লাল সিংহ/দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
ভূমিজ জাতি।
ভারতবর্ষীয় আদিম অনার্য্য অধিবাসীগণ প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে বানর, রাক্ষস প্রভৃতি অভিধানে অভিহিত হইয়াছে। যৎকালে ঐ সকল সাহিত্য রচিত হইয়াছিল, সে সময়ে আর্য ও অনার্য্যগণের মধ্যে জেতাজিত ভাব পূর্ণমাত্রার বিরাজ করিতেছিল। আর্য্যগণের আগমনে যে সকল অনার্য্য জাতি অবনত মস্তকে আর্য্যপ্রভুতা ও আর্য্য-শাসন মানিয়া লইল, তাহারা আর্য্যসমাজে শূদ্রপদবী বাচ্য হইয়া সেবক শ্রেণীতে পরিণত হইল। পরন্তু যাহারা আপনাদের জাতীয় প্রাধান্য অক্ষুণ্ণ রাখিবার প্রয়াসী হইল, তাহারা দুর্গম গিরিসঙ্কুল জঙ্গলময় ভূভাগে আত্মগোপন করিয়া বাস করিতে লাগিল। ইউরোপীয় ভাষা ও দেহতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতগণ এই সকল অনার্য্যজাতির ভাষা, দেহ ও প্রকৃতি বিশ্লেষণ করিয়া বর্ত্তমান যুগে চিন্তাশীল ব্যক্তিগণের অবিরাম অনুসন্ধানের পথ উন্মুক্ত করিয়া দিয়াছেন। ইউরোপীয় জ্ঞান ও অনুসন্ধিৎসা প্রভাবে ভারতবর্ষীয় অনার্য্য় অধিবাসীগণের জাতি, সভ্যতা, প্রকৃতি ইত্যাদি সম্বন্ধে বহুতর অবশ্য জ্ঞাতব্য তথ্য সভ্যজগতের নয়নপথবর্ত্তী হইয়াছে। এই আদিম অধিবাসীগণের আচরিত বহুতর প্রথা এক্ষণে সভ্যজাতির দৃষ্টিগোচর হইয়া তাহাদের মনোযোগ বিস্ময় উৎপাদন করিতেছে। যে বন্য সাঁওতাল সামান্য ফল-মূল ও বন্যজন্তুর মাংস আহার করিয়া প্রাণধারণ করে, পরন্তু সভ্যজগতের কোন সংবাদ রাখে না, তাহাদের উপনিবেশ প্রণালী ও সামাজিক অন্যান্য অনেক রীতি যে সুসভ্য জাতিরও অনুকরণীয়, তাহা প্রথম দৃষ্টিতে আমরা বুঝিয়া উঠিতে পারি না।
ভারতীয় অনার্য্য-ভাষাসাগর মন্থন করিয়া মহাপণ্ডিত গ্রিয়ারসন সাহেব Linguistic survey of India নামক যে প্রকাণ্ড গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন, তাহার চতুর্থখণ্ডে মুণ্ডা নামক মূল ভাষার ও তদুৎপন্ন অপর ভাষা সকলের অন্তর্নিহিত বহু জ্ঞাতব্য তথ্যের আবিষ্কার করিয়াছেন। উক্ত গ্রন্থের ভূমিকায় এক স্থলে সাহেব লিখিয়াছেন,— “Kherwar or Kharwar is according to Santali tradition, the name given to the old tribe from which Santals. Hos, Mundas, Bhumij and so forth are descended."
L. S. Vol IV. p. 8.
ভূমিজ জাতির আচার ব্যবহারে সবিশেষ পারদর্শী খ্যাতনামা ঐতিহাসিক শ্রীযুক্ত বাবু শরৎচন্দ্র রায় তাঁহার রচিত গ্রন্থের এক স্থলে লিখিয়াছেন,—
“Points of Similarity in Vocabulary, in details of grammatical forms, and in principles of language-building, appear to establish a close connection between the Kolarian, Santali, Bhumij, Ho &c.”
Mundas & Their Country pp 18, 19.
