বিষয়বস্তুতে চলুন

লাল সিংহ/পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

(পৃ. ১১৫-১২০)

পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ।

শান্তি সংস্থাপন।

 ষ্ট্রাচি সাহেবের অনুরোধে লাটসাহেব ক্ষমা নীতিমূলে বরাহভুমে শান্তি স্থাপনের প্রস্তাব অনুনোদিত করিলেন। তখন এক বিষম সমস্যা উপস্থিত হইল। বর্ব্বর প্রকৃতি অসভ্য বরাহভূমবাসীগণ ইংরাজজাতির শিক্ষা, দীক্ষা ন্যায়, নিষ্ঠা, আচার ও প্রকৃতির বিষয় কিছুমাত্র অবগত ছিল না। বরাহ ভূমের আদিম অধিবাসীগণের মধ্যে বৃটিশশাসনের শতাধিক বৎসর পরে, অদ্যাপিও শিক্ষার প্রভাব কিছুমাত্র বিস্তৃত হয় নাই, বলিলে বোধ হয় অত্যুক্তি হইবে না। তৎকালে তাহারা নিতান্ত মূর্খ, কাণ্ডজ্ঞানহীন, উদ্ধতপ্রকৃতি ও অনুদারস্বভাব ছিল। ঐ সকল অধিবাসীগণের নিকট ইংরাজ সরকারের মন্তব্য প্রচারিত করিয়া তাহাদিগকে শান্তিরক্ষার জন্য ব্রতী করা বিশেষ কঠিন কার্য্য হইয়া দাঁড়াইল। সরকারী লোকের মধ্যে সিপাহী, পুলিশ ও রাজস্ব সংক্রান্ত কর্ম্মচারীগণের সহিত তাহাদের পরিচয় ছিল। প্রথমোক্ত দুই শ্রেণীর কর্ম্মচারীগণকে তাহারা আপনাদের আচরিত কার্য্যের অন্তরায় ও শত্রু বলিয়া মনে করিত; এবং শেষোক্ত শ্রেণীর কর্মচারীগণ তাহাদের নিকট সর্ব্বাপেক্ষা অধিকতর অপ্রিয় বলিয়া বিবেচিত হইত। ষ্ট্রাচি সাহেব লিখিয়াছেন,—  “They (Police officers) so far from possessing the least authority over them were frequently indebted to the forbearance of the Choars alone for their safety. The revenue officers are generally speaking more obnoxious to the Choars than the Police Darogas.”

 অর্থাৎ “চোয়াড়গণের উপর পুলিশ কর্ম্মচারিগণের কিছুমাত্র প্রভুত্ব নাই। তাহারা অনেক সময়ে চোয়াড়গণের অনুগ্রহে জীবনরক্ষা করে। রাজস্ববিভাগীয় কর্ম্মচারীগণ পুলিশ দারোগাগণ অপেক্ষা চোয়াড়গণের নিকট অধিকতর অপ্রিয়।” এই চোয়াড়গণ প্রায় ৪৮০ বর্গমাইল পরিমিত পর্ব্বত ও জঙ্গল সমাকীর্ণ স্থানে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত ছিল। বরাহভূম পরগণা জঙ্গলমহলের দূরবর্ত্তী প্রান্তসীমায় অবস্থিত ও তৎকালে নিতান্ত অস্বাস্থ্যকর ছিল। বর্ত্তমান সময়ে বরাহভূম পরগণার জল-বায়ু বিশেষ স্বাস্থ্যকর বলিয়া অনেকে বিবেচনা করেন। কিন্তু খ্রীষ্টিয় অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে ‘এখানে জঙ্গলীজ্বর’ নামক এক প্রকার জ্বররোগের বিশেষ প্রাদুর্ভাব ছিল। এবং নবাগত লোক প্রায়ই এই রোগে আক্রান্ত হইয়া দীর্ঘকালের জন্য অকর্ম্মন্য হইয়া পড়িত। ষ্ট্রাচি সাহেব লিখিয়াছেন,—

 “The climate of Burrabhum is exceedingly unhealthy. Numbers of sepoys have perished there, and scarce a man escapes the most severe attacks of jungle fever, which if it does not prove fatal, generally disables the patient for a very long period.”

