বিষয়বস্তুতে চলুন

রাজকাহিনী/শিলাদিত্য

উইকিসংকলন থেকে

রাজকাহিনী

শিলাদিত্য

 শিলাদিত্যের যখন জন্ম হয়নি, যে সময় বল্লভীপুরে রাজা কনক সেনের বংশের শেষ-রাজা রাজত্ব করছিলেন, সেই সময় বল্লভীপুরে সূর্য্যকুণ্ডনামে একটি অতি পবিত্র কুণ্ড ছিল। সেই কুণ্ডের একধারে প্রকাণ্ড সূর্য্যমন্দিরে এক অতিবৃদ্ধ পুরোহিত বাস করতেন। তাঁর একটিও পুত্রকন্যা কিম্বা বন্ধুবান্ধব ছিল না। অনন্ত আকাশে সূর্য্যদেব যেমন একা, তেমনি আকাশের মত নীল প্রকাণ্ড সূর্য্যকুণ্ডের তীরে আদিত্যমন্দিরে সূর্য্যপুরোহিত তেজস্বী সেই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ বড়ই একাকী, বড়ই সঙ্গীহীন ছিলেন। মন্দিরে দীপ-দান, ঘণ্টাধ্বনি, উদয়-অস্ত দুই সন্ধ্যা আরতি, সকল ভারই তাঁর উপর;—ভৃত্য নাই, অনুচর নাই, একটি শিষ্যও নাই! বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ একাই প্রতিদিন ত্রিশ সের ওরজনে পিতলের প্রদীপে দু‍ই সন্ধ্যা সূর্য্যদেবের আরতি করতেন; প্রতিদিনই সেই শীর্ণ হাতে রাক্ষস-রাজার রাজমুকুটের মত মন্দিরের প্রকাণ্ড ঘণ্টা বাজাতেন; আর মনে মনে ভাবতেন, যদি একটি সঙ্গী পাই তবে এই বৃদ্ধ বয়সে তার হাতে সমস্ত ভার দিয়ে নিশ্চিন্ত হই।

 সূর্য্যদেব ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করলেন। একদিন পৌষ মাসের প্রথমে ঘন কুয়াশায় চারিদিক অন্ধকার ছিল, সূর্য্যদেব অস্ত গেছেন, বৃদ্ধ পুরোহিত সন্ধ্যার আরতি শেষ করে ভীমের বুকপাটাখানার মত প্রকাণ্ড মন্দিরের লোহার কপাট বহুকষ্টে বন্ধ করছেন, এমন সময় ম্লানমুখে একটি ব্রাহ্মণকন্যা তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হল;—পরনে ছিন্ন বাস, কিন্তু অপূর্ব্ব সুন্দরী! বোধ হল যেন শীতের ভয়ে একটি সন্ধ্যাতারা সূর্য্যমন্দিরে আশ্রয় চায়! ব্রাহ্মণ দেখলেন কন্যাটি সুলক্ষণা, অথচ তার বিধবার বেশ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন,— “কে তুমি? কি চাও?” তখন সেই ব্রাহ্মণবালিকা কমলকলির মত ছোট দুইখানি হাত যোড় করে বল্লে,—“প্রভু আমি আশ্রয় চাই; ব্রাহ্মণকন্যা, গুর্জ্জর দেশের বেদবিদ্ ব্রাহ্মণ দেবাদিত্যের একমাত্র কন্যা আমি, নাম সুভাগা; বিয়ের রাত্রে বিধবা হয়েছি, সেই দোষে দুর্ভাগী বলে সকলে মিলে আমায় আমাদের দেশের বার করেছে। প্রভু, আমার মা ছিলেন, এখন মাও নাই, আমায় আশ্রয় দাও।” ব্রাহ্মণ বল্লেন,—“আরে অনাথিনী, এখানে কোন্ সুখের আশায় আশ্রয় চাস্? আমার অন্ন নাই, বস্ত্র নাই, আমি যে নিতান্ত দরিদ্র, বন্ধুহীন!”

