রবিন্সন্ ক্রুসো/ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।
এই দ্বীপ-বাসের স্মৃতিচিহ্নস্বরূপ আমার নিজের হাতের তৈরি ছাগলের চাম্ড়ার টুপি, অদ্ভুত ছাতাটী আর আমার তোতা পাখীটি সঙ্গে লইলাম। ঠিক ২৮ বৎসর, ২ মাস, ১৯ দিন এই দ্বীপে বাস করিয়া স্বদেশে চলিলাম।
ইংল্যাণ্ডে পৌঁছিয়া বাড়ী গিয়া শুনিলাম, পিতা মাতার মৃত্যু হইয়াছে। তাঁহারা অনেক দিন আমার খোঁজ খবর না পাইয়া, আমার আশা পরিত্যাগ করিয়াছিলেন। এতদিন “স্বদেশ” “স্বদেশ” করিয়া অস্থির হইয়াছিলাম! আজ আর স্বদেশকে “স্বদেশ” বলিয়া মনে হইল না। আমার একমাত্র সঙ্গী প্রভুভক্ত “শুক্রকে” লইয়া আবার ইংল্যাণ্ড পরিত্যাগ করিয়া ব্রেজিলে গেলাম। সেখানে আমার যে জোত-জমী ছিল, অনুসন্ধান করিয়া জানিলাম, আমার মৃত্যুসংবাদ পাইয়া জমীদার সেগুলি অন্য প্রজাকে বিলি করিয়া দিয়াছেন। আমি সশরীরে হাজির হইয়া মৃত্যুসংবাদ মিথ্যা প্রমাণ করিয়া, সেই জোত-জমী আবার অধিকার করিলাম। কিছুদিনের মধ্যেই হাতে কিছু টাকা কড়ি হইল। চাষ আবাদের বন্দোবস্ত করিয়া দিয়া স্থলপথে ইংল্যাণ্ডে যাত্রা করিলাম। তিনজন ইংরেজ ও দুইজন পর্টুগীজ যুবক আমার সঙ্গী হইলেন। “শুক্র” ছাড়া আর একটী ইংরেজ নাবিক আমার ভৃত্য জুটিয়াছিল। আমার সঙ্গীদেরও তিনটি ভৃত্য ছিল। আমরা ছয়জন আর চাকর পাঁচটিতে বেশ একটি দল হইল। আমরা সৈনিক পুরুষদের মত অস্ত্রশস্ত্র লইয়া ঘোড়ায় চড়িয়া যাত্রা করিলাম। সকলে আমাকে দলপতি করিলেন। যখন আমরা পম্পিলুনায় পৌঁছিলাম তখন সেখানে বরফ পড়িতেছিল।
একদিন সন্ধ্যাবেলা পাহাড় হইতে নামিতেছি, এমন সময় তিনটী প্রকাণ্ড নেকড়ে বাঘ আমাদের দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল। একটী বাঘ আমাদের পথপ্রদর্শককে আক্রমণ করিল। তাহার চীৎকার শুনিয়া “শুক্র” ঘোড়া ছুটাইল এবং একেবারে মাথায় গুলি লাগাইয়া বাঘটাকে মারিয়া ফেলিল। “শুক্রের” বন্দুকের শব্দে চারিদিক্ হইতে নেকড়ে ডাকিয়া উঠিল। তখন ভয়ে আমাদের সকলের মুখ শুকাইয়া গেল। আমরা প্রাণপণে ঘোড়া ছুটাইলাম। নেকড়ের ভয় যাইতে না যাইতেই, হঠাৎ বন হইতে এক প্রকাণ্ড ভল্লুক বাহির হইল। ভালুক দেখিয়া “শুক্রের” আর আনন্দ ধরে না! সে বলিল, “প্রভু, আমাকে অনুমতি দিলে, আপনারা বন্ধুর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে যেমন হাত ঝাঁকাঝাঁকি করেন, আমিও একবার ভালুকটীর সঙ্গে সেই রকম হাত ঝাঁকাঝাঁকি ক’রে আসি! দেখে আপনাদের খুব হাসি পাবে!” আমি বলিলাম, “ওরে মূর্খ, ও যে তোকে খেয়ে ফেল্বে!” “শুক্র” চোখ ঘুরাইয়া বলিল, “কি, ও আমাকে খাবে?—আমিই ওকে খাবো! আপনারা সকলে এখানে থাকুন, আমি তামাসা দেখাচ্ছি!”—এই বলিয়া “শুক্র” মাটিতে বসিয়া জুতা খুলিয়া ফেলিল এবং বন্দুক লইয়া দৌড়াইয়া, ভালুকের কাছে গিরাই এক পাথর ছুড়িয়া মারিল। ভালুক অমনি “শুক্রকে” আক্রমণ করিতে আসিল। “শুক্র” বন্দুকটি নামাইয়া রাখিয়া, তাড়াতাড়ি একটা বড় ওক গাছে চড়িল। ভালুকও বিড়ালের মত আঁচড়াইতে আঁচড়াইতে গাছে উঠিল। তখন “শুক্র” একটি ডালের আগায় গেল; ভালুক সেই ডালে উঠিতেই, “শুক্র” আমাদিগকে ডাকিয়া বলিল, “এই দেখুন, এবার ভালুককে নাচ শেখাচ্ছি!” এই বলিয়া সে খুব জোরে ডালটা ঝাঁকিতে লাগিল। ভালুকের শরীর মোটা। “শুক্রের” ঝাঁকানিতে সে বেচারা ঠক্ ঠক্ করিয়া কাঁপিতে লাগিল! প্রাণ লইয়া পলাইতে পারিলে সে বাঁচে! আমরা স্থির করিলাম, এইবারে গুলি করিয়া ভালুকটাকে মারিয়া ফেলিব। কিন্তু “শুক্র” চেঁচাইয়া উঠিল—মার্বেন না, মার্বেন না! আমি ভালুককে আর একটু নাচাই!” এবার সে ডালের উপরে এমন জোরে নাচিতে লাগিল যে, ভালুক পড়ে আর কি! বেচারা ভয়ে তাড়াতাড়ি ডালটা আঁকড়াইয়া ধরিল! আমরা খুব হাসিতে লাগিলাম। “শুক্র” ডাল ধরিয়া তখন মাটিতে লাফাইয়া পড়িয়া বন্দুক হাতে লইল। ভালুকও গাছ হইতে নামিয়া আসিল এবং তখনি “শুক্রের” এক গুলিতে মারা পড়িল।
আমরা শীঘ্রই একটি সমতল স্থানে আসিলাম। কিছুক্ষণ পরেই প্রায় একশত নেকড়ে বাঘ আমাদের তাড়া করিল। আমরা সকলেই “গুড়ম্” “গুড়ুম্” করিয়া বন্দুক ছুড়িতে লাগিলাম। আর—“হৈ হৈ—রৈ রৈ” শব্দে আকাশ ফাটাইয়া দিলাম। অনেকগুলি নেকড়ে বাঘ যখন আমাদের হাতে মারা গেল, তখন অবশিষ্টগুলি ভয়ে পালাইল। এই শেষবারে যেমন প্রাণের ভয় হইয়াছিল, এমন আর কখনও হয় নাই। প্রতিজ্ঞা করিলাম, সমুদ্রপথে যে বিপদই হউক,—বন, জঙ্গল, পাহাড়, পর্ব্বত অতিক্রম করিয়া আর কখনও স্থলপথে চলিব না।
যাহা হউক, নিরাপদে আবার পুরাতন প্রিয় ইংল্যাণ্ডে ফিরিয়া আসিলাম। ব্রেজিলের ভূসম্পত্তি বিক্রয় করিয়া, ইংল্যাণ্ডে বসবাস করিতে লাগিলাম। তারপরে একটু খানি বৃদ্ধ বয়সে—(তা’ তখন এমনই বা কি বৃদ্ধ হইয়াছিলাম!) বিবাহ করিলাম। স্ত্রী আর তিনটী সন্তান লইয়া বেশ সুখে স্বচ্ছন্দে দীর্ঘকাল ঘরকন্না করিতেছি। অনেক সময়ই ইচ্ছা হয়, একবার আমার সেই দ্বীপটি দেখিয়া আসি। ভগবান্ আর কিছু দিন বাঁচাইয়া রাখিলে, বোধ হয় আর একবার সমুদ্র-যাত্রা করিব এবং আমার সেই দ্বীপ দেখিবার সাধও পূর্ণ হইবে!