লাল সিংহ/দশম পরিচ্ছেদ
দশম পরিচ্ছেদ।
পিতৃ-শত্রু নির্য্যাতন।
বরাহভূমের রাজা বিবেকনারায়ণের নেতৃত্বে শ্যামসুন্দরপুর,অম্বিকানগর, সুপুর ও ঘাটশীলা বা ধলভূমের রাজা সতেরখানি আক্রমণ করিয়া সম্মুখসমরে লালসিংহের পিতাকে নিহত করিয়া ছিলেন। শিশু লালসিংহ কি প্রকারে তাঁহার বুদ্ধিমতী জননীর যত্নে রক্ষা পাইয়াছিলেন, তাহাও ইতিপূর্ব্বে বর্ণিত হইয়াছে। লালসিংহ তাঁহার পিতৃহত্যার সন্তাপ আজীবন বিস্মৃত হইতে পারেন নাই। তিনি বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়া পিতৃশত্রুগণের নির্য্যাতন জন্য বদ্ধপরিকর হইলেন।
লালসিংহ আপনার শক্তিশালী বিপুল বাহিনী লইয়া একে একে বরাহভূম প্রভৃতি যাবতীর পিতৃ-শত্রুগণের রাজ্য আক্রমণ করিয়া দেশ লুণ্ঠন, ও আক্রান্ত রাজ্য লণ্ড ভণ্ড করিলেন। রাজাগণ তাঁহার ভয়ে বিব্রত হইয়া উঠিলেন। তিনি বিলক্ষণ বুদ্ধিমান ও নীতিকুশল ছিলেন। প্রয়োজন হইলেই তিনি অন্য সর্দ্দারগণের সহিত সম্মিলিত হইতেন। এই সম্মিলিত চোয়াড়সৈন্যের উপদ্রবে সম্যক দেশ অরাজক হইয়া উঠিল। শেষে লালসিংহের উপদ্রব হইতে রক্ষা পাইবার জন্য রাজন্যগণ আপন আপন জমীদারীর মধ্যে তাঁহাকে জায়গীর শান্তি ক্রয় করিবার জন্য ব্যস্ত হইয়া উঠিলেন। প্রদান করিয়া এই প্রকারে তাঁহার অধিকার হইতে বহুদূরবর্ত্তী স্থানে লালসিংহ আপনার প্রভুত্ব স্থাপন ও রাজ্যবিস্তার করিতে সমর্থ হইলেন। ক্রমে এ প্রকার অবস্থা দাড়াইল যে, জঙ্গলমহলের রাজা ও প্রজা লালসিংহের নামশ্রবণে ভয়ে বিহ্বল হইতেন। লালসিংহের উপদ্রব ভয়ে জঙ্গলমহলের রাজা প্রজা এ প্রকার অস্থির হইয়া উঠিয়াছিলেন, যে কোন দেশ জয় করিয়া লালসিংহ নিজ দুর্গে প্রত্যাবর্ত্তন করিলেও কেহ সাহস করিয়া হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করিতেন না। বরাহভূমের অবস্থা সম্বন্ধে জঙ্গলমহলের ম্যাজিষ্ট্রেট মিঃ স্ট্রাচি ১৮০০ খৃষ্টাব্দের ১৩ই এপ্রেল তারিখে মন্ত্রী সভাধিষ্ঠিত গবর্ণর জেনারেল সাহেব বাহাদুরের দরবারে এক রিপোর্ট বা মন্তব্য প্রেরণ করিয়াছিলেন। লালসিংহের উপদ্রব সন্বন্ধে উক্ত রিপোর্টের একাংশে লিখিত আছে যে,—
“Lalsing possesses large tracts of land in other Zemindaries, some of them at a great distance from his residence. These lands he has seized within these few years, and maintains himself in possession of them by the threat of laying waste the Zeniindari in which they are situated.”
