বিষয়বস্তুতে চলুন

লক্ষ্মী (ভূপেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী)/১১

উইকিসংকলন থেকে

◄  ১০
১২  ►

[ ১১ ]

 ছয় দিন পরে ‘মহা’ না হইলেও ‘বেশ’ সমারোহে গোকুলের মা’র শ্রাদ্ধ হইয়া গেল। তা’ ত গেল, কিন্তু বিনয়বাবুরও এদিকে যে মাথা ঘুরিয়া গেল।—তাহার উপায় কি?—মেয়ে যে এগার পার হইয়া বারোয় পা দিয়াছে,—এখন আরো এক বৎসর গোকুলের মুখ চাহিয়া তাহার বিবাহ না দিয়া রাখা যায় কি করিয়া! তিনি এখন কেবলি এই বলিয়া অনুতাপ করিতেছেন যে, গোকুলের পরীক্ষা দেওয়া শেষ হইয়া গেলেই তিনি কেন বিবাহ দেন নাই? পুরুষ মানুষ হইয়া তিনি কেন মেয়েদের কথায় ভুলিয়াছিলেন? মেয়েকে ম্যালেরিয়ায় ধরিয়াছে—মাঝে মাঝে জ্বর হইতেছে, তাই বলিয়া তাহার বিবাহ কেন বন্ধ রাখিলেন? ইত্যাদি ভাবিয়া কখনও নিজের উপর, কখনও বা মেয়েদের উপর রাগে ফুলিতে লাগিলেন।

 মায়ের শ্রাদ্ধ হইয়া গেলে একদিন ভাবী শশুর মহাশয়ের পত্র পাইয়া গোকুল আরও পড়িতেই মনস্থ করিয়া কলিকাতায় গিয়া কোন কলেজে ভর্ত্তি হইয়া পড়িবার ইচ্ছা করিল। নারায়ণীও ইহাতে বিশেষ উৎসাহ দেওয়া ব্যতীত কোনরূপ অমত করিলেন না। কিন্তু বাড়ীতে কেবল তিনি ও বৃদ্ধ ভৃত্য হরিপদ ভিন্ন আর কেহই ছিল না; কাজেই, পিসি-মার একা থাকিতে বড়ই কষ্ট হইবে ভাবিয়া, গোকুল এমন একটী স্বজাতিয়া বিধবাকে নিযুক্ত করিয়া গেল, যে, সর্ব্বদাই নারায়ণীর সঙ্গে এ বাড়ীতেই থাকিবে—এবং সকল কাজেই তাঁহার সহায়তা করিবে।

 মায়ের অসুখের জন্য লক্ষ্মী তখন মামার বাড়ী আসিয়াছিল। কলিকাতা রওনা হইবার পূর্ব্ব-দিন গোকুল তাহাদের বাড়ী গিয়া লক্ষ্মী ও তাহার মা সরস্বতী, গ্রামের মধ্যে তাহাদের এই মঙ্গলাকাঙ্ক্ষিণী রমণী দু’টীকেও পিসি-মার প্রতি লক্ষ্য রাখিবার বিষয় অনেক করিয়া বলিয়া যাইতেও বিস্তৃত হইল না। আর তাহার খুড়িমা মনোরমা; তিনি তো তাহাদের আপনার কেহ বলিলেই হয়, সুতরাং এ বিষয় সে তাঁহাকে আর অনুরোধ করিয়া যাইবে কি!

 সে যাহা হউক, দেখিতে দেখিতে বৎসর ঘুরিয়া গেল। তারপর একদিন বেলা প্রায় দশটার সময়, বোসেদের বাড়ীর গাড়ী যখন বর ক’ণে লইয়া বাড়ীর সদরে আসিয়া থামিল; তখন বাড়ীর ভিতর হইতে শঙ্খধ্বনি ও জনকরেক রমণী কণ্ঠের মিশ্রিত হুলুধ্বনি শূন্যে উত্থিত হইয়া গ্রামের অনেক দূর পর্য্যন্ত গোকুলের মা কুসুমের দুঃখটা সে দিন আবার নূতন করিয়া ঘোষণা করিয়া দিল।

 ম্যালেরিয়া-ক্লিষ্ট নব-বধু অমিয়াকে সেই দিন প্রথম দেখিয়া লক্ষ্মীর হৃদয়ের গভীরতম প্রদেশে কি যেন কেমন-কেমন করিয়া উঠিয়াছিল; কিন্তু তাহা ঠিক্ কেন এবং কি রকম যে করিয়াছিল, তাহা সে নিজেও ঠিক্ করিয়া বলিতে পারে না।

