লোকসাহিত্য/কবি-সংগীত

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


ছেলেভুলানো ছড়া : ২ খোকে। আমাদের ধন, বাড়িতে নটের বন । বাহির-বাড়ি ঘর করেছি সোনার সিংহাসন ॥ ግ❖ আয় ঘুম আয় কলাবাগান দিয়ে— হৈঁড়ে-পানী মেঘ করেছে । লখার মা নথ পরেছে কপাল ফুটো ক’রে । অামানি খেতে দাত ভেঙেছে । সি“দুর পরবে কিসে । ר ף খোকোমণির বিয়ে দেব হুটমালার দেশে তারা গাই বলদে চষে ॥ তারা হীরেয় দাত ঘষে । রুইমাছ পালঙের শাক ভারে ভারে আসে খোকোর দিদি কোণায় বসে বাছে । কেউ দুটি চাইতে গেলে বলে আর কি আমার অাছে ॥ "לף এত টাকা নিলে বাবা ছাদনাতলায় বসে— এখন কেন কণদ বাবা গামছা মুখে দিয়ে । আমরা যাব পরের ঘরে পর-অধীন হয়ে— পরের বেটি মুখ করবে মুখ নাড়া দিয়ে। দুই চক্ষের জল পড়বে বস্থধারা দিয়ে ॥ ዓ¢ כציר ృకి 6 ) - :్ఫ రీe R লোকসাহিত্য ግሯጭ ও পারে দুটো শিয়াল চন্দন মেখেছে— কে দেখেছে, কে দেখেছে, দাদা দেখেছে । দাদার হাতের লাল নাঠিখান ফেলে মেরেছে। দুই দিকে দুই কাৎলা মাছ ভেসে উঠেছে। একটা নিলে কি-য়ের মা, একটা নিলে কিয়ে । ঢোকুম কুম বাজনা বাজে অকণর মার বিয়ে । Ե օ ওই আসছে খোড়া জামাইডিং ডিং বাজিয়ে । ক্ষীরের ইড়িতে দই প’ল, ছাই থাকৃ সে । হঁাড়ায় আছে কাৎলা মাছ ধরে আন গে। দুই দিকে দুই কাৎলা মাছ ভেসে উঠেছে ৷ একটি নিলেন গুরুঠাকুর, একটি নিলে টিয়ে । টিয়ের মার বিয়ে লাল গামছা দিয়ে । লাল গামছায় হল নীকো, তসর এনে দে । তসর করে মসর মসর, শাড়ি এনে দে । শাড়ির ভারে উঠতে নারি, শালার কাদে ॥ Ե Ջ আলুর পাতায় ছালুরে ভাই, ভেল্প পাতায় দই । সকল জামাই এল রে অামার, খোড়া জামাই কই । ওই আসছে খোড়া জামাই টুংটুঙি বাজিয়ে । ভাঙা ঘরে শুতে দিলাম ইদুরে নিল কান। কেঁদো না কেঁদো না জামাই, গোরু দিব দান । সেই গোরুটার নাম খুইয়ে পুণ্যবতীর চাদ । ר ר কবি-সংগীত বাংলার প্রাচীন কাব্যসাহিত্য এবং আধুনিক কাব্যসাহিত্যের মাঝখানে কবিওয়ালাদের গান এক নূতন সামগ্রী এবং অধিকাংশ নূতন পদার্থের স্তায় ইহার পরমায়ু অতিশয় স্বল্প। একদিন হঠাৎ গোধূলির সময়ে যেমন পতঙ্গে আকাশ ছাইয়া যায়, মধ্যাহের আলোকেও তাহাদিগকে দেখা যায় না এবং অন্ধকার ঘনীভূত হইবার পূর্বেই তাহারা অদৃপ্ত হইয়া যায়— এই কবির গানও সেইরূপ এক সময়ে বঙ্গসাহিত্যের স্বল্পক্ষণস্থায়ী গোধূলি-আকাশে অকস্মাৎ দেখা দিয়াছিল, তৎপূর্বেও তাহদের কোনো পরিচয় ছিল না, এখনো তাহাদের কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না । গীতিকবিতা বাংলাদেশে বহুকাল হইতে চলিয়া আসিতেছে, এবং