লাল সিংহ/একাদশ পরিচ্ছেদ
একাদশ পরিচ্ছেদ।
সুখনিদি।
লালসিংহ বারম্বার বরাহভূম আক্রমণ করিয়া অধিবাসীগণকে নিরতিশয় বিব্রত ও সন্ত্রস্ত করিয়া তুলিলেন। লালসিংহের অত্যাচারে রাজ্য ছারখার হইতে লাগিল। লালসিংহ বারম্বার বরাহ-রাজ্য আক্রমণ করিয়া প্রজাগণের যথাসর্ব্বস্ব লুণ্ঠন করিতে লাগিলেন। ক্রমশঃ প্রজাগণ রাজার প্রতি শ্রদ্ধা হারাইয়া লালসিংহের শরণাপন্ন হইল। পরিশেষে প্রজাগণের সহিত এই প্রকার মীমাংসা হইল যে, প্রত্যেক গ্রান হইতে প্রজারা নির্দিষ্ট দিনে নির্দ্দিষ্ট পরিমাণ কর লালসিংহকে আদায় দিবেন; এবং রীতিমতরূপে ঐ কর আদায় পাইলে লালসিংহ আর তাহাদিগকে কোনরূপে নির্যাতিত করিবেন না।
এই প্রকারে রাজার অধিকৃত ও পরগণাস্থিত প্রত্যেক গ্রাম হইতে লালসিংহ কর পাইতে থাকিলেন। যে গ্রামের প্রজাগণ নির্দ্দিষ্ট দিনে এই কর প্রদান করিত, লালসিংহ তাহাদিগের উপরে আর কোন প্রকার উৎপীড়ন করিতেন না; বরং বহির্শত্রুর আক্রমণ হইতে নিজের বাহুবলে সেই সকল প্রজাগণকে রক্ষা করিতেন। লালসিংহের আশ্রিত লোকের উপর অত্যাচার করিতে সাহসী হয়, এ প্রকার কোন লোক তৎকালে এতদ্দেশে ছিল না; সুতরাং প্রজাগণও লালসিংহের আশ্রয়ক্রয়ের জন্য এবম্বিধ কর আদায় দিয়া সুখী হইয়াছিল
যদি কোন গ্রামের প্রজাগণ নির্দ্দিষ্ট দিনে লালসিংহকে এই কর আদায় না দিত, তবে তাহাদের আর কোনরূপে রক্ষা ছিল না। লালসিংহ সবলে গ্রাম আক্রমণ করিয়া গ্রামবাসীদিগের যথাসর্ব্বস্ব লুণ্ঠন করিতেন। এই ভয়ে ঐ কর আদায়ে কখন কোন গোলযোগ ঘটে নাই।
আমরা পূর্ব্বে বলিয়াছি যে এতদ্দেশে ইংরাজশক্তি বদ্ধমূল হইবার পূর্ব্বে রাজারাই প্রজাগণের শাসন ও পালনের একেশ্বর প্রভু ছিলেন। রাজ্যে নানাপ্রকার গোলযোগ ঘটায় তৎকালে রাজা প্রজাগণকে রক্ষা করিতে সমর্থ হয়েন নাই। এদিকে আবার ইংরাজ-শক্তি তখনও:দেশের যাবতীয় অশাস্তি বিদূরিত করিয়া আত্মপ্রতিষ্ঠা স্থাপিত করিবার অবসর পায় নাই! এই অবস্থায় প্রজাগণ নিতান্ত অসহায় হইয়া অবশেষে ভুঞার প্রাধান্য স্বীকার করিতে বাধ্য হইয়াছিল। লালসিংহও তাহাদিগকে যথোচিত আশ্রয় দিয়াছিলেন।
ইতিহাসে এপ্রকার করস্থাপনের অনেক দৃষ্টান্ত আছে, কিন্তু ইংরাজ-শাসনের প্রারম্ভে ইংরাজশক্তিকে প্রতিরুদ্ধ করিয়া এবম্প্রকার কর স্থাপনের দৃষ্টান্ত নিতান্ত সুলভ নহে। এই কর ‘সুখনিদি’ নামে অভিহিত হইত। ইহা প্রজাগণের সুখে নিদ্রা যাইবার কর বলিয়া ‘সুখনিদি’ আখ্যা প্রাপ্ত হইয়াছিল। বরাহ-রাজের প্রতি এবম্প্রকার কঠোরতা দ্বারা লালসিংহ আপনার পিতৃহত্যার প্রতিশোধ লইয়াছিলেন। বরাহ-রাজ সর্দ্দারগণকে আপনাদের অধীন বলিয়া মনে করিতেন। সুতরাং জনৈক সর্দ্দার কর্ত্তৃক তাঁহার রাজ্যে এবম্প্রকার অত্যাচারের অনুষ্ঠান, বিশেষতঃ নির্দিষ্ট করস্থাপন, রাজার পক্ষে বিশেষ অপমানজনক হইয়াছিল। এই কর সম্বন্ধে মিঃ ষ্ট্রাচি লিখিয়াছেন:-
“Every year he (Lalsing) levies a small contribution from every village in the Zemindary. In case of refusal or the least delay in the payment of Sooknidy, so the contribution is called, the village is infallibly plundered.”
