রবিন্সন্ ক্রুসো/পঞ্চম পরিচ্ছেদ
পঞ্চম পরিচ্ছেদ।
স্পেনদেশীয় লোকটি বলিল যে, তাহার ষোলজন বন্ধু অসভ্যদের দেশে শান্তিতে বাস করিতেছে। স্পেনের একখানি বাণিজ্য-জাহাজ ভাঙ্গিয়া গেলে, তাহারা এই সত্তর জন নাবিক একখানি নৌকায় করিয়া উপকূলে যাইবার চেষ্টা করিতেছিল, কিন্তু ঝড়ে পড়িয়া বাঁচিবার আশা ছিল না। অসভ্য লোকরা সকলকে উদ্ধার করিয়া তাহাদের দেশে লইয়া গিয়াছিল।
আমি বলিলাম, “এই স্পেনিয়ার্ডদের সাহায্যে একখানি বড় জাহাজ তৈয়ারি করিয়া, আমরা সকলেই স্বদেশে ফিরিয়া যাইবার উপায় করিতে পারি, কিন্তু স্পেনের সঙ্গে ইংল্যাণ্ডের যে রকম বিবাদ, তাহাতে আমার মত অসহায় একজন ইংরেজকে হাতে পাইয়া, স্পেনিয়ার্ড ভাইরা কি আমাকে বন্দী না করিয়া ছাড়িবেন?” তখন স্পেনিয়ার্ডটি বলিল, “আমার বন্ধুরা স্বদেশে পলাইতে পারিলেই বাঁচেন; এ দুর্দ্দশার সময় ইংরেজ-বিদ্বেষ থাকিতেই পারে না। আপনি অনুমতি দিলে, “শুক্রের” বাবাকে লইয়া আমি তাঁহাদের কাছে যাই এবং এই প্রস্তাব করি যে, আপনি আমাদের অধ্যক্ষ হইবেন। আমরা সকলে আপনার অধীনে থাকিব এবং শপথ করিব যে, প্রাণ গেলেও বিশ্বাসঘাতকতা করিব না। এই প্রস্তাবে রাজী করিয়া শীঘ্রই আমি সকলকে লইয়া ফিরিয়া আসিব।” আমাদের চারি জনের খাওয়া দাওয়া কোনও রকমে চলিতেছিল। আর ষোলজন অতিথি উপস্থিত হইলে, তাহাদের খাদ্য সামগ্রীর অভাব হইবে ভাবিয়া কিছুদিন অপেক্ষা করিতে হইল। উপযুক্ত পরিমাণ খাদ্য সামগ্রী সংগ্রহ করিয়া, স্পেনিয়ার্ড ও “শুক্রের’” বাবাকে একখানা নৌকায় করিয়া সেই ষোলজন লোককে আনিতে পাঠাইলাম।
বলিয়া দিলাম, ফিরিবার সময় দূর হইতে সাঙ্কেতিক নিশান উড়াইলে, আমি বুঝিতে পারিব, আমার বন্ধুগণ আসিতেছেন। ইহাদের জন্য অপেক্ষা করিতে করিতে আট দিন কাটিয়া গেল। একদিন ভোরের বেলা খুব ঘুমাইতেছি, এমন সময় “শুক্র” চেঁচাইয়া বলিল, “প্রভু, প্রভু, তারা এসেছে।” কথা কাণে যাইতেই লাফাইয়া উঠিলাম। সমুদ্রের ধারে গিয়া দেখিলাম, অনেক দূরে একখানি নৌকা পাল তুলিয়া আসিতেছে—কিন্তু সে নৌকাখানা সেই স্পেনিয়ার্ডদের হইতেই পারে না। আমি পাহাড়ে উঠিয়া দূরবীণ দিয়া দেখিলাম, প্রায় এক মাইল দূরে একখানি জাহাজ নোঙ্গর করা রহিয়াছে। জাহাজখানি ইংরেজের বলিয়া মনে হইল,—তখন আমার আনন্দ উথলিয়া উঠিল। দেখিতে দেখিতে সেই নৌকাখানি তীরে লাগিল। এগার জন লোক নৌকা হইতে নামিল। তাহাদের মধ্যে তিনজন নিরস্ত্র, হাতবাঁধা বন্দী। ইহা দেখিয়া “শুক্র” চেঁচাইয়া বলিয়া উঠিল, “ও প্রভু, ঐ দেখ ইংরেজরাও অসভ্যদের মত মানুষ ধ’রে খায়!” আমি বলিলাম, “ইংরেজরা বন্দী তিনজনকে খুন ক’রে ফেল্তে পারে, কিন্তু কখনো খাবে না।”
