লোকসাহিত্য/ছেলেভুলানো ছড়া

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


ছেলেভুলানো ছড়া বাংলা ভাষায় ছেলে ভুলাইবার জন্য যে-সকল মেয়েলি ছড়া প্রচলিত আছে, কিছুকাল হইতে আমি তাহ সংগ্ৰহ করিতে প্রবৃত্ত ছিলাম। আমাদের ভাষা এবং সমাজের ইতিহাস-নির্ণয়ের পক্ষে সেই ছড়াগুলির বিশেষ মূল্য থাকিতে পারে, কিন্তু তাহদের মধ্যে যে একটি সহজ স্বাভাবিক কাব্যরস আছে সেইটিই আমার নিকট অধিকতর আদরণীয় বোধ হইয়াছিল। আমার কাছে কোনটা ভালো লাগে বা না লাগে সেই কথা বলিয়া সমালোচনার মুখবদ্ধ করিতে ভয় হয়। কারণ, র্যাহারা স্বনিপুণ সমালোচক এরূপ রচনাকে তাহারা অহমিকা বলিয়া অপরাধ লইয়া থাকেন। র্তাহীদের নিকট আমার সবিনয় নিবেদন এই যে, তাহারা বিবেচনা করিয়া দেখিবেন এরূপ অহমিকা অহংকার নহে, পরস্তু তাহার বিপরীত। যাহার উপযুক্ত সমালোচক তাহীদের নিকট একটা দাড়িপাল্লা আছে ; তাহারা সাহিত্যের একটা বাধা ওজন এবং সেইসঙ্গে অনেকগুলি বাধি বোল বাহির করিয়াছেন ; যে-কোনো রচনা তাহদের নিকট উপস্থিত করা যায় নি:সংকোচে তাহার পৃষ্ঠে উপযুক্ত নম্বর এবং ছাপ মারিয়া দিতে পারেন। কিন্তু অক্ষমতা এবং অনভিজ্ঞতা -বশত সেই ওজনটি যাহারা পান নাই, সমালোচনস্থলে তাহাদিগকে একমাত্র নিজের অনুরাগ-বিরাগের উপর নির্ভর করিতে হয় । অতএব সেরূপ লোকের পক্ষে সাহিত্য সম্বন্ধে বেদবাক্য প্রচলিত করিতে যাওয়াই স্পর্ধার কথা। কোন লেখা ভালো অথবা মন্দ তাহা প্রচার না করিয়া কোন লেখা আমার ভালো লাগে বা মন্দ লাগে সেই কথা স্বীকার করাই তাহীদের উচিত। যদি কেহ প্রশ্ন করেন, সে কথা কে শুনিতে চায়, আমি উত্তর করিব, লোকসাহিত্য ومن ۹ সাহিত্যে সেই কথা সকল মানুষ শুনিয়া আসিতেছে। সাহিত্যের সমলোচনাকেই সমালোচনা বলা হইয়া থাকে, কিন্তু অধিকাংশ সাহিত্যই প্রকৃতি ও মানবজীবনের সমালোচনা মাত্র। প্রকৃতি সম্বন্ধে, মহন্ত সম্বন্ধে, ঘটনা সম্বন্ধে কবি যখন নিজের আনন্দ বিষাদ বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং র্তাহার নিজের সেই মনোভাব কেবলমাত্র আবেগের দ্বারা ও রচনাকৌশলে জন্যের মনে সঞ্চারিত করিয়া দিবার চেষ্টা করেন, তখন তাহাকে কেহ অপরাধী করে না । তখন পাঠকও অহমিকা-সহকারে কেবল এইটুকু দেখেন ষে ‘কবির কথা আমার মনের সহিত মিলিতেছে কি না” । কাব্য-সমালোচক ও ৰদি যুক্তিতর্ক এবং শ্রেণীনির্ণয়ের দিক ছাড়িয়া দিয়া কাব্যপাঠ-জাত মনোভাব পাঠকগণকে উপহার দিতে উদ্যত হন তবে সেজন্য র্তাহাকে দোষী করা উচিত হয় না । বিশেষত আজ আমি যে কথা স্বীকার করিতে বসিয়াছি তাহার মধ্যে আত্মকথার কিঞ্চিৎ অংশ থাকিতেই হইবে । ছেলেভুলানো ছড়ার মধ্যে আমি ষে রসাস্বাদ করি ছেলেবেলাকার স্মৃতি হইতে তাহাকে