রাজা সাহেব (২য় অংশ)/ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

রাজা সাহেব।

(২য় অংশ)

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

জালে পড়া।

 রাজা মহাশয়ের গমন করিবার সময় মন্ত্রী মহাশয় এসিন্টেন্ট সেক্রেটারীর দিকে লক্ষ্য কষিয়া রাজা মহাশয়কে কহিলেন, “ইহার প্রতি কি আদেশ হয়? “

 রাজা। কি সম্বন্ধে আদেশ?

 মন্ত্রী। ইনি ইহার মনিবের নিমিত্ত যে টাকা কর্জ্জ করিতে চাহিতেছেন, সেই সম্বন্ধে কি আদেশ হয়?

 রাজা। কেন, সে দেশ ত আমি পূর্ব্বেই দিয়াছি। আমি বলি দিয়াছি, টাকা দেওয়া যাইবে।”

 মন্ত্রী। তাহা হইলে কোন তারিখে ইহাকে আসিতে কহিব?

 রাজা। কল্যই আসিতে বলিয়া দিন। যেরূপ তারে লেখাপড়া হইবে, এই সমস্ত ঠিক করা হইয়াছে ত?

 মন্ত্রী। না, এখনও তার কিছুই হয় নাই।

 রাজা। আজ যদি সুবিধা হয়, সে সমস্ত কার্য্য শেষ করিয়া রাখুন। আর পাট ক্রয় করিবার লোকের বন্দোবস্ত করিতেছেন না কেন? এক মাসে মধ্যে সমস্ত পাটের ডিলিভারি দিতে হইবে, তাহা আপনি ভুলিয়া গিয়াছেন কি? ঢাকা, সিরাজগঞ্জ প্রভৃতি যে সকল প্রদেশে পাট জন্মিয়া থাকে, সেই প্রদেশীয় কোন লোক হইলে ভাল হয়। কারণ, সেইস্থানের লোক সকল যেরূপভাবে পাট চিনিতে পারে, অপর কোন স্থানের লোক সেরূপ ভাবে পাট চিনিতে পারে না।

 মন্ত্রী। দুই এক দিবসের মধ্যে আমি পাট ক্রয় করিবার নিমিত্ত লোক স্থির করিয়া দিতেছি। পাঠের ডিলিভারি দেওয়ার নিমিত্ত আপনি ব্যস্ত হইবেন না। দশ পনর দিবসের মধ্যে সমস্ত পাট যাহাতে ক্রয় করা যায়, তাহার নিমিত্ত আমি সবিশেষরূপে চেষ্টা করি। অন্যান্য মহাজনদিগের ন্যায় টাকার অভাব ত আর আমাদিগের নাই; সুতরাং কার্য্য শেষ করিতে কয়দিবস লাগিবে?

 মন্ত্রী মহাশয়ের সহিত এই কয়েকটী কথা দুইবার এই রাজা গলায় গৃহ হইতে বর্হিগত লইয়া অন্দ্রের ভিতর প্রবেশ করিলেন। ক্যাসবান্সবাহীও ক্যাসবাক্স এই তাঁহার পশ্চ্যাত পশ্চাত প্রস্থান করিল।

 যে পর্যন্ত রাজা মহাশয় দরবারে উপস্থিত ছিলেন সেই সময় এক মন্ত্রী মহাশয় ব্যতীত অপর কাহারও মুখ দিয়া কোন কথা নির্গত হয় নাই। সকলেই মুখ বন্ধ করিয়া আপন আপন কর্ম্মে নিযুক্ত ছিলেন। রাজা মহাশয় অন্য পুরে গমন করিবার পর সকলের মুখ দিয়া কথা নির্গত হইল। সেই সময়ে দাওয়ানজী মহাশয় মন্ত্রী মহাশয়কে কহিলেন, “পাট ক্রয় করিতে দক্ষ লোকের নিমিত্ত রাজা মহাশয় যখন এত ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছেন, তখন একটা লোক স্থির করিয়াই কেন দিউন না।”

