বিষয়বস্তুতে চলুন

লাল সিংহ/ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

(পৃ. ৪৫-৫০)

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

পূর্ব্ববর্ত্তী ঘটনা।

 লালসিংহের পূর্ব্বপুরুষগণ সকলেই বীর ছিলেন। তৎকালে জঙ্গলমহলের অধিবাসীগণ নিতান্ত অশিক্ষিত ছিল। সর্ব্বদা নিকটবর্ত্তী রাজ্যের সহিত যুদ্ধ ও যুদ্ধান্তে বিজিত-রাজ্য লুণ্ঠন তাহারা বিশেষ গৌরবজনক কার্য্য বলিয়া মনে করিত। সর্দ্দারগণের সহিত বরাহরাজের যে প্রকার সম্বন্ধ ছিল, তাহা ইতিপূর্ব্বে আলোচিত হইয়াছে। সতেরখানির সর্দ্দারগণ বরাহরাজের প্রাধান্য স্বীকার করিতেন সত্য, কিন্তু তাঁহারা সর্ব্ববিষয়ে রাজা কর্ত্তৃক চালিত বা নিয়ন্ত্রিত হইতেন না। সর্দ্দারগণ সুবিধানুসারে ভিন্ন ভিন্ন রাজ্য আক্রমণ ও লুণ্ঠন করিতেন; এবং সর্ব্ববিষয়ে তাঁহাদের যথেষ্ট স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীন শক্তিচালনার অবসর ছিল। রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে সর্দ্দারগণ বরাহরাজের অধীনে সমবেত হইতেন; এবং সৈন্য ও রসদ দ্বারা রাজার সাহায্য ও বলবৃদ্ধি করিতেন। পরন্তু নিজ নিজ অধিকারের মধ্যে সর্দ্দারগণ সর্ব্বময় কর্ত্তা ছিলেন। যে সকল যুদ্ধে সর্দ্দারগণ রাজার সহায়তা করিতেন, তাহাতেও সর্দ্দারগণ রাজার সহকারী বলিয়া বিবেচিত হইতেন। এইরূপ স্থলে রাজাকে অনেক সময়ে এই সর্দ্দারগণের মতামতের অপেক্ষা করিতে হইত। সর্দ্দার ও তাঁহার অধীনস্থ সৈন্যগণ চোয়াড় নামে অভিহিত হইত। রাজা, সর্দ্দার ও চোয়াড়গণের পরস্পর সম্বন্ধ এবং চোয়াড়সৈন্য গঠনের প্রণালী সময়ান্তরে সবিশেষ অলোচিত হইবে। সর্দ্দারগণ বরাহবাজের নেতৃত্ব স্বীকার করিলেও সময়ে সময়ে তাহারা রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা করিতে কুণ্ঠিত হইত না, এবং অনেক সময়ে বরাহরাজের রাজশক্তি সর্দ্দারগণের নিকট মস্তক অবনত করিত।