বিচ্ছিন্ন করিয়া দেখ৷ আমার পক্ষে অসম্ভব। সেই ছড়াগুলির মাধুর্ব কতটা নিজের বাল্যস্মৃতি এবং কতটা সাহিত্যের চিরস্থায়ী অাদর্শের উপর নির্ভর করিতেছে তাহা নির্ণয় করিবার উপযুক্ত বিশ্লেষণশক্তি বর্তমান লেখকের নাই। এ কথা গোড়াতেই কবুল করা ভালো । r ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর-টুপুর নদী এল বান’ এই ছড়াটি বাল্যকালে আমার নিকট মোহমন্ত্রের মতো ছিল এবং সেই মোহ এখনো আমি ভুলিতে পারি নাই। আমি আমার সেই মনের মুগ্ধ অবস্থা স্মরণ করিয়া না দেখিলে স্পষ্ট বুঝিতে পারিব না ছড়ার মাধুর্ঘ এবং উপযোগিতা কী। বুঝিতে পারিব না, কেন এত মহাকাব্য এবং খণ্ডকাব্য, এত তত্ত্বকথা এবং নীতিপ্রচার, মানবের এত প্রাণপণ প্রযত্ন, এত গলদঘর্ম ব্যায়াম প্রতিদিন ব্যর্থ এবং বিস্তৃত ছেলেভুলানো ছড়া o হইতেছে, অথচ এই-সকল অসংগত অর্থহীন যদৃচ্ছাকৃত শ্লোকগুলি লোকস্থতিতে চিরকাল প্রবাহিত হইয়া আসিতেছে। এই-সকল ছড়ার মধ্যে একটি চিরত্ব আছে। কোনোটির কোনো কালে কোনো রচয়িত ছিল বলিয়া পরিচয় মাত্র নাই এবং কোন শকের কোন তারিখে কোনটা রচিত হইয়াছিল এমন প্রশ্নও কাহারো মনে উদয় হয় না। এই স্বাভাবিক চিরত্বগুণে ইহার আজ রচিত হইলেও পুরাতন এবং সহস্ৰ বৎসর পূর্বে রচিত হইলেও নূতন । ভালো করিয়া দেখিতে গেলে শিশুর মতো পুরাতন আর-কিছুই নাই । দেশ কাল শিক্ষা প্রথা -অনুসারে বয়স্ক মানবের কত নূতন পরিবর্তন হইয়াছে, কিন্তু শিশু শত সহস্ৰ বৎসর পূর্বে যেমন ছিল আজও তেমনি আছে ; সেই অপরিবর্তনীয় পুরাতন বারংবার মানবের ঘরে শিশুমূর্তি ধরিয়া জন্মগ্রহণ করিতেছে, অথচ সর্বপ্রথম দিন সে যেমন নবীন, যেমন মুকুমার, যেমন মূঢ়, যেমন মধুর ছিল আজও ঠিক তেমনি আছে। এই নবীন চিরত্বের কারণ এই যে, শিশু প্রকৃতির স্বজন ; কিন্তু বয়স্ক মানুষ বহুল পরিমাণে মামুষের নিজকৃত রচনা। তেমনি ছড়াগুলিও শিশু-সাহিত্য ; তাহারা মানব-মনে আপনি জন্মিয়াছে । আপনি জন্মিয়াছে এ কথা বলিবাব একটু বিশেষ তাৎপর্য আছে। স্বভাবত আমাদের মনের মধ্যে বিশ্বজগতের প্রতিবিম্ব এবং প্রতিধ্বনি ছিন্নবিচ্ছিন্নভাবে ঘুরিয়া বেড়ায়। তাহার। বিচিত্র রূপ ধারণ করে এবং অকস্মাৎ প্রসঙ্গ হইতে প্রসঙ্গান্তরে গিয়া উপনীত হয়। যেমন বাতাসের মধ্যে পথের ধূলি, পুষ্পের রেণু, অসংখ্য গন্ধ, বিচিত্র শব্দ, বিচ্ছিন্ন পল্লব, জলের শীকর, পৃথিবীর বাষ্প— এই আবর্তিত আলোড়িত জগতের বিচিত্র উৎক্ষিপ্ত উডডীন খণ্ডাংশ-সকল সর্বদাই নিরর্থকভাবে ঘুরিয়া ফিরিয়া বেড়াইতেছে, আমাদের মনের মধ্যেও সেইরূপ । সেখানেও আমাদের নিত্যপ্রবাহিত চেতনার মধ্যে কত বর্ণ গন্ধ শব্দ, কত ケ লোকসাহিত্য কল্পনার বাষ্প, কত চিন্তার অভিাস, কত ভাষার ছিন্ন