বিষয়বস্তুতে চলুন

লাল সিংহ/প্রথম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

লাল সিংহ

প্রথম পরিচ্ছেদ

বরাহভূম ও সতেরখানি।

 আমরা এই ক্ষুদ্রগ্রন্থে যে বীরপুরুষের জীবনী সঙ্কলন করিবার সঙ্কল্প করিয়াছি, জেলা মানভূমের অন্তর্গত সতেরখানি তরফের অধীনস্থ বাটালুকা নামক গিরি-পরিখা বেষ্টিত ক্ষুদ্র গ্রামে তাঁহার জন্ম হইয়াছিল। সতেরখানি তরফ বরাহভূম পরগণার একাংশ। বর্ত্তমান পরিচ্ছেদে সেই জন্য বরাহভূম ও সতেরখানির কথঞ্চিৎ পরিচয় প্রয়োজনীয়।

 পশ্চিমবঙ্গের জনবিরল, জঙ্গলাকীর্ণ, পর্ব্বত-সঙ্কুল, দুর্গম, কঙ্করময় প্রান্ত ভূমিভাগ প্রাচীনকালে জঙ্গলমহল নামে অভিহিত হইত। প্রাচীন জঙ্গলমহল, এক্ষণে মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, মানভূম ও সিংহভূম ইত্যাদি জেলার অন্তর্ভুক্ত হইয়াছে। ইংরাজ-শাসনের প্রারম্ভে এই জঙ্গলমহল একটি পৃথক জেলা ছিল: এবং মেদিনীপুর সহর এই জেলার কেন্দ্র বা সদরস্থান নির্দ্দিষ্ট হইয়াছিল। জেলা জঙ্গলমহলে তৎকালে অনেকগুলি অর্দ্ধ-স্বাধীন রাজ্য ছিল। ঐ সকল রাজ্যে রাজারা প্রকৃতিপুঞ্জের শাসন ও পালনের একমাত্র অধীশ্বর ছিলেন। বঙ্গের মুসলমান শাসন ও মুসলমান সভ্যতা এই সকল অনুর্ধ্বর রাজ্যকে স্পর্শ করে নাই। রাজারা নিজ নিজ রাজ্যে, অপ্রতিহত প্রভাবে রাজশক্তি চালনা করিতেন, এবং প্রজাগণ প্রয়োজনানুসারে স্ব স্ব রাজার বিজয়-পতাকার নিম্নে সম্মিলিত হইয়া অন্য রাজার সহিত যুদ্ধ করিত। জঙ্গলমহলের অধিকাংশ স্থলে টোডরমল্লকৃত পরগণা বিভাগ নাই। ইংরাজ-শাসনের প্রারম্ভে লর্ড কর্ণওয়ালিস প্রবর্ত্তিত দশশালা বন্দোবস্ত কাল হইতে এক এক রাজার অধিকারভুক্ত যাবতীয় স্থান এক একটি পরগণা নামে অভিহিত হইয়াছে।

 জঙ্গলমহল নিতান্ত অনুর্ব্বর ও দরিদ্র স্থান থাকা হেতু বঙ্গের মুসলমান বিজেতাগণ এইস্থানে প্রভুতা বিস্তার জন্য কোন প্রকার উল্লেখযোগ্য যত্ন করেন নাই। একে দেশ নি তান্ত দরিদ্র, তাহাতে দুর্গমতাহেতু এই স্থানের বিজয় ও শাসন বিশেষ কষ্টসাধ্য ছিল। সে জন্য এই সকল নগণ্য রাজ্য আক্রমণ করিয়া অনর্থক শক্তিক্ষয় করিবার ইচ্ছা বিজেতা মুসলমানগণের মনে উদিত হয় নাই। যদি কখনও কোন মুসলমান সৈন্যাধ্যক্ষ কোন জঙ্গল রাজার রাজ্য আক্রমণ করিতেন, তিনি রাজার নিকট কিঞ্চিৎ কর আদায় করিয়া প্রত্যাবৃত্ত হইতেন। তৎকালে জঙ্গলমহলের জল-বায়ু নিতান্ত অস্বাস্থ্যকর ছিল। সুতরাং প্রভূত সৈন্যবাহিনী লইয়া কোন মুসলমান বীর দীর্ঘকাল জঙ্গলমহলে অবস্থান করেন নাই। এই প্রকার অবস্থায় মুসলমান শাসন বঙ্গের অন্যান্য স্থানের ন্যায় দৃঢ়ভাবে জঙ্গলমহলে প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। রাজাগণের মধ্যে অনেকে বহুসংখ্যক নির্দিষ্ট বেতনভোগী সৈন্য রাখিতেন, এবং তাঁহারা অনেকে যুদ্ধে কামান প্রভৃতি তৎকাল প্রচলিত অস্ত্র ব্যবহার করিতেন।

