লোকসাহিত্য/গ্রাম্যসাহিত্য

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


էր Պ গ্রাম্যসাহিত্য একদিন শ্রাবণের শেষে নৌকা করিয়া পাবনা-রাজশাহির মধ্যে ভ্রমণ করিতেছিলাম। মাঠ ঘাট সমস্ত জলে ডুবিয়াছে। ছোটো ছোটো গ্রামগুলি জলচর জীবের ভাসমান কুলায়পুঞ্জের মতো মাঝে মাঝে জাগিয়া আছে। কুলের রেখা দেখা যায় না শুধু জল ছলছল করিতেছে ; ইহার মধ্যে যখন স্বৰ্ষ অস্ত যাইবে এমন সময় দেখা গেল প্রায় দশ-বারো জন লোক একখানি ডিঙি বাহিয়া আসিতেছে। তাহারা সকলে মিলিয়া উচ্চকণ্ঠে এক গান ধরিয়াছে এবং দাড়ের পরিবর্তে এক-একখানি বাখারি দুই হাতে ধরিয়া গানের তালে তালে ঝোকে ঝোকে ঝপ ঝপ শব্দে জল ঠেলিয়া দ্রুত বেগে চলিয়াছে ; গানের কথাগুলি শুনিবার জন্য কান পাতিলাম, অবশেষে বারংবার আবৃত্তি শুনিয়া যে ধুয়াটি উদ্ধার করিলাম তাহা এই— যুবতী, ক্যান বা কর মন ভারী। পাবনা থ্যাহে অন্তে দেব ট্যাহা-দামের মোটরি ॥ ভরা বর্ষার জলপ্লাবনের উপর যখন নিঃশবে সূর্য অস্ত যাইতেছে এ গানটি ঠিক তখনকার উপযুক্ত কি না সে সম্বন্ধে পাঠকমাত্রেরই সন্দেহ হইতে পারে, কিন্তু গানের এই দুটি চরণে সেই শৈবালকীর্ণ জলমরুর মাঝখান হইতে সমস্ত গ্রামগুলি যেন কথা কহিয়া উঠিল। দেখিলাম, এই গোয়াল-ঘরের পাশে, এই কুল গাছের ছায়ায়, এখানেও যুবতী মন ভারী করিয়া থাকেন এবং তাহার রোষারুণ কুটিলকটাক্ষপাতে গ্রাম্যকবির কবিতা ছন্দে-বন্ধে স্বরে-তালে মাঠেঘাটে জলে-স্থলে জাগিয়া উঠিতে থাকে। জগতে যতপ্রকার দুর্বিপাক আছে যুবতীচিত্তের বিমুখত তাহার মধ্যে অগ্রগণ্য — সেই দুগ্রহ-শাস্তির জন্য কবির ছন্দোরচনা এবং প্রিয়প্রসাদ-বঞ্চিত হতভাগ্যগণ প্রাণপাত পর্যন্ত করিতে প্রস্তুত । কিন্তু যখন গানের মধ্যে শুনিলাম bわ* লোকসাহিত্য ‘পাবনা থেকে আনি দিব টাকা-দামের মোটরি’, তখন ক্ষণকালের জন্য মনের মধ্যে বড়ো একটা আশ্বাস অকুভব করা গেল । মোটরি পদার্থটি কী তাহ ঠিক জানি না, কিন্তু তাহার মূল্য যে এক টাকার বেশি নহে কবি তাহাতে সন্দেহ রাখেন নাই। জগতের এক প্রান্তে পাবনা জিলায় যে এমন একটা স্থান আছে যেখানে প্রতিকূল প্রণয়িনীর জন্য অসাধ্যসাধন করিতে হয় না, পাবনা অপেক্ষ দুর্গম স্থানে যাইতে এবং ‘মোটরি’ অপেক্ষ দুর্লভ পদার্থ সংগ্ৰহ করিতে হয় না, ইহা মনে করিলে ভবযন্ত্রণ অপেক্ষাকৃত স্বসহ বলিয়া বোধ হয় । কালিদাস ভবভূতি প্রভৃতি প্রথম শ্রেণীর কবিরা এমন স্থলে নিশ্চয়ই মানসসরোবরের স্বর্ণপদ্ম, আকাশের তারা এবং নন্দনকাননের পারিজাত অম্লানমুখে হাকিয়া বসিতেন। এবং উজ্জয়িনীর প্রথম শ্রেণীর যুবতীর শিখরিণী ও মন্দাক্রাস্তাচ্ছন্দে এমন দুঃসাধ্য অনুষ্ঠানের প্রস্তাবমাত্র শুনিলে প্রসন্ন না হইয়া থাকিতে পারিতেন না । অন্তত কাব্য পড়িয়া এইরূপ ভ্রম হয়। কিন্তু অবিশ্বাসী গদ্যজীবী লোকেরা এতটা কবিত্ব বিশ্বাস করে না। শুদ্ধমাত্র মন্ত্রপাঠের দ্বারা এক পাল ভেড়া মারা যায় কি না এ প্রশ্নের উত্তরে ভলটেয়ার বলিয়াছেন, যায়, কিন্তু তাহার সঙ্গে সঙ্গে যথেষ্ট পরিমাণে আর্সেনিক বিষও থাকা চাই। মন-ভারী-করা যুবতীর পক্ষে অকাশের তারা, নন্দনের পারি জাত এবং প্রাণসমর্পণের প্রস্তাব সন্তোষজনক হইতে পারে, কিন্তু অধিকাংশ স্থলেই তাহার সঙ্গে সঙ্গে বাজুবন্ধ বা চরণচক্রের প্রয়োজন হয়। কবি ঐ কথাটা চাপিয়া যান ; তিনি প্রমাণ করিতে চান যে কেবল মন্ত্রবলে, কেবল ছন্দ এবং ভাবের জোরেই কাজ সিদ্ধ হয়— অলংকারের প্রয়োজন হইতে পারে, কিন্তু তাহা কাব্যালংকারের। এ দিকে আমাদের পাবনার জনপদবাসিনীর কাব্যের আড়ম্বর বাহুল্য জ্ঞান করেন, এবং র্তাহীদের চিরাচুরক্ত গ্রামবাসী কবি মন্ত্রতন্ত্র বাদ দিয়া একেবারেই সোজা টাকাদামের মোটরির কথাটা পাড়িয়া বসেন ; সময় নষ্ট করেন না । গ্রাম্যসাহিত্য bూసా তবুও একটা ছন্দ এবং একটা স্থর চাই। এই জগৎপ্রান্তে এই পাবন। জিলার বিলের ধারেও তাহার প্রয়োজন আছে । তাহাতে করিয়া ঐ মোটরির দশম এক টাকার চেয়ে অনেকট বাড়িয়া যায়। ঐ মোটরিটাকে রসের এবং ভাবের পরশপাথর ছোওয়াইয়া দেওয়া হয়। গানের সেই দুটে লাইনকে প্রচলিত গদ্যে বিনা স্বরে বলিলে তাহার মধ্যে যে-একটি রূঢ় দৈন্য আসিয় পড়ে, ছন্দে স্বরে তাহ। নিমেষের মধ্যে ঘুচিয়া যায় ; সংসারের প্রতিদিনের ধূলিম্পর্শ হইতে ঐ ক’টি তুচ্ছ কথা ভাবের আবরণে আবৃত হইয়া উঠে । মানুষের পক্ষে ইহার একটা একান্ত প্রয়োজন আছে। যে-সকল সাংসারিক ব্যাপারের দ্বারা সে সর্বদা ঘনিষ্ঠভাবে পরিবৃত তাহাকে সে ছন্দে লয়ে মণ্ডিত করিয়া তাহার উপর নিত্যসৌন্দর্যময় ভাবের রশ্মিপাত করিয়া দেখিতে চায়। সেইজন্য জনপদে যেমন চাষবাস এবং খেয়া চলিতেছে— সেখানে কামারের ঘরে লাঙলের ফলা, ছুতারের ঘরে ঢে*কি এবং স্বর্ণকারের ঘরে টাকাদামের মোটরি নির্মাণ হইতেছে — তেমনি সঙ্গে সঙ্গে ভিতরে ভিতরে একটা সাহিত্যের গঠনকার্যও চলিতেছে ; তাহার বিশ্রাম নাই। প্রতিদিন যাহা বিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্ন খণ্ড খণ্ড ভাবে সম্পন্ন হইতেছে সাহিত্য তাহাকে ঐক্যস্থত্রে গাঁথিয়া নিত্যকালের জন্য প্রস্তুত করিতে চেষ্টা করিতেছে। গ্রামের মধ্যে প্রতিদিনের বিচিত্র কাজও চলিতেছে এবং তাহার ছিদ্রে ছিদ্রে চিরদিনের একটা রাগিণী বাজিয়া উঠিবার জন্য নিয়ত প্রয়াস পাইতেছে। পদ্মা বাহিয়া চলিতে চলিতে বালুচরের মধ্যে যখন চকাচকীর কলরব শুনা যায় তখন তাহাকে কোকিলের কুহুতান বলিয়া কাহারে ভ্রম হয় না, তাহাতে পঞ্চম মধ্যম কড়িকোমল কোনোপ্রকার স্থর ঠিকমত লাগে না ইহা নিশ্চয়, কিন্তু তবু ইহাকে পদ্মাচরের গান বলিলে কিছুই অসংগত হয় না। কারণ, ইহাতে স্বর বেস্থর যাহাই লাগুক, সেই নির্মল নদীর হাওয়ায় শীতের রৌদ্রে অসংখ্য প্রাণীর জীবনমুখসম্ভোগের আনন্দধ্বনি বাজিয় উঠে। 