বিষয়বস্তুতে চলুন

রবিন্সন্‌ ক্রুসো/প্রথম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে


রবিন্সন ক্রসো ও তাহার পিতা।

রবিন্সন ক্রুসো

প্রথম পরিচ্ছেদ

ইয়র্ক সহরে আমার জন্ম হয়। ঊনিশ বৎসর বয়স পর্য্যন্ত আমি পিতামাতার কাছেই ছিলাম। বিদেশ ভ্রমণের বিপদ আপদের কথা মা বাবা আমাকে অনেক বুঝাইয়াছিলেন, কিন্তু আমি মনে মনে ঠিক করিয়া রাখিয়াছিলাম, সুযোগ পাইলেই বাহির হইব। একদিন হাল্ সহরে বেড়াইতে গিয়া দেখিলাম, আমার এক সঙ্গী তাহার বাবার জাহাজে চড়িয়া লণ্ডনে যাইতেছে। আমি তখন পিতামাতার অনুমতি না লইয়াই সেই জাহাজে চড়িয়া বসিলাম। যে যত বড় দুঃসাহসিক কার্য্যেই প্রবৃত্ত হউক না কেন, আমাকে যেমন অল্প বয়সে দীর্ঘকাল দুঃখকষ্ট ভোগ করিতে হইয়াছিল—এমন কাহারও ভাগ্যে ঘটে নাই; হাম্বার বন্দর হইতে জাহাজ কিছুদূর যাইতেই প্রবল বেগে বাতাস বহিতে লাগিল এবং ভয়ঙ্কর ঢেউ উঠিতে লাগিল। এই আমার প্রথম সমুদ্র যাত্রা বলিয়া ভয়ে অস্থির হইয়া উঠিলাম এবং শরীরটা কেমন কেমন করিতে লাগিল। এক একটা ঢেউ আসে আর আমার মনে হয়, এখনই বুঝি জাহাজসুদ্ধ আমাদের সকলকে গিলিয়া ফেলিবে! আমি তখনই মনে মনে স্থির করি, একবার যদি ডাঙ্গায় পা ফেলিতে পারি, অমনি একেবারে মা বাপের কাছে বাড়ীতে গিয়া উপস্থিত হইব—আর সমুদ্রে যাওয়ার নামটিও করিব না।

 পরদিন ঝড় কমিয়া গেল, সমুদ্র শান্ত হইল; আর আমি বিপদে পড়িয়া যে সব প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলাম—তাহা একেবারে ভুলিয়া গেলাম। ছয় দিনের দিন আমরা ইয়ারমাথ্‌ বন্দরের কাছে উপস্থিত হইলাম এবং সেখানে আমাদের জাহাজের নঙ্গর ফেলিতে হইল। আট দিনের দিন সকাল বেলা বাতাস বাড়িতে লাগিল এবং দুপুর বেলা ভয়ঙ্কর ঝড় আরম্ভ হইল। সারাদিন প্রচণ্ড বেগে বাতাস বহিতে লাগিল। রাত্রি ১২টার সময় কে এক জন চেঁচাইয়া বলিয়া উঠিল, জাহাজ ফুটা হইয়া গিয়াছে, এবং দেখা গেল, জাহাজের খোলে ৪ ফুট জল উঠিয়াছে। তখন আমরা সকলে মিলিয়া জল ফেলিতে আরম্ভ করিলাম, কিন্তু খুব পরিশ্রম করিয়াও জল কমাইতে পারিলাম না। ক্রমেই জল বাড়িতে লাগিল এবং স্পষ্ট বুঝিতে পারিলাম—আমাদের জাহাজ ডুবিয়া যাইবে। আমাদের কাপ্তেন সাহায্যের জন্য বন্দুক ছুড়িতে লাগিলেন; তখন অন্য একখানি জাহাজ হইতে আমাদের সাহায্যের জন্য একখানি নৌকা পাঠান হইল। অনেক কষ্টে সেই নৌকাখানি আমাদের কাছে এল, আমরা সকলেই নিরাপদে নৌকায় উঠিলাম,—আর একট পরেই আমাদের জাহাজখানি ডুবিয়া গেল। অতি কষ্টে আমরা কিনারায় উঠিলাম। আমাদের উদ্ধারকারী আমাদের প্রতি অত্যন্ত সদয় ব্যবহার করিলেন;—হাল্‌ কিংবা লণ্ডন সহরে ফিরিয়া যাইবার উপযুক্ত পাথেয় তাঁহারা দয়া করিয়া আমাদিগকে দিলেন।