গীতিকবিতাই বঙ্গসাহিত্যের প্রধান গৌরবস্থল। বৈষ্ণব কবিদের পদাবলী বসস্তকালের অপর্যাপ্ত পুষ্পমঞ্জরীর মতো ; যেমন তাহার ভাবের সৌরভ তেমনি তাহার গঠনের সৌন্দর্য। রাজসভাকবি রায়গুণাকরের অন্নদামঙ্গলগান রাজকণ্ঠের মণিমালার মতো, যেমন তাহার উজ্জলতা তেমনি তাহার কারুকার্য। অামাদের বর্তমান সমালোচ্য এই কবির গানগুলিও গান, কিন্তু ইহাদের মধ্যে সেই ভাবের গাঢ়তা এবং গঠনের পারিপাট্য নাই । না থাকিবার কিছু কারণও আছে। পূর্বকালের গানগুলি হয় দেবতার সম্মুখে নয় রাজার সম্মুখে গীত হইত— মৃতরাং স্বতই কবির আদর্শ অত্যন্ত দুরূহ ছিল। সেইজন্য রচনার কোনো অংশেই অবহেলার লক্ষণ ছিল না, ভাব ভাষা ছন্দ রাগিণী সকলেরই মধ্যে সৌন্দর্য এবং নৈপুণ্য ছিল । তখন কবির রচনা করিবার এবং শ্রোতৃগণের শ্রবণ করিবার অব্যাহত অবসর ছিল ; তখন গুণীসভায় গুণাকর কবির গুণপনা-প্রকাশ সার্থক হইত। ab- লোকসাহিত্য কিন্তু ইংরাজের নূতনস্থষ্ট রাজধানীতে পুরাতন রাজসভা ছিল না, পুরাতন জাদর্শ ছিল না। তখন কবির আশ্রয়দাতা রাজা হইল সর্বসাধারণ নামক এক অপরিণত স্থূলায়তন ব্যক্তি, এবং সেই হঠাৎ-রাজার সভার উপযুক্ত গান হইল কবির দলের গান । তখন যথার্থ সাহিত্যরস-আলোচনার অবসর যোগ্যতা এবং ইচ্ছা কয়জনের ছিল ? তখন নূতন রাজধানীর নূতনসমৃদ্ধিশালী কৰ্মশ্রাস্ত বণিক-সম্প্রদায় সন্ধ্যাবেলার বৈঠকে বসিয়া দুই দণ্ড আমোদের উত্তেজনা চাহিত, তাহারা সাহিত্যরস চাহিত না । কবির দল তাহাদের সেই অভাব পূর্ণ করিতে আসরে অবতীর্ণ হইল। তাহার। পূর্ববর্তী গুণীদের গানে অনেক পরিমাণে জল এবং কিঞ্চিৎ পরিমাণে চটক মিশাইয়া, তাহাদের ছন্দোবন্ধ সৌন্দর্য সমস্ত ভাঙিয়া নিতান্ত স্থলভ করিয়া দিয়া, অত্যন্ত লঘু স্বরে উচ্চৈঃস্বরে চারিজোড়া ঢোল ও চারিখানা কাসিসহযোগে সদলে সবলে চীৎকার করিয়া আকাশ বিদীর্ণ করিতে লাগিল । কেবল গান শুনিবার এবং ভগবরস সম্ভোগ করিবার যে মুখ তাহাতেই তখনকার সভ্যগণ সন্তুষ্ট ছিলেন না— তাহার মধ্যে লড়াই এবং হার-জিতের উত্তেজনা থাকা আবশ্বক ছিল । সরস্বতীর বীণার তারেও ঝন ঝন শব্দে ঝংকার দিতে হইবে আবার বীণার কাষ্ঠদও লইয়াও ঠক্ ঠক্ শব্দে লাঠি খেলিতে হইবে। নূতন হঠাৎ-রাজার মনোরঞ্জনার্থে এই এক অপূর্ব নূতন ব্যাপারের স্বষ্টি হইল । প্রথমে নিয়ম ছিল, দুই প্রতিপক্ষদল পূর্ব হইতে পরম্পরকে জিজ্ঞাসা করিয়া উত্তর-প্রত্যুত্তর লিখিয়া আনিতেন ; অবশেষে তাহাতেও তৃপ্তি হইল না— আসরে বসিয়া মুখে মুখেই বাগযুদ্ধ চলিতে লাগিল। এরূপ অবস্থায় যে কেবল প্রতিপক্ষকে আহত করা হয় তাহা নহে, ভাষা