বিষয়বস্তুতে চলুন

রজনী (১৮৯৫)/তৃতীয় খণ্ড/চতুর্থ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।


 এদিকে বিষ্ণুরাম বাবু সংবাদ পাঠাইয়া দিলেন যে, মনোহয় দাসের উত্তরাধিকারী উপস্থিত হইয়াছে—বিষয় ছাড়িয়া দিতে হইবে। অমরনাথ তবে জুয়াচোর জালসাজ নহে?

 কে উত্তরাধিকারী তাহা বিষ্ণুরাম বাবু প্রথমে কিছু বলেন মাই। কিন্তু অমরনাথের কথা স্মরণ হইল। বুঝি রজনীই উত্তরাধিকারিণী। যে ব্যক্তি দাবিদার, সে যে মনোহর দাসের যথার্থ উত্তরাধিকারী তদ্বিষয়ে নিশ্চয়তা আছে কি না, ইহা জানিবার জন্য বিষ্ণুরাম বাবুর কাছে গেলাম। আমি বলিলাম, “মহাশয় পূর্ব্বে বলিয়াছিলেন, যে মনোহরদাস সপরিবারে জলে ডুবিয়া মরিয়াছে। তাহার প্রমাণও আছে। তবে তাহার আবার ওয়ারিস আসিল কোথা হইতে?”

 বিষ্ণুরাম বাবু বলিলেন, “হরেকৃষ্ণ দাস, নামে তাহার এক ভাই ছিল, জানেন বোধ হয়।”

 আমি। তা ত জানি। কিন্তু সেও ত মরিয়াছে।

 বিষ্ণু। বটে, কিন্তু মনোহরের পর মরিয়াছে। সুতরাং সে বিষয়ের অধিকারী হইয়া মরিয়াছে।

 আমি। তা হৌক, কিন্তু হরেকৃষ্ণেরও ত এক্ষণে কেহ নাই?

 বিষ্ণু। পূর্ব্বে তাহাই মনে করিয়া আপনাদিগকে বিষয় ছাড়িয়া দিয়াছিলাম। কিন্তু এক্ষণে জানিতেছি যে, তাহার এক কন্যা আছে।

 আমি। তবে এতদিন সে কন্যার কোন প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয় নাই কেন?

 বিষ্ণু। হরেকৃষ্ণের স্ত্রী তাহার পূর্ব্বে মরে; স্ত্রীর মৃত্যুর পরে শিশু কন্যাকে পালন করিতে অক্ষম হইয়া হরেকৃষ্ণ কন্যাটিকে তাহার শ্যালীকে দান করে। তাহার শ্যালী ঐ কন্যাটিকে আত্মকন্যাবৎ প্রতিপালন করে, এবং আপনার বলিয়া পরিচয় দেয়। হরেকৃষ্ণের মৃত্যুর পর তাহার সম্পত্তি লাওয়ারেশ বলিয়া মাজিষ্ট্রেট সাহেবকর্ত্তৃক গৃহীত হওয়ার প্রমাণ পাইয়া, আমি হরেকৄষ্ণকে লাওয়ারেশ মনে করিয়াছিলাম। কিন্তু এক্ষণে হরেক্বষ্ণের একজন প্রতিবাসী আমার নিকট উপস্থিত হইয়া, তাহার কন্যার কথা প্রকাশ করিয়াছে। আমি তাহার প্রদত্ত সন্ধানের অনুসরণ করিয়া জানিয়াছি, যে তাহার কন্যা আছে বটে।

 আমি বলিলাম, “যে হয় একটা মেয়ে ধরিয়া হরেকৃষ্ণ দাসের কন্যা বলিয়া ধূর্ত্তলোক উপস্থিত করিতে পারে। কিন্তু সে যে যথার্থ হরেকৃষ্ণ দাসের কন্যা তাহার কিছু প্রমাণ আছে কি?”

