বিষয়বস্তুতে চলুন

যাত্রা-সহচরী/জীবন-নাট্য

উইকিসংকলন থেকে

জীবন-নাট্য

 পাকা আমের সময়। সে তখন বালক মাত্র। গিয়াছিল সে মামার বাড়ী বেড়াইতে। বাগানে আম কুড়াইতে গিয়া পাড়ার একটি মেয়ের সঙ্গে দেখা। মেয়েটিও বালিকা। তাহাকে দেখিয়াই বালকের চিত্ত যেন বলিয়া উঠিল—এই এই, একেই আমি খুঁজিতেছিলাম, একেই আমি চাঁই।

 কিন্তু সে বালক কিনা, মেয়েটিকে মুখ ফুটিয়া কিছু বলিতে পারিল না। শুধু অবাক্ হইয়া তাহার দিকে চাহিয়া রহিল, মেয়েটি বালকটির রকম দেখিয়া একটু শুধু হাসিল।

 এবার এই পর্যন্ত। বালক মামার বাড়ী হইতে চলিয়া গেল, কিন্তু সেই একদিনের-দেখা মেয়েটির সেই হাসিটুকু সে ভুলিল না।

 আবার যখন সে মামার বাড়ীতে ফিরিল, তখন সে কলেজের ছেলে। তবু তখনো বালক। এবারও সেই মেয়েটির সঙ্গে পুকুর-ঘাটে দেখা। তার বয়স এখন চৌদ্দ বছর। কিন্তু তখনি তার বুকখানি মাতৃত্বের জন্য উন্মুখ হইয়া উঠিয়াছিল। মেয়েটির আগেকার সেই চঞ্চল গতি মন্থর, ও স্থির দৃষ্টি বিচঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে—সমস্ত দেহে একটি লাবণ্যময় লীলা পারদরাশির মতো টলটল করিতেছিল।;

 সে এবার আরো অবাক্ হইয়া মেয়েটিকে দেখিতে লাগিল; এবারও মেয়েটি তাহার রকম দেখিয়া হাসিল, কিন্তু তেমন সহজভাবে মুখের দিকে তাকাইয়া নয়—ঘাড় অন্যদিকে বাঁকাইয়া কিন্তু দৃষ্টিখানি তারই দিকে হানিয়া।

 তাদের আলাপ হইতে দেরী হইল না, এবং আলাপ যদি হইল তো তাহার মধ্যে এমন কথাও হইল যাহা শুধু সেই দুইটি মুখেরই বলিবার নতে! আর সেই চারটি কানেরই শুনিবার—আর কারো কাছে সে বলিবার নয়, আর কারো কানে সে শুনিবারও নয়।

 মেয়েটি বিধবা। তাকে বিয়ে করা অসাধ্যসাধন। কিন্তু সর্বস্ব যেখানে বাঁধা পড়িয়াছে, প্রাণপণ করিয়াই তো সেই সর্বস্ব উদ্ধার করিতে হয়। ছেলেটি উপার্জন করিবার জন্য আপনাকে প্রাণপণ যত্নে তৈরী করিতে লাগিল। সে ইঞ্জিনিয়ার হইবে—তার জন্য অন্ততপক্ষে আট বছর দরকার। আট বচ্ছর!

 ছেলেটি মাঝে মাঝে মামার বাড়ীতে আসে আর মেয়েটিকে দেখে—সে দিনে দিনে নব নব শ্রীতে পরিমণ্ডিত হইয়া উঠিতেছে! এমনি আশায় আনন্দে বাধায় চুরিতে প্রণয় তাহাদের প্রগাঢ় হইতে লাগিল।

 এমনি করিয়া তিন বছর কাটিয়া গেল। চতুর্থ বছরে মেয়েটির জ্বরবিকার হইল।

 তারপর ছেলেটি যখন তাহাকে দেখিল, তখন মেয়েটির রং বিবর্ণ, চোখ কোটরগত ও উদাস, মাথার চুল কাটা, সুগোল দেহের লাবণ্য কঙ্কালসার বিশ্রী। অমন রূপ হতশ্রী হওয়াতে ছেলেটির দুঃখ হইল, তবু তাহার অনুরাগের হ্রাস হইল না।

