লিপিকা/নতুন পুতুল

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

নতুন পুতুল > এই গুণী কেবল পুতুল তৈরি করত ; সে পুতুল রাজবাড়ির মেয়েদের খেলার জন্তে । বছরে বছরে রাজবাড়ির আঙিনায় পুতুলের মেল। বসে। সেই মেলায় সকল কারিগরই এই গুণীকে প্রধান মান দিয়ে এসেচে । যখন তার বয়স হল প্রায় চার কুড়ি, এমন সময় মেলায় এক নতুন কারিগর এল । তার নাম কিষণলাল, বয়স তার নবীন, নতুন তার কায়দা । যে-পুতুল সে গড়ে তার কিছু গড়ে কিছু গড়ে না, কিছু রং দেয় কিছু বাকি রাখে। মনে হয় পুতুলগুলো ষেন ফুরোয় নি, যেন কোনোকালে ফুরিয়ে যাবে না । নবীনের দল বললে, “লোকটী সাহস দেখিয়েচে ।” প্রবীণের দল বললে, “একে বলে সাহস ? এ ত সপদ্ধ।” × • 8 লিপিকা কিন্তু নতুন কালের নতুন দাবী । একালের রাজকন্যারা বলে, “আমাদের এই পুতুল চাই।” সাবেককালের অনুচরেরা বলে, “আরে ছিঃ ।” শুনে তাদের জেদ বেড়ে যায়। বুড়োর দোকানে এবার ভিড় নেই। তার বাকাভরা পুতুল যেন খেয়ার অপেক্ষায় ঘাটের লোকের মত ওপারের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। এক বছর যায়, দু’বছর যায়, বুড়োর নাম সবাই ভুলেই গেল। কিষণলাল হল রাজবাড়ির পুতুল-হাটের সর্দার। বুড়োর মন ভাঙল, বুড়োর দিনও চলে না । শেষকালে তার মেয়ে এসে তাকে বললে, “তুমি আমার বাড়িতে এস।” জামাই বললে, “খাও দাও, আরাম কর, আর সবজির ক্ষেত থেকে গোরু বাছুর খেদিয়ে রাখ।” বুড়োর মেয়ে থাকে অষ্টপ্রহর ঘরকরনার কাজে । তার জামাই গড়ে মাটির প্রদীপ, আর নেীকে বোঝাই করে সহরে নিয়ে যায়। নতুন কাল এসেচে সে কথা বুড়ো বোঝে না, নতুন পুতুল Q (t তেমনিই সে বোঝে না যে তার নাৎনীর বয়স হয়েছে ষোলো । যেখানে গাছতলায় বসে বুড়ে ক্ষেত আগলায় আর ক্ষণে ক্ষণে ঘুমে ঢুলে পড়ে সেখানে নাৎনী গিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরে, বুড়োর বুকের হাড়গুলো পৰ্য্যন্ত খুসি হয়ে ওঠে। সে বলে, “কি দাদী, কি চাই ?” । নাৎনী বলে, “আমাকে পুতুল গড়িয়ে দাও, আমি খেলব।” বুড়ে বলে, “আরে ভাই, আমার পুতুল তোর পছন্দ হবে কেন ?” , নাৎনী বলে, “তোমার চেয়ে ভাল পুতুল কে গড়ে শুনি ?” বুড়ে বলে, “কেন, কিষণলাল !” নাৎনী বলে, “ইস্ ! কিষণলালের সাধ্যি ” দুজনের এই কথা-কাটাকাটি কতবার হয়েচে । বারে বারে একই কথা ! i তারপরে বুড়ে তার ঝুলি থেকে মাল-মসলা বের করে—চোখে মস্ত গোল চষমাট আঁটে। নাৎনীকে বলে, “কিন্তু দাদী, ভুট্টা যে কাকে খেয়ে যাবে ” নাৎনী বলে, “দাদা আমি কাক তাড়াব।” বেলা বয়ে যায় ; দূরে ইদারা থেকে বলদে জল ుeta জিপিক। টানে তার শব্দ আসে ; নাৎসী কাক তাড়ায় ; বুড়ে বসে বসে পুতুল গড়ে । বুড়োর সকলের চেয়ে ভয় তার মেয়েকে। সেই গিন্নির