 “আছে।” বলিয়া বিষ্ণুরাম বাবু আমাকে একটা কাগজ দেখিতে দিলেন, বলিলেন, “এ বিষয়ে যে যে প্রমাণ সংগৃহীত হইয়াছে, তাহা উহাতে ইয়াদ দাস্ত করিয়া রাখিয়াছি।”

 আমি ঐ কাগজ লইয়া পড়িতে লাগিলাম। তাহাতে পাইলাম যে হরেকৃষ্ণ দাসের শ্যালীপতি রাজচন্দ্র দাস; এবং হরেকৃষ্ণের কন্যার নাম রজনী।

 প্রমাণ যাহা দেখিলাম তাহা ভয়ানক বটে। আমরা এত দিন অন্ধ রজনীর ধনে ধনী হইয়া তাহাকে দরিদ্র বলিয়া ঘৃণা করিতেছিলাম।

 বিষ্ণুরাম একটি জোবানবন্দীর জাবেদা নকল আমার হাতে দিয়া বলিলেন,

 “এক্ষণে দেখুন, এই জোবানবন্দী কাহার?”

 আমি পড়িয়া দেখিলাম, যে জোবানবন্দীর বক্তা হরেকৃষ্ণ দাস। মাজিষ্ট্রেটের সন্মুখে তিনি এক বালাচুরীর মোকদ্দমায় এই জোবানবন্দী দিতেছেন। জোবানবন্দীতে পিতার নাম ও বাসস্থান লেখা থাকে; তাহাও পড়িয়া দেখিলাম। তাহা মনোহরদাসের পিতার নাম ও বাসস্থানের সঙ্গে মিলিল। বিষ্ণুরাম জিজ্ঞাসা করিলেন,

 “মনোহর দাসের ভাই হরেক্বষ্ণের এই জোবানবন্দী বলিয়া আপনার বোধ হইতেছে কি না?”

 আমি। বোধ হইতেছে।

 বিষ্ণু। যদি সংশয় থাকে তবে এখনই তাহা ভঞ্জন হইবে। পড়িয়া যাউন।

 পড়িতে লাগিলাম যে সে বলিতেছে, “আমার ছয়মাসের একটি কন্যা আছে। এক সপ্তাহ হইল তাহার অন্নপ্রাশন দিয়াছি। অন্নপ্রাশনের দিন বৈকালে তাহার বালা চুরি গিয়াছে।”

 এই পর্য্যন্ত পড়িয়া দেখিলে, বিষ্ণুরাম বলিলেন, “দেখুন কত দিনের জোবানবন্দী?”

 জোবানবন্দীর তারিখ দেখিলাম জোবানবন্দী ঊনিশ বৎসরের।

 বিষ্ণুরাম বলিলেন, “ঐ কন্যার বয়স এক্ষণে হিসাবে কত হয়?”

 আমি। ঊনিশ বৎসর কয়মাস—প্রায় কুড়ি।

 বিষ্ণু। রজনীর বয়স কত অনুমান করেন?

 আমি। প্রায় কুড়ি।

 বিষ্ণু। পড়িয়া যাউন; হরেকৃষ্ণ কিছু পরে বালিকার নামোল্লেখ করিয়াছেন।

 আমি পড়িতে লাগিলাম। দেখিলাম, যে একস্থানে হরেকৃষ্ণ পুনঃপ্রাপ্ত বালা দেখিয়া বলিতেছেন, “এই বালা আমার কন্যা রজনীর বালা বটে।”

 আর বড় সংশয়ের কথা রহিল না—তথাপি পড়িতে লাগিলাম। প্রতিবাদীর মোক্তার হরেকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করিতেছেন, “তুমি দরিদ্রলোক। তোমার কন্যাকে সোণার বালা দিলে কি প্রকারে?” হরেকৃষ্ণ উত্তর দিতেছে, “আমি গরীব, কিন্তু আমার ভাই মনোহর দাস দশটাকা উপার্জ্জন করেন। তিনি আমার মেয়েকে সোণার গহনাগুলি দিয়াছেন।”

 তবে যে এই হরেকৃষ্ণ দাস আমাদিগের মনোহর দাসের ভাই, তদ্বিষয়ে আর সংশয়ের স্থান রহিল না।

 পরে মোক্তার আবার জিজ্ঞাসা করিতেছেন,

 “তোমার ভাই তোমার পরিবার বা তোমার আর কাহাকে কখন অলঙ্কার দিয়াছে?”