 খ্রীষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে নবাব আলিবর্দ্দি খাঁর রাজত্বকালে, যখন মারাঠাগণ বঙ্গদেশ আক্রমণ ও লুণ্ঠন করিয়াছিলেন, তৎকালে জঙ্গলমহলের অন্তর্গত বিষ্ণুপুর রাজ্যের রাজার সহিত মারাঠাগণের অন্যতম দলপতি ভাস্কর পণ্ডিতের এক যুদ্ধ হইয়াছিল। সেই যুদ্ধে বিষ্ণুপুরের রাজা কামান ব্যবহার করিয়াছিলেন। ‘দল-মাদল’ (দল-মর্দ্দন) নামক প্রকাণ্ড কামান সেই যুদ্ধে ব্যবহৃত হইয়াছিল। ঐ কামান অদ্য়াবধি বিষ্ণুপুর কেল্লার প্রান্তভাগে পতিত আছে। ঐ কামানের উপর পারস্যঅক্ষরে “একলাখ” শব্দ ক্ষোদিত আছে। তদ্দৃষ্টে অনুমান হয়, মুসলমান শাসন সম্যকভাবে জঙ্গলমহলে প্রতিষ্ঠিত না হইলেও, জঙ্গলমহলের অপেক্ষাকৃত প্রভাবশালী রাজাগণ মুসলমান অধিকারস্থ স্থানের সংবাদ রাখিতেন; এবং পারস্য-ভাষাবিৎ ও মুসলমান সভ্যতার সহিত পরিচিত ব্যক্তিগণের সহিত তাঁহাদের পরিচয় ও আচার ব্যবহার ছিল। ফলতঃ ইংরাজ-শাসনের পূর্ব্বে সম্যক জঙ্গলমহল কখন একত্রিত বা বাঙ্গালা প্রদেশের একাংশীভূত হয় নাই।

 জঙ্গলমহলের যে অংশ বর্ত্তমান মানভূম জেলার অন্তর্গত হইয়াছে, সেই অংশে পঞ্চকোট ও পাতকুম নামে দুইটি প্রাচীন রাজ্য আছে। এই উভয় রাজ্যের রাজারা আপনাদিগকে পশ্চিম প্রদেশাগত ক্ষত্রিয় বলিয়া পরিচয় প্রদান করিয়া থাকেন। প্রবাদ এই যে, মানভূম জেলার পূর্ব্ব-দক্ষিণাংশ যাহা এক্ষণে পরগণা বরাহভূম নামে কথিত হইয়া থাকে, তাহা পূর্ব্বে পাতকুম রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। প্রাচীনকালে শ্বেত বরাহ ও নাথ বরাহ নামধারী দুই ক্ষত্রিয় রাজকুমার পশ্চিম প্রদেশ হইতে পাতকুমে আসিয়া রাজার অধীনে সৈনিক বিভাগে চাকরী গ্রহণ করিয়াছিলেন।

