লাল সিংহ/পঞ্চম পরিচ্ছেদ
পঞ্চম পরিচ্ছেদ।
বংশাবলী।
লালসিংহ ভুঞা সতেরখানি তরফের সর্দ্দার ছিলেন। লালসিংহ কোন সালে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, কিম্বা কোন সালে তাঁহার লোকান্তর হয়, তাহার নিরাকরণ করা বর্ত্তমান সময়ে সম্ভাবিত নহে। তাঁহার বংশের পরিচয় সংগ্রহ করিতে হইলেও জনশ্রুতির উপর নির্ভর করা ভিন্ন গত্যন্তর নাই। আমরা লাল সিংহের সুযোগ্য বংশধর সতেরখানি তরফের বর্ত্তমান জমীদার শ্রীযুক্ত বাবু মনমোহন সিংহের নিকট হইতে তাঁহার বংশাবলীর যে প্রকার পরিচয় প্রাপ্ত হইয়াছি, তাহাই অবিকল উদ্ধৃত করিলাম। বংশাবলীর এতদতিরিক্ত বিবরণ বিস্মৃতির তিমিরগর্ভে নিহিত। তাহার উদ্ধারের কোন উপায় নাই।
| খাঁড়েপাথর | |||||||||||||||||||
| (তৎপুত্ত্র) | |||||||||||||||||||
| যুঝার সিংহ ভুঞা | |||||||||||||||||||
| (তৎপুত্ত্র) | |||||||||||||||||||
| হেমৎ সিংহ ভুঞা | |||||||||||||||||||
| (তৎপুত্ত্র) | |||||||||||||||||||
| ত্রিভন্ সিংহ ভুঞা | |||||||||||||||||||
| (তৎপুত্ত্র) | |||||||||||||||||||
| লাল সিংহ ভুঞা | |||||||||||||||||||
| (তৎপুত্ত্র) | |||||||||||||||||||
| পঞ্চানন সিংহ ভুঞা | |||||||||||||||||||
| (তৎপুত্ত্র) | |||||||||||||||||||
| ভরত সিংহ ভুঞা | |||||||||||||||||||
| (মর্দ্দরাজ) (তৎকন্যা) | |||||||||||||||||||
| চিন্তামনি দেবী | |||||||||||||||||||
মানভূম জেলার অন্তর্গত বেগুনকোদর প্রাচীন রাজবংশের রাজা দিগম্বর সিংহের পুত্র কোঙর (কুমার) জঙ্গরাম সিংহের সহিত চিন্তামনি দেবীর বিবাহ হইয়াছিল। কোঙর জঙ্গরাম ও চিন্তামনি দেবীর তিন পুত্র জন্মে; তন্মধ্যে জ্যেষ্ঠ বাবু মনমোহন সিংহ, মধ্যম বাবু ভিক্ষাম্বর সিংহ, ও কনিষ্ঠ বাবু বৃন্দাবন সিংহ। সতেরখানি পরিবারের চিরন্তন জ্যেষ্ঠাধিকার প্রথানুসারে শ্রীযুক্ত বাবু মনমোহন সিংহ সতেরখানি তরফের বর্ত্তমান জমিদার হইতেছেন।
লালসিংহের পূর্ব্বপুরুষগণ তরফ সতেরখানির অন্তর্গত বাটালুকা গ্রামে বাস করিতেন। বাটালুকা গ্রামের উত্তরে খাঁড়িপাহাড়ি নামক অত্যুচ্চ পর্বতশ্রেণী এবং উক্ত গ্রামের দক্ষিণে কাঁটারঞ্জানামক শৈলমালা বহুদূর পর্য্যন্ত বিস্তৃত আছে। এই উভয় শৈলশ্রেণীর মধ্যবর্তী উপত্যকায় বাটালুকা গ্রামের অধিকাংশ স্থল অদ্যাপি বিশাল শাল জঙ্গলে সমাকীর্ণ। এই পর্ব্বতনালারক্ষিত জঙ্গলের মধ্যস্থলে বাটালুকা একটি ক্ষুদ্র গ্রাম। গ্রামের উত্তরাংশে কিতাডুংরি নামক একটি ক্ষুদ্র পাহাড় আছে। ঐ পাহাড়ে কিতাপাট নামক এক দেবতা আছেন। অদ্যাপি প্রতিবৎসর শ্রাবণমাসে ঐ স্থলে মহাসমারোহে কিতাপাটের পূজা হইয়া থাকে। সতেরখানির সর্দ্দারগণ স্বহস্তে ঐ কিতাপাটের পূজা সম্পন্ন করিয়া থাকেন। কিতাপাট অনার্য্যগণপূজিত একটি বন্য দেবতা। বাটালুকা গ্রামের মধ্যে কিতাডুংরির সান্নিধ্যে সিংহবংশের আদি বাসবাটী বা গড় ছিল। ঐ স্থানকে অদ্যাপি লোকে কিতাগড় বলিয়া থাকে। এক্ষণে কিতাগড়ের নিদর্শন স্বরূপ কেবলমাত্র পুঞ্জীভূত মৃত্তিকাস্তূপ অতীত গৌরবের সাক্ষ্যপ্রদান করিতেছে। ঐ কিতাগড়ে খ্রীষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্দ্ধে লাল সিংহের জন্ম হইয়াছিল।