 এই প্রকারে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত চোয়াড়দিগকে সংযত করিবার, ও ইংরাজ-সরকারের সদুদ্দেশ্য তাহাদিগের নিকট বিজ্ঞাপিত করিয়া তাহাদিগকে ইংরাজ-সরকারের স্বপক্ষে আনয়ন করিবার, বিশেষতঃ তাহাদের সাহায্যে দেশে শান্তিস্থাপন করিবার, এবং তাহাদের মধ্য হইতে সহস্রাধিক প্রহরী নির্ব্বাচিত ও নিযুক্ত করিবার প্রয়োজন হইয়াছিল। তাহাদের বিশ্বাসী ও তাহাদের উপর প্রভুতাসম্পন্ন ব্যক্তি ভিন্ন অপরের দ্বারা এই কার্য সুসম্পন্ন হওয়া সম্ভাবিত ছিল না। নতন রাজা বয়সে বালক ছিলেন। প্রজাসাধারণের উপর তখনও তাঁহার প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। সুতরাং তাঁহার দ্বারা কোন কার্য্য সমাহিত হইবার সম্ভাবনা ছিল না। পরন্তু রাজা ও আবার লালসিংহের হস্তে ক্রীড়া-পুত্তলিকা মাত্র ছিলেন। ঘোর বিপৎকালে যখন রাজ্যের যাবতীয় প্রধান লোক তাঁহাকে পরিত্যাগ করিয়াছিলেন, তখন একমাত্র লালসিংহ তাঁহাকে আশ্রয় দিয়াছিলেন। সুতরাং লালসিংহের প্রতি কৃতজ্ঞ হইবার তাঁহার যথেষ্ট কারণ ছিল।

 রাজ্যের মধ্যে একমাত্র লালসিংহ সকল শ্রেণীর লোকের উপর প্রভুতা প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। লালসিংহের সংগ্রামকুশলতার ও তাঁহার চরিত্রের দৃঢ়তার কথা প্রত্যেকেই অবগত হইয়াছিল। বিশেষতঃ প্রত্যক্ষভাবে পরগণাস্থিত প্রত্যেক গ্রামের উপর কর সংস্থাপন দ্বারা লালসিংহ পরগণার প্রত্যেক অধিবাসীর উপর তাঁহার অপ্রতিহত প্রভাব বিস্তৃত করিয়াছিলেন। লালসিংহ চরিত্র ও বাহুবলে প্রত্যেক লোকের ইষ্টানিষ্ট সংসাধনে সমর্থ, এ কথা পরগণার প্রত্যেক লোক জ্ঞাত ছিল। তাহার উপর একা লালসিংহ গঙ্গাগোবিন্দের পক্ষাবলম্বন করিয়াছিলেন। সুতরাং গঙ্গাগোবিন্দ বরাহভূমের গদিতে প্রতিষ্ঠিত হইলে অন্য সর্দ্দারগণের প্রতিভা হীনবল ও লালসিংহের মর্য্যাদা ও প্রভুত্ব সমধিক বৃদ্ধি পাইয়াছিল। ষ্ট্রাচি সাহেব নিরতিশয় সূক্ষ্মদর্শী নীতিজ্ঞ পুরুষ ছিলেন। তিনি বুঝিতে পারিলেন যে, লালসিংহের সাহায্য ও মধ্যস্থতা ব্যতিরেকে বরাহভূমে শান্তি সুপ্রতিষ্ঠিত করা ও প্রজাগণকে বাধ্য করা সম্ভাবিত নহে; সেই জন্য তিনি পূর্ব্ব হইতেই লাট দরবারে জানাইয়াছিলেন যে,−

 “If the Government find for the elder brother, Lalsing I believe would be the best person to bring about a negociation with the Choars.”

 অর্থাৎ “রাজ্য লইয়া বিবাদকারী দুই ভ্রাতার মধ্যে সরকার বাহাদুর যদি জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার অনুকূলে বিবাদ নিষ্পন্ন করেন, তাহা হইলে চোয়াড়গণের সহিত বন্দোবস্তকার্য্য লালসিংহের যত্নে সম্পন্ন হইতে পারে।”

 গঙ্গাগোবিন্দ সিংহ জমীদারী প্রাপ্ত হওয়ায় ষ্ট্রাচি সাহেব অতঃপর লালসিংহের সাহায্যে বরাহভূমে শান্তি সংস্থাপনে যত্নশীল হইলেন; এবং সেই উদ্দেশ্যেই তিনি পূর্ব্ব হইতে গবর্ণমেণ্টে লিখিয়া লালসিংহের জন্য ক্ষমাভিক্ষা করিয়াছিলেন। এক্ষণে ইংরাজসরকার ও চোয়াড়গণের মধ্যস্থ হইয়া লালসিংহ চোয়াড়গণকে ইংরাজ-গবর্ণমেণ্টের অনুকূলে আনয়ন করিলেন; এবং তাহাদের মধ্য হইতে দেশে শান্তি-রক্ষার জন্য সহস্রাধিক প্রহরী নির্দ্দিষ্ট করিয়া দিলেন।

