বিষয়বস্তুতে চলুন

লাল সিংহ/পরিশিষ্ট

উইকিসংকলন থেকে

(পৃ. ১২১-১২৪)

পরিশিষ্ট।

 লালসিংহের জীবনীর পরিজ্ঞাত অংশ লিপিবদ্ধ হইল। এতদতিরিক্ত বিবরণ বিস্মৃতির তিমিরগর্ভে নিহিত। বর্ত্তমান সময়ে তাহার উদ্ধার সাধ্যায়ত্ত নহে।

 বরাহভূমে শান্তি সংস্থাপিত হইবার পর হইতে সরকারী কাগজপত্রে আর লালসিংহের কোন উল্লেখ দেখা যায় না। ১৮৩৩ খৃষ্টাব্দে বরাহভূমের ঘাটোয়ালগণের এক তালিকা প্রস্তুত হইয়াছিল। তাহা অদ্যাবধি মানভূমের ডেপুটী কমিশনর সাহেবের মহাফেজখানায় সুরক্ষিত আছে। ঐ তালিকা দৃষ্টে লালসিংহের পুত্র পঞ্চাননসিংহ তৎকালে সতেরখানির তরফসর্দ্দার ছিলেন বলিয়া জানা যায়। উপরোক্ত তালিকা প্রস্তুত হইবার পূর্ব্ববৎসর বরাহভূমের রাজকুমার গঙ্গানারায়ণসিংহ বিদ্রোহী হইয়া এতদঞ্চলে ভয়ানক অশান্তির সৃষ্টি করিয়াছিলেন। সেই বিদ্রোহের সময়ও পঞ্চাননসিংহ সতেরখানির সর্দ্দার ছিলেন। সুতরাং ইংরাজী ১৮৩২ খ্রীষ্টাব্দের পূর্ব্বে কোন সময়ে লালসিংহ লোকান্তরলাভ করিয়াছিলেন, এই পর্য্যন্ত বুঝিতে পারা যায়।

 ঘাটোয়ালীপ্রথা প্রবর্ত্তিত হইবার পর হইতে লালসিংহ সম্বন্ধে সরকারী কাগজ পত্র নীরব। তদ্দৃষ্টে অনুমান হয় যে, অতঃপর লালসিংহ শান্তভাবে জীবনের অবশিষ্টাংশ অতিবাহিত করিয়াছিলেন। এই অনুমান সত্য হইলে, নিসংশয়ে বলিতে পারা যায় যে ষ্ট্রাচি সাহেবের সাম্যনীতি অপাত্রে অর্পিত হয় নাই।

 লালসিংহের পর গঙ্গানারায়ণী হাঙ্গামা ও সিপাহী বিদ্রোহ উপলক্ষে এদেশে ঘোর অশান্তি ও রাষ্ট্রবিপ্লব সংঘটিত হইয়াছিল। এতদ্দেশীয় বহুসংখ্যক প্রভাবশালী ভূম্যধিকারী উপরোক্ত বিপ্লব কালে বিদ্রোহীগণের পক্ষাবলম্বন করিয়াছিলেন। কিন্তু সতের খানির সিংহপরিবার চিরকাল ইংরাজ সরকারের পৃষ্ঠপোষক থাকিয়া সরকারের শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস অর্জন করিয়া আসিতেছেন

 লালসিংহ বাহুবলে পরাভূত হন নাই। নীতিকুশল ষ্ট্রাচি সাহেব ক্ষমা ও বিশ্বাসের দ্বারা লালসিংহকে জয় করিয়াছিলেন বিবিধ ঘটনার চক্রে পড়িয়া এমন কি পরবর্ত্তী বিপ্লব ও বিদ্রোহ কালে লালসিংহ ও তাঁহার বংশধরগণ ইংরাজ সরকারের শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস অক্ষুন্ন রাখিতে সমর্থ হইয়াছেন। ক্ষমা ও বিশ্বাসের নীতি দণ্ডনীতি অপেক্ষা বহুগুণে দৃঢ়তর। সতেরখানির সিংহপরিবার সম্বন্ধে এই চিরন্তন নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটে নাই।

 লালসিংহ প্রতাপশালী বীরপুরুষ ছিলেন; তাহা ইতিপূর্ব্বে প্রতিপন্ন হইয়াছে। পরন্তু তিনি সুশাসক ও প্রজারঞ্জক ভূস্বামী ছিলেন। ষ্ট্রাচি সাহেব এসম্বন্ধে লিখিয়াছেন যে,—

 “He (Lalsing) treats his ryats well and gives them effectual protection.”

