বিষয়বস্তুতে চলুন

লাল সিংহ/অষ্টম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

(পৃ. ৫৮-৬৮)

অষ্টম পরিচ্ছেদ।

চোয়াড় সৈন্য।

 চোয়াড়গণ সাধারণতঃ তীর, ধনুক, তরবারি ও বল্লম লইয়া যুদ্ধ করিত। বন্দুকের ব্যবহার ও তাহাদের নিকট অপরিজ্ঞাত ছিল না। পদস্থ সৈন্যগণ প্রাচীন প্রথায় নির্ম্মিত পলিতাদার বন্দুক লইয়া যুদ্ধ করিতে জানিত। সাধারণ সৈনিকের বন্দুক ক্রয় করিবার সামর্থ্য হইত না। বিষ্ণুপুরের ন্যায় এই সকল স্থানে কামান ব্যবহারের কোন চিহ্ন প্রাপ্ত হওয়া যায় না। কামানের ব্যবহার প্রচলিত থাকিলে রাজা বা সর্দ্দারগণের গড়ে তাহার কিছু না কিছু নিদর্শন প্রাপ্ত হওয়া যাইত, তৎপক্ষে সন্দেহ নাই। বিষ্ণুপুর রাজবংশের গৌরবসূর্য্য বহুকাল অস্তমিত হইয়াছে, কিন্তু অদ্যাপি বিষ্ণুপুরের গড়ে স্থানে স্থানে কামানের ভগ্নাবিশিষ্ট অংশ দেখিতে পাওয়া যায়। চোয়াড়গণ যে কখনও কামান ব্যবহার করিয়াছিল, তাহার কোন প্রমাণ বা নিদর্শন প্রাপ্ত হওয়া যায় না।

 সাধারণ সৈনিকগণ পদব্রজে অসি, তীর ও বল্লম লইয়া যুদ্ধে অবতীর্ণ হইত। তীরধনুক নিম্নশ্রেণীর সৈন্যগণের সর্ব্বপ্রধান অস্ত্র ছিল। ধনুকের দণ্ড বংশনির্ম্মিত এবং তাহার গুণ বাশের ছালে প্রস্তুত হইত। বেত্র, শর বা কঞ্চির অগ্রভাগে লৌহফলাকা সংযুক্ত করিয়া তাহারা তীর প্রস্তুত করিত। চর্ম্মনির্ম্মিত দুইটি তুণে শতাধিক তীর লইয়া ধনুকহস্তে চোয়াড়গণ যুদ্ধযাত্রা করিত। শিক্ষাগুণে চোরাড়েরা অ্যাবধি এক তীরে চারি পাঁচ রসি দূর হইতে ভীষণ ব্যাঘ্র ও বন্য-হস্তী পর্য্যন্ত শীকার করিয়া থাকে। শিক্ষিত ভূমিজ ও সাঁওতাল তিন চারি রসি দূর হইতে তীরের দ্বারা উচ্চস্থানে রক্ষিত সুপারিফল বিদ্ধ করিয়া থাকে। এই তীর ও ধনুক তাহাদের শ্রেষ্ঠ অস্ত্র এবং যুদ্ধের প্রধান উপকরণ ছিল। চোয়াড়গণের অদম্য সাহস, ক্ষিপ্রগতিতে পর্ব্বত আরোহণ ও অধিরোহণে পটুতা তাহাদিগকে দুর্জ্জয় করিয়া তুলিয়াছিল। শিক্ষিত ব্যক্তির হস্তে তীর ধনুক, বন্দুকের তুল্য কার্য্যকারী হইয়া থাকে। বরাহবাজারের বিদ্রোহী রাজকুমার গঙ্গানারায়ণের প্রধান পৃষ্ঠপোষক জিরপা লায়ার তীর-চালনা-নৈপুণ্যের প্রবাদ অদ্যাপি শতমুখে এই সকল স্থানে পরিকীর্ত্তিত হইয়া থাকে। অপেক্ষাকৃত পদস্থ সৈনিকেরা অশ্বপৃষ্ঠে বন্দুক হস্তে সৈন্যদলের অগ্রবর্ত্তী হইতেন।

