বিষয়বস্তুতে চলুন

রবিন্সন্‌ ক্রুসো/তৃতীয় পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

এই দ্বীপের এক প্রান্ত হইতে যে দেশ দেখিতে পাইয়াছিলাম, সেই দেশে কোন রকমে যাওয়া যায় কি না, এই চিন্তা সর্ব্বদাই আমার মনে আসিত। ভাঙ্গা জাহাজের যে নৌকাখানি ঝড়ে সমুদ্রের কিনারায় আনিয়া উল্টাইয়া ফেলিয়াছিল, সেই খানি ঠেলিয়া ঠুলিয়া সমুদ্রে নামাইবার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিলাম, কিন্তু কিছুই করিতে পারিলাম না। নৌকায় চড়িয়া সমুদ্র পার হইয়া, সেই দেশে যাইবার ঝোঁক এত চাপিল যে, মস্ত একটা দেবদারু গাছ কাটিয়া ফেলিলাম, এবং কয়েক মাস খুব খাটিয়া একখানি বড় নৌকা তৈয়ারি করিলাম। কিন্তু আগে এ বুদ্ধি হয় নাই যে, এত বড় নৌকা আমি একা কেমন করিয়া ঠেলিয়া জলে নামাইব! এত দিনের পারশ্রম বৃথাই হইল। এমনি করিয়া আমার প্রবাসের চারি বৎসর কাটিয়া গেল। এই চারি বৎসরে আমার অনেক জিনিষ ফুরাইয়া এবং নষ্ট হইয়া গেল। কালি ফুরাইল, বিস্কিট ফুরাইল, কাপড়চোপড় ছিঁড়িয়া গেল। আমি যে সব জন্তু শিকার করিয়াছিলাম, তাহাদের চামড়া শুকাইয়া রাখিয়াছিলাম। সেই লোম সুদ্ধ চামড়া দিয়া প্যাণ্ট, কোট ও টুপি তৈয়ারি করিলাম। তার পর রৌদ্র, বৃষ্টি নিবারণের জন্য একটা ছাতা—অনেক কষ্টে অনেক দিন ধরিয়া প্রস্তুত করিয়া লইলাম। কোনও রকমে দিন কাটিতে লাগিল। পাঁচ বৎসরের মধ্যে বিশেষ কোনও ঘটনা ঘটিল না। নৌকায় চড়িয়া সমুদ্রযাত্রার প্রলোভন ছাড়িতে পারি নাই। একখানি ডোঙ্গা তৈয়ারি করিলাম। বালি খুঁড়িয়া খাল কাটিয়া, সমুদ্রের জল ডোঙ্গা পর্য্যন্ত আনিয়া, সহজেই সেখানা টানিয়া সমুদ্রে নামাইলাম। এই ভোঙ্গায় চড়িয়া দ্বীপের চারিদিকে ঘুরিয়া আসিবার সখ হইল। একটি মাস্তুল ও পাল লাগাইয়া, আবশ্যকীয় জিনিষপত্র ও কিছু খাদ্যসামগ্রী নৌকায় তুলিলাম, এবং আমার স্বহস্তনির্ম্মিত অপূর্ব্ব ছত্রটি মস্তকে দিয়া নৌকা চালাইতে আরম্ভ করিলাম। দেখিলাম, নৌকাখানি চমৎকার চলে। প্রায়ই এই নৌকায় চড়িয়া সমুদ্রে বেড়াইতাম, কিন্তু উপকূল হইতে বেশী দূরে যাইতে সাহস হইত না।

 অবশেষে স্থির করিলাম, একবার দ্বীপটি প্রদক্ষিণ করিয়া আসিতে হইবে। বন্দুক, গুলি-গোলা, বারুদ, খাদ্য সামগ্রী ইত্যাদি লইয়া নৌকা ছাড়িলাম। কিছুদূর গিয়াই দেখিলাম, কিনারা হইতে সমুদ্রের মধ্যে অনেক দূর পর্য্যন্ত উঁচু পাথরের ঢিবি রহিয়াছে; কাজেই আমাকে বাধ্য হইয়া, কিনারা হইতে অনেক দূর দিয়া নৌকা লইয়া যাইতে হইল। গভীর জলে যাইতেই, প্রবল স্রোতে নৌকা অনেক দূরে গিয়া পড়িল। বাতাস ছিল না যে পাল খাটাইয়া নৌকা চালাই। তখন সমুদ্রে নৌকাডুবি হইয়া মরিব বলিয়া ভয় হইল। দুপুর বেলা অল্প একটু বাতাস বহিতে লাগিল, সেই