বন্দীদিগকে উপকূলে নামাইয়া ছাড়িয়া দেওয়া হইল। তাহারা বিষণ্ণভাবে মাটিতে বসিয়া পড়িল। বাকী আটজনের মধ্যে কয়েকজন আমাদের দ্বীপে বেড়াইতে লাগিল। তিনজন নৌকায় শুইয়া ঘুমাইয়া পড়িল। তাহারা যখন জাগিয়া উঠিল, তখন ভাঁটায় জল সরিয়া গিয়াছে। নৌকাখানা একেবারে শুকনা ডাঙ্গায় পড়িয়া রহিয়াছে। তাহারা বিস্তর ঠেলাঠেলি করিল, কিন্তু কিছুতেই নৌকাখানা জলে নামাইতে পারিল না। তখন তাহারাও দ্বীপে বেড়াইতে গেল। জোয়ার আসিতে আসিতে সন্ধ্যা হইয়া যাইবে, তাহার আগে ইহারা নৌকা ছাড়িতে পারিবে না। আমি “শুক্রের” সঙ্গে পরামর্শ করিলাম, আবার একটা ছোট খাটো যুদ্ধ করা বাউক। “শুক্র” আর আমি অস্ত্রশস্ত্র লইয়া বাহির হইলাম। দুইটার সময় রৌদ্রের উত্তাপ হইতে রক্ষা পাইবার জন্য, বন্দী তিনজন একটা গাছের ছায়ায় বসিল। আর সকলে কিছুদূরে একটা বনের মধ্যে আশ্রয় লইল। আমি বন্দীদের কাছাকাছি গিয়া স্পেনীয় ভাষায় জিজ্ঞাসা করিলাম, “তোমরা কে?” তাহারা আমার অদ্ভূত চেহারা দেখিয়া, আর বিকট স্বর শুনিয়া পলাইতেছিল; তখন আমি মধুর ইংরেজী ভাষায় বলিলাম, “ভয় নাই, আপনারা হয় ত আশা করেন নাই যে, বিপদের সময় একজন বন্ধুর সাহায্য পাবেন।” একজন বন্দী গম্ভীর ভাবে বলিয়া উঠিলেন—“নিশ্চয়ই ইনি স্বর্গ হইতে প্রেরিত হইয়াছেন।” আমি বলিলাম, “হাঁ, এই পৃথিবীর সকল রকম সাহায্যই স্বর্গ থেকে আসে! সে যা হোক্, এখন বলুন, আপনাদের কি সাহায্য ক’র্ব!” বন্দীদের মধ্যে অপর একজন বলিলেন, “সব কথা বলার সময় নাই, শত্রুরা কাছেই র’য়েছে। আমি ঐ জাহাজের অধ্যক্ষ, আর এই দুইজন আমার বন্ধু। জাহাজের লোকরা বিদ্রোহী হ’য়ে, আমাদের তিনজনকে বন্দী ক’রে এনেছে?” জিজ্ঞাসা করিলাম, “আপনার শত্রুরা কোথায়?” জাহাজের অধ্যক্ষ আঙ্গুল দিয়া দেখাইয়া বলিলেন, “ঐ বনের ভিতর তারা শুয়ে আছে; আমাদের কথা শুন্তে পেলেই সকলকে খুন ক’রে ফেল্বে!” তখন বন্দী তিন জনকে সঙ্গে করিয়া একটু দূরে লইয়া গিয়া, আমি অধ্যক্ষ মহাশয়কে বলিলাম, “যদি আপনার শত্রুদের হাত থেকে জাহাজ উদ্ধার ক’ত্তে পারি, তবে আমাকে আর আমার এই ভৃত্যকে বিনা ভাড়ায় ইংল্যাণ্ডে পৌছিয়ে দিতে হবে। এখন আমি উহাদের সঙ্গে যুদ্ধ ক’র্ব!— আপনাদের আমার সাহায্য ক’ত্তে হবে এবং যতক্ষণ এই দ্বীপে আছেন, আমাকে সেনাপতি ব’লে মান্য ক’ত্তে হবে।”
