লাল সিংহ/নবম পরিচ্ছেদ
নবম পরিচ্ছেদ।
নাগাযুদ্ধ।
ত্রিভন সিংহ সম্মুখযুদ্ধে নিহত হইলে, লালসিংহের জননী শিশু লালসিংহকে ক্রোড়ে লইয়া বাটালুকা গ্রাম ত্যাগ করিয়া ছিলেন; এবং ক্রমশঃ তিনি সারিগ্রামে আসিয়া সেইস্থানে বাস করিয়াছিলেন, তাহা ইতিপূর্ব্বে বিবৃত হইয়াছে। আজীবন সারিগ্রানে বাস করিয়াছিলেন। লালসিংহের জননী সারিগ্রামে গড় নির্ম্মান আরম্ভ করিয়াছিলেন। লালসিংহ বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়া ঐ গড়ের নির্ম্মান সম্পন্ন করিয়াছিলেন। এতদ্ব্যতীত লালসিংহ সারিগ্রামে পাণীয় জলের সংস্থান জন্য দুইটি প্রকাণ্ড দীর্ঘিকা খনন করাইয়াছিলেন। দীর্ঘিকা দুইটি অদ্যাবধি বর্ত্তমান আছে। কিন্তু গড়ের ভগ্নাবশিষ্ট মৃত্তিকাস্তুূপ ব্যতীত অন্য কোন নিদর্শন নাই। লালসিংহের পৌত্র ভরত সিংহ সারিগ্রামের বাস ত্যাগ করিয়া সতেরখানির অন্তর্গত গোবরঘুসি গ্রামে গড় স্থাপন করিয়াছিলেন। তদবধি পরিত্যক্ত থাকিয়া ক্রমশঃ সারির গড় ভূমিসাৎ হইয়া গিয়াছে। লালসিংহ আপনার খনিত একটি দীর্ঘিকার মধ্যভাগে কাষ্ঠস্তম্ভের উপর একখানি গৃহ নির্ম্মাণ করাইয়াছিলেন। সর্দ্দারবংশ কর্ত্তৃক সারিগ্রামের বাস পরিত্যক্ত হইবার বহুকাল পরেও দীর্ঘিকার জলরাশির মধ্যভাগে কাষ্ঠস্তম্ভের উপর ঐ গৃহের ভগ্নাবশিষ্ট অংশ বিদ্যমান ছিল। প্রবাদ এই যে, লালসিংহ ঐ গৃহ গ্রীষ্মকালে বাস করিতেন।
সারিগ্রামের কিছুদূরে আমদাপাহাড়ি নামে একটি গ্রাম আছে। ঐ গ্রামে একদা একদল নাগাসন্ন্যাসী আসিয়া বলপূর্ব্বক একটি বাঁধখনন আরম্ভ করিয়া ছিলেন। সাধারণতঃ হিমালয় পর্ব্বতের সমীপবর্ত্তী অনার্য্য দেশের অধিবাসীগণ এতদ্দেশে ‘নাগা’ বা স্থানীয় ভাষায় ‘লাগা’ নামে কথিত হইয়া থাকে। ঐ শ্রেণীর সন্ন্যাসীগণ অনেকেই অতি দুর্দ্ধর্ষপ্রকৃতি, যুদ্ধবিদ্যাবিশারদ ও নিতাত্ত উগ্র-স্বভাব। তাহারাও আদিম মুণ্ডা জাতিগণের ন্যায় নিরতিশয় কলহপ্রিয় ও স্বাধীন প্রকৃতি। তৎকালে এই শ্রেণীর সন্ন্যাসীগণ যুদ্ধবিদ্যায় বিশেষ পারদর্শী হইত। নাগাগণ কিছুদিন আমদাপাহাড়ি গ্রামে বাস করিয়া বলপূর্ব্বক বাঁধ বা দীর্ঘিকা খনন আরম্ভ করিল। এতদ্দেশের প্রচলিত নিয়মানুসারে সর্দ্দারের অনুমতি ভিন্ন কেহ কোন বাঁধ খনন কি তাহার