বাতাসে পাল খাটাইয়া কিনারায় আসিলাম। রাত্রিটা কাটাইয়া সকাল বেলা সমুদ্রের ধার দিয়া হাঁটিয়া চলিলাম। নৌকা খানি একটি নিরাপদ স্থানে রাখিয়া—আমার সেই ছাতা মাথায় দিয়া, বন্দুক ঘাড়ে করিয়া পদব্রজে যাত্রা করিলাম। সন্ধ্যার সময় আমার কুঞ্জভবনে পৌঁছিলাম। শরীর অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছিল,—শুইয়া পড়িলাম। তৎক্ষণাৎ গভীর নিদ্রা হইল। হঠাৎ স্বপ্নের মত মনে হইল, কে যেন আমার নাম ধরিয়া ডাকিতেছে। ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল; স্পষ্ট শুনিতে পাইলাম “রবিন্সন্‌ ক্রুসো, ক্রুসো, রবিন্সন্, বেচারি রবিন,—তুমি কোথায়? কোথায় ছিলে এতক্ষণ?” আমার ভূতের ভয় ছিল না বলিয়া গর্ব্ব ছিল, কিন্তু আজ ভূতের ভয়ে সমস্ত শরীরে কাঁটা দিল! একবার চোখ মেলিয়া দেখিতে পাইলাম, আমার তোতা পাখীটা বেড়ার উপরে বসিয়া আছে। তখনই বুঝিতে পারিলাম, পাখীটাই আমার নাম ধরিয়া ডাকিতেছিল। সে কেমন করিয়া এখানে আসিল, ভাবিয়া বিস্মিত হইলাম। আমি পাখীর নাম ধরিয়া ডাকিতেই, সে উড়িয়া আসিয়া আমার হাতের উপর বসিল। সে আমাকে পাইয়া কতই আহ্লাদ প্রকাশ করিতে লাগিল। আমি তাহাকে সঙ্গে করিয়া বাড়ী লইয়া গেলাম। বারুদ ফুরাইয়া যাইতেছে দেখিয়া, আমার বড় ভাবনা হইল। বন্দুক দিয়া শিকার না করিয়া, অন্য উপায়ে বুনো ছাগল প্রভৃতি মারিবার কৌশল খুঁজিতে লাগিলাম। ফাঁদ পাতিয়া একটি বুড়ো ছাগল আর তিনটি ছাগলের ছানা ধরিলাম। বুড়ো ছাগলটার গোঁয়ারতামির জন্য তাহাকে ছাড়িয়া দিতে হইল। ছানা তিনটিকে দড়ি দিয়া বাঁধিয়া বাড়ী আনিলাম। তাহারা পোষ মানিল। ছাগল রাখিবার জন্য একটি জমী বেড়া দিয়া ঘিরিয়া লইলাম। দেড় বৎসরের মধ্যে আমার ১২টি ছাগল হইল। আরও দুই বৎসর পরে ছাগল, ছাগলী
মানুষের পায়ের ছাপ দেখিয়া চমকিয়া গেলাম।
আর ছাগলছানা সবশুদ্ধ প্রায় ৫০ টা হইল। তবুও ত অনেকগুলি খাইয়া ফেলিয়াছিলাম। এতদিন কেবল মাংসই খাইতাম, এখন ছাগলের দুধও খাইবার সুবিধা হইল। অনেক দুধ হইত; দুধ দিয়া মাখন, পনির প্রভৃতি সুখাদ্য প্রস্তুত করিতাম। অনেক দিন নৌকাযাত্রা করা হয় নাই; আমার সেই নৌকা খানির কথা মনে পড়িয়া গেল, এবং আবার নৌকায় চড়িয়া সমুদ্রে যাইতেও ইচ্ছা হইল। কিন্তু আগের বারের বিপদের কথা মনে পড়িতেই নিরস্ত হইলাম। একদিন দুপুর বেলা, আমার নৌকা যেদিকে ছিল, সেই দিকে বেড়াইতে গিয়া দেখিলাম, বালির উপরে মানুষের খালি পায়ের ছাপ রহিয়াছে। দেখিয়াই চমকিয়া গেলাম। বজ্রাহতের মত দাঁড়াইয়া রহিলাম। চারিদিকে চাহিলাম, কিছুই দেখিতে পাইলাম না। কান পাতিয়া রহিলাম, কিছুই শুনিতে পাইলাম না। সমুদ্রের ধার দিয়া পায়চারি করিতে লাগিলাম, আর কোথায়ও পায়ের দাগ দেখিলাম না। কেমন