3 е লোকসাহিত্য গ্রাম্যসাহিত্যের মধ্যেও কল্পনার তান অধিক থাকৃ বা না-থাকৃ সেই আনন্দের স্বর অাছে। গ্রামবাসীরা যে জীবন প্রতিদিন ভোগ করিয়া আসিতেছে, যে কবি সেই জীবনকে ছন্দে তালে বাজাইয়া তোলে সে কবি সমস্ত গ্রামের হৃদয়কে ভাষা দান করে। পদ্মাচরের চক্রবাক-সংগীতের মতে: তাহা নিখুত স্থর-তালের অপেক্ষ রাখে না। মেঘদূতের কবি অলকা পর্যন্ত গিয়াছেন, তিনি উজ্জয়িনীর রাজসভার কবি । আমাদের অখ্যাত গানের কবি কঠিন দায়ে পড়িয়াও পাবনা শহরের বেশি অগ্রসর হইতে পারে নাই ; যদি পারিত তবে তাহার গ্রামের লোক তাহার সঙ্গ ত্যাগ করিত। কল্পনার সংকীর্ণতার দ্বারাই সে আপন প্রতিবেশীবর্গকে ঘনিষ্ঠস্থত্রে বঁাধিতে পারিয়াছে এবং সেই কারণেই তাহার গানের মধ্যে, কল্পনাপ্রিয় একক কবির নহে, পরস্তু সমস্ত জনপদের হৃদয় কলরবে ধ্বনিত হইয়া উঠিয়াছে। সেইজন্য বাংলা জনপদের মধ্যে ছড়া গান কথা-আকারে যে সাহিত্য গ্রামবাসীর মনকে সকল সময়েই দোল দিতেছে তাহাকে কাব্যহিসাবে গ্রহণ করিতে গেলে তাহার সঙ্গে সঙ্গে মনে মনে সমস্ত গ্রাম, সমস্ত লোকালয়কে জড়াইয়া লইয়া পাঠ করিতে হয় ; তাহারাই ইহার ভাঙা ছন্দ এবং অপূর্ণ মিলকে অর্থে ও প্রাণে ভরাট করিয়া তোলে। গ্রাম্যসাহিত্য বাংলার গ্রামের ছবির, গ্রামের স্মৃতির অপেক্ষ রাখে ; সেইজন্যই বাঙালির কাছে ইহার একটি বিশেষ রস আসে। বৈষ্ণবী যখন ‘জয় ‘রাধে’ বলিয়া ভিক্ষা করিতে অস্তঃপুরের আঙিনায় আসিয়া দাড়ায় তখন কুতুহলী গৃহকত্রী এবং অবগুষ্ঠিত বধূগণ তাহ। শুনিবার জন্য উৎস্থক হইয়া আসেন। প্রবীণ পিতামহী, গল্পে গানে ছড়ায় যিনি আকণ্ঠ পরিপূর্ণ— কত শুক্লপক্ষের জ্যোৎস্নায় ও কৃষ্ণপক্ষের তারার আলোকে তাহাকে উত্ত্যক্ত করিয়া তুলিয়া গৃহের বালকবালিকা যুবকযুবতী একাগ্রমনে বহু শত বৎসর ধরিয়া যাহা শুনিয়া আসিতেছে বাঙালি পাঠকের নিকট তাহার রস গভীর এবং অক্ষয় । গ্রাম্যসাহিত্য వె) গাছের শিকড়টা যেমন মাটির সঙ্গে জড়িত এবং তাহার অগ্রভাগ আকাশের দিকে ছড়াইয়া পড়িয়াছে, তেমনি সর্বত্রই সাহিত্যের নিম্ন অংশ স্বদেশের মাটির মধ্যেই অনেক পরিমাণে জড়িত হইয়া ঢাকা থাকে ; তাহা বিশেষরূপে সংকীর্ণরূপে দেশীয়, স্থানীয়। তাহা কেবল দেশের জনসাধারণেরই উপভোগ্য ও আয়ত্তগম্য ; সেখানে বাহিরের লোক প্রবেশের অধিকার পায় না। সাহিত্যের যে অংশ সার্বভৌমিক তাহা এই প্রাদেশিক নিম্নস্তরের থাকটার উপরে দাড়াইয়া আছে। এইরূপ নিমসাহিত্য এবং উচ্চসাহিত্যের মধ্যে বরাবর ভিতরকার একটি যোগ আছে। যে অংশ আকাশের দিকে আছে তাহার ফুল-ফল ডালপালার সঙ্গে মাটির নীচেকার শিকড়গুলার তুলনা হয় না ; তবু তত্ত্ববিদদের কাছে তাহাদের সাদৃশ্ব ও সম্বন্ধ কিছুতেই ঘুচিবার নহে। নীচের সহিত উপরের এই-যে যোগ, প্রাচীন বঙ্গসাহিত্য অালোচনা করিলে ইহা স্পষ্ট দেখিতে পাওয়া যায়। অন্নদামঙ্গল ও কবিকঙ্কণের কবি যদিচ রাজসভাধনীসভার কবি, যদিচ তাহারা উভয়ে পণ্ডিত, সংস্কৃত কাব্যসাহিত্যে বিশারদ, তথাপি দেশীয় প্রচলিত সাহিত্যকে বেশি দূর ছাড়াইয়া বাইতে পারেন নাই। অন্নদামঙ্গল ও কুমারসম্ভবের আখ্যানে প্রভেদ অল্প ; কিন্তু অন্নদামঙ্গল কুমারসম্ভবের ছাচে গড়া হয় নাই। তাহার দেবদেবী বাংলাদেশের গ্রাম্য হরগৌরী। কবিকঙ্কণ চণ্ডী, ধর্মমঙ্গল, মনসার ভাসান, সত্যপীরের কথা, সমস্তই গ্রাম্যকাহিনী অবলম্বনে রচিত। সেই গ্রাম্য ছড়াগুলির পরিচয় পাইলে তবেই ভারতচন্দ্রমুকুন্দরাম-রচিত কাব্যের যথার্থ পরিচয় পাইবার পথ হয়। রাজসভার কাব্যে ছন্দ মিল ও কাব্যকলা স্বসম্পূর্ণ সন্দেহ নাই, কিন্তু গ্রাম্য ছড়াগুলির সহিত তাহার মৰ্মগত প্রভেদ ছিল না । আমার হাতে যে ছড়াগুলি সঞ্চিত হইয়াছে তাহা অপেক্ষাকৃত পুরাতন কি নূতন নিঃসন্দেহ বলিতে পারি না। কিন্তু দুই-এক শত বৎসরে এ-সকল কবিতার বয়সের কম-বেশি হয় না। আজ পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে পল্লীর কবি S২ লোকসাহিত্য যে ছড়া রচনা করিয়াছে তাহাকে এক হিসাবে মুকুন্দরামের সমসাময়িক বলা যায় ; কারণ, গ্রামের প্রাণটি যেখানে ঢাকা থাকে কালস্রোতের ঢেউগুলি সেখানে তেমন জোরের সঙ্গে ঘ দিতে পারে না । গ্রামের জীবনযাত্রা এবং সেই জীবনযাত্রার সঙ্গী সাহিত্য, বহুকাল বিনা পরিবর্তনে একই ধারায় চলিয়৷ আসে । কেবল সম্প্রতি অতি অল্পদিন হইল ‘আধুনিক কাল দূরদেশাগত নবীন জামাতার মতো নূতন চাল-চলন লইয়া পল্লীর অন্তঃপুরেও প্রবেশ করিয়াছে। গ্রামের মধ্যেও পরিবর্তনের হাত পড়িয়াছে। এজন্য গ্রাম্য ছড়া-সংগ্রহের ভার যাহারা লইয়াছেন তাহারা আমাকে লিখিতেছেন— ‘প্রাচীন ভিন্ন আজকালকার মেয়েদের কাছে এইরূপ কবিতা শুনিবার প্রত্যাশা নাই। তাহারা ইহা জানে না এবং জানিবার কৌতুহলও রাখে না। বৰ্ষীয়সী স্ত্রীলোকের সংখ্যা খুব কম। তাহদের মধ্যেও অনেকে উহা জানেন না। দুই-একজন জানিলেও সকলে জানেন না। সুতরাং পাচটি ছড়া সংগ্ৰহ করিতে হইলেই পাচ গ্রামের পাঁচজন বৃদ্ধার আশ্রয় লইতে হয়। এ দেশের পুরাতন বৈষ্ণবীগণের দুই-একজন মাঝে মাঝে এইরূপ কবিতা বলিয়া ভিক্ষা করে দেখিতে পাই। তাহদের কথিত ছড়াগুলির সমস্তই রাধাকৃষ্ণের প্রেমবিষয়ক । এইরূপ বৈষ্ণবী সচরাচর মেলে না এবং মিলিলেও অনেকেই একবিধ ছড়াই গাহিয়া থাকে। এমন স্থলে একাধিক নূতন ছড়া সংগ্ৰহ করিতে হইলে অপেক্ষাকৃত বহু বৈষ্ণবীর সাহায্য আবশ্বক। তবে শস্যশ্যামলা মাতৃভূমির কৃপায় প্রতি সপ্তাহে অন্তত দু-একটি বিদেশিনী নূতন বৈষ্ণবীর ‘জয় রাধে’ রব শুনিতে পাওয়া বড়ো কিছু আশ্চর্ষের বিষয় নহে। পূর্বে গ্রাম্য ছড়াগুলি গ্রামের সম্রাস্ত বংশের মেয়েদেরও সাহিত্যরস-তৃষ্ণ মিটাইবার জন্য ভিখারিনী ও পিতামহীদের মুখে মুখে ঘরে ঘরে প্রচারিত হইত। এখন তাহার। অনেকেই পড়িতে শিখিয়াছেন ; বাংলার ছাপাখানার সাহিত্য গ্রাম্যসাহিত্য సె\లి, র্তাহীদের হাতে পড়িয়াছে। এখন গ্রাম্য ছড়াগুলি বোধ করি সমাজের অনেক নীচের স্তরে নামিয়া গেছে। ছড়াগুলির বিষয়কে মোটামুটি দুই ভাগ করা যায়। হরগৌরী-বিষয়ক এবং কৃষ্ণরাধ-বিষয়ক । হরগৌরী বিষয়ে বাঙালির ঘরের কথা এবং কৃষ্ণরাধা বিষয়ে বাঙালির ভাবের কথা ব্যক্ত করিতেছে। এক দিকে সামাজিক দাম্পত্যবন্ধন, আর-এক দিকে সমাজবন্ধনের অতীত প্রেম। o ழ் দাম্পত্যসম্বন্ধের মধ্যে একটা বিল্প বিরাজ করিতেছে, দারিদ্র্য। সেই দারিদ্র্যশৈলটাকে বেষ্টন করিয়া হরগৌরীর কাহিনী নানা দিক হইতে তরঙ্গিত হইয়া উঠিতেছে। কখনো-বা শ্বশুর-শাশুড়ির স্নেহ সেই দারিদ্র্যকে আঘাত করিতেছে, কখনো-বা স্ত্রী-পুরুষের প্রেম সেই দারিদ্র্যের উপর আসিয়া প্রতিহত হইতেছে। 莺 বাংলার কবিহীদয় এই দারিদ্র্যকে মহত্ত্বে এবং দেবত্বে মহোচ্চ করিয়া তুলিয়াছে। বৈবাগ এবং আত্মবিস্মৃতির দ্বারা দারিদ্র্যের হীনতা ঘুচাইয়া কবি তাহাকে ঐশ্বর্ষের অপেক্ষা অনেক বড়ো করিয়া দেখাইয়াছেন। ভোলানাথ দারিদ্র্যকে অঙ্গের ভূষণ করিয়াছিলেন ; দরিদ্রসমাজের পক্ষে এমন আনন্দময় আদর্শ আর কিছুই নাই । ‘আমার সম্বল নাই যে বলে সেই গরিব ; আমার অবিশু্যক নাই যে বলিতে পারে তাহার অভাব কিসের ? শিব তো তাহারই অাদর্শ। - অন্য দেশের ন্যায় ধনের সন্ত্রম ভারতবর্ষে নাই, অন্তত পূর্বে ছিল না। যে বংশে বা গৃহে কুলশীলসম্মান আছে সে বংশে বা গৃহে ধন নাই এমন সম্ভাবন৷ অামাদের দেশে বিরল নহে। এইজন্য আমাদের দেশে ধনী ও নির্ধনের মধ্যে বিবাহের আদান-প্রদান সর্বদাই চলিয়া থাকে। rā কিন্তু সামাজিক আদর্শ যেমনই হউক, ধনের একটা স্বাভাবিক মত্তত আছে। ধনগৌরবে দরিদ্রের প্রতি ধনী কৃপাকটাক্ষপাত করিয়া থাকে। যেখানে 。