তিনি খুব খুসী হইয়া আমার কথায় রাজি হইলেন। আমি তাঁহাদের তিন জনের—হাতে তিনটী বন্দুক দিলাম। তারপর আমরা পাঁচজন সেই বনের কাছে গিয়া পরামর্শ করিতেছি, এমন সময় শত্রুরা জাগিয়া উঠিল। আমরা বন্দুক ছুড়িতেই তাহাদের দুইজন মরিয়া গেল; অবশিষ্ট কয়েকজন প্রাণভিক্ষা চাহিল। কাপ্তেন বলিলেন, “যদি তোমরা বিশ্বস্ত হইয়া থাকিতে শপথ কর, তাহা হইলে আমি তোমাদিগকে বধ করিব না।” তাহারা শপথ করিলে আমরা তাহাদিগকে বন্দী করিয়া রাখিলাম। যাহারা পলাইয়া নৌকায় গিয়াছিল তাহাদিগকে বন্দী করিলাম। আমি কাপ্তেনকে আমার কাহিনী কিছু কিছু বলিলাম,— তিনি শুনিয়া বিস্মিত হইলেন। তখন আর গল্প করিবার সমর ছিল না। কাপ্তেনকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “এখন জাহাজ কেমন করিয়া উদ্ধার করা যায়?” তিনি বলিলেন, “জাহাজে ছাব্বিশ জন শত্রু আছে। তাহারা আশা করিতেছে যে, তাহাদের আটজন সহচর আমাদের তিনজনকে এই দ্বীপে ছাড়িয়া দিয়া, এখনই ফিরিয়া যাইবে।” হঠাৎ জাহাজ হইতে বন্দুকের শব্দ হইল; বুঝিলাম, সঙ্গীদিগকে ফিরিয়া যাইবার জন্য সঙ্কেত করা হইল। দেরী দেখিয়া বার বার সঙ্কেত করা হইল। কিন্তু সঙ্গীরা ফিরিল না! তখন দশজন সশস্ত্র লোক আর একখানি নৌকা করিয়া তীরের দিকে আসিতে লাগিল। আমরা আবার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইলাম। উহারা তীরে নামিয়া বন্ধুদের নাম ধরিয়া চেঁচাইয়া ডাকিতে লাগিল, বন্দুক ছুড়িতে লাগিল, কিন্তু কে সাড়া দেয়? নিরাশ হইয়া তাহারা আবার নৌকায় আসিয়া বসিল। তখন আমি “শুক্র” আর কাপ্তেনের একটি বন্ধুকে শিখাইয়া দিলাম, “তোমরা দুজন একটু দূরে গিয়া লুকাইয়া থাকিয়া— হো— হো— করিয়া খুব চেঁচাইবে। তাহা হইলে ইহারা ভাবিবে যে, বন্ধুরা পথ হারাইয়া চেঁচাইতেছে। ইহারা সাড়া দিলে, তোমরা আবার চেঁচাইয়া উত্তর দিও।”
“শুক্র” ও কাপ্তেনের বন্ধু দূরে গিয়া গলা ফাটাইয়া “হে—হো—ও” করিয়া চেঁচাইতে লাগিল। চেঁচামেচি শুনিয়াই দশজনের মধ্যে আটজন —“হো হো” করিয়া চেঁচাইতে চেঁচাইতে ছুটিল; দুইজন নৌকায় রহিল। আমরা তখন নৌকা আক্রমণ করিয়া সেই দুই জনকে বন্দী করিয়া ফেলিলাম। কিছুপরে শুক্ররা ফিরিয়া আসিল। কিন্তু সেই আটজন লোক মিছামিছি “হো হো” করিয়া সন্ধ্যা পর্য্যন্ত ঘুরিয়া বেড়াইল। সন্ধ্যার সময় তাহারা যখন সমুদ্র-তীরে নৌকা খুঁজিতে আসিল, তখন আমরা অন্ধকারে লুকাইয়া, তাহাদিগকে আক্রমণ করিলাম এবং দুইজনকে গুলি করিয়া মারিয়া ফেলিলাম। অবশিষ্ট