করিয়া সেখানে মানুষের পায়ের ছাপ পড়িল, অনেক কল্পনা জল্পনা করিয়াও ঠিক করিতে পারিলাম না। তারপর ভয়ে বাড়ীর দিকে ছুটিলাম। এক একবার নিজের পায়ের শব্দেই চমকিয়া উঠিতেছিলাম! মনে হইতেছিল, কে যেন তাড়া করিতেছে,—কিন্তু পিছন দিকে ফিরিয়া দেখিতেও সাহস হইল না! তিন দিন তিন রাত্রি আমি ভয়ে ঘরের বাহির হই নাই। তার পর বাহিরের দিকে উঁকি ঝুঁকি মারিয়া, সাহস করিয়া বাহির হইলাম। ক্রমে ভগ্ন ভাঙ্গিয়া গেল। ভাবিলাম, হয় ত নৌকা হইতে নামিবার সময় আমার নিজেরই পায়ের ছাপ পড়িয়াছিল। এই ভাবিয়া আবার সেই পায়ের ছাপ দেখিতে গেলাম। আস্তে আস্তে নিজের পা সেই দাগের উপর দিয়া দেখিলাম, পায়ের ছাপ আমার পায়ের চেয়ে অনেক বড়। আবার ভয়-ভাবনা হইল! নিশ্চয়ই এই দ্বীপে কোনও লোক আসিয়াছিল, অথবা এই দ্বীপের কোনও অংশে লোক বাস করে। ১৫ বছর এইখানে আছি, কই, কখনও কোনও মানুষের ছায়াও ত দেখিতে পাই নাই!

 আমার বাসগৃহের চারিদিকে একটি দৃঢ় প্রাচীর নির্ম্মাণ করিয়াছিলাম। এই প্রাচীরে সাতটি ছিদ্র করিয়া আমার সাতটি বন্দুক পাতিলাম। দুই মিনিটের মধ্যে এই সাতটি বন্দুক ছুড়িবার সুযোগ করিয়া রাখিলাম। এই দেওয়াল গাঁথিতে অনেক পরিশ্রম, অনেক সময় লাগিয়াছিল। প্রাচীরের বাহিরে অনেক গাছ লাগাইয়াছিলাম। সেই ঘন গাছের সারি আমার বাসস্থানকে ঢাকিয়া রাখিয়াছিল,—এখানে যে লোকালয় আছে, তাহা কোনও শত্রুর বুঝিবার সাধ্য ছিল না।

 একদিন একটা পাহাড়ের উপর দাঁড়াইয়া আছি, এমন সময় মনে হইল, সমুদ্রের মধ্যে অনেক দূরে একখানি নৌকা দেখা যাইতেছে। পাহাড় হইতে নামিয়া সমুদ্রতীরে গিয়া, নৌকা দেখিতে পাইলাম না বটে, কিন্তু সেখানে মড়ার মাথার খুলি এবং মানুষের হাড় দেখিয়া ভয়ে আড়ষ্ট হইয়া গেলাম! তারপর এক যায়গায় আগুন জ্বালান হইয়াছিল, তাহার চিহ্ন দেখিতে পাইলাম। অনুমান করিলাম; এইখানে বসিয়া নরমাংসাশীরা মানুষ মারিয়া খাইয়াছে। এই সব কথা ভাবিতে ভাবিতে ভয়ে প্রাণ উড়িয়া গেল! তাড়াতাড়ি বাড়ী পালাইলাম। বাড়ী গিয়া রাত দিন এই কথাই ভাবিতে লাগিলাম। ভাবিয়া ভাবিয়া ঠিক করিলাম, এই নিষ্ঠুর নরমাংসভোজীদের জন কয়েককে কোন উপায়ে বধ করিতে হইবে, এবং যে লোকগুলিকে উহারা কাটিয়া খাইবার জন্য এখানে লইয়া আসিবে, তাহাদিগকে উদ্ধার করিতে হইবে। পাহাড়ের একটী যায়গায় অনেকগুলি গাছ ছিল, সেখানে লুকাইয়া থাকিয়া সমুদ্রের ধারে কোথায় কি হইতেছে, দেখিবার সুবিধা ছিল। ঠিক করিলাম, অনেকগুলি বন্দুকে গুলি ভরিয়া ঐ যায়গায় লুকাইয়া থাকিব, আর সেই মানুষের মাংসভোজী রাক্ষসরা আসিলেই গুলি করিয়া মারিব। কিন্তু নিজের প্রাণের ভয় এত বেশী হইল যে, একটা বন্দুক ছুড়িতে, এমন কি, একখানি কাঠ কাটিতেও সাহস হইল না, পাছে সেই শব্দে