মোহনলাল/দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
বাড়ী আসিলে, নেপালের প্রতি আমার অন্যায় ব্যবহারের কথা শুনিয়া, মা আমাকে যারপরনাই তিরস্কার করিলেন। তারপর কয়েকজন আত্মীয়-স্বজনের সহিত পরামর্শ করিয়া আমাকে কলিকাতায় পাঠান স্থির করিলেন। ১২৮২ সালের জ্যৈষ্ঠ মাসে, ১৫ বৎসর বয়সের সময় আমি মামার সহিত কলিকাতায় আসিয়া উপস্থিত হইলাম। এত বয়স পর্য্যন্ত আমি কখনও বাড়ীর বাহির হই নাই। সেই জন্য ট্রেণে উঠিয়া প্রথম প্রথম আমার খুব কষ্ট হইয়াছিল বটে, কিন্তু কলিকাতায় পৌঁছিবার পরে, দিন কয়েক মামার সঙ্গে চিড়িয়াখানা, যাদুঘর, গড়ের মাঠ, কেল্লা প্রভৃতি দেখিয়া, সে কষ্টের অবসান হইল। রোজ সকালে বিকালে চারিদিক থেকে কত বাঁশী বাজে, কত হারমোনিয়ম্ বাজে, কত গোরার বাজ্না বাজাইয়া, রোস্নাই করিয়া বিয়ে যায়, এই সব আমার কাছে খুব নূতন বোধ হইতে লাগিল। মামা আমাকে একটি বোর্ডিং স্কুলে ভর্ত্তি করিয়া দিয়া, এক সপ্তাহ পরে দেশে ফিরিয়া গেলেন। আমি বোর্ডিংএর ভাল ছেলেদের ত্রিসীমানায়ও ঘেঁসিতাম না। কয়েকটা ওঁচা ছেলে আমার সঙ্গী হইল! আমি তাহাদের সঙ্গে মিশিয়া, লুকাইয়া লুকাইয়া চুরুট খাইতে শিখিলাম। বড় বড় ‘হনি সোপ্’ কিনিয়া গায়ে মাখিতাম, আর প্রত্যহ একঘণ্টা ধরিয়া, ঝাঁঝ্রা কলের নীচে মাথা পাতিয়া আনন্দে স্নান করিতাম। তার পর আর্সি-ব্রুশ্ লইয়া, আলবাট্ কাটিয়া চুল ফিরাইতাম। ভাল ভাল চুনট্ করা কামিজ, চিনের বাড়ীর বার্ণিস্ করা হাপ্ জুতা, হাপ্ মোজার উপর গার্টার, এই সব অষ্টপ্রহর পরিয়া বাবুগিরি করিতাম। বোর্ডিংএ আমার স্বেচ্ছাচারিতা ক্রমশঃই বাধা পাইতে লাগিল। বোর্ডিং স্কুলের বাঁধাবাঁধি নিয়মের মধ্যে বাস করা যে কি ভয়ানক কষ্টকর, তাহা মনে হইলে এখনও আমার হৃৎকম্প উপস্থিত হয়। এক মাস যাইতে না যাইতে, আমি পুনঃ পুনঃ সাত বার নিয়মভঙ্গ অপরাধে তিরস্কৃত হই। বোর্ডিংএ আমার সমবয়স্ক আরও কয়েকটি বালক ছিল। তাহাদের মধ্যে রমানাথ দুষ্টামীতে সর্ব্বাপেক্ষা পাকা। তাহার সহিত আমার খুব ভাব হইল। আমাদের পরস্পরের মধ্যে এত ভাব দেখিয়া, হেড্মাষ্টার মহাশয় নিয়ম করিয়া দিলেন যে, আমরা কেহ কাহারও সহিত কথা বলিতে পারিব না। কিন্তু মাষ্টারের চক্ষে ধূলি দিবার শক্তি আমাদের যথেষ্ট ছিল। আমরা গোপনে সর্ব্বপ্রকার দুষ্টামীর মৎলব আঁটিতে লাগিলাম। লেখাপড়াও যে কিছুই