বিষয়বস্তুতে চলুন

রবিন্সন্‌ ক্রুসো/দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

দুপুর বেলা সমুদ্র বেশ শান্ত হইয়াছে এবং ভাঁটায় জল সরিয়া গিয়াছে। আমি ঠিক করিলাম, যদি পারি—জাহাজে একবার উঠিব। তার পর কাপড় চোপড় খুলিয়া সাঁতরাইয়া জাহাজের কাছে গেলাম এবং একটা কাছি ধরিয়া জাহাজে উঠিলাম। দেখিলাম, খাদ্য সামগ্রী কিছুই নষ্ট হয় নাই। ক্ষুধাও যথেষ্ট ছিল, পকেট ভরিয়া বিষ্কিট লইলাম, আর বিষ্কিট খাইতে খাইতে জাহাজের জিনিষপত্র খুঁজিতে লাগিলাম। আমার প্রয়োজনীয় অনেক জিনিষ এই জাহাজে ছিল। সেগুলি বহিয়া লইবার জন্য জাহাজ হইতে কয়েক খানি তক্তা জলে ভাসাইয়া, দড়ি দিয়া বাঁধিয়া একখানি ভেলা তৈয়ারি করিলাম। নাবিকদের তিনটী বাক্স খালি করিয়া তাহাতে রুটী, চাউল, পনির, পাঁঠার মাংস, মদ ইত্যাদি ভরিলাম। কতকগুলি কাপড় চোপড়, এক বাক্স ছুতরের অস্ত্র শস্ত্র, গোলাগুলি, বারুদ, দুইটী বন্ধুক, দুইটী পিস্তল, মরিচা পড়া দুইখানি পুরাতন তলোয়ার ইত্যাদি জিনিষ ভেলায় বোঝাই করিয়া, কষ্টে সৃষ্টে সমুদ্রতীরে লইয়া আসিলাম। ভেলা হইতে জিনিষ পত্র নামাইয়া, বাক্স আর তক্তা দিয়া রাত্রিবাসের উপযোগী মোটামুটি একটা কুটীর তৈয়ারি করিলাম। সেই দ্বীপটি অনুর্ব্বরা ও লোকালয় শূন্য। অনেক পাখী দেখিলাম, বাজের মত একটা পাখী বন্দুক দিয়া মারিলাম কিন্তু তাহার মাংস খাওয়া গেল না। আমি আর একবার সেই জাহাজে গিয়া, ভেলা বোঝাই করিয়া, বিছানা, জাহাজের একটা পাল ও আরও অনেক জিনিষ পত্র লইয়া আসিলাম। আসিয়া দেখিলাম, আমার একটা বাক্সের উপর এক বুনো বিড়াল বসিয়া আছে। আমি কাছে যাইতেই সে দৌড়াইয়া পলাইল এবং একটু দূরে গিয়া চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। আমি তাহার কাছে এক টুক্‌রা বিস্কিট ছুড়িয়া দিলাম, বিস্কিট টুকু খাইয়া সে আবার দৌড়াইয়া পলাইল। আমি পাল্‌ আর কয়েকটি খুঁটি দিয়া একটা ছোট খাটো তাঁবু তৈয়ারি করিলাম, এবং আমার যথাসর্ব্বস্ব তাহার ভিতরে আনিয়া রাখিলাম। ইহার পর হইতে আমি প্রতিদিনই একবার করিয়া সেই জাহাজে গিয়া রুটি, চিনি, ময়দা, দড়ি, ছুরি, কাঁটা, টাকা কড়ি ইত্যাদি যাহা পাইতাম, লইয়া আসিতাম।