 ক্রমে ছেলেটি ইঞ্জিনিয়ার হইল। অর্থ প্রতিপত্তিও হইল। কত সুন্দরী কিশোরীর পিতা তাহাকে দুবেলা সাধ্যসাধনা করিতে লাগিল— কিন্তু সে সেই চৌদ্দ বছরের মেয়ের কাছে প্রতিজ্ঞা করা ভুলিল না। সে বিধবাকেই বিয়ে করিল।

 মেয়েটির আবার চুল হইয়াছিল, কিন্তু তেমন ঘন লম্বা গোছ বাঁধে নাই, তার চোখের কোল ভরিয়াছিল, কিন্তু দৃষ্টিতে সে চঞ্চল আবেশ ছিল না; রং ফিরিয়াছিল, কিন্তু আগেকার সেই চৌদ্দ বছরের মেয়ের উচ্ছল লারণ্য ফিরে নাই; হৃদয়ের অন্তরে প্রণয় জমাট বাঁধিয়াছিল, কিন্তু বাহিরের সেই উচ্ছ্বসিত চাঞ্চল্য এখন শিথিল হইয়া গিয়াছিল। চৌদ্দ বছরের মেয়েকে ভালো বাসিয়া ছেলেটি বাইশ বছরের মেয়েকে বিবাহ করিল—তবু তাহাকে ভালোবাসিত।

 ভালোবাসিত; কিন্তু আগেকার সেই ব্যগ্রতা আর ছিল না; অনাবশ্যক বকুনি থামিয়া গিয়াছিল; পলকে পলকে চাওয়াচাওয়ি ও চুরি করিয়া হাসাহাসি বিদায় লইয়াছিল, মুহূর্ত অদর্শনে প্রলয়বোধ এখন ঘরকন্নার কাজের মাঝে ডুব দিয়াছিল।

 ক্রমে ক্রমে দুটি ছেলে আর একটি মেয়ে হইল। মেয়েটি বাপের প্রাণ, তার নয়নতারা, তার অনন্ত সান্ত্বনা।

 মেয়েটি যত বড় হইতে লাগিল তত তার মধ্যে তার মায়ের অতীত ছবি ফুটিয়া উঠিতে লাগিল; আর তত সে বাপের হৃদয় অধিকার করিতে লাগিল। মেয়ের দশ বৎসর বয়সে তার মায়ের সেই চৌদ্দ বৎসরের ছবি বাপের চোখে নূতন হইয়া দেখা দিল।

 বাপ সময় পাইলেই মেয়ের কাছটিতে লাগিয়া থাকিত; মেয়েকে যতটা পারে চোখে চোখে সে রাখে। মেয়েকে লইয়াই বাপ ব্যস্ত, মেয়ের মায়ের খবর লওয়া বড় একটা ঘটিয়া উঠে না।

 দুর্বল শরীরে সন্তান প্রসব ও ঘরকন্নার খাটুনিতে মায়ের শরীর ভাঙিয়া গিয়াছে। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কাজে ব্যস্ত, দেখা সাক্ষাৎ বড় একটা ঘটে না। তবু ভালোবাসা ছিল। কিন্তু যেমনটি ছিল তেমন কি?

 একদিন প্রভাতে মেয়েটি বিছানা হইতে উঠিল না। মা বলিল— স্কুলে না যাইবার ছুতো। বাবা কিন্তু তাড়াতাড়ি ডাক্তার ডাকিল।

 মৃত্যুর দূত মেয়েটিকে ডাক দিয়াছে—মেয়েটির যক্ষ্মা হইয়াছে। মা ঘরকন্না লইয়া ব্যস্ত। বাবা তাহার শুশ্রূষার জন্য আহার নিদ্রা কাজকর্ম ত্যাগ করিল। অর্থে শ্রমে চেষ্টায় যত্নে যত রকম আরাম দিতে পারা যায় মেয়েটির কিছুরই অভাব রহিল না। বাপের সঙ্গে সে যখন কথা কহিত বাপের বুক দুঃখবেদনার ভরিয়। উঠিত; তবু সে নিজের কষ্ট চাপিয়া রাখিয়া মেয়েকে হাসাইতে চেষ্টা করিত।