শিখিলাম না, এমন নয়। তখন আমি গড় গড় করিয়া—‘রয়েল্ রীডার ‘থ্রি'—পড়িতে পারিতাম! এক টানে আমার নাম লিখিতে পারিতাম; অঙ্কশাস্ত্রের জ্ঞানও নিতান্ত কম হয় নাই,—হড় হড় করিয়া কুড়ির কোটা পর্য্যন্ত নাম্তা মুখস্থ বলিতে পারিতাম। এইরূপে একটু লেখাপড়া এবং অনেক নূতন দুষ্টামী শিখিয়া আমি পূজার ছুটির সময় বাড়ীতে আসিলাম। পূজার কয়দিন বেশ কাটিয়া গেল, মা কিছুই বলিলেন না। কিন্তু বিজয়ার পরদিনই মা আমাকে ডাকিয়া বলিলেন, “মোহনলাল, এই ক’ মাস কল্কাতায় গিয়ে তুমি তোমার শিক্ষকের এবং বোর্ডিংএর ছেলেদের সঙ্গে যেরূপ ব্যবহার ক’রেছ, তা সবই আমি শুনেছি। তোমার মামাকে মাষ্টার মশাই যে চিঠি লিখেছেন, তাও আমি দেখেছি। তুমি এখন আর ছেলেমানুষ নও, বড় হয়েছ; কিন্তু কি দুঃখের বিষয়, এখনও তুমি কুসংসর্গ ছাড়তে পারলে না! যা হ’ক, আমি আর তোমাকে কিছু ব’লতে চাই না। তোমার যা ইচ্ছে তাই করো।” এই বলিয়া মা চক্ষে কাপড় দিয়া কাঁদিতে লাগিলেন। মাকে কাঁদিতে দেখিয়া আমার বড় কষ্ট হইল; আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিলাম, মা যাহাতে কষ্ট পান এমন কাজ আর কখনও করিব না। আমার ভাবগতিক দেখিয়া মা-ও বোধ করি ভাবিলেন যে, আমার সুমতি হইবার উপক্রম হইয়াছে। তারপর যে কয়দিন বাড়ীতে ছিলাম, আমার সে কয়দিনের ব্যবহার দেখিয়া মা যারপরনাই সন্তুষ্ট হইলেন। অবশেষে ছুটি ফুরাইয়া আসিলে, মা আমাকে আদর করিয়া, নানা প্রকার সদুপদেশ দিয়া, আবার কলিকাতায় পাঠাইয়া দিলেন।
ছুটির পর বোর্ডিংএ ফিরিয়া আসিয়া দেখি, সব যেন উলট্-পালট্ হইয়া গিয়াছে। আমি যে ঘরটাতে থাকিতাম, সে ঘর মেরামত হইতেছে, আমার জন্য অন্য একটা ঘরে স্থান নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে। অন্যান্য কয়েক জন বালকের ঘরও বদলাইয়া গিয়াছিল। রমানাথ আমার আসিবার একদিন পূর্ব্বে বোর্ডিংএ ফিরিয়া আসিয়াছিল। আমি যেদিন আসি, সেই দিন বিকালে রমানাথ আসিয়া বলিল, “দেখ, মোহনলাল, আজ একটা মজা ক’রতে হবে, তাতে তোমার সাহায্য চাই। তুমি বোধ হয় জান, ছোট কুঞ্জ রাক্ষসের কথা শুন্লে বড় ভয় পায়। কেহ রাক্ষসের গল্প বলে কুঞ্জ তাহার কাছেও যায় না। আজ রাত্তিরে কুঞ্জকে নিয়ে এক্টু মজা করবো। আমি দুটো রাক্ষসের মুখোস্ কিনে এনেছি। কুঞ্জ ঘুমুলে, আমরা রাক্ষস সেজে তাকে গিয়ে ভয় দেখাবো। কেমন, তুমি রাজি আছ ত?”
