মোহনলাল/প্রথম পরিচ্ছেদ
মোহনলাল
প্রথম পরিচ্ছেদ
তখন আমার বয়স বার বৎসর! একদিন মা আমাকে ডাকিয়া বলিলেন, “মোহনলাল, দেখতে দেখতে তুই বড় হ’য়ে উঠলি। আর হেসে খেলে সময় নষ্ট করলে চলবে না। কালই তোকে স্কুলে-ভর্ত্তি ক’রে দেব।”
এত বয়স পর্যন্ত স্কুলে ভর্তি হই নাই শুনিয়া, কেহ কেহ হয় ত আশ্চর্য্য বোধ করিবেন। কিন্তু তাঁহারা যদি সকল দিক দেখিয়া শুনিয়া বিচার করেন, তাহা হইলে নিশ্চিতই বুঝিতে পারিবেন যে, ইহাতে আশ্চর্য্য হইবার কিছুই নাই। প্রথম, আমি নেহাৎ গরীব লোকের ছেলে নই,—ঘরে অন্নের বিশেষ অভাব ছিল না। দ্বিতীয়, আমি মায়ের একমাত্র সন্তান,—আব্দারের সীমা ছিল না। তৃতীয়, নিতান্ত শিশু অবস্থায় আমি পিতৃহীন হই, শাসন করিবার কেহই ছিল না। সুতরাং এরূপ সুযোগের মধ্যে পড়িলে, কোন্ বালকই বা বার বৎসরের পূর্ব্বে স্কুলে ভর্ত্তি হয়? আমি মায়ের আদুরে গোপাল হইয়া হাসিয়া খেলিয়া দিন কাটাইতাম। মাকে বেলা দুপুর পর্য্যন্ত ফাঁকি দিয়া, বাগানে বাগানে পাখীর ছানা খুঁজিয়া বেড়াইতাম; কখন সমবয়সীদের সঙ্গে জুটিয়া প্রতিবাসীর বাগানে পাকা কুল, বাতাবি লেবু, কাঁচা আম, কচি শশা প্রভৃতি চুরি করিতে যাইতাম। কখন জেলের ছেলেদের সঙ্গে মিশিয়া, ঝড়-বৃষ্টি মাথায় করিয়াও গাঙ্গে নৌকা চড়িয়া বেড়াইতাম; কখনও বা গাঙ্গের চড়ায় গিয়া চড়িভাতি করিতাম। একদণ্ড আমাকে বাড়ীতে কেহ স্থির হইয়া থাকিতে দেখে নাই। দুপুরবেলা মা আমাকে ‘হাসি খুসি’ ও প্লেট্-পেন্সিল দিয়া বসাইয়া দিতেন, কিন্তু ‘আমি তাঁহার চক্ষে ধূলা দিয়া, পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে গিয়া মিশিতাম এবং দাণ্ডা-গুলি ও কপাটি খেলায় সারাদিন কাটাইয়া সন্ধ্যার সময় ঘরে ফিরিতাম। আমি আরও কয়েক বৎসর হাসিয়া খেলিয়া কাটাইতে পারিতাম; কিন্তু পাড়ার কয়েকটি দুষ্ট ছেলের সহিত আমার কিছু বেশী ঘনিষ্ঠতা হওয়াতে, মা বড়ই ভীত হইলেন; এবং স্কুলে যাইতে আরম্ভ করিলে, তাহাদের সঙ্গে আমার বেড়ান বন্ধ হইবে, এই ধারণায় তিনি পরদিনই আমাকে স্কুলে ভর্তি করিয়া দিলেন। কিন্তু মায়ের বুঝিবার নিতান্তই ভুল হইয়াছিল। স্কুলে গিয়া অতি অল্পদিনের মধ্যেই আমি অনেকগুলি কুসঙ্গী পাইলাম, এবং তাহাদের সঙ্গে মিশিয়া স্কুল হইতে পলাইয়া, বাগানে বাগানে ঘুরিয়া, পাখীর ছানা ও ফল-মূল চুরি করিয়া বেড়াইতে লাগিলাম।
স্কুলেও আমার মন্দ স্বভাবের কথা প্রকাশ হইয়া পড়িল; আমাদের ক্লাসে নেপাল ও মণিরাম নামে দুইটি ছেলে ছিল। নেপাল আমার সমবয়স্ক, মণিরামের বয়স নিতান্ত অল্প। এই দুই জনের সঙ্গে আমার একেবারেই বনিত না—প্রায় ঝগড়া-বিবাদ হইত। মণিরাম বয়সে ছোট বলিয়া অনেক সময়, বিনা দোষেও, আমি তাহাকে প্রহার করিতাম। কিন্তু মনে মনে খুব রাগ থাকিলেও, নেপালের উপর কোন অত্যাচার করি, এমন সাহস আমার ছিল না।
ক্লাসের প্রায় সকলেই আমাকে ও নেপালকে ভয় করিত। তাহার কারণ, নেপালের ভালবাসা ও আমার অত্যাচার। নেপাল সকলকে এত ভালবাসিত যে, তাহার সন্মুখে কোন অন্যায় কাজ করিতে কাহারও সাহস হইত না; আর আমার অত্যাচার-প্রবৃত্তি এমনই প্রবল ছিল যে, আমাকে ভয় না করিত, এমন ছেলে ক্লাসে কেহ ছিল না। এমন কি, আমি কোন অত্যাচার করিলেও শিক্ষককে বলিয়া দিতে কেহ সাহস করিত না!