ছোট খাটো তাঁবু তৈয়ারী করিয়া যথাসর্ব্বস্ব ভিতরে আনিয়া রাখিলাম।
 এমনি করিয়া কয়েকদিন কাটিয়া গেল, তার পর একদিন ঝড় আরম্ভ হইল,—সারারাত্রি ভীষণ ঝড় চলিল। সকাল বেলা তাঁবু হইতে সমুদ্রের দিকে চাহিয়া সেই জাহাজখানি আর দেখিতে পাইলাম না। তখন আমার থাকিবার মত একখানি বাড়ী তৈয়ারি করিবার জন্য, উপযুক্ত জায়গা খুঁজিতে খুঁজিতে, একটা পাহাড়ের পাশে অল্প একটু সমতল স্থান দেখিতে পাইলাম। সেই স্থানটি নিরাপদ এবং সেখানে রৌদ্রের তাপ কম লাগিবে দেখিয়া, স্থির করিলাম যে, সেই খানেই আমার তাঁবু খাটাইব। তাঁবু খাটাইয়া দেখিলাম, একপাশে পাহাড়টাই দেয়ালের কাজ করিয়াছে; অন্যদিকে সারি সারি খুঁটি পুতিয়া, কাছি দিয়া বাঁধিয়া বেশ শক্ত উঁচু বেড়া তৈয়ারি করিলাম। কোনও বন্যুপশু কি মানুষের সেই বেড়া ফাঁক করিয়া, কি ডিঙ্গাইয়া আসিবার সাধ্য রহিল না। আমি একখানি মই ফেলিয়া ভিতরে যাইতাম এবং নামিবার সময় মইখানি তুলিয়া লইতাম, এই রকমে ছোট খাটো একটা দুর্গ তৈয়ারি করিয়া, তাহার মধ্যে আমার সমস্ত জিনিষ পত্র রাখিলাম এবং কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁবুর পিছনে পাহাড়ের গায়ে একটা গুহা প্রস্তুত করিতে আরম্ভ করিলাম। আমি বন্দুক লইয়া প্রতিদিনই শিকারে বাহির হইতাম। একদিন একটা ছাগ্‌লী গুলি করিয়া মারিলাম, একটি ছোট ছানা তাহার পাশেই ছিল। আমি যখন মরা ছাগ্‌লীটাকে কাঁধে করিয়া চলিলাম, তখন ছানাটাও আমার পিছনে পিছনে আমার বাড়ী পর্য্যন্ত আসিল। তাহাকে ঘাস খাইতে দিলাম, খাইল না, আমি দেখিলাম, সে না খাইয়াই মরিয়া যাইবে। তাই আমি দয়া করিয়া তাহাকেও মারিয়া খাইলাম।

 কিছুদিন এই দ্বীপে বাস করার পর আমার মনে হইল, আমি মাস, তারিখ, বার, সবই ভুলিয়া যাইব। এমন কি “রবিবার” পর্য্যন্ত ঠিক করিতে পারিব না। এই ভাবিয়া আমি একখানি বড় চৌকা কাঠ পুতিয়া, তাহার গায়ে এই কথাগুলি খুদিয়া রাখিলাম, “আমি ১৬৫৮ খুঃ অব্দের ৩০শে সেপ্টেম্বর বৃধবার এইখানে আসিয়াছি।” তারিখ ও বার ঠিক করিবার জন্য কাঠের গায়ে ছুরি দিয়া দাগ কাটিলাম, রবিবারের চিহ্ন বড় করিয়া দিলাম। আমি জাহাজ হইতে যে সব জিনিষ আনিয়াছিলাম, তাহার মধ্যে কালী, কলম, কাগজ, তিনখানি বাইবেল, রুলার, কম্পাস ইত্যাদি যন্ত্রও ছিল এবং জাহাজের দুইটি বিড়ালকেও আমি উদ্ধার করিয়াছিলাম। আর একটি কুকুর সাঁতরাইয়া আমার সঙ্গে আসিয়াছিল; সে আমার বিশ্বস্ত ভূত্য হইয়া উঠিয়াছিল। দেড় বৎসর পরিশ্রমের পর, আমি পাহাড়ের গায়ের সেই গুহাটিকে কাটিয়া বড় করিলাম এবং জিনিষ পত্র রাখিবার জন্য বড়় বড় তাক তৈয়ারি করিলাম। জাহাজ হইতে যে তক্তা আনিয়াছিলাম, তাহা দিয়া একখানি চেয়ার ও একটি টেবিল প্রস্তুত করিলাম। আমি প্রতিদিনের কাজ কর্ম্মের ইতিহাস লিখিতে আরম্ভ করিলাম;—লিখিতে লিখিতে কিছুদিন পরে কালী ফুরাইয়া গেল, কাজেই আমার দৈনিক কার্য্যের ইতিহাস লেখা বন্ধ হইয়া গেল। আমি এইখানে সেই লিখিত বৃত্তান্ত হইতে কিছু কিছু উদ্ধৃত করিতেছি।—