রমানাথের কথার কোন উত্তর দিবার পূর্ব্বেই মায়ের চক্ষের জলের কথা আমার মনে পড়িল। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবিলাম, ইহা ত দুষ্টামী নয়, একটু মজা করা মাত্র। সুতরাং এরূপ করাতে দোষ কি? এই ভাবিয়া রমানাথকে বলিলাম, “আচ্ছা, আমি রাক্ষস সাজবো, কিন্তু ভাই, খুব সাবধান—মাষ্টার মশাই যেন টের না পান।”
“আরে সে ভাবনা নেই। মাষ্টার মশাই আমাদের কোন্ কাজটাই বা জান্তে পারেন!” এই বলিতে বলিতে রমানাথ অন্যত্র চলিয়া গেল। রাত প্রায় বারটা বাজিলে, ক্লাসের কয়েক জন ছেলে আমাদের দুই জনকে বেশ ভাল করিয়া রাক্ষস সাজাইয়া দিল। পূর্ব্বেই বলিয়াছি, আমাদের বোর্ডিং-গৃহ মেরামত হইতেছিল, বাড়ীতে অনেক খড়ের দড়ী ছিল। সুতরাং আমাদের এক একটি লেজেরও অভাব হইল না। আমরা বিকট মূর্ত্তি ধরিয়া বাতি হস্তে পা টিপিতে টিপিতে ছোট কুঞ্জর ঘরের সম্মুখে গিয়া উপস্থিত হইলাম। রমানাথ চাবি ঘুরাইবামাত্র দরজা খুলিয়া গেল। তখন বাতি নিভাইয়া, ভূতের মত অন্ধকারের সহিত মিশিয়া গিয়া, আমরা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিলাম। তারপর পশ্চিম দিকের জানালা খুলিয়া দিলাম। ঘরে বেশ চাঁদের আলো আসিয়া পড়িল। কুঞ্জর বিছানা ঘরের এক কোণে ছিল বলিয়া, কেবল সেই খানে আলো পৌঁছিল না। আমরা কুঞ্জর নাক ডাকার শব্দে বুঝিলাম, সে গাঢ় নিদ্রায় অভিভূত।
পূর্ব্বের বন্দোবস্ত অনুসারে রমানাথ ও আমি লাফাইয়া একেবারে কুঞ্জর উপরে গিয়া পড়িলাম। সে হাউমাউ করিয়া চীৎকার করিয়া উঠিল। ভয়ে তাহার কণ্ঠের স্বর একেবারে বদ্লাইয়া গিয়াছিল। সে যতই চীৎকার করিতে লাগিল, আমরাও ততই তাহাকে লেজের বাড়ি মারিতে মারিতে, বিকট শব্দ করিয়া বলিলাম, “আমরা রাক্ষস, তোঁকে গিলে খাঁবো!”
আমাদের কথা শেষ হইতে না হইতেই, কুঞ্জ জানালার ধারে জ্যোৎস্নাতে আসিয়া দাঁড়াইল।—ও মা, কি সর্ব্বনাশ! এ কি ব্যাপার! সহস্র বজ্র যেন হঠাৎ আমাদের মাথার উপরে পড়িল! চারিদিক অন্ধকার বোধ হইতে লাগিল! এ ত কুঞ্জ নয়! এ যে দেখি, আমাদের হেড্মাষ্টার! হেডমাষ্টারকে দেখিয়া, আমাদের হাত-পা আড়ষ্ট হইয়া গেল! কিন্তু তবুও আমরা প্রাণভয়ে ছুটিয়া ঘরে আসিয়া লুকাইলাম।
বাকি রাতটা যে কি ভাবে কাটিল, তাহা লিখিয়া জানাইতে পারি না। এমন কোন ভাষা নাই, যাহাতে ঠিক আমাদের তখনকার মনের ভাবটি প্রকাশ হয়। সকাল হইলে কি করিব, ভাবিয়া কিছুই ঠিক করিতে পারিলাম না। যাহা হউক শেষে গায়ের রং ধুইয়া, দুটিতে মৃতবৎ পড়িয়া রহিলাম। মুখোস্ পূর্ব্বেই পুড়াইয়া ফেলিয়াছিলাম।