অভ্যাস মত একদিন আমি মণিরামকে ধরিয়া দু চারি ঘা দিতেছি, এমন সময় নেপাল আসিয়া বলিল, “দেখ ভাই, মণিরাম একে ছোট, তাতে আবার ভারি রোগা। আর তুমি কত বড়! মণিকে মারা কি তোমার ভাল দেখায়!”
“আচ্ছা, আচ্ছা, এ বিষয়ে তোমার কোন কথা বলার দরকার নেই। জ্যেষ্ঠতাতের মত উপদেশ দিচ্ছ কেন? মণিকে মার্ছি—সে বুঝবে, মাঝখান থেকে তোমায় ফোড়ন দিতে ডাক্লে কে?”—এই বলিয়া রাগের চোটে আমি মণিরামের ঘাড় ধরিয়া ঠেলিয়া দিলাম। আমার অভদ্র ব্যবহারে বিরক্ত হইয়া, নেপাল সেখান হইতে চলিয়া গেল। কিন্তু আমার কথার কোন উত্তর না দিয়া, তাহাকে চলিয়া যাইতে দেখিয়া, ভাবিলাম, নেপাল নিশ্চিতই ভীরু। ভীরু না হইলে সে কখনই চুপ করিয়া চলিয়া যাইত না ৷
সেই দিন হইতে নেপালের উপর আমার রাগ দ্বিগুণ বাড়িয়া গেল। ক্লাসের অন্যান্য বালকের উপর আমি এত দিন যেরূপ প্রভুত্ব করিয়াছি, মিথ্যা ভয়ে নেপালের উপর সেরূপ করিতে সাহস করি নাই বলিয়া, মনে মনে খুব কষ্ট হইতে লাগিল। ভাবিলাম, এবার সুবিধা পাইলেই নেপালকে উত্তম-মধ্যম যা কতক দিতে হইবে। তখন হইতে নেপাল যাহাতে চটে, আমি বাছিয়া বাছিয়া সেইরূপ কাজ করিতে লাগিলাম।
ঝগড়া বাধাইবার জন্য বড় বেশী দিন অপেক্ষা করিতে হইল না। আমাদের স্কুলে যাইবার পথে, এক কৃষকের বাগানে কয়েকটা লিচু গাছ ছিল। তখন জ্যৈষ্ঠ মাস। গাছগুলি লিচুতে ভরিয়া গিয়াছিল। একদিন স্কুলে আমরা কয়েকজনে পরামর্শ করিলাম যে, সেই বাগানের লিচু খাইতে হইবে। আমাদের মধ্যে মণিরাম বেশ গাছে উঠিতে পারিত। আমি তাহাকে ডাকিয়া বলিলাম, “দ্যাখ্ মণি, আজ লিচু পেড়ে খাবো, তুই গাছে উঠ্বি, কেমন?” মণিরাম ঘাড় নাড়িয়া বলিল, “আচ্ছা।”
স্কুলের ছুটি হইলে আমরা দল বাঁধিয়া, কৃষকের লিচু গাছের তলায় উপস্থিত হইলাম। কৃষক তখন বাড়ীতে ছিল না। আমি মণিরামকে গাছে তুলিয়া দিয়া সকলকে পাহারা দিতে বলিলাম। মণিরাম সবেমাত্র দশ বারটা লিচু পাড়িয়াছে, এমন সময় বৈদ্যনাথ আসিয়া বলিল, “ওহে মোহনলাল, ব্যাপার বড় সহজ নয়! নেপাল দলবল নিয়ে এই দিকে আস্চে। বোধ হয়, মারামারি হ’তে পারে।” আমি বলিলাম, “কি, নেপাল আস্ছে? আসুক, আজ তাকে একবার দেখে নেবো! তোমরা এই দিকে থাকো, আমি ঐ গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকি। খবরদার, তোমরা ভয় পেও না। আমি ঠিক সময়ে বাইরে এসে নেপালকে দু’ চার ঘা লাগিয়ে দেবো। তোমরা তার চেলাদের মাথায় চড়্টা-আস্টা দিতে ভুলো না।” আমার কথায় সকলে রাজী হইল; আমি গাছের আড়ালে গিয়া লুকাইলাম। একটু পরেই নেপালের দল গাছতলায় আসিয়া উপস্থিত হইল। মণিরাম তখন ভয়ে নামিয়া আসিবার উদ্যোগ করিতেছিল। তাহাকে দেখিয়া নেপাল বলিল, “ছিঃ মণিরাম, তোমার এই কাজ! আমি তোমার মাকে ব’লে দেব।” মণিরাম ভয়ে কাঁপিতে কাঁপিতে বলিল, “না ভাই, আমার কোন দোষ নেই। তুমি ত জান, শুধু মার খাবার ভয়েই আমি এ কাজ ক’রতে রাজী হয়েছি।”
নেপাল। তা জানি, আসল ব্যাপার বুঝ্তে আমার বাকি নেই। ছিঃ! ছিঃ! এর চেয়ে লজ্জার বিষয় আর কি আছে!