 ব্রাহ্মণ মনে মনে এই কথা বল্লেন বটে, কিন্তু কে যেন তাঁর মনের ভিতর বল্‌তে লাগল,—“হে দরিদ্র, হে বন্ধুহীন, এই বালিকাকে তোমার বন্ধু কর, আশ্রয় দাও।’ ব্রাহ্মণ একবার মনে করলেন আশ্রয় দিই; আবার ভাবলেন,—যে মন্দিরে আশি বৎসর ধরে একা এই সূর্য্যদেবের পূজা কল্লেম, আজ শেষদশায় আবার কার হাতে তাঁর পূজার ভার দিয়ে নিশ্চিন্ত হই। ব্রাহ্মণ ইতস্তত করতে লাগলেন। সহসা সন্ধ্যার সমস্ত অন্ধকার ভেদ করে পৃথিবীর পশ্চিম পার থেকে একবিন্দু সূর্য্যের আলো সেই দুঃখিনী বালিকার মুখখানিতে এসে পড়ল। ভগবান আদিত্যদেব যেন নিজের হাতে দেখিয়ে দিলেন,—এই আমার সেবাদাসী; হে আমার প্রিয়ভক্ত, এই বালিকাকে আশ্রয় দাও, যেন চিরদিন এই দুঃখিনী বিধবা আমার সেবায় নিযুক্ত থাকে। ব্রাহ্মণ যোড়হস্তে সূর্য্যদেবকে প্রণাম করে, দেবাদিত্য ব্রাহ্মণের কন্যা সুভাগাকে সূর্য্যমন্দিরে আশ্রয় দিলেন।

 তারপরে কতদিন কেটে গেল, সুভাগা তখন মন্দিরের সমস্ত কাজই শিখেছেন, কেবল ননীর মত কোমল হাতে ত্রিশ সের ওজনের সেই আরতির প্রদীপটা কিছুতেই তুলতে পাল্লেন না বলে, আরতির কাজটা বৃদ্ধকেই করতে হত। একদিন সুভাগা দেখলেন, বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের জীর্ণ শরীর যেন ভেঙে পড়েছে,—আরতির প্রদীপ শীর্ণ হাতে টলে পড়ছে! সেই দিন সুভাগা বল্লভীপুরের বাজারে গিয়ে এক সের ওজনের একটি ছোট প্রদীপ নিয়ে এসে বল্লেন,— “পিতা, আজ সন্ধ্যার সময় এই প্রদীপে সূর্য্যদেবের আরতি করুন।” ব্রাহ্মণ একটু হেসে বল্লেন,— “সকালে যে প্রদীপে দেবতার আরতি আরম্ভ করেছি, সন্ধ্যাতেও সেই প্রদীপে দেবতার আরতি করা চাই। নূতন প্রদীপ তুলে রাখ, কাল নূতন দিনে নূতন প্রদীপে সূর্য্যদেবের আরতি হবে।” সেই দিন ঠিক দ্বিপ্রহরে সূর্য্যের আলোয় যখন সমস্ত পৃথিবী আলোময় হয়ে গেছে, সেই সময় ব্রাহ্মণ সুভাগাকে সূর্য্যমন্ত্র শিক্ষা দিলেন;— যে মন্ত্রের গুণে সূর্য্যদেব স্বয়ং এসে ভক্তকে দর্শন দেন, যে মন্ত্র জীবনে একবার ছাড়া দুইবার উচ্চারণে নিশ্চয় মৃত্যু। তারপর সন্ধিক্ষণে, সন্ধ্যার অন্ধকারে, আরতিশেষে, নিভন্ত প্রদীপের মত ব্রাহ্মণের জীবনপ্রদীপ ধীরে ধীরে নিভে গেল;— সূর্য্যদেব সমস্ত পৃথিবী অন্ধকার করে অস্ত গেলেন। সুভাগা একলা পড়লেন।

