বিষয়বস্তুতে চলুন

লক্ষ্মী (ভূপেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী)/১০

উইকিসংকলন থেকে

◄  
১১  ►

[ ১০ ]

 মাস চারেক পরে একদিন সকাল, প্রায় আটটার সময় রূক্ষমাথায়, খালি পায়ে, মলিন উত্তরিয়টা গায়ে জড়াইয়া গোকুল লক্ষ্মীদের প্রাঙ্গনে পা দিয়াই লক্ষ্মীকে সুমুখের দালানে পাইয়া সেইখানে দাঁড়াইয়াই ভারি গলায় বলিল—“লক্ষ্মী, আমি নিজে ব’ল্‌তে না এলে তুই তো যাবিনে বোন, কিন্তু আরো আমার ওপর রাগ কেন ভাই?” বলিতে বলিতেই ঝর্ ঝর্ করিয়া কাঁদিয়া ফেলিল। লক্ষ্মী তাড়াতাড়ি উঠিয়া আসিয়া তাহার একটী হাত ধরিয়া আর্তস্বরে বলিল— “গোকুল দাদা গো—তুমি যে সত্যিই এমন হয়ে গেছ’ তা’ যে বিশ্বাস করতে পারিনি গো—” বলিয়া সেও কাঁদিয়া ফেলিল।

 তারপর তাহার হাত ধরিয়া আনিয়া দালানে বসাইল। গোকুল প্রকৃতিস্থ হইয়া মুখ তুলিল। তারপর ভিজা গলায় বলিল—“আমার শরীর খারাপ হওয়া তো আশ্চর্য্য নয় বোন্—তুই কেন এমন হয়ে গেচিস্ লক্ষ্মী? কোন অসুখ-বিসুখ করে নাকি?

 না বুঝিয়া যাহার মনে ব্যথা দিবার পর হইতে এই চারি মাস কাল অনুতাপে দগ্ধ হইয়া নীরবে আপনার দেহ কালী করিয়াছে, তাহারই চোখে আজ এমনভাবে ধরা পড়িয়া লক্ষ্মী মনে-মনে আপনার এই দগ্ধ হওয়াটার সার্থক হইয়াছে ভাবিয়া ঈষৎ আনন্দ লাভ করিল। মুখে কিন্তু সে ভাব মোটেই প্রকাশ না করিয়া বলিল—“ও তোমার দেখার ভুল গোকুলদা—অনেক দিন আসনি কিনা। সে যা’ হোক, তোমার কিন্তু এমন অবুঝের মত কাজ করলে তো চলবে না গোকুলদা—এতদিন যা’ -ক’রেচ, তা’র তো আর উপায় নেই—কিন্তু এখন থেকে আমি আর তা’ কোন মতেই হ’তে দোবো না —আচ্ছা এর জন্যে পিসি-মা তোমায় বকেন না?”

 গোকুল মাথা হেঁট করিল। লক্ষ্মী বলিল—“সে তো জানি—তোমার সঙ্গে বুড়ী মানুষ কি পেরে ওঠে? —না গোকুল দা, তুমি নিজে না বুঝ্‌লে আমিও তো তা’ পার্‌বো না। আচ্ছা, তুমি-ই বল, কা’র মা-বাপ চিরদিন বেঁচে থাকে;—কিন্তু তোমার মতন এমন ক’রে না খেয়ে খেয়ে কে নিজের অমঙ্গল টেনে আনে বল?” গোকুল মুখ তুলিয়া দেখিল, লক্ষ্মীর চোখে জল। দেখিয়া গোকুলেরও কাঁন্না পাইল। আর্দ্রকণ্ঠে বলিল— “তা’ মানি বোন, কিন্তু আমার মতন অভাগা সংসারে আর ক’জনকে দেখ্‌তে পাওয়া যায় বল্ দিকি লক্ষ্মী?—‘গোকুলের বিয়ে হবে’—মায়ের যে কত বড় সাধ ছিল, সেকথা তুই যেমন জানিস্ তেমন তো অপরে আর কেউ জানেনা ভাই; কিন্তু বিয়ে তো দূরের কথা, দশ টাকা বৃত্তি পেয়ে পাশ -হওয়ার কথাটাও মা আমার শুনে যেতে পেলে না-একি কম দুঃখের কথা বোন—” গোকুল আবার কাঁদিল।