 তারপর একদিন বিনয়বাবু আসিয়া মেয়ে লইয়া গেলেন। কলেজের গ্রীষ্মের লম্বা ছুটী শেষ হইতে তখনও কিছুদিন বাকী ছিল বলিয়া গোকুল বাড়ীতেই রহিয়া গেল।

 কিছুদিন হইতে সরস্বতীর প্রকৃত রোগ ধরা পড়িয়াছিল—উহা যক্ষ্মা। স্বামীর অনুরোধে লক্ষ্মী হুগ্‌লি হইতে ভাল ডাক্তার আনাইয়া মায়ের উপযুক্ত চিকিৎসা আরম্ভ করিয়াছিল। গোকুল প্রতিদিন আসিয়া সরস্বতীর পাশে বসিয়া আপনার নিরতিশয় সঙ্কীর্ণ অভিজ্ঞতা অনুসারে মাঝে-মাঝে তাঁহার নাড়ী টিপিয়া, কাশির শব্দ শুনিয়া এবং কফের বর্ণ পরীক্ষা করিয়া যাইত। আজ অত্যন্ত বাড়াবাড়ি হইয়াছে শুনিয়া, ভোর হইতেই এ বাড়ী আসিয়া ডাক্তার বাবুকে সকাল-সকাল আসিবার জন্য অনুরোধ করিয়া লোক পাঠাইয়া দিয়াছিল।

 সরস্বতী গোকুলকে কাছে বসিতে বলিয়া, ক্ষীণ কণ্ঠে বলিলেন— “আর জন্মে তুমি আমার পেটের ছেলে ছিলে গোকুল।” বলিয়াই খুক্-খুক্‌ করিয়া দুইবার কাসিলেন। গোকুল বলিয়া উঠিল,—“ও কথা আজ তো তুমি নতুন ব’ল্‌ছ না মাসি-মা!”

 তিনি বলিলেন,—“তা’ জানি বাবা। কিন্তু আজ আমার মন এ-কথা ঠিক যেমন ক’রে ব’লছে গোকুল, এমন সত্যি ক’রে বোধ করি আর কখনও বলিনি—ব’ল্‌তে পারিনি; এ তুমি বেশ জেন বাবা।” বলিয়া আবার কাসিলেন।

 গোকুল কুণ্ঠিত হইয়া বলিল,—“ও কথা থাক্‌ না মাসি-মা।”

 “না বাবা, আরো তুমি থাকতে বল? আমি আর কতক্ষণ গোকুল; জানি, তোমরা সব এ কথা মুখ দিয়ে ব’ল্‌তে আমায় মানা ক’র্‌বে, কিন্তু মুখে ‘ম’রবো না” ‘ম’র্‌বে না’ ব’ল্‌লেই মানুষ যে না মরে তা’ তো নয় বাছা।” বলিয়া কাশি আসিতেই চুপ করিলেন। কাশি হইল না। এতগুলি কথা বলার পরিশ্রমে হাঁপাইয়া পড়িয়াছিলেন; একটু জিরাইতে লাগিলেন। এই অবসরে গোকুল বলিয়া উঠিল— “সে যা’ হোক্‌ মাসি-মা তুমি এখন বেশী বোকোনা।”

 "না বাবা, আর তার শক্তিও বড় আমার নেই, তাই কথাগুলো শেষ ক’রে ব’লতে পারেই নিশ্চিন্ত হই! দ্যাখ’ বাবা, এই একটী কথাই আমি অনেকদিন থেকে ভেবে আস্‌চি, যে, মানুষ যা’ আশা করে, যেমনটি হ’লে তার মনে শান্তি হয়, এ জগতে তা’ হ’বার জো নেই;—তাই এখন আর সেজন্যে আমি কোন দুঃখ করিনে গোকুল। ভগবানের কাছে এই প্রার্থনা করি বাবা, লক্ষ্মী আমার যা’ পেয়েচে, তা’তেই ও-যেন শান্তি পায়।” তিনি থামিলেন, বোধ করি মনের আবেগ-উচ্ছ্বাস সংযত করিবার মানসেই, থামিলেন। তাঁহার চোখের কোণে দুই ফোঁটা অশ্রু আসিয়া পড়িল। চক্ষু মুছিয়া বলিলেন - “যাক্, ও যে খেতে পর্‌তে কখনও কষ্ট পাবে না, এও একটা ভাগ্যের কথা।” এই সময় গরম দুধের বাটি লইয়া—লক্ষ্মী ঘরে ঢুকিয়া মাকে বলিল—“ও কি মা, অমন ক’রে ব’ক্‌চ কেন?” বলিয়া গোকুলের মুখপানে চাহিল। গোকুল অপরাধীর মত বলিয়া উঠিল—“আমি কি ক’র্‌বো লক্ষ্মী—এত ক’রে বারন ক’চ্ছি, মাসি-মা যে আমার কথা শুন্‌চেই না।”