 গল্প এই প্রকার যে ভ্রাতৃযুগল রাজকুমার; সুতরাং তাঁহাদের মস্তক কিছুতেই অবনমিত হইত না এবং তজ্জন্য তাঁহারা কাহাকেও প্রণাম করিতেন না। ক্রমশঃ তাঁহাদের ব্যবহারে ক্ষুণ্ণ হইয়া পাতকুম রাজ্যের ব্রাহ্মণগণ রাজার নিকট অভিযোগ করিলেন যে, নবাগত সৈনিক কর্ম্মচারীদ্বয় তাঁহাদিগকে প্রণাম করেন না। রাজা এই বৃত্তান্ত শুনিয়া শ্বেত ও নাথকে দরবারে ডাকাইয়া ব্রাহ্মণগণের সম্বন্ধে তাহাদের আচরণের কারণ জিজ্ঞাসা করিলে, তাঁহারা বলিলেন যে, তাঁহারা রাজপুত্র; সুতরাং তাঁহাদের মস্তক স্কন্ধের সহিত এপ্রকার দৃঢ়ভাবে সম্বদ্ধ যে তাঁহাদের মস্তক কিছুতেই নত হয় না। রাজা সে দিন তাঁহাদিগকে কিছু না বলিয়া বিদায় করিয়া দিলেন। কিছুদিন পরে রাজা কুমারদ্বয়ের উক্তির যাথার্থ্য় পরীক্ষা করিবার উদ্দেশ্যে তাঁহাদিগকে অশ্বপৃষ্ঠে দূরবর্ত্তী স্থানে বিদায় করিয়া দিয়া উপদেশ দিলেন যে তাঁহারা সেই স্থান হইতে বেগে অশ্ব ছুটাইয়া রাজবাটীর তোরণ দিয়া একেবারে আঙ্গিনায় প্রবেশ করিবেন। ভ্রাতৃযুগল চলিয়া যাইবার পর রাজা তোরণদ্বারে এরূপভাবে . একখণ্ড তীক্ষ্ণধার করাত ঝুলাইয়া দিলেন, যে অশ্বপৃষ্ঠে দ্রুতগতিতে আগত ভ্রাতৃযুগল করাত দৃষ্টে মস্তক অবনমিত না করিলে, তাঁহাদের মস্তক ছিন্ন হইয়া যাইবে! কিছুক্ষণ পরে জ্যেষ্ঠ শ্বেত সর্ব্বাগ্রে অশ্বারোহণে তোরণদ্বারে আসিয়া পৌছিলেন, এবং তোরণদ্বারে করাত দৃষ্টে আসন্ন মৃত্যু জানিয়াও মস্তক অবনমিত করিলেন না। তাঁহার মস্তক স্কন্ধচ্যুত হইয়া ভূপতিত হইল। তদনন্তর রাজা দূর হইতে নাথকে অশ্ব সংযত করিতে বলিলেন। নাথ অশ্ব হইতে অবতরণ করিয়া পদব্রজে তোরণদ্বারে আসিলেন এবং তথায় জ্যেষ্ঠের মৃতদেহ দেখিয়া, বিশেষ ক্ষুব্ধ হইলেন। এদিকে, রাজাও আত্মকৃতকার্য্যের জন্য বিশেষ অনুতপ্ত হইলেন। এই প্রকারে মস্তক ও কণ্ঠের দৃঢ় সংযোজন দৃষ্টে ভ্রাতৃগণের ক্ষত্রিয়ত্ব ও রাজকুমারত্ব বিশেষভাবে প্রমাণিত হইয়া গেল তখন রাজা নাথকে আপন রাজ্যের পূর্ব্বাংশ রাজ্য স্থাপন জন্য দান করিলেন। তদনুসারে নাথ বরাহ কর্তৃক নবরাজ্য প্রতিষ্ঠিত হইল; এবং বরাহ ভ্রাতৃদ্বয়ের নামানুসারে রাজ্যের নাম বরাহভূম হইল।[] মহামতি কর্ণেল ডাল্টন বলেন যে নাথ বরাহের জ্যেষ্ঠভ্রাতার নাম কেশ বরাহ ছিল। কিন্তু আমরা এতদ্দেশে কেশ বরাহের নাম শুনি নাই। বরাহভূম ও পাতকুম অঞ্চলে নাথ বরাহের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার নাম শ্বেত বরাহ বলিয়াই প্রসিদ্ধ।