শত্রুরা আমাকে খুঁজিয়া বাহির করে! আগুন জ্বালিলে পাছে তাহারা ধোঁয়া দেখিয়া আমার বাসস্থান ঠিক করিতে পারে, এইভয়ে আগুন জ্বালিলাম না। যাহা হউক, আমি একটা পাহাড়ের তলায় সুড়ঙ্গের মত গুহা দেখিতে পাইলাম। তাহার মুখটা খুব প্রশস্ত, মুখের কাছে দাঁড়াইয়া উঁকি মারিয়া দেখিলাম—গুহাটি বেশ বড়। গুহার মধ্যে ঢুকিয়া কত দূর যাওয়া যায়—দেখিবার জন্য বড় কৌতূহল হইল। একটুখানি ঢুকিয়াই দেখিলাম, কাহার যেন দুইটি চোখ জ্বল জ্বল করিতেছে! অমনি ভয়ে কাঁপিতে কাঁপিতে গুহা হইতে তাড়াতাড়ি বাহিরে আসিলাম। উপরে আসিয়া একখানি জ্বলন্ত কাঠ হাতে করিয়া, সাহসপূর্ব্বক আবার গুহার মধ্যে ঢুকিলাম। তিন পা ফেলিতে না ফেলিতেই মনে হইল, কে যেন দারুণ যন্ত্রণায় জোরে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিতেছে। তারপরেই অস্পষ্ট একটা স্বর শুনিলাম এবং আবার দীর্ঘনিশ্বাস পড়িল। অনন্ত কাঠখানি উঁচু করিয়া ধরিয়া অগ্রসর হইয়া দেখিলাম, প্রকাণ্ড একটা বুড়ো ছাগল শ্বাস টানিতেছে, তাহার জীবন শেষ হইয়া আসিয়াছে। তাহাকে শান্তিতে মরিতে দিয়া, আমি গুহার সুড়ঙ্গপথে অগ্রসর হইতে লাগিলাম। খানিক দূর গিয়া সোজা ভাবে চলিতে না পারিয়া, হামাগুড়ি দিয়া চলিলাম, কিন্তু আলোর অভাবে আমাকে ফিরিয়া আসিতে হইল। পরদিন ছয়টি বড় বড় বাতি লইয়া আবার সেই গুহার মধ্যে ঢুকিলাম। অনেক দূর গিয়া একটি সুন্দর নিরাপদ স্থান আবিষ্কার করিলাম। কল্পনা করিতে লাগিলাম, প্রাচীনকালের দৈত্যের মত আমিও পর্ব্বতগুহায় ও পাতালপুরীতে বাস করিতেছি! মানুষের সাধ্য নাই যে, আমার সন্ধান পায়। তখন আমার ভরসা হইল, পাঁচশত অসভ্য লোক আমার সন্ধানে ঘুরিয়া বেড়াইলেও, আমাকে খুঁজিয়া বাহির করিতে পারিবে না।

 ডিসেম্বর মাসে একদিন খুব ভোরের বেলা বেড়াইতে বেড়াইতে দেখিলাম, প্রায় দুই মাইল দূরে—যেখানে পূর্ব্বে মানুষের হাড় দেখিয়াছিলাম—সেখানে আগুন জ্বলিতেছে। ভাবিলাম, অসভ্যেরা আগুন জ্বালাইয়া, মানুষ পোড়াইয়া খাইবার আয়োজন করিতেছে। যদি দেখিতে পায়, তাহারা আমাকেও ধরিয়া লইয়া আগুনে পোড়াইয়া খাইবে! ভয়ে আধমরা হইয়া আমি তাড়াতাড়ি আমার গুহার মধ্যে লুকাইলাম। যদি আবশ্যক হয়, আত্মরক্ষার জন্য আমি বন্দুক ও পিস্তলগুলি ভরিয়া রাখিলাম। ঈশ্বরে আত্মসমর্পণ করিয়া, আগ্রহ সহকারে তাঁহার নিকট প্রার্থনা করিলাম যে, বর্ব্বরদিগের হাত হইতে যেন রক্ষা পাই। এই অবস্থায় দুই ঘণ্টা কাটাইলাম। বাহিরে কি হইতেছে, জানিবার জন্য অস্থির হইয়া উঠিলাম, কিন্তু কাহাকে পাঠাইয়া খবর আনিব?