লাল সিংহ/ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ
ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ।
বরাহভূমে অশান্তি।
আমরা পূর্ব্ব পরিচ্ছেদে বলিয়াছি যে, কেবল লালসিংহ বরাহভূমের ভ্রাতৃবিরোধে জ্যেষ্ঠ গঙ্গাগোবিন্দের পক্ষাবলম্বন করিয়াছিলেন। লালসিংহের এবম্বিধ আচরণে আমরা লালসিংহের তীক্ষ্ণ-বুদ্ধি ও কর্ত্তব্যনিষ্ঠার পরিচয় প্রাপ্ত হই। রঘুনাথনারায়ণের রাজ্যাধিকারলাভ কালে বয়োজ্যেষ্ঠের অধিকার বিশেষভাবে প্রতিপন্ন হইয়াছিল। এরূপ অবস্থায় গঙ্গাগোবিন্দ রাজ্যের প্রকৃত অধিকারী। সর্দ্দারগণ বরাহভূমরাজ্যের চিরন্তন পৃষ্ঠপোষক। সুতরাং কর্ত্তব্যবুদ্ধি প্রণোদিত হইয়া লালসিংহ জ্যেষ্ঠের পক্ষ অবলম্বন করিয়াছিলেন, এ প্রকার মনে করা অসঙ্গত নহে।
এই সময়ে বরাহভূমপরগণার যাবতীয় বিরোধে লালসিংহ বিশেষভাবে লিপ্ত ছিলেন। সুতরাং বরাহভূম পরগণার সাধারণ ইতিহাস লালসিংহের জীবনীর একাংশ। সেইজন্য এই অধ্যায়ে সাধারণভাবে বরাহভূমের ইতিহাস বর্ণিত হইবে।
এই ভ্রাতৃবিরোধ উপলক্ষে বরাহভূম অশান্তির নিলয় হইয়া উঠিল। সর্দ্দারগণের দৌরাত্ম্যে সম্যক পরগণার লোক নিতান্ত ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়িল। এই প্রসঙ্গে মিঃ ইরাষ্ট লিখিয়াছেন,—
“There have always been the greatest disorders in this Zemindary owing to the number of powerful Sarders who live in different parts of it, and are constantly committing depredations upon each other; and to the disputes which have always existed between different members of the Zeminder’s family, and frequently occasioned a great deal of fighting and blood-shed.”
অর্থাৎ “বরাহভূমের স্থানে স্থানে যে সকল সর্দ্দার বাস করে তাহাদের উপদ্রবে এখানে সর্ব্বদা গোলযোগ চলিতেছে। সর্দ্দারগণ সর্ব্বদাই আপনা আপনি মারামারি কাটাকাটি করিতেছে। তাহার উপর রাজপরিবারের মধ্যেও ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি অশান্তি উৎপাদন করিতেছে। এই সকল লইয়া এখানে সর্ব্বদাই যুদ্ধ ও রক্তপাত সাধিত হইতেছে।”
দুই ভ্রাতার বিরোধ সম্বন্ধে মিঃ ষ্ট্রাচি লিখিয়াছিলেন,—
“The ties of relationship seem to have been entirely disregarded by these brothers & their respective partisans during the family dissensions which have subsisted in the estate since the father’s death. One brother only 15 years old was accused of joining the Choars, laying waste the lands (the lands to which he lays claim) and committing murder. He answered by recriminations against his elder brother of 16, and there appears some ground to suspect that both of them as well as their adherents have been concerned in offences of the nature above mentioned.”