8 লোকসাহিত্য W. * সামাজিক উচ্চনীচতা নাই সেখানে ধনের উচ্চনীচতা আসিয়া একটু নিম, বাধাইয়া দেয় ; এইরূপ অবস্থা দাম্পত্য-সম্বন্ধে একটা মন্ত বিপাকের কারণ। স্বভাবতই ধনী শ্বশুর যখন দরিদ্র জামাতাকে অবজ্ঞা করে এবং ধনীকঙ্কা চরিত্র পতি ও নিজের দুরপৃষ্টের প্রতি বিরক্ত হইয় উঠেন তখন গৃহধর্ম কম্পাদিত হইয় থাকে। 疊 o দাম্পত্যের এই দুবুগ্রহ কেমন করিয়া কমিয়া যায় হরগৌরীর কাহিনীতে তাহা কীর্তিত হইয়াছে। সতী স্ত্রীর অটল শ্রদ্ধা তাহার একটা উপাদান, তাহার আর-একটা উপাদান দারিদ্র্যের হীনতামোচন, মহত্ত্ব-কীর্তন। উমাপতি দরিদ্র হইলেও হেয় নহেন, এবং শ্মশানচারীর স্ত্রী পতিগৌরবে ইন্দ্রের ইন্দ্রাণী অপেক্ষ cણઠે দাম্পত্যবন্ধনের আর-একটি মহৎ বিন্ন স্বামীর বার্ধক্য ও কুরূপতা। হরগৌরীর সম্বন্ধে তাহাও পরাভূত হইয়াছে। বিবাহসভায় বৃদ্ধ জামাতাকে দেখিয়া মেনকা যখন আক্ষেপ করিতেছেন তখন অলৌকিক প্রভাবে বৃদ্ধের রূপযৌবন বসনভূষণ প্রকাশিত হইয়া পড়িল । এই অলৌকিক রূপযৌবন প্রত্যেক বৃদ্ধ স্বামীরই আছে, তাহা তাহার স্ত্রীর আস্তরিক ভক্তি-প্রীতির উপর নির্ভর করে। গ্রামের ভিক্ষুক কথক গায়ক হরগৌরীর কথায় বারে বারে দ্বারে দ্বারে সেই ভক্তি উদ্রেক করিয়া বেড়ায় । গ্রামের কবিপ্রতিভা এইখানেই ক্ষাস্ত হয় নাই। শিবকে গাজা ভাঙ প্রভৃতি নেশায় উন্মত্ত করিয়াছে। শুদ্ধ তাহাই নহে ; অসভ্য কোচকামিনীদের প্রতি তাহার আসক্তি প্রচার করিতে ছাড়ে নাই। কালিদাসের অনুত্তরঙ্গ সমুদ্র ও নির্বাতনিষ্কম্প দ্বীপশিখাবৎ যোগীশ্বর বাংলার পল্লীতে আসিয়া এমনি দুৰ্গতি প্রাপ্ত হইয়াছেন। 1_ச் কিন্তু স্থূল কথা এই যে, হরগৌরীর কথা ছোটো-বড়ো সমস্ত বিম্নের উপরে দাম্পত্যের বিজয়কাহিনী। হরগৌরীপ্রসঙ্গে আমাদের একান্ন-পারিবারিক গ্রাম্যসাহিত্য 氹 সমাজের মর্মরূপিণী রমণীর এক সজীব অাদর্শে গঠিত হইয়াছে। স্বামী দীন দরিদ্র বৃদ্ধ বিরূপ যেমনই হউক, স্ত্রী রূপযৌবন-ভক্তিপ্রীতি-ক্ষমাধৈর্ধ-তেজগর্বে সমুজ্জলা। স্ত্রীই দরিদ্রের ধন, ভিখারির অন্নপূর্ণ, রিক্ত গৃহের সম্মানলক্ষ্মী। হরগৌরীর গান যেমন সমাজের গান, রাধাকৃষ্ণের গান তেমনি সৌন্দর্ষের গান। ইহার মধ্যে যে অধ্যাত্মতত্ত্ব অাছে তাহা আমরা ছাড়িয়া দিতেছি। কারণ, তত্ত্ব যখন রূপকের ছদ্মবেশ ধারণ করিয়া সাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে চেষ্টা করে তখন তো সে আপন তত্ত্বরূপ গোপন করে। বাহরূপেই সে সাধারণের হৃদয় অাকর্ষণ করিয়া থাকে। রাধাকৃষ্ণের রূপকের মধ্যে এমন একটি পদার্থ আছে যাহা বাংলার বৈষ্ণব অবৈষ্ণব তত্ত্বজ্ঞানী ও মূঢ় সকলেরই পক্ষে উপাদেয়, এইজন্যই তাহা ছড়ায় গানে যাত্রায় কথকতায় পরিব্যাপ্ত হইতে পারিয়াছে । সৌন্দর্যসূত্রে নরনারীর প্রেমের আকর্ষণ সকল দেশের সাহিত্যেই প্রচারিত। কেবল সামাজিক কর্তব্যবন্ধনে ইহাকে সম্পূর্ণ কুলাইয়া পায় না। সমাজের বাহিরেও ইহার শাসন বিস্তৃত । পঞ্চশরের গতিবিধি সর্বত্রই, এবং বসন্ত অর্থাৎ জগতের যৌবন এবং সৌন্দর্য র্তাহার নিত্য-সহচর। নরনারীর প্রেমের এই যে একটি মোহিনী শক্তি আছে, যে শক্তিবলে সে মুহূর্তের মধ্যে জগতের সমস্ত চন্দ্রস্থর্যতারা পুষ্পকানন নদনদীকে এক স্থত্রে টানিয়া মধুরভাবে উজ্জ্বলভাবে আপনার চতুর্দিকে সাজাইয়া আনে, ষে প্রেমের শক্তি আকস্মিক অনির্বচনীয় আবির্ভাবের দ্বারা এতদিনকার বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত উপেক্ষিত বিশ্বজগৎকে চক্ষের পলকে সম্পূর্ণরূপে কৃতকৃতাৰ্থ করিয়া তোলে— সেই শক্তিকে যুগে যুগে দেশে দেশে মনুষ্য অধ্যাত্মশক্তির রূপক বলিয়া অনুভব ও বর্ণনা করিয়াছে। তাহার প্রমাণ সলোমন, হাফেজ এবং বৈষ্ণব কবিদের পদাবলী । দুটি মমুন্যের প্রেমের মধ্যে এমন একটি বিরাট বিশ্বব্যাপকতা আছে যে আধ্যাত্মিক ভাবুকদের মনে হয়, সেই প্রেমের সম্পূর্ণ অর্থ সেই দুইটি মকুন্যের పెte লোকসাহিত্য মধ্যেই পর্যাপ্ত নহে ; তাহা ইঙ্গিতে জগৎ ও জগদীশ্বরের মধ্যবর্তী অনন্তকালের সম্বন্ধ ও অপরিসীম ব্যাকুলত জ্ঞাপন করিতেছে। কাব্যের পক্ষে এমন সামগ্রী আর দ্বিতীয় নাই। ইহা একই কালে স্বন্দর এবং বিরাট, অন্তরতম এবং বিশ্বগ্রাসী ; লৌকিক এবং অনির্বচনীয়। যদিচ স্ত্রীপুরুষের প্রকাশু মেলামেশা ও স্বাধীন বরণের অভাবে ভারতবর্ষীয় সমাজে এই প্রেম লাঞ্ছিত হইয়া গুপ্তভাবে বিরাজ করে, তথাপি ভারতবর্ষের কবির নানা ছলে নানা কৌশলে ইহাকে তাহদের কাব্যে আবাহন করিয়া আনিয়াছেন । তাহারা প্রকাগুভাবে সমাজের অবমাননা না করিয়া কাব্যকে সমাজের বাহিরে স্থাপন করিয়াছেন। মালিনীনদীতীরে তপোবনে, সহকারসনাথ-বনজ্যোৎস্নাকুঞ্জে, নবযৌবনা শকুন্তলা সমাজ-কারাবাসী কবিহদয়ের কল্পনাস্বপ্ন। দুষ্মন্তশকুন্তলার প্রেম সমাজের অতীত, এমন-কি, তাহ সমাজবিরোধী । পুন্ধরবার প্রেমোন্মত্তত সমাজবন্ধন ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করিয়া নদী-গিরি-বনের মধ্যে মদমত্ত বন্য হস্তীর মতো উদামভাবে পরিভ্রমণ করিয়াছে। মেঘদূত বিরহের কাব্য। বিরহাবস্থায় দৃঢ়বদ্ধ দাম্পত্যস্থত্রে কিঞ্চিৎ ব্যবচ্ছেদ ঘটিয়া মানব যেন পুনশ্চ স্বতন্ত্রভাবে ভালোবাসিবার অবসর লাভ করে। স্ত্রীপুরুষের মধ্যে সেই ব্যবধান পড়ে যেখানে হৃদয়ের প্রবল অভিমুখী গতি আপনাকে স্বাধীনভাবে প্রবাহিত করিতে স্থান পায়। কুমারসম্ভবে কুমারী গৌরী যদি প্রচলিত সমাজনিয়মের বিরুদ্ধে শৈলতপোবনে একাকিনী মহাদেবের সেবা না করিতেন তবে তৃতীয় সর্গের ন্যায় অমন অতুলনীয় কাব্যের স্বষ্টি হইত কী করিয়া ? এক দিকে বসন্তপুষ্পাভরণ শিরীষপেলবা বেপথুমতী উমা, অন্যদিকে যোগাসীন মহাদেবের অগাধস্তম্ভিত সমুদ্রবিশাল হৃদয়— লোকালয়ের নিয়মপ্রাচীরের মধ্যে বিশ্ববিজয়ী প্রেমের এমন সুযোগ মিলিত কোথায় ? যাহা হউক, মানবরচিত সমাজ আপনার মধ্যে আপনি সম্পূর্ণ পরিতৃপ্ত নয়। যে শক্তি সমাজকে সমাজের বাহিরের দিকে টানে সেই সৌন্দর্য সেই প্রেমের গ্রাম্যসাহিত্য >哈 শক্তিকে অন্তত মানসলোকে স্থাপন করিয়া কল্পনার দ্বারা উপভোগ না করিয়া মানুষ থাকিতে পারে না। পার্থিব সমাজে যদি-বা বাধা পায় তবে দ্বিগুণ তীব্রতার সহিত অধ্যাত্মিক ভাবের মধ্যে তাহাকে আয়ত্ত করিতে চেষ্টা করে । বৈষ্ণবের গান যে দেখিতে দেখিতে সমস্ত ভারতবর্ষ ছাইয়া ফেলিয়াছে ইহাই তাহার প্রধান কারণ। বৈষ্ণবের গান স্বাধীনতার গান। তাহ জাতি মানে না, কুল মানে না। অথচ এই উচ্চুম্বলতা সৌন্দর্ধবন্ধনে হৃদয়বন্ধনে নিয়মিত। তাহ অন্ধ ইন্দ্রিয়ের উদভ্ৰাস্ত উন্মত্ততা মাত্র