 একদিন আর মেয়েটি হাসিল না, কথাও বলিল না। সব শেষ হইয়া গেল।

 সে শোকের দৃশ্য চিত্র করা অসম্ভব। যখন লোকে মৃতদেহ লইতে আসিল, তখন বাপ একেবারে ক্ষেপিয়া গেল—লোককে মারিতে যায়— অমন দুধের মেয়ে মরিয়া গেছে এ সে বিশ্বাসই করিতে পারে না, এখনো আশা থাকিতে পারে, সে বাঁচিলেও বাঁচিতে পারে।

 লোকেরা তাহার মিনতি শুনিল না, বাধা অগ্রাহ্য করিল, অমন সোনার মেয়েকে পুড়াইয়া ছাই করিয়া ফেলিল।

 পাগল পিতা এক মুঠি ছাইয়ের উপর সমাধি রচনা করিল। সাদা পাথরের সুন্দর সমাধি। রোজ সে একগাছি সাদা ফুলের সুগন্ধি মালা পরাইয়া সমাধির কাছে অশ্রু বিসর্জন করিয়া আসিত।

 এমনিভাবে বছরখানেক গেল। দ্বিতীয় বৎসরে কন্যার সমাধির নিত্য আর শোক করার সময় হয় না, কাজের বড় ঝঞ্ঝাট। মনে মনে এক একবার লজ্জা হয় যে মেয়ের প্রতি ঠিক-মতো স্নেহ প্রকাশ করা হইতেছে না। তবু সময় বড় চিকিৎসক,—সকল শোক, সকল লজ্জা, সকল স্মৃতি সে অল্পে অল্পে অলক্ষ্যে মুছিয়া ফেলিতে লাগিল।

 আরো দুটি কন্যা জন্মিয়াছে—কিন্তু তাঁরা তাহার মতো নয়, এ কথা তার বাপের মনে জাগে।

 আর স্ত্রী? যার তুল্য নারী এ জগতে আর ছিল না, এখন তার সে মোহিনী ঘুচিয়া গেছে, বিশুষ্কমঞ্জরী লতার মতো একদিনের যাহা শ্রী ছিল এখন নষ্ট হইরা তাহাই তাহাকে অধিকতর কুশ্রী করিয়া তুলিয়াছে।

 জীবনেরও স্ফূর্তিতে আনন্দে ভাটা পরিয়াছে। বার্দ্ধক্য চুপিচুপি ঘাড় ধরিয়া পিঠ কুঁজা করিয়া দিতেছে, পা বাঁকা ও কম্পিত করিয়া তুলিতেছে।

 ঘরকন্নারও সে শ্রী নাই। একা গিন্নি অনেকগুলি ছেলেপুলে সাম্‌লাইতে পারে না। তাহারা চেয়ারের ঠ্যাং ভাঙে, বালিসের তুলো বাহির করে; চুনকাম-করা দেয়ালে কালি ছড়ায়, গানের বদলে ছেলেদের কান্না গৃহখানিকে ভরিয়া রাখে। কাজেই কর্তা-গিন্নির নেজাজ চটা, কথা কড়া, ব্যবহার রূঢ় হইয়া উঠিতেছে। কর্তা-গিন্নিরও এখন ছাড়াছাড়ি, আগেকার সে সোহাগসম্ভাষণ এখন খুঁজিয়া মনে করিতে হয়।

 কর্তার বয়স যখন পঞ্চাশ, তখন গিন্নির মৃত্যু হইল। তখন বুড়োর মনে অতীত যৌবনের সকল স্মৃতি নূতন হইয়া উঠিল, চোখের সাম্‌নে সেই চৌদ্দ বছরের ফুটন্ত কলি মেয়েটিরই ছবি জাগিতে লাগিল। বুড়ো শোকে বড় কাতর হইল—সে শোক, বুড়ীর মৃত্যুতে নয়,—এ শোক সেই চৌদ্দ বছরের কিশোরীর স্মৃতির জন্য,—সেই বাইশ বছরের বধূর ভালোবাসার জন্য, এবং বুড়ীর গিন্নিপনার জন্য অল্প স্বল্প।