 প্রথম দিনকতক সুভাগা বৃদ্ধের জন্য কেঁদে কেঁদে কাটালেন। তারপর দিনকতক নিজের হাতে জঙ্গল পরিষ্কার করে মন্দিরের চারিদিকে ফলের গাছ, ফুলের গাছ লাগাতে কেটে গেল। আরও কতকদিন মন্দিরের পাথরের দেওয়াল মেজে ঘসে পরিষ্কার করে তার গায়ে লতা, পাতা, ফুল, পাখী, হাতী, ঘোড়া, পুরাণ, ইতিহাসের পট লিখতে চলে গেল। শেষে সুভাগার হাতে আর কোনো কাজ রইল না। তখন তিনি সেই ফলের বাগানে, ফুলের মালঞ্চে একাএকাই ঘুরে বেড়াতেন। ক্রমে যখন সেই নূতন বাগানে দুটি একটি ফল পাকতে আরম্ভ হল, দুটি একটি ফুল ফুটতে লাগল, তখন ক্রমে দু একটি ছোট পাখী, গুটিকতক রঙিন প্রজাপতি, সেই সঙ্গে একপাল ছোট-বড় ছেলেমেয়ে দেখা দিলে। প্রজাপতি শুধু একটুখানি ফুলের মধু খেয়ে সন্তুষ্ট ছিল, পাখী শুধু দু-একটা পাকা ফল ঠোকরাত মাত্র, কিন্তু সেই ছেলের পাল ফুল ছিড়ে, ফল পেড়ে, ডাল ভেঙে চুরমার করত। সুভাগা কিন্তু কাকেও কিছু বলতেন না, হাসি-মুখে সকল উৎপাত সহ্য করতেন। এ গাছের তলায় সবুজ ঘাসে নানা রঙের কাপড় পরে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে খেলে বেড়াত, দেখতে দেখতে সুভাগীর দিনগুলো আনমনে কেটে যেত। ক্রমে বর্ষা এসে পড়ল; চারিদিকে কালো মেঘের ঘটা, বিদ্যুতের ছটা, আর গুরুগুরু গর্জ্জন! সেই সময় একদিন ক্ষুরের মত পূবের হাওয়া, সুভাগার নূতন বাগানে ফুলের বোঁটা কেটে, গাছের পাতা ঝরিয়ে, তার সাধের মালঞ্চ শূন্য প্রায় করে শন্‌শন্-শব্দে চলে গেল।পাখীর ঝাঁক হাওয়ার মুখে উড়ে গেল, প্রজাপতির ভাঙা ডানা ফুলের পাপড়ির মত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল, ছেলের পাল কোথায় অদৃশ্য হল। সুভাগা তখন সেই ধারাশ্রাবণে একা বসে বসে বাপমায়ের কথা, শ্বশুরশাশুড়ীর নিষ্ঠুরতা, আর বিয়ের রাত্রে সুন্দর বরের হাসিমুখের কথা মনে করে কাঁদতে লাগলেন; আর মনে মনে ভাবতে লাগলেন—“হায়, এই নির্জ্জনে সঙ্গীহীন বিদেশে কেমন করে সারাজীবন একা কাটাব!” হরিণের চোখের মত সুভাগার কালো কালো দুটি বড় বড় চোখ অশ্রুজলে ভরে উঠল। তিনি পূবে দেখলেন অন্ধকার, পশ্চিমে অন্ধকার, উত্তরে দক্ষিণে চারিদিকে অন্ধকার; মনে পড়ল এমনি অন্ধকারে এক দিন তিনি সেই মন্দিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আজও সেদিনের মত অন্ধকার—সেই বাদলার হাওয়া, সেই নিঃশব্দ প্রকাণ্ড সূর্য্যমন্দির; কিন্তু হায়, কোথায় আজ সেই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ, যিনি সেই দুর্দ্দিনে অনাথিনী অভাগিনী সুভাগাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন! সুভাগার কালো চোখথেকে দুটি ফোঁটা জল দুই বিন্দু বৃষ্টির মত অন্ধকারে ঝড়ে পড়ল! সুভাগা মন্দিরের সমস্ত দুয়ার বন্ধ করে প্রদীপ জ্বালিয়ে ঠাকুরের আরতি করলেন; তারপর কি জানি কি মনে করে, সুভাগা সেই সূর্য্যমূর্তির সম্মুখে ধ্যানে বসলেন। ক্রমে সুভাগার দুটি চক্ষু স্থির হয়ে এল, চারিদিক থেকে ঝড়ের ঝন্‌ঝনা, মেঘের কড়মড়ি, ক্রমে যেন দূর হতে বহুদূরে সরে গেল। সুভাগার মনে আর কোনো শোক নাই, কোনো দুঃখ নাই। তাঁর মনের অন্ধকার যেন সূর্য্যের তেজে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। সুভাগা ধীরে ধীরে, ভয়ে ভয়ে, বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের কাছে শেখা সেই সূর্য্যমন্ত্র উচ্চারণ করলেন; তখন সমস্ত পৃথিবী যেন জেগে উঠল, সুভাগা যেন শুনতে পেলেন, চারিদিকে পাখীর গান, বাঁশীর তান, আনন্দের কোলাহল। তারপর গুরু গুরু গভীর গর্জ্জনে সমস্ত আকাশ কাঁপিয়ে, চারিদিক আলোয় আলোময় করে, সেই মন্দিরের পাথরের দেওয়াল, লোহার দরজা, যেন আগুনে আগুনে গলিয়ে দিয়ে, সাতটা সবুজ ঘোড়ার পিঠে আলোর রথে কোটি কোটি আগুনের সমান জ্যোতির্ম্ময় আলোময় সূর্য্যদেব দর্শন দিলেন। সে আলো, সে জ্যোতি মানুষের চোখে সহ্য হয় না। সুভাগা দুই হাতে মুখ ঢেকে বল্লেন, “হে দেব, রক্ষা কর, ক্ষমা কর, সমস্ত পৃথিবী জ্বলে যায়।” সূর্য্যদেব বল্লেন,— “ভয় নাই, ভয় নাই। বৎসে, বর প্রার্থনা কর।” বলতে বলতে সূর্য্যদেবের আলো ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে এল, শুধু একটুখানি রাঙা আভা সধবার সিদুরের মত সুভাগার সিঁথি আলো করে রইল। তখন সুভাগা বল্লেন,—“প্রভু, আমি পতিপুত্রহীনা, বিধবা অনাথিনী, বড়ই একাকিনী, আমাকে এই বর দাও যেন এই পৃথিবীতে আমায় আর না থাকতে হয়;—সমস্ত জ্বালাযন্ত্রণা থেকে মুক্ত হয়ে আজই তোমার চরণতলে আমার মরণ হোক।” সূর্য্যদেব বল্লেন,—“বৎসে, দেবতার বরে মৃত্যু হয় না, দেবতার অভিশাপে মৃত্যু হয়, তুমি বর প্রার্থনা কর।” তখন সুভাগা সূর্য্যদেবকে প্রণাম করে বল্লেন, “প্রভু, যদি বর দিলে, তবে আমাকে একটি ছেলে আর একটি মেয়ে দাও, আমি তাদের মানুষ করি। ছেলেটি তোমারি মত তেজস্বী হবে, মেয়েটি হবে যেন চাঁদের কোণার মত সুন্দরী।”