 তখন যদি বাড়ী ফিরিয়া যাইবার সুবুদ্ধি আমার হইত, তাহা হইলে আমার ভাগ্যে সুখ ঘটিত, কিন্তু আমার কপাল মন্দ ছিল বলিয়া আমি লণ্ডনে গেলাম। এইখানে এক জাহাজের অধ্যক্ষের সহিত বন্ধুত্ব করিলাম এবং তাঁহার জাহাজে চড়িয়া আফ্রিকার অন্তর্গত গিনিতে নিরাপদে পৌছিলাম। এইবার সমুদ্র যাত্রায় আমার নাবিক আর বণিকের বিদ্যালাভ হইল। গিনি হইতে স্বর্ণরেণু লইয়া আসিয়াছিলাম;—লণ্ডনে ফিরিয়া আসিয়া সেই স্বর্ণরেণু বিক্রয় করিয়া প্রায় ৩০০ পাউণ্ড পাইয়াছিলাম। আমার এই কাপ্তেন বন্ধুর শীঘ্রই মৃত্যু হইলে, তাঁহার একজন বন্ধু সেই জাহাজের অধ্যক্ষ হইলেন। তাঁহার সঙ্গে আমি পুনরায় গিনি যাত্রা করিলাম। এইবার বড়ই বিপদে পড়িলাম। কেনারী দ্বীপপুঞ্জ ও আফ্রিকার উপকুলের মধ্যবর্ত্তী স্থান দিয়া যখন আমাদের জাহাজ যাইতেছিল, তখন একদিন সকালবেলা হঠাৎ তুর্ক জলদস্যদের এক জাহাজ দ্রুতবেগে আমাদের পশ্চাদ্ধাবন করিল। বিকালবেলা সেই জাহাজ আমাদের জাহাজ ধরিল এবং ভয়ঙ্কর যুদ্ধের পর আমরা সেই তুর্কদিগের নিকট পরাভব স্বীকার করিতে বাধ্য হইলাম। তাহারা আমাদিগকে বন্দী করিয়া মুরগণের অধিকৃত স্যালি নামক বন্দরে লইয়া গেল। আমার অন্যান্য সঙ্গীদিগকে সেই দেশের রাজার নিকট লইয়া যাওয়া হইল,—কিন্তু জলদস্যগণের জাহাজের অধ্যক্ষ আমাকে তাঁহার ক্রীতদাস করিয়া রাখিলেন।

