বিষয়বস্তুতে চলুন

রবিন্সন্‌ ক্রুসো/চতুর্থ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

চতুর্থ পরিচ্ছদ।

 বড় সুখে দিন কাটিতে লাগিল। আমার অনেক পরিশ্রম কমিয়া গেল। “শুক্র”ই সব করে; শস্য সংগ্রহ করে, ময়দা পেষে, কোটি ট তৈয়ারি করে। “শুক্র”কে আমি খুব ভালবাসিতাম, “শুক্র” আবার তাহার চেয়েও আমাকে বেশী ভালবাসিত। কথায় কথায় একদিন “শুক্র”কে জিজ্ঞাসা করিলাম, তাহার স্বদেশ কতদূর? কেমন করিয়া সেখানে যাওয়া যায়? নৌকায় চড়িয়া নিরাপদে সমুদ্র পার হইয়া সেখানে যাওয়া যায় কি না? সে বলিল-—“নৌকায় চড়িয়া অনায়াসে আমাদের দেশে যাওয়া যায়, কোন ভয়ের কারণ নাই। আমাদের দেশের পশ্চিমে তোমার মত দাড়িওয়ালা সাদা মানুষরা থাকে।” আমি বলিলাম, “শুক্র, আমাকে সেই দাড়িওয়ালা সাদা মানুষদের কাছে নিয়ে যেতে পারিস্?” সে বলিল, “খুব পারি, একটা বড় নৌকা পেলেই হয়।” তখন মনে মনে আশা হইল, এই দ্বীপটি ছাড়িয়া একবার কোন ইউরোপীয়দিগের কাছে যাইতে পারিলেই, স্বদেশে যাইবার উপায় হইবে।

 “শুক্রের” মনে যাহাতে প্রকৃত ঈশ্বর-জ্ঞান জন্মে তাহার জন্য তাহাকে ধর্ম্মোপদেশ দিতে আরম্ভ করিলাম। তাহাকে বলিলাম, “পৃথিবী ও সকল জীবের সৃষ্টিকর্ত্তা মহান্ ঈশ্বর অনেক উচ্চে স্বর্গে থাকেন, তোমাদের দেবতার মত পাহাড়ে কি গাছে থাকেন না। তাঁহার শক্তি তোমাদের দেবতার চেয়ে অনেক বেশী!” এই রকম ধর্ম্মের আলোচনা করিয়া আমরা দুইজন তিন বৎসর পরম সুখে কাটাইয়াছিলাম। আমার উপদেশ শুনিতে শুনিতে, বর্ব্বর “শুক্র” সভ্য খৃষ্টান হইয়া উঠিল। আমরা দুই জনে একসঙ্গে ঈশ্বরের পবিত্র ধর্ম্মপুস্তক বাইবেল পড়িতাম। তাহাকে বন্দুক ছোড়াও শিখাইলাম।

 “শুক্রকে” আমার সমস্ত কাহিনী বলিয়া ভাঙ্গা নৌকাখানি দেখাইলাম। সেই নৌকা দেখিয়া সে বলিয়া উঠিল, “এই রকমের একখানা নৌকা ঝড়ে ডুবে যাচ্ছিল, তাতে অনেক সাদা মানুষ ছিল; আমরা তাদের বাঁচিয়েছিলাম।” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম— “তারা কজন? কোথায় আছে?”—আমার ভৃত্য আঙ্গুল গণিয়া বলিল, “সতর জন, তারা আমাদের দেশেই আছে। আমাদের দেশের লোকরা তাদের মেরে খায় নাই; তাদের সঙ্গে ভাব হয়েছে।” আমি অনুমান করিলাম, চারি বছর আগে এই দ্বীপের কাছে ঝড়ে পড়িয়া যে জাহাজখানি ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল, বোধ হয় সেই জাহাজের সতর জন লোকই এক খানি বোটে ভাসিতে ভাসিতে, শুক্রদের দেশের কাছে গিয়া ডুবিয়া যাইতেছিল।