থও, আমাদের ব্যবহারজগতের কত শত পরিত্যক্ত বিস্তৃত বিচুত পদার্থ-সকল অলক্ষিত অনাবশ্বকভাৰে ভাসিয়া ভাসিয়া বেড়ায় । যখন আমরা সচেতনভাবে কোনো-একটা বিশেষ দিকে লক্ষ করিয়া চিত্ত৷ করি তখন এই-সমস্ত গুঞ্জন থামিয়া যায়, এই-সমস্ত রেণুজাল উড়িয়া যায়, এইসমস্ত ছায়াময়ী মরীচিকা মুহূর্তের মধ্যে অপসারিত হয় ; আমাদের কল্পনা, আমাদের বুদ্ধি একটা বিশেষ ঐক্য অবলম্বন করিয়া একাগ্রভাবে প্রবাহিত হইতে থাকে। আমাদের মন-নামক পদার্থটি এত অধিক প্রভুত্বশালী ষে, সে যখন সজাগ হইয়া বাহির হইয়া আসে তখন তাহার প্রভাবে আমাদের অন্তর্জগতের এবং বহির্জগতের অধিকাংশই সমাচ্ছন্ন হইয়া যায়— তাহারই শাসনে, তাহারই বিধানে, তাহারই কথায়, তাহারই অনুচরপরিচরে নিখিল সংসার আকীর্ণ হইয়া থাকে। ভাবিয়া দেখে, আকাশে পাখির ডাক, পাতার মর্মর, জলের কল্লোল, লোকালয়ের মিশ্রিত ধ্বনি, ছোটো বড়ো কত সহস্র প্রকার কলশব্দ নিরস্তর ধ্বনিত হইতেছে— এবং আমাদের চতুর্দিকে কত কম্পন, কত আন্দোলন, কত গমন, কত আগমন, ছায়ালোকের কতই চঞ্চল লীলাপ্রবাহ প্রতিনিয়ত আবর্তিত হইতেছে– অথচ তাহার মধ্যে কতই যৎসামান্য অংশ আমাদের গোচর হইয়া থাকে ; তাহার প্রধান কারণ এই যে, ধীবরের ন্যায় আমাদের মন ঐক্যজলি ফেলিয়া একেবারে এক ক্ষেপে যতখানি ধরিতে পারে, সেইটুকু গ্রহণ করে, বাকি সমস্তই তাহাকে এড়াইয়া যায়। যে যখন দেখে তখন ভালো করিয়া শোনে না ; যখন শোনে তখন ভালো করিয়া দেখে না, এবং সে যখন চিন্তা করে তখন ভালো করিয়া দেখেও না, শোনেও না । তাহার উদ্দেশ্যের পথ হইতে সমস্ত অনাবশ্যক পদার্থকে সে অনেকটা পরিমাণে দূর করিয়া দিতে পারে। এই ক্ষমতাবলেই সে এই জগতের অসীম বৈচিত্র্যের মধ্যেও আপনার নিকটে আপনার প্রাধান্ত রক্ষা করিতে পারিয়াছে। পুরাণে ছেলেভুলানো ছড়া o পাঠ করা যায়, পুরাকালে কোনো কোনো মহাত্মা ইচ্ছামৃত্যু ক্ষমতা লাভ করিয়াছিলেন। আমাদের মনের ইচ্ছান্ধত ইচ্ছাবধিরতার শক্তি আছে ; এবং এই শক্তি তাহাকে প্রতি পদেই ব্যবহার করিতে হয় বলিয়া জন্ম হইতে মৃত্যুকাল পর্যন্ত জগতের অধিকাংশই তাহার চেতনার বহির্ভাগ দিয়া চলিয়া যায়। সে নিজে বিশেষ উদযোগী হইয়া যাহা গ্রহণ করে এবং নিজের আবশ্বক ও প্রকৃতি -অনুসারে গঠিত করিয়া লয় তাহাই সে উপলব্ধি করে । চতুদিকে, এমন-কি, মানসপ্রদেশেও যাহা ঘটিতেছে, যাহা উঠিতেছে, তাহার সে ভালোরূপ খোজ রাখে না । সহজ অবস্থায় আমাদের মানসাকাশে স্বপ্নের মতো যে-সকল ছায়া এবং শব্দ যেন কোন অলক্ষ্য বায়ুপ্রভাবে দৈবচলিত হইয়া কখনো সংলগ্ন কখনো বিচ্ছিন্ন ভাবে বিচিত্র আকার ও বর্ণ-পরিবর্তন-পূর্বক ক্রমাগত মেঘরচনা করিয়া বেড়াইতেছে, তাহারা যদি কোনো অচেতন পটের উপর