 সূর্য্যদেব তথাস্তু বলে অন্তর্দ্ধান করলেন। ধীরে ধীরে সুভাগার চোখে ঘুম এল, সুভাগা পাষাণের উপর আঁচল পেতে শুয়ে পড়লেন। চারিদিকে ঝম্ ঝম্‌ করে বৃষ্টি নাব্‌ল। তখন ভোর হয়ে এসেছে, সুভাগা ঘুমের ঘোরে শুনতে লাগলেন, তাঁর সেই ভাঙা মালঞ্চে দুটি ছোট পাখী কি সুন্দর গান ধরেছে! ক্রমে সকাল বেলার একটুখানি সোনার আলো সুভাগার চোখে পড়ল, তিনি তাড়াতাড়ি উঠে বসলেন, আঁচলে টান পড়ল, চেয়ে দেখলেন কচি দুটি ছেলেমেয়ে কোলের কাছে ঘুমিয়ে আছে। সূর্য্যদেবের বর সফল হল;—সুভাগা দেবতার মত সুন্দর সন্তান দুটি কোলে নিলেন। সকল লোকের চোখের আড়ালে নির্জ্জন মন্দিরে জন্ম হল বলে, সুভাগা দুজনের নাম দিলেন গায়েব, গায়েবী।

 সুভাগা গায়েব আর গায়েবীকে বুকে নিয়ে মন্দিরের বাহিরে এলেন, তখন পূবে সূর্য্যদেব উদয় হচ্ছিলেন, পশ্চিমে চাঁদ অস্ত যাচ্ছিলেন। সুভাগা দেখলেন, গায়েবের মুখে সূর্য্যের আলো ক্রমেই ফুটে উঠতে লাগল, আর গায়েবীর কালো চুলে চাঁদের জ্যোৎস্না ধীরে ধীরে নিভে গেল। তিনি মনে মনে বুঝলেন, গায়েবীকে এই পৃথিবীতে বেশি দিন ধরে রাখা যাবে না।