অর্থাৎ “প্রত্যেক বৎসর লালসিংহ জমিদারীর অন্তর্গত প্রত্যেক গ্রামের উপর একটি কর স্থাপিত করিয়া থাকেন। ঐ করের নাম ‘সুখনিদি’। সুখনিদি দিতে অস্বীকার কি বিলম্ব করিলে গ্রাম লালসিংহ কর্ত্তৃক নিশ্চয়ই লুণ্ঠিত হইত।”
এই কর সাক্ষাৎ সম্বন্ধে প্রজাগণের নিকট হইতে আদায় হইত। রাজার সহিত এই কর আদায় সম্বন্ধে লালসিংহের কোনপ্রকার সম্বন্ধ ছিল না। মারাঠাগণ যে প্রকারে বঙ্গাধিপের নিকট হইতে চৌথ বা রাজস্বের এক চতুর্থাংশ আদায় লইত, এই কর তাহার অনুরূপ নহে। এই কর প্রজাগণের দেয়, তাহাদের সুখে নিদ্রা যাইবার কর। এই কর আদায় দ্বারা প্রজাগণ রাজার নিকট আপনাদের দেয় রাজস্ব কর আদায় সম্বন্ধে কোন প্রতিকার পাইত না। লালসিংহের এই প্রকার বন্দোবস্তে আমরা লালসিংহের কূটনীতির অভাস পাইয়া থাকি। রাজার নিকট হইতে লালসিংহ কোন কর আদায় করিলে তদ্বারা প্রজাসাধারণের নিকট লালসিংহের কোন প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পাইত না। এবং তাহাতে হয়ত লালসিংহ বিশেষ আত্মপ্রাসাদ উপভোগ করিবার অবসর পাইতেন না। রাজা নিজে কোন কর প্রদান করিলে প্রজারা অনেকেই তাহার কোন সংবাদ রাখিত না। সুতরাং প্রজাগণের নিকট রাজার মস্তকাবনতি ঘটিত না। প্রজাগণের নিকট এই কর আদার হইতে থাকায় প্রজাগণ রাজার অসারতা ও অক্ষমতা বিশেষরূপে হৃদয়ঙ্গম করিল। পরন্তু তাহাদের নিকট লালসিংহের মর্য্যাদা ও প্রতিপত্তি সবিশেষ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইল।
এদিকে আবার লানসিংহ রাজার অধীনস্থ একজন সর্দ্দার। লালসিংহের অধিকৃত সতেরখানি তরফ তৎকালে মহাল ভূমিজান আখ্যায় অভিহিত হইত। বাঙ্লা ১২০৬ সালে রাজার পক্ষীয় জনৈক কর্ম্মচারী মেদিনীপুর কালেক্টরী আদালতে জমা ওয়াশীল বাকী নামক বরাহভূম পরগণার প্রজাগণের নিকট প্রাপ্য ফরের এক তালিকা দাখিল করিয়াছিলেন। ঐ তালিকায় লালসিংহ ভুঞার অধিকৃত স্থান ‘মহাল ভূমিজান’ আখ্যায় অভিহিত হইয়াছে। মিঃ ষ্ট্রাচি তাঁহার রিপোর্টে রাজার সহিত সর্দ্দারগণের সম্বন্ধে নির্ণয়কল্পে লিখিয়াছেন,-
“The Sarder Pikes and their followers have borne the appellation of Choars. The Sarders may be considered as the Talookdars of Burrabhum, and they have commonly acknowledged the Zemindar as their chief. Their ancestors have for many generations possessed the lauds at present occupied by them.”
অর্থাৎ “সর্দ্দারগণ ও তাহাদের অনুচয়েরা সাধারণতঃ চোয়াড় নামে খ্যাত। সর্দ্দারগণকে বরাহভূমের তালুকদার বলা যাইতে পারে। তাহারা বরাহবাজারের জমীদারকে আপনাদের রাজা বা প্রধান বলিয়া স্বীকার করে। তাহাদের পূর্ব্বাধিকারীগণ পুরুষানুক্রমে তাহাদের অধিকৃত ভূমি দখল করিয়া আসিতেছে।”
মুণ্ডাজাতির জাতীয় প্রথানুসারে বরাহভূমের জমিদারকে সতেরখানির পূর্ব্ববর্ত্তী সর্দ্দারগণ সন্মান প্রদর্শন করিয়া আসিতেছিলেন। বরাহভূমের জমীদারের সহিত এবম্প্রকার বিরোধ স্বত্বেও লালসিংহ রাজাকে নির্দ্দিষ্ট কর আদায় দিতে কখন ত্রুটি করেন নাই। ষ্ট্রাচি সাহেব রিপোর্টের একস্থানে লিখিয়াছেন,-
Lalsing and his ancestors have long possessed lands, in the Zemindary and have with punctuality paid the revenue of 240 Rupees yearly to the Zemindar."