নিজের প্রতিবিহুপ্রবাহ চিহ্নিত করিয়া যাইতে পারিত তবে তাহার সহিত আমাদের আলোচ্য এই ছড়াগুলির অনেক সাদৃশু দেখিতে পাইতাম । এই ছড়াগুলি আমাদের নিয়তপরিবর্তিত অন্তরাকাশের ছায়ামাত্র, তরল স্বচ্ছ সরোবরের উপর মেঘক্রীড়িত নভোমণ্ডলের ছায়ার মতো । সেইজন্যই বলিয়াছিলাম, ইহারা আপনি জন্মিয়াছে । * উদাহরণস্বরূপে এইখানে দুই-একটি ছড়া উদ্ধত করিবার পূর্বে পাঠকদের নিকট মার্জন ভিক্ষা করি ; প্রথমত, এই ছড়াগুলির সঙ্গে চিরকাল যে স্নেহার্ড সরল মধুর কণ্ঠ ধ্বনিত হইয়া আসিয়াছে আমার মতো মর্যাদাভীরু গম্ভীরস্বভাব বয়স্ক পুরুষের লেখনী হইতে সে ধ্বনি কেমন করিয়া ক্ষরিত হইবে ? পাঠকগণ আপন গৃহ হইতে, আপন বাল্যস্মৃতি হইতে সেই স্বধান্নিগ্ধ স্বরটুিকু মনে মনে সংগ্ৰহ করিয়া লইবেন । ইহার সহিত যে স্নেহাট, যে সংগীতটি, যে সন্ধ্যাপ্রদাপালোকিত সৌন্দর্যচ্ছবিটি চিরদিন একাত্মভাবে মিশ্রিত হইয়া আছে সে Se 瞬 লোকসাহিত্য আমি কোন মোহমন্ত্রে পাঠকদের সামনে আনিয়া উপস্থিত করিব! ভরস{ করি, এই ছড়াগুলির মধ্যেই সেই মোহুমন্ত্রটি আছে। দ্বিতীয়ত, আট-ঘাট-বাধা রীতিমত সাধুভাষার প্রবন্ধের মাঝখানে এই-সমস্ত গৃহচারিণী অকৃতবেশ অসংস্কৃত মেয়েলি ছড়াগুলিকে দাড় করাইয়া দিলে তাহাদের প্রতি কিছু অত্যাচার করা হয়— যেন আদালতের সাক্ষ্যমঞ্চে ঘরের বধূকে উপস্থিত করিয়া জেরা কর। কিন্তু উপায় নাই। আদালতের নিয়মে অণদালতের কাজ হয়, প্রবন্ধের নিয়মানুসারে প্রবন্ধ রচনা করিতে হয়— নিষ্ঠুরতাটুকু অপরিহার্য। যমুনাবতী সরস্বতী কাল যমুনার বিয়ে। যমুনা যাবেন শ্বশুরবাড়ি কাজিতলা দিয়ে । কাজিফুল কুড়তে পেয়ে গেলুম মালা । হাত-ঝুমঝুম্ পা-কুমঝুম সীতারামের খেলা ৷ নাচে তো সীতারাম কঁকাল বেঁকিয়ে । আলোচাল দেব টাপাল ভরিয়ে ॥ আলোচাল খেতে খেতে গলা হল কাঠ । হেথায় তো জল নেই ত্রিপূণির ঘাট । ত্রিপূর্ণির ঘাটে দুটো মাছ ভেসেছে। একটি নিলেন গুরুঠাকুর একটি নিলেন কে. তার বোনকে বিয়ে করি ওড়ফুল দিয়ে । ওড়ফুল কুড়তে হয়ে গেল বেলা । তার বোনকে বিয়ে করি ঠিক দুঙ্কুর বেলা । ইহর মধ্যে ভাবের পরম্পর সম্বন্ধ নাই সে কথা নিতান্তই পক্ষপাতী সমালোচককেও স্বীকার করিতে হইবে। কতকগুলি অসংলগ্ন ছবি - নিতান্ত সামান্য প্রসঙ্গস্বত্র অবলম্বন করিয়া উপস্থিত হইয়াছে। একটা এই দেখ। ছেলেভুলানো ছড়ী X > ৰাইতেছে কোনোপ্রকার বাছ-বিচার নাই। যেন কবিত্বের সিংহদ্বারে নিস্তব্ধ শারদ মধ্যাহের মধুর উত্তাপে দ্বারবান বেটা দিব্য পা ছড়াইয়া দিয়া ঘুমাইয়। পড়িয়াছে। কথাগুলো ভাবগুলো কোনোপ্রকার পরিচয়-প্রদানের অপেক্ষ না রাখিয়া, কোনোরূপ উপলক্ষ অন্বেষণ না করিয়া, অনায়াসে তাহার পা ডিঙাইয়া, এমন-কি, মাঝে মাঝে