 সেই সতর জন লোকের কাছে যাইবার জন্য মন অস্থির হইয়া উঠিল। “শুক্রকে” আমার নৌকাখানি দেখাইলাম। সে বলিল, “এত ছোট নৌকায় সমুদ্র পার হওয়া যায় না।” আমি বলিলাম—“এস আমরা দুজনে মিলে একটা বড় নৌকা তৈয়ারি করি, সেই নৌকায় চ’ড়ে তুমি তোমার স্বদেশে যেতে পার্‌বে।” এই কথা শুনিয়া সে কোনও উত্তর দিল না, বড়ই দুঃখিত হইল। দুঃখের কারণ জিজ্ঞাসা করিলাম। সে বলিল, “প্রভু, তুমি নিশ্চয়ই আমার উপর রাগ ক’রেছ, নইলে আমাকে দেশে যেতে ব’ল্‌ছো কেন?” আমি বলিলাম, “সে কি?—তুমি ত দেশে যেতে চেয়েছিলে? এখন আবার কি হ’ল?” “শুক্র” বলিল “তোমায় ছেড়ে দেশে যেতে চাই না, আমাকে কেন বিদায় ক’রে দেবে? তার চেয়ে এই কুড়ালখানা দিয়ে আমাকে কেটে ফেলো!” বলিতে বলিতে বেচারা কাঁদিয়া ফেলিল। আমার প্রতি তাহার এত ভালবাসা দেখিয়া, আমারও চোখে জল আসিল। আমি বলিলাম, “তুমি নিজে ইচ্ছা ক’রে না গেলে, আমি তোমাকে কখনো আমার কাছছাড়া ক’র্‌ব না।”