 বরাহভূম রাজ্যের উৎপত্তি সম্বন্ধে পাতকুম অঞ্চলে আর একটি গল্প শ্রুত হইয়া থাকে। সেখানে এই প্রকার জনশ্রুতি প্রচলিত আছে যে একদা বরাট দেশের ক্ষত্রিয় রাজা সপরিবারে শ্রীক্ষেত্র দর্শনে যাইতে ছিলেন, রাণী তৎকালে গর্ভবতী ছিলেন, কিন্তু রাজা তাহা জানিতেন না। ক্রমশঃ রাজা দীর্ঘকাল পথ অতিক্রম করিয়া একদিন সন্ধ্যাকালে সতেরখানি তরফের সন্নিহিত, পর্ব্বতপ্রান্তে রূপসান নামক গ্রামে তাম্বু সন্নিবেশ করিলেন। সেই স্থানে রাণী দুই যমজ সন্তান প্রসব করিলেন। রাণী গর্ভ গোপন করিয়া রাজার সহিত দেশ ভ্রমণে, বিশেষতঃ তীর্থ দর্শনে আসিয়াছেন শুনিলে, রাজা নিরতিশয় ক্রুদ্ধ হইবেন, এই ভয়ে রাণী সদ্যোজাত শিশু-যুগলকে পর্ব্বতের উপর ফেলিয়া দিলেন। পরদিন প্রাতে রাজা, রাণী ও অনুচরবর্গকে লইয়া শ্রীক্ষেত্রের পথে চলিয়া গেলেন। ক্বাচিৎ বন্যবরাহী কুমারযুগলের সৌন্দর্য দর্শনে মুগ্ধ হইয়া পর্ব্বতের উপরে স্তন্যদানে তাহাদিগকে রক্ষা করিতে লাগিল। কয়েকদিন পরে জনৈক বন্যলোক কুমারযুগলকে দেখিয়া, তাহাদিগকে লইয়া গিয়া প্রতিপালন করিতে লাগিল; এবং বরাহ-দুগ্ধে বালকদ্বয়ের দেহ রক্ষা হইয়াছিল বলিয়া তাহাদের যথাক্রমে শ্বেতবরাহ ও নাথবরাহ নাম রাখিল। কালক্রমে কুমারদ্বয় বিশেষ বলশালী বীর হইল। পরন্তু রাজপুত্র থাকা হেতু তাহাদের মস্তক কিছুতেই অবনমিত হইত না। ক্রমশঃ বালকদ্বয়ের সৌন্দর্য্য ও বীরত্ব দেখিয়া পাতকুমপতি তাহাদিগকে সৈন্যবিভাগে নিযুক্ত করিলেন। তৎপরে ব্রাহ্মণ-দিগের অভিযোগে তোরণদ্বারে জ্যেষ্ঠের শিরশ্ছেদ ও দানসূত্রে কনিষ্ঠভ্রাতা দ্বারা বরাহভূম রাজ্য স্থাপন ইত্যাদি সম্বন্ধে পূর্ব্ব বর্ণিত গল্পের সহিত পাতকুম অঞ্চলের গল্পের মিল ও ঐক্য আছে। শেষোক্ত গল্পে রাজবংশের জাতি ও উৎপত্তির প্রকৃত বিবরণ নিতান্ত সূক্ষ্ম আবরণে আচ্ছাদিত। শ্রীক্ষেত্রগামী পশ্চিমদেশীয় রাজা কর্তৃক পরিত্যক্ত অনার্যপরিবারে প্রতিপালিত বালক কর্ত্তৃক জঙ্গলমহলের অন্তর্গত বিষ্ণুপুর রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। বিষ্ণুপুর রাজবংশ সম্বন্ধেও ঐ প্রকার কাহিনী প্রচলিত আছে। কাহিনীর সূক্ষ্ম আবরণ ভেদ করিয়া হ্যার উইলিয়ম হাণ্টার, মহামান্য মিঃ রিজলী, মিঃ রমেশচন্দ্র দত্ত- প্রমুখ মনস্বীগণ এই সকল জঙ্গল রাজাগণকে অনার্য্য মুণ্ডাবংশীয় বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়াছেন, আমরা সময়ান্তরে বরাহভূম সম্বন্ধে মিঃ রিজলীর উক্তি উদ্ধৃত করিব। যাহা হউক বরাহ উপাধিধারী অনার্য্য ভূমিজ সন্তান বা আর্য্য রাজকুমার দ্বারা বরাহভূম রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল; এবং সেই বরাহের নামানুসারে বরাহভূম রাজ্যের নামকরণ হইয়াছিল, ইহাই সাধারণের বিশ্বাস। বরাহভূমের বর্ত্তমান রাজা ঐ আদি বরাহরাজের বংশধর।