প্রতিষ্ঠা করিলে তাহাতে সর্দ্দারের রাজশক্তির অবমাননা করা হয়। অদ্যাপি চিরন্তন প্রথা অনুসারে কেহ কোন বাঁধ খনন করিতে ইচ্ছা করিলে সর্দ্দারের অনুমতি লইয়া থাকেন। লালসিংহ তখনও বালক; সবেমাত্র জীবনের কৈশোর সীমা অতিক্রম করিতেছেন। লালসিংহ মনে করিলেন তাঁহাকে অল্পবয়স্ক দেখিয়া তাঁহার প্রতি অবজ্ঞা বশতঃ নাগাগণ ঐ প্রকার ব্যবহার করিতেছে। সদ্দার নাগাগণকে নিষেধ করিয়া পাঠাইলেও তাহারা অবজ্ঞা বশতঃ তাহা গ্রাহ্য করিল না। এদিকে তাহারা ক্রমশঃ ঐ স্থানে আপনাদের বাসস্থান নির্ম্মাণ করিতে লাগিল এবং দেবালয় প্রতিষ্ঠিত করিল। নাগাগণের এবম্প্রকার গর্হিত আচরণে লালসিংহ নিরতিশয় ক্ষুব্ধ হইলেম।
মুণ্ডা জাতির চিরাচরিত প্রজাতন্ত্র-প্রণালী অনুসারে সতেরখানির পৃষ্ঠপোষক সদিয়াল ও মুণ্ডাগণের ডাক পড়িল। এবং লালসিংহ তাহাদিগকে নাগাগণের বিরুদ্ধে অভিযান করিবার জন্য বলিলেন। ত্রিভন্ সিংহের মৃত্যুর পর হইতে সুদীর্ঘকাল সদিয়ালগণ কোন যুদ্ধে লিপ্ত হয় নাই। সতেরখানির গৌরব প্রতিষ্ঠিত করিবার সুযোগ ও এতদিন তাহাদের হয় নাই। বিশেষতঃ জাতীয় প্রথানুসারে সর্দ্দারের প্রতি অপমান তাহারা ব্যক্তিগত অপমান বলিয়া বিবেচনা করিল। তাহাদের অল্পবয়স্ক সর্দ্দারের সমরানুষ্ঠান দ্বারা গৌরব রক্ষার প্রবৃত্তি ও তাহাদের নিকট বিশেষ গৌরবকর বলিয়া অনুভূত হইল। তাহারা সর্দ্দারকে ঈপ্সিত কার্য্যে বাধা না দিয়া বরং তাঁহার ক্ষোভাগ্নিতে ঈন্ধন প্রদান করিল। নাগাগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানের সংকল্প স্থির হইয়া গেল।
সময়ক্রমে মুণ্ডা সৈন্যগণ সর্দ্দারের অধীনে সমবেত হইল। এই লালসিংহের সর্ব্বপ্রথম সমরোদ্যোগ। বালক লালসিংহ প্রবীন ও বয়োজ্যেষ্ঠ সদিয়াল, গ্রাম্যসর্দ্দার ও তাঁবেদারগণের নেতা হইলেন। যে সকল চিরন্তন নিয়মমূলে মুণ্ডাগণ অসংখ্য খণ্ডরাজ্য স্থাপনে সমর্থ হইয়াছিল, পদস্থ ব্যক্তির কর্তৃত্বাধীনে কার্য্য করিবার শক্তি ও সর্দ্দার বা মান্কির আজ্ঞাপালনে তৎপরতা তাহাদের অন্যতম। সুতরাং সর্দ্দার বয়সে বালক, বরং তাহাদের অপেক্ষা যুদ্ধবিদ্যায় অনভিজ্ঞ হইলেও, তাহারা সাগ্রহে সর্দ্দারের অধীনে কার্য্য করিয়া আপনাদিগকে গৌরবান্বিত মনে করিতে লাগিল।
