বিষয়বস্তুতে চলুন

লাল সিংহ/তৃতীয় পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

উপনিবেশ প্রণালী।

 ভূমিজ জাতি বরাহভূমের আদিন অধিবাসী। এই জাতি সর্ব্বপ্রথমে মধ্যভারতবর্ষ ও বিন্ধ্যাগিরির সমীপবর্ত্তী দেশ হইতে আসিয়া বরাহভূমে উপনিবেশ স্থাপন করিয়াছিল। মানব জাতির সহিত বরাহভূমের প্রথম সম্বন্ধ স্থাপন এই জাতির যত্নে সমাহিত হইয়াছিল।

 ভূমিজ জাতির উপনিবেশ প্রণালী ও তাহাদের আচরিত অন্যান্য প্রথা নিতান্ত বিস্ময়কর। আর্য্যগণের দাসত্ব হেয় জ্ঞান করিয়া যে জাতি বিজন-বনে ও দুর্গম গিরিকন্দরে স্বেচ্ছায় নির্ব্বাসিত হইয়াছিল, এই ভূমিগণ তাহাদের বংশধর। দেশে শত্রু কর্ত্তৃক পীড়িত হইয়া কিম্বা অপেক্ষাকৃত অল্পায়াসে জীবিকা অর্জ্জনের লোভে দেশত্যাগ করিয়া তাহারা জঙ্গলাকীর্ণ ভূখণ্ডে উপনিবেশ স্থাপন করিত।

 এইরূপে দেশ ত্যাগ করিয়া অনার্য্য মুণ্ডা পুত্র কলত্র ও গৃহপালিত পশু লইয়া দুর্গম শৈল-শিখরে বা নির্জ্জন কাননে আপনার কুটীর নির্ম্মাণ করিত। ক্রমশঃ জঙ্গল-ছেদনে কৃষিক্ষেত্র প্রস্তুত করিয়া নবাগত মুণ্ডা সেই চির পরিত্যক্ত স্থানে কৃষিকার্য্যের উদ্বোধন করিত। এই প্রকার আদিম অবস্থায় মুণ্ডাগণ কোন রাজশক্তির প্রাধান্য স্বীকার করিত না। যে সকল নির্জন স্থান সমীপবর্ত্তী কোন রাজা স্বাধিকারান্তর্গত বলিয়া মনে করিতেন না সেইস্থানে মুণ্ডা ঔপনিবেশিক আপনার নবরাজ্য প্রতিষ্ঠিত করিত। বরাহভূম ও সম্যক ছোটনাগপুর বিভাগের প্রথম উপনিবেশ সম্বন্ধে কর্ণেল ডাণ্টন বলেন,

 Mundaries say they had no Raja when they first took up the country called Chotanagpur.

Ethnology P. 165.

 স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা সংরক্ষণের প্রয়াসে মুণ্ডাগণ জঙ্গলের ভিন্ন ভিন্ন অংশে বিক্ষিপ্ত ভাবে বাস করিত। প্রকৃতপক্ষে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত এক একটি পরিবার এক একটি পৃথক রাজ্যের ন্যায় স্বাধীনভাবে বাস করিত। দলবদ্ধ হইয়া এক স্থানে বাস করিলে পরস্পরের সান্নিধ্যে স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হইবার আশঙ্কায় তাহারা তৎকালে গ্রাম বা নগর সংস্থাপন করিত না! ক্রমশঃ এক এক পরিবারের অধিকৃত স্থান এক একটি পৃথক গ্রামে পরিণত হইয়াছে। এই প্রকার প্রত্যেক পরিবারের মধ্যে কর্ত্তা বা বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি সর্ব্বতোভাবে নিজ পরিবারের রাজা ছিল। কর্ত্তা স্বহস্তে পারিবারিক দেবতা, পিতৃপুরুষ, ও মানবের অহিত সাধনে নিত্যতৎপর দুষ্টাত্মা মারাংবুরুর পূজা করিত। সাংসারিক প্রত্যেক কার্য্যে পরিবারস্থ ব্যক্তিগণ কর্ত্তার প্রাধান্য অবনত মস্তকে স্বীকার করিত। বহির্শত্রুর সহিত যুদ্ধে কর্ত্তা স্বয়ং পরিবারস্থ ব্যক্তিগণের নেতৃত্ব করিত। এই সকল কারণে কর্ত্তার নাম সম্যক পরিবারের মুণ্ড (বা মস্তক) এবং তাহার অপভ্রংশে মুণ্ডা হইয়াছে; এবং এই প্রকার ঔপনিবেশ ও পারিবারিক শাসন প্রথা ক্রমশঃ মুণ্ডারি প্রথা নামে অভিহিত হইয়াছে। এই প্রকার বিভিন্ন পরিবারের প্রতি লক্ষ্য করিয়া কর্ণেল ডাল্টন বলিয়াছেন,——

 “They formed a Congeries of Small Confederate States. Each village had its chief also called a Munda, literally a head’ in Sanskrit.”