 সাধারণ সৈনিকগণের বেশভূষা অতি সামান্যরূপ ছিল। স্বল্পপরিসর মোটা ধুতি ও ঐরূপ বস্ত্রের পাগড়ী ব্যতীত তাহাদের অপর কোন পরিচ্ছদ ছিল না। অপেক্ষাকৃত পদস্থ সৈনিকগণ ধুতি ও পাগড়ী ব্যতীত কোর্ত্তা বা হাতকাটা জামা ব্যবহার করিত। কোন কোন যোদ্ধা লৌহনির্ম্মিত-বর্ম্মে দেহরক্ষা করিতেন এ প্রকার প্রবাদ ও শ্রুত হইয়া থাকে। মোটের উপর চোয়াড়গণের অস্ত্র শস্ত্র ও তাহাদের পরিচ্ছদ নিতান্ত মোটামুটি রকমের ছিল।

 ভূমিজদিগকে পূর্ব্বে নিকটবর্ত্তী লোকে ঘৃণাসূচক চোয়াড় আখ্যায় অভিহিত করিত। নিকটবর্ত্তী স্থানসকলের অধিবাসীগণ তাহাদের ভয়ে সর্ব্বদা সশঙ্কিত থাকিত। চোয়াড়গণের আচরিত যুদ্ধ ও লুণ্ঠনাদি কার্য্যে ‘চোয়াড়ি’ সংজ্ঞা প্রাপ্ত হইয়াছিল। ডাল্টন্‌ সাহেব বলেন যে, “অতি সামান্য কারণে অনেক স্থলে এই চোয়াড়গণ যুদ্ধ, নরহত্যা, লুণ্ঠন প্রভৃতি কার্য্যে ব্রতী হইত। চোয়াড়গণ ইংরাজ জাতির শাসনাধীন হইবার পর হইতে বরাবর তাহাদের এই প্রকার প্রকৃতি পরিলক্ষিত হইয়া আসিতেছে। তাহারা সকল সময়ে অন্য মুণ্ডাগণের ন্যায় যে কেবল মাত্র তাহাদের বিরুদ্ধে আচরিত অত্যাচারের প্রতিশোধ লইবার জন্য এবম্প্রকার কার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়া থাকে তাহা নহে। অনেক সময়ে তাহাদের অনুষ্ঠিত যুদ্ধবিগ্রহের ফলে তাহাদের কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ থাকে না। তাহারা কেবলমাত্র দুর্দ্দান্ত দলপতি-কর্ত্তৃক চালিত হইয়া নিরর্থক বিবিধ নীতিবিগর্হিত কার্য্য সম্পাদন দ্বারা প্রতিপত্তি লাভের আশায়, কিম্বা কেবলমাত্র সরকার বাহাদুরের বিরুদ্ধাচরণ করিবার অভিলাষে তাহাদের আচরিত কার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়া থাকে।”[]  সর্দ্দারগণের অধীনে অপেক্ষাকৃত অল্পসংখ্যক নির্দিষ্ট বেতনভোগী সৈন্য থাকিত। তদ্ব্যতীত তিন শ্রেণীর সৈন্য এই সর্দ্দারগণের প্রধান আশ্রয় ছিল। সর্দ্দারের অধীনস্থ প্রকৃতিপুঞ্জ শেষোক্ত তিন শ্রেণীর সৈন্য সরবরাহ করিত। ঐ তিন শ্রেণীর সৈন্যগণের বংশধরগণ বর্ত্তমান সময়ে যথাক্রমে সদিয়াল গ্রাম্যসর্দ্দার ও তাঁবেদার আখ্যায় কথিত হইয়া থাকে। এক্ষণে উক্ত ব্যক্তিগণের জাতীয় প্রভুতা নষ্ট হইয়াছে। বিশেষতঃ সুসভ্য ইংরাজ শাসন দেশে বদ্ধমূল হওয়ায় তাহাদিগকে আর সর্দ্দারের অধীনে যুদ্ধযাত্রা করিতে হয় না। তাহারা নির্দিষ্ট পঞ্চককর আদায় দিয়া এবং আবশ্যক অনুসারে সরকার বাহাদুরের অধীনে পুলিশের চাকরী করিয়া আপনাদের পূর্ব্বপুরুষার্জিত ভূমিসম্পত্তি ভোগ করিয়া থাকে। মহামান্য রিজ্লি সাহেব সর্দ্দারগণকে লক্ষ্য করিয়া বলিয়াছেন যে,—

 The latter (Sirdirs) I think, are merely overgrown mankis who have lost their tribal status and with it their hold over their subordinates.