 অর্থাৎ “তিনি প্রজামণ্ডলীর প্রতি সদ্ব্যবহার করেন, এবং তাহাদিগকে উপযুক্তভাবে রক্ষা করিয়া থাকেন।” সতেরখানির প্রকৃতিপুঞ্জের, বিশেষতঃ চোয়াড় সৈন্যের, যে প্রকার গঠনপ্রণালী ইতিপূর্ব্বে প্রদর্শিত হইয়াছে, তাহাতে তাহাদের মনোরঞ্জন ব্যতিরেকে লালসিংহ কদাপি কথিতরূপে আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ করিতে সমর্থ হইতেন না। চরিত্রের ঔদার্য্য ব্যতিরেকে কেবলমাত্র সাহস ও বাহুবলে পিতৃহীন, অসহায় শিশু বয়োবৃদ্ধি সহকারে কখনই এতাদৃশ প্রতিষ্ঠা ও আত্মগৌরব স্থাপন করিতে পারিতেন না।

 যুদ্ধবিশারদ বীর মাত্রেই সন্ধি ও শান্তি স্থাপনে কৃতিত্বের পরিচয় দিতে পারেন না। সাধারণতঃ শান্তি সংস্থাপন কার্য্য অনেক সময়ে বীরধর্ম্মের বিরোধী। লালসিংহের চরিত্রে একাধারে এই উভয় গুণ বিদ্যমান ছিল। তিনি যে প্রকার বীরত্বের পরিচয় দিয়াছেন, দেশের শান্তি সংস্থাপন কার্য্যেও সেই প্রকার তীক্ষ্ণ-বুদ্ধি ও নীতিকুশলতার পরিচয় দিয়াছেন। তিনি অসাধারণ প্রতিভাবলে রাজ্যের অশান্তি বিদূরিত করিয়া তাহার স্থানে শান্তি সংস্থাপনের প্রধান অবলম্বন হইয়াছিলেন। ইহা তাঁহার জীবনের সর্ব্ব প্রধান গৌরব তৎপক্ষে সন্দেহ নাই।

 লালসিংহের তীক্ষ্ণ-বুদ্ধি ও নীতিকুশলতার অপরাপর দৃষ্টান্ত ইতিপূর্ব্বে প্রদত্ত হইয়াছে। বরাহরাজবংশে ভ্রাতৃবিরোধ উপস্থিত হইলে রাজ্যের ন্যায্য অধিকারী জ্যেষ্ঠ গঙ্গাগোবিন্দের পক্ষাবলম্বন ও চিরন্তন প্রথানুসারে বিবাদকালে ও রাজসরকারে কর প্রদান ইত্যাদির বিবরণ ইতিপূর্ব্বে লিপিবদ্ধ হইয়াছে। তদ্দৃষ্টে লালসিংহের মেধা ও কূটবুদ্ধির পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়।

 লালসিংহের চরিত্রের যে অংশ বিবৃত হইল, তদৃষ্টে জানা যায় যে লালসিংহ একজন কর্ম্মঠ, দৃঢ়চেতা, রণকুশল, তীক্ষ্ণবুদ্ধি, নীতিজ্ঞ, শান্তি ও সন্ধিস্থাপনে প্রতিভাশালী, এবং আত্মগৌরবে গরীয়ান পুরুষ ছিলেন। এই প্রকার চরিত্রের আলোচনা বোধ হয় কেহু নিরর্থক বলিয়া মনে করিবেন না।  লালসিংহ যে অনার্যবংশসম্ভূত ছিলেন, সেই বংশীয় অনেকে ইংরাজশাসনের প্রারম্ভে জঙ্গলাকীর্ণ, তদানীন্তন সভ্যজগতের অপরিজ্ঞাত, স্থানে যথেষ্ট শাসন প্রতিভা প্রদর্শন করিয়া গিয়াছেন কিন্তু বাঙ্গালাভাষায় উক্ত ব্যক্তিগণের জীবনী উদ্ধারের যথাযথ চেষ্টা হয় নাই। তাহাদের আচার, ব্যবহার ও শাসন প্রণালী সম্বন্ধে ইয়ুরোপীয় লেখকগণ যে সকল তথ্য লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন, তদতিরিক্ত কোন তথ্য আৱিস্কারের জন্য বঙ্গীয় শিক্ষিত সমাজ কোন উল্লেখযোগ্য যত্ন করেন নাই। উদারনীতিমূলক ইংরাজী শিক্ষার প্রভাবে আর্য্য অনার্য্যের মধ্যে চিরন্তন ব্যবধান অন্তরিত হইয়াছে। এতদ্দেশীয় অনার্য্যগণ এক্ষণে আমাদের সমাজের আবশ্যকীয় অংশ বলিয়া বিবেচিত হইতেছে। সমাজের এরূপ অবস্থায় অনার্য্যজাতীয় ব্যক্তিগণের প্রতিভা লিপিবদ্ধ করিয়া তাহা হইতে আবশ্যকীয় জ্ঞান লাভ করিবার চেষ্টা করা আমাদের অবশ্য কর্ত্তব্য। এই ক্ষুদ্র পুস্তক দৃষ্টে অনার্য্যজাতির ইতিহাস সংগ্রহ জন্য কোন প্রতিভাশালী লেখক যত্নবান হইলে, লেখক শ্রম সার্থক জ্ঞান করিবেন।


সম্পূর্ণ।