 মন্ত্রী। লোকের আবশ্যক বলিয়াই যে একটা অকর্ম্মণ্য লোক নিযুক্ত করিতে হইবে, এমন নহে। পনের কুড়ি দিবস একটু পরিশ্রম করিলে সম্বৎসরের নিমিত্ত তাহাকে আর চিন্তা করিতে হইবে না। এরূপ কার্য্যের নিমিত্ত আমি একজন সামান্য লোক নিযুক্ত করিতে পারি না।

 দাওয়ান। তবে এরূপ উৎকৃষ্ট অথচ কঠিন কার্য্যের নিমিত্ত অপর লোক নিযুক্ত করিবার প্রয়োজনই বা কি? আপনার অধীনে ও অনেকগুলি কর্ম্মচারী কর্ম করিতেছেন। দশ পনর দিবসের নিমিত্ত তাঁহাদিগের মধ্য হইতে একজনকে পাঠাইয়া দিলে হয় না?

 মন্ত্রী। আমিও মনে মনে তাহাই স্থির করিয়া রাখিয়াছিলাম। কিন্তু রাজা মহাশয় যখন ঢাকা কি সিরাজগঞ্জ নিবাসী কোন লোককে নিযুক্ত করিতে চাহিতেছেন, তখন আমি আমার অধীনের কর্মচারীগণের মধ্যে কাহাকেও পাঠাইতে পারি না। কারণ, সেই প্রদেশীয় কোন লোকই রাজ-সরকারে কর্ম্ম ক্রেন না।

 দাওয়ান। এরূপ অবস্থায় যাহা আপনি ভাল বিবেচনা করেন, তাহাই করুন। এসিস্টেন্ট সেক্রেটায়ী বাবুর বাড়ী আমার বোধ হয় ঢাকা জেলায়। তাহাকে বলিলে তিনি নিশ্চয়ই একজন উপযুক্ত লোক স্থির করিয়া দিতে পারেন সন্দেহ নাই।

 মন্ত্রী। আপনি উত্তম কথা বলিয়াছেন। সেক্রেটারী মহাশয়ের বাড়ী ঢাকা জেলায়, ইহা আমি অবগত হইয়াছি; কিন্তু কার্য্যের সময় সে কথা আমার মনে হয় নাই। আপনার এই প্রস্তাবের নিমিত্ত আমি আপনাকে ধন্যবাদ না দিয়া থাকিতে পারি না। (এসিষ্টেন্ট সেক্রেটারীর প্রতি) আপনি অনুগ্রহ পূর্বক যদি একজন উপযুক্ত ও বিশ্বাসী লোক স্থির করিয়া দেন, তাহা হইলে সবিশেষ উপকৃত হই। কারণ, আপনি নিজেই শুনিলেন, রাজা মহাশয় একজন লোকের নিমিত্ত কিরূপ ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছেন।

 এসিষ্টেন্ট সেক্রেটারী। লোকের অভাব নাই। আমি কল্য নিশ্চয়ই একজন লোক ঠিক করিব, এবং যে সময় এইস্থানে আগমন করিব, সেই সময় আমি তাহাকে সঙ্গে করিয়া আনয়ন করিব।

 মন্ত্রী। দেখিবেন যেন ভুলিবেন না। আর আপনার টাকা সম্বন্ধে যেরূপভাবে শেখা পড়া করিয়া লইতে চাহেন, সেইরূপভাবে একটা খসড়া আপনি প্রস্তুত করিয়া আনিবেন। উহা আমি একবার দেখিয়া রাজা মহাশয়ের সম্মুখ শিখাইয়া লইব। তাহার পর উহা নিয়মিতরূপ ষ্ট্যাম্প কাগজে লিখিয়া দিলেই আপনি টাকা প্রাপ্ত হইবে। লেখা পড়া করি কি রেজিষ্টায়ী হইবার পুর্ব্বেই যদি আপনার টাকার সবিশেষ প্রয়োজন হয়, তাহা হইলেও কতক অংশ পূর্বেই আপনি লইতে পারিবেন।  এসিন্টেন্ট সেক্রেটারীর সহিত এইরূপ.. দুই চারিটা কথা হইবা পরই মন্ত্রী মহাশয় সেই কয়বার গৃহ পল্লিত্যাগ করিয়া আপনার বাসা-অভিমুখে প্রস্থান করিলেন।

