বিষয়বস্তুতে চলুন

লাল সিংহ/ভূমিকা

উইকিসংকলন থেকে

ভূমিকা।

 অতি প্রাচীনকালে এদেশে সাহিত্য, দর্শন, গণিত, জ্যেতির্ব্বিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্র প্রভৃতি বিবিধ শাস্ত্রের সমধিক আলোচনা ছিল; এবং মনস্বী আর্য্য ঋষিগণ ঐ সকল বিদ্যায় বিশেষ প্রসিদ্ধিলাভ করিয়াছিলেন। ভারতীয় বিবিধ বিদ্যা অদ্যাপি জ্ঞানগরীরসী পাশ্চাত্যবিদ্যার জননী বলিয়া কীর্ত্তিত হইতেছে। পাশ্চাত্য সমাজে যে প্রণালীতে জাতীয় সভ্যতার ইতিহাস ও মনস্বীগণের জীবনচরিত রচিত হইয়া থাকে, এতদ্দেশে কিন্তু সে প্রণালীতে পুরাতত্ত্ব সঙ্কলনের কোন চেষ্টা কুত্রাপি পরিলক্ষিত হয় না। পাশ্চাত্য প্রণালীতে লিখিত ঐতিহাসিক গ্রন্থের অভাব সত্ত্বেও এতদ্দেশে আর্য্যজাতির সামাজিক সভ্যতার ইতিবৃত্তমূলক বিবিধ সাহিত্য গ্রন্থ বর্ত্তমান আছে। ঐ সকল গ্রন্থ দৃষ্টে প্রাচীন আর্য্যসমাজ ও চরিত্রের চিত্র সংগৃহীত হইয়াছে ও হইতেছে।

 আর্য্যগণ অপেক্ষাকৃত পরবর্ত্তী সময়ে ভারতবর্ষ অধিকার করিয়াছিলেন, ইহা অবিসম্বাদী ঐতিহাসিক তথ্য। সিন্ধু জাহ্ণবীগ্পূত আর্য্যদেশে আর্য্যগণের আগমনের বহু পূর্ব্বাবধি অনার্য্য জাতির বাস ছিল। যে সকল অর্দ্ধনগ্ন, বন্য প্রকৃতি কোল ভীল প্রভৃতি জাতির আকৃতি দৃষ্টে আমরা নাসিকাকুঞ্চন করিয়া থাকি, এই বিশাল দেশের তাহারাই আদিম অধিবাসী। লব্ধপ্রতিষ্ঠ ঐতিহাসিকগণের মতে আর্য্যগণের শুভাগমনের বহু পূর্ব্বে অনার্য্যগণ মধ্যএসিয়ার সমীপবর্ত্তী দেশ হইতে আসিয়া ভারতবর্ষে উপনিবেশ স্থাপন করিয়াছিল। হিংস্র জন্তুর কবল হইতে জঙ্গলাকীর্ণ ভূভাগ অধিকার করিয়া সেই স্থানে মানব জাতির অধিকার বিস্তার করা যদি গৌরবের কার্য্য হয়, তবে অনার্য্যগণ আর্য্যজাতির অপেক্ষা বহু অধিক পরিমাণে সেই গৌরবের অধিকারী।

 আর্য্য জাতির আদি গুরু মনুর মতে “স্থানুচ্ছেদস্য কেদারম্।” এই ঋষিবাক্য সত্য হইলে, সুজলা, সুফলা আর্য্যদেশ অনার্য্যগণের। আর্য্যগণ এদেশের প্রবাসী। “বীর ভোগ্যা নিত্য বসুন্ধরা” এই কবিবাক্যের সার্থকতা প্রতিপন্ন করিয়া আর্য্যগণ আদিম অধিবাসী অনার্য্যগণকে গহন কানন ও শ্বাপদসঙ্কুল পার্ব্বত্য দেশে নির্ব্বাসিত করিয়া এদেশে আত্মপ্রতিষ্ঠা স্থাপন করিয়াছিলেন।