লোকরা ভয় পাইয়া আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করিল। বন্দীদিগের মধ্যে দশ এগার জনকে বিশ্বাস করিয়া, কাপ্তেন তাহাদের সাহায্যে জাহাজ আক্রমণ করিতে গেলেন। “শুক্র” আর আমি অন্যান্য বন্দীদিগকে আটক করিয়া, কড়া পাহারা দিতে লাগিলাম। কাপ্তেন জাহাজের কাছাকাছি গিয়া, একজনের দ্বারা সংবাদ পাঠাইলেন, —“আমরা কাপ্তেন আর তাঁর বন্ধু দুটিকে নির্জ্জন দ্বীপে নির্ব্বাসন দিয়া ফিরিয়া আসিতেছি।”—তার পর তিনি অনুচরগণের সহিত তাড়াতাড়ি জাহাজে উঠিয়াই, সম্মুখে যে কয়টাকে পাইলেন, মারিয়া ডেক্শায়ী করিলেন। তাহারা ডেকের উপর গড়াইতে লাগিল। “কি হইল—কি হইল!” বলিয়া যাহারা দৌড়াইয়া আসিল, তাহাদিগকে বন্দী করা হইল। বিদ্রোহী দলের সর্দ্দার রাতারাতি কাপ্তেন হইয়া, কাপ্তেনের ক্যাবিনে—কাপ্তেনের বিছানায় শুইয়া সুখের স্বপ্ন দেখিতেছিল! কোলাহলে এই হঠাৎ নবাবটির সুখের স্বপ্ন ভাঙ্গিয়া গেল। সে গোলমাল থামাইবার জন্য “চুপ্রাও” বলিয়া গর্জ্জন করিয়া উঠিল। কিন্তু তখনই সত্য কাপ্তেন ক্যাবিনে ঢুকিয়া, নকল কাপ্তেনের চেয়ে চড়াইয়া “চুপরাও” বলিয়া ধমক দিলেন, এবং “গুড়ুম” করিয়া বন্দুক ছুড়িলেন। সেই শব্দের সঙ্গে সঙ্গে বেচারার সব নবাবী ফুরাইয়া গেল! এইরূপে অধ্যক্ষ মহাশয় তাঁহার জাহাজখানি পুনরুদ্ধার করিয়া, সাতটি তোপধ্বনি দ্বারা জয়বার্ত্তা ঘোষণা করিলেন।
পরদিন সকালবেলা কাপ্তেন বাঁশি বাজাইতে বাজাইতে জাহাজ খানিকে তীরে লইয়া আসিলেন এবং প্রথমেই আমাকে দস্তুরমত ভদ্রলোক সাজাইবার জন্য এক প্রস্ত পোষাক উপহার দিলেন। বন্দীদিগের সম্বন্ধে কি ব্যবস্থা করা হইবে, কাপ্তেনের সঙ্গে পরামর্শ করিলাম। তিনি বলিলেন, “ইহাদের মধ্যে দুইটী লোক থাকা ডাকাত, তাহাদের হাতে পায়ে বেড়ি লাগাইয়া, কোনও ইংরেজ বিচারকের হাতে দিতে হইবে। তা ছাড়া আর সকলকে ক্ষমা করিয়া আমাদের সঙ্গে লইয়া যাইব।” আমি কাপ্তেনের অনুমতি লইয়া ঐ দুইটী লোককে বলিলাম, “তোমাদের দুই জনকে আমার এই দ্বীপের রাজা ক’র্লাম। তোমরা আমার এই বাড়ী ও ছাগলের পালের উত্তরাধিকারী হ’লে। এই দুটী বন্দুক, এই গুলি-গোলা-বারুদ, এই দুখানি তলোয়ার তোমাদিগকে উপহার দিলাম। রাজপুত্রের মত স্বাধীনভাবে এই দ্বীপে থাক, আমরা সব স্বদেশে যাত্রা ক’র্লাম।”
যাত্রা করিবার পূর্ব্বে “শুক্রের” বাবা ও সেই স্পেনিয়ার্ডদের কথা তাহাদিগকে বলিলাম এবং একখানি চিঠি দিয়া বলিয়া দিলাম— “স্পেনিয়ার্ডরা আসিলে যেন এই চিঠি দেওয়া হয়।”