 গায়েব ক্রমশ যখন বড় হয়ে পাঠশালায় যেতে আরম্ভ করলেন, সেই সময় গায়েবী মায়ের কাছে বসে মন্দিরে কাজকর্ম্ম শিখতে লাগলেন। গায়েব যেমন দুরন্ত দুর্দান্ত, গায়েবী তেমনি শিষ্ট শান্ত। গায়েবীর সঙ্গে কত ছোট ছোট মেয়ে সেধে সেধে খেলা করতে আসত, কিন্তু গায়েবের উৎপাতে পাঠশালার সকল ছেলে অস্থির হয়ে উঠেছিল। শেষে তারা সকলে মিলে একদিন পরামর্শ করলে,—গায়েব আমাদের চেয়ে লেখায়, পড়ায়, গায়ের জোরে, সকল বিষয়ে বড়; এস আমরা সকলে মিলে গায়েবকে রাজা করি, আর আমরা তার প্রজা হই; তাহলে গায়েব আর আমাদের উপর অত্যাচার করতে পারবে না। এই বলে সকলে মিলে গায়েবকে রাজা বলে কাঁধে করে নৃত্য আরম্ভ করলে। গায়েব হাসিখুসিতে সেই সকল ছোট ছোট ছেলের কাঁধে বসে আছেন, এমন সময় একটি খুব ছোট ছেলে বলে উঠল,—“আমি রাজার পূজারী। মন্ত্র পড়ে গায়েবকে রাজটীকা দেব।” তখন সেই ছেলের পাল গায়েবকে একটা মাটির ঢিপির উপর বসিয়ে দিলে। গায়ের সত্যি রাজার মত সেই মাটির সিংহাসনে বসে আছেন, এমন সময়, সেই ছোট ছেলেটি তাঁর কপালে তিলক টেনে দিয়ে বল্লে,—“গায়েব, তোমার নাম জানি, বল তোমার মায়ের নাম কি, বাপের নাম কি? গায়েব বল্লেন,—“আমার নাম গায়েব, আমার বোনের নাম গায়েবী, মায়ের নাম সুভাগা। আমার বাপের নাম—কি?” গায়েব জানেন না যে তিনি সূর্য্যদেবের বরপুত্র। নাম বলতে পাল্লেন না, লজ্জার অধোবদন হলেন, চারিদিকে ছেলের পাল হো হো হাততালি দিতে লাগল, লজ্জায় গায়েবের মুখ লাল হয়ে উঠল। তখন এক পদাঘাতে সেই মাটির সিংহাসন চূর্ণ করে, চড়ে চাপড়ে ছোট ছেলেদের ফোলা গাল বেশি করে ফুলিয়ে, রাগে কাঁপ্‌তে কাঁপ্‌তে গায়েব একেবারে দেবমন্দিরে উপস্থিত হলেন। সুভাগা গায়েবীর হাতে পিতলের একটি ছোট প্রদীপ দিয়ে কেমন করে সূর্য্যদেবের আরতি করতে হয় শিখিয়ে দিচ্ছিলেন; এমন সময় ঝড়ের মত গায়েব এসে পিতলের সেই প্রদীপটা কেড়ে নিয়ে টান মেরে ফেলে দিলেন। নিরেট পিতলের প্রদীপ পাথরের দেওয়ালে ঝন্‌ঝন্ শব্দে চুরমার হয়ে গেল, সেই সঙ্গে সূর্যদেবের মূর্ত্তি-লেখা একখানা কালো পাথর সেই দেওয়াল থেকে খসে পড়ল। সুভাগা বল্লেন,—“আরে উন্মাদ, কি করলি? সূর্য্যদেবের মঙ্গল আরতি ছারখার করে দেবতার অপমান করলি?” গায়েব বল্লেন,—“দেবতাও বুঝিনে, সূর্য্যও বুঝিনে, বল আমি কার ছেলে? না হলে আজ তোমার সূর্য্যমূর্ত্তি কুণ্ডের জলে ডুবিয়ে দেব।” যদিও প্রকাণ্ড সেই সূর্য্যমূর্ত্তি ভীম এলেও তুলতে পারতেন না, তবু গায়েবের বীরদর্প দেখে সুভাগার মনে হল,— কি জানি কি করে! তিনি তাড়াতাড়ি গায়েবের দুটি হাত ধরে বল্লেন, “বাছা শান্ত হ, স্থির হ, আর সূর্য্যদেবের অপমান করিসনে; পিতার নামে কি কাজ? আমি তোর মা আছি, গায়েবী তোর বোন, আর তোর কিসের অভাব?” গায়েব তখন কাঁদ্‌তে কাঁদ্‌তে বল্লেন,—“তবে কি মা, আমি নীচ, জঘন্য, অপবিত্র, পথের ধূলা, ভিখারীর অধম?” কথাগুলো তীরের মত সুভাগার বুকে বাজল, তিনি দুই হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়লেন; মনে মনে ভাবলেন,—হায় ভগবান, কি করলে? এ দুরন্ত ছেলেকে কেমন করে বোঝাই, কি বলে প্রবোধ দিই? গায়েব গায়েবী নীচ নয়, অপবিত্র নয়, সূর্য্যের সন্তান, সকলের চেয়ে পবিত্র, একথায় কে বিশ্বাস করবে? সুভাগার সূর্য্যমন্ত্রের কথা একবার মনে হল, কিন্তু যখন ভাবলেন যে দুইবার মন্ত্র উচ্চারণ করলে নিশ্চয় মৃত্যু—এই কচি বয়সে গায়েবগায়েবীকে একা ফেলে পৃথিবী ছেড়ে চিরকালের মত চলে যেতে হবে, —তখন তাঁর মায়ের প্রাণ কেঁদে উঠল। সুভাগা বল্লেন,—“বাছা, কথা রাখ্, ক্ষান্ত দে, চল্ আমরা অন্য দেশে চলে যাই, সূর্য্যদেবকেই তোদের পিতা বলে জেনে রাখ্।” গায়েব ঘাড় নাড়লেন; বিশ্বাস হয় না। তখন সুভাগা বল্লেন, — “তবে মন্দিরের সমস্ত দরজা বন্ধ কর, এখনি তোদের পিতাকে দেখতে পাবি, কিন্তু হায়, আমাকে আর ফিরে পাবি না।” সুভাগার দুই চক্ষে জল পড়তে লাগল। গায়েবী বল্লে,—“ভাই, মাকে কেন কষ্ট দাও?” গায়েব উত্তর না দিয়ে মন্দিরের সমস্ত দরজা বন্ধ করে দিলেন। সুভাগা দুজনের হাত ধরে সূর্য্যমূর্ত্তির সম্মুখে গিয়ে ধ্যানে বসলেন। এই মন্দিরে একাকিনী সুভাগা একদিন মৃত্যু ইচ্ছা করে যে-মন্ত্র নির্ভয়ে উচ্চারণ করেছিলেন, কালসর্পের মত সেই সূর্য্যমন্ত্র আজ উচ্চারণ করতে তাঁর মায়ের প্রাণে কতই ভয়, কতই ব্যথা! সূর্য্যদেব দর্শন দিলেন,—সমস্ত মন্দির যেন রক্তের স্রোতে ভাসিয়ে প্রচণ্ড মূর্ত্তিতে দর্শন দিলেন। সুভাগা বল্লেন,—“প্রভু, গায়েবগায়েবী কার সন্তান?” সূর্য্যদেব একটিও কথা কইলেন না। দেখতে দেখতে সূর্য্যের প্রচণ্ড তেজে ভিখারিণী সুভাগার সুন্দর শরীর জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে গেল। গায়েবী কেঁদে উঠল,—“মা, মা!” গায়েব জিজ্ঞাসা করলেন,—“মা কোথা?” সূর্য্যদেব কোনই উত্তর করলেন না, কেবল পাষাণের উপর সেই রাশীকৃত ছাই দেখিয়ে দিলেন। গায়েব বুঝলেন,—মা আর নেই। রাগে দুঃখে তাঁর চোখে আগুন ছুটল। গায়েব মন্দিরের কোণ থেকে সূর্য্যমূর্ত্তি-লেখা সেই পাথরখানা কুড়িয়ে সূর্য্যদেবকে ফেলে মারলেন। যমরাজের মহিষের মাথাটার মত সেই কালো পাথর সূর্য্যদেবের মুকুটে লেগে জ্বলন্ত কয়লার মত এক দিকে ঠিকরে পড়ল,—সঙ্গে সঙ্গে গায়েব মুর্চ্ছিত হলেন।