 ১৮ই নবেষ্বর;—আজ বনের ভিতর খুঁজিতে খুঁজিতে এক রকম কাঠ দেখিতে পাইলাম, তাহা লোহার মত শক্ত। অনেক পরিশ্রম করিয়া এবং কুড়ালখানি নষ্ট করিয়া সেই কাঠ হইতে একটা টুকুরা কাটিয়া লইলাম। এমন ভারি কাঠ যে, সেই ছোট টুক্‌রাখানি আনিতেই আমার বিলক্ষণ কষ্ট হইয়াছিল। অল্প অল্প করিয়া সেই কাঠ চাঁছিয়া ছুলিয়া কোদালের মত করিয়া গড়িয়া তুলিলাম। এই লোহার মত শক্ত কাঠের কোদাল পরে আমার খুব কাজে লাগিয়াছিল।

 ২৭শে ডিসেম্বর—একটি ছাগলের ছানা মারিলাম, আর একটিকে খোঁড়া করিয়া দড়ি দিয়া বাঁধিয়া বাড়ী আনিলাম। বাড়ী আনিয়া তাহার খোঁড়া পা পাতলা তক্তার টুক্‌রা দিয়া বাঁধিয়া দিলাম। যত্ন করাতে ছাগলটা বাঁচিয়া গেল, তাহার পা-ও ভাল হইয়া গেল। তাহাকে সেবা করিতে করিতে সে আমার পোষ মানিয়াছিল।

 ২রা জানুয়ারী—আমার কুকুরটাকে বুনো ছাগল দেখাইয়া লেলিয়ে দিলাম, ছাগলগুলিও কুকুরকে আক্রমণ করিবার জন্য ফিরিয়া দাঁড়াইল। বুদ্ধিমান কুকুর তাহার বিপদ বুঝিতে পারিয়া সরিয়া দাঁড়াইল। ছাগলের কাছে ঘেঁসিতে সাহস করিল না।

 ৩রা জানুয়ারী—কেহ আমাকে আক্রমণ করিতে পারে, এই ভয়টা আমার মন হইতে কিছুতেই দূর হইল না। আমার বাসস্থানের চারি দিকের বেড়া আরও শক্ত করিতে লাগিলাম। অনেক দিন ধরিয়া এই কাজ করিলাম।

 বনের ভিতর শিকার করিতে গিয়া এক রকম বুনো পায়রা দেখিলাম, তাহারা পাহাড়ের গায়ে গর্ত্ত করিয়া বাস করে। সেই পায়রার কয়েকটা ছানা পুষিলাম, কিন্তু তাহারা বড় হইয়াই পলাইয়া গেল।

 বাতির অভাব বড়ই বোধ করিতে লাগিলাম; কাজেই সন্ধ্যা লাগিলেই বিছানায় গিয়া শুইয়া থাকিতাম। তার পর ছাগলের চর্ব্বি সলিতায় লাগাইয়া এক রকমের প্রদীপ তৈয়ারি করিয়া লইলাম। আমার জিনিষ পত্র ঘাঁটাঘাঁটি করিতে করিতে, শস্যপূর্ণ ছোট একটা থলিয়া দেখিতে পাইলাম। খুলিয়া দেখিলাম, শ্য ইঁদুরে খাইয়া ফেলিয়াছে—কেবল তুঁষগুলি পড়িয়া আছে। থলিয়াটার দরকার হওয়াতে, তুঁষগুলি ফেলিয়া দিলাম। এক মাস পরে দেখিলাম, যেখানে তুঁষ ফেলিয়াছিলাম সেখানে কয়েকটি গাছ গজাইয়াছে, কয়েক দিন পরে দেখিয়া বিস্মিত হইলাম, যে সেগুলি বার্লির গাছ। তাহার কাছেই কয়েকটা ধানের গাছও হইয়াছিল। উপযুক্ত সময়ে বপন করা যাইবে মনে করিয়া, বার্লি ও ধানের বীজ রাখিয়া দিলাম।