 অর্থাৎ “সর্দ্দারগণ লোহারডাগা অঞ্চলের মানকি উপাধিধারী প্রভুতাশালী ভূস্বামীগণের ন্যায় পদস্থ ব্যক্তি। বর্ত্তমান সময়ে তাহারা আপনাদের জাতীয় প্রভুতা চ্যুত হইয়া তাহাদের অধীনস্থ ব্যক্তিগণের উপর কত্তৃত্ব হারাইয়াছে।”

 আমরা যে সময়ের কথা লিপিবদ্ধ করিতেছি, তৎকালে সর্দ্দারগণের জাতীয় গৌরব ও প্রভুতা অক্ষুণ্ণ ছিল; এবং সদিয়ালগণ আপনাদের অধীনস্থ গ্রাম্যসর্দ্দার ও তাঁবেদারগণকে লইয়া সর্দ্দারের অধীনে যুদ্ধ করিত। প্রত্যেক সদিয়ালের অধীনে নির্দ্দিষ্ট দ্বাদশ কি পঞ্চদশ গ্রাম ছিল; এবং প্রত্যেক গ্রামে এক একজ গ্রাম্যসর্দ্দার ছিল। পরন্তু প্রত্যেক গ্রাম্যসর্দ্দারের অধীনে নির্দিষ্টসংখ্যক তাঁবেদার বা সর্ব্বনিম্নশ্রেণীর সৈনিক ছিল। এই সকল সৈন্যগণ প্রভুতা স্বীকারের নিদর্শনস্বরূপ উপরস্থ ব্যক্তিকে সামান্য নির্দিষ্ট পঞ্চককর আদায় দিত। পরন্তু যুদ্ধবিগ্রহ ঘটিলে, তাহারাই সর্দ্দারের প্রধান পৃষ্ঠপোষকরূপে যুদ্ধ করিত।

 সদিয়ালগণ পদমর্য্যাদা ও বিক্রমে সর্দ্দারের অধীনস্থ হইলেও, সর্দ্দারকে অনেক সময়ে সদিয়ালগণের মুখাপেক্ষা করিতে হইত। সদিয়ালগণ সদ্দারের দরবারে বিশেষ সম্মানপ্রাপ্তির দাবি রাখিত; এবং অনেক বিষয়ে সর্দ্দারকে সদিয়ালগণের পরামর্শ লইয়া কার্য্য করিতে হইত। সদিয়ালগণ সময়ে সময়ে সর্দ্দারের বিরুদ্ধেও অভিযান করিত। রিজ্‌লী সাহেব তাঁহার কৃত ঘাটোয়ালিরিপোর্টের একস্থানে লিখিয়াছেন যে−

 “One of these men (the Sadial of Katjore) seems to have been practically independent in 1800. Their position is a very strong one as against the Taraf Sarders.”

 এবম্প্রকার সৈন্যবিভাগের সহিত ভূমিজদিগের আচরিত মুণ্ডারি উপনিবেশ প্রথার বিশেষ সম্বন্ধ আছে। এই প্রকার সৈন্য বা প্রজাবিভাগ মুণ্ডা জাতীয় ঔপনিবেশিকগণের বিশেষ প্রথা। তরফ সর্দ্দারের অধীনস্থ সদিয়াল বা ক্ষুদ্র সর্দ্দারগণ প্রকৃতপক্ষে তাঁহাদের অধীনস্থ প্রজা নহে। তাহাদেরই সাহায্যে এবং তাহাদেরই পৃষ্ঠপোষকতায় তরফসর্দ্দারগণ আপনাদের অধিকারও প্রভূত্ব সংস্থাপনে সমর্থ হইয়াছিলেন। তাহাদের অধিকৃত ভূমির উপর তরফ সর্দ্দারের যে প্রকার অধিকার; তাহাদেরও সেই প্রকার জাতীয় অধিকার আছে। মুণ্ডা জাতীয় ব্যক্তিগণের চিরন্তন প্রথা অনুসারে—ভূমিজ জাতীয় সদিয়াল বা গ্রাম্যসদ্দারগণও স্বাধিকারের মধ্যে প্রভু। তাহাদের অবস্থা পর্য্যালোচনা করিয়া মহামান্য রিজলী সাহেব যে মন্তব্য লিপিবদ্ধ করিয়াছিলেন, তাহার এক অংশে আছে,−

