রাজমালা (ভূপেন্দ্রচন্দ্র চক্রবর্তী)/দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ/৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

 

(8)

গৌড়েশ্বরের দরবারে ত্রিপুরকুমার রত্ন

 মহারাজ ডাগরের সময় গৌড়ের নবাবের সহিত পুনরায় যোগাযোগ ঘটে।

 লক্ষ্মণ সেন যখন নবদ্বীপ ত্যাগ করিয়া বিক্রমপুরে চলিয়া আসেন তখন বিজয়ী বখ্‌তিয়ার গৌড়ে রাজধানী স্থাপন করেন। খ্ৰীষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে গৌড়ের নবাবের সহিত মহারাজ ডাগরের প্রীতি প্রণয় ঘটে। সেই বন্ধুতাসূত্রে কনিষ্ঠ পুত্র রত্নকে গৌড়েশ্বরের দরবারে পাঠাইয়া দেন।

 ত্রিপুরেরশ্বরের হয়ত ইচ্ছা ছিল কুমার রত্ন যেরূপ চতুর, দেশ ভ্রমণে তাঁহার অভিজ্ঞতা আরও বাড়িবে। তাই রত্নের সঙ্গে ২৪০ জন সৈন্য ও আরও লোক জন দিলেন, কুমার দল বল লইয়া গৌড় উদ্দেশ্যে যাত্রা করিলেন। কিছুকাল মধ্যে নানা দেশ দেখিয়া কুমার গৌড়ে আসিয়া পৌঁছিলেন। গৌড়েশ্বর রত্নকে সমাদরে গ্রহণ করেন। নবাবের দরবারে কুমার যাইতে লাগিলেন, অল্প সময়ের মধ্যেই নবাবের হৃদয় জয় করিয়া ফেলিলেন। তখন নবাব নিঃসঙ্কোচে কুমারের সহিত রঙ্গরহস্য করিতেন। একদিন নবাব রত্নকে রসিকতা করিয়া বলেন—“ওহে, ত্রিপুরকুমার! তোমার কুকি জাতীয় প্রজারা নাকি মাটির নীচে যে ঘুঘুরা কীট থাকে তাহা খুঁড়িয়া তুলিয়া তৃপ্তিতে আহার করে, একি সত্য?” কুমার নবাবকে কুর্ণিশ করিয়া বলিলেন—“একথা সত্য হইতে পারে কিন্তু তাতে কি আসে যায়? আপনার রাজ্যে কত জাতির লোক আছে তাদের মধ্যে কেউ যদি এমন কিছু খায় তাতে গৌড়ের নবাবের গায়ে ত সে দোষ লাগে না, নবাবের আচার ব্যবহার তাতে কি অশুদ্ধ হয়? আমাদের ত্রিপুরা রাজ্য যেমনি বড় তেমনি তাতে অনেক জাতির বাস, খাওয়া পরা রুচির বিষয়, এতে হাত দেওয়া কি রাজার উচিত?” গৌড়েশ্বর রত্নের আলাপনে বড়ই প্রীত হইলেন!

 একদিন রত্ন দরবারে আসিয়াছেন, সেদিন সোমবার বড় সকাল আসিয়াছেন। তখনও দরবার বসে নাই তাই রত্ন বাহিরে প্রতীক্ষা করিতেছেন। গৌড়েশ্বরের প্রাসাদের সিঁড়িতে পায়চারি করিতেছেন এমন সময় দেখিলেন চৌদোলে চড়িয়া এক পরম সুন্দরী রমণী নবাবের প্রাসাদ পথে যাইতেছেন, তাঁহার পেছনে আরও এইরূপ জন কয়েক সুন্দরী ছিল। ইহাদের পরণে সোণার কাপড়, মাথায় সোণার ঝালর ছাতি, সঙ্গে নবাবের লোক লস্কর। এই আশ্চর্য্য রূপযাত্রা দেখিতে যখনই কৌতূহলে লোকের ভিড় হইতেছে অমনি ছড়িদার ছড়ি ঘুরাইয়া লোকজন হঠাইয়া দিতেছে। এই সব সাজসজ্জা লোক লস্কর দেখিয়া রত্নের মনে হইল, চৌদোল রমণী গৌড়েশ্বরের কোন এক মহিষী হইবেন এবং সঙ্গের নারীগণ হয়ত তাহার সেবিকা হইবে। যখন চৌদোল রত্নের সম্মুখে আসিয়া পড়িল তখন রত্ন ঢিপ্ করিয়া সেই রমণীকে এক প্রণাম করিলেন। রমণী ত অবাক্, চৌদোল থামাইয়া এই অবোধ সুন্দর যুবকের পরিচয় লইল, তারপর একটু রত্ন, গৌড়ের নবাবের প্রাসাদের সিঁড়িতে পায়চারি করিতেছেন এমন সময় দেখিলেন
চৌদোলে এক পরমা সুন্দরী রমণী প্রাসাদ পথে যাইতেছেন—
কটাক্ষে হাস্য করিয়া চৌদোল চালাইয়া চলিয়া গেল, সেখানকার লোকজন রত্নকে প্রণাম করিতে দেখিয়া হু হু করিয়া হাসিয়া উঠিল। এই হাস্যকর ঘটনা দরবারী কাহারও কাহারও চোখ এড়াইলনা এবং ক্রমে গৌড়েশ্বরের কানে পৌঁছিতেও বিলম্ব হইল না।

 যখন দরবার সুরু হইল, রত্ন তাঁহার নির্দ্দিষ্ট আসনে বসিলেন। নবাব রসিকতা করিয়া প্রশ্ন করিলেন—“ওহে ত্রিপুর কুমার, তোমার ভক্তির কথা শুনিয়া ত আমরা অবাক হইয়াছি। তুমি নাকি নৰ্ত্তকীকেও প্রণাম কর, কথাটা কি ঠিক?” অবশ্য পূর্ব্ব হইতেই লোকজনের হাস্য দেখিয়া রত্নের সন্দেহ হইয়াছিল, এইবার পরিষ্কার সেই রমণী কে চিনিলেন। কিন্তু রত্ন মুখের রঙ না বদলাইয়া নির্ভীক ভাবে কহিলেন—“নবাবের মহিষী ভ্ৰমে ইহাকে প্রণাম করিয়াছি, ইহাতে ক্রটি হইয়া থাকিলে সে ক্রটি ভুলের, আমার নহে।” রত্নের এই উত্তর শুনিয়া দরবারীগণের রসিকতার সুযোগ ত ঘটিলইনা পরন্তু তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ ভয়ে জড় সড় হইয়া পড়িল পাছে বা নবাব রাগ করেন! কিন্তু নবাব কুমারের সরলতা দেখিয়া মুগ্ধ হইয়া গেলেন। এইভাবে গৌড়েশ্বরের দরবারে কুমার রত্নের খ্যাতি ও মান দিন দিন বাড়িতে লাগিল!