 লালসিংহ বিলক্ষণ বুদ্ধিমান ছিলেন। তিনি বুঝিয়া ছিলেন তাঁহার পূর্ব্বপুরুষাচরিত মুণ্ডারি প্রথানুসারে যুদ্ধ ও দেশ লুণ্ঠন আর অধিক দিন চলিবে না। ইংরাজ-শক্তি ক্রমশঃ বদ্ধমূল হইয়া যাবতীয় রাজ-শক্তির কর্ত্তা হইবেন। সুতরাং এই অবসরে তিনি ইংরাজ গবর্ণমেণ্টকে সাহায্য করিতে প্রস্তুত হইলেন। তাঁহার বুদ্ধি-কৌশলে অচিরে চোয়াড়গণ ইংরাজ-গবর্ণমেণ্টের বশ্যতা স্বীকার করিয়া কৃষিকার্য্যের উন্নতি-বিধানে নিযুক্ত হইল; এবং সর্দ্দারগণের যে বিপুল বাহিনী এতদিন দেশ উৎসন্ন করিতেছিল, তাহারা ইংরাজ-গবর্ণমেণ্টের শাসনাধীনে দেশের শান্তি-রক্ষার কার্য্যে নিযুক্ত হইল।

 এই প্রকা্‌রে মার্কুইস অব্ ওয়েলেস্‌লির উদার নীতিমূলে, ষ্ট্রাচি সাহেবের তীক্ষ্ণ শাসন প্রতিভায়, ও লালসিংহের যত্নে বরাহভূমে শান্তি সংস্থাপিত হইল; এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে অনার্য্য ভূমিজ জাতির জাতীয় প্রভুতা নষ্ট হইয়া তাহারা কৃষি-জীবনের শান্তি ও সম্পদ উপভোগের অবসর প্রাপ্ত হুইল।

 ষ্ট্রাচি সাহেবের নির্দ্দিষ্ট বিধান অনুসারে এক্ষণে ভূমিজ চোয়াড়গণ তাহাদের পূর্ব্বাচরিত দুর্দ্ধর্ষ রণ-নীতি পরিত্যাগ করিয়া অদ্যাপি পার্ব্বত্য গিরিপথ বা ‘ঘাট’ রক্ষা করিয়া দেশে শান্তিস্থাপনের সহায় হইয়াছে। এক্ষণে এতদ্দেশে তাহারা ‘ঘাটোয়াল’ বা ‘গিরিপথ রক্ষাকারী সৈন্যদলের অধ্যক্ষ’ এই নামে অভিহিত হইয়া আসিতেছে। কর্ণেল ডাল্টন ইংরাজী ১৮৭২ সালে স্বরচিত পুস্তকের ১৭৬ পৃষ্ঠায় লিখিয়াছেন,—

 “With one or two exceptions all the Ghatwals (captains of the border and their man) of the Bhumij part of Manbhum aud Singhbhum Districts are Bhumij, this is a sure indication of their being the earliest settlers. They were the people to whom the defence of the country was entrusted. The Bhumij Ghatwals in Manbhum have now after all their wild escapades settled down steadily to work as guardians of the peace.”

 অর্থাৎ “মানভূম ও সিংহভূম জেলার ভূমিজ অংশের ঘাটোয়ালগণ (দুই একজন বাদে) সকলেই ভূমিজজাতীয়। এই সকল লোক যে স্থানীয় আদিম অধিবাসী তাহাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। এই সকল লোকের হস্তে দেশের শান্তিরক্ষার ভার অর্পিত হইয়াছে। মানভূম জেলার ঘাটোয়ালগণ তাহাদের পূর্ব্বাচরিত রণনীতি পরিত্যাগ করিয়া দৃঢ়ভাবে শান্তিরক্ষার কার্য্যে ব্রতী হইয়াছে।” এই প্রকারে দুর্দ্দমনীয় চোয়াড়-শক্তিকে দেশহিতকরকার্য্যে ব্যাপৃত রাখিয়া তাহাদিগের সাহায্যে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। লালসিংহের বুদ্ধি ও প্রতিপত্তিবলে এই কার্য্য সমাহিত হইয়াছিল, ইহা লালসিংহের জীবনের সর্ব্বপ্রধান গৌরব।