শাসন বড় কড়া, তার সংসারে সবাই থাকে সাবধানে । , বুড়ে আজ একমনে পুতুল গড়তে বসেচে, হুস হল না, পিছন থেকে তার মেয়ে ঘন ঘন হাত ফুলিয়ে আসচে। কাছে এসে যখন সে ডাক দিলে তখন চৰ্যমাট চোখ থেকে খুলে নিয়ে অবোধ ছেলের মত তাকিয়ে রইল। মেয়ে বললে, “তুধ দোয় পড়ে থাক, আর তুমি সুভদ্রাকে নিয়ে বেলা বইয়ে দাও ! অত বড় মেয়ে, ওর কি পুতুল খেলার বয়স ” । বুড়ো তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “স্থভদ্রা খেলবে কেন ? এ পুতুল রাজবাড়িতে বেচুব। আমার দাদীর যেদিন বর আসবে সেদিন ত ওর গলায় মোহরের মালা পরাতে হবে। আমি তাই টাকা জমাতে চাই ।” মেয়ে বিরক্ত হয়ে বললে, “রাজবাড়িতে এ পুতুল কিনবে কে ?” নতুন পুতুল ه به বুড়োর মাথা হেঁট হয়ে গেল। চুপ করে বসে রইল। স্বভদ্রা মাথা নেড়ে বললে, "দাদার পুতুল রাজবাড়িতে কেমন না কেনে দেখৰ ” । ছুদিন পরে স্বভদ্রা এক কাহন সোনা এনে মাকে বললে, “এই নাও আমার দাদার পুতুলের দাম।” মা বললে, “কোথায় পেলি ?” মেয়ে বললে, “রাজপুরীতে গিয়ে বেচে এসেচি।” বুড়ে হাস্তে হাসতে বললে, “দাদী, তৰু ত তোর দাদা এখন চোখে ভাল দেখে না, তার হাত কেঁপে যায় ।” মা খুসি হয়ে বললে, “এমন ষোলোটা মোহর হলেই ত সুভদ্রার গলার হার হবে।” ৰুড়ে বললে, “তার অার ভাবনা কি ?” স্থম্ভজা বুড়োর গলা জড়িয়ে ধরে বললে, “দাদাভাই, আমার বরের জন্তে ত ভাবনা নেই।” বুড়ে হাসতে লাগল, আর চোখ থেকে একফোট৷ জল মুছে ফেললে। বুড়োর যৌবন যেন ফিরে এল। সে গাছের তলায় বসে পুতুল গড়ে আর সুভদ্রা কাক তাড়ায়, আর দূরে ইদারায় বলদে র্ক্যা-র্কে করে জল টানে। একে একে ষোলোটা মোহর গাথা হল, হার পূর্ণ হয়ে উঠল। মা বললে, “এখন বর এলেই হয়।” সুভদ্র বুড়োর কানে কানে বললে, “দাদাভাই, বর ঠিক আছে।” দাদা বললে, “বল ত দাদী, কোথায় পেলি বর।” সুভদ্রা বললে, “যেদিন রাজপুরীতে গেলেম, দ্বারী বললে কি চাও ? আমি বললেম, রাজকন্যাদের কাছে পুতুল বেচুতে চাই। সে বললে, এ পুতুল এখনকার দিনে চলবে না,—বলে’ আমাকে ফিরিয়ে দিলে। একজন মানুষ আমার কান্না দেখে বললে, দাও ত, ঐ পুতুলের একটু সাজ ফিরিয়ে দিই, বিক্রি হয়ে যাবে। সেই মানুষটিকে তুমি যদি পছন্দ কর, দাদা, তাহলে আমি তার গলায় মালা দিই।” বুড়ে জিজ্ঞাসা করলে, “সে আছে কোথায় ?” নাৎনী বললে, “ঐ যে বাইরে পিয়াল গাছের তলায়।” নতুন পুতুল । రి ఏ বর এল ঘরের মধ্যে, বুড়ে বললে, “এ যে কিষণলাল ।” কিষণলাল বুড়োর পায়ের ধূলো নিয়ে বললে, “ই, আমি কিষণলাল ৷” বুড়ো তাকে বুকে চেপে ধরে বললে, “ভাই, একদিন তুমি কেড়ে নিয়েছিলে আমার হাতের পুতুলকে, আজ নিলে আমার প্রাণের পুতুলটিকে।” নাৎনী বুড়োর গলা ধরে তার কানে কানে বললে, “দাদা, তোমাকে সুদ্ধ।”