 ১৬ই এপ্রিল—আমি আমার গুহার ভিতরে কাজে ব্যস্ত আছি, এমন সময়ে ছাদ হইতে মাটি পড়িল এবং হঠাৎ দুইটি খুঁটি ফাটিয়া গেল। গুহাটি ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে এই ভয়ে, আমি মই ফেলিয়া দেওয়াল ডিঙ্গাইয়া বাহিরে গেলাম এবং মাটিতে পা দিয়াই স্পষ্ট বুঝিতে পারিলাম, ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প হইতেছে। একটা ছোট পাহাড়ের খানিকটা ভাঙ্গিয়া হুড়্‌ হুড়্‌ করিয়া পড়িয়া গেল, সমুদ্রে তোলপাড় উপস্থিত হইল। বাতাস জোরে বহিতে লাগিল এবং আধ ঘণ্টার মধ্যেই ভীষণ ঝড় আরম্ভ হইল। কিছুক্ষণ পরে সাহস করিয়া গুহায় ঢুকিলাম। মনে মনে সঙ্কল্প করিলাম, খোলা জায়গায় একটি ছোট কুটীর তৈয়ারি করিতেই হইবে। নইলে একদিন না একদিন আমার জীবন্ত সমাধি হইবে।

 ২২শে এপ্রিল—অস্ত্রে শান দিবার যন্ত্রটা কৌশল করিয়া এমন ভাবে ঠিক করিয়া লইলাম যে, পা দিয়া ঢাকা চালাইব আর দুই হাতে স্বচ্ছন্দে কাজ করিবার সুবিধা হইবে।

 ২৮।২৯ শে এপ্রিল—এই দুইদিন সমস্ত দিন ধরিয়া আবার অস্ত্র-শস্ত্র গুলি শান দিলাম। আমার নিজের হাতের তৈয়ারি শান দিবার কলটি চমৎকার চলিতেছিল।

 ১লা মে—সমুদ্রের দিকে চাহিয়া দেখিলাম, ভূমিকম্পের ধাক্কায় ভাঙ্গা জাহাজখানি জল হইতে অনেকটা উপরে উঠিয়াছে এবং আগেকার চেয়ে বেশী ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। আমি ঠিক করিলাম, ভাঙ্গা জাহাজের কাঠ, তক্তা যাহা কিছু পাই, ভাঙ্গিয়া চুরিয়া সংগ্রহ করিয়া রাখিব।

 ৫ই মে—১৫ই জুন—প্রতিদিন ভাঙ্গা জাহাজে গিয়া, কিছু কিছু করিয়া কাঠ, তক্তা ও লোহার জিনিষ সংগ্রহ করিয়া উপকূলে লইয়া আসিতাম।

 ১৫ই জুন—আজ একটি বেশ বড় কচ্ছপ পাইলাম। ইহার মাংস খাইয়া তৃপ্তি বোধ হইল; চমৎকার সুস্বাদু—সুমিষ্ট।