 সমুদ্র-যাত্রার জন্য “শুক্র” আর আমি একখানি বড় নৌকা তৈয়ারি করিতে আরম্ভ করিলাম। একমাস পরিশ্রম করিয়া নৌকা প্রস্তুত করিলাম। দুই জনে ঠেলিতে ঠেলিতে তাহা জলে ভাসাইলাম। মাস্তুল, পাল, হাল, ইত্যাদি সব ঠিক করিয়া লাগাইলাম। বর্ষা চলিয়া গেলেই আমরা নৌকাযাত্রা করিব, স্থির করিলাম। বর্ষার পর, আমাদের যাওয়ার দিন প্রায় ঠিক হইয়াছে, এমন সময়, একদিন সকালবেলা “শুক্র” ছুটিয়া আসিয়া হাঁপাইতে হাঁপাইতে বলিল, “প্রভু, মরেছি, এবার আর বাঁচবার আশা নাই!” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “অমন কচ্ছো কেন? হ’য়েছে কি?” সমুদ্রের দিকে আঙ্গুল দিয়া দেখাইয়া সে বলিল, “ঐ যে, এক, দুই, তিনখানা নৌকা! —এক—দুই—তিন।” বুঝিলাম, অসভ্যেরা আবার নরমাংস ভোজনের উৎসবে আসিতেছে! শুক্রের ভয় হইয়াছে— সেবারে কোন রকমে পলাইয়া বাঁচিয়াছিল, এবার আর রক্ষা নাই; এবারে উহাকেই কাটিয়া খাইবার জন্য তাহারা আসিতেছে! আমি বলিলাম, “শুক্র, আমি থাকিতে তোমার ভয় কি? অমন ক’রে ভয়ে কেঁপো না, স্থির হও। তোমাকে ত বন্দুক ছুড়্‌তে শিখিয়েছি। দু’জনে বন্দুক দিয়ে সব নিকেস ক’রবো। সাহস ক’রে আমার পাশে দাঁড়িয়ে আমার মত যুদ্ধ ক’ত্তে হবে। আমি যা ব’লবো তাই শুন্‌বে।” “শুক্র” বলিল, “হাঁ, প্রভু, তুমি ম’র্‌তে বললে ম’র্‌ব।” যতগুলি বন্দুক আর পিস্তল ছিল—সব ভরিয়া ঠিক করিলাম। আমি একবার পাহাড়ের মাথায় উঠিয়া দূরবীণ ঠিক করিয়া দেখিলাম—একুশ জন নরপিশাচ তিনটি লোককে বন্দী করিয়া আনিয়াছে। পাহাড় হইতে নামিয়া “শুক্র” আর আমি বন্দুক ঘাড়ে করিয়া, কোমরে পিস্তল আর ভরোয়ার ঝুলাইলাম এবং সেই অসভ্যদিগকে আক্রমণ করিবার জন্য, বনের ভিতর দিয়া লুকাইয়া লুকাইয়া অগ্রসর হইতে লাগিলাম। একটি বড় গাছের আড়ালে লুকাইয়া থাকিয়া, “শুক্র” উঁকি মারিয়া দেখিতে দেখিতে বলিল, “এখান থেকে সব দেখা যাচ্ছে। সকলে মানুষের মাংস খাওয়ার জন্য আগুনের চার্‌দিকে ব’সেছে। একটি লোককে হাত-পা বেঁধে বালির উপর ফেলে রেখেছে, তাকেও এখনি মেরে খাবে। সে লোকটি দাড়িওয়ালা সাদা মানুষ!” আমি তখন সেই গাছের আড়ালে দাঁড়াইয়া দেখিলাম, সত্যই একজন হাত পা বাঁধা সাদা মানুষ বালির উপর পড়িয়া আছে। আমরা আরও অগ্রসর হইয়া একটা ঝোপের আড়ালে লুকাইয়া দেখিতে লাগিলাম। উনিশ জন মাটিতে বসিয়া আছে, আর দুই জন সেই বন্দীকে মারিতে উদ্যত হইয়াছে। তাহারা তাহার পায়ের দড়ি খুলিতেছিল। আমি তখন “শুক্র”কে বলিলাম, “আমি যা ব’ল্‌ব শুন্‌বে; যা ক’র্‌ব তাই ক’র্‌বে—এই এম্‌নি ক’রে বন্দুক তুলে ঐ লোকদের গায়ে ছোড়!”—ব’লেই আমি বন্দুক ছুড়িলাম,—শুক্রও বন্দুক ছুড়িল। আমাদের দুইজনের গুলিতে তিনটি লোক মরিয়া গেল আর পাঁচ জন আহত হইল। আর সকলে লাফাইয়া উঠিল!—কোন্ দিকে দৌড়াইয়া পালাইবে ঠিক করিতে পারিল না। আবার আমরা দুইজনে বন্দুক ঠিক করিয়া এক সঙ্গে গুলি চালাইলাম। এবারে দুইজন মরিল, অনেকে আহত হইল এবং পাগলের মত চীৎকার করিতে করিতে চারিদিকে ছুটিতে লাগিল। আমি তখন গুলিভরা বন্দুক ল‍ইয়া বন হইতে বাহির হইয়া পড়িলাম। “শুক্র”ও বন্দুক লইয়া আমার সঙ্গে সঙ্গে বাহির হইল। আমি যত জোরে পারি—“মার্ মার্—কাট্ কাট্” করিয়া চেঁচাইতে চেঁচাইতে যেখানে সেই সাদা মানুষটি পড়িয়াছিল সেই দিকে ছুটিলাম। আমি যা করি “শুক্র”ও তাই করে। সেও আমার মত চেঁচাইতে