অর্থাৎ “ভাষা, ব্যাকরণের নিয়ম, বাক্যাবলী ইত্যাদির সাদৃশ্য দৃষ্টে কোল, সাঁওতাল, ভূমিজ, হো ইত্যাদি জাতিগণের মধ্যে জাতিগত ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধে নির্দ্দেশ করা যাইতে পারে।”
মুণ্ডা জাতীয় ও অন্যান্য অনার্য্যগণ ভারতবর্ষের আদিম অধিবাসী। শ্রীযুক্ত শরৎচন্দ্র রায় বলেন,—
“The woods and valleys by the side of the ancient Drisadwati & Saraswati rivers appear to have rung with the Bacchalian songs or durangs of the Mundas and other allied tribes long before the Venerable Arya Rishis of old Chanted their Sonorons vedic hymns on their Sacred banks.” অর্থাৎ “প্রাচীন সরস্বতী ও দৃষদ্বতী নদীর উপকূলবর্ত্তী সমতলক্ষেত্র আর্য্যঋষিগণের বেদগানে মুখরিত হইবার পূর্ব্বে মুণ্ডা প্রভৃতি অনার্য্যগণের প্রেমগানে পূর্ণ হইয়াছিল।”
গ্রিয়ারসান সাহেবের মতে মুণ্ডা জাতি প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে বর্ণিত নিষাদ জাতির নামান্তর মাত্র। তিনি বলেন,—
“In Sanskrit the common name for the Munda aborigines seems to be Nishad. They are found to be in the Madhyadesh and in the Vindya range. Their country is said to begin where the river Saraswati disappears in the Sands. In other words, the Nishads lived in the desert and in the hills to the south and east of the stronghold of the Aryans, i.e, in districts where we now find Munda tribes of their descendants.” L, S, vol IV, p 8.
অর্থাৎ “সংস্কৃত ভাষার মুণ্ডাজাতীয় অনার্য্যগণ নিষাদ আখ্যায় অভিহিত হইয়াছে। মধ্যদেশ ও বিন্ধ্যপর্ব্বত তাহাদের বাসস্থান। যে স্থানে সরস্বতী নদীর জলপ্রবাহ মরুভূমির মধ্যে অদৃশ্য হইয়াছে, সেই দেশই নিষাদগণের বাসস্থান বলিয়া কথিত হইয়াছে। তাহা হইলে নিষাদগণ আর্য্য উপনিবেশ সকলের পূর্ব্ব ও দক্ষিণ ভাগে পর্ব্বত ও বালুকাময় মরুভূমিতে বাস করিত। এক্ষণেও ঠিক ঐ স্থানে তাহাদের বংশধর অনার্য্য মুণ্ডাগণ বাস করিয়া থাকে।”
প্রাচীন নিষাদ বা মুক্তাগণ বিবিধ শাখায় বিভক্ত হইরা ভারতবর্ষের বিবিধ দেশে বাস করিয়া থাকে। সাঁওতাল, হো, ভূমিজ প্রভৃতি জাতিগণ ঐ প্রাচীন মুণ্ডা জাতির বিভিন্ন শাখা মাত্র। মুণ্ডাগণ অপরতঃ কোল নামে পরিচিত। কোল শব্দের ব্যুৎপত্তি লইয়া বহুতর পাশ্চাত্য পণ্ডিত ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করিয়াছেন। গ্রিয়ারসন সাহেব বলেন, “The word Kol or Kolh is a title applied by Hindus to the Hos, Mundaris, and Oraos, and some times also to the other tribes of the Munda stock.” অর্থাৎ “হিন্দুরা হো, মুণ্ডারি, ওরাও এবং অন্যান্য মুণ্ডাবংশীয় জাতিবৃন্দকে কোল আখ্যার অভিহিত করিয়া থাকেন।”Vol IV, p 7.
