লক্ষ্মী (ভূপেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী)/৫
[ ৫ ]
কথাটি সত্য। যেমন করিয়াই হউক সম্বন্ধটী কিন্তু অনেকটা পাকাপাকিই হইরাছিল। নারায়ণীর মনের মধ্যে কুল করিবার বাসনা থাকা সত্বেও কেন যে তিনি এই নিঃস্ব ঘরের মৌলিকের মেয়েকেই ঘরে আনিতে রাজী হইয়াছিলেন, তাহা তিনিই জানেন।
সে যাহা হউক, কল্পনার চক্ষে লক্ষ্মীর ভবিষ্যত জীবনের সুখশান্তিপূর্ণ দিনগুলি যে কতই উজ্জ্বল, তাহাই নিরীক্ষণ করিয়া সরস্বতীর হৃদয়ে যে আনন্দের উদয় হইত, তাহা সত্যই অব্যক্ত। তবে যতদিন চার হাতএক-করিতে না পারিতেছেন, ততদিন তিনি কিন্তু সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হইতে পারিতেছেন না। কি জানি, তাঁহার কপাল যে ভাঙা!”
আজ ছয় মাস হইল গোকুল কলিকাতায় গিয়াছে; এই ছয়মাস কাল সরস্বতী যে কি করিয়া কাটাইয়াছেন, তাহা তাঁহার অন্তরে যিনি আছেন তিনিই জানেন।—দিন যেন আর কাটে না!—কবে বৎসর ঘুরিবে, কবে তিনি শুনিবেন—গোকুল পাশ দিয়া বাড়ী ফিরিতেছে!
জানিনা বিধবাকে ঐভাবে দিন গুনিতে দেখিয়া তাঁহার ভাগ্যবিধাতা মুখটিপিয়া হাসিতেছিলেন কি না; কেননা যে আশাটি এতদিন বিধবার মনের মধ্যে ধীরে-ধীরে বাড়িয়া উঠিতেছিল, তাহাই একদিন সহসা খান-খান্ হইয়া ভাঙ্গিয়া পড়িল।
একদিন দুপুর বেলা নারায়ণী তাঁহাদের বাড়ী আসিয়া যে ভাবে যে-সব কথাগুলি বলিয়া গেলেন, তাহাতে বিধবা বুঝিলেন, এ দোষ কাহারও নয়—দোষ তাঁহার ভাগ্যের। তিনি কাহারও প্রতি একটুকু রাগ অভিমান করিলেন না; কেবল একটীবার অস্ফুটে বলিয়া উঠিলেন—“এই যদি তোমার মনে ছিল ঠাকুর, তবে আশা কেন দিয়েছিলে প্রভু?”
সত্যই নারায়ণীর নিজের কোন দোষ ছিল না। সংসারে কৃতজ্ঞতার মুখ চাহিয়া কাহারও হৃদয়ে ব্যথা দিতে বাধ্য হওয়ার যদি কোন দোষ থাকে, তবে, একমাত্র তাহাই হইয়াছিল নারায়ণীর দোষ। ইহা ভিন্ন, এ কথাটিও ভুলিলে চলিবে না যে, নারায়ণী মানবী ভিন্ন দেবী নহেন।
কথাটী খুলিয়া বলি।
ও পাড়ার বোস-গিন্নি মনোরমার মধ্যম ভ্রাতা বিনয় চন্দ্র ঘোষ মহাশয় অনেক দিন হইতে আপনার কনিষ্ঠা কন্যা অমিয়া সুন্দরীর জন্য একটী সৎপাত্রের সন্ধান করিয়া রাখিয়াছিলেন। কথা ছিল, এই বৎসর সে ছেলে এফ্, এ-পাশ করিলেই শুভ বিবাহ, কার্য্য সম্পন্ন হইবে। আজ মাস দুই হইল, সহসা তিন দিনের জ্বরে সে ছেলে মারা গিয়াছে। এমন