রাজকাহিনী/বাপ্পাদিত্য
বাপ্পাদিত্য
তুঁষের আগুন যেমন প্রথমে ধিকি ধিকি শেষে হঠাৎ ধূধূ করে জ্বলে ওঠে, তেমনি গোহের পর থেকে রাজপুতদের উপর ভীলদের রাগ ক্রমে ক্রমে, অল্পে অল্পে, বাড়তে বাড়তে একদিন দাউ-দাউ করে পাহাড়ে পাহাড়ে, বনে বনে দাবানলের মত জ্বলে উঠল।
গোহের সুন্দর মুখ, অসীম দয়া, অটল সাহসের কথা মনে রেখে ভীলেরা আট-পুরুষ-পর্য্যন্ত রাজপুত রাজাদের সমস্ত অত্যাচার সহ্য করেছিল। যদি কোনো রাজপুত রাজা শিকারে যেতে পথের ধারে কোনো ভীলের কালো গায়ে বল্লমের খোঁচায় রক্তপাত করে চলে যেতেন, তবে তার মনে পড়ত,—রাজা গোহ একদিন তাদেরই বংশের একজনকে বাঘের মুখ থেকে বাঁচিয়ে এনে নিজের হাতে তার বুকের রক্ত মুছে দিয়েছিলেন! যখন কোনো রাজকুমার, কোনো-একদিন সখ্ করে গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে তামাসা দেখতেন, তখন তাদের মনে পড়ত,—এক বছর দুর্ভিক্ষের দিনে রাজা গোহ তাঁর প্রকাণ্ড রাজবাড়ি, পরিপূর্ণ ধানের গোলা, আশ্রয়হীন দীনদুঃখী ভীলপ্রজাদের জন্যে সারা-বৎসর খুলে রেখেছিলেন! ভাগ্যদোষে যুদ্ধে জয় না হলে যেদিন কোনো কাপুরুষ যুবরাজ বিশ্বাসঘাতক বলে ভীল-সেনাপতিদের মাথা একটির পর একটি হাতীর পায়ের তলায় চূর্ণ করে ফেলতেন, সেদিন সমস্ত ভীল-বাহিনী চক্ষের জল মুছে ভাবত,—হায় রে হায়, মহারাজ গোহ ছিলেন, যিনি যুদ্ধের সময় ভায়ের মত তাদের যত্ন করতেন, মায়ের মত তাদের রক্ষা করতেন, বীরের মত সকলের আগে চলতেন!
এত অত্যাচার, এত অপমান, তবু সেই বিশ্বাসী ভীল-প্রজাদের সরল প্রাণ আট-পুরুষপর্য্যন্ত বিশ্বাসে, রাজভক্তিতে পরিপূর্ণ ছিল! কিন্তু যখন বাপ্পাদিত্যের পিতা নাগাদিত্য রাজসিংহাসনে বসে ঘোর অত্যাচার আরম্ভ করলেন; যখন গরীব প্রজাদের গ্রাম জ্বালিয়ে, ক্ষেত উজাড় করে তাঁর মন সন্তুষ্ট হল না; তিনি যখন হাজার হাজার ভীলের মেয়ে দাসীর মত রাজপুতের ঘরে ঘরে বিলিয়ে দিতে লাগলেন; যখন প্রতিদিন নূতন নূতন অত্যাচার না হলে রাত্রে তাঁর ঘুম হত না; শেষে সমস্ত ভীলের প্রাণের চেয়ে প্রিয় তাদের একমাত্র আমোদ—বনে বনে পশু শিকার—যেদিন নাগাদিত্য নূতন আইন করে একেবারে বন্ধ করলেন; সেদিন তাদের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে পড়ল।
নাগাদিত্য ভীল-প্রজাদের উপর এই নূতন আইন জারি করে সমস্ত রাত্রি সুখের স্বপ্নে কাটিয়ে সকালে উঠে দেখলেন, দিনটা বেশ মেঘলা-মেঘলা, ঠাণ্ডা হাওয়া ছেড়েছে, কোনো দিকে ধূলো নেই, শিকারের বেশ সুবিধা। নাগাদিত্য তৎক্ষণাৎ হাতী সাজিয়ে দলবল নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। সেদিন রাজার সঙ্গে কেবল রাজপুত!—দলের পর দল, বড় বড় ঘোড়ায় চড়ে রাজপুত! সামান্য ভীলের একটি ছোট ছেলে পর্য্যন্ত যাবার হুকুম নেই! শিকার দেখলে খাঁচার ভিতর চিতাবাঘ যেমন ছট্ফট্ করে, আজ এমন শিকারের দিনে ঘরের ভিতর বসে থেকে ভীলদের প্রাণ তেমনিই ছট্ফট্ করছে। এই কথা ভেবে নিষ্ঠুর নাগাদিত্যের মন আনন্দে নৃত্য করতে লাগল।
মহারাজ নাগাদিত্য দলবল নিয়ে ভেরী বাজিয়ে হৈহৈ-শব্দে পর্ববতের শিখরে চড়লেন;— বজ্রের মত ভয়ঙ্কর সেই ভেরীর আওয়াজ শুনে অন্যদিন মহিষের পাল জল ছেড়ে উঠে পালাত, বনের পাখী বাসা ছেড়ে আকাশে উঠত, হাজার হাজার হরিণ প্রাণভয়ে পথ-ভুলে ছুটতে ছুটতে যেখানে শিকারী সেইখানেই এসে উপস্থিত হত, ঘুমন্ত সিংহ জেগে উঠত, বাঘ হাঁকার দিত, —শিকারীরা কেউ বল্লম-হাতে মহিষের পিছনে, কেউ খাঁড়া-হাতে সিংহের সন্ধানে ছুটে চলত; কিন্তু নাগাদিত্য আজ বারবার ভেরী বাজালেন, বারবার শিকারীর দল চীৎকার করে উঠল, তবু সেই প্রকাণ্ড বনে একটিও বাঘের গর্জ্জন, একটিও পাখীর ঝটাপট্ কিম্বা হরিণের খুরের খুটখাট্ শোনা গেল না! —মনে হল, সমস্ত পাহাড় যেন ঘুমিয়ে আছে! রাগে নাগাদিত্যের দুই চক্ষু লাল হয়ে উঠল। তিনি দলবলের দিকে ফিরে বল্লেন,—“ঘোড়া ফেরাও। অসন্তুষ্ট ভীল-প্রজা এ বনের সমস্ত পশু অন্য পাহাড়ে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে। চল আজ গ্রামে গ্রামে, নগরে নগরে পশুর সমান ভীলের দল শিকার করিগে।”
মহারাজার রাজহস্তী শুঁড় দুলিয়ে কান কাঁপিয়ে পাহাড়ের উপর ইদরপুরের দিকে ফিরে দাঁড়াল;—তার পিঠের উপর সোনার হাওদা, জরীর বিছানা হীরের মত জ্বলে উঠল; তার চারিদিকে ঘোড়ায়চড়া রাজপুতের দুশো বল্লম সকালের আলোয় ঝক্মক্ করতে লাগল! নাগাদিত্য হুকুম দিলেন—“চালাও!” তখন কোথা থেকে গভীর গর্জ্জনে, সমস্ত পাহাড় যেন ফাটিয়ে দিয়ে প্রকাণ্ড একটা কালো বাঘ যেন একজন ভীল-সেনাপতির মত, সেই অত্যাচারী রাজার পথ আগ্লে পাহাড়ের সুড়িপথে রাজহস্তীর সম্মুখে এসে দাঁড়াল! নাগাদিত্য মহা আনন্দে ডান-হাতে বল্লম নিয়ে হাতীর পিঠে ঝুঁকে বসলেন। কিন্তু তাঁর হাতের বল্লম হাতেই রইল;—বনের অন্ধকার থেকে কালো চামরে সাজানো প্রকাণ্ড একটা তীর তাঁর বুকের একদিক থেকে আর-একদিক ফাটিয়ে দিয়ে শন্শন্-শব্দে বেরিয়ে গেল;—অত্যাচারী নাগাদিত্য ভীলদের হাতে প্রাণ হারালেন। তারপর চারিদিক থেকে হাজার হাজার কালো বাঘের মতো কালো কালো ভীল ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে রাজপুতের রক্তে পাহাড়ের গা রাঙা করে তুল্লে। একজনও রাজপুত বেঁচে রইল না; —কেবল সোনার সাজ-পরা মহারাজ নাগাদিত্যের কালো একটা পাহাড়ী ঘোড়া অন্ধকার সমুদ্রের সমান ভীল-সৈন্যের মাঝ দিয়ে ঝড়ের মত রাজবাড়ির দিকে বেরিয়ে গেল।
রাজমহিযী তখন ইদরপুরে কেল্লার ছাদে রাজকুমার বাপ্পাকে কোলে নিয়ে সন্ধ্যার হাওয়ায় বেড়িয়ে ![]()