চেঁচাইতে আমার সঙ্গে ছুটিল। সেখানে গিয়া দেখিলাম,কয়েক জন লোক একখানি নৌকায় উঠিয়াছে। আমি “শুক্র”কে বলিলাম—“মার্, ঐ রাক্ষসগুলোকে মার্!” শুক্র গুলি চালাইয়া দুইজনকে মারিয়া ফেলিল এবং একজনকে আহত করিল। আমি সেই অবসরে বন্দীর হাত পায়ের দড়ি কাটিয়া, তাহাকে হাতে ধরিয়া তুলিলাম, কিন্তু সে এত দুর্ব্বল হইয়া পড়িয়াছিল যে, দাঁড়াইয়া থাকিতে পারিল না। আমি তাহাকে একটু ব্রাণ্ডি আর একটু রুটি খাইতে দিলাম, রুটি আর ব্রাণ্ডি খাইয়া তাহার কথা ফুটিল, গায়ে বল আসিল। সে বলিল যে, সে স্পেনদেশীয় লোক। আমি তাহার হাতে পিস্তল দিয়া বলিলাম, “এখন অসভ্যদের যে কটি বাকী আছে তাদের মেরে ফেলতে হবে,—এসো, যুদ্ধ করি গিয়ে।” সেই বন্দী তখন মুক্ত হইয়া, অস্ত্র হাতে পাইয়া অসভ্যদিগকে আক্রমণ করিল এবং এক মুহূর্ত্তে দুইটিকে বধ করিল। “শুক্র” আর আমি বন্দুক ভরিতেছিলাম এমন সময় একটা বর্ব্বর সেই স্পেনদেশীয় লোকটিকে আক্রমণ করিয়া মাটিতে ফেলিয়া দিল। সে তখন মাটিতে শুইয়া পড়িয়াই পিস্তল ছুড়িল, আক্রমণকারী গুলি খাইয়া পড়িয়া গেল। এই রকম করিয়া আমরা তিনজনে ক্রমে ক্রমে প্রায় সকলকেই হত্যা করিলাম;—কেবল চারি জন একখানি নৌকায় চড়িয়া পলাইয়া গিয়াছিল। আমরা আর একখানি নৌকায় চড়িয়া তাহাদিগকেও তাড়া করিতে গিয়াছিলাম। আমরা যে নৌকায় উঠিয়াছিলাম তাহাতে একটি অসভ্য লোককে হাত-পা বাঁধিয়া ফেলিয়া রাখা হইয়াছিল। তাহার হাত পায়ের দড়ি কাটিয়া ছাড়িয়া দিলাম। সে উঠিয়া বসিতেই “শুক্র” তাহার মুখের দিকে চাহিয়াই দৌড়াইয়া গিয়া আলিঙ্গন করিল। তারপর “শুক্র” পাগলের মত হাসিতে লাগিল, নাচিতে লাগিল, কাঁদিতে লাগিল। আমি তাহাকে কিছুতেই থামাইতে পারি না। একটু পরে “শুক্রের” মাথা ঠিক হইলে, সে বলিল—“আমার বাবা!” বাবাকে দেখিয়া একজন বর্ব্বর লোকের এত আনন্দ হয় ভাবিয়া আমার মন গলিয়া গেল। এই অবসরে সেই চারিজন অসভ্য নৌকা জোরে চালাইয়া কোথায় অদৃশ্য হইয়া গেল। একবার ভয় হইল, দেশে ফিরিয়া গিয়া ইহারা প্রতিশোধ লইবার জন্য বড় এক দল বাঁধিয়া আসিয়া, আমাদিগকে আক্রমণ করিতে পারে। কিন্তু দুই ঘণ্টার মধ্যে এমন ভয়ঙ্কর ঝড় উঠিল যে, সে ঝড়ে তাহারা নিশ্চয়ই ডুবিয়া মরিয়াছে ভাবিয়া নিশ্চিন্ত হইলাম। “শুক্রের” বাবাকে কিছু কিস্‌মিস্ খাইতে দিলাম, “শুক্র” তাহাকে একটু জল আনিয়া দিল। কিস্‌মিস্ আর জল খাইয়া সে অনেকটা সুস্থ হইল। স্পেনদেশীয় লোকটিকে কিস্‌মিস্ আর রুটি খাইতে দিলাম। “শুক্রের” বাবা আর এই স্পেনিয়ার্ড দুইজনেই এত দুর্ব্বল হইয়া পড়িয়াছিল যে, তাহারা হাঁটিয়া আমাদের সঙ্গে বাড়ী পর্য্যন্ত যাইতে পারিল না। তাড়াতাড়ি হাতগাড়ী তৈয়ারি করিয়া, তাহাতে দুই জনকে চড়াইয়া “শুক্র” আর আমি ঠেলিয়া লইয়া চলিলাম। আজ আমার বাড়ীতে চারি জন লোক হইল ভাবিয়া, খুব আনন্দ হইতে লাগিল। রাত্রে খাওয়ার পর “শুক্রকে” দিয়া তাহার বাবাকে জিজ্ঞাসা করিলাম যে, সেই পলাতক চারি জন লোক আবার দলবল লইয়া আমাদিগকে আক্রমণ করিতে পারে, এ রকম সম্ভাবনা আছে কি না? “শুক্রের” বাবা বলিল—“খুব সম্ভব ঝড়ে নোকা ডুবিয়া তাহারা মারা গিয়াছে। বাঁচিয়া থাকিলেও বন্দুকের ভয়ে তাহারা আর এখানে আসিবে না।” কিছুদিন আমরা ভয়ে ভয়ে কাটাইলাম, কিন্তু অসভ্যদের নৌকা আর শীঘ্র আসিল না দেখিয়া, ভয় ভাঙ্গিয়া গেল।