সৎচরিত্র সুপাত্র হাত-ছাড়া হইয়া যাওয়ায় প্রথমটা বিনয়বাবু অস্থির হইয়া পড়িলেন। তারপর আর একটী সৎপাত্রের জন্য অনেক অনুসন্ধান করিলেন, কিন্তু তেমন মনের মতন আর পাওয়া গেল না। তখন একদিন—বোধ করি সরস্বতীর ভাগ্য-দোষেই এমন অসম্ভব ও সম্ভব হইল—তিনি মনে মনে গোকুলকেই মনোনীত করিলেন। তারপর একদিন কন্যা লইয়া তিনি স্বয়ং বক্নাহাটীতে আসিয়া ভগিনী মনোরমার সাহায্যে নারায়ণীকে ধরিয়া বসিলেন।
নারায়ণী অস্বীকার করিতে পারিলেন না; আর তাহা করিবার কোন সঙ্গত কারণও খুজিয়া পাইলেন না। এবং সত্য কথা বলিতে হইলে, ইহাও বলিতে হইবে যে, পাইলেও অস্বীকার করিতেন কি না সন্দেহ। কেন না, মেয়ে দেখিয়া তিনি আশ্চর্য্য হইয়া গেলেন—মানুষের মেয়ের এত রূপ হর নাকি? তারপর বংশ ও অবস্থা; তা’ সে আর নূতন করিয়া খবর লইবেন কি? ইহার পর দেনা-পাওনার কথা; অধর মিত্তিরের বংশে ছেলের বিবাহে কেহ কখনও পণ লয়েন নাই, তাই গোকুলের বিবাহেও তাহা গ্রহণ করা হইবে না। তা’ না হৌক্, কিন্তু বিনয়বাবু যে-সকল গহনাদির নাম করিলেন, তা’ সে বড় অল্প টাকার খবর নয়!
এই সকল দেখিয়া শুনিয়া নারায়ণীর মনে হইল, তিনি হয় ত স্বপ্ন দেখিতেছেন—ইহাও কি সম্ভব?—তাঁহাদের নিজেদের অবস্থার কথা না হয় না-ই ধরিলেন, কেন না, কথায় বলে, বিজ্ঞ লোকে ছেলে দেখিয়া গাছ তলায়ও মেয়ে দিয়া থাকেন; কিন্তু তাঁহাদের গোকুলই বা এমন কি, যাহার জন্য তিনি এমন ঝুঁকিয়া পড়িয়াছেন? সুতরাং ইহার পর তিনি যে কেবল রাজি হইলেন তাহা নহে, তাঁহাদের দুই বিধবার ভাগ্য নিতান্ত সুপ্রসন্ন বলিয়াই যে, এমন অসম্ভবও সম্ভব হইল, এ কথাটাও বারংবার উল্লেখ করিতে তুলিলেন না। তবে এই সময় অভাগী সরস্বতীকে মনে পড়ার তাঁহার দুই চক্ষু ছল-ছল্ করিয়া উঠিল। তিনি মনে-মনে বলিলেন—“না’ বলি কেমন ক’রে—গোকুলের যা’ কিছু হ'য়েছে, এঁরাই ত তার গোড়।”
বহুদিন হইতে গোঁদলপুরের জমিদার শ্রীযুক্ত মদন মোহন রায় হালদার আপনার গ্রামের কাছাকাছি একটী ভাল স্কুলের অভাব অনুভব করিয়া আসিতেছিলেন। এতদিন কেন যে তাহা কার্য্যে পরিণত করিতে পারেন নাই তাহা বলা সুকঠিন। আজ প্রায় তিন মাস হইল বক্নাহাটীর পূর্ব্ব-দিকের শেষ সীমায়, পাশাপাশি তিন চারি খানি গ্রামের মাঝামাঝি যে-মাঠটী পড়িয়াছিল তাহারি, উপর বেশ একটী লম্বা-চওড়া পাকা বাড়ী আপনার