 “The Village-Sarder answers to this Munda, the Tabedars to the privileged Bhuinbari rayats. The Sadial at the group of 12 or 15 villages clearly corresponds to the MANKI of the Mundari parcha. As for the Sarder-Ghatwals of the larger tarafs it seems to me the most likely that they were originally Mankis of the cut-lying parchas, and in course of time fresh villages being created, new parchagroups were added under new Mankis (Sadials) who are now only nominally subordinate to the land-Manki (Sarder-Ghatwais) of the taraf, At any rate there can be no question that in Panch-Sardari and Satrakhani tarafs, Sadials occupy well-defined Ghats of 12 or 15 villages and pay to the Taraf Sarder nothing but a fixed rent.”

 অর্থাৎ “গ্রাম্য সর্দ্দার মুণ্ডারিপ্রথাসম্মত প্রধান ব্যক্তি; এবং তাঁবেদারগণ সাধারণ জমীপ্রস্তুতকারী প্রজা। দ্বাদশ বা পঞ্চদশ গ্রামের উপরে যে এক একজন সদিয়াল আখ্যাধারী ব্যক্তি আছেন, তিনি মুণ্ডাদেশীয় মান্‌কি। তরফসর্দ্দারগণ ও ক্ষুদ্র মানকিগণের উপরিস্থিত প্রধান মান্‌কি। সময়ক্রমে যত নূতন গ্রামের সৃষ্টি হইতে লাগিল, ততই সদিয়াল ও গ্রাম্য সর্দ্দারের সংখ্যা বৃদ্ধি হইতে লাগিল। ঐ সকল সদিয়ালগণ বর্ত্তমান সময়ে কেবলমাত্র নামে তরফ সর্দ্দারের অধীনস্থ। পঞ্চসর্দ্দারি ও সতেরখানি তরফে লদিয়ালগণ নির্দিষ্ট দ্বাদশ কি পঞ্চদশ সংখ্যক গ্রাম অধিকার করিয়া থাকে।”

 এই মন্তব্য দৃষ্টে ছোটনাগপুর বিভাগের তৎকালীন কমিশনার মিঃ হিউএট লিখিয়াছেন,−

 “The ancestors of the subordinate division (Sadials & village Sarders) were probably younger brothers or descendants of the younger brothers of the original tribal leaders, while the Sarder-Ghatwals and Tabedars represented the Manki and Munda families. * * * Their holdings were their ancestral property dating from the time when the tribe to which they belonged took possession of the territory.”

 অর্থাৎ “সদিয়াল ও গ্রাম্যসর্দ্দারগণের পূর্ব্বপুরুষ তরফ সর্দ্দারের কনিষ্ঠ ভ্রাতা কিম্বা ঐ সকল ভ্রাতার বংশধর। তরফ সর্দ্দার মুণ্ডারি ঔপনিবেশিক-প্রথা-সম্মত মান্‌কি এবং তাঁবেদারগণ সাধারণ মুণ্ডা পরিবার। এই সকল ব্যক্তিগণের পূর্ব্বপুরুষগণ যে সময়ে এই সকল স্থান অধিকার করিয়াছিল, তাহাদের অধিকৃত ভুমি সকল সেই সময় হইতে বিমান আছে।”

 বিভিন্ন শ্রেণীর ভূমিজ ঔপনিবেশিকগণের জাতীয় অধিকারের বিষয় বিবেচনা করিয়া মিঃ ডাল্টন লিখিয়াছেন,—

 “The headmen had no superior rights in the land cultivated by other villagers; they were not landlords but chiefs; and, they and the people acknowledging them, held the soil they cultivated in virtue of their being the heirs of those who first utilised it, and when it became necessary to distinguish such men from cultivators of inferior title, the former were called Bhuinhars, breakers of the soil. Dalton, p 168.

 অর্থাৎ “তরফ সর্দ্দার প্রভৃতি ভূমিজদিগের জাতীয় প্রভুগণ ভূমিজ কৃষকগণের অধিকৃত ভূমির উপর কোন প্রাধান্যের দাবি করিতে পারে না। তরফ সর্দ্দারগণ ভূমিজ কৃষকগণের অধিকৃত স্থানের প্রভু নহে। তাহারা ভূমিজজাতির রাজা। রাজা এবং তদধীন কৃষকগণ নিজ নিজ অধিকৃত ভূমি, তাহাদের পূর্ব্বপুরুষগণ সর্ব্বপ্রথমে প্রস্তুত করিয়াছিল, এই অধিকারে ভোগ করিয়া থাকে। যখন এই শ্রেণীর কৃষক ও অপর সাধারণ কৃষকগণের মধ্যে নির্দ্দেশের প্রয়োজন হইল, তখন প্রথম শ্রেণীর কৃষকগণ ভূমিহার (ভূঁইয়া) অর্থাৎ ‘কৃষিযোগ্য স্থান প্রস্তুতকারী’ আখ্যা প্রাপ্ত হইল।”

 এই মুণ্ডা জাতির বিবরণ এবং তাহাদের রাজ্যশাসন প্রণালী ও তৎসংক্রান্ত নিয়মাবলী পর্যালোচনা করিলে, অনেক বিস্ময়কর প্রথা লোকলোচনের পথবর্ত্তী হইয়া থাকে। আমরা পূর্ব্বে বলিয়াছি যে ক্ষুদ্র ভূস্বামীগণ তরফ সর্দ্দারকে সামান্য নির্দ্দিষ্ট পঞ্চককর আদায় দিয়া থাকে। হিউয়েট সাহেব প্রমুখ মুণ্ডারিপ্রথাভিজ্ঞ ব্যক্তিগণের মতে তাহা প্রকৃতপক্ষে কর নহে। তরফ সর্দ্দার প্রকৃতপক্ষে আদিম উপনিবেশ স্থাপনকালে রাজা ছিলেন। তাঁহার রাজ্যশাসন সংক্রান্ত আবশ্যকীয় ব্যয়ভার বহন করা প্রকৃতিপুঞ্জ কর্ত্তব্য বলিয়া বিবেচনা করিত। এবং সেই ব্যয়ভার নির্ব্বাহ জন্য এই কর প্রদত্ত হইত। ইহা প্রকৃতপক্ষে ভূমির কর নহে। পরন্তু যদি কখন রাজ্যশাসনজন্য অধিক অর্থের প্রয়োজন হইত, তাহা হইলে তরফসর্দ্দার অধীনস্থ সদিয়াল, গ্রাম্যসর্দ্দার ও তাঁবেদারগণকে দরবারে আহ্বান করিতেন। সেই দরবারে সাধারণের মতামত লইয়া যে প্রকার অবধারিত হইত, প্রত্যেককে তদনুসারে কার্য্যানুবর্ত্তী হইতে হইত। হিডয়েট সাহেব তাঁহার রিপোর্টের একস্থানে লিখিয়াছেন,—

 “When the income received by the Taraf-Sarder from the tenure-holders and from his own lands was considered according to Mundari ideas, and if the total contribution given by the Mankis did not suffice for State-expenses, he would have called upon them to pay more, and they would have applied to their Mundas, the whole business being settled by public decision.”