—আমার ত আর গুপ্তচর ছিল না! মই পাতিয়া গুহার পাশের পাহাড়ে চড়িলাম, পাহাড়ের মাথায় উঠিয়া দূরবীক্ষণ লাগাইয়া, সেই যায়গা খুঁজিতে লাগিলাম। দেখিলাম, অগ্নিকুণ্ডের চারিদিকে আট নয় জন উলঙ্গ বর্ব্বর বসিয়া আছে, আর দুইখানি ডোঙ্গা সমুদ্রের ধারে বালির উপর টানিয়া তুলিয়া রাখিয়াছে। তাহারা একটু পরেই নাচিতে আরম্ভ করিল, তার পর জোয়ার আসিতেই তাহারা নৌকায় উঠিয়া উহা ছাড়িয়া দিল। তাহারা যাই চলিয়া গেল, অমনি আমি দুইটী বন্দুক ঘাড়ে করিয়া, দুইটী পিস্তল আর একখানি মস্ত তরোয়ার কোমরবন্ধে ঝুলাইয়া সেইখানে গেলাম। বালির উপরে দাগ দেখিয়া টের পাইলাম, আরও তিনখানি নৌকা আসিয়াছিল। সমুদ্রের দিকে চাহিয়া দেখিলাম, অনেকদূরে সেই নৌকাগুলি নাচিতে নাচিতে, অসভ্যদের বাসস্থানের দিকে চলিয়া যাইতেছে। তাহার পর সেই অগ্নিকুণ্ডের পাশে মানুষের হাড়গোড় প্রভৃতি দেখিয়া শিহরিয়া উঠিলাম! বুঝিলাম, এই অসভ্যেরা অনেক দিন পরে পরে এইখানে আসিয়া পৈশাচিক কাণ্ড করে। এই রাক্ষসেরা কবে হঠাৎ আসিয়া আমাকেই খাইয়া ফেলিবে, এই ভয় লইয়া রাতদিন কাটাইতে লাগিলাম।

 মে মাসের মাঝামাঝি একদিন ভয়ঙ্কর ঝড় উঠিল, ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাইতে লাগিল, কড় কড় করিয়া বাজ পড়িতে লাগিল। আমি তখন গম্ভীরভাবে বাইবেল পড়িতেছিলাম; এমন সময়, হঠাৎ সমুদ্র হইতে তোপধ্বনি হইল। আমি তাড়াতাড়ি বাহিরে গিয়া পাহাড়ের মাথায় উঠিলাম। আবার তোপের আওয়াজ শুনিতে পাইলাম। বুঝিলাম, কোনও জাহাজ বিপন্ন হইয়া সাহায্যের জন্য তোপধ্বনি করিতেছে। আমি জাহাজের লোকদিগকে সঙ্কেত করিবার জন্য, শুক্‌না কাঠ জড় করিয়া, পাহাড়ের মাথার উপরে এক প্রকাণ্ড অগ্নিকুণ্ড করিলাম। জাহাজের লোকেরা এই আগুন নিশ্চয়ই দেখিতে পাইয়াছিল, কারণ আগুন দাউ দাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠিতেই, অনেকবার বন্দুকের শব্দ হইল। আমি সমস্ত রাত্রি আগুন জ্বালাইয়া, পাহাড়ের মাথায় বসিয়া রহিলাম। পরদিন ভোরের বেলা সমুদ্রের দিকে চাহিয়া, অনেক দূরে জাহাজের মত কি একটা জিনিষ দেখিতে পাইলাম। পাহাড় হইতে নামিয়া, সমুদ্রের ধারে ঘুরিতে ঘুরিতে দেখিতে পাইলাম, জলমগ্ন পাহাড়ে ঠেকিয়া একখানি জাহাজ ভগ্নদশায় পড়িয়া আছে। জাহাজের লোকদের কি দশা হইল? তাহারা সকলেই মরিল, কি, কেহ কেহ বাঁচিল, কিছুই জানিতে পারিলাম না। কয়েক দিন পরে দেখিলাম, একটি বালকের মৃতদেহ উপকূলে পড়িয়া আছে। তাহার পকেটে দুইটি রৌপ্যমুদ্রা ও একটি তামাক খাইবার পাইপ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। চেহারা দেখিয়া ঠিক করিতে পারিলাম না যে, সে কোন্ জাতীয় লোক। এই মৃত বালকটির মুখের দিকে চাহিয়া চাহিয়া স্বদেশের কত বালক বালিকার কথা আমার মনে পড়িল! একবার মৃতদেহটি কোলে তুলিয়া লইলাম। একবার চুমো খাইয়া আস্তে আস্তে বালকটীকে বালির শয্যায় শোয়াইয়া রাখিলাম! সমুদ্র শান্ত