লক্ষ্মী (ভূপেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী)/১
লক্ষ্মী।
[ ১ ]
বৈশাখ মাস—বেলা প্রায় চারিটার পর হইতেই হুগলী জেলার অন্তর্গত বক্নাহাটী গ্রামের উপরিভাগের আকাশের গায়ে একখানি একখানি করিয়া মেঘ আসিয়া জমা হইতে আরম্ভ করিয়াছিল। সন্ধ্যা হইবার প্রায় এক ঘণ্টা পূর্ব্বে ঝড় উঠিল। গ্রামের ছোট-বড় ছেলে মেয়েরা কোচড় ভরিয়া আম কুড়াইবার জন্য উচ্চ কলরব করিতে করিতে দলে-দলে বাহির হইরা গ্রামের বিভিন্ন আম-বাগানের উদ্দেশে উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়াইতে লাগিল।
মিত্তিরদের বার-তের বৎসরের হৃষ্টপুষ্ট গোকুল এবং তাহারই সমবয়সী আরও জনকয়েক এপাড়া ওপাড়ার ছেলে-মেয়ে ছুটিয়া আসিয়া যে বাগানটীর মধ্যে প্রবেশ করিল, তাহার নাম বেল-বাগান। বাগানটির এরূপ নাম-করণ হওয়ার একটী বিশেষ কারণ আছে। এই বাগানের মধ্যে অনেক দিনের পুরাতন একটী বেলগাছ আছে। গাছটি কোন একটী শান্তশিষ্ট ব্রহ্মদৈত্যের বাসস্থান, এম্নিই একটা জনশ্রুতি বহুদিন হইতে প্রচলিত আছে।
বাগানে প্রবেশ করিয়া বালকেরা যে যাহার সাধ্যমত আম কুড়াইতে আরম্ভ করিয়াছে, এমন সময় সহসা,—সেই বেলগাছটির শাখা প্রশাখা ভেদ করিয়া যে জাম-গাছটি উঠিয়াছিল, তাহারই একটা ডাল যেমন ‘মড়-মড়’ শব্দে ভাঙ্গিয়া পড়িল অম্নি তাহারা প্রায় সকলেই—‘বাবারে; ভূত্ রে’ বলিয়া কোচড়ের আমের ভার ফেলিয়া দিতে-দিতে ছুটিয়া বাগান হইতে বাহির হইয়া পড়িল। তাহাদের ধাক্কা খাইয়া ও-পাড়ার সত্যচরণ সরকারের ভাগিনেরী আট বৎসরের লক্ষ্মী বাগানের সঙ্কীর্ণ পথের উপর উবুড় হইয়া পড়িয়া গেল। সে কতক ভয়ে, কতক বা পড়িয়া যাওয়ার আঘাতে —“মাগো, মলুম গো” বলিয়া আর্ত্তস্বরে চীৎকার করিয়া উঠিল। ঘোষকৃষকের পুত্র সুরো ও গদাই, গোকুলের এই অনুচরদ্বয় এবং গোকুল নিজে তখনও লক্ষ্মীর পশ্চাতে ছিল। তাহাদের কেহই তখনও আমগুলি ফেলিয়া দেয় নাই বটে, কিন্তু বাহির হইয়া পড়িবার জন্য তাহারা তিন জনেই ছুটিতে আরম্ভ করিয়াছিল। কিছুদূর পশ্চাৎ হইতে লক্ষ্মীকে পড়িয়া যাইতে দেখিয়া গোকুল তাহার দিকে ছুটিয়া আনিয়া একহাতে লক্ষ্মীকে ধরিয়া উঠাইয়া দাঁড় করাইল; দেখিল যে, তাহার হাত পায়ের স্থানে স্থানে ছিঁড়িয়া গিয়াছে এবং ঠোট কাটিয়া গিয়া রক্ত পড়িতেছে। ইহা ভিন্ন, পথের ধারের কতকগুলি আগাছার ‘খোঁচে' জড়াইয়া গিয়া তাহার অর্দ্ধমলিন ডুড়ে কাপড়খানিও খানিকটা ছিঁড়িয়া গিয়াছে। দেখিয়া গোকুলের মনে ভারি মান্না হইল।
পায়ের হাঁটুতে একটু বেশী রকম আঘাত লাগায় লক্ষ্মীর উঠিয়া চলিবার শক্তি ছিল না। সেই জন্য গোকুল, জ্যেষ্ঠ গদাইকে তিন জনের আমের বোঝা লইতে আদেশ দিয়া, কনিষ্ঠ সুরোকে, লক্ষ্মীর একটী হাত ধরিতে বলিয়া নিজে তাহার অপর হাতখানি অতিশয় যত্নের সহিত ধরিয়া বাগান হইতে বাহির করিয়া লইয়া যাইতে যাইতে সমবেদনা পরিপূর্ণ কণ্ঠে লক্ষ্মীকে প্রশ্ন করিল,—“খুব লেগেছে, নারে লক্ষ্মী?” লক্ষ্মী গুন্ গুন্ করিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে হাঁ’ বলিল কি ‘না’ বলিল, তাহা স্পষ্ট করিয়া বুঝা গেল না।
বাহিরে আসিয়া একটী পুস্করিণীর ধারে গিয়া গোকুল নিজের কাপড় ভিজাইয়া অতি সন্তর্পণে লক্ষ্মীর ঠোঁটের রক্ত মুছিরা দিতে লাগিল। ইহার পর তাহাকে লইয়া যখন তাহাদের বাড়ীর সদর দরজায় আসিয়া দাঁড়াইল তখন, ঝড় থামিয়া গিয়াছে; সন্ধ্যার আব্ছা অন্ধকার ধীরে-ধীরে ঘন হইয়া উঠিয়াছে;—পাখীরা গাছে-গাছে তাহাদের স্বাভাবিক সন্ধ্যাস্তোত্র পাঠ করিতে আরম্ভ করিয়াছে। লক্ষ্মীর বিধবা মা সরস্বতী তখন মেয়ের আসা পথ চাহিয়া সদর দরজায় বসিয়াছিলেন এবং বাড়ীর ভিতর দাওয়ার বসিয়া সত্যবাবু গাঁজার কলিকায় আগুন ধরাইবার চেষ্টা করিতে ছিলেন। এমনি সময়ে মেয়েকে ঐ অবস্থায় পাইরা এবং গোকুলের মুখে সমস্ত বৃত্তান্ত শুনিয়া সরস্বতী গোকুলকে শত সহস্র আশীর্ব্বাদ করিতে লাগিলেন। সহসা ছর্-ছর্ করিয়া বৃষ্টি আসিয়া পড়িতেই সরস্বতী তাহাদের চারজনকেই বাড়ীর মধ্যে ডাকিয়া লইলেন।