 বুড়ো ছেলেমেয়েগুলিকে লইয়া থাকে। মেয়েগুলির বিয়ে হইল: মেয়েরা শ্বশুরবাড়ী চলিয়া গেল; ছেলেগুলি যে যার কাজে দেশ বিদেশে ছড়াইয়া পড়িল; শ্মশান আগুলিয়া রহিল শুধু সেই বুড়ো।

 বছরখানেক ধরিয়া বুড়ীর এক-একটি গুণের কথা একশবার বলিয়া সে তার বন্ধুদের বিরক্ত করিয়া তুলিল। তারপর যা ঘটিল সে বড় চমৎকার।

 একটি আঠারো বছরের সুন্দরীর সঙ্গে বুড়োর আলাপ হইল। তাহার আকৃতির মধ্যে—কী আশ্চর্য - বুড়ো তার মৃত পত্নীর চোদ্দ বছর বয়সের ছবিখানির চমৎকার সাদৃশ্য দেখিতে পাইল। সেই কোন সুদূর অতীতের আমবাগানের চোদ্দ বছরের মেয়েকে দেখিয়া যেমন সেদিন মনে হইয়াছিল এমনটি বুঝি আর জগতে নাই, আজ এই অষ্টাদশীকে দেখিয়া ও তেমনি মনে হইল। আর প্রজাপতিরই নির্বন্ধ! এ বিধাতার লীলা!

 শুধু যে বুড়োই যুবতীকে দেখিয়া ক্ষেপিয়া উঠিল তাহা নয়, যুবতীও বুড়োকে ভালোবাসে—বুড়োর অনেক ঐশ্বর্য! বুড়োর শূন্য ভাঙা মন সুখে গর্বে ভরাট হইয়া উঠিল—এখনো সে একেবারে অপদার্থ নয়, পঞ্চাশ বছরেও সে অষ্টাদশীর হৃদয়জয়ী!

 বুড়ো আবার বিয়ে করিল, নইলে যে সংসার চলে না; বুড়ো বয়সে তাহাকে দেখে কে? ছেলেমেয়েগুলোকে মাতৃহীন রাখাও তো বাপের প্রাণে সহ্য হয় না।

 কিন্তু ছেলেমেয়েগুলো এমনি অকৃতজ্ঞ, বাপের এতবড় স্নেহের নিদর্শনটাকে তারা তাদের মায়ের প্রতি অপমান মনে করিল, বুড়ো বয়সে বাপের কাণ্ড দেখিয়া তাদের মাথা হেঁট হইল, লজ্জায় তাদের নাকি লোকালয়ে মুখ দেখানো ভার হইল। শোন একবার কথা!

 এমন অকৃতজ্ঞতা কি বরদাস্ত হয় বুড়ো ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সকল সম্পর্ক তুলিয়া দিল। নূতন উৎসাহে নূতন গিন্নি লইয়া নূতন-পাতা ঘরকন্নায় বুড়ো মন দিল। বুড়োর বুড়ো-বন্ধুরা বলাবলি করিল—বুড়ো-গাছে দোফলা ফসল রকমারির বাহার বটে, কিন্তু সে না-মিষ্টি না-টক, পান্‌সে!

 বছর ফিরিতে না ফিরিতে নববধূর সন্তান হইল। বুড়ো বয়সে একেই ঘুম কম হয়, তাহাতে আবার শিশুর কান্নায় বুড়োর ভারি ঘুমের ব্যাঘাত হইতে লাগিল। এ বয়সে কি এসব ঝঞ্ঝাট ভালো লাগে? বুড়ো পৃথক্‌ ঘরে শয্যা রচনা করিল।