ভাব ছন্দ সমস্তই ছারখার হইতে থাকে। শ্রোতারাও বেশি কিছু প্রত্যাশ করে না— কথার কৌশল, অকুপ্রাসের ছটা এবং উপস্থিতমত জবাবেই সভা জমিয়া উঠে এবং বাহবা উচ্ছসিত হইতে থাকে ; তাহার উপরে আবার চারজোড়া ঢোল, চারখানা কাসি কবি-সংগীত ግእU এবং সম্মিলিত কণ্ঠের প্রাণপণ চীৎকার ; বিজনবিলাসিনী সরস্বতী এমন সভায় অধিকক্ষণ টিকিতে পারেন না। o: সৌন্দর্ধের সরলতায় যাহাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে না, ভাবের গভীরতায় যাহাদের নিমগ্ন হইবার অবসর নাই, ঘন ঘন অনুপ্রাসে অতি শীঘ্রই তাহদের মনকে উত্তেজিত করিয়া দেয়। সংগীত যখন বর্বর অবস্থায় থাকে তখন তাহাতে রাগরাগিণীর যতই অভাব থাকৃ, তালপ্রয়োগের খচমচ কোলাহল যথেষ্ট থাকে। সুরের অপেক্ষা সেই ঘন ঘন সশবদ আঘাতে অশিক্ষিত চিত্ত সহজে মাতিয়া উঠে। এক শ্রেণীর কবিতায় অনুপ্রাস সেইরূপ ক্ষণিক, ত্বরিত, সহজ উত্তেজনার উদ্রেক করে। সাধারণ লোকের কর্ণ অতি শীঘ্র আকর্ষণ করিবার এমন স্থলভ উপায় অল্পই আছে। অনুপ্রাস যখন ভাব ভাষা ও ছন্দের অনুগামী হয় তখন তাহাতে কাব্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে কিন্তু সে সকলকে ছাড়াইয়া ছাপাইয়া উঠিয়া যখন মূঢ় লোকের বাহবা লইবার জন্য অগ্রসর হয় তখন তদ্বারা সমস্ত কবিতা ইতরতা প্রাপ্ত হয়। কবিদলের গানে অনেক স্থলে অনুপ্রাস— ভাব, ভাষা, এমন-কি ব্যাকরণকে ঠেলিয়া ফেলিয়া শ্রোতাদের নিকট প্ৰগলভতা প্রকাশ করিতে অগ্রসর হয় । অথচ তাহার যথার্থ কোনো নৈপুণ্য নাই, কারণ তাহাকে ছন্দোবন্ধ অথবা কোনো নিয়ম রক্ষা করিয়াই চলিতে হয় না। কিন্তু ষে শ্রোতা কেবল ক্ষণিক আমোদে মাতিয়া উঠিতে চাহে সে এত বিচার করে না ; এবং যাহাতে বিচার আবশ্যক এমন জিনিসও চাহে না । গেল গেল কুল কুল, যাক কুল— তাহে মই আকুল । © লয়েছি যাহার কুল, সে আমার প্রতিকূল । যদি কুলকুগুলিনী অমুকুলা হন আমায় অকুলের তরী কুল পাব পুনরায় bア● লোকসাহিত্য এখন ব্যাকুল হয়ে কি দুকুল হারাব সই । তাহে বিপক্ষ হাসিবে যত রিপুচয় ॥ পাঠকেরা দেখিতেছেন, উপরি-উদ্ভূত গীতাংশে এক কুল-শবের কুল পাওয়া দুষ্কর হইয়াছে। কিন্তু ইহাতে কোনো গুণপনা নাই ; কারণ, উহার অধিকাংশই একই শব্দের পুনরাবৃত্তিমাত্র। কিন্তু শ্রোতৃগণের কোনো বিচার নাই, তাহারা অত্যন্ত স্থলভ চাতুরীতে মুগ্ধ হইতে প্রস্তুত আছেন। এমনকি, যদি অনুপ্রাসছটার খাতিরে কবি ব্যাকরণ এবং শব্দশাস্ত্র সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করেন তাহাতেও কাহারে আপত্তি নাই। দৃষ্টাস্ত— 飘 একে নবীন বয়স, তাতে