অর্থাৎ “লালসিংহ ও তাঁহার পূর্ব্বপুরুষগণ দীর্ঘকাল ধরিয়া জমিদারীর মধ্যে ভূমি অধিকার করিয়া আসিতেছে। এবং তাহারা যথা নিয়মে নির্দ্দিষ্টকর বার্ষিক ২৪০ টাকা হিসাবে জমীদারকে আদায় দিয়া থাকে।”
পূর্ব্বাচরিত পন্থার অনুষ্ঠান রাজ নীতির নিগূঢ় তথ্য। লাল সিংহ এই তথ্যে সর্ব্বদা অবহিত ছিলেন। তিনি যদি প্রত্যক্ষভাবে রাজার উপর করস্থাপন করিতেন, কিম্বা বরাহবাজার সরকারে নির্দ্দিষ্ট রাজস্ব আদায় দেওয়া বন্ধ করিতেন, তাহা হইলে তাঁহাকে পূর্ব্বপুরুষাচরিত পন্থী হইতে চ্যুত হইতে হইত। প্রাচীনকাল হইতে যে নিয়মে তাঁহার জমীদারী অধিকৃত হইয়া আসিতেছিল, অকস্মাৎ তাহার আমূল পরিবর্ত্তন সংঘটিত হইত। এবম্প্রকার পরিবর্ত্তনের ফল তাঁহার বা তদীয় বংশধরগণের উপর শুভকর হইত বলিয়া মনে হয় না। আবার হয়ত তাঁহার দৃষ্টান্তে তাঁহার অধীনস্থ সদিয়ালগণ তাঁহার অধীনতাপাশ ছিন্ন করিয়া স্বাধীন হইবার চেষ্টা করিত। এবং সেরূপ হইলে তাঁহার উন্নতির পথ বন্ধ হইয়া, তাঁহাকে জমীদারীর আভ্যন্তরীণ ব্যাপার লইয়া ব্যস্ত হইয়া পড়িতে হইত। সুতরাং সম্মুখে বাহিরের ঠাট রজায় রাখিয়া লালসিংহ বিশেষ বুদ্ধিমত্তা এবং কূটনীতি-কুশলতার পরিচয় দিয়াছিলেন। পলাশী-বিজয়ী বৃটিশ্ বীরগণ যে যুদ্ধান্তে দিল্লীর বিগতপ্রতাপ বাদসাহের নিকট হইতে বঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানীসনন্দ লাভের জন্য ব্যগ্রতা প্রকাশ করিয়াছিলেন, তাহারও কারণ কতকটা এইরূপ। এই প্রকার নীতিকুশলতা রাজনৈতিক উন্নতির মূলসূত্র। লালসিংহ সেই মন্ত্রে বিশেষ অভিজ্ঞ ছিলেন।
অপর দিক্ হইতে দৃষ্টি করিলেও এই ব্যাপারে আমরা লালসিংহের ভূয়সী প্রশংসা না করিয়া থাকিতে পারি না। আমরা যে সময়ের বৃত্তান্ত বর্ণিত করিতেছি, সে সময়ে বঙ্গের মুসলমান-শক্তি নির্ব্বাপিত হইয়া ইংরাজ-শক্তি ক্রমশঃ প্রাধান্য লাভ করিতেছিল। দুদিন অগ্রপশ্চাৎ সকলকেই ইংরাজ-শক্তির নিকট মস্তকাবনত করিতে হইয়াছে। এই সময়ে জঙ্গলমহলের অন্যতম প্রধান রাজ্য বিষ্ণুপুরের রাজা রাজস্ব কর আদায় না করায়, তাঁহার বিশাল জমীদারী বিক্রীত হইয়া যায়। বিষ্ণুপুরের জমীদার যদিও বাহুবলে কিছুদিন ক্রেতাকে বেদখল রাখিয়াছিলেন, তথাপি শেষ পর্য্যন্ত তাঁহাকে সর্ব্বস্বান্ত হইতে হইয়াছে। যদি এই সময়ে লালসিংহ পূর্ব্বাচরিত পন্থার পরিবর্ত্তন করিতে প্রয়াসী হইতেন, তাহা হইলে হয়ত চিরকালের জন্য তাঁহার বিশাল জমীদারী পরহস্তগত হইত। সেই জন্য লালসিংহের এবম্প্রকার অনুষ্ঠানের জন্য আমরা তাহার ভূয়সী প্রশংসা করিতে বাধ্য।