন সাহসে উদ্দীপ্ত হইয়া উঠিল। আমি উত্তেজিতভাবে বলিলাম, “প্রাণ থাকতে বাক্স ছাড়্বো না; আগে আমাকে খুন না ক’র্লে এক কপর্দ্দকও পাবার আশা ক’রো না!” এই বলিতে বলিতে, হঠাৎ লাফাইয়া উঠিয়া আমি ঘণ্টা টানিবার চেষ্টা করিলাম, কিন্তু নেপাল লৌহমুষ্টির আঘাতে আমাকে বেঞ্চের উপর ফেলিয়া দিল। ঠিক সেই সময় গোপীনাথ তূলাতে ক্লোরোফর্ম মাখাইয়া আমার নাকের কাছে ধরিল। সমুদয় গাড়ী দুর্গন্ধে পূর্ণ হইয়া গেল। দস্যুরা পূর্ব্বে দরজা, জানালা বন্ধ করিয়া দিয়াছিল। আমি গোপীনাথের হাত হইতে শিশিটা কাড়িয়া লইয়া, জানালার গ্লাসের উপর ছুড়িয়া দিলাম। ঝন্-ঝন্ করিয়া গ্লাস ভাঙ্গিয়া পড়িল। তখন প্রাণপণ চেষ্টায় আমি জানালার ধারে ছুটিয়া গেলাম এবং ভাঙ্গা কাচের ভিতর দিয়া গলা বাড়াইয়া,—“খুন কর্ল, খুন্ কর্ল”—বলিয়া চীৎকার করিতে লাগিলাম! পর মুহূর্ত্তেই দস্যুরা আমাকে টানিয়া ভিতরে আনিয়া ফেলিল এবং খুব জোরে আমার মুখ চাপিয়া ধরিল। আমি পুনরায় চীৎকার করিবার চেষ্টা করিলাম, কিন্তু কণ্ঠের স্বর ফুটিল না; ক্রমে গলা শুকাইয়া আসিল; তারপর মনে হইল, যেন তাহারা আমাকে বাঁধিতেছে। তার পর আর কি হইল, আমার মনে নাই।
কতক্ষণ এই ভাবে কাটিল বলিতে পারি না। শেষে অল্প অল্প চেতনা হইলে দেখিলাম, গাড়ী খুব জোরে ছুটিতেছে। আমি বসিতে চেষ্টা করিলাম, কিন্তু কিছুতেই উঠিতে পারিলাম না। চীৎকার করিতে চেষ্টা করিলাম, আওয়াজ ফুটিল না। আস্তে আস্তে হাত সরাইয়া টিনের বাক্সটি খুঁজিলাম, সেটিও পাওয়া গেল না। মুখ ফিরাইয়া দেখিলাম, ডাকাতেরাও পলায়ন করিয়াছে। আমার সমুদয় শরীর তখন রক্তারক্তি হইতেছিল, সর্ব্বাঙ্গ জ্বলিয়া যাইতেছিল। এই সময় আমি হঠাৎ যেন কি একটা আওয়াজ শুনিতে পাইলাম। অল্প পরেই গাড়ীর গতি একটু একটু করিয়া কমিতে লাগিল। তারপর—“বগুলা, বগুলা”—এই শব্দ শুনিতে পাইলাম। ষ্টেশনে গাড়ী থামিবামাত্র একজন টিকেট্ কালেক্টার আসিয়া গাড়ীর দরজা খুলিয়া দিল। অমনি আমি উঠিয়া বসিলাম, এবং বিশেষ বিস্ময় ও আনন্দের সহিত দেখিলাম, আমার শরীর সম্পূর্ণ অক্ষত; বাক্স যেখানে ছিল ঠিক সেই খানেই আছে। বলা বাহুল্য, ঘড়ী ও চেইন চুরি যায় নাই, এবং গাড়ীর দরজা, জানালা কিছুই ভাঙ্গে নাই!—কি ভীষণ স্বপ্ন! এমন স্বপ্নও মানুষে দেখে! নেপালের প্রতি আমার আন্তরিক ঘৃণা ছিল; সেই ঘৃণা হইতেই যে এই স্বপ্নের উৎপত্তি, ইহাতে আর কোন সন্দেহ নাই। আমি জিনিষপত্র লইয়া ষ্টেশনে নামিয়া পড়িলাম এবং সেই অদ্ভুত স্বপ্নের বিষয় ভাবিতে ভাবিতে, একখানি গাড়ী করিয়া, বাড়ী রওনা হইলাম।