 ইংরাজ কর্তৃক বঙ্গাধিকারের পূর্ব্বে জঙ্গলমহলের রাজাগণ নির্দিষ্টভাবে অন্য রাজ-শক্তির অধীন হয়েন নাই। ইংরাজ-সরকার ১৭৬৫ খৃষ্টাব্দে দিল্লীর বাদসাহের নিকট হইতে বঙ্গ, বিহার, উড়িষ্যার দেওয়ানী সনদ লাভ করিবার পরে বরাহভূম ও অন্যান্য জঙ্গল-রাজ্য প্রকৃত পক্ষে অন্য শক্তির অধীন হইয়াছে। এতদ্দেশের রাজারা সহজে ইংরাজ-শক্তির প্রাধান্য ও কর আদায়ের অধিকার স্বীকার না করায় এখানে ইংরাজগণের সহিত তাঁহাদের ঘোরতর সংঘর্ষ উপস্থিত হইয়াছিল। মহামতি ডাল্টন তাঁহার রচিত Ethnology নামক পুস্তকের ১৭৪ পৃষ্টায় লিখিয়াছেন, “I do not think that the settlement of any of the Bhumij Jungle Mohals was effected without a fight.” অর্থাৎ “আমার বোধ হয় বিনা যুদ্ধে জঙ্গলমহলের কোন রাজা ইংরাজ-সরকারের সহিত কর আদায় দিবার জন্য বন্দোবস্ত করে নাই।” দৃষ্টান্ত স্বরূপ ডাল্টন সাহেব ঘাটশীলার বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। ডাল্টন বলেন,—“In Dhalbhum the Raja resisted the interference of the British power, and the Government set up a rival power, but after various failures to establish his authority, they set him aside, and made terms with the rebel.” অর্থাৎ “ধলভূমের রাজা ইংরাজ-শক্তি কর্ত্তৃক করস্থাপনা কার্য্যে বাধা দিয়াছিলেন। ইংরাজ-সরকার অন্য লোককে রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য দীর্ঘকাল চেষ্টার পর অকৃতকার্য্য হইয়া শেষে বিদ্রোহী রাজার সহিত সন্ধি করিয়া ছিলেন।”

 পঞ্চকোটের রাজা যদিও প্রথমে ইংরাজ-সরকারের সহিত বন্দোবস্ত করিয়াছিলেন, কিন্তু তিনি কর আদায় দিতে ত্রুটী করায় ১৭৯৮ খৃষ্টাব্দে পঞ্চকোট-রাজ্য নিলামে বিক্রয় হইয়াছিল। কিন্তু রাজ্যের প্রজাগণ বিদ্রোহী হইয়া ইংরাজ-সরকারের সহিত প্রতিকূলতাচরণ করিতে থাকায় ইংরাজ-সরকার নিলাম রহিত করিয়া রাজাকে পুনরায় জমিদারী ছাড়িয়া দিয়াছিলেন।[]

 ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর দেওয়ানী লাভের সমকালে রাজা বিবেকনারায়ণ বরাহভূমের রাজা ছিলেন। বিবেকনারায়ণ দীর্ঘ-কাল ধরিয়া কোম্পানীর সহিত বিরুদ্ধাচরণ করায় কোম্পানী বাহাদুর ১১৮২ সালে তাঁহাকে রাজ্যত্যাগ করিতে বাধ্য করিয়াছিলেন। তাঁহার রাজ্যত্যাগের পর তাঁহার পুত্র রঘুনাথ সিংহ ইংরাজ-সরকারের সহিত প্রথম বন্দোবস্ত করিয়াছিলেন। তদনুসারে জঙ্গলমহলের অন্যান্য রাজ্যের ন্যায় বরাহ-রাজ্য জমিদারীতে পরিণত ও জমিদারী আখ্যা প্রাপ্ত হইয়াছে। বরাহভূম পরগণার দক্ষিণাংশে সতেরখানি তরফ অবস্থিত।

 বরাহভূম পরগণার মধ্যে চারিটি প্রধান তরফ বা বিভাগ আছে। তাহাদের নাম যথাক্রমে সতেরখানি, পঞ্চসর্দ্দারী, ধাদকা ও তিনসওয়া। এই চারিটি তরফে বহু প্রাচীনকালাবধি তরফসর্দ্দার উপাধিধারী চারিজন জমিদার বা তালুকদার আছেন। এই সর্দ্দারগণ আপনাপন অধিকার মধ্যে রাজশক্তি পরিচালনা করিতেন। বরাহরাজকে আপনাদের অধিপতি বা প্রভু বলিয়া স্বীকার করিতেন; এবং বহির্শত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধ করিবার জন্য সর্দ্দারগণ বরাহরাজের নেতৃত্বে যুদ্ধযাত্রা করিতেন। এই সর্দ্দারগণ বরাহরাজের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও সহায় ছিলেন। সর্দ্দারগণ অনেকেই নামে মাত্র রাজার প্রাধান্য স্বীকার করিতেন। সর্দ্দারগণ অনেকেই নামে মাত্র রাজার প্রাধান্য স্বীকার করিতেন। ফলতঃ স্ব স্ব অধিকার মধ্যে সর্দ্দারগণ অপ্রতিহতপ্রতাপ ছিলেন। আমরা সময়ান্তরে এ সম্বন্ধে সবিশেষ আলোচনা করিব।

 বরাহভূম রাজ্য বা পরগণা পরিমাণে ৬৪২ বর্গমাইল স্থান ব্যাপিয়া অবস্থিত। এই স্থানের অধিকাংশ ভাগ পর্ব্বত ও গভীর অরণ্যে সমাবৃত। কলনিনাদিনী গিরিনদী, উন্নত পর্ব্বত-মালা’ ও শ্বাপদসঙ্কুল দুর্গম অরণ্যানি, বরাহভূম পরগণার প্রধানতম দৃশ্যবস্তু। খ্রীষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে বরাহভূম পরগণার জল বায়ু নিতান্ত অস্বাস্থ্যকর ছিল। পরগণার মধ্যে যাতায়াতের রাস্তা ছিল না। রাজা ও সর্দ্দারগণ দুর্গম পর্ব্বত-পরিখা বেষ্টিত উপত্যকায় বাস করিতেন।

 তরফ সতেরখানি পরিমাণে প্রায় ১০০ বর্গমাইল স্থান ব্যাপিয়া অবস্থিত; এবং তাহার অধিকাংশ ভাগ অত্যুচ্চ পর্ব্বত ও জঙ্গলাকীর্ণ উপত্যকা-ভূমিতে পরিপূর্ণ। বরাহভূম পরগণার ও মানভূম জেলার দক্ষিণভাগে সতেরখানি তরফ অবস্থিত। সতেরখানির গর্ব্বোন্নত পর্ব্বতমালার পদতল ধৌত করিয়া স্বচ্ছ-সলিলা সুবর্ণরেখা নদী প্রবাহিত হইতেছে। সুবর্ণরেখার পর পারে ঘাটশীলা রাজ্যের নগরাজি ক্রমশঃ দক্ষিণ মুখাতিগামী হইয়া পরিশেষে মধ্যভারতবর্ষের বিশাল পর্ব্বতমালা বিন্ধ্যগিরির সহিত সম্মিলিত হইয়াছে।