 অর্থাৎ “তরফসর্দ্দার অধীনস্থ ব্যক্তিগণের নিকট যে কর পাইতেন তাহা এবং তাঁহার নিজের দখলী জায়গার আয় বিবেচনা করিয়া, যদি তাঁহার অধিক অর্থের প্রয়োজন হইত, তাহা হইলে তিনি মান্‌কিদিগকে এবং মান্‌কিগণ মুণ্ডাদিগকে অধিক কর দিবার জন্য জানাইতেন। এবং এই সকল যাবতীয় কার্য সাধারণের বিচার দ্বারা সমাহিত হইত।”

 সম্ভবতঃ সর্দ্দারগণ যুদ্ধে যে সকল সম্পত্তি লুণ্ঠন করিতেন, তাহাও উপরোক্ত নিয়মে জাতীয় ব্যক্তিগণের মধ্যে বিভক্ত হইত। মুক্তাগণের এই প্রকার জাতীয় প্রথা তাহাদিগকে অজেয় করিয়া তুলিয়াছিল। তরফের প্রত্যেক অধিবাসী বিশেষভাবে অবগত ছিল, যে সে রাজ্যের একটি আবশ্যকীয় অংশ। রাজ্যের উন্নতি অবনতিতে তাহাদের ব্যক্তিগত লাভ-লোকসান ছিল। বীরত্বাভিমান তাহাদের প্রকৃতির একাংশ ছিল। রাজ্যের গৌরবে তাহারা আপনাদিগকে গৌরবান্বিত মনে করিত। চোয়াড়গণের বীরত্বাভিমান ও তাহাদের আত্মগৌরব রাজ্যসংক্রান্ত যাবতীয় কার্য্য নির্ব্বাহ জন্য তাহাদিগকে স্বেচ্ছায় প্রাণোদিত করিত। সতেরখানির সর্দ্দারগণ সকলেই বলশালী ও বীর প্রকৃতি; এবং তাঁহারা বিবিধ যুদ্ধে সতেরখানির মুখ উজ্জ্বল করিয়াছিলেন। সুতরাং প্রকৃতিপুঞ্জ ও সন্তোষসহকারে সর্দ্দারের অধীনে যুদ্ধযাত্রা করিত। লালসিংহের ন্যায় বীরপ্রকৃতি ও প্রতিভাশালী সদ্দারের গৌরবে মুণ্ডাবংশীয় প্রকৃতিপুঞ্জ আপনাদিগকে গৌরবান্বিত মনে করিত, সুতরাং তাহারা যথাসাধ্য সর্দ্দারের পৃষ্ঠপোষকস্বরূপে কার্য্য করিত। এই শ্রেণীর সৈন্যগণ বেতনভোগী সৈন্য অপেক্ষা বহুগুণে অধিকতর কার্য্যকারী হইয়া থাকে। আত্মগৌরব ও মর্য্যাদা যে প্রকার মনুষ্যের কার্য্যকারী-শক্তি প্রবুদ্ধ করে, অন্য কিছুতেই সেরূপ পারে না। সেইজন্য আমরা পরিচ্ছেদের প্রথমাংশে বলিয়াছি যে এই শ্রেণীর সৈন্যগণ সর্দ্দারের প্রধান আশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষক ছিল।

 অনার্য্য, বর্ণজ্ঞানহীন মুণ্ডাগণ যে প্রথা ও প্রণালীর অনুসরণ করিয়া প্রতিষ্ঠালাভে সমর্থ হইয়াছিল, তাহা সুসভ্য জাতিগণের ও অনুকরণীয়। তাহাদের কর্ত্তব্যবুদ্ধি ও আত্মসন্মান তাহাদিগকে ক্ষুদ্র স্বার্থপরতা হইতে রক্ষা করিত। এবং এই আত্মসম্মান ও গৌরব তাহাদিগকে দুর্দ্ধর্ষ ও অজেয় করিয়াছিল। এই চোয়াড়গণকে সংযত রাখিয়া তাহাদের সাহায্যে রাজ্যবিস্তার ও প্রতিষ্ঠা অর্জ্জন করা লালসিংহের জীবনের অন্যতম গৌরব, তৎপক্ষে সন্দেহ নাই।


  1. Bhumij of the Jungle Mohals were under the nickname of ‘Choar’, the terror of the surrounding districts, and their various outbreaks were called! ‘Chuaris’. On several occasions since they came under the British rule they have shown how readily a Chuari may be improvised on very slight provocation. I do not know that on any occasion they rose like the Mundaris simply to redress their own wrongs. It was sometimes in support of a turbulent chief ambitious of obtaining power to which according to the Courts of law he was not entitled, and it was sometimes to oppose the Government in a policy that they did not approve, though they may have had very little personal interest in the matter. Dalton, p 174.