অর্থাৎ “পিতার মৃত্যুর পর হইতে ভ্রাতৃদ্বয় ও তাহাদের সাহায্যকারীগণ আপনাদের সম্বন্ধ বিস্তৃত হইয়া পরস্পরের প্রতি বিরুদ্ধাচরণ করিতেছে। এক ভ্রাতার বয়স পঞ্চদশ বৎসর মাত্র। তাঁহার বিরুদ্ধে অপর ভ্রাতা অভিযোগ করিতেছেন যে তিনি চোয়াড়গণের সহিত মিলিত হইয়া নিজ দাবিকৃত রাজ্য উৎসন্ন দিতেছেন; পরন্তু তাঁহার বিরুদ্ধে নরহত্যার অভিযোগ পর্য্যন্ত আরোপিত হইয়াছে। অপরতঃ কনিষ্ঠ ভ্রাতা ষোড়শ বৎসর বয়স্ক জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার বিরুদ্ধে উক্ত প্রকার অত্যাচারের অভিযোগ করিতেছেন। উভয় ভ্রাতা ও তাহাদের অনুচরগণ উক্ত প্রকার গর্হিত কার্য্যে লিপ্ত থাকে, ইহা সন্দেহ করিবার যথেষ্ট কারণ আছে।” রিপোর্টের আর এক স্থানে ষ্ট্ৰাচি সাহেব লিখিয়াছেন,—
“All parties proceeded to open hostilities, that is to say, murder each other, to plunder, lay waste and burn the property in dispute, to depopulate the country as far as lay in their power, and to commit every species of outrage and enormity.
অর্থাৎ “উভয়পক্ষ পরস্পরের বিরুদ্ধে শত্রুতাচরণ আরম্ভ করিল। নরহত্যা, দেশলুণ্ঠন, গৃহদাহ ও যথাসাধ্য দেশ প্রজাহীন করা তাহাদের কার্য্য হইয়াছে। যত প্রকার গর্হিত ও অন্যায় কার্য্য করা সম্ভব তাহারা তাহার প্রত্যেকটির অনুষ্ঠান করিতেছে।” এই ভ্রাতাদ্বয় বিরোধ উপলক্ষে যে প্রণালী দ্বারা শত্রুতা সাধন করিত তাহার দৃষ্টান্ত স্বরূপ ষ্ট্ৰাচি সাহেব লিখিয়াছেন,—
“The mode which these people adopt in all their quarrels to wreak their vengeance on each other is by joining the Choars or turbulent and disaffected Pikes or hiring them to commit the most terrible out-rages and devastations on those whom they look upon as hostile to their interests.”
অর্থাৎ “এই ভ্রাতাদ্বয় পরস্পরের বিরুদ্ধে শত্রুত। সাধন জন্য চোয়াড়দের সহিত মিলিত হয় কিংবা চোয়াড়দিগকে অর্থে বশীভূত করিয়া তাহাদের দ্বারা যে সকল লোক তাহাদের স্বার্থের অন্তরায় তাহাদের বিরুদ্ধে অমানুষিক অত্যাচার করিয়া থাকে।”
বরাহভূমের অবস্থা সম্বন্ধে অন্য এক স্থানে ষ্ট্রাচি সাহেব লিখিয়াছেন,—
“According to the best information I am able to obtain Burrabhum has seldom or never been known in & state of perfect tranquility, nor has the Zemindar ever expected to acquire a sufficient control over the different descriptions of persons within the estate to prevent their committing depredations either on himself, on each other, or on the neighbouring Zemindars.”
অর্থাৎ “আমি অনুসন্ধানে যতদূর অবগত হইয়াছি, বরাহভূম পরগণায় কখনও সম্পূর্ণভাবে শান্তি সংস্থাপিত হয় নাই। কিংবা বিভিন্ন প্রকৃতির যে সকল লোক এখানে বাস করে জমীদার কখন তাহাদের উপর সম্পূর্ণভাবে নিজ কর্ত্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করিতে সমর্থ নহেন। ঐ সকল লোক জমীদারের উপর, পরস্পরের উপর, ও নিকটবর্ত্তী জমীদারের উপর যে সকল অত্যাচার করে, জমীদার তাহার প্রতিকার করিতে পারেন না।” প্রকৃতপক্ষে লালসিংহ বরাহভূম ও নিকটবর্ত্তী রাজ্যসকলের উপর যে সকল অত্যাচার করিয়াছিলেন, আমরা ইতিপূর্ব্বে তাহার বর্ণনা করিয়াছি। ষ্ট্ৰাচি সাহেবের রিপোর্টের এই অংশ সেই সকল বিবরণের সমর্থন করে।