সুসভ্য, কাব্যরসে রসিকে, মাধুর্য গাম্ভীর্য, তাতে ‘দাম্ভির্য নাই, আর আর বউ যেমনধারা ব্যাপিকে । অধৈর্ষ হেরে তোরে স্বজনী, ধৈর্য ধরা নাহি যায়। যদি সিদ্ধ হয় সেই কার্য করব সাহায্য, বলি, তাই বলে যা আমায় । . একে বাংলা শব্দের কোনো ভার নাই, ইংরাজি-প্রথা-মত তাহাতে অ্যাক্সেণ্ট, নাই, সংস্কৃত-প্রথা-মত তাহাতে হ্রস্ব-দীর্ঘ রক্ষা হয় না, তাহাতে আবার সমালোচ্য কবির গানে স্বনিয়মিত ছন্দের বন্ধন না থাকাতে এই-সমস্ত অযত্নকৃত রচনাগুলিকে শ্রোতার মনে মুদ্রিত করিয়া দিবার জন্য ঘন ঘন অনুপ্রাসের বিশেষ আবশ্বক হয় । সোজা দেয়ালের উপর লতা উঠাইতে গেলে যেমন মাঝে মাঝে পেরেক মারিয়৷ তাহার অবলম্বন স্বষ্টি করিয়া যাইতে হয়, এই অনুপ্রাসগুলিও সেইরূপ ঘন ঘন শ্রোতাদের মনে পেরেক মারিয়া যাওয়া ; অনেক নিজীব রচনাও এই কৃত্রিম উপায়ে অতি দ্রুত বেগে মনোযোগ আচ্ছন্ন করিয়া বসে। বাংলা পাচালিতেও এই কারণেই এত অনুপ্রাসের ঘট । কবি-সংগীত b>> উপস্থিতমত সাধারণের মনোরঞ্জন করিবার ভার লইয়। কবিদলের গান— ছন্দ এবং ভাষার বিশুদ্ধি ও নৈপুণ্য বিসর্জন দিয়া কেবল স্থলভ অনুপ্রাস ও ঝু"ট। অলংকার লইয়া কাজ সারিয়া দিয়াছে, ভাবের কবিত্ব সম্বন্ধেও তাহার মধ্যে বিশেষ উৎকর্ষ দেখা যায় না। পূর্ববর্তী শাক্ত এবং বৈষ্ণব মহাজনদিগের ভাবগুলিকে অত্যন্ত তরল এবং ফিকা করিয়া কবিগণ শহরের শ্রোতাদিগকে স্থলভ মূল্যে জোগাইয়াছেন। তঁহাদের যাহা সংযত ছিল এখানে তাহ শিথিল এবং বিকীর্ণ। র্তাহীদের কুঞ্জবনে যাহা পুপ-আকারে প্রফুল্ল এখানে তাহা বাসি ব্যঞ্জন-আকারে সম্মিশ্রিত । অনেক জিনিস আছে যাহাকে স্বস্থান হইতে বিচ্যুত করিলে তাহা বিকৃত এবং দূষণীয় হইয় উঠে, কবির গানেও সেইরূপ অনেক ভাব তাহার যথাস্থান হইতে পরিভ্রষ্ট হইয়া কলুষিত হইয়া উঠিয়াছে। এ কথা স্বীকার করিতে হইবে যে, বৈষ্ণব কবিদের পদাবলীর মধ্যে এমন অংশ আছে যাহা নির্মল মহে, কিন্তু সমগ্রের মধ্যে তাহা একপ্রকার শোভা পাইয়া গিয়াছে। কবিওয়াল সেইটিকে তাহার সজীব আশ্রয় হইতে, তাহার সৌন্দৰ্য-পরিবেষ্টন হইতে, বিচ্ছিন্ন করিয়া ইতর ভাষা এবং শিথিল ছন্দ -সহযোগে স্বতন্ত্রভাবে আমাদের সম্মুখে ধরিলে তাহা গলিত পদার্থের ন্যায় কদৰ্য মূর্তি ধারণ করে । বৈষ্ণব কাব্যে প্রেমের নানা বৈচিত্র্যের মধ্যে রণধার খণ্ডিত অবস্থার বর্ণনা আছে । আধ্যাত্মিক অর্থে ইহার কোনো বিশেষ গৌরব থাকিতে পারে, কিন্তু সাহিত্য হিসাবে শ্ৰীকৃষ্ণের এই কামুক ছলনার দ্বারা কৃষ্ণরণধার প্রেমকাব্যের সৌন্দর্যও খণ্ডিত হইয়াছে তাহাতে সন্দেহ নাই। রাধিকার এই অবমাননয় কাব্যশ্রীও অবমানিত হইয়াছে। কিন্তু প্রচুর সৌন্দর্যরাশির মধ্যে এ-সকল বিকৃতি আমরা চোখ মেলিয়া দেখি না ; সমগ্রের সৌন্দর্যপ্রভাবে তাহার দূষণীয়তা অনেকটা দূর হইয়া যায়। লৌকিক অর্থে ধরিতে গেলে বৈষ্ণব কাব্যে প্রেমের আদর্শ অনেক স্থলে স্থলিত We *求 লোকসাহিত্য হইয়াছে ; তথাপি সমগ্র পাঠের পর যাহার মনে একটা সুন্দর এবং উন্নত ভাবের স্বষ্টি না হয়, সে হয় সমস্তটা ভালো করিয়া পড়ে নাই নয় সে যথার্থ কাব্যরসের রসিক নহে । কিন্তু আমাদের কবিওয়ালারা বৈষ্ণব কাব্যের সৌন্দর্য এবং গভীরতা নিজেদের এবং শ্রোতাদের আয়ত্তের অতীত জানিয়া প্রধানত যে অংশ নির্বাচিত করিয়া লইয়াছেন তাহা অতি অযোগ্য। কলঙ্ক এবং ছলনা ইহাই কবিওয়ালাদের গানের প্রধান বিষয়। বারংবার রাধিক এবং রাধিকার সখীগণ কুজাকে অথবা অপরাকে লক্ষ্য করিয়া তীব্র সরস পরিহাসে শু্যামকে গঞ্জনা করিতেছেন । র্তাহাদের আরো একটি রচনার বিষয় আছে, স্ত্রী-পক্ষ এবং পুরুষ-পক্ষের পরম্পরের প্রতি অবিশ্বাস-প্রকাশ-পূর্বক দোষারোপ করা ; সেই শখের কলহ শুনিতে শুনিতে ধিক্কার জন্মে। যাহাদের প্রকৃত আত্মসন্মানজ্ঞান দৃঢ় তাহারা সর্বদা অভিমান প্রকাশ করিতে অবজ্ঞা করিয়া থাকে। তাহীদের মানে আঘাত লাগিলে, হয় তাহারা স্পষ্টরূপে তাহার প্রতিকার করে নয় তাহা নিঃশব্দে উপেক্ষা করিয়া যায়। প্রিয়জনদের নিকট হইতে প্রেমে আঘাত লাগিলে, হয় তাহ গোপনে বহন করে নয় সাক্ষাতভাবে সম্পূর্ণরূপে তাহার মীমাংসা করিয়া লয়। আমাদের দেশে ইহা সর্বদাই দেখিতে পাওয়া যায় পরাধীনতা যাহার অবলম্বন সেই অভিমানী ; যে এক দিকে ভিক্ষুক তাহার অপর দিকে অভিমানের অস্ত নাই, যে সর্ববিষয়ে অক্ষম সে কথায় কথায় অভিমান প্রকাশ করিয়া থাকে। এই অভিমান জিনিসটি বাঙালি-প্রকৃতির মজ্জাগত নির্লজ্জ দুর্বলতার পরিচায়ক । দুর্বলতা স্থলবিশেষে এবং পরিমাণবিশেষে সুন্দর লাগে। স্বল্প উপলক্ষে অভিমান কখনো কখনো স্ত্রীলোকদিগকে শোভা পায়। যতক্ষণ নায়কের প্রেমের প্রতি নায়িকার যথার্থ দাবি থাকে ততক্ষণ মাঝে মাঝে ক্রীড়াচ্ছলে কবি-সংগীত アー。 অথবা স্বল্প অপরাধের দগুচ্ছলে পুরুষের প্রেমাবেগকে কিয়ৎকালের জন্য প্রতিহত করিলে সে অভিমানের একটা মাধুর্য দেখা যায়। কিন্তু গুরুতর অপরাধ অথবা বিশ্বাসঘাতের দ্বারা নায়ক যখন সেই প্রেমের মূলেই কুঠারাঘাত করে তখন যথারীতি অভিমান প্রকাশ করিতে বসিলে নিজের প্রতি একান্ত অবমাননা প্রকাশ করা হয় মাত্র ; এইজন্য তাহাতে কোনো সৌন্দর্য নাই এবং তাহা কাব্যে স্থান পাইবার যোগ্য