 আর্য্যগণ তাঁহাদের রচিত গ্রন্থে সমকালবর্ত্তী অনার্য্য জাতি বা অনার্য্য সমাজের কোন সুনিপুণ চিত্র রক্ষা করেন নাই। ভারতের সীমায় পদার্পণ করিয়াই আর্য্যগণকে অনার্য্য জাতির সহিত ঘোরতর সংগ্রাম করিতে হইয়াছিল। সুদীর্ঘকাল ধরিয়া এই দুই জাতির মধ্যে ঘোরতর বিরোধ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলিয়াছিল। এই প্রকার জাতীয় কলহ উপলক্ষে উভয় জাতির মধ্যে পরস্পরের প্রতি হিংসা নিরতিশয় প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল। তাহার ফলে আর্য্য সাহিত্যে অনার্য্য জাতির চরিত্র নিরতিশয় কৃষ্ণবর্ণে চিত্রিত হইয়াছে। আর্য্য জাতির চিরঘৃণিত অসুর, রাক্ষস, বানর প্রভৃতি যে এই অনার্য্য জাতির মলিন চিত্র তদ্বিষয়ে মতদ্বৈধ নাই। অনার্য্যগণকে নিপীড়িত করা আর্য্যগণ ধর্ম্ম বলিয়া মনে করিতেন। এই প্রকার জাতীয় বিদ্বেষের ফলে যে অপরাধে আর্য্য জাতীয় অপরাধী সামান্য অর্থদণ্ডে অব্যাহতি লাভ করিত, সেই অপরাধে অনার্য্য অপরাধীর প্রতি শিরশ্ছেদ ও তুষানলের পর্য্যন্ত ব্যবস্থা বিহিত হইত। আর্য্যগণের এই প্রকার সাম্যবিরহিত কঠোর নীতি অদ্যাপি আর্য্য ব্যবহার শাস্ত্রের প্রতি পত্র কলঙ্কিত করিতেছে।

 আর্য্যগণ অনার্য্যগণকে হিংস্র জন্তুর ন্যায় বর্জ্জনীয় বলিয়া মনে করিতেন। শিক্ষা দান করিয়া ক্রমশঃ অনার্য্যগণের চরিত্র সম্মার্জিত করিবার কোন বিশেষ চেষ্টা আর্য্যগণ কখন করিয়াছিলেন বলিয়া মনে করিবার কারণ নাই। গভীর কাননে আর্য্যোচিত তপস্যানিরত অনার্য্যের শিরশ্ছেদ করিয়া রামচন্দ্র ধর্ম্ম-রাজ্য প্রতিষ্ঠার পথপ্রদর্শক হইয়াছিলেন। শিক্ষা দীক্ষায় অনার্য্যগণ কিসে উন্নত হইয়া ক্রমশঃ আর্য্য সমাজের একাঙ্গীভূত হইতে পারে, তদ্বিষয়ে মনোযোগী হইয়া সমাজ গঠনের প্রয়াস কোন আর্য নৃপতি কস্মিনকালে করেন নাই।

 পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে আর্য্য জাতির অনার্য্য দ্বেষ নিরাকৃত হইয়াছে। উদার নীতিমূলক পাশ্চাত্য শিক্ষা এদেশে প্রবর্ত্তিত হইবার পূর্ব্বাবধি বৌদ্ধ ও বৈষ্ণব ধর্ম্মের উদারনীতি অনার্য্যগণের প্রতি আর্য্য জাতির স্বাভাবিক বিদ্বেষ বহু পরিমাণে প্রশমিত করিয়াছিল। চৈতন্য প্রচারিত বৈষ্ণবধর্ম্ম স্বীয় সাম্যনীতি প্রণোদিত হইয়া অনার্য্যগণকে নিজ ক্রোড়ে স্থান দান করিয়াছিল। জাহ্নবী তীরে যে নীতির বিকাশে দিগন্ত মুখরিত করিয়া আনন্দময়ী-বাণী গাহিয়াছিল;—

“ও ভাই মেরেছিস্ তুই কলসীর কানা,
তাই বলে কি প্রেম দিব না।”

 সেই নীতির বশবর্ত্তী হইয়া বৈষ্ণব আচার্য্যগণ অবাধে অনার্য্য-সমাজে প্রবেশ করিয়া আর্য্যানার্য্যের চিরবিদ্রোহে সন্ধির শান্তিবারি বর্ষণ করিয়াছিলেন। এক্ষণে আর্য্য ও অনার্য্যের মধ্যে আর পূর্ব্বের ন্যায় বিরোধ বিদ্রোহ নাই। পাশ্চাত্য সাম্যনীতিমূলক শিক্ষা ও খ্রীষ্টীয় প্রচারকগণের অবিরাম চেষ্টা ক্রমশঃ উভয় জাতির হৃদয় সঞ্চিত যুগ-যুগান্ত-ব্যাপী বিদ্বেষ বহ্নির ভগ্নাবশেষ নির্ব্বাপিত করিতেছে।

 পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে এতদ্দেশে ইসিহাস ও জীবনচরিত রচনার স্রোত প্রবাহিত হইয়াছে। এই বঙ্গদেশে বহুসংখ্যক প্রতিভাশালী লেখক দেশের প্রাচীন ইতিহাস সংগ্রহের জন্য অবিরাম পরিশ্রম করিয়াছেন ও করিতেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় চিরনিগৃহীত অনার্য্যগণের সামাজিক ইতিহাস বিশ্লেষণের কোন উল্লেখযোগ্য প্রয়াস অদ্যাবধি হয় নাই বলিলেও চলে। পশ্চিমবঙ্গের অনার্য্যসমাজের ইতিহাস সংগ্রহকল্পে এতদ্দেশীয় যে সকল শ্রদ্ধেয় লেখক লেখনী ধারণ করিয়াছেন, তন্মধ্যে শ্রীযুক্ত বাবু শরৎচন্দ্র রায় সকলের অগ্রনী তদ্বিষয়ে বিন্দুমাত্র সংশয় নাই। বাবু শরৎচন্দ্র তাঁহার গভীর জ্ঞান, অকাতর পরিশ্রম ও নৈসর্গিক প্রতিভাবলে The Mundas and their Country নামক পুস্তক বঙ্গীয় সমাজকে উপহার দান করিয়াছেন। সে জন্য বঙ্গীয় শিক্ষিত সমাজ শরৎ বাবুর নিকট চিরঋণী। অনার্য্য ইতিহাস সংগ্রহে উদাসীন ভারতীয় শিক্ষিত সমাজের প্রতি লক্ষ্য করিয়া শরৎ বাবু প্রণীত গ্রন্থের ভূমিকায় খ্যাতনামা সিভিলিয়ান মিঃ ই, এ, গেট লিখিয়াছেন,—In this country which contains so many primitive tribes, possessing peculiar rights and customs of the greatest anthropological interest, it has long been a reproach to educated Indians that the task of collecting informations regarding them has been left almost entirely to Europeans. আশা করা যার শরৎ বাবুও তাঁহার পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া অপর প্রতিভাবান ঐতিহাসিক অদূর ভবিষ্যতে অনার্য্য ইতিহাসের চিরতিমিরাবৃত কন্দরে জ্ঞানের উজ্জ্বল আলোক বিতরণ করিয়া শিক্ষিত সমাজের কলঙ্ক অপনোদনে অগ্রসর হইবেন।

 আর্য্য সভ্যতার উজ্জ্বল আলোকে আমাদের নেত্র ঝলসিত হইয়াছে। সেই জন্য আমরা প্রথম দৃষ্টিতে অনার্য্য চরিত্রের শিক্ষণীয় বিষয় সকল আয়ত্ত করিতে পারি না। আর্য্যসমাজ শিক্ষা, দীক্ষা জ্ঞান ও সভ্যতার অনার্য্যসমাজ অপেক্ষা বহু অগ্রবর্ত্তী হইয়াছিল, সে জন্য আর্য্য চরিত্রে অত্যধিক অনুরাগ বশতঃ তাহার মোহে অনার্য্যসমাজকে বিস্মৃত হওয়া বিচিত্র নহে। কিন্তু ধীরচিত্তে অনার্য্য জাতি সম্বন্ধে আর্য্যসভ্যতামূলক কুসংস্কার পরিত্যাগ করিয়া অনার্য্যসমাজ ও অনার্য্য চরিত্রেের আলোচনা করিলে তাহাতে যে বহুতর শিক্ষণীয় বিষয় আছে, তাহা সহজেই উপলদ্ধি হইবে। যে জাতি যুগ যুগান্ত ধরিয়া প্রবল পরাক্রান্ত আর্য্যসমাজের সংঘর্ষে আত্মবিস্মৃত না হইয়া আপনার স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখিতে সমর্থ হইয়াছে, তাহাদের ইতিহাসে যে কোন শিক্ষণীয় বিষয় নাই, ইহা মনে করা একটি দারুণ ভ্রান্তি; বিশেষতঃ অনার্য্যসমাজের সম্পূর্ণ ইতিহাস সংগ্রহ ব্যতিরেকে এতদ্দেশীয় কোন ইতিহাস গ্রন্থ সম্পূর্ণ হইতে পারে না।

 পশ্চিমবঙ্গের অনার্য্য ইতিহাসের লোক বিস্মৃত একটি মাত্র পরিচ্ছেদ জনসমাজে প্রচার জন্য এই ক্ষুদ্র গ্রন্থ রচিত হইয়াছে। অনার্য্য ইতিহাস-সাগর মথিত হইলে এবম্বিধ বিবিধ জীবনী ও ঘটনাবলীর উদ্ধার এখনও অসম্ভব নহে। কালবিলম্বে বর্ত্তমান সময়ে পরিজ্ঞাত বহুতর ঘটনা বিস্মৃতিগর্ভে লীন হইবে এবং তাহাতে ভবিষ্যৎ ইতিহাসের অঙ্গহানি হওয়া অনিবার্য্য।