জগদ্বিখ্যাত পণ্ডিত শিরোমনি সক্ষমুলারের মতে মুণ্ডা ও কোল একই জাতি। গ্রিয়ারসন সাহেব মক্ষমুলারের উক্তি যাহা উদ্ধৃত করিয়াছেন তাহার একাংশে আছে, These people call themselves Munda which is an ethnic name, I have adopted for the common appellation of the aboriginal Koles.” প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্য হরিবংশে কোল আখ্যাধারী বীর জাতির উল্লেখ আছে।[১] অবস্থা দৃষ্টে প্রাচীন নিষাদ জাতি, হরিবংশে কথিত কোল জাতি, এবং বর্ত্তমানকালীন কোল আখ্যাধারী মুণ্ডা জাতির একত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ করিবার বিশেষ কোন কারণ লক্ষিত হয় না।
আদিম মুণ্ডা ভাষা, ও তাহার রূপান্তরে গঠিত অন্যান্য শাখা-ভাষা সকল দৃষ্টে পণ্ডিতগণ বহুতর তথ্যের মীমাংসায় সমর্থ হইয়াছেন। মুণ্ডা-ভাষা বর্ত্তমান সময়ে প্রধানতঃ ছোট নাগপুর বিভাগীয় প্রান্তরে পরিদৃষ্ট হইয়া থাকে। বহু ভাষাবিৎ গ্রিয়ারসান সাহেব উপরোক্ত পুস্তকের ভূমিকার লিখিয়াছেন, “The principal home of the Munda languages at the present day is the Chotanagpur plateau. * * They are almost everywhere found in the hills and jungles, the plains & valleys being inhabited by people speaking some Aryan language.” অর্থাৎ বর্ত্তমান সময়ে মুণ্ডাভাষা প্রধানতঃ ছোটনাগপুর বিভাগে দৃষ্ট হইয়া থাকে। মুণ্ডাভাষী লোক সাধারণতঃ পর্ব্বত ও জঙ্গলে বাস করিয়া থাকে। সমীপবর্ত্তী সমতলে আর্য্যভাষাভাষী ব্যক্তিগণ বাস করে।”
কালক্রমে সংস্কৃতমূলক-ভাষার সংস্রবে আসিয়া অনেক স্থলে মুণ্ডা জাতীয় লোক সমূহ ক্রমশঃ সংস্কৃতমূলক বাঙ্গালা, হিন্দী, প্রভৃতি ভাষা বলিতে শিখিয়াছে। এবং তাহাদের কথিত ভাষার মধ্যেও অনেক সংস্কৃত শব্দ প্রবেশ লাভ করিয়াছে। সেই জন্য গ্রিয়ারসান সাহেব উক্ত ভুমিকার একস্থানে লিখিয়াছেন “The Munda race is nuch more wideiy spread than the Muuda languages.” অর্থাৎ “মুণ্ডাভাষা অপেক্ষা মুণ্ডাজাতি অধিকতর বিস্তৃতি লাভ করিয়াছে।” প্রকৃত পক্ষে ছোটনাগপুর বিভাগের অন্তর্গত অযোধ্যা পর্ব্বতশ্রেণীর পূর্বাংশের মুণ্ডাবংশীয় ভূমিজগণ বাঙ্গালা ভাষায় কথাবার্ত্তা কহে। ছোটনাগপুরের অন্তর্গত মানভূম জেলার অধিবাসী মুণ্ডাগণের সম্বন্ধে গ্রিয়ারসান সাহেব লিখিয়াছেন, “InManbhum they are found in the west, and according to Mr, Risley speak Mundari. the Bhumij on the east side of the Ajodhya range speak Bengali.
L. S. Vol IV, p 54.
আমরা পূর্ব্বে বলিয়াছি আদিন মুণ্ডাভাষা বহু শাখায় বিভক্ত হইয়া বিভিন্ন রূপ ও বিভিন্ন নাম ধারণ করিয়াছে। গ্রিয়ারসান সাহেব তাঁহার রচিত পুস্তকের চতুর্থখণ্ডে মুণ্ডাভাষার যে সকল শাখা-ভাষার তালিকা দিয়াছেন, ভূমিজভাষা তাহাদের অন্যতম। সাহেব উপরোক্ত পুস্তকে বিবিধ শাখা-ভাষার অনুশীলন করিয়া সিদ্ধান্ত করিয়াছেন,—“Santali, Mundari, Bhumij. Birhar, Koda, Ho, Turi, asuri and Korwa are only slightly differing forms of one and the same language. All these tribes are according to Santali traditions, descended from the same stock, and were once known as Kherwars or Kharwars.” L. S. Vol IV p 21.
অর্থাৎ “সাঁওতালি মুণ্ডারি, ভূমিজ, বীরহর, কোডা প্রভৃতি ভাষা একই মূল ভাষার সামান্য রূপান্তর মাত্র। সাঁওতালি প্রবাদ অনুসারে উপরোক্ত জাতি সকল একমাত্র মূলবংশ হইতে উদ্ভূত। ঐ মূলবংশ খাড়ওয়ার বা খেড়ওয়ার বংশ নামে পূর্ব্বে অভিহিত হইত।”
মানভূম জেলার অন্তর্গত বরাহভূম পরগণার ঘাটোয়ালি সেটলমেণ্ট পরিমাপ কার্য্য ইংরাজী ১৮৮২-৮৩ সালে সম্পন্ন হইয়াছিল। অশেষ ভাষাবিৎ পণ্ডিত মিঃ রিজলি সরকার বাহাদুরের নিয়োগ অনুসারে উক্ত সেটেলমেণ্ট পরিমাপ কার্য্যের তত্ত্বাবধারক বা সুপারিণ্টেণ্ডেণ্ট নিযুক্ত হইয়াছিলেন। সেটেলমেণ্ট পরিমাণ সমাপ্ত হইলে চিরন্তন সরকারী প্রথানুসারে রিজলি সাহেব বাহাদুর যে মন্তব্য বা রিপোর্ট লিপিবদ্ধ করিয়াছিলেন, তাহার একাংশে লিখিত আছে,— “There can I think, be no question that the aboriginal tribe called Bhumij or Bhumij Kols were first Settlers in Barrabhum.Local tradition says that they cleared the soil, their name implies the truth of the tradition and the fact that they hold servicetenures and are the priests of the forestgods are almost conclusive evidence on the point. This tribe has always been treated as a branch of the Kol family bearing the same relation to the Mundas of Lohardaga as the Santals & the Hos. Mr. Notrott speaks of the Bhumij as most closely resembling the Mundas in speech and manners and * * * I am inclined to think they are merely Mundas who have for the most part dropped their original languages and gone on for Hinduizing themselves.”
অর্থাৎ “ভূমিজ বা ভূমিজকোল নামধারী অনার্য্য জাতি বরাহভূম পরগণার সর্ব্বপ্রথম অধিবাসী। স্থানীয় প্রবাদ এই যে তাহারা সর্ব্বপ্রথম জঙ্গল কাটিয়া এইস্থানে উপনিবেশ স্থাপন করিয়াছে। তাহাদের নাম এই প্রবাদের সমর্থন করে। তাহারা যে চাকরাণ জায়গা ভোগ করে এবং বন্য-দেবতার পূজা করে, তাহা তাহাদের আদিমত্বের অখণ্ডনীয় প্রমাণ। এই জাতি চিরকাল কোল-বংশীয় বলিয়া বিবেচিত হইয়া আসিতেছে। পরন্তু লোহারডাগার মুণ্ডাগণের সহিত সাঁওতাল ও হোগণের জাতিগত যে প্রকার সম্বন্ধ, ভূমিজগণের সহিতও সেই সম্বন্ধ বিদ্যমান রহিয়াছে। মিঃ নোর্ট বলেন যে ভাষা ও আচার ব্যবহারে মুণ্ডাদিগের সহিত ভূমিজদিগের বিশেষ সাদৃশ্য আছে। এবং আমি বিবেচনা করি যে এই ভূমিজগণ সকলেই মুণ্ডা;তবে তাহারা অনেকে আদিম ভাষা পরিত্যাগ করিয়া ক্রমশঃ হিন্দুত্বের দিকে অগ্রসর হইতেছে।”
স্যার উইলিয়ম হাণ্টারের মতে ভূমিজগণ মুণ্ডা বংশীয়। সাহেব একস্থলে লিখিয়াছেন, “The Bhumij-Kols of western Manbhum are beyond doubt pure Mundas. They inhabit the tract of the conntry which lies on bothsides of the subarnarekha river,”
Statistical Accounts of BengalVol. XVII, P. 271.
কর্ণেল ডাল্টন সাহেবের মতেও ভূমিজজাতি বরাহভূমের আদিম অধিবাসী। কাঁসাই ও সুবর্ণরেখা নদীদ্বয়ের মধ্যভাগ ভূমিজগণের বাসস্থান। সাহেব বলেন, “The Bhumij are no doubt, the original inhabitants of Dhalbhum, Barabhum, Patkum and Baghmundi, and still form the bulk of the population in those and adjoining estates. They may be described roughly as being chiefly located in the country between the Kasai and Subarnarekha rivers.