নহে। * হরগোরীকথায় দাম্পত্যবন্ধনে যেমন কতকগুলি বাধা বর্ণিত হইয়াছে, বৈষ্ণব গাথার প্রেমপ্রবাহেও তেমনি একমাত্র প্রবল বাধার উল্লেখ আছে, তাহ সমাজ । তাহা একাই এক সহস্ৰ । বৈষ্ণব পদাবলীতে সেই সমাজ-বাধার চতুর্দিকে প্রেমের তরঙ্গ উচ্ছসিত হইয়া উঠিতেছে। এমন-কি, বৈষ্ণব কাব্য-শাস্ত্রে পরকীয়া অনুরক্তির বিশেষ গৌরব বর্ণিত হইয়াছে। সে গৌরব সমাজ-নীতির হিসাবে নহে, সে কথা বলাই বাহুল্য । তাহা নিছক প্রেমের হিসাবে । ইহাতে যে আত্মবিস্মৃতি, বিশ্ববিস্কৃতি, নিন্দ ভয় লজ্জা শাসন সম্বন্ধে সম্পূর্ণ ঔদাসীন্য, কঠিন কুলাচার লোকাচারের প্রতি অচেতনতা প্রকাশ পায় তদদ্বারা প্রেমে প্রচণ্ড বল, দুর্বোধ রহস্য, তাহার বন্ধনবিহীনতা, সমাজ-সংসার স্থান-কাল-পাত্র এবং যুক্তিতর্ক কার্যকারণের অতীত একটা বিরাট ভাব পরিস্ফুট হইয় উঠে। এই কারণে যাহা বিশ্বসমাজে সর্বত্রই এক বাক্যে নিন্দিত সেই অভ্ৰভেদ কলঙ্কচুড়ার উপরে বৈষ্ণব কবিগণ র্তাহীদের বর্ণিত প্রেমকে স্থাপন করিয়া তাহার অভিষেকক্রিয়া সম্পন্ন করিয়াছেন । এই সর্বনাশী, সর্বত্যাগী, সর্ববন্ধনচ্ছেদী প্রেমকে অধ্যাত্মিক অর্থে গ্রহণ করিতে না পারিলে কাব্য হিসাবে ক্ষতি হয় না, সমাজ-নীতি হিসাবে হইবার কথা । এইরূপ প্রেমগানের প্রচার সাধারণ লোকের পক্ষে বিপজ্জনক এবং সমাজের পক্ষে অহিতকর মনে হইতে পারে। কিন্তু ফলত তাহ সম্পূর্ণ সত্য নহে। o 囑 ᎼᏌ> লোকসাহিত্য মানবপ্রকৃতিকে সমাজ একেবারে উন্ম,লিত করিতে পারে না । তাহা কাজে কথায় কল্পনায় আপনাকে নানাপ্রকারে ব্যক্ত করিয়া তোলে। তাহা এক দিক হইতে প্রতিহত হইয়া আর-এক দিক দিয়া প্রবাহিত হয় । মানবপ্রকৃতিকে অযথাপরিমাণে এবং সম্পূর্ণভাবে রোধ করাতেই সমাজের বিপদ। সে অবস্থায় যখন সেই রুদ্ধ প্রকৃতি কোনো-একটা আকারে বাহির হইবার পথ পায় তখনই বরঞ্চ বিপদের কতকটা লাঘব হয়। আমাদের দেশে যখন বন্ধবিহীন প্রেমের সমাজবিহিত প্রকাশু স্থান কোথাও নাই, সদর দরজা যখন তাহার পক্ষে একেবারেই বন্ধ, অথচ তাহাকে শাস্ত্র চাপা দিয়া গোর দিলেও সে যখন ভূত হইয়া মধ্যাহরাত্রে রুদ্ধদ্বারের ছিদ্রমধ্য দিয়া দ্বিগুণতর বলে লোকালয়ে পর্যটন করিয়া বেড়ায়, তখন বিশেষরূপে আমাদের সমাজেই সেই কুলমানগ্রাসী কলস্কঅঙ্কিত প্রেম স্বাভাবিক নিয়মে গুপ্তভাবে স্থান পাইতে বাধ্য ; বৈষ্ণব কবির। সেই বন্ধননাশী প্রেমের গভীর দুনিবার আবেগকে সৌন্দর্যক্ষেত্রে অধ্যাত্মলোকে বহুমান করিয়া তাহাকে অনেক পরিমাণে সংসার পথ হইতে মানসপথে বিক্ষিপ্ত করিয়া দিয়াছেন, আমাদের সমাজের সেই চিরক্ষুধাতুর প্রেতটকে পবিত্র গয়ায় পিণ্ডদান করিবার আয়োজন করিয়াছেন । র্তাহারা কামকে প্রেমে পরিণত করিবার জন্য ছন্দোবদ্ধ কল্পনার বিবিধ পরশপাথর প্রয়োগ করিয়াছেন। র্তাহীদের রচনার মধ্যে যে ইন্দ্রিয়বিকার কোথাও স্থান পায় নাই তাহ বলিতে পারি না। কিন্তু বৃহৎ স্রোতস্বিনী নদীতে যেমন অসংখ্য দূষিত ও মৃত পদার্থ প্রতিনিয়ত আপনাকে আপনি সংশোধন করে তেমনি সৌন্দর্য এবং ভাবের বেগে সেই-সমস্ত বিকার সহজেই শোধিত হইয়া চলিয়াছে। বরঞ্চ বিদ্যাসুন্দরের কবি সমাজের বিরুদ্ধে যথার্থ অপরাধী। সমাজের প্রাসাদের নীচে তিনি হাসিয়া হাসিয়া স্বরঙ্গ খনন করিয়াছেন। সে স্বরঙ্গ-মধ্যে পুতস্বর্যালোক এবং উন্মুক্ত বায়ুর প্রবেশপথ নাই। তথাপি এই বিদ্যাসুন্দর কাব্যের এবং বিদ্যাম্বন্দর যাত্রার এত অাদর আমাদের দেশে কেন ? উহা অত্যাচারী কঠিন সমাজের প্রতি গ্রাম্যসাহিত্য స్సె মানবপ্রকৃতির স্বনিপুণ পরিহাস। বৈষ্ণব কবি যে জিনিসটাকে ভাবের ছায়াপথে সুন্দর রূপে অঙ্কিত করিয়াছেন ইনি সেইটাকে সমাজের পিঠের উপরে দাগার মতো ছাপিয়া দিয়াছেন ; যে দেখিতেছে সেই কৌতুক অনুভব করিতেছে। যাহা হউক, মোটের উপর হরগৌরী এবং কৃষ্ণরাধাকে লইয়া আমাদের গ্রাম্যসাহিত্য রচিত। তাহার মধ্যে হরগৌরীর কথা অামাদের ঘরের কথা । সেই হরগৌরীর কথায় আমাদের বাংলাদেশের একটা বড়ো মর্মের কথা আছে। কন্ত। আমাদের গৃহের এক মস্ত ভার ; কন্যাদায়ের মতো দায় নাই । কন্যাপিতৃত্বং খলু নাম কষ্টম। সমাজের অনুশাসনে নির্দিষ্ট বয়স এবং সংকীর্ণ মণ্ডলীর মধ্যে কন্যার বিবাহ দিতে আমরা বাধ্য। সুতরাং সেই কৃত্রিম তাড়নাবশতই বরের দর অত্যন্ত বাড়িয়া যায়, তাহার রূপগুণ অর্থসামর্থ্যে আর তত প্রয়োজন থাকে না । কন্যাকে অযোগ্য পাত্রে সমর্পণ করা, ইহা আমাদের সমাজে নিত্যনৈমিত্তিক দুর্ঘটনা । ইহা লইয়। দুশ্চিন্তা, অনুতাপ, অশ্রুপাত, জামাতৃপরিবারের সহিত বিরোধ, পিতৃকুল ও পতিকুলের মধ্যবর্তিনী বালিকার নিষ্ঠুর মৰ্মবেদনা, সর্বদাই ঘরে ঘরে উদভূত হইয়া থাকে। একান্নপরিবারে আমরা দূর ও নিকট, এমন-কি, নামমাত্র আত্মীয়কেও_ৰ্বাধিয়া_রাথিতে চাই ; কেবল কন্যাকেই ফেলিয়া দিতে হয়। যে সমাজে স্বামী-স্ত্রী ব্যতীত পুত্রকন্যা প্রভৃতি সকলেই বিচ্ছিন্ন হইয়া যায় তাহারা আমাদের এই দুঃসহ বেদন কল্পনা করিতে পারিবে না। আমাদের মিলনধর্মী পরিবারে এই একমাত্র বিচ্ছেদ। স্বতরাং ঘুরিয়া ফিরিয়া সর্বদাই সেই ক্ষতবেদনায় হাত পড়ে। হরগৌরীর কথা বাংলার একান্নপরিবারের সেই প্রধান বেদনার কথা । শরৎসপ্তমীর দিনে সমস্ত বঙ্গভূমির ভিখারি-বধু কন্যা মাতৃগৃহে আগমন করে, এবং বিজয়ার দিনে সেই ভিখারিঘরের অন্নপূর্ণ যখন স্বামীগৃহে ফিরিয়া যায় তখন সমস্ত বাংলাদেশের চোখে জল ভরিয়া আসে । এই-সকল কারণে হরগৌরীসম্বন্ধীয় গ্রাম্যছড়াগুলি বাস্তব ভাবের । তাহ y е е লোকসাহিত্য রচয়িত ও শ্রোতৃবর্গের একান্ত নিজের কথা । সেই-সকল কাব্যে জামাতার নিন্দা, স্ত্রীপুরুষের কলহ ও গৃহস্থালীর বর্ণনা যাহা আছে তাহাতে রাজভাব বা দেবভাব কিছুই নাই ; তাহাতে বাংলাদেশের গ্রাম্য কুটিরের প্রাত্যহিক দৈন্ত ও ক্ষুদ্রতা সমস্তই প্রতিবিম্বিত। তাহাতে কৈলাস ও হিমালয় আমাদের পানাপুকুরের ঘাটের সম্মুখে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে, এবং তাহাদের শিখররাজি আমাদের অাম-বাগানের মাথা ছাড়াইয়া উঠিতে পারে নাই। যদি তাহারা নিজ নিজ অভ্ৰভেদী মূর্তি ধারণ করিবার চেষ্টামাত্র করিতেন তাহা হইলে বাংলার গ্রামের মধ্যে র্তাহীদের স্থান হইত না । শরৎকালে রানী বলে বিনয়বচন— আর শুনেছ গিরিরাজ নিশার স্বপন ? Η এই স্বপ্ন হইতে কথা আরম্ভ। সমস্ত আগমনী গানের এই ভূমিকা। প্রতি বৎসর শরৎকালে ভোরের বাতাস যখন শিশিরসিক্ত এবং রৌদ্রের রঙ কাচা সোনার মতো হইয়া আসে, তখন গিরিরানী সহসা একদিন তাহার শ্মশানবাসিনী সোনার গৌরীকে স্বপ্ন দেখেন, আর বলেন— অার শুনেছ গিরিরাজ নিশার স্বপন ? এ স্বপ্ন গিরিরাজ আমাদের পিতামহ এবং প্রপিতামহদের সময় হইতে ললিত বিভাস এবং রামকেলি রাগিণীতে শুনিয়া আসিতেছেন, কিন্তু প্রত্যেক বৎসরই তিনি নূতন করিয়া শোনেন । ইতিবৃত্তের কোন বৎসরে জানি না, হরগৌরীর বিবাহের পরে প্রথম যে শরতে মেনকারানী স্বপ্ন দেখিয়া প্রত্যুষে জাগিয়া উঠিয়াছিলেন সেই প্রথম শরৎ সেই তাহার প্রথম স্বপ্ন লইয়াই বর্ষে বর্ষে ফিরিয়৷ ফিরিয়া আসে । জলে স্থলে আকাশে একটি বৃহৎ বেদনা বাজিয়া উঠে, যাহাকে পরের হাতে দিয়াছি আমার সেই আপনার ধন কোথায় ! বৎসর গত হয়েছে কত, করছে শিবের ঘর । যাও গিরিরাজ, আনতে গৌরী কৈলাসশিখর ॥ গ্রাম্যসাহিত্য > o \2 শুন গৌরী, কৈলাসপুর তুচ্ছ তোমার ঠাই। দেখছি তোমার কাঙাল পিতার ঘর-দরজা নাই। শেষ দুইটি ছত্ৰ বুঝিতে একটু গোল হয়। ইহার অর্থ এই যে, তোমার বাসের পক্ষে কৈলাসপুরীই তুচ্ছ, এমন স্থলে তোমার কাঙাল পিতা তোমাকে স্থান দিতে পারেম এমন সাধ্য র্তাহার কী অাছে ! পতিকে লইয়া পিতার সহিত বিরোধ করিতে হয়, আবার পিতাকে লইয়া পতির সহিত বিবাদ বাধিয়া উঠে— উমার এমনি অবস্থা । গৌরী কন, আমি কইলে মিছে দন্দেজ হবে। সেই-যে আমার কাঙাল পিতা ভিক্ষা মাঙছেন কবে ॥ তার রাজার বেটা, দালান-কোঠা অট্টালিকাময়। যাগযজ্ঞ করছে কত, শ্মশানবাসী নয় ॥ তারা নানা দানপুণ্যবান দেবকার্য করে । এক দফাতে কাঙাল বটে, ভাঙ নাই তার ঘরে ॥ কিন্তু কড়া জবাব দিয়া কার্যোদ্ধার হয় না। বরং তর্কে পরাস্ত হইলে গায়ের জোর আরো বাড়িয়া উঠে। সেই বুঝিয়া দুর্গ তখন— গুটি পাঁচ-ছয় সিদ্ধির লাডু যত্ন ক’রে দিলেন। দাম্পত্যযুদ্ধে এই ছয়টি সিদ্ধির লাডু কামানের ছয়টা গোলার মতো কাজ করিল ; ভোলানাথ এক দমে পরাভূত হইয়া গেলেন। সহসা পিতা কন্যা ও জামাতার ঘনিষ্ঠ মিলন হইয়া গেল । বাক্যহীন নন্দী সকৌতুক ভক্তিভরে দ্বারপাশে দাড়াইয়া মনে মনে হাসিতে লাগিল । সন্ত্রমে সম্ভাষণ করি বসলেন তিন জন । দুর্গা, মর্তে যেয়ে কী আনিবে অামার কারণ ॥ প্রতিবারে কেবলমাত্র বিল্বপত্র পাই । দেবী বললেন, প্রভু ছাড কোন দ্রব্য খাই । So 3 লোকসাহিত্য সি*ছর-ফোটা অলকছটা মুক্ত গাথা কেশে । সোনার বীপা কনকচাপা শিব তুলেছেন যে বেশে । রত্নহার গলে তার দুলছে সোনার পাট । চাঁদনি রাত্রিতে যেন বিদ্যুৎ দিচ্ছে ছটা । তাড় কঙ্কণ সোন পৈছি শঙ্খ বাহুমূলে । বাক-পরা মল সোনার নূপুর, আঁচল হেলে দোলে। সিংহাসন, পট্টবসন পরছে ভগবতী । কাতিক গণেশ চললেন লক্ষ্মী সরস্বতী ॥ জয় বিজয়া দাসী চললেন দুই জন । গুপ্তভাবে চললেন শেষে দেব পঞ্চানন ॥ গিরিসঙ্গে পরম রঙ্গে চললেন পরম মুখে । ষষ্ঠ তিথিৎ উপনীত হলেন মর্তলোকে । সারি সারি ঘট বারি আর গঙ্গাজল। সাবধানে নিজ মনে গাচ্ছেন মঙ্গল ॥ তখন— গিরিরানী কন বাণী চুমো দিয়ে মুখে, কও তারিণী, জামাই-ঘরে ছিলে কেমন সুখে ॥ এই ছড়াটি এইখানে শেষ হইল— ইহার বেশি আর বলিবার কথা নাই। এ দিকে বিদায়ের কাল সমাগত । কন্যাকে লইয়া শ্বশুরঘরের সহিত বাপের ঘরের একটু ঈর্ষার ভাব থাকে। বেশিদিন বধূকে বাপের বাড়িতে রাখ। শ্বশুরপক্ষের মনঃপূত নহে। বহুকাল পরে মাতায় কন্যায় যথেষ্ট পরিতৃপ্তিপূর্বক মিলন হইতে-না-হইতেই শ্বশুরবাড়ি হইতে তাগিদ অাসে, ধন্না বসিয়া যায়। স্ত্রীবিচ্ছেদবিধুর স্বামীর অধৈর্য তাহার কারণ নহে। হাজার হউক বধু পরের ঘর হইতে আসে ; শ্বশুরঘরের সহিত তাহার সম্পূর্ণ জোড় লাগ৷ বিশেষ গ্রাম্যসাহিত্য * У e & চেষ্টার কাজ। সেখানকার নূতন কর্তব্য অভ্যাস ও পরিচয় -বন্ধন হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া তাহার বাল্যকালের স্বাভাবিক অপ্রত্নস্থলে ঘন ঘন যাতায়াত বা দীর্ঘকাল অবস্থিতি করিতে দিলে জোড় লাগিবার ব্যাঘাত করে । বিশেষত বাপের বাড়িতে বিবাহিত কন্যার কেবলই কর্তব্যহীন আদর, শ্বশুরবাড়িতে তাহার কর্তব্যের শাসন, এমন অবস্থায় দীর্ঘকাল বাপের বাড়ির আবহাওয়া শ্বশুরবর্গ বধূর পক্ষে প্রার্থনীয় জ্ঞান করেন না। এই-সকল নানা কারণে পিতৃগৃহে কন্যার গতিবিধি সম্বন্ধে শ্বশুরপক্ষীয়ের বিধান কিছু কঠোর হইয়াই থাকে। কন্যাপিতৃত্বের সেও একটা কষ্ট । বিজয়ার দিন বাংলাদেশের শ্বশুরবাড়ির সেই কড়া তাগিদ লইয়া শিব মেনকার দ্বারে আসিয়া উপস্থিত। মাতৃস্নেহের স্বাভাবিক অধিকার সমাজ-শাসনের বিরুদ্ধে বৃথা আছাড় খাইয়া মরিতে লাগিল । নাহি আজ গিরিরাজ, শিবকে বলে যেয়ে । অমনি ভাবে ফিরে যাক সে, থাকবে আমার মেয়ে ॥ তখন, শ্বশুরবাড়িতে দুর্গার ষত-কিছু দুঃখ আছে সমস্ত মাতার মনে পড়িতে লাগিল। শিবের ভাণ্ডারে যত অভাব, আচরণে যত ত্রুটি, চরিত্রে যত দোষ, সমস্ত র্তাহার নিকট জাজল্যমান হইয়া উঠিল। অপাত্রে কন্যাদান করিয়াছেন, এখন সেটা যতটা পারেন সংশোধন করিবার ইচ্ছা, যতটা সম্ভব গৌরীকে মাতৃক্রোড়ে ফিরাইয়া লইবার চেষ্টা । শ্বশুরুগৃহের আচারবিচার অনেক সময় দূর হইতে পিতৃগৃহের নিকট অযথা বলিয়া মনে হয় এবং পিতৃপক্ষীয়েরা স্নেহের আক্ষেপে কন্যার সমক্ষেই তাহার কঠোর সমালোচনা করিয়া থাকেন। মেমক তাহাই শুরু করিলেন, এবং শিব সেই অন্যায় আচরণে ক্ষিপ্ত হইয়া শ্বশুরবাড়ির অনুশাসন সতেজে প্রচার করিয়া দিলেন— মর্তে আসি পূর্বকথা ভুলছ দেখি মনে । বারে বারে নিষেধ তোমায় করছি এ কারণে ॥ লোকসাহিত্য ט • מ মায়ের কোলে মত্ত হয়ে ভুলছ দেখি স্বামী । তোমার পিতা কেমন রাজা তাই দেখব আমি ॥ শুনে কথা গিরিরাজা উন্মাযুক্ত হল। জয়-জোগাড়ে অভয়ারে যাত্রা করে দিল । যে নিবে সে ক’তে পারে, নইলে এমন শক্তি কার । যাও তারিণী হরের ঘরে, এসে পুনর্বার ॥ অনুগ্রহের সংকীর্ণ মেয়াদ উত্তীর্ণ হইল, কন্যা পতিগৃহে ফিরিয়া গেল। এক্ষণে যে ছড়ার আলোচনায় প্রবৃত্ত হইতেছি তাহাতে দেবদেবীর একটি গোপন ঘরের কথা বর্ণিত আছে— শিবসঙ্গে রসরঙ্গে বসিয়ে ভবানী । কুতুহলে উমা বলেন ত্রিশূলখুলপাণি, তুমি প্রভু তুমি প্ৰভু ত্ৰৈলোক্যের সার— ইন্দ্র চন্দ্র কুবের বরুণ তোমারি কিংকর । তোমার নারী হয়ে আমার সাধ নাহি পোরে । ষেন বেন্যা পতির কপালে প’ড়ে রমণী ঝোরে ॥ দিব্য সোনার অলংকার না পরিলাম গায় । শমের বরন দুই শঙ্খ পরতে সাধ যায় ॥ দেবের কাছে মরি লাজে হাত বাড়াতে নারি । বারেক মোরে দাও শঙ্খ তোমার ঘরে পরি ॥ ভোলানাথ ভাবিলেন, একটা কৌতুক করা যাক। প্রথমেই একটু কোন্দল বাধাইয়া তুলিলেন— ভেবে ভোলা হেসে কন শুন হে পার্বতী, আমি তো কড়ার ভিখারি ত্রিপুরারি শঙ্খ পাব কথি । হাতের শিঙাটা বেচলা পরে হবে না গ্রা ম্যসাহিত্য > e o একখানা শঙ্খের কড়ি, বলদটা মূল করিলে হবে কাহনটেক কড়ি । এটি ওটি ঠাক ঠিকাটি চাও হে গৌরী, থাকলে দিতে পারি। তোমার পিতা আছে বটে অর্থের অধিকারী। সে কি দিতে পারে না দুমুটো শঙ্খের মুজুরি ॥ এই-যে ধনহীনতার ভড়ং এটা মহাদেবের নিতান্ত বাড়াবাড়ি, স্ত্রীজাতির নিকট ইহা স্বভাবতই অসহ। স্ত্রী যখন ব্রেসলেট প্রার্থনা করে কেরানিবাৰু তখন অায়ব্যয়ের সুদীর্ঘ হিসাব বিশ্লেষণ করিয়া আপন দারিদ্র্য প্রমাণ করিতে বসিলে কোন ধর্মপত্নী তাহা অবিচলিত রসনায় সহ করিতে পারে ? বিশেষত শিবের দারিদ্র্য ওটা নিতান্তই পোশাকি দারিদ্র্য ; তাহা কেবল ইন্দ্র চন্দ্র বরুণ সকলের উপরে টেক্কা দিবার জন্য, কেবল লক্ষ্মীর জননী অন্নপূর্ণার সহিত একটা অপরূপ কৌতুক করিবার অভিপ্রায়ে। কালিদাস শংকরের অট্টহাস্তকে কৈলাসশিখরের ভীষণ তুহিনপুঞ্জের সহিত তুলনা করিয়াছেন ; মহেশ্বরের শুভ্রদারিদ্র্যও তাহার এক নি:শব অট্টহাস্য। কিন্তু দেবতার পক্ষেও কৌতুকের একটা সীমা অাছে। মহাদেবী এ সম্বন্ধে নিজের মনের ভাব যেরূপে ব্যক্ত করিলেন তাহা অত্যন্ত স্পষ্ট । তাহাতে কোনো কথাই ইঙ্গিতের অপেক্ষায় রহিল না । গৌরী গজিয়ে কন, ঠাকুর শিবাই আমি গৌরী তোমার হাতে শঙ্খ পরতে চাই । আপনি যেমন যুব-যুবতী অমনি যুবক পতি হয় তবে সে বৈরস রস নইলে কিছুই নয় ॥ আপনি বুড়ো আধবয়সী ভাঙথুতুরায় মত্ত । আপনার মতো পরকে বলে মন্দ ॥ লোকসাহিত্য سb ه له. এইখানে শেষ হয় নাই— ইহার পরে দেবী মনের ক্ষোভে আরো দুই-চারিটি যে কথা বলিয়াছেন তাহা মহাদেবের ব্যক্তিগত চরিত্র সম্বন্ধে ; তাহা সাধারণ্যে প্রকাশযোগ্য নহে। সুতরাং আমরা উদ্ভূত করিতে ক্ষাস্ত হইলাম। ব্যাপারটা কেবল এইখানেই শেষ হইল না ; স্ত্রীর রাগ যতদূর পর্যন্ত যাইতে পারে, অর্থাৎ বাপের বাড়ি পর্যন্ত, তাহা গেল । কোলে করি কাতিক ইটোয়ে লম্বোদরে ক্রোধ করি হরের গৌরী গেলা বাপের ঘরে ॥ এ দিকে শিব তাহার সংকল্পিত দাম্পত্যপ্রহসনের নেপথ্যবিধান শুরু করিলেন। বিশ্বকৰ্ম৷ এনে করান শঙ্খের গঠন । শঙ্খ লইয়া শাখারি সাজিয়া বাহির হইলেন— দুই বাহু শঙ্খ নিলেন নাম শ্রীরাম লক্ষ্মণ । কপটভাবে হিমালয়ে তলাসে ফেরেন | হাতে শূলী কাখে থলি শম্ভু ফেরে গলি গলি। শঙ্খ নিবি শঙ্খ নিবি এই কথাটি ব’লে ৷ সখীসঙ্গে বসে গৌরী আছে কুতুহলে। শঙ্খ দেখি শঙ্খ দেখি এই কথাটি বলে ৷ গৌরীকে দেখায়ে শাখারি শঙ্খ বার ক’ল্প । শঙ্খের উপরে যেন চন্দ্র উদয় হল । মণি-মুকুতা-প্রবাল-গাথা মাণিক্যের ঝুরি । নব ঝলকে ঝলকে যেন ইন্দ্রের বিজুলি । দেবী খুশি হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন— শাখারি ভালো এনেছ শঙ্খ । শঙ্খের কত নিবে তঙ্ক । 3) ম্যসাহিত্য > e > দেবীর লুদ্ধভাব দেখিয়া চতুর শাখারি প্রথমে দর-দামের কথা কিছুই জালোচন। করিল না ; কহিল— গৌরী, ব্রহ্মলোক, বৈকুণ্ঠ, হরের কৈলাস, এ তে সবাই কয়। বুঝে দিলেই হয় । হস্ত ধুয়ে পরে শঙ্খ, দেরি উচিত নয় । শাখারি মুখে মুখে হরের স্থাবর সম্পত্তির যেরূপ ফর্দ দিল তাহাতে শাখাজোড়। যে বিশেষ সস্তায় যাইবে মহাদেবীর এমন মনে করা উচিত ছিল না। গৌরী আর মহাদেবে কথা হল দড় । সকল সখি বলে দুর্গা শঙ্খ চেয়ে পরে । কেউ দিলেন তেল গামছা কেউ জলের বাটি । দেবের উরুতে হস্ত খুয়ে বসলেন পার্বতী ॥ দয়াল শিব বলেন, শঙ্খ আমার কথাটি ধরে । দুর্গার হাতে গিয়ে শঙ্খ বজ্র হয়ে থাকে ॥ শিলে নাহি ভেঙো শঙ্খ খড়েগ নাহি ভাঙো । দুর্গার সহিত করেন বাক্যের তরঙ্গ ॥ এ কথা শুনিয়া মাতা মনে মনে হাসে । শঙ্খ পরাম জগৎপিতা মনের হরষে ॥ শাখারি ভালো দিলে শঙ্খ মামায়ে । ভাণ্ডার ভেঙে দেইগে তঙ্ক লওগে গনিয়ে ॥ এতক্ষণে শাখারি সময় বুঝিয়া কহিল— অামি যদি তোমার শঙ্খের লব তঙ্ক জ্ঞেয়াত-মাঝারে মোর রহিবে কলঙ্ক | ইহারা যে বংশের শাখারি তাহদের কুলাচার স্বতন্ত্র ; তাহদের বিষয়বুদ্ধি কিছুমাত্র নাই; টাকাকড়ি সম্বন্ধে বড়ো নিস্পৃহ ; ইহারা যাহাকে শাখা পরান লোকসাহিত্য * ۰ داد র্তাহাকে পাইলেই মূল্যের আর কোনো প্রকার দাবি রাখেন না । ব্যবসায়টি অতি উত্তম । কেমন কথা কও শাখারি কেমন কথা কও ৷ মানুষ বুঝিয়া শাখারি এসব কথা কও ৷ শাখারি কহিল— না করে বড়াই দুর্গ না করে। বড়াই । সকল তত্ত্ব জানি আমি এই বালকের ঠাই । তোমার পতি ভাঙড় শিব তা তো আমি জানি । নিতি নিতি প্রতি ঘরে ভিক্ষা মাঙেন তিনি । ভস্মমাখা তায় ভুজঙ্গ মাথে অঙ্গে । নিরবধি ফেরেন তিনি ভূত-পেরেতের সঙ্গে । ইহাকেই বলে শোধ তোলা। নিজের সম্বন্ধে যে-সকল স্পষ্ট ভাষা মহাদেব সহধর্মিণীর মুখ হইতে মধ্যে মধ্যে শুনিয়া আসিয়াছেন; অদ্য স্থযোগমত সেই সত্য কথাগুলিই গৌরীর কানে তুলিলেন। এই কথা শুনি মায়ের রোদন বিপরীত । বাহির করতে চান শঙ্খ না হয় বাহির । পাষাণ অনিল চণ্ডী শঙ্খ না ভাঙিল। শঙ্খেতে ঠেকিয়া পাষাণ খণ্ড খণ্ড হল । কোনোরূপে শঙ্খ যখন না হয় কর্তন । খড়গ দিয়ে হাত কাটিতে দেবীর গেল মন ॥ হস্ত কাটিলে শঙ্খে ভরিবে রুধিরে । রুধির লাগিলে শঙ্খ নাহি লব ফিরে ॥ মেনকা গো মা, কী কুক্ষণে বাড়ছিলাম পা । N O R লোকসাহিত্য কদম্বের পুপ বলেন সভা-বিদ্যমানে সাজিয়া দুলিব আজি গোবিন্দের কানে ॥ করবীর পুষ্প বলেন, আমার মর্ম কে বা জানে— আজ আমায় রাখবেন হরি চুড়ার সাজনে ॥ । অলক-ফুলের কনক দাম বেলফুলের গাথনি— আমার হৃদয়ে শুাম দুলাবে চূড়ামণি ৷ আনন্দেতে পদ্ম বলেন, তোমরা নানা ফুল আমায় দেখলে হবে চিত্ত ব্যাকুল । চরণতলে থাকি অামি কমল পদ্ম নাম রাধাকৃষ্ণে একাসনে হেরিব বয়ান । কোনো ফুলকেই নিরাশ হইতে হইল না ; সেদিন তাহদের ফুটিয়া ওঠা সার্থক হইল— ফুলেরই উড়ানি ফুলেরই জামাজুরি সুবল সাজাইলি ভালো । ফুলেরই পাগ ফুলেরই পোশাক সেজেছে বিহারীলাল । নানা অভিরণ ফুলেরই ভূষণ চুড়াতে করবী ফুল। কপালে কিরীটি অতি পরিপাটি পড়েছে চাচর চুল। এ দিকে কৌতুহলী ভ্রমর-ভ্রমরী ময়ুর-ময়ূরী খঞ্জন-খঞ্জনীর মেলা বসিয়া গেল। যে-সকল পাখির কণ্ঠ আছে তাহারা স্ববলের কলানৈপুণ্যের প্রশংসা করিতে লাগিল। কোকিল সস্ত্রীক আসিয়া বলিয়া গেল ‘কিংকিণী কিরীটি অতি পরিপাটি’— গ্রাম্যসাহিত্য סי כי צ ডাহুক ডাহুকী টিয়া টুয়া পাখি ঝংকারে উড়িয়া যায় । তাহারা ঝংকার করিয়া কী কথা বলিল ? স্থবল রাখাল সাজায়েছে ভালো বিনোদবিহারীরায় । এ দিকে চাতক-চাতকী খ্যামকে মেঘ ভ্ৰম করিয়া উড়িয়া উড়িয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়৷ ‘জল দে’ ‘জল দে’ বলিয়৷ ডাকিয় বেড়াইতে লাগিল । বনের মধ্যে শাখায় পল্লবে বাতাসে আকাশে ভারি একটা রব পড়িয়া গেল। কানাই বলিছে প্রাণের ভাই রে সুবল কেমনে সাজালে ভাই বল দেখি বল। কানাই জানেন তাহার সাজ সম্পূর্ণ হয় নাই। কোকিল-কোকিল। আর ডাহুক-ডাহুকীরা যাহাই বলুক-না কেন, স্ববলের রুচি এবং নৈপুণ্যের প্রশংসা করিবার সময় হয় নাই। নানা ফুলে সাজালে ভাই, বামে দাও প্যারী। তবে তো সাজিবে তোর বিনোদবিহারী । , বৃন্দাবনের সর্বপ্রধান ফুলটিই বাকি ছিল। সেই অভাবটা পশু-পক্ষীদের নজরে না পড়িতে পারে, কিন্তু শু্যামকে যেন বাজিতে লাগিল । কুঞ্জ-পানে যে দিকে ভাই চেয়ে দেখি আঁখি । স্থখময় কুঞ্জবন অন্ধকার দেখি । তখন লজ্জিত মুবল কহিল— এই স্থানে থাকে৷ তুমি নবীন বংশীধারী। খুঁজিয়া মিলাব আজ কঠিন কিশোরী ॥ এ দিকে ললিতা-বিশাখা সখীদের মাঝখানে রাধিকা বসিয়া আছেন। bo > S 8 লোকসাহিত্য স্ববলকে দেখিয়া সবাই হয়ে হরষিত— এসো এসো বোসো সুবল একী অচরিত ৷ সুবল সংবাদ দিল— মন্দ মন্দ বহিতেছে বসন্তের বা, পত্র পড়ে গলি । কাদিয়া বলেন কৃষ্ণ কোথায় কিশোরী ॥ কৃষ্ণের দুরবস্থার কথা শুনিয়া রাধা কাদিয়া উঠিয়া কহিলেন— সাধ ক’রে হার গেঁথেছি সই, দিব কার গলে । বাপ দিয়ে মরিব আজ যমুনার জলে । রাই অনাবশ্বক এইরূপ একটা দুঃসাধ্য দুঃসাহসিক ব্যাপার ঘটইবার জন্য মুহূর্তের মধ্যে কৃতসংকল্প হইয়া উঠিলেন। কিন্তু অবশেষে সখীদের সহিত রফা করিয়া বলিলেন— যেই সাজে আছি আমি এই বৃন্দাবনে সেই সাজে যাব আমি কৃষ্ণদরশনে ॥ দাড়া লো দাড়া লো সই বলে সহচরী। ধীরে যাও ফিরে চাও রাধিকাসুন্দরী । রাধিক সখীদের ডাকিয়া বলিলেন— তোমরা গো পিছে এসো মাথে করে দই । নাথের কুশল হোক, ঝটিৎ এসে সই। রাধা প্রথম আবেগে যদিও বলিয়াছিলেন, যে সাজে আছেন সেই সাজেই যাইবেন, কিন্তু সে প্রতিজ্ঞা রহিল না। ’ হালিয়া মাথায় বেণী বামে বাধি চুড়া অলকা তিলকা দিয়ে এ*টে পরে ধড়া । ধড়ার উপর তুলে নিলেন স্ববর্ণের ঝরা ॥ গ্রাম্যসাহিত্য X > (t সোনার বিজটা শোভে হাতে তাড়বালা । গলে শোভে পঞ্চরত্ন তক্তি কণ্ঠমালা । চরণে শোভিছে রাইয়ের সোনার নৃপুর। কটিতে কিংকিণী সাজে, বাজিছে মধুর । চিস্তা নাই চিন্তা নাই বিশাখা এসে বলে । ধবলীর বৎস একটি তুলে লও কোলে । সখীরা সব দধির ভাণ্ড মাথায় এবং রাধিক ধবলীর এক বাছুর কোলে লইয়া গোয়ালিনীর দল ব্রজের পথ দিয়া শু্যাম-দরশনে চলিল। কৃষ্ণ তখন রাধিকার রূপ ধ্যান করিতে করিতে অচেতন । সাক্ষাতে দাড়ায়ে রাই বলিতেছে বাণী— কী ভাব পড়িছে মনে শু্যাম গুণমণি । যে ভাব পড়েছে মনে সেই ভাব আমি । রাধিক সগর্বে সবিনয়ে কহিলেন, তোমারই অস্তরের ভাব আমি বাহিরে প্রত্যক্ষ বিরাজমান । গাও তোলো চক্ষু মেলো ওহে নীলমণি । কাদিয়ে কাদাও কেন, আমি বিনোদিনী ॥ অঞ্চলেতে ছিল মালা দিল কৃষ্ণের গলে । রাধাকৃষ্ণের যুগল মিলন ভাওঁীরবনে ॥ ভাণ্ডীরবনবিহারীর সাজ সম্পূর্ণ হইল ; স্ববলের হাতের কাজ সমাধা হইয়া গেল। ইহার মধ্যে বিশেষ করিয়া বাংলার গ্রাম্যদৃশু গৃহচিত্র কিছুই নাই । গোয়ালিনীরা যেরূপ সাজে নূপুর কিংকিণী বাজাইয়া, দধি মাথায়, বাছুর কোলে বনপথ দিয়া চলিয়াছেন, তাহা বাংলার গ্রামপথে প্রত্যহ অথবা কদাচিৎ দেখিতে পাওয়া যায় না। রাখালের মাঠের মধ্যে বটচ্ছায়ায় অনেকরকম খেলা করে, কিন্তু ফুল লইয়া তাহদের ও তাহাদিগকে লইয়া ফুলের এমন মাতামাতি শুনা লোকসাহিত্য وی به نام যায় না। এ-সমস্ত ভাবের স্বষ্টি । কৃষ্ণরাধার বিরহ-মিলন সমস্ত বিশ্ববাসীর বিরহমিলনের অাদর্শ ; ইহার মধ্যে ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মণসমাজ বা মনুসংহিতা নাই ; ইহার আগাগোড়া রাখালি কাণ্ড । যেখানে সমাজ বলবান সেখানে বৃন্দাবনের গোচারণের সঙ্গে মথুরার রাজ্যপালনের একাকার হওয়া অত্যন্ত অসংগত। কিন্তু কৃষ্ণরাধার কাহিনী যে ভাবলোকে বিরাজ করিতেছে সেখানে ইহার কোনো কৈফিয়ৎ আবশ্যক করে না। এমন-কি, সেখানে চিরপ্রচলিত সমস্ত সমাজপ্রথাকে অতিক্রম করিয়া বৃন্দাবনের রাখালবৃত্তি মথুরার রাজত্ব অপেক্ষা অধিকতর গৌরবজনক বলিয়া সপ্রমাণ হইয়াছে। আমাদের দেশে, যেখানে কর্মবিভাগ শাস্ত্রশাসন এবং সামাজিক উচ্চনীচতার ভাব সাধারণের মনে এমন দৃঢ় বদ্ধমূল, সেখানে কৃষ্ণরাধার কাহিনীতে এই-প্রকার আচারবিরুদ্ধ বন্ধনবিহীন ভাবের স্বাধীনতা যে কত বিস্ময়কর তাহা চিরাভ্যাসক্রমে আমরা অতুভব করি না । * কৃষ্ণ মথুরায় রাজত্ব করিতে গেলে রাধিক কাদিয়া কহিলেন— আর কি এমন ভাগ্য হবে, ব্রজে আসবে হরি । সে গিছে মথুরাপুরী, মিথ্যে আশা করি । , রাজাকে পুনরায় রাখাল করিবার আশা দুরাশা, এ কথা সকলকেই স্বীকার করিতে হইবে । কিন্তু, বৃন্দা বৃন্দাবনের আসল কথা বোঝে, সে জানে নিরাশ হইবার কোনো কারণ নাই। সে জানে, বৃন্দাবন-মথুরায় কাশী-কাঞ্চীর নিয়ম ঠিক খাটে না । বুন্দে বলে অামি যদি এনে দিতে পারি তবে মোরে কী ধন দিবে বল তো কিশোরী ॥ শুনে বাণী কমলিনী যেন পড়িল ধন্দে— দেহপ্রাণ করেছে দান কৃষ্ণপদণরবিন্দে ॥ গ্রাম্যসাহিত্য > > " এক কালেতে র্যাক সঁপেছি বিরাগ হলেন র্তাই । যম-সম কোনো দেবতা রাধিকার নাই। ইহা বই নিশ্চয় কই কোথা পাব ধন। মোর কেবল কৃষ্ণনাম অঙ্গের ভূষণ । রাজার নন্দিনী মোর। প্রেমের ভিখারি— বধুর কাছে সেই ধন লয়ে দিতে পারি। বলছে দূতী, শোন শ্ৰীমতী, মিলবে স্যামের সাথে । তখন দুজনের দুই যুগল চরণ, তাই দিয়ে মোর মাথে । এই পুরস্কারের কড়ার করাইয়া লইয়া দুতী বাহির হইলেন। যমুনা পার হইয়। পথের মধ্যে— হাস্যরসে একজনকে জিজ্ঞাসিলেন তবে, কও দেখি কার অধিকারে বসত কর সবে ॥ সে লোক বললে তখন রাজা কৃষ্ণচন্দ্ররায়, মেঘের ধারা রৌদ্রে যেমন লাগল দূতীর গায় । ননীচোরা রাখাল ছোড়া ঠাট করেছে আসি । চোর বিনে তাকে কবে ডাকছে গোকুলবাসী । কৃষ্ণের এই রায়বাহাদুর খেতাবটি দূতীর কাছে অত্যন্ত কৌতুকাবহ বোধ হইল । কৃষ্ণচন্দ্ররায়, এ তো আসল নাম নয়। এ কেবল মূঢ় লোকদিগকে ভুলাইবার একটা আড়ম্বর । আসল নাম বৃন্দ জানে। চললেন শেষে কাঙালবেশে উতরিলেন দ্বারে । হুকুম বিনে রাত্রিদিনে কেউ না যেতে পারে । বহুকষ্টে হুকুম আনাইয়। ‘বৃন্দাদূতী গেল সভার মাঝে’ । সম্ভাষণ করি দূতী থাকল কতক্ষণ । একদৃষ্টে চেয়ে দেখৈ কৃষ্ণের বদন । ৮ক লোকসাহিত্য ילג כ ধড়াচুড়া ত্যাগ করিয়ে মুকুট দিয়েছ মাথে । সব অঙ্গে রাজ-আভরণ, বংশী মাইকে হাতে ॥ সোনার মালা, কণ্ঠহার, বাহুতে বাজুবন্ধ। শ্বেত চামরে বাতাস পড়ে দেখে লাগে ধন্দ ॥ নিশান উড়ে, ডঙ্কা মারে, বলছে খবরদার । ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের ঘটা ব্যবস্থা বিচার ॥ অার এক দরখাস্ত করি শুন দামোদর। যমুনাতে দেখে এলেম এক তরী মনোহর । শূন্ত হয়ে ভাসছে তরী ওই যমুনা-তীরে । কাণ্ডার অভাবে নৌকা ঘাটে ঘাটে ফিরে ॥ পূর্বে এক কাণ্ডারী ছিল সর্বলোকে কয়। সে চোর পালালে৷ কোথা তাকে ধরতে হয় ॥ শুনতে পেলেম হেথা এলেম মথুরাতে আছে। হাজির না কর যদি জানতে পাবে পাছে ॥ —মেয়ে হয়ে কয় কথা, পুরুষের ডরায় গা । সভামৃদ্ধ নি:শব্দ, কেউ না করে রা ॥