নেপালের কথা শেষ হইতে না হইতে বৈদ্যনাথ সগর্ব্বে বলিয়া উঠিল, “সাবধানে কথা বল, অত বাড়াবাড়ি ভাল নয়।”
নেপালের দলে গোপীনাথ নামে একটি ছেলে ছিল। তাহার চেহারা যেমন গুণ্ডার মত, তাহার গায়ের জোরও তেমনি ভয়ানক। সে বৈদ্যনাথের দিকে মুখ ফিরাইয়া বলিল, “কি, সাবধান হব? কেন, এত ভয় কিসের? আয় না, কা’র ঘাড়ে ক’টা মাথা, দেখি!” এই বলিয়া গোপীনাথ যেই একটু অগ্রসর হইল, লিখিতে লজ্জা হয়, আমার দলের সকলেই অমনি প্রাণভয়ে দৌড় দিল। দলের ছেলেদের কাণ্ড দেখিয়া আমি যারপরনাই দুঃখিত হইলাম। এক একবার ভাবিলাম, ছুটিয়া গিয়া নেপালের মুখে এক ঘুসী লাগাই। কিন্তু গোপীনাথের ভয়ে আমারও সে সাহস হইল না। আমি যেমন লুকাইয়া ছিলাম, তেমনি রহিলাম। তখন নেপাল মণিরামকে ডাকিয়া বলিল, “নেমে এস, এমন কাজ আর কখনো করো না।” মণিরাম ধীরে ধীরে নামিয়া বাড়ীর দিকে চলিল। নেপালের দলও অন্য একটি রাস্তা দিয়া চলিয়া গেল। তাহারা অনেক দূর যাইলে পর, আমি তাড়াতাড়ি বাড়ী চলিলাম। সেই দিন আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিলাম যে, নেপালকে ইহার প্রতিশোধ দিবই দিব। তাহা যদি না পারি, আমার মোহনলাল নাম মিথ্যা!
ইহার পর কয়েক দিনের মধ্যেই নেপালকে মারিবার সুযোগ উপস্থিত হইল। একদিন স্কুলের ছুটির পর, নদীর ধার দিয়া যাইতে যাইতে, আমি নীচে বই রাখিয়া, একটা গাছে পাখীর ছানা পাড়িতে উঠিয়াছি, এমন সময় নেপাল, মণিরাম এবং আমাদের ক্লাসের আরও কয়েকটি ছেলে সেখানে আসিল। গাছের তলায় বই দেখিয়া নেপাল বলিয়া উঠিল, “এই দেখ্, কোন্ হতভাগা ছেলে বই ফেলে গেছে! কার নাম লেখা আছে খুলে দেখ্ত?”