সকাল না হইতেই, বোর্ডিংময় রাষ্ট্র হইল যে, দুটি বালক মুখোস্ পরিয়া রাত্রে হেডমাষ্টারকে খুন করিতে আসিয়াছিল। সেই বালক দুটি কে কে, জানিবার জন্য মাষ্টার মহাশয় বোর্ডিংএর সকল বালককে একত্র হইতে বলিলেন। আমরা যতদূর সম্ভব মনের ভাব গোপন করিয়া সকলের সঙ্গে গিয়া বসিলাম; এবং যাহারা আমাদের কীর্ত্তি জানিত, ইঙ্গিতে তাহাদিগকে কোনও কথা প্রকাশ করিতে নিষেধ করিয়া, নিতান্ত নিরীহ বালকের ন্যায় মাষ্টার মহাশয়ের আগমন প্রতীক্ষা করিতে লাগিলাম। কিছু পরেই বোর্ডিংএর সম্পাদক ও হেডমাষ্টার মহাশয় সেখানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন, এবং কে কে এরূপ অসমসাহসিক কার্য্য করিয়াছে, জানিতে চাহিলেন। কিন্তু বালকদিগের মধ্যে কেহই তাঁহাদের কথার উত্তর দিল না। তাঁহারা আবার জিজ্ঞাসা করিলেন; সেবারেও কেহ কোন উত্তর দিল না। তখন তাঁহারা এক এক জন করিয়া একদিক হইতে সকলকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। প্রথম চার পাঁচটি ছেলে উত্তর দিল যে, তাহারা ইহার কিছুই জানে না। তারপর মাষ্টার মহাশয় পঞ্চানন নামে একটি ছেলেকে জিজ্ঞাসা করিলেন। পঞ্চাননের সহিত রমানাথের খুব শত্রুতা ছিল। আমিও পঞ্চাননকে মনে মনে ঘৃণা করিতাম। মাষ্টার মহাশয়ের প্রশ্নের উত্তরে পঞ্চানন দাঁড়াইয়া বলিল, “আমার বোধ হয়, রমানাথ এর মধ্যে ছিল! কাল বিকেলে তাকে দুটো মুখোস কিনে আনতে দেখেছি।” পঞ্চাননের কথা শুনিয়া, ভয়ে আমাদের মুখ শুকাইয়া গেল, বুক গুর্-গুর্ করিতে লাগিল। বোর্ডিংএর সম্পাদক মহাশয় তখনই রমানাথের হাত ধরিয়া হিড় হিড়্ করিয়া টানিতে টানিতে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি এই কাজ করেছ?”
“আজ্ঞে না, আমি কিছুই জানি না, বলিয়া রমানাথ আত্মদোষ গোপন করিতে চেষ্টা করিল। কিন্তু সে চেষ্টা বৃথা। প্রহারের যন্ত্রণায় দুই তিন মিনিটের মধ্যেই রমানাথ তাহার দোষ স্বীকার করিল; এবং আমার নামও প্রকাশ করিয়া দিল। হেডমাষ্টার মহাশয় আমাকেও টানিতে টানিতে, সম্পাদকের কাছে লইয়া গেলেন। নরহত্যাকারীকে ফাঁসি দিবার সময় তাহার মনের ভাব কিরূপ হয়, এই সময়ে আমি তাহা ভাল করিয়া বুঝিতে পারিয়াছিলাম। আমরা কোন রকমে দোষ গোপন করিতে না পারিয়া, প্রকৃত ঘটনাটা কি, তাহা তাঁহাদিগকে বুঝাইতে চেষ্টা করিলাম। কিন্তু তাঁহারা কিছুতেই আমাদের কথায় বিশ্বাস করিলেন না। মনের সাধ মিটাইয়া প্রহার করিতে লাগিলেন। চাবুকের আঘাতে যখন আমাদের সর্ব্বাঙ্গ ফুলিয়া লাল হইয়া উঠিল, তখন তাঁহারা আমাদের দুই জনকে দুই ঘরে বন্ধ করিয়া রাখিলেন। এইখানেই যে আমাদের শাস্তির শেষ হইল, তাহা নহে; দশটার পর মাষ্টার মহাশয় আমাদের দুই জনের মাথায় দুটা গাধার টুপী পরাইয়া ক্লাসে ক্লাসে ঘুরাইয়া আনিলেন এবং ভবিষ্যতে আর কখনও কোন প্রকার দুষ্টামী করিলে, বোর্ডিং হইতে তাড়াইয়া দিবেন বলিয়া ভয় দেখাইলেন। এইরূপে সেই দিনের গোলযোগ এক রকম থামিয়া গেল। গোলমাল চুকিয়া গেল বটে, কিন্তু নীচাশয় পঞ্চাননের শত্রুতার কথা ভুলিতে পারিলাম না। আমরা গোপনে পরামর্শ করিলাম যে, বোর্ডিং ছাড়িতে হয় তাও স্বীকার, পঞ্চাননকে একবার ভাল করিয়া শিক্ষা দিতে হইবে! আমাদের ইচ্ছা পূর্ণ হইতে বড় বেশী দেরী হইল না। পাঁচ ছয় দিন পরে একদিন সামান্য দোষে আমরা পঞ্চাননকে বেশ করিয়া প্রহার করিলাম। হেড্মাষ্টার মহাশয় তাহা শুনিয়া, আমাদের দুই জনকে বোর্ডিং হইতে তাড়াইয়া দিলেন।