নহে। দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের দেশে স্বামীকৃত সকল প্রকার অসম্মাননা এবং অন্যায় স্ত্রীকে অগত্যা সহ এবং মার্জনা করিতেই হয় ; কিঞ্চিৎ অশ্রুজলসিক্ত বক্রবাক্যবাণ অথবা কিয়ৎকাল অবগুণ্ঠনাবৃত বিমুখ মৌনাবস্থা ছাড়া আর কোনো অস্ত্র নাই, অতএব আমাদের সমাজে স্ত্রীলোকের সর্বদা অভিমান জিনিসটা সত্য সন্দেহ নাই। কিন্তু তাহা সর্বত্র সুন্দর নহে ইহাও নিশ্চয় ; কারণ, যাহাতে কাহারো অবিমিশ্র স্থায়ী হীনতা প্রকাশ করে তাহা কখনোই সুন্দর হইতে পারে না । কবিদলের গানে রাধিকার যে অভিমান প্রকাশ হইয়াছে তাহ প্রায়শই এইরূপ অযোগ্য অভিমান।— সাধ ক’রে করেছিলেম দুর্জয় মান, শু্যামের তায় হল অপমান । শু্যামকে সাধলেম না, ফিরে চাইলেম না, কথা কইলেম না রেখে মান । কৃষ্ণ সেই রাগের অনুরাগে, রাগে রাগে গো পড়ে পাছে চন্দ্রাবলীর নবরাগে । ছিল পূর্বের যে পূর্বরাগ, আবার এ কী অপূর্ব রাগ, পাছে রাগে শু্যাম রাধার অাদর ভুলে যায়। যার মানের মানে অামায় মানে, সে না মানে 切ア8 লোকসাহিত্য তবে কী করবে এ মানে । মাধবের কত মান না হয় তার পরিমাণ, মানিনী হয়েছি যার মানে ॥ যে পক্ষে যখন বাড়ে অভিমান সেই পক্ষে রাখতে হয় সম্মান । রাখতে শু্যামের মান গেল গেল মান, আমার কিসের মান-অপমান ৷ এই কয়েক ছত্রের মধ্যে প্রেমের যেটুকু ইতিহাস যে ভাবে লিপিবদ্ধ হইয়াছে তাহাতে কৃষ্ণের উপরেও শ্রদ্ধা হয় না, রাধিকার উপরেও শ্রদ্ধা হয় না, চন্দ্রাবলীর উপরেও অবজ্ঞার উদয় হয়। কেবল নায়ক-নায়িকার অভিমান নহে, পিতামাতার প্রতি কন্যার অভিমানও কবিদলের গানে সর্বদাই দেখিতে পাওয়া যায়। গিরিরাজ-মহিষীর প্রতি উমার যে অভিমানকলহ তাহাতে পাঠকের বিরক্তি উদ্রেক করে না— তাহা সর্বত্রই সুমিষ্ট বোধ হয়। তাহার কারণ, মাতৃস্নেহে উমার যথার্থ অধিকার সন্দেহ নাই ; কন্যা ও মাতার মধ্যেএই-যে আঘাত ও প্রতিঘাত তাহাতে স্নেহসমুদ্র স্বন্দরভাবে তরঙ্গিত হইয়া উঠে। মাতা-কন্যা এবং নায়ক-নায়িকার মান-অভিমান যে কবিদলের গানের প্রধান বিষয়, পূর্বেই বলিয়াছি তাহার একটা কারণ বাঙালির প্রকৃতিতে অভিমানটা কিছু বেশি, অর্থাৎ অন্যের প্রেমের প্রতি স্বভাবতই তাহার দাবি অত্যন্ত অধিক ; এমন-কি, সে প্রেম অপ্রমাণ হইয়া গেলেও ইনিয়া-বিনিয়া কাদিয়া-রাগিয়া আপনার দাবি সে কিছুতেই ছাড়ে না— আর-একটা কারণ, এই মান-অভিমানে উত্তর-প্রত্যুত্তরের তীব্রতা এবং জয়-পরাজয়ের উত্তেজন রক্ষিত হয়। কবিওয়ালাদের গানে সাহিত্যরসের স্বষ্টি অপেক্ষ ক্ষণিক উত্তেজনাউদ্রেকই প্রধান লক্ষ্য।