লাল সিংহ/সপ্তম পরিচ্ছেদ
সপ্তম পরিচ্ছেদ।
বাল্যজীবন।
কোন সালে লালসিংহ ভূমিষ্ঠ হইয়াছিলেন, কিম্বা কোন সালে তাঁহার লোকান্তর হয়, তাহার ধারাবাহিক বিবরণ সংগ্রহ করা অসম্ভব। সদ্য-বৈধব্য-পীড়িতা বীর-জননীর অঙ্কারূঢ় শিশু লালসিংহের পুর্ব্ববর্ত্তী তদীয় জীবনের কোন চিত্র আমরা সংগ্রহ করিতে পারি নাই। নিয়তমুখরা জনশ্রুতিও এস্থলে নীরব। কল্পনার আশ্রয়ে লালসিংহের জীবনীর সেই অঙ্ক উদ্ঘাটন করিবার নিরর্থক চেষ্টা আমরা করিব না। শত্রুর হস্তে পিতৃরক্তপাতের দারুণ সন্তাপ ও তদীয় জীবন রক্ষার্থ বীর-জননীর সাগ্রহ আকুলতা; লালসিংহের জীবনীর এই প্রথম শিক্ষা ব্যতীত তৎপূর্ব্ববর্ত্তী অন্য শিক্ষার কথা আমরা অবগত হইতে পারি নাই। লালসিংহের জননী যদি স্বামী-নিধন সংবাদে “অশ্রুজলৈর্ধরাতলমভিষিঞ্চন্” রোদন করিতেন, তাহা হইলে হয় ত শিশুও জননীর অঞ্চল ধরিয়া রোদন করিয়া হৃদয়ের সন্তাপভার কথঞ্চিৎ নিরাকৃত করিত; কিন্তু সে প্রকারে অশ্রুজলে হৃদয়ের সন্তাপ অপসারিত করিবার অবসর তাঁহারা প্রাপ্ত হয়েন নাই।
ত্রিভন সিংহের মৃত্যু-সংবাদ গড়ে পৌঁছিবার পরক্ষণেই বিজয়োন্মত্ত পিশাচ প্রকৃতি শত্রু-সৈন্যের দারুণ কোলাহল গড়ের দ্বারে পৌছিল। আর লালসিংহের জননী অপত্যস্নেহ ও কর্ত্তব্যবুদ্ধির প্রতিমূর্ত্তি স্বরূপে দুর্গের পশ্চাদ্বার দিয়া তাঁহাকে ক্রোড়ে লইয়া রজনীর অন্ধকারে ব্যাঘ্র-ভল্লুক-সমাকুল, জঙ্গলাকীর্ণ, দুর্গম পর্ব্বতপথে অন্তর্হিত হইলেন। পর্ব্বতের উপর হইতে সমস্ত রাত্রি নিম্নে বিজয়োন্মত্ত শত্রুগণের ভৈরবনিনাদ তাঁহাদের কর্ণে প্রবেশ করিয়া প্রতিক্ষণে তাঁহাদিগকে আকুল করিয়া তুলিতে লাগিল। বীরপত্নী ও বীর-জননীর তৎকালীন মানসিক অবস্থা বর্ণনা করা সাধ্যায়ত্ত নহে। এইরূপ অবস্থায় মহাকবি হেমচন্দ্র লিখিয়াছেন,
“পতি যোদ্ধা যার, তাহার অন্তরে
কত যে সতত ভয়;
জানে সে ক’জন, ভাবে সে ক’জন,
বীরপত্নী কিসে হয়?”