 বধূ ইহাতে নারীভাগ্যকে ধিক্কার দিয়া কাঁদিল; রমণীর জীবন কী দুঃখদুর্ভর! বছরখানেক আগে বুড়ো তাহার কানে যেসব সৃষ্টিছাড়া মনভুলানো কথা বলিয়াছিল এখন তাহার আগাগোড়া মিথ্যা প্রবঞ্চনা বলিয়া মনে হইতে লাগিল। তখন তাহার মনে তাহার ভাগ্যবতী সতীনের উপর হিংসা জাগিতে লাগিল। এটা যেন সম্পূর্ণ তার সতীনেরই দোষ যে, সে আগে জুটিয়া তার স্বামীর সকল মাধুর্য সকল সোহাগ নিঃশেষে উপভোগ - করিয়া তবে মারিয়াছে এবং তাহার জন্য রাখিয়া গেছে শুধু অনাদর আর উপেক্ষা। সে মনে করিতে লাগিল তাহাকে বিবাহ করা সে কেবল তাহার সতীনের শূন্য স্থান পূর্ণ করিবার জন্য, তাহার যতটুকু আদর সে সতীনেরই স্মৃতির উদ্দেশে। তাহার নিজের কিছু নাই, মনে করিয়া সে ক্ষুণ্ণ ক্ষুব্ধ হইয়া উঠিল।

 এখন সে স্বামীর মনোহরণের জন্য বিশেষ যত্ন করিয়া যে-সব বিলাসকলা প্রণয়লীলার অনুষ্ঠান করিতে শুরু করিল তাহা বুড়োর কাছে বড় বাড়াবাড়ি ও ন্যাকামি বলিয়া ঠেকিতে লাগিল। বুড়ো মনে মনে বিরক্ত হইয়া উঠিল। এখন কথায় কথায় বুড়োর মনে তুলনায় সমালোচনা জাগে—মনে হয় আগেরটি যেমন সরল সোহাগী ছিল এটি তেমন নয়, মেজাজটা চটা, ঢংটা পাকামি, ব্যবহারটা অসঙ্গত। তখন বুড়োর মনে তার পূর্ব পক্ষের ছেলেমেয়েগুলির প্রতি মমতা ফিরিয়া আসিল। গৃহ তার অতিরিক্ত অস্বস্তিকর মনে হইতে লাগিল। তার বুড়ো বয়সের কাণ্ডখানা আগাগোড়া মূর্খতারই নামান্তর বলিয়া প্রতিভাত হইল। এমন ভুলটা না করিলেই ছিল ভালো। ভাবিতে ভাবিতে তাহার সমস্ত জীবন ভার হইয়া উঠিল।

 এতদিন তাহার মনের মধ্যে সেই আমবাগানের চোদ্দ বছরের মেয়েটির রূপই শুধু জাগিতেছিল— যাহার সাদৃশ্য সে দু-দুবার দেখিয়া মুগ্ধ হইয়াছিল এবং দুবারই সেজন্য বেদনা পাইয়াছে,—একবার তাহার কন্যার আকৃতিতে, আরবার এই দ্বিতীয়া পত্নীর মধ্যে। কিন্তু এখন এই জীবনের অবসান-সময়ে, এই নিরানন্দ সংসারে, পত্নীর কর্কশ ভৎসনা পরিপাক করিতে করিতে,তাহার সম্মুখে জাগিয়া উঠিল সেই ধৈর্যশীলা কর্মপটু গৃহিণীমূর্তি—যে নীরবে শুধু সংসার দেখিয়াছে, স্বামীপুত্রের সেবা করিয়া গিয়াছে, যে কখনো একটি অপ্রিয় বা রূঢ় কথা উচ্চারণ করে নাই। যে তুচ্ছ মোহে চোদ্দ বছরের কিশোরীর রূপে সে মজিয়াছিল, আজ বৃদ্ধ বয়সে ধাক্কা খাইয়া সে মোহ তাহার কাটিয়া গেল; এখন বুড়ো বুঝিল চোদ্দ বছরের তরুণীরই প্রণয় পরিণতি পাইয়াছিল সেই সেবা-নিপুণা গৃহিণীতে; বৃথাই সে তাহাকে তুচ্ছ করিয়া শুধু আকৃতির সন্ধানে ব্যাকুল হইয়া ভুগিয়াছে। এখন সে মৃত্যুর ভিতর দিয়া তাহারই সহিত মিলনের অপেক্ষা করিয়া দিন গণিতে লাগিল।