বাটালুকা গ্রামের উত্তরে খাঁড়িপাহাড়ি নামক পর্ব্বত সগর্ব্বে মস্তক উন্নত করিয়া দণ্ডায়মান আছে। খাঁড়িপাহাড়ি ও খাঁড়েপাথরের মধ্যে নামমূলক কোন সম্বন্ধ আছে কি না,—তাহা নির্ণয় করা সুসাধ্য নহে। খাঁড়িপাহাড়ি পর্ব্বতের নামানুসারে খাঁড়েপাথরের নামকরণ হইয়াছিল, কিম্বা খাড়েপাথরের নামানুসারে তাঁহার প্রিয় মৃগয়াক্ষেত্রের খাঁড়িপাহাড়ি নাম হইয়াছে, তাহা কে বলিয়া দিবে? খাঁড়েপাথরের বর্ত্তমান বংশধরগণ জনশ্রুতিমূলে বিশ্বাস করেন যে, খাঁড়েপাথর প্রকৃত নাম নহে; তাহা একটী উপাধি মাত্র। মানভূম জেলায় কাঁড় শব্দের অর্থ তীর। প্রবাদ আছে যে, খাঁড়েপাথর একজন সুনিপুন যুদ্ধবিশারদ তিরন্দাজ ছিলেন; এবং সেই জন্য তাঁহার ধনুর্ব্বিদ্যানৈপুণ্যের নিদর্শনস্বরূপ তৎকালীন বীরগণ তাঁহাকে কাঁড়েপাথর বা তাহার অপভ্রংশে খাঁড়েপাথর এই উপাধি দিয়াছিলেন। রাজ্যস্থাপয়িতা বীরের পক্ষে যুদ্ধনৈপুণ্যের পরিচায়ক উপাধি অতি প্রিয় বস্তু। সেজন্য তিনিও সাদরে ঐ নামে আত্মপরিচয় প্রদান করিতেন। এই প্রবাদ সত্য হইলে, খাঁড়েপাথরের নামানুসারে তাঁহার প্রিয় মৃগয়াক্ষেত্রের নাম খাঁড়িপাহাড়ি হওয়া বিচিত্র নহে। 'পাথর' শব্দ পাত্র শব্দের অপভ্রংশ। তৎকালে এই সকল পার্ব্বত্য প্রদেশে পাত্র বা পাথর শব্দে বিশেষ সম্মানশালী ব্যক্তি বুঝাই বরাহভূমের অপর তরফ পঞ্চমদারীর সর্দ্দারগণ অদ্যপি 'পাত্র' উপাধিতে আত্মপরিচয় প্রদান করিয়া থাকেন। লাল সিংহের সমকালে যিনি পঞ্চসর্দ্দারির অধীশ্বর ছিলেন, তাঁহার নান কিশন পাথর।
মানভূম জেলার অন্তর্গত পাতকুম পরগণার রাজাগণ আপনাদিগকে সূর্য্যবংশীয়— ক্ষত্রিয় বলিয়া পরিচয় দিয়া থাকেন। তাঁহারা বলেন যে, তাঁহাদের পূর্ব্বপুরুষ বিক্রমাদিত্য নামধারী জনৈক বীরপুরুষ পাতকুম রাজবংশের স্থাপয়িতা। প্রবাদ এই যে, বিক্রমাদিত্য পশ্চিম ভারতবর্ষ হইতে আসিয়া বাহুবলে পাতকুম রাজ্য স্থাপন করিয়াছিলেন। পাতকুম রাজবংশে বিক্রমাদিত্য নামধেয় একাধিক রাজা ছিলেন। পাতকুম রাজবংশের জনৈক বিক্রমাদিত্যের সহিত খাঁড়েপাথরের যুদ্ধ হইয়াছিল। দীর্ঘকালব্যাপী যুদ্ধের পর উভয় পক্ষের মধ্যে শান্তি ও সন্ধি সংস্থাপিত হইয়াছিল। অবস্থানুসারে এ প্রকার যুদ্ধঘটনা অসম্ভব নহে। কিন্তু এ সম্বন্ধে আমরা জনশ্রুতি ব্যতীত অন্য কোন বিশ্বাসযোগ্য বিবরণ সংগ্রহ করিতে পারি নাই।
লালসিংহ খ্রীষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে ও উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে আপনার বিস্ময়কর সামরিক প্রতিভা প্রদর্শন করিয়াছিলেন। খাঁড়েপাথর লালসিংহের বৃদ্ধপ্রপিতামহ। সুতরাং তৎকালীন লোকের পরমায়ু অপেক্ষাকৃত অধিক ছিল বলিয়া ধরিয়া লইলেও খাঁড়েপাথরের প্রাদুর্ভাবকাল খ্রীষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগের পূর্ব্বে যায় না।
বরাহভূম পরগণার যে অংশের জঙ্গল ও পর্ব্বতে খাঁড়েপাথর বাস করিতেন, তাহা পাতকুম রাজধানীর অপেক্ষাকৃত নিকটবর্ত্তী। সুতরাং পাতকুমের রাজা কর্ত্তৃক খাঁড়েপাথরের উপর অধিকারবিস্তার জন্য অভিযান করা বা তদুপলক্ষে কোন যুদ্ধ হওয়া বিচিত্র ব্যাপার নহে। অথবা এই সর্দ্দারগণ যে প্রকৃতির লোক ছিলেন, তাহাতে খাঁড়েপাথর পাতকুম রাজ্যের প্রজাগণের উপর অত্যাচার করা এবং তাঁহার শাসনকল্পে পাতকুমরাজ কর্ত্তৃক খাঁড়েপাথরের বিরুদ্ধে অভিযান ও তদুপলক্ষে কোন যুদ্ধ হওয়া আশ্চর্য্য নহে। বর্ত্তমান সময়ে বিস্মৃতির তিমির-গর্ভ ভেদ করিয়া এই সকল ব্যাপারের আমূল বিবরণ সংগৃহীত হওয়া নিতান্ত অসম্ভব।