লালসিংহের জননী রমণীর সারধন বীর-স্বামীর মৃত্যুতে তাঁহার কর্ত্তব্যের কঠোরতা সমধিক হৃদয়ঙ্গম করিলেন। তাঁহারা সমস্ত রাত্রি বিজন অরণ্যে পার্ব্বত্যপথ অতিক্রম করিয়া দিবাভাগে কখন লতাগুল্ম-পরিবৃত, গভীর অরণ্যে, কখন বা নির্জন গিরিগুহায় অবস্থান করিতেন। এই প্রকারে, বন্যফলমূলে দেহরক্ষা করিয়া তাঁহারা কয়েক দিন অতিবাহিত করিলেন। প্রবাদ আছে যে কয়েক দিবস পরে কয়েকজন বন্যলোক তাঁহাদিগের সন্ধান অবগত হইরা তাঁহাদিগকে একস্থান হইতে স্থানান্তরে লুক্কায়িত রাখিত; এবং আপনারা অক্লান্ত পরিশ্রমে দিবারাত্রি তীর ও বল্লম হস্তে সদার-রমণী ও তাঁহার শিশুসন্তানের রক্ষার জন্য বদ্ধপরিকর থাকিত সতেরখানির এই সকল বিশ্বস্ত প্রকৃতিপুঞ্জ শত্রুগণ কর্ত্তৃত হৃতসর্ব্বস্ব হইয়াও শত্রুগণকে সর্দ্দার-রমণীর, কি শিশু লাল সিংহের সন্ধান বলিয়া দেয় নাই। বীর অনার্য্য জাতির মধ্যে এবম্প্রকার প্রভুভক্তি নিতান্ত সুলভ।
বিজয়ী রাজাগণ কয়েক দিন ধরিয়া সতেরখানি লুণ্ঠন ও ত্রিভন সিংহের একমাত্র বংশধরের অনুসন্ধান করিয়া স্ব স্ব রাজ্যে প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। তখন লালসিংহের জননী শিশুপুত্রকে লইয়া পর্ব্বতশিখর হইতে সতেরখানির অন্তর্গত সারিগ্রামে অবতীর্ণ হইলেন। ক্রমশঃ সতেরখানির বিশ্বস্ত ও পৃষ্ঠপোষক প্রকৃতিপুঞ্জ লালসিংহের নিরাপদের বৃত্তান্ত অবগত হইয়া তাঁহার দর্শনকামনায় সারিগ্রামে সমবেত হইল; এবং তাহারা শিশুকে আপনাদের সর্দ্দারপদে বরণ করিয়া তাঁহাকে গদিতে অভিষিক্ত করিল।
সতেরখানির তৎকালীন অধিবাসী অধিকাংশ প্রজাই ভূমিজ, সাঁওতাল ও অন্য জাতীয় মুণ্ডা ছিল। তাহারা সকলেই দুর্দ্ধর্ষ, যুদ্ধপ্রিয় ও বলশালী ছিল। যে সকল ব্যাঘ্র-ভল্লুকের সহিত নিয়ত সংগ্রাম করিয়া তাহারা আত্মরক্ষা করিত; শিক্ষা, চরিত্র ও ব্যবহারে তাহারা ঐ সকল বন্যপশুর সহিত তুলনীয় হইবার অযোগ্য ছিল না। বিশেষতঃ তৎকালে সতেরখানি বহির্শত্রুর উপদ্রবে নিরতিশয় উপদ্রুত ছিল। তথাপি প্রকৃতিপুঞ্জ কি জন্য সেই শিশুকে রাজা বলিয়া মানিয়া লইল, তাহা নির্ণয় করা সুকঠিন। বীর জাতির মধ্যে রাজ-ভক্তির দৃষ্টান্ত নিতান্ত সুলভ। সেই রাজ-ভক্তিতে প্রণোদিত হইয়া বন্যগণ হৃতসর্ব্বস্ব হইয়াও পলায়মান সর্দ্দার-পত্নী ও সর্দ্দার-শিশুর রক্ষণে আত্মনিয়োগ করিয়াছিল। বিশেষতঃ খুঁটের প্রধানকে মুণ্ডা ও সাঁওতালগণ দেবতার নিম্নেই আসন প্রদান করিয়া থাকে। যে খাঁড়েপাথরের নেতৃত্বে তাহাদের পূর্ব্বপুরুষগণ সতেরখানিতে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠালাভ করিতে সমর্থ হইয়াছিল, যে ত্রিভন সিংহের নেতৃত্বে তাহারা বহুযুদ্ধে জয়লাভ করিয়া আপনাদের বাহুবলে নিকটবর্ত্তী রাজন্যগণকে বিব্রত ও সন্ত্রস্ত করিয়াছিল, শিশু লালসিংহ সেই বংশের একমাত্র বংশধর। সুতরাং তাহাদের গৌরবান্বিত সর্দ্দারবংশের প্রতি স্বাভাবিক শ্রদ্ধা ও অনুরাগ তাহাদিগকে এই কার্য্যে নিয়ন্ত্রিত করিয়াছিল।
লালসিংহ আজীবন সারিগ্রামে বাস করিয়াছিলেন। সারিগ্রামের চারিদিকে পর্ব্বতমালা অভেদ্য প্রাচীরের ন্যায় মস্তক উন্নত করিয়া আছে। দুর্গম পর্ব্বতমালা উর্ত্তীর্ণ না হইলে কোন দিক দিয়া গ্রামে প্রবেশের পথ নাই। চারিদিকে পর্ব্বতমালা ও তাহার উপত্যকাভূমি নিবিড় জঙ্গলে সমাকীর্ণ। আমরা যে সময়ের বৃত্তান্ত বর্ণনা করিতেছি, তৎকালে এই সকল পর্ব্বত ও জঙ্গলে ব্যাঘ্র, ভল্লুক ও বন্যহস্তী অবাধে বিচরণ করিত। ময়ুর, শুক প্রভৃতি বন্যপক্ষী এই সকল স্থানে অদ্যাবধি দৃষ্ট হইয়া থাকে। প্রকৃতির কমনীয় শোভা ও ভীষণ বিপদসঙ্কুলতা, এই উভয়ের সংমিশ্রণ এইস্থানে যে প্রকার দৃষ্ট হইয়া থাকে, অন্যত্র সেরূপ বিরল। এই অনধিগম্য কঙ্করময় ভূখণ্ডে লালসিংহের বাল্যজীবন অতিবাহিত হইয়াছিল। প্রকৃতির সহিত নিয়ত সংগ্রামে মানব চরিত্রের যে স্বাভাবিক দৃঢ়তা জন্মে, লালসিংহের তাহাই হইয়াছিল।
এই সকল দুর্গম, হিংস্রজন্তুপূর্ণ ভূভাগে অষ্টমবর্ষীয় কৃষক-বালক গোচারণে যাইতে হইলে তীর-ধনুক ও বল্লম প্রভৃতি অস্ত্র লইয়া গৃহের বাহির হয়; এবং দৈবক্রমে হিংস্রজন্তুর সম্মুখীন হইলে পশ্চাৎপদ না হইয়া করস্থ অস্ত্রের সাহায্যে সোৎসাহে যুদ্ধে অগ্রসর হইয়া থাকে। স্বভাবের প্রয়োজন অনুসারে মানবচরিত্র গঠিত ও পরিপুষ্ট হইয়া থাকে। সহরবাসী বালক দিবসে শশুশালায় পিঞ্জরাবদ্ধ ব্যাঘ্র দেখিয়া আসিলে, রাত্রিতে নিদ্রাবেশে ‘বাঘের স্বপ্ন’ দেখিয়া ভয়ে বিহ্বল হয়। আর এই সকল আরণ্যপ্রদেশে রাখালবালকগণ দলবদ্ধ হইয়া তীর হস্তে শব্দ লক্ষ্য করিয়া ব্যাঘ্রের অন্বেষণ করিয়া থাকে। এতদ্দেশীয় মুণ্ডা জাতির অপর শাখা হোবংশীয় বালকগণের বাল্যশিক্ষা, ধনুর্ব্বিদ্যা-নৈপুণ্য এবং বয়স্কব্যক্তিগণের আচরিত ক্রীড়া ব্যায়ামাদি সম্বন্ধে মি: ডাল্টন বলেন,—
“Hos are fair marksmen with the bow and arrow, and great sportsmen. From childhood they practise archory. Every lad tending cattle or watching crops makes this his sole pastime, and skill is attained even in knocking over small birds with blunt arrows.”
Dalton, p. 195.