আমি গাছের উপর হইতে বলিলাম, “কি, এত বড় আস্পর্দ্ধা! তুই আমাকে হতভাগা বলার কে? দাঁড়া, তোকে দেখাচ্ছি!” এই বলিয়া আমি তিন চারিটা ডিম শুদ্ধ একটি পাখীর বাসা নেপালের মুখের উপর ছুড়িয়া দিলাম। ডিমগুলা ভাঙ্গিয়া তাহার নাক, মুখ রসে ভরিয়া গেল; নেপালের মুখের শ্রী দেখিয়া সকলে হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিল। আমি তাড়াতাড়ি নামিয়া তাহার কাছে গিয়া বলিলাম, “এখন তোর ‘গুপে’কোথায়? সে দিন যে বড় মারামারি ক’রতে চেয়েছিলি! আয়, তিন ঘুসীতে এখনই তোর দাঁত উড়িয়ে দেবো।”
“মারামারি করা ভদ্রলোকের কাজ নয়! যতক্ষণ ভাল কথায় চলে, ততক্ষণ মারামারি না করাই উচিত, কিন্তু তুমি ক্রমেই যে রকম বাড়িয়ে তুল্ছ, তোমাকে একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার। আমি মিষ্ট কথা ব’লে দেখেছি, ভাল ব্যবহার ক’রে দেখেছি, তুমি কিছুতেই শুনলে না। যেন মারামারি করাই তোমার উদ্দেশ্য! যদি তাই হয়, এস, দেখা যাক্!” এই বলিয়া, নেপাল জামার আস্তিন গুটাইতে লাগিল।
আমি আর কালবিলম্ব না করিয়া, নেপালের মুখ লক্ষ্য করিয়া সজোরে এক ঘুসী চালাইলাম। সে হঠাৎ মাথা সরাইয়া সেই ঘুসী এড়াইল। তখনই আবার আর একটা ঘুসী মারিলাম, সেটাও তাহার গায়ে লাগিল না। রাগে ও ঘৃণায় উত্তেজিত হইয়া, আমি আবার তাহাকে মারিবার উপক্রম করিতেছি, এমন সময়, নেপালের প্রকাণ্ড এক ঘুসী ঠিক আমার নাকের উপর আসিয়া পড়িল! সে ত ঘুসী নয়, যেন লোহার মুগুর! আমি চারিদিক অন্ধকার দেখিতে লাগিলাম। মাথা ঝাঁ ঝাঁ করিতে লাগিল। আমি বেশ বুঝিতে পারিলাম যে, নেপালের সহিত ঘুসীতে আঁটিয়া উঠা সহজ নয়। সে একজন রীতিমত পালোয়ান। তখন আমি—‘যাক্ প্রাণ, থাক মান’—মন্ত্র জপিতে জপিতে, একেবারে মরিয়া হইয়া তাহার দিকে ছুটিয়া গেলাম। নেপাল চক্ষুর নিমিষে অমনি একধারে একটু সরিয়া দাড়াইল, আর বেগ সাম্লাইতে না পারিয়া আমি সম্মুখের নদীতে পড়িয়া গেলাম। নদীটা বড় না হইলেও গভীর ছিল। আমি সাঁতার জানিতাম না; নদীতে পড়িয়া আঁকুর-পাকুর করিতে করিতে ভাসিতে চেষ্টা করিলাম; কিন্তু আমার সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হইল! আমার এই আসন্ন বিপদে নেপাল স্থির থাকিতে পারিল না—তাড়াতাড়ি লাফাইয়া পড়িয়া আমাকে ধরিয়া ফেলিল। আমিও তাহার কাপড় ধরিলাম। নেপাল বলিল, “তোমার কোন ভয় নেই; আমার কাপড় ছেড়ে দেও, আমি তোমাকে এখনি উঠাচ্ছি।” কিন্তু তাহার কাপড় ছাড়িতে আমার সাহস হইল না; কি জানি, শত্রু ভাবিয়া সে যদি আমাকে ফেলিয়া চলিয়া যায়। আমার নির্ব্বুদ্ধিতায়, লাভের মধ্যে এই হইল যে, আমরা দুই জনেই ডুবিতে লাগিলাম। শেষে নেপাল জোর করিয়া আমার হাত হইতে তাহার কাপড় ছাড়াইয়া লইল এবং অনেক কষ্টে আমাকে লইয়া ভাসিতে ভাসিতে তীরে আসিয়া উঠিল। এইরূপে আমি সে যাত্রা বাঁচিয়া গেলাম।
কিন্তু কুশিক্ষার এমনই দোষ যে, সে সময়েও আমি নেপালকে ভাল চক্ষে দেখিতে পারিলাম না! সে যে আপনাকে এত বিপদে ফেলিয়া, আমার জীবন রক্ষা করিল, সেজন্য কৃতজ্ঞ হওয়া দূরে থাক, বরং অপমানে যেন আমি মরিয়া গেলাম! নেপাল এই ঘটনা লইয়া যেখানে সেখানে গর্ব করিবে, আর সকলের কাছে আমার মাথা হেঁট হইবে, ইহা অপেক্ষা লজ্জা ও অপমানের বিষয় আর কি আছে? নদীর জলে ডুবিয়া মরাই বরং আমার পক্ষে সহস্র গুণে ভাল ছিল! এই ভাবিতে ভাবিতে আমি বাড়ী চলিয়া গেলাম।