Ethnology, p 165.

 মুণ্ডাগণের এই প্রকার বিক্ষিপ্তভাবে বাস করিবার আর একটি বিশেষ কারণ ছিল। একস্থানে বহুসংখ্যক ব্যক্তি বাস করিয়া থাকিলে বাহিরের শত্রু অতি অল্পায়াসে তাহাদিগকে জয় করিতে পারিত। দুর্গম ও বিজন স্থানে এইপ্রকারে বিক্ষিপ্ত এক একটি পরিবারকে জয় করিয়া তাহাদিগের উপর প্রাধান্য বিস্তার করা অন্য লোকের পক্ষে বিশেষ কষ্টসাধ্য হইত। পরন্তু মুণ্ডাগণও প্রকাশ্য যুদ্ধ না করিয়া বিভিন্ন দিক হইতে খণ্ডযুদ্ধে শত্রুকে নিপীড়িত করিতে পারিত। অপেক্ষাকৃত পরবর্ত্তী সময়ে মারাঠাগণও এই প্রণালীতে যুদ্ধ করিয়া বিজেতা মুসলমানগণকে বিব্রত ও পর্য্যুদস্ত করিয়াছিল।

 অনার্য্যগণের মধ্যে স্বাবলম্বন প্রবৃত্তি নিতান্ত প্রবল। তাহারা কোন কারণে অপরের কৃপাপাত্র হইবার ইচ্ছা করে না। তাহাদের এবম্প্রকার উপনিবেশ প্রথা দ্বারা এই স্বাবলম্বন প্রবৃত্তির উৎকর্ষ সাধিত হইত। ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্তভাবে বাস করিতে হইলে প্রত্যেক গৃহস্থকে গৃহস্থের ব্যবহার্য্য যাবতীয় পদার্থ প্রস্তুত করিতে হয়, এবং পরের সাহায্যের প্রত্যাশা না রাখিয়া সর্ব্বদা যুদ্ধ ও বিপদের জন্য প্রস্তুত থাকিতে হয়। এই প্রকার স্বাবলম্বন বলে মুণ্ডাগণ অদ্যাপি নিরতিশয় সাহসী, দৃঢ়চেতা ও শ্রমশীল জাতি। প্রাচীনকালে এই সকল স্বাভাবিক গুণে তাহারা আর্য্যগণের সহিত যুগ যুগান্তব্যাপী যুদ্ধেও স্বাধীনতা বিসর্জ্জন করে নাই। এই সকল গুণে বাসস্থানের দুর্গমতা, জল বায়ুর অস্বাস্থ্যকরতা, খাদ্য ও পানীয়ের অভাব প্রভৃতি সহস্র বিপদের মধ্যে পড়িয়াও অনার্য্যগণ আর্য্য জাতির নিকট মস্তক নত করে নাই।

 পরিবারস্থ ব্যক্তিবর্গের প্রতি স্নেহ-মমতা মুণ্ডা বা ভূমিজ চরিত্রের অন্যতম উল্লেখযোগ্য গুণ। ভূমিজগণের গ্রাম বা বংশের মধ্যে প্রত্যেকে সমান পরিমাণে সম্মানের অধিকারী হইয়া থাকে। তাহারা বংশের মধ্যে কাহাকেও উচ্চনীচ জ্ঞান করে না। এইজন্য একস্থলে ডাল্টন সাহেব লিখিয়াছেন,

 As a village often consisted of one family, the inhabitants were all of the Munda dignity, and hence it became a name for the whole tribe.”

Ethnology p 165,

 মুণ্ডা বা ভূমিজ পরিবারের মধ্যে জ্যেষ্ঠাধিকার প্রথানুসারে দারাধিকারের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু তথাপি কোন কর্ত্তা বা মুণ্ডা তাহার পরিবারান্তর্গত অপর ব্যক্তিকে আপনার অধীনস্থ বলিয়া মনে করে না।

 চিরন্তন প্রথানুসারে অ্যাপি গ্রামের কর্ত্তা বা মুণ্ডা প্রধানত্বের অধিকারী। সমগ্র গ্রামের রাজস্ব কর মুণ্ডার নিকট হইতে আদায় হয়। এবং পরিবারস্থ অন্যান্য ব্যক্তিগণ আপন আপন দেয় রাজস্বের অংশ মুণ্ডাকে আদায় দিয়া থাকে। কিন্তু গ্রাম বা পরিবারস্থ ব্যক্তিগণ মুণ্ডাকে আপনাদের ভূম্যধিকারী বলিয়া স্বীকার করে না।

 ভূমিজ পরিবারের মৃত যাবতীয় ব্যক্তি একই শ্মশানে সমাহিত হয়। ভূমিজগণ মৃতদেহের অগ্নি সৎকার সম্পন্ন করিয়া দাহনান্তে অস্থি সঞ্চয় করিয়া থাকে। সময়ক্রমে মহা সমারোহে ঐ অস্থি পারিবারিক শ্মশান বা অস্থিশালাতে প্রোথিত করিয়া দিয়া তদুপরি এক প্রকাণ্ড প্রস্তরখণ্ড চাপাইয়া দেয়। যে যে গ্রামে মুণ্ডাগণের আদিম উপনিবেশ ছিল সেই সেই গ্রামে উপরোক্ত প্রকার অস্থিশালা বিদ্যমান আছে। ঐ অস্থিশালাতে যে যে ভূমিজ পরিবারের অস্থি সমাহিত হইবার অধিকার আছে, তদ্দৃষ্টে আদি মুণ্ডার বংশধরগণকে অনায়াসে জানিতে পারা যায়।

 ভূমিজগণ যে ভাবে জীবনযাপন করিত, তাহার ফলে বাল্যকাল হইতে তাহাদিগকে যুদ্ধবিদ্যা ও মৃগয়া কৌশল শিক্ষা করিতে হইত। সেইজন্য প্রাচীনকালে ভূমিজগণ নিরতিশয় দ্বন্দ্বপ্রিয়, যুদ্ধবিশারদ ও মৃগয়াশীল হইয়া উঠিয়াছিল।সুবিধানুসারে নিকটবর্ত্তী পররাজ্য লুণ্ঠন করিয়া তাহারা বিশেষ প্রীতি ও গৌরব উপভোগ করিত। তীরচালনায় তাহাদের সবিশেষ কৃতিত্ব ছিল। ভূমিজ রমণীগণ সাধ্যানুসারে উপরোক্ত যাবতীয় কার্য্যে স্বামীর সাহায্য করিতে ত্রুটি করিত না। ভূমিজগণের আচরিত নিম্নোক্ত একটি প্রথা হইতে তাহাদের তৎকালীন জীবনের বিশদরূপ আভাস পাওয়া যায়।

 বিবাহের পরদিন ভূমিজগণ অদ্যাপি একটি আচার পালন করিয়া থাকে। সেই দিনে বর-কন্যা মহা সমারোহে স্বজাতীয় পুরুষ ও রমণীগণ কর্ত্তৃক পরিবেষ্টিত হইয়া স্নানার্থ গ্রাম্য জলাশয়ে গমন করিয়া থাকে। সেই সময় বরকে তীর-ধনুক ও কন্যাকে একটি জলের কলসী লইয়া যাইতে হয়। স্নানান্তে সিক্তবস্ত্রে যে সময়ে বর-কন্যা গৃহাভিমুখে প্রত্যাবৃত্ত হয়, সেই সময়ে বর হস্তস্থিত ধনুকে চাপ যোজনা করিয়া এক একটি তীর সম্মুখ দিকে নিক্ষেপ করিয়া থাকে। কন্যা বারিপূর্ণ কলস মস্তকে ধারণ করিয়া ঐ নিক্ষিপ্ত শর কুড়াইয়া লইয়া পুনরায় তাহা বরের হস্তে সমর্পণ করে। তীরচালনায় নৈপুণ্য পুরুষের প্রধান লক্ষ্য, ও যুদ্ধকার্য্যে স্বামীকে সাহায্য করা রমণীর আদর্শ, এবম্বিধ আচারে—ইহাই প্রতিপন্ন হইয়া থাকে।

 এই প্রকার সামাজিক আদর্শে প্রাচীনকালে ভূমিজজাতির চরিত্র গঠিত হইত। অদ্যাপি ভূমিজ-চরিত্র পরীক্ষা করিলে প্রাচীন আদর্শের বিবিধ নিদর্শন প্রাপ্ত হওয়া যায়।