 অনেকক্ষণ পরে গায়েব যখন জেগে উঠলেন তখন সূর্য্যদেব অন্তর্দ্ধান করেছেন, মাথার কাছে শুধু গায়েবী বসে আছে। গায়েব জিজ্ঞাসা করলেন,—“সূর্য্যদেব কোথায়?” গায়েবী তখন সেই কালো পাথরখানা দেখিয়ে বল্লে,—“ওই লও ভাই, আদিত্যশিলা। এই পাথর তুমি যার উপর ফেলবে তাঁর নিশ্চয় মৃত্যু। সূর্য্যদেব এটি তোমার দিয়ে গেছেন,আর বলেছেন তুমি তাঁরই ছেলে, আজ থেকে তোমার নাম হল শিলাদিত্য। তোমার বংশ সূর্য্যবংশ নাম নিয়ে পৃথিবী শাসন করবে, আর তুমি মনে মনে ডাকলেই ওই সূর্য্যকুণ্ড থেকে সাতটা ঘোড়ার পিঠে সূর্য্যের রথ তোমার জন্যে উঠে আসবে। রথের নাম সপ্তাশ্বরথ। যাও ভাই, সপ্তাশ্বরথে আদিত্যশিলা হাতে পৃথিবী জয় করে এস।” গায়েব বল্লেন,—“তোকে কোথা রেখে যার বোন্?” গায়েবী বল্লে,—“ভাই, আমাকে এই মন্দিরে বন্ধ করে রেখে যাও, আমি বাগানের ফল, কুণ্ডের জল খেয়ে জীবন কাটাব। তারপর তুমি যখন রাজা হবে, আমার এই মন্দির থেকে রাজবাড়িতে নিয়ে যেও।”