সুযোগ বুঝিয়া একদা লালসিংহ সতেরখানির সৈন্যদল লইয়া নাগাগণকে আক্রমণ করিলেন। নাগাগণ এবম্প্রকার আক্রমণের জন্য সর্ব্বদা প্রস্তুত থাকিত। তাহারা সংখ্যায় প্রায় তিন চারি শত ছিল, এবং তাহারা সকলেই সাহসী, উগ্রস্বভাব ও অস্ত্রচালনায় সুপটু ছিল। তৎকালপ্রচলিত অস্ত্র-শস্ত্র তাহাদের যথেষ্ট পরিমাণে ছিল। তাহারা অমিততেজে সর্দ্দারের আক্রমণ প্রতিরোধ করিবার চেষ্টা করিল। যে স্থানে এই যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছিল তাহ পরিচ্ছেদান্তরে বর্ণিত ‘বচ্ছিগাদার’ সমীপবর্ত্তী। সারাদিন উভয় পক্ষের ঘোরতর যুদ্ধ হইল। সর্দ্দারের সৈন্যগণ বহুবার বেগে নাগাগণকে আক্রমণ করিল, কিন্তু নাগাগণ কিছুতেই পশ্চাৎপদ হইল না। এক একজন নাগা যুদ্ধে হত হইতে লাগিল, আর অবশিষ্ট নাগাগণ তত ভীষণবিক্রমে সংগ্রামে রত হইল। নাগারা বিলক্ষণ জানিত যে যুদ্ধে পশ্চাৎপদ কি পলায়মান হইলে তাহাদের আর রক্ষা ছিল না। নাগারা একবার হঠিলে কি পশ্চাৎপদ হইলেই চারিদিক হইতে চোয়াড়গণ তাহাদিগকে আক্রমন করিয়া তাহাদিগকে একেবার সবংশে হত্যা করিবে। পরন্তু নাগাগণ বিদেশাগত; কিন্তু নিকটবর্ত্তী গিরিপথ সকল চোয়াড়গণের নিকট সম্পূর্ণভাবে পরিজ্ঞাত ছিল। সুতরাং যুদ্ধে ভঙ্গদিয়া তাহারা কিছুতেই রক্ষা পাইবেনা। সেজন্য তাহারা শেষ পর্য্যন্ত যুদ্ধ করিতে কৃতসংকল্প হইল। প্রবাদ আছে যে যতক্ষণ পর্য্যন্ত একজন নাগা জীবিত ছিল ততক্ষণ পর্য্যন্ত যুদ্ধের বিরাম হয় নাই। প্রাক্কালে যাবতীয় নাগা ধ্বংশ প্রাপ্ত হইলে যুদ্ধ শেষ হইল। বিজয়লক্ষ্মী লালসিংহকে বরমাল্য প্রদান করিলেন। সুদীর্ঘকাল পরে সতেরখানির প্রকৃতিপুঞ্জ সময়-বিজয়ের আনন্দলাভ করিয়া উৎফুল্ল হইল। এই যুদ্ধে লালসিংহের সাহস ও বীরত্ব দর্শনে তাহারা গৌরব অনুভব করিতে লাগিল। সতেরখানির ঘরে ঘরে উৎসবের তরঙ্গ উত্থিত হইল।
আমরা পূর্ব্বে ত্রিভন্ সিংহের যুদ্ধে সতেরখানির কুলদেবতা কালাচাঁদ জিউ লুণ্ঠিত হওয়ার বৃত্তান্ত বর্ণনা করিয়াছি। নাগাযুদ্ধান্তে নাগাগণের উপাস্য দেবতা এক পরম সুন্দর, প্রস্তরময় বিগ্রহ চোয়াড়গণের হস্তগত হইল। এই উপলক্ষে কালাচাঁদ-লুণ্ঠনের ক্ষোভ তাহাদের মনে সমুদিত হইল। তাহারা নাগাগণের উপাস্য দেবতার রমণীয় মূর্ত্তি দর্শনে তাঁহাকে তাহাদের