 বরাহভূম পরগণা জঙ্গলমহলের অন্যান্য অধিকাংশ রাজ্যের ন্যায় বন্ধুর, কঙ্করময় ও অনুর্ব্বর। অধিবাসীগণ প্রধানতঃ ভূমিজ ও সাঁওতাল। তাহারা অনেকেই বৎসরের অধিকাংশ সময় মহুল, জোনার, কদুয়া প্রভৃতি খাদ্য আহার করিয়া জীবন যাপন করে। আদিম সর্দ্দারগণও সকলেই ভূমিজ জাতীয় ছিলেন। এই ভূখণ্ডের অধিবাসীগণ অধিকাংশই নিরক্ষর, সাহসী, বলবান, কলহপ্রিয় ও কষ্টসহিষ্ণু। বর্ত্তমান সময়ে নিকটবর্ত্তী বাঙ্গালা ও উড়িষ্যা হইতে বহুসংখ্যক প্রবাসী আসিয়া বরাহভূম রাজ্যে বাস করিয়াছেন। কিন্তু খ্রীষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে এখানে প্রধানতঃ ভূমিজ, সাঁওতাল ও তাহাদের বিভিন্ন শাখা কোল, খেড়িয়া, ধাঙ্গর ব্যতীত অন্যলোকের বাস ছিল না। এক্ষণে ভূমিজ প্রভৃতি জাতিরা অনেকে বাঙ্গালা ভাষায় কথাবার্ত্তা কহে। তাহাদের কথিত ভাষা মানভূম জেলার অন্যান্য স্থানেরই ভাষার অনুরূপ। আদিম অধিবাসীগণের মধ্যে অনেকে অদ্যাপি আপনাদের মধ্যে আদিম অনার্য্য ভাষায় কথাবার্তা কহিয়া থাকে।

 আদিম অধিবাসীগণের মধ্যে ভূমিজ জাতিই সর্ব্বপ্রধান। তাহারা আপনাদিগকে হিন্দু বলিয়া পরিচয় প্রদান করিয়া থাকে। তাহাদের মধ্যে অনেকে শূকর, কুক্কুটাদি হিন্দুর অখাদ্য ভোজন করিয়া থাকে। বন্যদেবতা বিশেষতঃ দুষ্টাত্মা মারাংবুরুর পূজা স্বহস্তে নির্ব্বাহ করিয়া থাকে। তাহারা বন্যদেবতার নিকট কুক্কুট বলিপ্রদান করে, এবং বিধবা বিবাহের অনুষ্ঠান দোষাবহ মনে করে না। ভূমিজদিগের মধ্যে কেহ কেহ উপবীত গ্রহণ করিয়াছে। পূর্ব্বদেশাগত বৈষ্ণব ও গোস্বামীগণ এই ভূমিজ জাতির গুরু। তাঁহারাই ভূমিজগণকে হিন্দুত্বের পথ দেখাইয়াছেন। হিন্দু-সমাজ সে জন্য এই বৈষ্ণব ও গোস্বামীগণের নিকট বহু পরিমাণে ঋণী। খ্রীষ্টীয় যাজকগণ বরাহভূমে কোন কৃতিত্ব দেখাইবার অবসর প্রাপ্ত হন নাই, এতদ্দেশে তাঁহাদের শুভাগমনের বহু পূর্ব্বাবধি বৈষ্ণব-ধর্ম্মপ্রচারকগণ এই ভূমিজগণের মধ্যে আপনাদের শিক্ষার আলোক প্রসারিত করিয়াছেন।


  1. Dalton's Descriptive Ethnology of Bengal P. 175.
  2. In the year A. D. 1798 when the Pachet estate was sold for arrears of revenue they rose and violently disturbed the peace of the Country till the sale was cancelled. Dalton p. 174.