 গায়েব মহা আনন্দে গায়েবীকে সেই মন্দিরে বন্ধ রেখে সাত-ঘোড়ার রথে পৃথিবী জয় করতে চলে গেলেন। আর গায়েবী সেই রাশীকৃত ছাই সূর্য্যকুণ্ডের জলে ঢেলে দিয়ে “মা রে ভাই রে!” বলে পাষাণের উপর আছাড় খেয়ে পড়ল।

 সেই দিন গভীর রাত্রে যখন আকাশে তারা ছিল না, পৃথিবীতে আলো ছিল না, সেই সময় হঠাৎ সেই সূর্য্যমন্দির ঝন্‌ঝন্‌,—শব্দে একবার কেঁপে উঠল। তারপর আশি মণ কালোপাথরের প্রকাণ্ড সূর্য্যমূর্ত্তিকে নিয়ে, আর ননীর পুতুলের মত সুন্দরী গায়েবীকে নিয়ে, আধখানা মন্দির ক্রমে মাটির নীচে চলে যেতে লাগল। গায়েবী প্রাণভয়ে পালাবার চেষ্টা কলে, বৃথা চেষ্টা! গায়েবী দেওয়াল ধরে ওঠবার চেষ্টা কল্লে, পাথরের দেওয়ালে পা রাখা যায় না,—কাঁচের সমান। তখন গায়েবী ‘ভাই রে'! বলে অজ্ঞান হয়ে পড়ল। তারপর সব শেষ, সব অন্ধকার!

 কতদিন চলে গেছে, গায়েব সেই সপ্তাশ্বরথে পৃথিবী ঘুরে, দেশবিদেশ থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে,রাজ্যের পর রাজ্য জয় করে, শেষে বল্লভীপুরের রাজাকে সেই আদিত্যশিলা দিয়ে সম্মুখযুদ্ধে সংহার করে, শিলাদিত্য নাম নিয়ে, রাজসিংহাসনে বসে, পাঠশালার সঙ্গীদের কাউকে মন্ত্রী, কাউকেবা সেনাপতি করে, যত নিষ্কর্ম্মা বুড়ো কর্ম্মচারীদের তাড়িয়ে দিলেন। তারপর হুলুধ্বনি শঙ্খধ্বনির মাঝখানে শিলাদিত্য, চন্দ্রাবতী-নগরের রাজকন্যা পুষ্পবতীকে বিয়ে করে, শ্বেতপাথরের শয়নমন্দিরে বিশ্রাম করতে গেলেন। ক্রমে রাত্রি যখন গভীর হল, কোনো দিকে সাড়া-শব্দ নেই, পায়ের কাছে চামরধারিণী চামর-হাতে ঢুলে পড়েছে, মাথার শিয়রে সোনার প্রদীপ নিভ-নিভ হয়েছে, সেই সময় শিলাদিত্য তাঁর সেই ছোট বোন গায়েবীর কচি মুখখানি স্বপ্নে দেখলেন;—তাঁর মনে হল যেন অনেক অনেক দূরে থেকে সেই মুখখানি তাঁর দিকে চেয়ে আছে; আর যেন সেই সূর্য্যমন্দিরের দিক থেকে কে যেন ডাকছে— “ভাই রে, ভাই রে, ভাই রে!”