আহত নাগাদিত্য বেড়াচ্ছিলেন, আর এক একবার যে পাহাড়ে মহারাজ শিকারে গিয়েছেন, সেই দিকে চেয়ে দেখছিলেন। এক সময়ে হঠাৎ পাহাড়ের দিকে একটি গোলমাল উঠল; তারপর রাণী দেখলেন, সেই পাহাড়ে রাস্তায়, বনের অন্ধকার থেকে, মহারাজার কালো ঘোড়াটি তীরের মত ছুটে বেরিয়ে, ঝড়ের মত কেল্লার দিকে ছুটে আসতে লাগল;—পিছনে তাঁর শত শত ভীল,—কারো হাতে বল্লম, কারো হাতে বা তীরধনুক! মহারাণী দেখলেন, কালো ঘোড়ার মুখ থেকে সাদা ফেনা চারিদিকে মুক্তোর মত ঝরে পড়ছে, তার বুকের মাঝ থেকে রক্তের ধারা রাস্তার ধূলোয় ছড়িয়ে যাচ্ছে; তারপর দেখলেন, আগুনের মত একটি তীর তার কালো-চুলের ভিতর দিয়ে ধনুকের মত তার সুন্দর বাঁকা ঘাড় সজোরে বিঁধে ঘোড়াটাকে মাটির সঙ্গে গেঁথে ফেল্লে; রাজার ঘোড়া কেল্লার দিকে মুখ ফিরিয়ে ধূলোর উপর ধড়ফড় করতে লাগল! ঠিক সেই সময় মহারাণীর মাথার উপর দিয়ে একটা বল্লম শনশন্শব্দে কেল্লার ছাদের উপর এসে পড়ল। রাজমহিষী ঘুমন্ত বাপ্পাকে ওড়নার আড়ালে ঢেকে তাড়াতাড়ি উপর থেকে নেমে এলেন। চারিদিকে অস্ত্রের ঝন্ঝনি আর যুদ্ধের চীৎকার উঠল।—সূর্য্যদেব মালিয়া-পাহাড়ের পশ্চিম পারে অস্ত গেলেন।
সে রাত্রি কি ভয়ানক রাত্রি! সেই মালিয়া-পাহাড়ের উপর অসংখ্য ভীল, তার মাঝে গুটিকতক রাজপুত প্রাণপণে যুদ্ধ করতে লাগলেন; আর অন্ধকার রাজপুরে নাগাদিত্যের বিবর মহিযী পাঁচ বৎসরের রাজকুমার বাপ্পাকে বুকে নিয়ে নির্জ্জন ঘরে বসে রইলেন। তিনি কতবার কত দাসীর নাম ধরে ডাকলেন,—কারো সাড়া শব্দ নেই! মহারাজের খবর জানবার জন্য তিনি কতবার কত প্রহরীকে চীৎকার করে ডাকলেন, কিন্তু তারা সকলেই যুদ্ধে ব্যস্ত,— মহারাণীর ঘরের ভিতর দিয়ে ছুটে গেল, তবু তাঁর কথায় কর্ণপাতও করলে না! রাণী তখন আকুল হৃদয়ে কোলের বাপ্পাকে ছোট একখানি উটের কম্বলে ঢেকে নিয়ে অন্দরমহলের চন্দনকাঠের প্রকাণ্ড দরজা সোনার চাবি দিয়ে খুলে বাইরে উঁকি মেরে দেখলেন; —রাত্রি অন্ধকার, রাজপুরী অন্ধকার, প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড পাথরের খিলান, তার মাঝে গজদন্তের কাজ-করা বড় বড় দরজা খোলা,—হাঁ হাঁ করছে; —অত বড় রাজপুরীতে যেন জনমানব নেই!
মহারাণী অবাক হয়ে এক-হাতে বাপ্পাকে বুকে ধরে আর-হাতে সোনার চাবির গোছা নিয়ে খোলা দরজায় দাঁড়িয়ে রইলেন। হঠাৎ সেই অন্ধকারে কার পায়ের শব্দ শোনা গেল;— চামড়ার জুতো-পরা রাজপুতবীরের মচ্মচ্ পায়ের শব্দ নয়; রূপার বাঁকি-পরা রাজদাসীর ঝিনিঝিনি পায়ের শব্দ নয়; কাঠের খড়ম-পরা পঁচাশি বৎসরের বুড়ো রাজপুরোহিতের খটাখট্ পায়ের শব্দ নয়; —এ যেন চোরের মত, সাপের মত খুস্খাস্, খিট্খাট্ পায়ের শব্দ! মহারাণী ভয় পেলেন। দেখতে দেখতে অসুরের মত একজন ভীলসর্দ্দার তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হল। মহারাণী জিজ্ঞাসা করলেন,—“কে তুই? কি চাস্?” ভীল-সর্দ্দার বাঘের মত গর্জ্জন করে বল্লে,—জানিসনে আমি কে? আমি সেই দুঃখী ভীল, যার মেয়েকে তোর মহারাজা দাসীর মত চিতোরের রাজাকে দিয়ে দিয়েছে। আজ কি সুখের দিন!—এই হাতে নাগাদিত্যের বুকে বল্লম বসিয়েছি, আজ এই হাতে তার ছেলে-সুদ্ধ মহারাণীকে দাসীর মত বেঁধে নিয়ে যাব।”
মহারাণীর পা থেকে মাথা পর্যন্ত কেঁপে উঠল। “ভগবান রক্ষা কর!” বলে তিনি সেই নিরেট সোনার বড় বড় চাবির গোছা সজোরে ভীল-সর্দ্দারের কপালে ছুঁড়ে মারলেন। দুরন্ত ভীল “মা রে!” বলে চীৎকার করে ঘুরে পড়ল; মহারাণী কচি বাপ্পাকে বুকে ধরে রাজপুরী থেকে বেরিয়ে পড়লেন; —তাঁর প্রাণের আধখানা মহারাজ নাগাদিত্যের জন্য হাহাকার করতে লাগল, আর-আধখানা এই মহাবিপদে প্রাণের বাপ্পাকে রক্ষা করবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠল।
রাণী পথ চল্তে লাগলেন; —পাথরে পা কেটে গেল, শীতে হাত জমে গেল, অন্ধকারে বারবার পথ ভুল হতে লাগল,—তবু রাণী পথ চল্লেন। কত দূর! কত দূর! কত দূর!—পাহাড়ের পথ কত দূর, কোথায় চলে গেছে, তার যেন শেষ নেই! রাণী কত পথ চল্লেন, তবু সে পথের শেষ নেই! ক্রমে ভোর হয়ে গেল, রাস্তার আশে-পাশে বীরনগরের দু-একটি ব্রাহ্মণের বাড়ি দেখা দিতে লাগল। পাহাড়ী হাওয়া বরফের মত ঠাণ্ডা। পাখীরাও তখন জাগেনি, এমন সময় নাগাদিত্যের মহিষী রাজপুত্র বাপ্পাকে কোলে নিয়ে সেই বীরনগরের ব্রাহ্মণী কমলাবতীর বাড়ির দরজায় ঘা দিলেন। আট-পুরুষ আগে, একদিন শিলাদিত্যের মহিষী পুষ্পবতী প্রাণের কুমার গোহকে এই বীরনগরের কমলাবতীর হাতে সঁপে গিয়েছিলেন; আর আজ আবার কত কাল পরে সেই কমলাবতীর নাতির নাতি বৃদ্ধ রাজপুরোহিতের হাতে গোহর বংশের গিহেলাট রাজকুমার বাপ্পাকে সঁপে দিয়ে, নাগাদিত্যের মহিষী চিতার আগুনে ঝাঁপ দিলেন।
সকালে বৃদ্ধ পুরোহিত রাজপুত্রকে আশ্রয় দিলেন, আর সেইদিন সন্ধ্যার সময় একটি ভীলের মেয়ে ছোট ছোট দুটি ছেলে কোলে তাঁরই ঘরে আশ্রয় নিলে। এদেরই পূর্বপুরুষ সব- প্রথমে নিজের আঙুল কেটে রাজপুত গোহের কপালে রক্তের রাজতিলক টেনে দিয়েছিল—আজ রাজপুত রাজার সঙ্গে তাদেরও সর্ব্বনাশ হয়ে গেল; বিদ্রোহী ভীলেরা তাদেরও ঘরদুয়োর জ্বালিয়ে দিয়ে তাদের তিনটিকে পাহাড়ের উপর থেকে দূর করে দিলে। রাজপুরোহিত সেই তিনটি ভীল আর রাজকুমার বাপ্পাকে নিয়ে বীরনগর ছেড়ে ভাণ্ডীরের কেল্লার যদুবংশের আর-এক ভীলের রাজত্বে কিছুদিন কাটালেন। কিন্তু সেখানেও ভীল রাজা, সেখানেও ভয় ছিল—কোন্ দিন কোন্ ভীল মা-হারা বাপ্পাকে খুন্ করে! ব্রাহ্মণ যে মহারাণীর কাছে প্রতিজ্ঞা করেছেন, বিপদে সম্পদে অনাথ বাপ্পাকে রক্ষা করবেন! তিনি একেবারে ভীলরাজত্ব ছেড়ে তাদের ক’টিকে নিয়ে নগেন্দ্রনগরে চলে গেলেন। একদিকে সমুদ্রের তিনটে ঢেউয়ের মত ত্রিকূট পাহাড়, আর-একদিকে মেঘের মত অন্ধকার পরাশর অরণ্য, মাঝখানে নগেন্দ্রনগর, কাছাকাছি শোলাঙ্কি বংশের একজন রাজপুত রাজার রাজবাড়ি। বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ সেই নগেন্দ্রনগরে ব্রাহ্মণ-পাড়ার গা-ঘেঁসে ঘর বাঁধলেন। সেই ভীলের মেয়ে তাঁর ঘরের সমস্ত কাজ কর্তে লাগল, আর রাজপুত্র বাপ্পা সেই দুটি ভাই,—ভীল বালিয় আর দেবকে নিয়ে মাঠে মাঠে বনে বনে গরু-চরিয়ে রাখাল-বালকদের সঙ্গে রাখালের মত খেলে বেড়াতে লাগলেন। রাজপুরোহিত কারো কাছে প্রকাশ করলেন না যে, বাপ্পা রাজার ছেলে; কেবল একটি তামার কবচে আগাগোড়া সমস্ত পরিচয় নিজের হাতে লিখে বাপ্পার গলায় বেঁধে দিলেন;—তাঁর মনে বড় ভয় ছিল, পাছে কোনো ভীল বাপ্পার সন্ধান পায়।