বরাহভূমের এই প্রকার বিশৃঙ্খলা বিদূরিত করিবার জন্য ইংরাজ সরকার চিন্তান্বিত হইয়া উঠিলেন। পরিশেষে সর্দ্দারগণের দমন ও পরগণায় শান্তিস্থাপন উদ্দেশ্যে ১৭৯৯ খৃষ্টাব্দে মেদিনীপুর হইতে বরাহভূমে একদল সৈন্য প্রেরিত হইল। শিক্ষিত ইংরাজ সৈন্যের আগমনে সর্দ্দারগণ কিছুদিন গা ঢাকা দিয়া নিজ নিজ দুর্গে আশ্রয় লইলেন। সর্দ্দারগণ এই প্রকারে সরিয়া যাইবার পূর্ব্বে লালসিংহ সরবরাহকারের বাটী লুণ্ঠন করিয়াছিলেন; তাহা ইতিপূর্ব্বে বর্ণিত হইয়াছে। সর্দ্দারগণ কিন্তু কিছুতেই শান্ত হইল না। তাহারা সুযোগ বুঝিয়া আপন আপন দুর্গ হইতে বাহির হইয়া অবসরক্রনে নির্দ্দয়ভাবে বরাহভূম লুণ্ঠন করিতে প্রবৃত্ত হইল। এ সম্বন্ধে ষ্ট্ৰাচি সাহেবের রিপোর্টে আছে,−
“A considerable military force being at last sent Burrabhum hostilities ceased between the contending parties and they retired to their strong holds from whence they have occasionally sallied out and plundered indiscriminately every part of the estate.”
অর্থাৎ “বহুসংখ্যক সৈন্য বরাহভূমে প্রেরিত হইলে, কিছুদিনের জন্য বিবাদ থামিল; ও সর্দ্দারগণ তাহাদের দুর্গে প্রত্যবর্ত্তন করিল। কিন্তু তাহারা সময় সময় দুর্গ হইতে বাহির হইয়া নির্দ্দয়ভাবে রাজার জমীদারী লুণ্ঠন করিয়া থাকে।”
লালসিংহ সর্দ্দারগণের মধ্যে সর্ব্বাপেক্ষা বলশালী ও প্রবল ব্যক্তি। লালসিংহকে গ্রেপ্তার করিতে পারিলে, বরাহভূমে শান্তি সংস্থাপিত হইবার সুবিধা হইবে, বিবেচনা করিয়া ইংরাজ সরকার লালসিংহকে ধৃত করিয়া মেদিনীপুরে পাঠাইবার জন্য বার বার আদেশ পাঠাইলেন। কিন্তু লালসিংহকে কেহই গ্রেপ্তার করিতে সমর্থ হইলেন না। পূর্ব্বের ন্যায় লালসিংহ অব্যাহতভাবে আপনার ইপ্সিত পন্থার অনুসরণ করিতে লাগিলেন। ষ্ট্রাচি সাহেবের মন্তব্যের একাংশে আছে—
“Frequent orders were issued to the sebandies and the Police Daroga to seize Lalsing and his followers and to send them to Midnapur.”
অর্থাৎ “লালসিংহ ও তাঁহার অনুচরবর্গকে গ্রেপ্তার করিয়া মেদিনীপুরে পাঠাইয়া দিবার জন্য বারংবার সিপাহিগণ ও দারোগার উপর আদেশ দেওয়া হইয়াছিল।” কিন্তু দারোগার সাধ্য ছিল না যে লালসিংহকে গ্রেপ্তার করে। ষ্ট্রাচি সাহেব একস্থলে লিখিয়াছেন যে, দারোগাগণ চোয়াড়গণকে গ্রেপ্তার করা দূরে থাকুক, চোয়াড়গণের অনুগ্রহ ব্যতীত জীবন লইয়া ফিরিয়া আসিতে সমর্থ নহে।
শেষে লালসিংহকে গ্রেপ্তার করিয়া তাঁহাকে শাসন করার আশা ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব পরিত্যাগ করিলেন। পরন্তু লালসিংহ ও তাহার অনুচরবর্গ ধৃত হইলেও আদালতের বিচারে তাহাদিগকে দোষী প্রতিপন্ন করা যাইবে না বলিয়া ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেবের প্রতীতি হইল। বরাহভূম পরগণার ভিতর একজনও লোক আদালতে দাঁড়াইয়া তাহাদের অত্যাচার কাহিনী প্রকাশ করিতে সাহসী হইবে না; সুতরাং তাহাদিগকে ধৃত করিয়া ফল নাই বলিয়া ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব সিদ্ধান্ত করিয়াছিলেন। তিনি লিখিয়াছিলেন,—
“These people though guilty of most atrocious crimes, if apprehended and placed before a court of circuit would be acquitted and released owing to the difficulty of procuring witnesses to depose against them.”
ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব আরও বুঝিতে পারিলেন যে, বহুসংখ্যক সৈন্য প্রেরণ করিয়া কোন ফল হইবে না। লালসিংহ-প্রমুখ সর্দ্দারগণকে বলে কি ভয় প্রদর্শন দ্বারা বশীভূত করা যাইবে না। বহুসংখ্যক সৈন্য লইয়া সর্দ্দারগণকে দেশ হইতে বিতাড়িত করিয়া দিলেও বরাহভূমে শান্তি সংস্থাপিত হইবে না বলিয়া ষ্ট্রাচি সাহেব বুঝিতে পারিলেন। দেশের মধ্যে সর্দ্দারগণের যে প্রকার প্রতাপ ও প্রতিপত্তি, তাহাতে সৈন্যের সাহায্যে তাহাদিগকে দমিত করা অসম্ভব। এই প্রকার সিদ্ধান্ত করিয়া ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব গভর্ণমেণ্টে রিপোর্ট করিলেন,—
“Experience has shown that Sarders are able to commit depredations with impurity; that owing to the nature of the country they inhabit, to seize their persons or expell them are equally difficult, and that to confine them to their fastnesses or cause them to retire to the Marhatta territory for a time which is all that can be done by regular troops, is insufficient to protect the country from their depredations, because they can occasionally return, and plunder, and when pursued easily elude all search from their knowledge of the country and skill and dexterity in passing through it. This is proved by the general conviction that they are able to put in execution their threats of vengeance in case of refusal to satisfy their demands. They accordingly maintain their authority merely by threats over large tracts of country in spite of all the powers of the civil Magistrate aided by the military.”
অর্থাৎ “অভিজ্ঞতা দ্বারা আমার এই শিক্ষালাভ হইয়াছে যে সর্দ্দারগণ অবাধে যে কোন প্রকার অত্যাচারের অনুষ্ঠান করিতে সমর্থ। তাহারা যেপ্রকার স্থানে বাস করে, তাহাতে তাহাদিগকে ধৃত করা কি তাহাদিগকে বিতাড়িত করা দুরূহ কার্য্য। রীতিমত সামরিক অভিযান প্রেরণ করিলে অহাদিগকে নিজ নিজ দুর্গে আবদ্ধ রাখা কি তাহাদিগকে কিছু দিনের জন্য মারাঠা রাজ্যে পলাইয়া যাইতে বাধ্য করা যাইতে পারে; কিন্তু তাহাতে তাহাদের অত্যাচার হইতে দেশ রক্ষা করিতে পারা যাইবে না। স্থানীয় অবস্থা দৃষ্টে, ও পর্ব্বত সঙ্কুল স্থানে গতায়াতে তাহারা যে প্রকার অভ্যস্ত তাহাতে, মনে হয় যে তাহারা সৈন্যগণের দৃষ্টি এড়াইয়া পলাইয়া যাইবে; এবং সময় বুঝিয়া পুনরাগমন করতঃ পূর্ব্ববৎ লুণ্ঠন ও অন্যান্য অত্যাচারের অনুষ্ঠান করিবে। এবং তাহাদিগের দাবি পরিপূর্ণ না করিলে তাহারা প্রকৃতিপুঞ্জের উপর যথেচ্ছ অত্যাচার করিবে। কেবল মাত্র ভয় প্রদর্শন দ্বারা তাহারা বিস্তৃত স্থানে আপনাদের অধিকার প্রবল রাখিয়াছে। সৈন্যবলের সাহায্যে ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব তাহাদের গতিরোধ করিতে সমর্থ নহেন।”