 এই সময় গোকুলের মড়ার মত পাংশু মুখখানি দেখিয়া লক্ষ্মীর বুকের ভিতরটা কি যে করিতে লাগিল বাহির হইতে অন্যে তাহা বুঝিবে কেমন করিয়া? সে নিজের আঁচল দিয়া তাহার মুখখানি মুছিয়া দিতে-দিতে বলিল—“চুপ কর’ গোকুল দা—আমারও তো বাপ নেই গোকুল দা—”

 শরৎবাবু বাড়ী ছিলেন না; এখন বাড়ী ঢুকিয়া আজ অনেক দিনের পরে দু’জনকে এই ভাবে বসিয়া কাঁদিতে দেখিয়া লক্ষ্মীর এতদিনকার কথাটী ভাবিয়া মনে-মনে স্বস্তির একটা নিশ্বাস ফেলিলেন এবং মুখে কুসুমের মৃত্যুর কথাটা স্মরণ করিয়া অনেক দুঃখ প্রকাশ করিলেন। তারপর লক্ষ্মী উঠিয়া ও-ঘরে চলিয়া যাইবার পর কথা প্রসঙ্গে বলিয়া উঠিলেন —“তা’ এতদিন আসনি কেন গোকুল? সেই যে কি ঝগ্‌ড়া ক’রে বেরিয়ে গিছ্‌লে তারপর থেকে ও কি আমায় কম জ্বালাতন ক’রেচে—” এই পর্য্যন্ত বলিয়া একবার দেখিয়া লইলেন, লক্ষ্মী ও-ঘর হইতে বাহির হইয়াছে কিনা, তারপর আবার বলিলেন-” স্বীকার ক’র্‌বে, তা’র কোন দোষ নেই—নিজের-ই দোষ, অথচ আমি যদি বলি, বেশ তো, তুমি কেন ডেকে পাঠাও না; তা হ’লেই আমার ওপর জ্বলে উঠে যা’ নয় তাই শুনিয়ে দেবে—তারপর আবার কোথাও কিচ্ছু নেই, খপ, ক'রে পায়ে হাত দিয়ে অপরাধের ক্ষমা চাইবে। ঐ যে বল্লুম, ওঠা যে কি রকম মানুষ তা’ আমি ভেবেই পাইনে—” এই বলিয়া স্ত্রীর প্রতি স্নেহের আধিক্যে হাসিতে লাগিলেন। এমন সময় পশ্চাৎ হইতে লক্ষ্মী হাসি টিপিয়া বলিল—“তা' তো বটেই—লোকের কাছে আমার মিথ্যে গ্লানি গেয়ে হাসবে না তো আর হাস্‌বে কিসে বল?”

 ধরা পড়িয়া গিয়া শরৎবাবু হাসিতে হাসিতে বলিলেন—“মিথ্যে ক’রে আবার কি, আমার সঙ্গে ঝগড়া তুমি করোনি?”

 লক্ষী বৃদ্ধকে ঠিক্ কিসের চক্ষে দেখিত জানিনা, তবে সে যে তাঁহাকে উঠিতে বসিতে আনন্দে ডুবাইয়া রাখিবার চেষ্টা করিত, এ কথা নিঃসংশয়ে বলা যাইতে পারে। এখন হাসিতে হাসিতে বলিল—“ক’রিনি কেন, কিন্তু কেন যে ক’রতুম, তা’ তো আর সত্যি করে বলা হ’ল না;আমার যখন মাথাটাতা ধ’রে কষ্ট হ’ত, ও তখন কোথাও কিচ্ছু নেই, অম্‌নি কি ব’লে আমায় রাগাতো জান গোকুল-দা— আমি যেন, তুমি আপনি ব’লে দুঃখু ক’র্‌চি, গায়ের জোরে এম্‌নি বুঝে নিয়ে, ব’ল্‌তো—তোর গোকুল-দা......আমিও তেম্‌নি খুব ক’রে ঝগড়া ক’র্‌তুম।”

 বৃদ্ধ বলিলেন—“হ্যাঁ, তা’ আমি বল্‌তুম বটে ভায়া, বল্‌তুম,তোর গোকুল-দা মরে গেছে—” বলিয়া স্ত্রীর মুখপানে কেমন এক প্রকার দৃষ্টিতে চাহিয়া নিজের কথায় নিজেই হাসিতে লাগিলেন।