 শিলাদিত্য চীৎকার করে জেগে উঠলেন। তখন ভোর হয়েছে, তিনি তৎক্ষণাৎ রথে চড়ে সৈন্যসামন্ত নিয়ে সূর্য্যমন্দিরে উপস্থিত হলেন; দেখলেন, ভীমের বর্ম্ম দুখানার মত মন্দিরের দুখানা কবাট একেবারে বন্ধ;—কত-কালের লতা-পাতা, সেই মন্দিরের দুয়ার যেন লোহার শিকলে বেঁধে রেখেছে। শিলাদিত্য নিজের হাতে সেই লতা-পাতা সরিয়ে মন্দিরের দুয়ার খুলে ফেল্লেন; দিনের আলো পেয়ে এক ঝাঁক বাদুড় ঝটাপট্ করে খোলা-দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। শিলাদিত্য মন্দিরে প্রবেশ করেন; চেয়ে দেখলেন, যেখানে সূর্য্যদেবের মূর্ত্তি ছিল সেখানে প্রকাণ্ড একখানা অন্ধকার, কালো পর্দ্দার মত সমস্ত ঢেকে রেখেছে।শিলাদিত্য ডাকলেন—“গায়েবী! গায়েবী! কোথায় গায়েবী?”অন্ধকার থেকে উত্তর এল— “হায় গায়েবী, কোথা গায়েবী!” শিলাদিত্য মশাল আনতে হুকুম দিলেন; সেই মশালের আলোয় শিলাদিত্য দেখলেন,—উত্তর দিকটা শূন্য করে সূর্য্যমূর্ত্তির সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরের আধখানা যেন পাতালে চলে গেছে; কেবল কালো পাথরের সাতটা ঘোড়ার মুণ্ডু বাসুকির ফণার মত মাটির উপর জেগে আছে। যে ঘরে শিলাদিত্য গায়েবীর সঙ্গে খেলা করেছেন, যে ঘরে সারাদিন খেলার পর দুটি ভাই-বোন্ গুর্জ্জরদেশের গল্প শুনতে শুনতে মায়ের
সূর্য্যমন্দিরদ্বারে শিলাদিত্য
কোলে ঘুমিয়ে পড়তেন, যেখানে দেবদারু-গাছের মত পিতলের সেই আরতি-প্রদীপ ছিল, সে সকল ঘরের চিহ্নমাত্র নাই। শিলাদিত্য সেই প্রকাণ্ড গহ্বরের মুখে দাঁড়িয়ে ডাকলেন—“গায়েবী গায়েবী!” তাঁর সেই করুণ সুর, সেই অন্ধকার গহ্বরে ঘুরে ফিরে ক্রমে দূর থেকে দূরে, পাতালের মুখে চলে গেল।গায়েব নিশ্বাস ফেলে রাজমন্দিরে ফিরে এলেন।

 সেই দিন রাজ-আজ্ঞায় রাজ-কর্ম্মকারেরা পুরু সোনার পাত দিয়ে সেই প্রকাণ্ড মন্দির আগাগোড়া মুড়ে দিতে লাগল। শিলাদিত্য সে মন্দিরে আর অন্য মূর্ত্তি প্রতিষ্ঠা করলেন না। সেই অন্ধকার গহ্বর থেকে সূর্য্যের ঘোড়াগুলি যেমন আধখানা জেগেছিল তেমনিই রইল। তারপর শিলাদিত্য পাহাড় কেটে শ্বেতপাথর আনিয়ে, সূর্য্যকুণ্ডের চারিদিক সুন্দর করে বাঁধিয়ে দিলেন। যখনি কোনো যুদ্ধ উপস্থিত হত, শিলাদিত্য সেই সূর্য্যকুণ্ডের তীরে সূর্য্যের উপাসনা করতেন; তখনি তাঁর জন্য সপ্তাশ্বরথ জল থেকে উঠে আসত। শিলাদিত্য সেই রথে যখন যে যুদ্ধে গিয়েছেন, সেই যুদ্ধেই তাঁর জয় হয়েছে। শেষে একজন বিশ্বাসঘাতক মন্ত্রী, যাকে তিনি সব চেয়ে বিশ্বাস করতেন, সব চেয়ে ভালোবাসতেন, সেই তাঁর সর্ববনাশ করলে। সেই মন্ত্রী ছাড়া পৃথিবীতে আর-কেউ জানত না যে, শিলাদিত্যের জন্য সূর্য্যকুণ্ড থেকে সপ্তাশ্বরথ উঠে আসে।

 সিন্ধুপারে শ্যামনগর থেকে পারদনামে অসভ্য একদল যবন যখন বল্লভীপুর আক্রমণ করলে, তখন সেই বিশ্বাসঘাতক, তুচ্ছ পয়সার লোভে, সেই অসভ্যদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে, গোরক্তে সেই পবিত্র কুণ্ড অপবিত্র করলে। শিলাদিত্য যুদ্ধের দিন যখন সেই সূর্য্যকুণ্ডের তীরে সূর্য্যের উপাসনা করতে লাগলেন, তখন আগেকার মত নীল জল ভেদ করে দেবরথ উঠে এল না। শিলাদিত্য সাতটা ঘোড়ার সাতটা নাম ধরে বারবার ডাকলেন, কিন্তু হায়, কুণ্ডের জল যেমন স্থির তেমনিই রইল! শিলাদিত্য হতাশ হয়ে রাজরথে শত্রুর সম্মুখে উপস্থিত হলেন, কিন্তু সেই যুদ্ধেই তাঁর প্রাণ গেল। সমস্ত দিন যুদ্ধের পর সূর্য্যদেবের সঙ্গে সঙ্গে সূর্য্যের বরপুত্র শিলাদিত্য অস্ত গেলেন। বিধর্মী শত্রু সোনার মন্দির চূর্ণ করে, বল্লভীপুর ছারখার করে চলে গেল।