অর্থাৎ “হো জাতীয় মুণ্ডাগণ তীর-ধনুক দ্বারা সুন্দর লক্ষ্যভেদে সমর্থ, এবং তাহারা সুনিপুণ শিকারী। বাল্যকাল হইতে তাহারা তীরচালনা শিক্ষা করে। প্রত্যেক বালক গরু চরাইবার কি শস্যরক্ষা করিবার সময় তীর-ধনুক লইয়া বাহির হয়, এবং অবসরকাল তীর চালনায় অতিবাহিত করে। ইহাই তাহাদের প্রধান ক্রীড়া। তাহারা ফলক-বর্জ্জিত তীর দ্বারা পক্ষী স্বীকার করিয়া থাকে।” হোগণের সহিত ভূমিজগণের ক্রীড়া, ব্যায়াম ও তীরচালনা-নৈপুণ্য সম্বন্ধে কোন পার্থক্য নাই। হোদিগের সম্বন্ধে সাহেবের সিদ্ধান্ত ভূমিজগণের সন্বন্ধেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
লালসিংহ বাল্যকালে এই সকল কৃষকবালকগণের সহিত পর্ব্বত ও অরণ্যে বিচরণ করিতেন। ধনুর্ব্বিদ্যা ও বীরোচিত অন্যান্য কার্য্যের শিক্ষাই তাঁহার জীবনের প্রধান শিক্ষা। তিনি সারিগ্রামের সন্নিহিত পর্ব্বত ও জঙ্গলে সমবয়স্ক রাখাল বালকগণের সহিত তীর চালনা ও মৃগয়া করিয়া বেড়াইতেন। লালসিংহ স্বভাবের ক্রোড়ে সমবয়স্ক কৃষকবালকগণের সহিত দুর্গম পর্ব্বত ও অরণ্যে মৃগরাচারী হইয়া যে শিক্ষা ও সংস্কার লাভ করিয়াছিলেন, তাহাই তাঁহার ভবিষ্যৎজীবনে পরিস্ফুট হইয়াছিল। স্নেহময়ী বীরজননীর ক্রোড়ে প্রতিপালিত হইয়া তাঁহার চরিত্রে বংশগত বীরত্বাভিমান ও বিজয়স্পৃহা প্রবুদ্ধ হইয়াছিল। বিপন্নের রক্ষা ও শত্রুর সহিত সংগ্রাম তাঁহার জীবনের ব্রত হইয়াছিল।
লালসিংহের জননী অতিশর বুদ্ধিমতী ছিলেন। লালসিংহের শৈশবকালে তিনি রাজত্বের তত্ত্বাবধারণ, দুর্ব্বৃত্তের দমন ও আশ্রিতের পালনকার্য্য দৃঢ়তা সহকারে সম্পন্ন করিতেন। তাঁহার বুদ্ধিকৌশলে ও পালন গুণে সর্দ্দারবংশের প্রতি প্রকৃতিপুঞ্জের স্বাভাবিক অনুরাগ অক্ষুণ্ণ ছিল। লালসিংহ বাল্যকালে জননীর নিকট সমবেতরাজশক্তির নিকট জনকের পরাজয় ও হত্যার বিবরণ শুনিতেন, এবং বাহুবলে আত্মপ্রতিষ্ঠা ও পিতৃঘাতীগণের দণ্ডবিধান জন্য সংকল্প করিতেন। তাঁহার বাল্যকালীন আশা কতদূর ফলবতী হইয়াছিল তাহা ক্রমশঃ বিবৃত হইবে।
বাল্যকাল হইতে লালসিংহ মৃগয়াপ্রিয় ও অস্ত্রচালনায় নিপুণ হইয়াছিলেন। বয়োবৃদ্ধি সহকারে তাঁহার চরিত্রে সাহস, কর্ত্তব্যনিষ্ঠা, সমরকুশলতা এবং অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ক্রমশঃ পরিস্ফুট হইয়াছিল। তাঁহার বীরজননীর আদর্শচরিত্র তাঁহার হৃদয়ে প্রতিবিম্বিত হইয়াছিল। দেড় শতাধিক বৎসর পূর্ব্বে তাঁহার জননীর ন্যায় কর্তব্যনিষ্ঠাসম্পন্না, ধীমতি অনার্য্য রমণী এদেশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, ইহা বর্ত্তমান যুগের পাঠকগণের নিকট বিস্ময়কর বলিয়া অনুমিত হইতে পারে। কিন্তু এই মুণ্ডা রমণীগণের প্রতি শ্রদ্ধা সহকারে তাহাদের সগ্দুণাবলীর আলোচনা করিলে, তাহাদের মধ্যে এবপ্রকার নারী চরিত্রের আরও অনেক আদর্শ মিলিবে।