 ১৯শে জুন— আজ শরীর বড় অসুস্থ হইয়া পড়িল। মাথার ভয়ঙ্কর যন্ত্রণা হইল, শীত করিয়া কাঁপাইয়া জ্বর আসিল। প্রায় একমাস এই কম্পজ্বর ভোগ করিলাম। অসুখের সময় ঈশ্বরের দিকে মন গেল! আমি ভাবিলাম, যিনি এতদিন এই বিপদে আমার জীবনরক্ষা করিলেন, তাঁহাকে ভুলিয়া থাকিয়া কি অকৃতজ্ঞতাই দেখাইয়াছি। যদিও অত্যন্ত দুর্ব্বল হইয়া পড়িয়াছিলাম, তবুও কোন রকমে বিছানা হইতে উঠিয়া, বাক্স খুলিয়া বাইবেল বাহির করিয়া পড়িতে আরম্ভ করিলাম। ধর্ম্মগ্রন্থের সঙ্গে সঙ্গে বাক্সের মধ্যে তামাকের পাতা পাইলাম, এবং হঠাৎ মনে পড়িয়া গেল, ব্রেজিলের লোকেরা সকল রকম রোগেই তামাক ছাড়া অন্য কোনও ঔষধ ব্যবহার করে না। ঔষধ মনে করিয়া তামাক খাইলাম, তৎক্ষণাৎ গভীর নিদ্রা উপস্থিত হইল। অনেকক্ষণ পরে জাগিয়া শরীর বেশ সুস্থ বোধ করিতে লাগিলাম, কিন্তু ঘুমের ঘোর সহজে ভাঙ্গিতেছিল না। ঔষধের নেশা ধরিল; রোজ তামাক খাইতে খাইতে শরীর বেশ সুস্থ সবল হইয়া উঠিল। এই ঘটনায় আমার মন গলিয়া গেল; আমি আরোগ্য লাভ করিয়া ঈশ্বরকে ধন্যবাদ করিলাম এবং প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় গম্ভীরভাবে বাইবেল পাঠ করিতে লাগিলাম।

 ১৬ই জুলাই—দ্বীপটির কোথায় কি আছে, ঘুরিয়া ফিরিয়া দেখিতে লাগিলাম। দেখিলাম তরমুজ, ফুটি, আঙুর, লেবু প্রভৃতি ফলের অভাব নাই। আঙুর শুকাইয়া রাখিলাম এবং নিকটবর্ত্তী বর্ষাকালের জন্য লেবু সঞ্চয় করিয়া রাখিলাম।

 দ্বীপের পশ্চিম দিকে একটি সুন্দর উপত্যকা আবিষ্কার করিলাম। সেখানে একটি কুঞ্জভবন প্রস্তুত করিলাম। তখন মনে হইল, বড়লোকদের মত আমার দুইটি বাড়ী; একটি সমুদ্রতীরস্থিত আবাসগৃহ—আর একটি পল্লীস্থিত প্রমোদভবন।

 ১৪ই আগষ্ট হইতে অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময় পর্য্যন্ত প্রতিদিনই অল্পাধিক পরিমাণে বৃষ্টি হইয়াছিল। আমার একটি বিড়াল কিছুদিন আগে পলাইয়া গিয়াছিল, তাহার জন্য আমি চিন্তিত ছিলাম। আশ্চর্য্যের বিষয়, আগষ্ট মাসের শেষভাগে সেই বিড়ালটি তিনটি ছানা লইয়া আমার কাছে উপস্থিত হইল। বর্ষার সময় আমি আমার গুহাটিকে একটু বড় করিলাম এবং একদিকে একটি দুয়ার তৈয়ারি করিলাম।

 ৩০শে সেপ্টেম্বর—আজ আমার এই দ্বীপবাসের—বার্ষিক উৎসব। আমার কালি ফুরাইয়া আসিতেছে দেখিয়া “দৈনিক লিপি” বন্ধ করিলাম; কেবল বিখ্যাত ঘটনাগুলি লিখিয়া রাখিলাম।

 ধান ও বালির যে বীজ রাখিয়াছিলাম, তাহা বপন করার সময় হইয়াছে মনে করিয়া, বীজ ছড়াইয়া দিলাম, কিন্তু একটিও গাছ বাহির হইল না। তার পর আমার কুঞ্জভবনের কাছে মাটি খুঁড়িয়া একটি ক্ষেত প্রস্তুত করিলাম, এবং বর্ষাকালের পূর্ব্বেই বীজ বপন করিলাম। এবারে চমৎকার ফসল হইল। আমি অনেকগুলি ঝুড়ি তৈয়ারি করিলাম, তাহাতে শস্যাদি রাখিবার বেশ সুবিধা হইল। একদিন ঠিক করিলাম, দ্বীপটার অন্যপ্রান্তে যাইতে হইবে। ব্যাগে কিছু খাবার ভরিয়া, বন্দুক আর কুকুর লইয়া আড়া আড়ি চলিতে আরম্ভ করিলাম। সমুদ্রের ধারে আসিয়া দেখিলাম, দূরে স্থল দেখা যাইতেছে। ভাবিলাম, ঐখানে হয় ত নরমাংসাশী অন্য জাতীয় লোক বাস করে। দ্বীপের এই অংশে অনেক তোতাপাখী দেখিলাম, তাহার একটি ধরিয়া বাড়ী লইয়া আসিলাম। আমি এই পাখীটিকে কথা বলিতে শিখাইয়াছিলাম। সে আমার নাম ধরিয়া ডাকিতে শিখিয়াছিল। এইখানে খরগোস আর খেঁকশিয়ালও দেখিয়াছিলাম।