হইলে, আমার নৌকায় চড়িয়া সেই ভাঙ্গা জাহাজের কাছে গেলাম। আমি কাছে যাইতেই, একটি কুকুর জাহাজ হইতে লাফাইয়া পড়িয়া, সাঁতরাইয়া আমার কাছে আসিল। আমি তাহাকে নৌকায় তুলিয়া লইয়া কিছু খাইতে দিলাম। জাহাজে উঠিয়া দেখিলাম, লোক জন কেহই নাই। জাহাজ হইতে দুইটি বাক্স ও আর দুই একটি জিনিষ নৌকায় তুলিয়া ল‍ইলাম। একটি বাক্স খুলিয়া কয়েকটি ভাল ভাল সার্ট, রুমাল ইত্যাদি কাপড় চোপড় পাইলাম। আর একটি বাক্সে অনেকগুলি স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রা গাইলাম, সে গুলি ভাল করিয়া লুকাইয়া রাখিলাম।

 সমুদ্রের ওপারে যে দেশ দেখিতে পাইয়াছিলাম, সেখানে যাইবার জন্য অস্থির হইয়া উঠিলাম। কিন্তু কে আমাকে পথ দেখাইয়া লইয়া যাইবে? ভাবিলাম, যে মানুষগুলিকে অসভ্যেরা মারিয়া খায়— তাহাদের একটিকে কোন রকমে উদ্ধার করিতে পারিলে, সেই আমার পথ-প্রদর্শক হইবে। অপেক্ষা করিতে লাগিলাম, আবার মনুষ্য-মাংস ভোজনের উৎসব করে আসে! অপেক্ষা করিতে করিতে দেড় বৎসর কাটিয়া গেল, তাহারা আসিল না। অবশেষে একদিন সকাল বেলা পাঁচখানা নৌকা আসিয়া তীরে লাগিল। আমি পাহাড়ে উঠিয়া দূরবীণ লাগাইয়া দেখিলাম, প্রায় ত্রিশজন লোক এক অগ্নিকুণ্ডের চারিদিকে ঘুরিয়া নৃত্য করিতেছে। কিছুক্ষণের পর তাহারা নৌকা হইতে দুইটি হতভাগ্য লোককে, বধ করিবার জন্য, টানিয়া আনিল, এবং দেখিতে দেখিতে তাহাদের একজনকে লগুড়াঘাতে ধরাশায়ী করিল। তারপর সেই লোকটিকে খাইবার আয়োজনে যখন সকলে ব্যস্ত হইয়া উঠিল, সেই সুযোগে অপর লোকটি উর্দ্ধশ্বাসে দৌড় দিল। দৌড়াইতে দৌড়াইতে সে আমার দিকেই আসিতে লাগিল। অমনি তিনজন অসভ্য তাহার পেছনে পেছনে তাড়া করিল। তখন মনে মনে খুব ভয় হইলেও, আমি শক্ত হইয়া দাঁড়াইলাম! পলাতক ব্যক্তি প্রাণের ভয়ে এত জোরে দৌড়াইতেছিল যে, তাহাকে ধরিবার আর সম্ভাবনা রহিল না। আমি তাহাকে চীৎকার করিয়া অভয় দিয়া, আমার কাছে আসিবার জন্য সঙ্কেত করিলাম। যে তিনজন লোক পশ্চাদ্ধাবন করিতেছিল তাহাদের একজন অনেক পেছনে পড়িয়াছিল। আর দুই জনের মধ্যে যে আগে ছিল, তাহার কাছে দৌড়াইয়া গিয়া, আমি বন্দুকের আঘাতে তাহাকে মাটিতে ফেলিয়া দিলাম। ইহা দেখিয়া দ্বিতীয় ব্যক্তি ভয়ে থমকিয়া দাঁড়াইল; আমি দৌড়াইয়া তাহার দিকে অগ্রসর হইলাম। কাছে গিয়া দেখিলাম, সে একটা ধনুকে তীর লাগাইয়া আমাকে লক্ষ্য করিতেছে। বাণ ছুড়িবার আগেই আমি বন্দুক ছুড়িয়া তাহাকে মারিয়া ফেলিলাম। পলাতক
আমার পা তুলিয়া মাথায় দিল।
অসভ্য ব্যক্তি বন্দুকের শব্দ শুনিয়া ও ধুঁয়া উড়িতে দেখিয়া অবাক হইয়া রহিল। আমি হাতছানি দিয়া তাহাকে আমার কাছে আসিতে ইঙ্গিত করিলাম। সে ভয়ে কাঁপিতে লাগিল। পুনরায় সঙ্কেত করিলাম, এবার সে ধীরে ধীরে অগ্রসর হইতে লাগিল এবং এক একবার হাঁটু গাড়িয়া বসিতে লাগিল। তাহার প্রাণ রক্ষা করিয়াছি বলিয়া, সে এই রকমে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতে লাগিল। আমি মৃদু হাসিয়া মাথা নাড়িয়া, তাহাকে আরও কাছে আসিতে বলিলাম। অবশেষে সে আমার সম্মুখে আসিয়া জানু পাতিয়া মৃত্তিকা চুম্বন করিল, আর মাটিতে মাথা ঠেকাইয়া আমার পা তুলিয়া মাথায় দিল। বুঝিলাম, সে চিরকালের জন্য আমার বিশ্বস্ত দাস হইয়া থাকিবে বলিয়া শপথ করিতেছে। আমি তাহাকে হাতে ধরিয়া তুলিয়া, আশা ভরসা দিয়া উৎসাহিত করিলাম। যে লোকটিকে বন্দুকের আঘাতে ভূমিসাৎ করিয়াছিলাম সে একেবারে মরে নাই, আবার চেতনা পাইয়া উঠিয়া বসিতেছিল, তখন আমার এই অনুগত দাস আমাকে কি যেন বলিল। তাহার ভাষা বুঝিতে পারিলাম না বটে, কিন্তু প্রায় পঁচিশ বৎসর পরে মানুষের কথা কি মিষ্টই লাগিল! আমি যখন দেখিলাম, সেই অর্দ্ধমৃত লোকটা উঠিয়া বসিয়াছে, তখন তাহাকে লক্ষ্য করিয়া বন্দুক তুলিলাম। কিন্তু আমার এই নূতন ভৃত্য তাড়াতাড়ি আমার নিকট হইতে তরবারী চাহিয়া লইয়া, তাহার সেই শত্রুর নিকট দৌড়াইয়া গেল, এবং এক কোপে তাহার মাথা কাটিয়া ফেলিল। তারপর মাথাটি হাতে করিয়া নাচিতে নাচিতে আমার কাছে আসিয়া, হাসিতে হাসিতে তরোয়ার আর সেই কাটামুণ্ড আমার পায়ের কাছে রাখিল!

 তাহার পর সে ইসারায় জানাইল যে, মৃতদেহ দুইটির গোর দিবে। গোর দেওয়া হইলে, তাহাকে আমার গুহায় লইয়া গিয়া রুটী, কিস্‌মিস্‌ আর জল খাইতে দিলাম। তারপর তাহাকে বিশ্রম করিবার জন্য শুইতে বলিলাম। বেচারা শুইয়াই ঘুমাইয়া পড়িল। লোকটি বেশ সুস্থ, তাহার বয়স প্রায় ছাব্বিশ বৎসর; মুখে সাহসের চিহ্ন, মাথায় কাল কাল লম্বা চুল; তাহাকে আমার বেশ লাগিল। আমি ছাগলের দুধ দুহিতেছিলাম, এমন সময়ে আমার ভৃত্য, ঘুম হইতে উঠিয়া আসিয়া, আমার পায়ে মাথা রাখিয়া, ভাবে প্রকাশ করিল যে, সে আমাকে নানা রকমে সেবা করিয়া সুখে রাখিবে। আমি তাহাকে আমার ভাষা একটু একটু করিয়া শিখাইতে লাগিলাম। প্রথমে তাহাকে বুঝাইলাম, তাহার নাম “শুক্র”। শুক্রবারে তাহাকে উদ্ধার করিয়াছিলাম, এজন্য তাহার নাম “শুক্র” রাখিলাম। “প্রভু”—কথাটি শিখাইয়া বুঝাইলাম, আমার নাম “প্রভু”। “হা” ও “না”—কথা দুইটি শিখাইয়া হাতে কলমে তাহার অর্থ বুঝাইয়া দিলাম। তাহাকে কাপড় পরা শিখাইয়া, ভদ্রলোক সাজাইয়া আমার সঙ্গী করিলাম। তারপর তাহাকে সঙ্গে লইয়া পাহাড়ের মাথায় উঠিয়া দূরবীণ লাগাইয়া দেখিলাম, সেই বর্ব্বরেরা চলিয়া গিয়াছে। তাহাদের দুইজন সঙ্গী কোথায় গেল, তাহার আর খোঁজ করিল না।