হৃতপূর্ব্ব কালাচাঁদ বলিয়া বরণ করিল। চোয়াড়গণ মহাসমারোহে এই নবার্জ্জিত কালাচাঁদজিউকে বহন করিয়া সারিদুর্গে লইয়াগেল। লালসিংহ যথাবিধি হিন্দু-শাস্ত্রানুমোদিত প্রথানুসারে কালাচাঁদজিউর প্রতিষ্ঠাকার্য্য সম্পন্ন করাইলেন। তদবধি কালাচাঁদজিউ সতেরখানি সিংহপরিবারের কুলদেবতা হইয়াছেন।
নাগা-যুদ্ধে বিজিত একখানি খাণ্ডা অদ্যাপি সর্দ্দারগৃহে সযত্নে রক্ষিত ও পূজিত হইয়া আসিতেছে। তৎকালেচোয়াড়গণ বিশ্বাস করিত যে, ঐ খাণ্ডা মহতীশক্তিসম্পন্ন এবং সিদ্ধপুরুষদত্ত। নাগাগণ ও ঐ খাণ্ডার বলে আপনাদিগকে অজেয় মনে করিত। ঐ খাণ্ডা অদ্যাপি প্রতিবৎসর বীরাষ্টমীর দিন মহাসমারোহে পূজিত হইয়া থাকে; সর্দ্দারের মরণান্তে যখন নূতন সর্দ্দার গদিতে আরোহণ করেন, তখন ঐ খাণ্ডা হস্তে করিয়া তাঁহাকে গদিতে বসিতেহয়।
আমদাপাহাড়ী গ্রামের প্রান্তভাগে অদ্যাপি নাগাগণের খনিত বাঁধ ও তাহাদের নির্ম্মিত দোলমঞ্চ দৃষ্ট হইয়া থাকে; এবং নাগাবিজয়ের নিদর্শন স্বরূপ আমদাপাহাড়ী গ্রাম নাগাবাঁধ আমদাপাহাড়ী নামে কথিত হইয়া আসিতেছে। এই নাগাযুদ্ধ উপলক্ষে কোন কোন শান্তিপ্রিয় পাঠক লালসিংহের চরিত্রে দোষারোপ করিতে পারেন। সতেরখানির মধ্যে নাগাগণের অধিকৃত স্থানের অনুরূপ পতিত, জঙ্গলাকীর্ণ বহুস্থান অদ্যাপি বিদ্যমান রহিয়াছে। বিদেশাগত সন্ন্যাসীর দল সামান্য কঙ্করময় পতিত, ভূমিখণ্ড অধিকার করিয়া থাকিলে, তাহাতে সর্দ্দারের কিছুমাত্র ক্ষতি বৃদ্ধি ছিল না। কিন্তু নাগাগণের ব্যবহার ও তৎকালীন সামাজিক অবস্থা পর্য্যালোচনা করিলে, এই ব্যাপারে আমরা লালসিংহের কোন দোষ দেখিতে পাই না। গৌরব ও মর্য্যাদা রক্ষা করা প্রত্যেক রাজার বিশেষভাবে কর্ত্তব্য। সেই রাজকর্ত্তব্যের অনুরোধে, নিজ প্রতিপত্তি অক্ষুণ্ণ রাখিবার জন্য, লালসিংহ এই যুদ্ধে ব্রতী হইয়াছিলেন। নাগাগণ যে প্রকার দরিদ্র ও ভিক্ষোপজীবী সন্ন্যাসী ছিল, তাহাতে তাহাদিগকে পরাস্ত করিয়া সর্দ্দার কোন আর্থিক লাভ করিতে সমর্থ হন নাই। কেবলমাত্র কর্ত্তব্যবুদ্ধি প্রণোদিত হইয়াই তিনি এই যুদ্ধের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন; এবং এই যুদ্ধে লালসিংহ আপনার কর্ত্তব্যানুরাগেরই পরিচয় দিয়াছেন, তাহা আমরা মুক্তকণ্ঠে বলিতে বাধ্য।
