রাজমালা (ভূপেন্দ্রচন্দ্র চক্রবর্তী)/দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ/৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

হরি রায়ের পুত্ৰগণের বুদ্ধি পরীক্ষা

 হরিরায় ওরফে ডাঙ্গর ফা সিংহতুঙ্গের অধস্তন চতুর্থ পুরুষ। ডাঙ্গর শব্দে ডাগর অর্থাৎ বড় বুঝায়। এই রাজার আঠারটি কুমার ছিল। রাজার মহা চিন্তা হইল, তাই ত কুমারেরা সংখ্যায় বেশী, এখন রাজা করি কাকে? যে সব চাইতে বুদ্ধিমান তাকেই রাজপদ দিব। কি উপায়ে ইহাদের বুদ্ধির পরখ হয়? অবশেষে রাজা এক উপায় ঠিক করিলেন। নিজে একাদশীর উপবাস করিলেন, পুত্রগণকেও সেই দিন উপবাসী রাখিলেন। এদিকে রাজার এক কুকুর-রক্ষক ছিল। রাজা গোপনে তাহাকে ডাকাইয়া হুকুম দিলেন—“ত্রিশটি কুকুরকে না খাওয়াইয়া আজিকার দিন বাঁধিয়া রাখ। কাল পারণা দিন, আমি যখন কুমারগণকে লইয়া ভোজনে বসিব, তখন তুমি কুকুরগুলিকে লইয়া পাকশালের বাহিরে থাকিবে। আমার চোখের দিকে চাহিয়া থাকিবে, যেই মাত্র আমি চোখে ইশারা করিব আমনি কুকুরগুলিকে ছাড়িয়া দিবে। যদি এ কায ঠিকভাবে না করিতে পার তবে প্রাণদণ্ড করিব।” এই বলিয়া সেবককে সাবধান করিয়া দিলেন।

 পরদিন রাজা ভোজনে বসিলেন, পুত্রগণকে একটু দূরে পংক্তিক্রমে বসাইলেন। কুমারদের পাতে ভাত দেওয়া হইয়াছে; জ্যেষ্ঠ মুখে গ্রাস তুলিতেই সকলে গ্রাস তুলিলেন। এইভাবে মাত্র পাঁচ গ্রাস অন্ন ভোজন হইয়াছিল এমন সময় রাজা চোখে ইশারা করিলেন। অমনি বাহিরে দাঁড়ান সেবক ত্রিশটি কুকুরকে ছাড়িয়া দিল। একে কুকুরগুলি কাল কিছুই খায় নাই, ক্ষুধায় পেট চু চু করিতেছিল; তার মধ্যে সম্মুখে এতগুলি সোনার থালায় রাশি রাশি অন্ন! কুকুরগুলি এক দৌড়ে ঘরে ঢুকিয়া রাজপুত্রদের থালায় খাইতে চাহিল। কুমারেরা হা হা, হু হু করিলেন বিস্তর, কিন্তু কুকুর কি তাহা বোঝে? তাঁহাদের থালায় কুকুরের মুখ লাগিতেই সতেরটি কুমার পাত্ৰত্যাগ করিলেন। কিন্তু সর্ব্বকনিষ্ঠ পুত্র রত্ন এক কৌশলে ইহাদের ঠেকাইলেন। দূরে মুঠো মুঠো ভাত ছড়াইয়া দিলেন। কুকুর ঘরের কোণে সেই ভাত চাটিয়া খাইতে লাগিল, এ অবসরে রত্ন বেশ কয়েক গ্রাস খাইয়া ফেলিলেন। এমনি করিয়া ভাত ছড়াইয়া কুকুরগুলিকে দূরে রাখিয়া ছোট কুমার বেশ পেট ভরিয়া খাইয়া উঠিলেন। এদিকে তাঁহার জ্যেষ্ঠ ভাই সব ক্ষুধার জ্বালায় অবশ্যই রাগিয়া আগুন হইয়া গেলেন। রাজা এই সব দেখিয়া বুঝিলেন কনিষ্ঠ রত্নই বুদ্ধিমান্। একদিন ত্রিপুর-সিংহাসনে যে রত্ন বসিবেন ইহাতে তাঁহার বিন্দুমাত্র সন্দেহ রহিল না।

 এই ঘটনার পর রাজার স্নেহ রত্নের উপর বাড়িয়া গেল দেখিয়া অন্যান্য কুমারেরা রত্নকে ঈর্ষা করিতে লাগিলেন। এই ভাবে কিছুকাল গেল কিন্তু ভাইদের মধ্যে রেষারেষি কমিল না বরং বাড়িয়া চলিল। মহারাজ ভাবিত হইলেন, এখন উপায় কি? পুত্রদিগকে দূরে দূরে রাখাই এক মাত্র উপায় স্থির হইল। পরবর্ত্তীকালের সাজাহান বাদশাহ যেমন তাঁহার পুত্রত্ৰয়কে বিভিন্ন প্রদেশের শাসন ভার দিয়া ইহাদিগকে দূরে রাখিয়াছিলেন মহারাজও তেমনি পুত্রগণকে রাজ্যের অন্তর্গত বিভিন্ন দেশের শাসনভার দান করিলেন। এষ্টভাবে সর্ব্ব জ্যেষ্ঠ রাজা ফা রাজনগরে, এক পুত্র কাচরঙ্গে, অন্য পুত্র আচরঙ্গে বসিলেন; আগর ফা পুত্রকে আগরতলা স্থান দিলেন। তাঁহার নাম হইতেই আগরতলা নামের উৎপত্তি। কুমারগণ যে যে স্থানের শাসনভার পাইলেন, সেই সেই স্থানের নাম এইরূপ— (১) ধর্ম্মনগর (২) তারক (৩) বিশালগড় (৪) খুটিমুড়া (৫) নাকবাড়ী (৬) মধুগ্রাম (৭) থানাচি (৮) মোহরী নদীর তীর (৯) লাউগঙ্গা প্রদেশ (১০) বরাক প্রদেশ (১১) তেলারঙ্গ (১২) ধোপ পাথর (১৩) মণিপুর।