 লক্ষ্মী সে কথার কোন জবাব না দিয়া বলিল—“ওঠ’ মা দুধ এনেচি খাও।”

 “না বাছা, এখন আর খেতে ইচ্ছে নেই; আমার মাথা খাস্ লক্ষ্মী, ও নিয়ে আমায় আর বিরক্ত করিসনে মা; বরং তুইও একটু আমার মাথার কাছে ব’স্—” বলিয়াই কাসিতে লাগিলেন।

 লক্ষ্মীও আর বেশী পীড়াপীড়ি না করিয়া মায়ের পায়ের কাছে বসিয়া পড়িল। বসিয়া গোকুলের মুখপানে চাহিয়া বলিল— “ডাক্তার বাবুকে খুব শীগ্‌গীরি আস্‌তে লিখে দিয়েচ তো গোকুল দা!”

 সরস্বতী বলিয়া উঠিলেন—“আরও ডাক্তার কেন লক্ষ্মী স্বয়ং মহাদেব এলেও যে আর আমার কিছু ক’র্‌তে পারবে না, তা‍’ কি তোরা বুঝতে -পার্‌চিসনে বাছা—না না, অষুধ আর আমি খাব’ না-শেষ সময় আমায় আর জ্বালাতন করিস্‌নে লক্ষ্মী—” লক্ষ্মী “ও কি কথা বল মা?” বলিয়া আঁচলে মুখ ঢাকিয়া কাঁদিয়া ফেলিল। সরস্বতী মেয়েকে সান্ত্বনা দিতে লাগিলেন।

 কিছুক্ষণ পরে তিনি আবার বলিলেন,—“দেখিস্ বাছারা, মরবার -সময়েও আমি যেন এম্‌নি ক’রেই তোদের দু’জনকে দু’পাশে দেখ্‌তে দেখ্‌তে মর্‌তে পাই। এ আমার বড় সাধ গোকুল, দেখিস্ বাছারা, এ সুখে তোরা যেন আমায় বঞ্চিত করিস না!—হ্যাঁরে, দাদাকে আজ সকাল থেকে দেখ্‌চিনে কেনরে?”

 লক্ষ্মী ভিজা গলায় বলিল—“কি জানি, বাবুরা কি জন্যে ডেকে পাঠিয়েছিল,—সেই ভোর বেলা গোকুলদা’কে ডেকে দিয়ে গেছে—এখনও তো এল না।”

 সরস্বতী বলিলেন—“এল না, আস্‌বেই অখন— আহাঃ!—তা’র মনে যে কি হ’চ্ছেরে, তা’ তোরা কি বুঝ্‌বি বাবা”—বলিতে বলিতেই ঝর্‌ ঝর্‌ করিয়া অশ্রুবর্ষণ করিতে লাগিলেন।

 কিছুক্ষণ পরে লক্ষ্মী ঘর হইতে বাহির হইয়া গেলে, সরস্বতী বলিলেন —“দ্যাখ্‌ বাবা গোকুল, এর পর আর হয় তো বলার সময় পাবো না, হয় তো বলবার শক্তিও থাক্‌বে না—তাই এখুনি তোকে আর একটী শেষ কথা ব’লে রাখি মাণিক—আমার এই কথাটী কখনও ভুলিসনে গোকুল;— লক্ষ্মীকে-আমার ফেলিস্‌নে—মেয়ের-আমার বড় অভিমান বাছা, তাই ব’ল্‌ছি, ও যদি তোর কাছে এসে কখন কোন’ খোট আব্দার-করে, তুই বাবা সাধ্যমত বিরক্ত হোস্‌নে—বল্ বাবা, তোর মাসিমায়ের এই কথাটি চিরদিন মনে রাখ্‌বি?” এই বলিয়া আপনার শীর্ণ হস্তে তাহার একটী হাত চাপিয়া ধরিলেন। গোকুল বাষ্পরূদ্ধ কণ্ঠে বলিল— “রাখ্‌বো বৈকি মাসি মা—আর ও ছাড়া আমারই বা তেমন আপনার লোক আর কে রৈল বল?”

 “তা যা’ ব’লেছ গোকুল—ও যে তোমার কত বড় আপনার, সে কথা আমি যেমন জানি, তেমন জানা সংসারে আর তো কেউ জানেনা বাবা”—বলিতে বলিতে ডুগ্‌রাইয়া কাঁদিয়া উঠিলেন।