 যাঁহারা রাজা মহাশয়ের সহিত তাল খেলা করিয়া এক দিবসেই লক্ষ টাকার সংস্থান করিয়া লইলেন, তাঁহাদিগকে লক্ষ্য করিয়া দাওয়ানজী মহাশয় কহিলেন, “এইরূপ ক্রীড়ার রাজা মহাশয়ের মনের গতি কতদিবস স্থির থাকিরে, তাহা বলিতে পারি না। এই সময়ে কিছু সংস্থান করিয়া লউন। রাজা মহাশয়ের অগাধ টাকা; সুতরাং ইহাতে তাঁহার অধিক কিছু ক্ষতি হইবে না, অথচ আমরা পাঁচজন এই সুযোগে কিছু উপার্জন করিয়া লইতে পারি।”

 দাওয়ানজী মহাশয়ের কথা শ্রবণ করিয়া উঁহাদিগের মধ্য হইতে একজন কহিলেন, “আপনার সম্মুখে আপনার মনিবের নিন্দা করা উচিত নহে। আমরা বিস্তর বিস্তর মুর্খ দেখিয়াছি, কিন্তু আপনার রাজা সাহেব সদৃশ মূর্খ ব্যক্তি এ পর্যন্ত আমাদিগের নয়নগোচর হয় নাই। বড়মানুষ হইলেই কি এইরূপ মূর্খ হইতে হয়?

 দাওয়ান। আমার মনিব যে সকল কার্য করেন, আছে তাঁহাকে মুর্খ বলা যাইতে পারে না; চলিত কথায়, উহাকে বড়মানুষি কহে। চিরকালটা পল্লীগ্রামে রাজত্ব করি ইহাকে জীবন অতিবাহিত করিতে হয়। সেই সকল স্থানে যে সকল লোক ইহার নিকট গমন করিতে পারে না; সুতরাং এরূপভাবে অর্থ নষ্ট করিবার সুযোগও হয় না। কলিকাতা আসিয়া যে কয়দিবস অবস্থিতি করেন, সেই কয়দিবস নানারূপে খরচের মত সকলকে দেখাইয়া খান। আপনারা যেমন একদিন জুটিয়া গিয়াছেন, সেইরূপ যদি আর কাহাকেও পাই, তাহা হইলে আমার মনিবের সঙ্গে তাঁহাকেও জুটাইয়া দিই। আপনাদিগের উপলক্ষে যেমন কিছু কিছু প্রাপ্ত হইতেছি, সেইরূপ তাঁহাদিগকে উপলক্ষ করিয়া আরও কিছু সংস্থান করিয়া লইতে পারি।

 ক্রীড়কারী একজন। তাস খেলার কৌশল যেমন আমাদিগকে শিখাইয়া দিয়া, পরিশেষে রাজা মহাশয়ের সহিত মিলাইয়া দিয়াছেন; এসিষ্টেন্ট সেক্রেটারী মহাশয়কেও কেন সেইরূপে শিখাইয়া দিয়া তাঁহাকেও এই রাজা মহাশয়ের সহিত মিলাইয়া দেন না? তাহা হইলে আপনারও মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হইবে, এবং এসিষ্টেন্ট সেক্রেটারী মহাশয়ও মধ্য হইতে কিছু উপার্জন করিয়া লইয়া যাইতে পারিবেন। রাজা মহাশয় এইস্থান হইতে প্রস্থান করিয়া গেলে ত আর এরূপ সুযোগ সহজে পাওয়া যাইবে না।