ক্রমে বাপ্পা যখন বড় হয়ে উঠলেন; যখন মাঠে মাঠে খোলা হাওয়ায় ছুটোছুটি করে, পাহাড়ে পাহাড়ে ওঠা-নামাতে রাজপুত্র বাপ্পার সুন্দর শরীর দিন দিন লোহার মত শক্ত হয়ে উঠল; যখন তিনি ক্ষেপা মোষ এক হাতে ঠেকিয়ে রাখতে পারতেন; সমস্ত রাখাল বালক যখন রাজপুত্র বোলে না জেনেও রাজার মত বাপ্পাকে ভয়, ভক্তি, সেবা কর্তে লাগল; তখন ব্রাহ্মণ অনেকটা নিশ্চিন্ত হলেন, তিনি তখন বাপ্পার শরীরের সঙ্গে মনকেও গড়ে তুলতে লাগলেন। তিনি প্রতিদিন সন্ধ্যার সময় একলা ঘরে বাপ্পার কাছে বসে সেই মালিয়া-পাহাড়ের গল্প, সেই ভীল-বিদ্রোহের গল্প, সেই রাণী পুষ্পবতী, মহারাজ শিলাদিত্য, রাজকুমার গোহ, তাঁর প্রিয়বন্ধু মাণ্ডলিকের কথা একে একে বল্তে লাগলেন। শুনতে শুনতে কখনো বাপ্পার চোখে জল আসত, কখনো বা রাগে মুখ লাল হয়ে উঠত, কখনো ভয়ে প্রাণ কাঁপত। বাপ্পা সারারাত্রি কখনো সূর্য্যের রথ, কখনো পাহাড়ে ভীলের যুদ্ধ স্বপ্নে দেখে জেগে উঠতেন; মনে ভাবতেন,—আমিও কবে হয় ত রাজা হব, লড়াই করব।
এমনি ভাবে দিন কাটছিল। সেই সময় একদিন শ্রাবণ মাসে নতুন নতুন ঘাসের উপর গোরুগুলিকে চরতে দিয়ে বনের পথে বাপ্পাদিত্য একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। সেদিন ঝুলন পর্ব্ব, রাজপুতদের বড় আনন্দের দিন; সকাল না হতে দলে দলে রাখাল নতুন কাপড় প’রে, কেউ ছোট ভাইবোনকে কোলে করে, কেউ বা দৈয়ের ভার কাঁধে নিয়ে, একজন তামাসা দেখতে, অন্য জন বা পয়সা করতে নগেন্দ্রনগরের রাজপুত-রাজার বাড়ির দিকে মেলা দেখতে ছুটল। বাপ্পা প্রকাণ্ড বনে একলা রইলেন; তাঁর প্রাণের বন্ধু দুটি,—ভাই ভীল বালিয় আর দেব, দিদির হাত ধরে এই আনন্দের দিনে বাপ্পাকে কতবার ডাকলে,—“ভাই, তুই কি রাজবাড়ি যাবি?” বাপ্পা শুধু ঘাড় নাড়লেন,—“না যাবনা।” হয় ত তাঁর মনে হয়েছিল,—আমার ভাই নেই, বোন নেই, মা নেই, আমি কার হাত ধরে কাকে নিয়ে আজ কিসের আনন্দের মেলা দেখতে যাব? কিন্তু যখন বালি আর দেব, ভীলনী-দিদির সঙ্গে সঙ্গে হাসতে হাসতে চলে গেল; যখন সকালের রোদ মেঘের আড়ালে ঢেকে গেল; বাপ্পার একটিমাত্র গাই চরতে চরতে যখন মাঠের পর মাঠ পার হয়ে বনের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল; যখন বনে আর সাড়া-শব্দ নেই, কেবল মাঝে মাঝে ঝিঁঝির ঝিনি-ঝিনি, পাতার ঝুরু-ঝুরু; সেই সময় বাপ্পার বড়ই একা-একা ঠেকতে লাগল। তিনি উদাস প্রাণে ভীলনী-দিদির মুখে-শোনা ভীল-রাজত্বের একটি পাহাড়ী গান ছোট একটি বাঁশের বাঁশীতে বাজাতে লাগলেন। সে গানের কথা বোঝা গেল না, কেবল ঘুমপাড়ানি গানের মত তার বুনো সুরটা মেঘলা দিনে বাদলার হাওয়ায় মিশে স্বপ্নের মত বাপ্পার চারিদিকে ভেসে বেড়াতে লাগল। আজ যেন তাঁর মনে পড়তে লাগল, —ঐ পশ্চিম দিকে যেখানে মেঘের কোলে সূর্য্যের আলো ঝিকিমিকি জ্বলছে, সেখানে কালো কালো মেঘ পাথরের মত জমাট বেঁধে রয়েছে, সেইখানে, সেই অন্ধকার আকাশের নীচে, তাঁদের যেন বাড়ি ছিল; সেই বাড়ির ছাদে চাঁদের আলোয় তিনি মায়ের হাত ধরে বেড়িয়ে বেড়াতেন; সে বাড়ি কি সুন্দর! সে চাঁদের কি চমৎকার আলো! মায়ের কেমন হাসিমুখ! সেখানে সবুজ ঘাসে হরিণ ছানা চরে বেড়াত; গাছের উপর টিয়ে-পাখী উড়ে বসত; পাহাড়ের গায়ে ফুলের গোছা ফুটে থাকত; —তাদের কি সুন্দর রং, কি সুন্দর খেলা! বাপ্পা সজল নয়নে মেঘের দিকে চেয়ে চেয়ে বাঁশের বাঁশীতে ভীলের গান বাজাতে লাগলেন;—বাঁশীর করুণ সুর কেঁদে কেঁদে, কেঁপে কেঁপে বন থেকে বনে ঘুরে ঘুরে বেড়াতে লাগল।
সেই বনের একধারে আজ ঝুলন-পূর্ণিমায়, আনন্দের দিনে, শোলাঙ্কি-বংশের রাজায় মেয়ে সখীদের নিয়ে খেলে বেড়াচ্ছিলেন। রাজকুমারী বল্লেন,—“শুনেছিস ভাই, বনের ভিতর রাখাল-রাজা বাঁশী বাজাচ্ছে!” সখীরা বল্লে,—“আয় ভাই, সকলে মিলে চাঁপা-গাছে দোলা খাটিয়ে ঝুলনো খেলা খেলি আয়!” কিন্তু দোলা খাটাবার দড়ি নাই যে! সেই বৃন্দাবনের মত গহন বন, সেই বাদলা দিনের গুরু গর্জ্জন, সেই দূরে বনে রাখালরাজের মধুর বাঁশী, সেই সখীদের মাঝে শ্রীরাধার সমান রূপবতী রাজনন্দিনী, সবই আজ যুগযুগান্তর আগেকার বৃন্দাবনে কৃষ্ণরাধার প্রথম ঝুলনের মত! এমন দিন কি ঝুলনা-বাঁধার একগাছি দড়ির অভাবে বৃথা যাবে? রাজনন্দিনী গালে হাত দিয়ে ভাবতে লাগলেন। আবার সেই বাঁশী, পাখীর গানের মত, বনের এপার থেকে ওপার আনন্দের স্রোতে ভাসিয়ে দিয়ে বেজে উঠল রাজকুমারী তখন হীরে-জড়ানো হাতের বালা সখীর হাতে দিয়ে বল্লেন,—“যা ভাই, এই বালার বদলে ঐ রাখালের কাছ থেকে একগাছা দড়ি নিয়ে আয়।”
রাজকুমারীর সখী সেই বালা হাতে বাপ্পার কাছে এসে বল্লে,—“এই বালার বদলে রাজকুমারীকে একগাছা দড়ি দিতে পার?” হাসতে হাসতে বাপ্পা বল্লেন,—“পারি, যদি রাজকুমারী আমার বিয়ে করেন।”
সেইদিন সেই নির্জ্জন বনে, রাজকুমারীর হাতে সেই হীরের বালা পরিয়ে দিয়ে রাজকুমার বাপ্পা চাঁপাগাছে ঝুলনা বেঁধে দিয়ে রাজকন্যার হাত ধরে বসলেন। চারিদিকে যত সখী দোলার উপর বর-ক’নেকে ঘিরে ঘিরে ঝুলনের গান গেয়ে ফিরতে লাগল; —“আজ কি আনন্দ, আজ কি আনন্দ!”
খেলা শেষ হল, সন্ধ্যা হল; রাজকুমারী বনের রাখালকে বিয়ে করে রাজবাড়িতে ফিরে গেলেন। আর বাপ্পা ফুলে ফুলে প্রফুল্ল চাঁপার তলায় বসে ঝুলনপূর্ণিমার প্রকাণ্ড চাঁদের দিকে চেয়ে ভাবতে লাগলেন,—আজ কি আনন্দ, আজ কি আনন্দ!
হঠাৎ একটুখানি পূবের হাওয়া গাছের পাতা কাঁপিয়ে ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে, হুহু-শব্দে পশ্চিম দিকে চলে গেল; সেই সঙ্গে বড় বড় দুটি বৃষ্টির ফোঁটা টুপ্ টাপ্ করে চাঁপা-গাছের সবুজ পাতার উপরে ঝরে পড়ল। বাপ্পা আকাশের দিকে চেয়ে দেখলেন—পশ্চিম দিক থেকে একখানা কালো মেঘ ক্রমশ পূবদিকে এগিয়ে চলেছে, মাঝে মাঝে গুরুগুরু গর্জ্জন আর ঝিকিমিকি বিদ্যুৎ হানছে! বাপ্পা তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালেন; মনে পড়ল, ঘরে ফিরতে হবে। দুধের মত সাদা তাঁর ধবলী গাই বনের মাঝে ছাড়া আছে, তিনি চাঁপা-গাছ থেকে ছাঁদন দড়ি খুলে নিয়ে ধবলী গাইটির সন্ধানে চল্লেন। তখন চারিদিকে অন্ধকার, মাঝে মাঝে গাছে গাছে রাশি রাশি জোনাকী-পোকা হীরের মত ঝক্ঝক্ করছে, আর জায়গায় জায়গায় ভিজে মাটির নরম গন্ধ বনস্থল পরিপূর্ণ করেছে। বাপ্পা সেই অন্ধকার বনের পথে পথে ধবলীর সন্ধানে ফিরতে লাগলেন। হঠাৎ এক জায়গায়, ঘন বেত-বনের আড়ালে, বাপ্পা দেখলেন,—এক তেজোময় ঋষি ধ্যানে বসে আছেন; ঠিক তাঁর সম্মুখে মহাদেবের নন্দের মত তাঁর ধবলী গাই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর সেই সাদা গাইয়ের গাঢ় দুধ সুধার মত একটি শ্বেতপাথরের শিবের মাথায় আপনা-আপনি ঝরে পড়ছে। বাপ্পা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
ক্রমে ধ্যানভঙ্গে মহর্ষির দুটি চোখ সকালবেলায় পদ্মের পাপড়ির মত ধীরে ধীরে খুলে গেল। মহর্ষি মহাদেবকে প্রণাম করে এক অঞ্জলি দুধের ধারা পান করলেন। তারপর বাপ্পার দিকে ফিরে বল্লেন, “শোনো বৎস, আমি মহর্ষি হারীত। তোমায় আশীবর্বাদ করছি, তুমি দীর্ঘজীবী হও, পৃথিবীর রাজা হও। তোমার ধবলীর দুধের ধারায় আজ আমি বড়ই তুষ্ট হয়েছি! আজ আমার মহাপ্রস্থানের দিন, এই শেষদিনে তোমায় আর কি দেব? এই ভগবতী ভবানীর খাঁড়া, এই অক্ষয় ধনুঃশর,—এই খাঁড়া পাহাড়ও বিদীর্ণ করে, এই ধনুঃশর পৃথিবী জয় করে দেয়,—এই দুটি তুমি লও। আর, বৎস, ভগবান একলিঙ্গের এই শ্বেত পাথরের মূর্ত্তিটি তুমি সঙ্গে রেখো, সর্ব্বদা এঁর পূজা করবে। আজ হতে তোমার নাম হল—একলিঙ্গকা দেওয়ান। তোমার বংশে যত রাজা, এই নাম নিয়েই সিংহাসনে বসবে।” তারপর নিজের হাতে বাপ্পার গলার চামড়ার পৈতা জড়িয়ে দিয়ে মহর্ষি সমাধিতে বসলেন। দেখতে দেখতে তাঁর পবিত্র শরীর আগুনের মত ধূধূ করে জ্বলে গেল। বাপ্পা, কোমরে খাঁড়া, হাতে ধনুঃশর, মাথায় একলিঙ্গের পাথরের মূর্ত্তি ধরে ধবলী-গাইয়ের পিছনে পিছনে ফিরে চল্লেন;— মেঘের গুরুগুরু, দেবতার দুন্দুভির মত, সমস্ত আকাশ জুড়ে বাজতে লাগল।
তখন ভোর হয়েছে, মেলা-শেষে মলিন মুখে যে যার ঘরে ফিরছে, বাপ্পা সেই যাত্রীদের সঙ্গে ঘরে ফিরলেন।
কিছুদিন পরেই বাপ্পাকে নগেন্দ্রনগর ছেড়ে যেতে হল। ঝুলন-পূর্ণিমার খেলাচ্ছলে দুজনে বিয়ে হবার পর বিদেশ থেকে রাজকুমারীর বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে এক ব্রাহ্মণ রাজসভায় উপস্থিত হলেন; সেইদিন সন্ধ্যাবেলা নগেন্দ্রনগরে রাষ্ট হয়ে গেল যে, ব্রাহ্মণ, রাজকন্যার হাত দেখে গুণে বলেছেন, আগেই না কি কোন্ বিদেশীর সঙ্গে রাজকুমারীর বিয়ে হয়ে গেছে; আজ রাজার গুপ্তচর সেই বিদেশীর সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে;—রাজা তার মাথা আনতে হুকুম দিয়েছেন। কথাটা শুনে বাপ্পার মন অস্থির হয়ে উঠল, ভাবনায় ভাবনার সমস্ত রাত কাটিয়ে ভোরে উঠে তিনি দেশ ছেড়ে যাবার জন্যে প্রস্তুত হলেন। যাবার সময় বাপ্পা তাঁর পালক-পিতা পঁচাশি বৎসরের সেই রাজপুরোহিতের কাছে সমস্ত কথা প্রকাশ করে বল্লেন,—“পিতা, আমায় বিদায় দাও। আমি তো এখন বড় হয়েছি; আমার জন্য তোমরা কেন বিপদে পড়?” ব্রাহ্মণ বল্লেন,— “বৎস, তুমি জাননা তুমি কে; তুমি রাজপুত্র; তোমার মা তোমাকে আমার হাতে সঁপে গেছেন; আমি আজ এই অল্প বয়সে একা ভিখারীর মত তোমাকে কেমন করে বিদায় করব?” বাপ্পা তখন ভগবতীর সেই খাঁড়া আর অক্ষয় ধনুঃশর দেখিয়ে বল্লেন, —“পিতা, বিদেশে এরাই আমার সহায়, আর আছেন একলিঙ্গজী।” ব্রাহ্মণ তখন আনন্দে দুই হাত তুলে আশীর্ব্বদ কল্লেন,—“যাও বৎস, তুমি রাজার ছেলে, রাজারই মত ধনুঃশর হাতে পেয়েছ! আমি বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ আশীর্ব্বাদ করছি পৃথিবীর রাজা হও, যদি কেউ তোমার পরিচয় চায়, তবে গলার কবচ খুলে দেখিয়ে দিও কোন্ পবিত্র বংশে তোমার জন্ম, তোমার পূর্বপুরুষেরা কোন্ রাজসিংহাসন উজ্জ্বল করে গেছেন! যাও বৎস, সুখে থাক!”
ব্রাহ্মণের কাছে বিদায় হয়ে বাপ্পা ভীলনী-দিদির কাছে বিদায় হতে চল্লেন, কিন্তু সেখানে বিদায় নেওয়া ততটা সহজ হল না। অনেক কাঁদাকাটার পর ভীলনীদিদি বল্লেন,—“বাপ্পা রে, যদি যাবি তবে তোর দুটি ভাই, বালিয় দেবকে সাথে নে। ওরে বাপ্পা, তোকে একা ছেড়ে দিতে প্রাণ আমার কেমন-কেমন করে যে!” তারপর তিনজনের হাতে তিন তিনখানি পোড়া রুটি দিয়ে ভীলনী-দিদি তিনটি ভাইকে বিদায় কল্লেন। বাপ্পা বালিয় ও দেবকে সঙ্গে নিয়ে গহন বনে চলে গেলেন। সেখানে বড় বড় পাথরের থামের মত প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড গাছের গুঁড়ি আকাশের দিকে ঠেলে উঠেছে, কোথাও ময়ূর-ময়ূরী বন আলো করে উড়ে বেড়াচ্ছে, কোথাও আস্ত ছাগল গিলে প্রকাণ্ড একটা অজগর স্থির হয়ে পড়ে, কোথাও বাঘের গর্জ্জন, কোথাও বা পাখীর গান; এক জায়গায় সবুজ ঘাসে সোনার রোদ, আর-জায়গায় কাজলের সমান নীল অন্ধকার! বাপ্পা, বালিয় ও দেবকে সঙ্গে নিয়ে কখনো বনের মনোহর শোভা দেখতে দেখতে, কখনো মহা মহা বিপদের মাঝখান দিয়ে ভগবতী ভবানীর খাঁড়া হাতে নির্ভয়ে চল্লেন।
সেই প্রকাণ্ড পরাশর অরণ্য পার হতে তাঁর তিন দিন, তিন রাত কেটে গেল। রাজপুত্র বাপ্পা সেই তিন দিন, তিনখানি পোড়া রুটি খেয়ে কাটিয়ে দিলেন। তারপর গ্রামের পর গ্রাম, দেশের পর দেশ পার হয়ে, কত বর্ষা, কত শীত, পথে পথে কাটিয়ে, বাপ্পা মেবারে মৌর্য্যবংশীয় রাজা মানের রাজধানী চিতোর নগরে উপস্থিত হলেন। সেখানে তখন মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধের মহা আয়োজন হচ্ছে। হাতীর পিঠে, উটের উপরে গোলাগুলি, চালডাল, তাম্বু-কানাত; গোরুর গাড়িতে অস্ত্রশস্ত্র, খাবারদাবার, বড় বড় জালায় খাবার জল, রাঁধবার ঘি তোলা হচ্ছে। রাস্তায় রাস্তায় রাজপুত সৈন্য মাথায় পাগড়ি হাতে-বল্লম ঘুরে বেড়াচ্ছে। চারিদিকে রাজার চর মুসলমানের সন্ধানে সন্ধানে ফিরছে। মহারাজা মান নিজে সামন্ত রাজাদের নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধের সমস্ত আয়োজন দেখে বেড়াচ্ছেন,—চারিদিকে হৈ হৈ পড়ে গেছে।
এত গোলমাল, এত লোকজন, এমন প্রকাণ্ড নগর, এত বড় বড় পাথরের বাড়ি বাপ্পা এ পর্য্যন্ত কখনো দেখেন নি। নগেন্দ্রনগরে বাড়ি ছিল বটে, কিন্তু তার মাটির দেওয়াল। সেখানেও মন্দির ছিল কিন্তু সে কত ছোট! বাপ্পা আশ্চর্য্য হয়ে রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন, বালিয় আর দেব বড় বড় হাতী দেখে অবাক হয়ে হাঁ করে রইল। সেই সময় রাজা মান ঘোড়ায় চড়ে সেই রাস্তায় উপস্থিত হলেন;—সাদা ঘোড়ার সোনার সাজ মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, মাথায় রাজছত্র ঝল্মল্ করছে, দুইদিকে দুইজন ময়ূর-পাখার চামর ঢোলাচ্ছে! বাপ্পা ভাবলেন,—রাজার সঙ্গে দেখা করবার এই ঠিক সময়। তিনি তৎক্ষণাৎ বালিয় ও দেবের হাত ধরে রাস্তার মাঝে উপস্থিত হয়ে ভগবতী ভবানীর খাঁড়া কপালে স্পর্শ করে মহারাজকে প্রণাম করলেন। রাজা মান জিজ্ঞাসা করলেন,—“কে তুমি? কি চাও?” বাপ্পা বল্লেন, -“আমি রাজপুত-রাজার ছেলে, আপনার আশ্রয়ে রাজার মত থাকতে চাই।” এই ভিখারী আবার রাজার ছেলে! চারিদিকে বড় বড় সর্দ্দার মুখ টিপে হাসতে লাগলেন, কিন্তু রাজা মান বাপ্পার প্রকাণ্ড শরীর, সুন্দর মুখ, অক্ষয় ধনুঃশর আর সেই ভবানীর খাঁড়া দেখেই বুঝেছিলেন—এ কোনো ভাগ্যবান, ভগবান কৃপা করে এই মুসলমান-যুদ্ধের সময় এই বীর পুরুষকে আমার কাছে পাঠিয়েছেন। মান রাজা তৎক্ষণাৎ নিজের জরীর শাল বাপ্পার গায়ে পরিয়ে দিয়ে একটা কালো ঘোড়া বাপ্পার জন্যে আনিয়ে দিলেন। বাপ্পা বল্লেন,—“মহারাজ, আমার ভীল-ভাইদের জন্যে ঘোড়া আনিয়ে দিন্।” তারপর, বালিয় ও দেবকে ঘোড়ায় চড়িয়ে বাপ্পা সেই কালো ঘোড়ায় উঠে বসলেন;—সমস্ত সৈন্যসামন্ত ও সেনাপতির মাথার উপর বাপ্পার প্রকাণ্ড শরীর, সমুদ্রের মাঝে পাহাড়ের মত, প্রায় আধখানা জেগে রইল; তখন রাস্তার লোক দেখে বলতে লাগল -হাঁ বীর বটে! যেমন চেহারা তেমনি শরীর! চারিদিকে ধন্য ধন্য পড়ে গেল; কেবল রাজার যত সেনাপতি মাথার উপরে রাজবেশমোড়া সেই ভিখারীকে দেখে মান রাজার উপর মনে মনে অসন্তুষ্ট হলেন। রাজা দিন দিন বাপ্পাকে যতই সুনয়নে দেখতে লাগলেন, যতই তাকে আদর-অভ্যর্থনা করতে লাগলেন, ততই সেনাপতিদের মন হিংসার আগুনে পুড়তে লাগল।
ক্রমে মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধের দিন উপস্থিত হল। সেইদিন রাজসভায় দেশ-বিদেশের যত সামন্ত-রাজা, যত বুড়ো বুড়ো সেনাপতি একমত হয়ে মান রাজার সম্মুখে দাঁড়িয়ে বল্লেন,— “মহারাজ! আমরা অনেক সময় অনেক যুদ্ধে তোমার জন্যে প্রাণ দিতে গিয়েছি, সে কেবল তুমি আমাদের ভালোবাসতে বলে, আমাদের বিশ্বাস করতে বলে; যদি মহারাজ, আজ তুমি সেই ভালোবাসা ভুলে একজন পথের ভিখারীকে আমাদের সকলের উপরে বসালে, বাপ্পা আজ যদি তোমার প্রাণের চেয়ে প্রিয়, সকলের চেয়ে বিশ্বাসী হল—তবে আমাদের আর কাজ কি? বাপ্পাকেই এই মুসলমান-যুদ্ধে সেনাপতি কর; আমাদের বীরত্ব তো অনেকবার দেখা আছে, এবার নতুন সেনাপতি কেমন করে যুদ্ধ করেন দেখা যাক্!” মহারাজ মান চিরবিশ্বাসী রাজভক্ত সর্দ্দারদের মুখে হঠাৎ এই নিষ্ঠুর কথা শুনে বজ্রাহতের মত স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন, তাঁর আর কথা বলবার শক্তি থাকল না। তখন সেই প্রকাণ্ড রাজসভায় সেই বিদ্রোহী সর্দ্দারদের মধ্যস্থলে পোনেরো বৎসরের বীর বালক বাপ্পাদিত্য উঠে দাঁড়িয়ে বল্লেন,—“শুনুন মহারাজ! আজ রাজস্থানের প্রধান প্রধান সর্দ্দারেরা রাজসভায় দাঁড়িয়ে বলেছেন, —এ ঘোর বিপদের সময় বাপ্পাই এবার সেনাপতি হয়ে যুদ্ধ চালান; তবে তাই হোক!” রাজা মান হতাশের মত চারিদিকে চেয়ে দেখলেন, তারপর ধীরে ধীরে বল্লেন,—“তবে তাই হোক।” তারপর একদিক দিয়ে মূচ্ছিতপ্রায় মান রাজা চাকরের কাঁধে ভর দিয়ে অন্তঃপুরে চলে গেলেন, আর-একদিক দিয়ে বাপ্পাদিত্য সৈন্য সাজাতে বাহির হলেন।
বিদ্রোহী সর্দ্দারদের মাথা হেঁট হল। তাঁরা মনে ভেবেছিলেন যে, পোনেরো বৎসরের বালক বাপ্পা যুদ্ধে যেতে কখনই সাহস পাবে না,—সভার মাঝে অপমান হবে। কিন্তু যখন সেই বীর বালক নির্ভয়ে হাসিমুখে এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধের ভার রাজার কাছে চেয়ে নিলে, তখন তাঁদের বিস্ময়ের সীমা রইল না। তাঁরা আরও আশ্চর্য্য হলেন, যখন সেই বাপ্পা—যাকে তাঁরা একদিন পথের ভিখারী বলে ঘৃণা করেছেন —পোনেরো বৎসরের সেই বালক বাপ্পা—যুদ্ধ জয় করে কোটি কোটি রাজপুত প্রজার আশীর্ব্বদ, জয়জয়কারের মধ্যে একদিন শুভদিনে শুভক্ষণে সমস্ত রাজস্থানের রাজমুকুটের সমান রাজপুতের রাজধানী চিতোর নগরে ফিরে এলেন, সেদিন সমস্ত রাজস্থান বেড়ে কি আনন্দ, কি উৎসাহ!
নতুন সেনাপতি বাপ্পা সমস্ত রাজস্থানকে ভয়ঙ্কর মুসলমানের হাত থেকে রক্ষা করে যেদিন চিতোর নগরে ফিরে এলেন, সেইদিন রাজা মানের বুড়ো বুড়ো সর্দ্দারেরা ক্ষুণ্ণ মনে রাজসভা ছেড়ে গেলেন। মহারাজ মান তাঁদের ফিরিয়ে আনতে কতবার কত চেষ্টা করলেন, কাকুতি-মিনতি, এমন কি শেষে রাজগুরুকে পর্য্যন্ত তাঁদের কাছে পাঠালেন কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না; সর্দ্দারেরা দূতের মুখে বলে পাঠালেন, —“আমরা মহারাজের নিমক খেয়েছি, এক বৎসর পর্য্যন্ত আমরা শত্রুতা করব না, বৎসর শেষ হলে যুদ্ধক্ষেত্রে দেখা হবে।”
সেই এক বৎসর কত ভীষণ ষড়যন্ত্র, কত ভয়ঙ্কর পরামর্শে কেটে গেল! এক বৎসর পরে সেই বিদ্রোহী সর্দ্দারদের দুষ্ট পরামর্শে রাজা মানকে ভুল বুঝে বাপ্পা তাঁদের সকলের সেনাপতি হয়ে যুদ্ধে চল্লেন। রাজা মান যখন শুনলেন, বাপ্পা তাঁর রাজসিংহাসন কেড়ে নিতে আসছেন; যখন শুনলেন, যে বাপ্পাকে তিনি পথের ধূলা থেকে একদিন রাজসিংহাসনের দিকে তুলে নিয়েছিলেন, যার দীনহীন বেশ একদিন তিনি রাজবেশ দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলেন, যাকে তিনি প্রাণের চেয়ে প্রিয় ভেবেছিলেন—হায় রে! সেই অনাথ আজ সমস্ত কৃতজ্ঞতা ভুলে তাঁরই রাজছত্র কেড়ে নিতে আসছে, তখন তাঁর দুই চক্ষে ঝরঝর করে জল পড়তে লাগল।
তিনি সেই বৃদ্ধ বয়সে একা একদল রাজভক্ত সৈন্য নিয়ে যুদ্ধে গেলেন; সেই যুদ্ধই তাঁর শেষ যুদ্ধ হল; —যুদ্ধক্ষেত্রে বাপ্পার হাতে মান রাজা প্রাণ দিলেন।
ষোলো বৎসরে, বাপ্পা দেববন্দরের রাজকন্যাকে বিয়ে করে, হিন্দুমুকুট, হিন্দুসূর্য্য, রাজগুরু, চাকুয়া উপাধি নিয়ে, চিতোরের রাজসিংহাসনে বসলেন। বালিয় ও দেব, দুটি ভাই ভীল, বাপ্পার কপালে রাজতিলক টেনে দিয়ে দুখানা গ্রাম বকশিশ্ পেলে। বাপ্পা সেইদিন নিয়ম করে দিলেন যে, তাঁর বংশের যত রাজা সকলকেই এই দুই ভীলের বংশাবলীর হাতে রাজটীকা নিয়ে সিংহাসনে বসতে হবে। আজও সেই নিয়ম চলে আসছে।
এই নতুন নিয়ম বাপ্পা রাজস্থানে যখন প্রচলিত কল্লেন, তখন এই ভীলের হাতে রাজটীকা নেবার কথা যে শুন্লে, সেই মনে ভাবলে নতুন রাজার এ একটা নতুন খেয়াল। কিন্তু মান-রাজার সভাপণ্ডিতেরা ভাবলেন, ইনি কি তবে গিহেলাট রাজকুমার গোহের বংশীয়? —সূর্যবংশেই তো ভীলের হাতে রাজটীকা নেবার নিয়ম ছিল জানি! মহারাজ বাপ্পা, নাগাদিত্যের মহিষী চিতোর-রাজকুমারীর ছেলে নয় তো? রাজা মান, বাপ্পার মায়ের ভাই, মামা নয়তো?—ছি, ছি! বাপ্পা কি অধর্ম্ম কল্লেন;——চোরের মত মামার সিংহাসন আপনি নিলেন? —এমন নিষ্ঠুর রাজার রাজত্বে থাকাও যে মহাপাপ! পণ্ডিতেরা আর রাজসভার মুখো হলেন না,—একে একে চিতোর ছেড়ে অন্য দেশে চলে গেলেন! হায়, তাঁরা যদি জানতেন বাপ্পা কত নির্দোষ;—বাপ্পা স্বপ্নেও ভাবেন নি রাজা মান তাঁর মামা! তিনি তাঁর পালকপিতা, সেই বৃদ্ধ রাজপুরোহিতের কাছে ভীল-বিদ্রোহ, রাজা গোহ, গায়েব-গায়েবীর গল্প শুনতেন বটে, কিন্তু তিনি জানতেন না যে, যার নিষ্ঠুর অত্যাচারে সরল ভীলরা একদিন ক্ষেপে উঠেছিল, সেই মহারাজ নাগাদিত্য তাঁর পিতা; তিনি জানতেন না যে, তাঁরই পূর্ব্বপুরুষ রাজকুমার গোহ,—যাঁকে রাণী পুষ্পবতী ব্রাহ্মণী কমলাবতীর হাতে সঁপে দিয়ে চিতার আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। বাপ্পা ভাবতেন, তিনি কোনো সামান্য রাজ্যের রাজপুত্র!
রাজা হবার পর বাপ্পা যখন দেববন্দরের রাজকন্যাকে বিয়ে করে ফিরে আসেন, তখন বাণমাতা-দেবীর সোনার মূর্ত্তি সঙ্গে এনেছিলেন। চিতোরের রাজপ্রাসাদে শ্বেতপাথরের মন্দিরে সোনার সেই দেবীমূর্ত্তি প্রতিষ্ঠা করে বাপ্পা প্রতিদিন দুই সন্ধ্যা পূজো করতেন।
অনেক দিন কেটে গেছে, বাপ্পা প্রায় বুড়ো হয়েছেন, সেই সময় একদিন ভক্তিভরে বাণমাতাকে প্রণাম করে ওঠবার সময় বাপ্পার গলা থেকে ছেলেবেলার সেই তামার কবচ ছিঁড়ে পড়ল। বাপ্পা বড় হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু সূতায় বাঁধা তামার কবচটি তাঁর গলায় যেমন তেমনিই ছিল;—অনেক দিনের অভ্যাসে মনেই পড়ত না যে, গলায় একটা-কিছু আছে। আজ যখন হীরামোতির কুড়িগাছা হারের নীচে থেকে সেই পুরোনো কবচখানি পায়ের তলায় ছিঁড়ে পড়ল তখন বাপ্পা চম্কে উঠে ভাবলেন,—এ কি! এতদিন আমার মনেই ছিল না যে এতে লেখা আছে আমি কে, কোথায় ছিলুম; আজ সব সন্ধান পাওয়া যাবে। বাপ্পা প্রফুল্লমুখে সেই তামার কবচ মহারাণীর হাতে এনে দিয়ে বল্লেন,—“পড় ত শুনি।” বাপ্পা নিজে এক অক্ষরও পড়তে জানতেন না। মহারাণী বাপ্পার পায়ের কাছে বসে পড়তে লাগলেন। কবচের এক পিঠে লেখা রয়েছে,—বাসস্থান ত্রিকূট পর্ব্বত, নগেন্দ্রনগর, পরাশর অরণ্য। বাপ্পা হাসি মুখে রাণীর কাঁধে হাত রেখে বল্লেন,—“এই আমার ছেলেবেলার দেশ, এইখানে কত খেলা খেলেছি! সেই ত্রিকূট পাহাড়, সেই আশী বৎসরের বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের গম্ভীর মুখ, নগেন্দ্রনগরের ঝুলনপূর্ণিমায় সেই জ্যোৎস্না রাত্রি, সেই শোলাঙ্কি-রাজকুমারীর মধুর হাসি, স্বপ্নের মত আমার এখনো মনে আসে। আমি কতবার কত লোককে জিজ্ঞাসা করেছি, কিন্তু পৃথিবীতে তিনটে-চূড়ো-পাহাড় কত আছে কে তার সন্ধান পাবে! আমি যদি বলতে পারতেম যে সেই মেঘের মত তিনটে পাহাড়ের ঢেউকে “ত্রিকূট” বলে, যদি বলতে পারতেম সেই ছোট সহরের নাম নগেন্দ্রনগর, যদি জানতে পারতেম সেই ঘন বন, যেখানে আমি রাখালদের সঙ্গে খেলে বেড়াতেম, যেখানে ঝুলনপূর্ণিমায় শোলাঙ্কি-রাজকুমারীকে বিয়ে করেছিলেম, সেটি পরাশর অরণ্য, তবে কোনো গোলই হত না। হায় হায়! জন্মাবধি লেখা-পড়া না শিখে এই ফল! এতকাল পরে কি আর সেই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ, সেই শোলাঙ্কি–রাজনন্দিনীকে ফিরে পাব? পড় ত শুনি আর কি লেখা আছে।” রাণী কবচের আর-এক পিঠ উল্টে পড়তে লাগলেন,—জন্মস্থান মালিয়া-পাহাড়, পিতা নাগাদিত্য, মাতা চিতোর-কুমারী, নাম বাপ্পা।
মহারাণীর বড় বড় চোখ মহাবিস্ময়ে আরও বড় হয়ে উঠল,—তিনি তামার সেই কবচ হাতে বাপ্পার পায়ের তলায়, ফুলের বিছানার মত সুন্দর গালিচায় অবাক হয়ে বসে রইলেন; আর গজদন্তের পালঙ্কের উপর বাপ্পা ডান হাতের আঙুলে এক ফোঁটা রক্তের মত বড় একখানা লালের আঙুটির দিকে চেয়ে ভাবতে লাগলেন,—হায় হায়! কি পাপ করেছি! এই হাতে পিতৃহন্তা ভীলদের শাসন না করে, মামার প্রাণহন্তা হয়ে আমি সিংহাসনে বসেছি! মহারাণি! আমি মহাপাপী, আমি চিতোরের সিংহাসনে বসবার উপযুক্ত নই। এখন পিতৃহত্যার প্রতিশোধ আর আত্মীয়-বধের প্রায়শ্চিত্ত আমার জীবনের ব্রত হল।
একলিঙ্গের দেওয়ান বাপ্পা সেই দিনই সকলের কাছে বিদায় হয়ে, দশ হাজার দেওয়ানী ফৌজ নিয়ে চিতোর থেকে বার হলেন। তাঁর সমস্ত রাগ মালিয়া-পাহাড়ে ভীল-রাজত্বের উপর গিয়ে পড়ল। বাপ্পা মালিয়া-পাহাড় জয় করে ভীল-রাজত্ব ছারখার করে চলে গেলেন। তারপর, দেশবিদেশ,—কাশ্মীর, কাবুল, ইস্পাহান, কান্দাহার, ইরান, তুরান, জয় করলেন। বাপ্পার সকল সাধ পূর্ণ হল;—মালিয়া-পাহাড় জয় করে পিতৃহত্যার প্রতিশোধের সাধ পূর্ণ হল, আধখানা পৃথিবী চিতোর-সিংহাসনের অধীনে এনে আত্মীয়-বধের কষ্ট অনেকটা দূর হল;—কিন্তু তবু মনের শান্তি প্রাণের আরাম কোথায় পেলেন? বাপ্পা যখন সমস্ত দিন যুদ্ধের পর, শ্রান্ত হয়ে নিজের শিবিরে বসে থাকতেন, যখন নিস্তব্ধ যুদ্ধক্ষেত্র কোনো দিন পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় আলোময় হয়ে যেত, তখন বাপ্পার সেই ঝুলন-পূর্ণিমার রাত্রে চাঁপাগাছের ঝুলনায় শোলাঙ্কি-রাজকুমারীর হাসি-মুখ মনে পড়ত; যখন কোনো নূতন দেশ জয় করে বাপ্পা সেখানকার নূতন রাজপ্রাসাদে সোনার পালঙ্কে নহবতের মধুর সুর শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তেন, তখন সেই পূর্ণিমার রাতে চাঁপাগাছের চারিদিক ঘিরে ঘিরে রাজকুমারীর সখীদের সেই ঝুলন-গান স্বপ্নের সঙ্গে বাপ্পার প্রাণে ভেসে আসত। শেষে যেদিন তিনি নগেন্দ্রনগরে গিয়ে দেখলেন তাঁদের পাতার কুটীর, মাটির দেওয়াল, মাটির সঙ্গে মিশে গেছে, যখন দেখলেন, শোলাঙ্কি-রাজার রাজবাড়ি জনশূন্য, নিস্তব্ধ, অন্ধকার হয়ে পড়ে আছে,— সে রাজকুমারীও নেই, সে সখীও নেই, তখন বাপ্পার মন একেবারে ভেঙে গেল;—তিনি শান্তিহারা পাগলের মত সেই দিগ্বিজয়ী সৈন্য নিয়ে শান্তির আশায় এদেশ ওদেশ ঘুরে বেড়াতে লাগলেন;—চিতোরের প্রকাণ্ড রাজপ্রাসাদ, শূন্য সিংহাসন আর অন্দরে একা মহারাণীকে নিয়ে, পড়ে রইল!