 লালসিংহের পিতা খ্রীষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে প্রাদুর্ভূত হইয়াছিলেন। তিনি একজন প্রবল পরাক্রান্ত সর্দ্দার ছিলেন। তিনি অনেক সময় আপন বিপুল চোয়াড়বাহিনী লইয়া সমীপবর্ত্তী শ্যামসুন্দরপুর, অম্বিকানগর, সুপুর, ধলভূম, এমন কি বরাহভূম রাজ্য পর্য্যন্ত আক্রমণ ও লুণ্ঠন করিতেন। তাঁহার উপদ্রবে উপদ্রুত হইয়া উপরোক্ত রাজ্যের অধিপতিগণ নিরতিশয় অস্থির হইয়া উঠিয়াছিলেন। রাজাগণ একে একে ত্রিভন সিংহের সহিত বাহুবল পরীক্ষা করিয়া পরাস্ত হইলেন। শেষে ত্রিভন সিংহের উৎপাতে তাঁহাদের বাস করা দায় হইয়া উঠিল। উৎপীড়িত রাজাগণ ত্রিভন সিংহের উপদ্রবে নিরতিশয় পীড়িত হইয়া শেষে সকলে একত্রিত হইয়া ত্রিভন সিংহকে দমন করিবার জন্য দলবদ্ধ হইলেন। ত্রিভন সিংহ বরাহরাজের অধীন জনৈক করসর্দ্দার; সুতরাং তাঁহার আচরণে বরাহরাজের মর্ম্মবেদনা সমধিক তীব্র হইয়া উঠিল। যাবতীয় শক্তি সমবেত করিয়া ত্রিভন সিংহকে দমন করিবার জন্য বরাহরাজ অন্য রাজাগণের অগ্রণী হইলেন। এই সময়ে বঙ্গের মুসলমান শক্তি নির্ব্বাপিতপ্রায় হইয়াছিল এবং ইংরাজ শক্তি তখনও সমধিক আত্মপ্রতিভা বিকাশ করিতে সমর্থ হয় নাই। এই অবস্থায় খ্রীষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্দ্ধে ত্রিভন সিংহের সহিত বরাহরাজ প্রমুখ:রাজাগণের দীর্ঘকালব্যাপী যুদ্ধ হইয়াছিল। এই সময়ে সম্ভবতঃ বিবেকনারায়ণ বরাহভূমের রাজা ছিলেন। রাজা বিবেকনারায়ণ খ্রীষ্টীয় ১৭৭৫ খৃষ্টাব্দে রাজ্যচ্যুত হইয়াছিলেন; এবং তাঁহার অপ্রাপ্তবয়স্ক পুত্র রঘুনাথনারায়ণ সিংহ তাঁহার হলে রাজ্যাধিকার করিয়াছিলেন। স্থানান্তরে সে সম্বন্ধে বিস্তৃত আলোচনার প্রয়োজন হইবে। ত্রিভন সিংহের সহিত যুদ্ধে বালক রঘুনাথের নেতৃত্ব গ্রহণ করা অবস্থানুসারে অসম্ভব। বিবেকনারায়ণ বিশেষ বলশালী বীর ছিলেন। তাঁহার ন্যায় ব্যক্তির নেতৃত্বে রাজন্যবৃন্দ চালিত হওয়া অসম্ভব নহে। রাজা বিবেকনারায়ণের শাসনকাল ও ত্রিভন সিংহের প্রাদুর্ভাবকাল অন্য় হিসাবে ঠিক সমকালবর্ত্তী বলিয়া মনে হয়। খ্রীষ্টীয় ঊনবিংশ শতাব্দীর অব্যবহিত পূর্ব্বে লালসিংহ আপনার বীরত্বে ও প্রতাপে সবিশেষ প্রতিষ্ঠালাভ করিয়াছিলেন। বিশেষতঃ ত্রিভন সিংহের মৃত্যুকালে লালসিংহ নিতান্ত শিশু ছিলেন। ত্রিভন সিংহের যুদ্ধকাল খ্রীষ্টীয় উনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভের ৩০শে হইতে ৪০ বৎসর পূর্ব্বে হওয়া অবস্থানুসারে সম্ভব। তাহা হইলে সেই সময়ে বিবেকনারায়ণ বরাহুভূমের রাজা ছিলেন।

 রাজা বিবেকনারায়ণের নেতৃত্বে ধলভূম, অম্বিকানগর, সুপুর ও শামসুন্দরপুরের রাজা সতেরখানি আক্রমণ করিলেন। সতেরখানির প্রান্তভাগে দীর্ঘকাল ধরিয়া ত্রিভন সিংহের সহিত সমবেত রাজন্যবর্গের যুদ্ধ হইল। অসহায় ত্রিভন সিংহ দীর্ঘকালব্যাপী যুদ্ধে ক্রমশঃ হতবল হইতে লাগিলেন। শেষে ত্রিভন সিংহ সম্মুখসমরে জয়ের আশা পরিত্যাগ করিয়া খণ্ডযুদ্ধ আরম্ভ করিলেন। মারাঠাগণের ন্যায় চোয়াড়গণ খণ্ডযুদ্ধে বিশেষ নিপুণ ছিল। একা ত্রিভন সিংহ সুদীর্ঘকাল এইভাবে যুদ্ধ করিয়া পরিশেষে নিজ বাটালুকার গড়ে আশ্রয় লইলেন। সমবেত রাজাগণ এখানেও তাঁহার অনুসরণ করিলেন। বাটালুকার প্রান্তভাগে কাটারঞ্জা পর্ব্বতের তলদেশে উভয় পক্ষের এক ঘোরতর যুদ্ধ হইল। সেই যুদ্ধে ত্রিভন সিংহের পরাজয় হইল। কিন্তু বীরহৃদয় ত্রিভন সিংহ শত্রুকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিলেন না। মৃত্যু অবধারিত জানিয়াও ত্রিভন সিংহ অমিত পরাক্রমে সম্মুখসমরে লিপ্ত রহিলেন। অবশেষে ক্রমশঃ তাঁহার সৈন্যবল ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত ও অনেকে হত হইল। দিবা অবসানকালে ত্রিভন সিংহ সন্মুখ সমরে শত্রুগণের হস্তে নিহত হইলেন। ত্রিভন সিংহের মৃত্যু ঘটিলে, যুদ্ধ পরিসমাপ্ত হইল।