— ব্ৰজপুরে ঘর বসতি মোর । ভাও ভেঙে মনি খেয়ে পলায়েছে চেণর ॥ চোর ধরিতে এই সভাতে আসছে অভাগিনী । কেমন রাজা বিচার কর জানব তা এখনি ॥ বৃন্দা কৃষ্ণচন্দ্ররায়ের রাজসম্মান রক্ষা করিয়া ঠিক দস্তুর-মত কথাগুলি বলিল— অন্তত কবির রিপোর্ট দৃষ্টে তাহাই বোধ হয়— তবে উহার মধ্যে কিছু ম্পর্ধাও ছিল । বৃন্দ। মথুরার উপরে আপন বৃন্দাবনের দেমাক ফলাইতে ছাড়ে নাই। "হাজির না কর যদি জানতে পাবে পাছে’ এ কথাটা খুব চড়া কথা ; গ্রাম্যসাহিত্য ``TS শুনিয় সভ্যস্থ সকলে নিঃশব হইয়। গেল। মথুরার মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রর" কহিলেন— ব্রজে ছিলে বৃন্দাদাসী বুঝি অনুমানে । কোনদিন বা দেখা-সাক্ষাৎ ছিল বৃন্দাবনে। তখন বৃন্দা কচ্ছেন, কী জানি তা হবে কদাচিৎ ৷ বিষয় পেলে অনেক ভোলে মহতের রীত ॥ কৃষ্ণ বৃন্দাবনের কুশলসংবাদ জিজ্ঞাসা করিলে বৃন্দা কহিলেন— 源 হাতে ননি ডাকছে রানী গোপাল কোথা রয়। ধেনু বৎস আদি তব তৃণ নাহি খায় । শতদল ভাসতেছে সেই সমুদ্র-মাঝে । কোন ছার ধুতুরা পেয়ে এত ডঙ্কা বাজে । মথুরার রাজত্বকে বৃন্দা ধুতুরার সহিত তুলনা করিল ; তাহাতে মত্তত আছে, কিন্তু বৃন্দাবনের সৌন্দর্য ও সুগন্ধ কোথায় ! বল বাহুল্য, ইহার পর বৃন্দার দৌত্য ব্যর্থ হয় নাই— দূতী কৃষ্ণ লয়ে বিদায় হয়ে ব্ৰজপুরে এল। পশুপক্ষী অাদি যত পরিত্রাণ পেল ॥ ব্রজের ধন্য লতা তমালপাতা ধন্য বৃন্দাবন। ধন্য ধন্য রাধাকৃষ্ণের যুগলমিলন । বাংলার গ্রাম্যছড়ায় হরগৌরী এবং রাধাকৃষ্ণের কথা ছাড়া সীতারাম ও রাম-রাবণের কথাও পাওয়া যায়, কিন্তু তাহা তুলনায় স্বল্প। এ কথা স্বীকার করিতেই হইবে, পশ্চিমে, যেখানে রামায়ণ-কথাই সাধারণের মধ্যে বহুল পরিমাণে প্রচলিত সেখানে বাংলা অপেক্ষা পৌরুষের চর্চা অধিক। অামাদের দেশে হরগৌরী-কথায় স্ত্রী-পুরুষ এবং রাধাকৃষ্ণ-কথায় নায়ক-নায়িকার সম্বন্ধ নানারূপে বর্ণিত হইয়াছে ; কিন্তু র্তাহার প্রসর সংকীর্ণ, তাহাতে সর্বাঙ্গীণ লোকসাহিত্য মহন্তত্বের খাদ্য পাওয়া যায় না। আমাদের দেশের রাধাকৃষ্ণের কথায় সৌন্দর্যবৃত্তি এবং হরগৌরীর কথায় হৃদয়বৃত্তির চর্চা হইয়াছে, কিন্তু তাহাতে ধর্মপ্রবৃত্তির অবতারণা হয় নাই। তাহাতে বীরত্ব, মহত্ত্ব, অবিচলিত ভক্তি ও কঠোর ত্যাগস্বীকারের আদর্শ নাই। রামসীতার দাম্পত্য আমাদের দেশ-প্রচলিত হরগোরীর দাম্পত্য অপেক্ষা বহুতরগুণে শ্রেষ্ঠ, উন্নত এবং বিশুদ্ধ ; তাহ যেমন কঠোর গম্ভীর তেমনি স্নিগ্ধ কোমল । রামায়ণ-কথায় এক দিকে কর্তব্যের দুরূহ কাঠিন্য, অপর দিকে ভাবের অপরিসীম মাধুর্য, একত্র সম্মিলিত। তাহাতে দাম্পত্য, সৌভ্রাত্র, পিতৃভক্তি, প্রভুভক্তি, প্রজাবৎসল্য প্রভৃতি মঙ্গুষ্যের যতপ্রকার উচ্চ অঙ্গের হৃদয়বন্ধন আছে তাহার শ্রেষ্ঠ আদর্শ পরিস্ফুট হইয়াছে। তাহাতে সর্বপ্রকার হৃদয়বৃত্তিকে মহৎ ধর্মনিয়মের দ্বারা পদে পদে সংযত করিবার কঠোর শাসন প্রচারিত । সর্বতোভাবে মানুষকে মানুষ করিবার উপযোগী এমন শিক্ষা অীর-কোনো দেশে কোনো সাহিত্যে নাই। বাংলাদেশের মাটিতে সেই রামায়ণ-কথা হরগৌরী ও রাধাকৃষ্ণের কথার উপরে যে মাথা তুলিয়া উঠিতে পারে নাই তাহ আমাদের দেশের দুর্ভাগ্য। রামকে যাহারা যুদ্ধক্ষেত্রে ও কর্ম ক্ষেত্রে নরদেবতার আদর্শ বলিয়া গ্রহণ করিয়াছে তাহদের পৌরুষ, কর্তব্যনিষ্ঠা ও ধর্মপরতার আদর্শ আমাদের অপেক্ষ উচ্চতর। У\О e Q গ্রন্থপরিচয় মজুমদার লাইব্রেরি কর্তৃক প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের গদ্যগ্রন্থাবলীর তৃতীয় ভাগ -রূপে লোকসাহিত্য ১৩১৪ সালে প্রথম প্রচারিত হয়। । বর্তমান সংস্করণের দ্বিতীয় প্রবন্ধ— ‘ছেলেভুলানো ছড়া : ২’ ১৩৪৫ সালে প্রথম গ্রন্থভুক্ত হইয়াছে। সংকলিত নিবন্ধচতুষ্টয়ের সাময়িক পত্রে প্রকাশের সূচী নিম্নে দেওয়া গেল— ছেলেভুলানো ছড়া” সাধনা। আশ্বিন-কাতিক ১৩০১ ছেলেভুলানো ছড়া : ২২ সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা। মাঘ ১৩• ১ এবং কাতিক ১৩০২ কবি-সংগীত ৩ সাধনা । জ্যৈষ্ঠ ১৩০২ গ্রাম্যসাহিত্য ভারতী। ফাল্গুন-চৈত্র ১৩০৫ ১ মেয়েলি ছড়া’ নামে মুদ্রিত। ২ ১৩০১ মাঘ সংখ্যায় সম্পাদক রজনীকান্ত গুপ্ত, সংকলিত তিনটি ছড়ার এক-একটি পাঠ্যস্তর পাদটীকায় দেন । ( সেগুলি পরপৃষ্ঠায় দ্রষ্টব্য । ) তাহ ছাড়া, ১৩০২ কাতিক সংখ্যায় বাকুড়া-বেলেতোড় হইতে সংগৃহীত ২৬টি, ‘মেদিনীপুর হইতে সংগৃহীত ৪টি, বন-বিষ্ণুপুর হইতে সংগৃহীত ৮টি এবং ‘সাওতাল পরগনার ছড়া ১৬টি রবীন্দ্রনাথের ছড়া-সংগ্রহের পরিপূরক হিসাবে মুদ্রিত হয় । সংগ্রাহকের বলেন, এগুলি প্রধানত পাঠান্তর বলিয়াই গণ্য হইবে । ৩ গুপ্তরত্নোদ্ধার’ নামে মুদ্রিত। “শ্ৰীকেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় -কর্তৃক সংগৃহীত ও প্রকাশিত" "গুপ্তরত্নোদ্ধার বা প্রাচীন ক বিসঙ্গীতসংগ্রহ’ গ্রন্থের সমালোচনা-প্রসঙ্গে লিখিত । > & > পাঠাস্তর বর্তমান গ্রন্থের ৫০-৫৩ পৃষ্ঠায় সংকলিত ছড়ার অন্য একটি পাঠান্তর সাহিত্যপরিষৎ-পত্রিকার ( মাঘ ১৩৪১ ) সম্পাদক পাদটীকায় দেন— আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে। ডাহিন মেড়া ঘাগর বাজে ॥ বাজতে বাজতে লাগলো হুলি । কে কে যাবি কদমফুলি ৷ ওন গোন টিয়ে টোন । লাল বাগানের লাল ঝটুকা । লেগে যা গোয়াল ঘটুকা ॥ হলুদ ফুলে কলুদ ফুল । আয়রে আমার টগরের ফুল । কাকী রশধে কুকী খায়। হিম সময়ে দুঃখ পায় ॥ বনের বাঘে খায় কী । কপ লে গায়ের দুধ ॥ কপলে গাই নড়ে চড়ে । পান ছিটুকির বাড়ি মারে । সংকলিত প্রথম ছড়ার (পৃ. ৫৩ ) পাঠান্তর— মাসি পিসি বনগাবাসী বনের অাগে টিয়া । মাসি গেলেন শ্ৰীবৃন্দাবন দেখে আসি গিয়া । কিসের মাসি কিসের পিসি কিসের বৃন্দাবন। এতদিনে জানলেম আমি মা বড়ো ধন ৷ মাকে দেব শঙ্খ সিন্দূর ভাইকে দেব বিয়া । সোনার মুকুট মাথায় দিয়া তীর্থ করি গিয়া । છે ૨૨ ংকলিত একাদশ ছড়ার (পৃ. ৫৭) পাঠান্তর— ঘুঘু—যু ! পেটে-ফু* ॥ কী ছেলে হ’ল । বেটা ছেলে ॥ ছেলে কই । মাছ ধরতে গেছে | মাছ কই । চিলে নিলে । চিল কই । ডালে বসেছে | ডাল কই । পুড়েকুড়ে গেল । ছাই মাটি কই । ধোপায় নিলে । কী করলে ! কাপড় ধুলে । সোনা কুড়ে পড়বি, না ছাই কুড়ে পড়বি ? । ৬১-৬৪ -সংখ্যক ছড়া (পৃ. ৭১-৭২ ) কোনো বিক্রমপুরনিবাসী ভদ্রগৃহস্থ হইতে সংগৃহীত। ৪৭-সংখ্যক ছড়ার একটি পাঠান্তর হুগলি-অঞ্চলে এইরূপ শোনা যায়— কাজল বলে আজল রে ভাই আমি রাঙা মুখের পান। কালো মুখে গেলে পরে আমি হই গো হতমান । হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় -কর্তৃক সংকলিত বঙ্গীয় শব্দকোষ-অনুসারে ; আজল=‘আদরিণী' বা যে অাদরে নেক সাজে । > a\○