মাথাঝাড়া দিয়া উঠিবার আশ্বাস দিয়াছে। এই ‘স্কুল-বাড়ী তৈয়ারী হওন্নার সঙ্গে সত্যবাবুর বিশেষ একটু সম্বন্ধ আছে। গাঁজাখোর হইলেও তিনি খুব বিশ্বাসী লোক ছিলেন। সেই জন্য - সুশিক্ষিত জমিদার মদনবাবু ছোট সরকার হইলেও তাঁহাকেই ইট-কাঠের হিসাব রাখার বড় সরকারের পদে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। তিনি প্রতিদিন বেলা দশটার যাইয়া সন্ধ্যার প্রারম্ভে বাড়ী ফিরিতেন।
সেদিনও সন্ধ্যার সময় বাড়ী আসিয়া সংবাদ শুনিয়া তাঁহার মনের অবস্থা ঠিক্ কিরূপ হইয়াছিল জানিনা,—বাহির দিক হইতে তাঁহাকে কিন্তু এতটুকুও বিষণ্ণ হইতে দেখা যায় নাই। তিনি বরং বলিয়াছিলেন—“তার জন্যে আর কান্না কাটি কেন দিদি-তের বছর?—তা হ’লেই বা, আমি একমাসের মধ্যেই ওর চেয়ে ভাল পাত্রের যোগাড় কর্বো—তুই কাঁদিস্নে বোন্—ওতে যে আমি বিরক্ত হই তা’ ত’ জানিস?”
সরস্বতী নিজেও বুঝিয়াছিলেন—মিছামিছি কাঁদিলে আর কি হইবে। কিন্তু তথাপি তাঁহার মন যে থাকিয়া থাকিয়া কাঁদিয়া উঠিতেছিল—কোন উপদেশই সে মানিতে চাহিতেছিল না। মেয়ে যে এত বড় হইয়াছে, গোকুলের আশায় আশায় থাকিয়া জননী যেন এতদিন তাহা দেখিরাও দেখেন নাই; আজ তাহাকে হঠাৎ এতটা বাড়িয়া উঠিতে দেখিয়া তাঁহার মাথায় বজ্রাঘাত হইয়াছে। তিনি কাঁদিতে-কাঁদিতে অগ্রসর হইয়া দুই হাতে দাদার হাত দু’টী চাপিয়া ধরিয়া বলিলেন—“কি করবো যতদিন আর একটী ভাল ছেলের যোগাড় না হচ্ছে ততদিন আমি যে আর—”
সত্যবাবু বাধা দিয়া ক্লান্ত স্বরে বলিলেন—“আচ্ছা ভাই, তুই এখন একটু থাম্।”
লক্ষ্মী সকলি শুনিয়াছিল ও সকলি বুঝিয়াছিল; তাহার মনের অবস্থার কথা আর বলিব না—বলিলেও হয় ত’ ঠিক করিয়া বলা হইবে না। সে মাকে থামাইবার জন্য অনেকক্ষণ হইতে চেষ্টা করিতেছিল, কোনই ফল হয় নাই। মায়ের এই কাটা পাঁঠার মত ছট্-ফটানি দেখিয়া দেখিয়া বড় একটা লজ্জা-সরম ও তাহার তখন ছিল না। মামার কথা শুনিয়া মায়ের উপর রাগ করিয়া বলিল—“হ্যাঁ থাম্বে, থাম্বার জন্যে ওর দার প’ড়েচে;— এবার একবার অসুখে প’ড়লে হয়—আমি কিচ্ছু কর্তে পার্বো না, তা’ ব’লে রাখ্চি—”
সরস্বতী উচ্ছ্বসিত হইয়া কাঁদিয়া উঠিলেন,—“অসুখ কেন না, বল্, এখুনি আমার মরণ হোক্—আমার সকল যন্ত্রণা জুড়িয়ে যাক্—” কণ্ঠস্বর নাষাইয়া আনিয়া কতকটা কথা কহিবার মত বলিলেন—“আর তা না হয় ত তুই যমের বাড়ী যা’মা,—আমি নিশ্চিন্ত হই।”