অর্থাৎ “লালসিংহ তাঁহার নিজের জমীদারী হইতে বহুদূরবর্ত্তী স্থানে স্বাধিকার বিস্তার করিয়াছেন। গত কয়েক বৎসরের মধ্যে লালসিংহ ঐ সকল স্থান আক্রমণ করিয়াছিলেন। যাঁহাদের রাজ্য আক্রমণ করিয়া লালসিংহ ঐ সকল স্থান অধিকার করিয়াছেন, পাছে লালসিংহ প্রত্যাবর্ত্তন করিয়া সমস্ত রাজ্য উৎসন্ন করিয়া দেয়, এই ভয়ে তাঁহারা কোন প্রতিকারের চেষ্টা করেন না; এবং তাহাতে লালসিংহের অধিকার দৃঢ়ভাবে রক্ষিত হইয়া আসিতেছে।”
ত্রিভনসিংহের সহিত যুদ্ধে ধলভূম বা ঘাটশীলার রাজা জনৈক নায়ক ছিছেন। লালসিংহ অবসর বুঝিয়া তাঁহার রাজ্য আক্রমণ করিয়া দশখানি গ্রাম স্বাধিকারভুক্ত করিয়া লইলেন। এই উপলক্ষে ধলভূমের তৎকালীন রাজা জগন্নাথ ধবলের সহিত সুদীর্ঘকাল ধরিয়া লালসিহের যুদ্ধ হইয়াছিল। ঐ যুদ্ধে বিস্তর প্রাণহানি ও রক্তপাত হইয়াছিল। পরিশেষে রাজা জগন্নাথ দীর্ঘকালব্যাপী যুদ্ধের অন্তে লালসিংহের কবল হইতে বিজিত গ্রাম কয়খানি পুনরুদ্ধার করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। ঘাটশীলা যুদ্ধ সম্বন্ধে মিঃ ট্রাচি লিখিয়াছেন,—
“A few years ago he took possession of 10 villages belonging to Jagganath Dhal, Zemindar of Ghatsila. This produced a war between them, and after a long struggle and much slaughter on both sides, he was forced to yield to the superior power of the Zemindar, and retire to his own domains, and relinquish the lands he had occupied in Ghatsila.”
অর্থাৎ “কয়েক বৎসর পূর্ব্বে লালসিংহ ঘাটশীলা আক্রমণ করিয়া জমীদার জগন্নাথ ধবলের অধিকৃত দশখানি গ্রাম স্বাধিকারভুক্ত করিয়া লইয়াছিলেন এই উপলক্ষে উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ হইয়াছিল। দীর্ঘকালব্যাপী যুদ্ধ ও উভয় পক্ষে বিস্তর প্রাণিহিংসার পর লালসিংহ জমিদার কর্ত্তৃক বিজিত স্থান ত্যাগ করিয়া নিজ রাজ্যে প্রত্যাবৃত্ত হইতে বাধ্য হইয়াছিলেন।”
ইহা খৃষ্টিয় ১৮০০ খৃষ্টাব্দের কথা। ষ্ট্রাচি সাহেবের উপরোক্ত পত্র ১৮০০ খৃষ্টাব্দের ১৩ই এপ্রেল তারিখে লিখিত হইয়াছিল; কিন্তু ঐ ঘটনার পরে লালসিংহ পুনরায় ঘাটশীলা-রাজ্য আক্রমণ করিয়া কয়েকখানি গ্রাম পুনরধিকার করিয়াছিলেন। তাঁহার বংশধর পঞ্চানন সিংহ ভূঞা ঐ সকল গ্রাম দখল করিতেন। ইংরাজী ১৮৩৩ খৃষ্টাব্দে সরকার বাহাদুরের আদেশে বরাহভূম পরগণার যাবতীয় ঘাটোয়ালী জায়গার এক তালিকা প্রস্তুত হইয়াছিল। ঐ তালিকায় ঘাটশীলার অন্তর্গত কয়েকখানি গ্রাম লালসিংহের পুত্র পঞ্চানন সিংহের দখলে থাকা জানিতে পারা যায়।
বরাহুভূমের জমিদার লালসিংহের সর্ব্বপ্রধান পিতৃশত্রু ছিলেন। লালসিংহ নামে বরাহ-রাজের অধীন হইলেও কার্য্যতঃ তাঁহার যথেষ্ট স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা ছিল। তিনি রাজাকে নির্দ্দিষ্ট রাজস্ব কর আদায় দিতেন, তাহাতে তাঁহার কোন ত্রুটী লক্ষিত হয় না। কিন্তু আবশ্যক ও সুবিধা অনুসারে বরাহভূম-রাজ্য লুণ্ঠন করিতেও তিনি পশ্চাৎপদ হন নাই।