Dalton, p 173.
কর্ণেল ডাল্টন্ অন্যত্র লিখিয়াছেন যে, এই ‘ভূমিজগণ’ সম্ভবতঃ জৈনগণ কর্ত্তৃক ‘বজ্রভূমি’ নামে অভিহিত হইয়াছে। জৈনগণের চতুর্ব্বিংশ জিন বা তীর্থঙ্কর মহাত্মা বীর এই ভূমিজগণ কর্ত্তৃক আক্রান্ত হইয়াছিলেন। মানভূম জেলার অন্তর্গত পরেশনাথ পর্ব্বতে মহাত্মা বীরের আশ্রম ছিল। একদা এই ভূমিজগণ মহাত্মা বীর ও তাঁহার অনুচরগণের উপর তীর চালনা করিয়া এবং অন্যান্য প্রকার উপদ্রব করিয়া তাঁহাদিগকে বিব্রত করিয়াছিল।[২]
সর্দ্দারগণ ও তাঁহাদের অধীনস্থ পরগণার আদিম অধিবাসীগণ প্রধানতঃ ভূমিজ জাতীয়। তাহাদের পূর্ব্বপুরুষগণ সর্ব্বপ্রথমে জঙ্গলাকীর্ণ বরাহভূম পরগণায় প্রবেশ করিয়া জঙ্গল ছেদনে গ্রামস্থাপন ও কৃষিকার্য্যের উদ্বোধন করিয়াছিল। যৎকালে সভ্য আর্য্যগণ অপেক্ষাকৃত উর্ব্বর ভূমিখণ্ড হইতে আদিম অনার্য্যগণকে বিতাড়িত করিয়া ভারতবর্ষে প্রাধান্য বিস্তার করিতেছিলেন, তৎকালাবধি আদিম অনার্য্যগণ আপনাদের শিক্ষানুসারে ক্রমশঃ বন্য-জন্তুর হস্ত হইতে জঙ্গলময় দেশ উদ্ধার করিয়া সেখানে মানবসমাজের স্থাপনা করিতেছিল। এই মুণ্ডাগণ বরাহভূমের ন্যায় পরিত্যক্ত কঙ্করময় স্থানে সভ্যতার প্রথম আলোক এবং মানব জাতির প্রভুতা প্রথম সংস্থাপনের গৌরবে গৌরবান্বিত। প্রকৃতির হস্ত হইতে মানবের আবশ্যকীয় পদার্থ সংগ্রহ করিবার পন্থা উদ্ভাবন করা সভ্যতার প্রধান গৌরব। ভূমিজ বা মুণ্ডাগণ শ্রমে যত্নে সেই গৌরব অর্জ্জন করিয়াছে।
বর্ত্তমান সময়ে মানভূমবাসী ভূমিজগণ বাঙ্গালাভাষার কথা কহে। মানভূমের প্রচলিত বাঙ্গালা ভাষাই তাহাদের ভাষা। তাহারা সকলেই হিন্দুধর্ম্ম অবলম্বন করিয়াছে। পূর্ব্বপ্রদেশাগত গোস্বামী ও বৈষ্ণব মহাপ্রভুদের অনুগ্রহে ভূমিজগণ বৈষ্ণবধর্ম্মে দীক্ষিত হইয়াছে। মানভূম জেলার ভূমিজগণের মধ্যে প্রত্যেকেই আপনাকে হিন্দু বলিয়া পরিচয় দিয়া থাকে। তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ আবার উপবীত পর্য্যন্ত গ্রহণ করিয়াছে।
- ↑ করুত্থামাদথাক্রোড় শ্চত্বার স্তস্য চাত্মজাঃ। পাণ্ড্যশ্চ কেরলশ্চৈব কোলশ্চোপশ্চ পার্থিবঃ। তেষাং জনপদাঃ স্ফীতাঃ পাণ্ড্যাঃ কোলাঃ সকেরলাঃ। হরিবংশ, ২২ অ।
- ↑ These Bhumij were probably the ‘Vajra Bhumi’ (the terrible aborigines) who are described as abusing, beating, shooting arrows at, and baiting with dogs, the great saint Bira, the twenty-fourth Jina or Tirthankar of the Jains.
Journal, Asiatic Sociey, Vol IX, p 186.