 দাওয়ানজী। সেক্রেটারী মহাশয় যদি সেরূপ ইচ্ছা করেন, তাহা হইলে আমিও চেষ্টা দেখিতে পারি।

 এসিষ্টেন্ট সেক্রেটারী মহাশয় এ সম্বন্ধে কোন কথা কহিলেন না। ইহার পর গল্পের শ্রোত ফিরিয়া গেল। অন্য অনেক কথাই পর সে দিবসের কার্য্য শেষ হইল। আগন্তুক ব্যক্তিগণ আপন স্থানে প্রস্থান করিলেন। দাওয়নজী মহাশয়ও দরবার গৃহ পরিত্যাগ করিবার মানসে গাত্রোত্থান করিলেন। এদিকে সেক্রেটারী অতঃপর গারোত্থান করিয়া ভগবান দাসের সঙ্গে আপ্ন বাসায় গমন করিলেন। যাইয়ার, সময় দাওয়ানজী মহাশয়ের নিকট বিদায় গ্রহণ করিলেন। “যে সময়ে আজ আগমন করিয়াছিলাম, পরদিবস পুনরায় সেই সময় মুসবিদার খসড়া সহিত আগমন করিব” এই কথা বলিয়া গেলেন। গমন করিবার কালে পথে ভগবান দাস কহিল, “কেমন মহাশয়। কিরূপ মহাজনের যোগাড় করিয়া দিয়াছি?”

 সেক্রেটারী। মহাজন ভালই বলিয়া বোধ হইতেছে; তবে কার্য্য শেষ না হইলে কোন কথা বলা যায় না।

 ভগবান। যখন রাজা মহাশয়ের আদেশ হইয়া গিয়াছে, তখন কার্য্যও শেষ হইয়া গিয়াছে জানিবেন।

 সেক্রেটারী। যে পর্যন্ত সমস্ত বিষয় শেষ না হইয়া যায়, সেই পর্যন্ত যদি রাজা মহাশয় পুনরায় নূতন আদেশ প্রদান না করেন, তা হলেই ভাল।

 ভগবান। আপনি ইহার সহিত পূর্ব্বে কখনও ব্যবহার করেন নাই বলিয়া, এই প্রকার কহিলেন। যদি পূর্ব্ব হইতে ইহার সহিত আপনার জানা শুনা থাকিত, তাহা হইলে এরূপ কথা কখনই আপনার মনে উদিত হইত না। ইহার মুখ হইতে একবার যে কথা বাহির হইবে, লক্ষ লক্ষ মুদ্রায় ক্ষতি হইলেও, সে আদেশ কখনই তিনি প্রত্যাহার করিবেন না। তাহার দৃষ্টান্ত আজ আপনি স্বচক্ষেই দর্শন করিলেন। দুই ঘণ্টার মধ্যে লক্ষ টাকা নষ্ট করিয়া যিনি এবারের নিমিত একটু দুঃখ প্রকাশ করিলেন না, তাহার জন কত উচ্চতর বিশেষত কেহই কত টাকা আছে, তাহা আমরা এ পর্য্যন্ত কেহই স্থির করিয়া উঠিতে পারিলাম না।  সেক্রেটারী। তবে কি মোর বিশ্বাস হয় যে, রাজা মহাশয়ের নিকট হইতে আমি, আমার প্রস্তাবিত অর্থ সংগ্রহ করিতে সমর্থ হইব।

 ভগবান। তাহার আর কিছু ভুল নাই। টাকা আপনার হস্তগত হইয়াছে, ইহাই আপনি স্থির করিয়া রাখুন।

 সেক্রেটারী। ইনি কি এতই ধনী?

 ভগবান। তাহা আর আপনি আমাকে কেন জিজ্ঞাসা করিতেছেন? ইহার কার্য্য দেখিয়া তাহা আর আপনি অনুমান করিতে পারিতেছেন না?

 ভগবান দাসের সহিত এইরূপ কথাবার্তা হইতে না হইতেই এসিষ্টেন্ট সেক্রেটারী মহাশয় তাহার বাসায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন।