লাল সিংহ/চতুর্থ পরিচ্ছেদ
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
পঞ্চখুঁট।
গত পরিচ্ছেদে ভূমিজ গণের প্রাচীন উপনিবেশ পদ্ধতির কথঞ্চিৎ পরিচয় প্রদত্ত হইয়াছে। অপেক্ষাকৃত পরবর্ত্তী সময়ে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত ভূমিজ পরিবারগণ বহির্শত্রুর হস্ত হইতে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে আপনাদের ভিতর জনৈক বলশালী বীরকে নেতা নির্বাচিত করিত। এবম্প্রকারে নির্ব্বাচিত নেতা বা দলপতিকে ভূমিজগণ নেতৃত্বের নিদর্শন স্বরূপ যৎসামান্য কর প্রদান করিত। আবশ্যক অনুসারে প্রত্যেক পরিবারের সবলকায় বক্তিগণ স্ব স্ব নেতার অধীনে সমবেত হইয়া যুদ্ধ করিত। প্রকৃতপক্ষে এই দলপতি ভূমিজগণের ভূম্যধিকারী ছিলেন না। কালক্রমে ঐ সকল দলপতি মান্কি বা তরফসর্দ্দার আখ্যায় ক্রমশঃ ভূমিজগণের ভূম্যধিকারীতে পরিণত হইয়াছে।
সময়ে সময়ে এক দলপতির নেতৃত্বে বহুসংখ্যক মুণ্ডা পরিবার একযোগে দেশত্যাগ করিয়া নূতন দেশে উপনিবেশ স্থাপন করিত। নূতন স্থানে বাস করিবার সময়ে এক একটি পরিবার পৃথকভাবে নির্জ্জন স্থানে বাস করিত। এই প্রকার বিক্ষিপ্তভাবে বাস করা ভূমিজগণের একটি বিশেষ প্রথা। যথাসম্ভব স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রাখিবার প্রয়াসে তাহারা এবম্বিধ আচরণ করিত। এই নবাগত স্থানেও ভূমিজগণ দলপতির প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনে ত্রুটি করিত ন॥ এই প্রথার অনুসরণ করিয়া ভূমিজগণ জঙ্গলমহল, মধ্যভারতবর্ষ ও উড়িষ্যা প্রদেশে অসংখ্য উপনিবেশ স্থাপন করিয়াছে।
‘খুঁট’ শব্দের প্রকৃত অর্থ ‘স্তম্ভ’। উক্ত প্রকারে নব-রাজ্যের স্থাপয়িতা: তদীয় রাজ্যের ‘খুঁট’ বা স্তম্ভস্বরূপ ছিলেন। সতেরখানি প্রভৃতি তরফের সর্দ্দারগণ তাঁহাদের অধীনস্থ ঔপনিবেশিকগণের নেতা ছিলেন। তাঁহাদিগকে লক্ষ্য করিয়া কর্ণেল ডাল্টন্ লিখিয়াছেন,—
“The principal of these are the representatives of the most influential of patriarchs. They originally formed the colony, and each is literally a pillar of the little state called Khunt.
Ethnology, p 191.
রিজলি সাহেবের মতে অপেক্ষাকৃত সভ্যতার আলোক প্রাপ্ত হইয়া আদিম অবস্থার অনেক পরে ভূমিজগণ পাঁচ প্রধান খুঁট বা শাখায় বিভক্ত হইয়া বরাহভূমে উপনিবেশ স্থাপন করিয়াছিল। সাহেবের মতে বরাহভূমের চারিজন তরফসর্দ্দার ও রাজা এই পাঁচজন, সেই আদিম পঞ্চখুঁটের প্রতিনিধি। বরাহভূমের ও জঙ্গলমহলের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার, রীতি নীতি,ভাষা ও আচার ব্যবহার—বিশেষতঃ প্রজা-ভূম্যধিকারী সংক্রান্ত নিয়মাবলী সম্বন্ধে মহামান্য রিজলি সাহেবের ন্যায় অভিজ্ঞ ব্যক্তি নিতান্ত দুর্লভ। রিজলি সাহেবের এই প্রকার মন্তব্য ভ্রান্তিমূলক বলিয়া মনে করিবার কোন উপযুক্ত কারণ পরিদৃষ্ট হয় না।
সর্দ্দারগণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সমবেত হইয়া ঔপনিবেশিকগণের প্রধান শাখা বা খুঁটের প্রতিনিধিকে রাজপদে বরণ করিয়াছিল। তদনুসারে বরাহভূমের রাজত্ব সৃষ্ট হয়। সর্দ্দারগণ প্রভুত্ব স্বীকারের নিদর্শন স্বরূপ রাজাকে যৎসামান্য কর প্রদান করিতেন। পরন্তু, প্রয়োজনানুসারে তাঁহাদিগকে রাজার নেতৃত্বে যুদ্ধে অভিযান করিতে হইত। নিজ নিজ তরফের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে সর্দারগণ সর্ব্বতোভাবে প্রভু ছিলেন। রাজা সর্দ্দারগণের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করিলে তাঁহারা রাজার বিরুদ্ধেও যুদ্ধঘোষণা করিতে কুণ্ঠিত হইতেন না। ক্রমশঃ রাজ। হিন্দুধর্ম্ম অবলম্বন করিয়া ক্ষত্রিয় বলিয়া আত্মপরিচয় দিতে আরম্ভ করিলেন। সম্ভবতঃ সেই সময় হইতে রাজপরিবারের উৎপত্তি সম্বন্ধে বিবিধ অলৌকিক কাহিনী রচিত হইতে আরম্ভ হইল।
কালক্রমে ভূমিজগণের আর যুদ্ধ করিবার প্রয়োজন হয় না। এক্ষণে তাহারা ঘাটোয়াল উপাধি প্রাপ্ত হইয়। দেশের শান্তি-সংরক্ষণে নিযুক্ত আছে। তরফসর্দ্দারগণও জাতীয় প্রভুতা হারাইয়া দেশের শান্তিরক্ষণে ব্রতী হইয়াছে। এই প্রাচীন সর্দ্দার-পরিবারগণের সম্বন্ধে স্যর উইলিয়ম হাণ্টার বলেন,"In the fiscal division of Barabhum, four tennres containing about 20 villages a piece, are held by Sarder Ghatwals or Chief guardians of the passes. These tenures are of great antiquity; and in two of these, Satarakhani and Dhadka, the Sarder Ghatwals were semi-independent chiefs, owing to the Raja of Barrabhum a nominal allegiance, which he was continually obliged to claim by force of arms.”
Statistical Accounts of Bengal. Vol XVII, p334.
অর্থাৎ “বরাহভুম পরগণার মধ্যে তরফসর্দ্দার বা প্রধান ঘাটরক্ষক উপাধিধারী ব্যক্তিগণের কর্তৃত্বাধীনে চারিটি বিভাগ বা তালুক আছে। এইরূপ প্রত্যেক বিভাগে প্রায় বিংশতি সংখ্যক গ্রাম আছে। এইগুলি অতি প্রাচীন তালুক। ইহাদের মধ্যে ধাদকা ও সতেরখানি তরফের সর্দ্দারগণ অর্দ্ধ-স্বাধীন সামন্তরাজা ছিলেন। তাঁহারা নামে নাত্র বরাহরাজের অধীন ছিলেন। রাজাকে প্রায়ই এই সর্দ্দারদ্বয়ের উপর প্রাধান্য রক্ষার জন্য বাহুবলের আশ্রয় লইতে হইত।”
অপর একস্থলে প্রধান ঘাটোয়ালগণের সম্বন্ধে সাহেব লিখিয়াছেন,—
“Probably their occupation of the soil is anterior to that of their landlord, who may originally have been a Bhumij himself; and Colonel Dalton Conjectures that (p 174) when the chief was first elected, the more powerful members of the clan became his feudatories, for the purpose of defending the frontiers of the small territory against external enemies. This conjecture is supported by the fact that many of the Sarder or Head Ghatwals are men of great heriditary influence.”
Ibid. pp 356-357.
বর্তমান সময়ে অনেক শিক্ষিত ব্যক্তি মনে করেন যে ভারবর্ষে ইংরাজ জাতির পদার্পণের পূর্ব্বে নির্ব্বাচনপ্রণালী এতদ্দেশীয়গণের অপরিজ্ঞাত ছিল। সেজন্য অনার্য্যগণের মধ্যে এ প্রকারে নির্ব্বাচন দ্বারা নৃপতিমনোনয়নের দৃষ্টান্ত নিতান্ত বিস্ময়কর তৎপক্ষে সন্দেহ নাই। বরাহরাজবংশের উৎপত্তি ও সর্দ্দারগণের সহিত রাজবংশের সম্বন্ধ বিষয়ে মহামান্য রিজলী সাহেবের Special Notes on Barrabhoom নামক প্রবন্ধে নিম্নলিখিত রূপ বর্ণনা আছে।
“It seems to me that the present distribution of the so-called Ghatwali tennres strongly suggests the inference that a body of Mundas, divided into Khunts or Stripes which is a part of their systens settled in Burrabhum and cleared the country. There were probably as many Khunts as there are Tarafs and the ancestor of the present Zemindar was the head of the eldest Khunt. To him the others Owed military service and paid rent in cash and kind, the cash-rent being probably nominal in amount, and then reckoned of minor importance. In course of time the Zemindar from the eldest Khunt of the Bhumij became a Bindu, and called himself a Raja.”
“The term Bhumihor or Bhuinya is a common title among Ghatwals in Barrabhum at the present day and if asked to explain it, they say it means clearer of the jungles and owners of the soil. Like the Bhumihors in Lohardaga they do not deny all liability to pay rent, but they say their rent ought not to exceed half that paid by an ordinary raiyat. The present organisation of the Ghatwals in Burrabhum corresponds so exactly to the Mundari village system in Lohardaga that there can hardly be a doubt that it is the same thing under a different name.” 19-12-13,