 তৎকালে যুদ্ধান্তে বিজয়ী বীরগণ শত্রুরাজ্য লুণ্ঠন করিয়া অত্যাচারের একশেষ করিতেন। সমবেত রাজন্য়গণ পূর্ব্বাচরিত রণ-নীতির অনুসরণ করিয়া সতেরখানি রাজ্য লুণ্ঠন ও সেখানে অত্যাচারের একশেষ করিলেন। বাটালুকা দুর্গ লুণ্ঠিত ও ভূপ্রোথিত হইল। ত্রিভন্ সিংহের পত্নী স্বামীর মৃত্যু সংবাদ ও শত্রুগণের দুর্গাক্রমণের সংবাদ অবগত হইয়া বৃথা শোকে মুহ্যমান হইলেন না। তিনি বীরপত্নী ও বীরের জননী ছিলেন। শত্রুর করে আত্মসমর্পণ করা তিনি সমীচীন বলিয়া স্থির করিলেন না। তৎকালীন রাজারা যে প্রকার অত্যাচারপ্রিয় ও বর্বরপ্রকৃতি ছিলেন, তাহাতে হয়ত তাঁহাদের হস্তে আত্মসর্পন করিলেও তাঁহার জীবনের একমাত্র সম্বল শিশুপুত্র লালসিংহের জীবনান্ত ঘটিত। অতঃপর আমরা রাজাগণের যে সকল অত্যাচার কাহিনী লিপিবদ্ধ করিব তদ্দৃষ্টে এ প্রকার অনুমান করা অসঙ্গত নহে। ত্রিভন সিংহের পত্নী এক হস্তে সীমন্তের সিন্দুর মুছিতে মুছিতে ও অন্য হস্তে শিশুপুত্র লালসিংহকে ক্রোড়ে লইয়া রজনীর অন্ধকারে আত্মগোপন করতঃ দুর্গ ত্যাগ করিয়া পলায়ন করিলেন। জনৈকা বালিকাভৃত্যা এই বিপৎকালেও সর্দ্দার রমণীকে পরিত্যাগ করে নাই। সে তাঁহার অনুগামিনী হইয়াছিল। বর্ত্তমান সময়ে জীবিত কোন কোন লোক ঐ ভৃত্যাকে দেখিয়াছিলেন। ঐ সকল লোক ভৃত্যার নিকট যে প্রকার বিবরণ শুনিয়াছিলেন,, তাহার এবং সতেরখানির সাধারণ জনশ্রুতিমূলে এই পরিচ্ছেদ রচিত হইয়াছে। শতাধিক বৎসর পূর্ব্বের ঘটনা সংগ্রহ করিতে হইলে জনশ্রুতিকে একেবারে বাদ দেওয়া যায় না। সুতরাং “নহ্যমূলা জনশ্রুতি” এই প্রাচীন বাক্যের উপর নির্ভর করিয়া ইতিহাসের এই পরিচ্ছেদ রচিত হইয়াছে।

 যুদ্ধান্তে বাটালুকা গ্রাম, কিতাগড় এবং সতেরখানির অন্যান্য স্থান লুণ্ঠিত হইল। লুণ্ঠিত দ্রব্যনিচয় বিজয়গৌরবের নিদর্শন স্বরূপ বিজয়ী রাজারা আপনাদের মধ্যে বিভাগ করিয়া লইলেন। লুণ্ঠিত বস্তু সকলের মধ্যে সিংহপরিবারের প্রাচীন কুলদেবতা শ্রীশ্রী৺কালাচাঁদ জিউ বিগ্রহ অংশবণ্টনে সুপুরের রাজার অংশে পড়িয়াছিল। কালাচাঁদজিউ অদ্যাবধি সুপুর রাজবংশের কুলদেবতা হইয়া বাঁকুড়া জেলার প্রান্তে রহিয়াছেন।

 যুদ্ধান্তে শত্রু-রাজ্য লুণ্ঠন করিয়া বিজয়ী রাজারা ত্রিভন্‌ সিংহের একমাত্র বংশধরের অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। কিন্তু শিশু বা তাহার জননীর কোন উদ্দেশ মিলিল না। বিশ্বস্ত প্রকৃতিপুঞ্জ লালসিংহকে ধরাইয়া দিবার কোন চেষ্টা করিল না। তখন বিজয়ী রাজারা মহাক্রোধে সতেরখানির প্রজাগণের উপর অত্যাচারের একশেষ করিতে লাগিলেন। সতেরখানি তরফের প্রজাগণের যাবতীয় গো, মেষ, মহিষ, শূকরাদি গৃহপালিত জন্তু বাটালুকাতে নীত হইল; এবং সেখানে গর্ব্বোদ্ধত, পশুপ্রকৃতি রাজাগণ ও তাহাদের অনুচরবর্গ ‘বচ্ছি’ বা বল্লমের আঘাতে খোঁচাইয়া ঐ সকল পশুকে নিহত করিল। বাটালুকা গ্রামের প্রান্তভাগে যে উন্নত ভূমিখণ্ডের উপর রাজাগণ ঐ সকল গৃহপালিত পশুকে নৃশংসভাবে হত্যা করিয়াছিলেন ঐ স্থান অদ্যাপি ঐ নৃশংসতার স্মরণচিহ্নস্বরূপ ‘বচ্ছিগাদা’ নামে অভিহিত হইয়া থাকে। অদ্যাপি লোকের কুসংস্কার আছে যে ঐ বচ্ছিগাদার উপর কাহাকেও যাইতে নাই।