 উত্তর—না।

 পুনশ্চ প্রশ্ন। সংলার খরচ দেয়?

 উত্তর। না।

 প্রশ্ন। তবে তোমার কন্যাকে অন্নপ্রাশনে সোণার গহনা দিবার কারণ কি?

 উত্তর—আমার এই মেয়েটি জন্মান্ধ। সেজন্য আমার স্ত্রী সর্ব্বদা কাঁদিয়া থাকে। আমার ভাই ও ভাইজ তাহাতে দুঃখিত হইয়া, আমাদিগের মনোদুঃখ যদি কিছু নিবারণ এই ভাবিয়া অন্নপ্রাশনের সময় মেয়েটিকে এই গহনাগুলি দিয়াছিলেন।

 জন্মান্ধ! তবে যে সে এই রজনী তদ্বিষয়ে আর সংশয় কি?

 আমি হতাশ হইয়া জোবানবন্দী রাখিয়া দিলাম। বলিলাম “আমার আর বড় সন্দেহ নাই।”

 বিষ্ণুরাম বলিলেন, “অত অল্প প্রমাণে আপনাকে সন্তুষ্ট হইতে বলি না। আর একটা জোবানবন্দীর নকল দেখুন।”

 দ্বিতীয় জোবানবন্দীও দেখিলাম যে, উহাও ঐ কথিত বালা চুরীর মোকদ্দমায় গৃহীত হইয়াছিল। এই জোবানবন্দীতে বক্তা রাজচন্দ্র দাস। তিনি একমাত্র কুটুম্ব বলিয়া ঐ অন্নপ্রাশনে উপস্থিত ছিলেন। তিনি হরেকৃষ্ণের শ্যালীপতি বলিয়া আত্মপরিচয় দিতেছেন। এবং চুরীর বিষয় সকল সপ্রমাণ করিতেছেন।

 বিষ্ণুরাম বলিলেন, “উপস্থিত রাজচন্দ্র দাস সেই রাজচন্দ্র দাস। সংশয় থাকে ডাকিয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করুন।”

 আমি বলিলাম, “নিষ্প্রয়োজন।”

 বিষ্ণুরাম আরও কতকগুলি দলিল দেখাইলেন, সে সকলের বৃত্তান্ত সবিস্তারে বলিতে গেলে, সকলের ভাল লাগিবে না। ইহা বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, এই রজনী দাসী যে হরেকৃষ্ণ দাসের কন্যা তদ্বিষয়ে আমার সংশয় রহিল না। তখন দেখিলাম বৃদ্ধ পিতা মাতা লইয়া, অন্নের জন্য কাতর হইয়া বেড়াইব!

 বিষ্ণুরামকে বলিলাম, “মোকদ্দমা করা বৃথা। বিষয় রজনী দাসীর, তাঁহার বিষয় তাঁহাকে ছাড়িয়া দিব। তবে আমার জ্যেষ্ঠ সহোদর এ বিষয়ে আমার সঙ্গে তুল্যাধিকারী! তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করার অপেক্ষা রহিল মাত্র।”

 আমি একবার আদালতে গিয়া, আসল জোবানবন্দী দেখিয়া আসিলাম। এখন পুরাণ নথি ছিঁড়িয়া ফেলে, তখন রাখিত। আসল দেখিয়া জানিলাম যে নকলে কোন কৃত্রিমতা নাই।

 বিষয় রজনীকে ছাড়িয়া দিলাম।