 আমার ভৃত্য “শুক্রের” হাতে তরোয়ার, ধনুক, তীর ও একটি বন্দুক দিয়া, এবং আমি নিজে দুইটি বন্দুক লইয়া যেখানে “নরবলী” হইতেছিল সেই দিকে যাত্রা করিলাম। সেখানে উপস্থিত হইয়া, ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখিলাম! আমার রক্ত শীতল হইয়া গেল, মন অবসন্ন হইয়া পড়িল! নরপিশাচেরা মানুষের হাত, পা হইতে মাংস ছিড়িয়া খাইয়া, চারিদিকে সেইগুলি ছড়াইয়া ফেলিয়াছে। “শুক্র” আমাকে বুঝাইয়া দিল যে, তাহাদের চারি জনকে মারিয়া খাইবার আয়োজন করা হইয়াছিল, তাহার মধ্যে কেবল সে একেলা, আমার দয়াতেই বাঁচিয়াছে।

 আমি “শুক্র”কে দিয়া সমস্ত হাড় এক যায়গায় জড় করিয়া, আগুনে পোড়াইয়া ছাই করিয়া দিলাম। “শুক্র” যখন হাড়গুলি কুড়াইতেছিল, তখন লোলুপ দৃষ্টিতে দেখিতেছিল, তাহাতে মাংস লাগিয়া আছে কি না! আমি বন্দুক তুলিয়া তাহাকে বুঝাইয়া দিলাম যে, মানুষের মাংসের লোভ না ছাড়িলে মারিয়া ফেলিব।

 “শুক্র”কে ছাগলের চাম্‌ড়ার পোষাক করিয়া দিলাম। মনিবের মত পোষাক হওয়াতে যে বড় খুসী হইল। তাহার জন্য একটা ছোট তাঁবু করিয়া দিয়াছিলাম, সেখানে সে শুইত। রাত্রে সে যাহাতে আমার কাছে হঠাৎ না আসিতে পারে, সে বিষয়ে আমি বিশেষ সাবধান হইয়াছিলাম। কি জানি ঘুমন্ত অবস্থায় আমাকে মারিয়াই যদি সে মানুষের মাংস খাবার সাধ মিটায়! কিন্তু এমন প্রভুভক্ত, স্নেহপরায়ণ সরল ভৃত্যকে অবিশ্বাস করা আমার অন্যায় হইয়াছিল। এই বুদ্ধিমান্ ভৃত্যকে সহজেই আমার ভাষা শিখাইলাম, সব কাজ কর্ম্ম শিখাইলাম। সে আমার সকল কাজের সহায় হইয়া উঠিল। দুই তিন দিন পরে মনে হইল, “শুক্র” যদি একবার অন্য মাংসের সুস্বাদ পায়, তাহা হইলে তার নরমাংস ভোজনের প্রবৃত্তি দূর হইতে পারে। “শুক্র”কে লইয়া শিকারে বাহির হইলাম। একটী ছাগল ছানা দেখিতে পাইয়াই আমি গুলি করিয়া তাহাকে মারিলাম। হঠাৎ বন্দুকের শব্দ শুনিয়া “শুক্র” ভয়ে কাঁপিতে কাঁপিতে মাটিতে পড়িয়া গেল। কি হইয়াছে দেখিবার জন্য কাছে যাইতেই, সে উঠিয়া আমার পা জড়াইয়া ধরিল এবং কাঁদিতে কাঁদিতে বলিল, “প্রভু, আমাকে মারিও না।” আমি তাহার হাত ধরিয়া তুলিয়া হাসিতে লাগিলাম এবং আঙ্গুল দিয়া মরা ছাগলছানাটিকে দেখাইয়া বলিলাম, “যা, ঐটিকে নিয়ে আয়।” বলবামাত্র সে লাফাইতে লাফাইতে ছানাটিকে লইয়া আসিল, এবং যখন বুঝিল, সেই ছানাটিকেই মারিবার জন্য বন্দুক ছোড়া হইয়াছিল, তখন আমার এই সরল ভৃত্য সব কটি দাঁত বাহির করিয়া হাসিতে লাগিল! তাহার পর একটি তোতাপাখী মারিলাম। আমার ক্ষমতা ও বন্দুকের শক্তি দেখিয়া “শুক্র” হাঁ করিয়া আমাকে আর বন্দুককে ভয় ও ভক্তির সহিত দেখিতে লাগিল। সে আমাকে আর বন্দুককে দেবতা ভাবিয়া পূজা করিতে চাহিয়াছিল। সে অনেকদিন পর্য্যন্ত বন্দুক ছুঁইতে সাহস করে নাই; চুপি চুপি বন্দুকের কাছে গিয়া যোড়হাত করিয়া প্রার্থনা করিত, “দেবতা, আমাকে বধ করিও না!”