 এই দিকটা বাড়ী তৈয়ারি করিলে ভাল হইত। কচ্ছপ আর পাখীর মাংস খাওয়ার ভারী সুবিধা হইত। চিহ্ন রাখিবার জন্য এইখানে একটা বড় কাঠ পুতিয়া রাখিয়া বাড়ী ফিরিলাম। পথে আমার কুকুর একটি ছাগলছানাকে আক্রমণ করিল, আমি দৌড়াইয়া গিয়া কুকুরের মুখ হইতে তাহাকে উদ্ধার করিলাম। ছাগলছানাকে দড়ি দিয়া বাঁধিয়া বাড়ী লইয়া গেলাম। বাড়ী আসিয়া তোতাপাথীর জন্য একটি খাঁচা তৈয়ারি করিলাম। পাখী আর ছাগলছানা আমার হাতে খাইতে পাইয়া বেশ পোষ মানিল।

 দুই বৎসর কাটিয়া গেল। বার্লি আর ধানের গাছ গজাইলেই বুনো ছাগল ও খরগোস আসিয়া খাইয়া ফেলিত। কাজেই অনেক পরিশ্রম করিয়া বেড়া দিয়া ক্ষেতগুলি ঘিরিয়া দিলাম। রাত্রে আমার কুকুর পাহারা দিত। শস্য ফলিতে আরম্ভ হইল, কিন্তু দলে দলে পাখী আসিয়া তাহা খাইতে লাগিল। আমি বন্দুক দিয়া অনেক পাখী মারিলাম, কিন্তু তবুও পাখীরা আসিতে ছাড়িল না। অবশেষে আমি মরা পাখী ক্ষেতে ঝুলাইয়া রাখিলাম, তখন ভয়ে অন্য পাখী আর আসিত না। যখন শস্য পাকিল, তখন একখানি পুরান তলোয়ার দিয়া তাহা কাটিয়া আনিলাম। যে অল্প শস্য পাইলাম, তাহা বীজের জন্য রাখিয়া দিলাম।

 কাজ করিতে করিতে ক্লান্ত হইলে, মন প্রফুল্ল করিবার জন্য আমি তোতাপাখীর সঙ্গে কথা কহিতাম।

 মাটি দিয়া থালা, বাটি, হাঁড়ি, কলসি ইত্যাদি অনেক রকমের পাত্র তৈয়ারি করিলাম। কিন্তু তাহাতে জল রাখাও চলে না, এবং তাহা আগুনের তাতও সয় না! তাই পাত্রগুলি আগুনে পোড়াইয়া শক্ত করিয়া লইলাম।

 চাউল ও বালি গুঁড়া করিয়া রুটি তৈয়ারি করিবার ইচ্ছা হইল। যাঁতা প্রস্তুত করিবার জন্য পাথর খুঁজিয়া পাইলাম না; কাঠ দিয়া উদুখল প্রস্তুত করিয়া, শস্য চূর্ণ করিবার বন্দোবস্ত করিলাম, এবং একটা চালুনিও তৈয়ার করিয়া লইলাম। পাঁউরুটির জন্য কোন রকমে একটা উনুন গড়িলাম।

 এই সব কাজ করিতে করিতে আমার তৃতীয় বৎসরও প্রায় কাটিয়া গেল।