 দুই বৎসর বন্দীদশায় থাকার পর, আপনা হইতেই পলায়নের এক সুযোগ উপস্থিত হইল। আমার মনিব তাঁহার মুরজাতীয একআত্মীয ও জুরী নামক এক বালকের সঙ্গে আমাকে মধ্যে মধ্যে মাছ ধরিতে পাঠাইতেন। একদিন এই দুইটি লোকের সঙ্গে মাছ ধরিতে গিয়া, আমাদের নৌকা ভাসিতে ভাসিতে সমুদ্রের মধ্যে অনেক দূর গিয়া পড়িয়া ছিল—তখন আমি সুযোগ পাইয়া হঠাৎ মুরটাকে ধরিয়া একেবারে সমুদ্রে ফেলিয়া দিলাম। সে আবার নৌকায় ফিরিয়া আসিতে চেষ্টা করিয়াছিল, কিন্তু গুলি করিয়া মারিব বলিয়া ভয় দেখাইয়া তাহাকে নিরস্ত করিলাম। তখন সে ফিরিয়া সাঁতরাইয়া কূলের দিকে গেল। তারপর বালকটির দিকে চাহিয়া বলিলাম, “জুরী, তুমি যদি আমার বিশ্বস্ত হইয়া থাক, তবে আমি তোমাকে বড় লোক করিয়া দিব; কিন্তু আমার অনুগত হইয়া থাকিতে যদি শপথ না কর, তবে আমি নিশ্চয়ই তোমাকেও সমুদ্রে ফেলিয়া দিব।” ছেলেটি আমার মুখপানে চাহিয়া একট মুচ্‌কি হাসিল এবং আমার বিশ্বস্ত হইয়া থাকিবে বলিয়া শপথ করিল। তখন আমরা মুরদের দেশ হইতে সমুদ্রপথে অনেক দূর চলিয়া গেলাম। পথে অনেক আশ্চর্য ঘটনা ঘটিল। একদিন আমি নৌকার ভিতরে বসিয়া আছি, এমন সময় জুরী বলিয়া উঠিল, “পাল তুলিয়া দিয়া জাহাজ যাইতেছে।” আমরা বিপদের সঙ্কেত প্রকাশ করিতেই, সেই জাহাজের নাবিকরা আমাদিগকে দেখিতে পাইল এবং আমাদিগকে তুলিয়া লইবার জন্য জাহাজ থামাইল। সেখানি পর্টুগীজ বাণিজ্যজাহাজ। সেই জাহাজের অধ্যক্ষ যখন শুনিলেন, আমি দাসত্ব হইতে মুক্তিলাভ করিবার জন্যই পলায়ন করিয়াছি, তখন তিনি আমার প্রতি অত্যন্ত সদয় ব্যবহার করিলেন এবং ব্রেজিল পর্য্যন্ত আমাকে বিনা ভাড়ায় পোঁছাইয়া দিলেন। তিনি জুরীকে তাঁহার ভৃত্য করিয়া লইলেন, কাজেই আমি সেই বিদেশে একলা পড়িলাম। সেই উর্ব্বরদেশে কৃষিকার্য্য করিয়া বেশ লাভ হইল। আমি যদি বরাবর সেই দেশে থাকিতাম, তাহা হইলে নিশ্চয়ই একজন ধনীলোক হইতে পারিতাম। কিন্তু হায়! আমি কিছুদিন পরেই অসম্ভষ্ট হইয়া উঠিলাম—এবং আমার ভাগ্য-পরীক্ষার জন্য আবার সমুদ্র যাত্রার সঙ্কল্প করিলাম। আমার পরিচিত কয়েকজন বণিক ও কৃষিব্যবসায়ীর সঙ্গে একত্র আমি দুইবার আফ্রিকা অঞ্চলে গিয়াছিলাম। সেখানে আমার তিন বন্ধু প্রস্তাব করিলেন যে, তাঁহারা গিনি প্রদেশে যাত্রা করিবেন এবং আমি যদি তাঁহাদের সঙ্গে যাই, তাহা হইলে ব্যবসায়ে যে লাভ হইবে, তাহার একটি সমান অংশ আমাকে দেওয়া হইবে! আমি তাঁহাদের সহিত যাইতে সম্মত হইলাম। বাড়ী হইতে পলাইয়া আসিবার আট বৎসর পরেই অশুভক্ষণে তাঁহাদের সঙ্গে জাহাজে উঠিলাম। আমাদের জাহাজে ছয়টি কামান, চৌদ্দজন বয়স্ক ব্যক্তি, কাপ্তেন, তাঁহার অল্পবয়ঙ্ক পুত্র এবং আমি ছিলাম। জাহাজে বেশী মাল বোঝাই করা হয় নাই, কেবল ঝিণুক, শামুক, কাচের জিনিষ, আয়না, ছুরি, কাঁচি ও নানা রকমের খেলেনা আমরা সঙ্গে লইলাম। এই সব কম দামি চক্‌চকে জিনিষ নিগ্রোদের কাছে বেশী দামে বেচিয়া লাভ করিবার বেশ সুবিধা ছিল। অনেকদিন আমরা সমুদ্র পথে বেশ ভাল ভাবেই কাটাইলাম, তার পর একদিন প্রচণ্ড ঝড় উঠিল; সেই ঝড়ে পড়িয়া আমাদের জাহাজ বার দিন ধরিয়া পথ হারাইয়া ভাসিতে লাগিল। অবশেষে একদিন ভোরের বেলা জাহাজের একজন লোক “ডাঙ্গা, ডাঙ্গা” বলিয়া চেচাইয়া উঠিল আর তৎক্ষণাৎ আমাদের জাহাজ বালির চূড়ায় ঠেকিয়া গেল। ডেকের উপর দিয়া জল চলিতে লাগিল। জাহাজ খানি চুরমার হইয়া ভাঙ্গিয়া যাইবে, এই ভয়ে আমরা একখানি নৌকা ভাসাইয়া, তাহাতে সকলে উঠিয়া পড়িলাম। বাতাসে আমাদের নৌকাখানি কিনারার দিকে চলিল, এমন সময়, হঠাৎ এক বিশাল ঢেউ আসিয়া সেই নৌকা উণ্টাইয়া দিল,—আর আমরা সমুদ্রের লোণা জলে হাবু ডুবু খাইতে লাগিলাম। একটা ঢেউ আসিয়া খুব জোরে আমাকে কিনারার দিকে ঠেলিয়া লইয়া, এক পাথরের চিবির উপর আছড়াইয়া ফেলিল। আমি পাথর আঁকড়াইয়া ধরিয়া ঢিবির উপর পড়িয়া রহিলাম। ঢেউ সরিয়া যাইতেই আমি সমুদ্রের ধারের পাহাড়ে উঠিয়া নিরাপদ হইলাম। যখন সমুদ্রের উপকুলে দাড়াইলাম, তখন প্রাণ বাঁচিল জানিয়া উর্দ্ধদিকে চাহিয়া ভগবানকে ধন্যবাদ করিলাম। তার পর কি রকম জায়গায় পড়িলাম এবং প্রথমেই কি করিতে হইবে, ঠিক করিবার জন্য চারিদিকে চাহিয়া দেখিলাম। আমার কাপড় চোপড় একেবারে ভিজে জব্‌জবে ছিল; পকেট হাতড়াইয়া দেখিলাম, একখানি ছুরি, তামাক খাইবার একটা পাইপ্‌ আর ছোট এক বাক্স তামাক ছাড়া আর কিছুই নাই। রাত্রি উপস্থিত হইতেছে দেখিয়া, পানীয় জলের অনুসন্ধানে বাহির হইলাম,—জল পাইয়া পরম আনন্দে পান করিলাম। তার পর একটা বেশ বড় গাছে চড়িয়া ঘুমাইয়া পড়িলাম। ঘুম ভাঙ্গিলে দেখিলাম, বেশ রৌদ্র উঠিয়াছে, ঝড় কমিয়া গিয়াছে এবং জাহাজখানি ঢেউয়ের ঠেলায় এক বালির চূড়ায় আসিয়া উঠিয়াছে। বোধ হইল, জাহাজখানি উপকুল হইতে প্রায় এক মাইল দূুরে রহিয়াছে। আর নৌকাখানা শুক্‌নো ডাঙ্গায় পড়িয়া আছে।