এই কথায় মেয়ে, জননীর হৃদয়ের ভিতর দিকটা স্পষ্ট দেখিতে পাইয়া কাপড়ে মুখ ঢাকিল।
‘একমাস’ ও গোকুলের অপেক্ষা ভাল পাত্র ত দূরের কথা আজ প্রায় তিন মাস হইতে চলিল, তথাপি বাহা হউক একটা কানা-খোঁড়া পাত্রেরও যোগাড় হইল না। ইতি পূর্ব্বে যাহা দু’একটী ছুটিয়াছিল, তাহাও ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। কাজেই সত্যবাবু ক্রমেই অস্থির হইয়া উঠিতে লাগিলেন। দাবার এইরূপ নিরাশ ভাব ভগিনীর হৃদয়ে যে কি ভাবে প্রবেশ করিতে লাগিল, সে কথা আর না-ই বা বলিলাম।
তারপর একদিন হঠাৎ তিনি এমনি একটা ভীতিকর প্রতিজ্ঞা করিয়া বসিলেন, যাহা শুনিয়া সরস্বতী বোধ করি বা আপনার অদৃষ্ট বিধাতাকে জীবনের শেষ প্রার্থনা জানাইয়া মনে-মনে বলিলেন—“দেখো প্রভু, আজ যেন আর দাদাকে নিরাশ ক’রোনা ঠাকুর। কানা হোক্ খোঁড়া হোক্ আর যেমনই হোক্, কিন্তু পাওয়া যেন যায়—”
বিধবার এই মর্ম্মান্তিক করুণ প্রার্থনা বিধাতা বোধ করি কাণ পাতিয়া শুনিলেন। তিন ঘণ্টার মধ্যেই দাদা ফিরিয়া আসিয়া বলিলেন যে, পাত্র জুটিয়াছে, এবং তাহার সম্বন্ধে মাত্র একটী কথা বাদ দিলে, বোধ করি এমন সুযোগ সব সময় সকলের ভাগ্যে জুটে না। খাওয়া পরার জন্য লক্ষ্মীকে তো একটী দিনের জন্যও ভাবিতে হইবে না—শ্বাশুড়ী ননদের গঞ্জনার সহিত লক্ষ্মীর পরিচয়ও হইবে না, ইত্যাদি আরও বে কত কি হইবে না, সে বিষয় নিশ্চিত করিয়া তিনি যখন জানাইলেন যে, ও পাড়ার শরৎ ঘোষ-ই জামাই হইবেন, তখন এ কি হইল? সরস্বতী যে বলিয়াছিলেন, যাহা হয় একটি জুটাইয়া দাও দেবতা, সে কথা প্রায় বিস্তৃত হইয়া আঁচলে মুখ ঢাকিয়া কাঁদিতে সুরু করিয়া দিলেন। দাদা অস্থির হইয়া বুঝাইয়া বলিতে লাগিলেন, “না দিদি, এতে আর অমত করিনে সরো—যা’ হ’য়েছে ভালই হ’য়েছে; বরং ভেবে দেখ,, এও যদি না জুটতো, তা হ’লে, আর কি তোরা আমার মুখ দেখতে পেতিস্ বোন্? কি কর্বো দিদি, একে মেয়ে বেড়ে উঠেচে, তা’তে আবার পাড়ার পাঁচ ব্যাটা জুটে শত্রুতা কর্চে—বুঝিস্ তো সব। তা’ছাড়া অনেকেই তো এমন দেয়, না আমরাই কেবল আজ নতুন দিচ্চি বোন্?” ইত্যাদি আরো অনেক সান্ত্বনার বাক্য শুনিয়া-শুনিয়া এবং নিজেও সমস্ত বুঝিয়া সরস্বতী চুপ করিলেন। তারপর মুখ তুলিয়া দেখিলেন, দাদার চোখেও দু’ফোঁটা জল টল্ টল্ করিতেছে।