এই সময়ে বরাহভূম রাজ্যের রাজ্যাধিকার লইয়া বিষম গোলযোগ উপস্থিত হয়। স্থানান্তরে ঐ গোলযোগ ও তৎসংক্রান্ত ব্যাপারে লালসিংহের সম্বন্ধ বিশদভাবে লিপিবদ্ধ হইবে। ঐ গৃহবিবাদের সূত্র ধরিয়া লালসিংহ একাধিকবার বরাহভূম রাজ্য আক্রমণ করিয়াছিলেন। কখন একা, কখন বা অন্য সর্দ্দারগণের সহিত মিলিত হইয়া, তিনি বরাহভূম রাজ্য ও বরাহভূম রাজার রাজধানী আক্রমণ ও লুণ্ঠন করিয়া অত্যাচারের একশেষ করিয়াছিলেন। রাজ্যে দুই রাজপুত্রের মধ্যে রাজ্যাধিকার লইয়া বিবাদ উপস্থিত হইলে, সরকার বাহাদুর কর্ত্তৃক বংশী মাইতি নামক জনৈক ব্যক্তি সরবরাহকার বা ম্যানেজার নিযুক্ত হইয়াছিলেন। লালসিংহ ১৭৯৮ খৃষ্টাব্দের শেষ ভাগে ৬০০।৭০০ চোয়াড় সৈন্য লইয়া বরাহবাজার আক্রমণ করেন, এবং বরাহবাজারের প্রজাগণের যথাসর্ব্বস্ব লুণ্ঠন করিয়া অবাধে নিজ রাজ্যে প্রত্যাবর্ত্তন করিয়াছিলেন। এই সময়ে লালসিংহের শক্তি প্রতিরোধ করিবার জন্য সরকার পক্ষ হইতে দুইশত সিপাহী বরাহবাজারে রক্ষিত হইয়াছিল। লালসিংহ ঐ সিপাহীগণের মধ্যে একশত সিপাহীকে প্রলোভন দ্বারা নিজের দলভুক্ত করিয়া লইয়া নিজ রাজ্যে প্রত্যাবর্ত্তন করিলেন। লালসিংহের এই প্রকার উপদ্রব ও বরাহবাজার লুণ্ঠন সম্বন্ধে মিঃ ষ্ট্রাচি ও মেদিনীপুরের কালেক্টার মিঃ ইরাষ্ট্, যাহা লিখিয়াছেন, নিম্নে তাহা অবিকল উদ্ধৃত হইল।
মিঃ ষ্ট্রাচি লিখিয়াছেন:—
“Lalsing with what avowed object I can not discover, had in conjunction with other Sarders plundered the greater part of the town, or rather village, (since there is not a single brick house in the whole Zemindari) and prevailed on 100 pikes of the place to join him and take up their residence at Sarree.”
অর্থাৎ “লালসিংহ, কি উদ্দেশ্যে আমি বুঝিতে পারি না, অন্য সর্দ্দারগণের সহিত মিলিত হইয়া বরাহবাজার সহর বা গ্রামের (কেন না সমস্ত জনীদারীর মধ্যে একটিও ইষ্টক নির্ম্মিত বাটী নাই) অধিকাংশ লুণ্ঠন করিয়া ও স্থানীয় একশত সিপাহীকে ভাঙ্গাইয়া লইয়া সারিদুর্গে প্রত্যাবৃত্ত হইয়াছে।”
এই ব্যাপার সম্বন্ধে মিঃ ইরাষ্ট্ বলেন:
“But it appears that after he (Bansi Maiti) had been about five months in charge of it (office of Sarberakar) having received intelligence that Lalsing a famous Sarder Pike or Choar who is in possession of a large tract of country to the west of Barrabhum was coming with 6 or 700 men to attack the town where he lived and kept his Cutchery, he immediately left it, and did not return till he found that a strong detachment of regular Sepoys had arrived there.
Sometimes afterwards having received advices from Burrabhum and the revenues being very much in arrears I summoned the manager who represented that the collections had been entirely put a stop to by the disorders which prevailed in the Zemindary, and that his house having been plundered by Lalsing and his followers the day after he left it, he had lost all his property.”
অর্থাৎ “দেখা যাইতেছে যে বংশী মাইতি ৫ মাস কার্য্য করিবার পর বিখ্যাত সর্দ্দার-পাইক বা সর্দ্দার-চোয়াড় লালসিংহ ৬।৭ শত সৈন্য লইয়া বরাহবাজার আক্রমণ করিতে আসিতেছে, এই সংবাদ পাইয়া ম্যানেজার পলাইয়া গিয়াছিল; এবং বহুসংখ্যক শিক্ষিত সৈন্য প্রেরিত না হওয়া পর্য্যন্ত বরাহভূমে প্রত্যাবৃত্ত হয় নাই।
কিছু দিন পরে বরাহভূমের সংবাদ পাইয়া ও বরাহভূমের বিস্তর কর অনাদায়ী থাকা হেতু আমি ম্যানেজারকে তলব করিয়া আনাইয়াছিলাম। কিন্তু ম্যানেজার বলে যে, বরাহভূমের গোলযোগ হেতু কোন খাজনা আদায় হইতেছে না। পরন্তু ম্যানেজার যে দিন বরাহবাজার ত্যাগ করিয়াছিল, তাহার পরদিন তাহার বাটী আক্রমণ করিয়া লালসিংহ তাহার যথাসর্ব্বস্ব লুঠিয়া লইয়া গিয়াছে।”
লালসিংহ বরাহভূম রাজ্যে অন্যান্য যে প্রকার অত্যাচার করিয়াছিলেন, তাহা পরবর্ত্তী পরিচ্ছেদে বিবৃত হইবে।