এই রকম দেশে বিদেশে ঘুরতে ঘুরতে বাপ্পা এক দিন বল্লভীপুরে গায়নী-নগরে—যেখানে দুটি ভাইবোন গায়েব-গায়েবী পৃথিবীর আলো প্রথম দেখেছিলেন সেইখানে—উপস্থিত হলেন। এক দিন, ষোল বৎসর বয়সে, রাজা মানের সেনাপতি হয়ে বাপ্পা মুসলমান সুলতান সেলিমের সমস্ত সৈন্য এই গায়নী-নগর থেকে তাড়িয়ে দিয়ে চিতোরে ফিরে গিয়েছিলেন; আজ কত বৎসর পরে যখন কালো চুলে পাক ধরেছে, যখন চোখের কোলে কালি পড়েছে, গায়ের মাংস লোল হয়েছে, পৃথিবী যখন তাঁর কাছে অনেকটা পুরোনো হয়ে এসেছে, সেই সময় বাপ্পা আর-একবার সেই গায়নী-নগরে ফিরে এলেন। গায়নী-নগর দেখে বাপ্পার সেই দুটি ভাইবোন গায়েব-গায়েবীর গল্প মনে পড়ল।
বাপ্পাদিত্য সেই সূর্য্যকুণ্ডের জলে সূর্য্য—পূজা করে, গায়নীর রাজপ্রাসাদে শ্বেতপাথরের শয়ন-মন্দিরে বিশ্রাম করতে গেলেন। হঠাৎ অর্দ্ধেক রাত্রে, কার একটি মধুর গান শুনতে শুনতে বাপ্পার ঘুম ভেঙে গেল। তিনি শয়ন-মন্দির থেকে পাথরের ছাদে বেরিয়ে দাঁড়ালেন;—সম্মুখে মুসলমানদের প্রকাণ্ড মস্জিদ্ জ্যোৎস্নার আলোয় ধপ্ ধপ্ করছে, আকাশে আধখানি চাঁদ, চারিদিক নিসুতি। বাপ্পা জ্যোৎস্নার আলোয় দাঁড়িয়ে গান শুনতে লাগলেন। তাঁর মনে হল, এ গান যেন কোথায় শুনেছেন। হঠাৎ দক্ষিণের হাওয়ায় গানের কথা আরো স্পষ্ট হয়ে বাপ্পার কানের কাছে ভেসে এল; বাপ্পা চমকে উঠে শুনলেন,—“আজ কি আনন্দ, ঝুলত ঝুলনে শ্যামর চন্দ!”— এ যে সেই গান! নগেন্দ্রনগরে রাজপুত-রাজকুমারীর ঝুলন-গান!
বাপ্পা ছাদের উপর ঝুঁকে দাঁড়ালেন; নীচে দেখলেন, এক ভিখারিণী রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাইছে,— “আজি কি আনন্দ—।” বাপ্পা তৎক্ষণাৎ সেই ভিখারিণীকে ডেকে পাঠালেন;—সেই চাঁদের আলোয় নির্জ্জন শ্বেতপাথরের ছাদে, পথের ভিখারিণী, রাজ্যেশ্বর বাপ্পার সম্মুখে এসে দাঁড়াল। বাপ্পা জিজ্ঞাসা করলেন,—“কে তুমি? তুমি কি নগেন্দ্রনগরের শোলাঙ্কি-রাজকুমারী? তুমি কি কখনো ঝুলন-পূর্ণিমায় এক রাখাল বালককে বিয়ে করেছিলে?” ভিখারিণী অনেকক্ষণ একদৃষ্টে বাপ্পার মুখের দিকে চেয়ে রইল, তারপর একটুখানি হেসে বল্লে,—“মহারাজ, অর্দ্ধেক রাত্রে ভিখারিণীকে ডেকে এ কি তামাসা!” বাপ্পা বল্লেন,—“তবে কি তুমি রাজকুমারী নও?” ভিখারিণী নিশ্বাস ফেলে বল্লে—,“আমি একদিন রাজকুমারী ছিলাম বটে, আজ ভিখারিণী! মহারাজ, আমি মুসলমান নবাব সেলিমের কন্যা। একদিন, পোনেরো বৎসর বয়সে, তুমি আমাদের রাজ্য কেড়ে নিয়েছিলে, সে দিন আমি এই রাজপ্রাসাদের এই ছাদের উপর থেকে তোমায় দেখেছিলেম;—কি সুন্দর মুখ, কি প্রকাণ্ড শরীর! আর আজ তোমায় কি দেখছি! সে শরীর নেই, সে হাসি নেই! এমন দশা তোমার কে কল্লে? কোন রাজপুত—কুমারীর আশায় তুমি পাগলের মত দেশে বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছ?” বাপ্পা বল্লেন,—“সে কথা থাক্, তুমি আবার সেই গান গাও।” ভিখারিণী গাইতে লাগল— “আজি কি আনন্দ! ঝুলত ঝুলনে শ্যামর চন্দ!” বাপ্পা সমস্ত দুঃখ ভুলে সেই ভিখারিণীর মুখের দিকে চেয়ে রইলেন! গান শেষ হল; বাপ্পা বল্লেন,―“নবাবজাদী, তোমায় কি দিব বল?” ভিখারিণী বল্লে,―“আমার যদি রাজ্য থাকতো তবে তোমায় বলতেম আমায় বিয়ে করে তোমার বেগম কর―কিন্তু সে আশা এখন নেই, এখন আমি ভিখারিণী যে! আমাকে তোমার বাঁদী করে কাছে কাছে রাখ।” বাপ্পা বল্লেন,―“তুমি বাঁদী হবার যোগ্য নও, আমি তোমায় বেগম করব, তুমি চিরদিন আমার কাছে বসে এই গান গাইবে।”
তার পর দিন, সেই মুসলমান-কন্যাকে বিয়ে করে বাপ্পা খোরাসান দেশে চলে গেলেন। সেখানে গুলবাগে খাসমহলে গোলাবের ফোয়ারার ধারে সিরাজির পেয়ালা হাতে বেগম-সাহেবার মুখে আরবী গজল আর সেই হিন্দুস্থানের ঝুলন-গান শুনতে শুনতে বাপ্পা প্রাণের আরাম, মনের শান্তি পেয়েছিলেন কিনা কে জানে!
এক শত বৎসর বয়সে বাপ্পার মৃত্যু হল। পূর্ব্বদিকে, হিন্দুস্থানে তাঁর হিন্দু মহিষী, হিন্দু প্রজারা; পশ্চিমে, ইরাণীস্থানে তাঁর মুসলমানী বেগম আর পাঠানের দল;―হিন্দুরা তাদের মহারাজকে চিতায় তুলে দিতে চাইলে, আর নৌসেরা পাঠানের দল তাঁকে মুসলমানের মত কবর দিতে ব্যস্ত হল। শেষে যখন এক পিঠে সূর্য্যের স্তব আর-এক পিঠে আল্লার দোয়া–লেখা প্রকাণ্ড কিংখাবের চাদর বাপ্পার উপর থেকে খুলে নেওয়া হল, তখন সেখানে আর কিছুই দেখা গেল না,—কেবল রাশি রাশি পদ্ম ফুল! আর গোলাপ ফুল! চিতোরের মহারাণী সেই পদ্ম ফুল বাণমাতাজীর মন্দিরে মানস-সরোবরের জলে রেখে দিলেন; ইরাণী বেগম একটি গোলাপ ফুল, সখের গুলবাগে খাসমহলের মাঝে গোলাপ-জলের ফোয়ারার ধারে, পুঁতে দিলেন; আর সেই দিন হিন্দুস্থান ও ইরাণীস্থানের মধ্যস্থলে হিন্দুকুশ পর্ব্বতের শিখরে হীরে জহরতে মোড়া এক রাজার শরীর চিতার উপরে তুলে দিয়ে এক সন্ন্যাসিনী বল্লেন,—“সখী, তোরা সেই গান গা।” চারিদিকে চার সন্ন্যাসিনী ঘিরে ঘিরে গাইতে লাগল,—“আজি কি আনন্দ!” সন্ন্যাসিনী সেই শোলাঙ্কি-রাজকুমারী; আর সেই রাজদেহ বাপ্পার মৃতদেহ;—দুজনে চিরদিন দুজনের সন্ধানে ফিরেছিলেন, কিন্তু ইহলোকে মিলন হয়নি!