লঘুকরম্পর্শে তাহার কান মলিয়া দিয়া, কল্পনার অভ্ৰভেদী মায়াপ্রাসাদে ইচ্ছাস্বথে আনাগোনা করিতেছে ; দ্বারবানটা যদি ঢুলিতে ঢুলিতে হঠাৎ একবার চমক খাইয়া জাগিয়া উঠিত তবে সেই মুহূর্তেই তাহারা কে কোথায় দৌড় দিত তাহার আর ঠিকানা পাওয়া যাইত না। যমুনাবতী সরস্বতী যিনিই হউন, আগামী কল্য যে তাহার শুভবিবাহ সে কথার স্পষ্টই উল্লেখ দেখা যাইতেছে। অবশু, বিবাহের পর যথাকলে কাজিতলা দিয়া যে র্তাহণকে শ্বশুরবাড়ি যাইতে হইবে সে কথা আপাতত উত্থাপন না করিলেও চলিত ; যাহা হউক তথাপি কথাটা নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক হয় নাই। কিন্তু বিবাহের জন্য কোনোপ্রকার উদযোগ অথবা সেজন্ত কাহারে! তিলমাত্র ঔৎসুক্য অাছে এমন কিছুই পরিচয় পাওয়া যায় না। ছড়ার রাজ্য তেমন রাজ্যই নহে। সেখানে সকল ব্যাপারই এমন অনায়াসে ঘটিতে পারে এবং এমন অনায়াসে না-ঘটিতেও পারে যে, কাহাকেও কোনো-কিছুর জগুই কিছুমাত্র দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বা ব্যস্ত হইতে হয় না। অতএব আগামী কল্য শ্ৰীমতী যমুনাবতীর বিবাহের দিন স্থির হইলেও সে ঘটনাকে বিন্দুমাত্র প্রাধান্ত দেওয়া হয় নাই। তবে সে কথাটা আদৌ কেন উত্থাপিত হইল তাহার জবাবদিহির জন্যও কেহ ব্যস্ত নহে। কাজিফুল যে কী ফুল আমি নগরবাসী তাহা ঠিক করিয়া বলিতে পারি না, কিন্তু ইহা স্পষ্ট অনুমান করিতেছি যে যমুনাবতীনামক কন্যাটির আসন্ন বিবাহের সহিত উক্ত পুষ্পসংগ্রহের কোনো যোগ নাই। এবং হঠাৎ মাঝখান হইতে সীতারাম কেন যে হাতের বলয় এবং পায়ের নুপুর ৰুম ঝুম করিয়া নৃত্য আরম্ভ করিয়া দিল আমরা তাহার বিন্দু-বিসর্গ কারণ > ネ লোকসাহিত্য দেখাইতে পারিব না। আলোচলের প্রলোভন একটা মস্ত কারণ হইতে পারে, কিন্তু সেই কারণ আমাদিগকে সীতারামের আকস্মিক নৃত্য হইতে ভুলাইয়া হঠাৎ ত্রিপূর্ণির ঘাটে আনিয়া উপস্থিত করিল। সেই ঘাটে দুটি মৎস্ত ভাসিয়া উঠা কিছুই আশ্চর্য নহে বটে, কিন্তু বিশেষ আশ্চর্যের বিষয় এই যে, দুটি মৎস্তের মধ্যে একটি মৎস্য যে লোক লইয়া গেছে তাহার কোনোরূপ উদেশ না পাওয়া সত্বেও আমাদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রচয়িতা কী কারণে তাহারই ভগিনীকে বিবাহ করিবার জন্য হঠাৎ স্থির সংকল্প হইয়া বসিলেন, অথচ প্রচলিত বিবাহের প্রথা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করিয়া একমাত্র ওড়ফুল সংগ্রহদ্বারাই শুভকর্মের আয়োজন যথেষ্ট বিবেচনা করিলেন এবং যে লগ্নটি স্থির করিলেন তাহাও নূতন অথবা পুরাতন কোনো পঞ্জিকাকারের মতেই প্রশস্ত নহে। এই তো কবিতার বাধুনি। আমাদের হাতে যদি রচনার ভার থাকিত তবে নিশ্চয় এমন কৌশলে প্লট বাধিতাম যাহাতে প্রথমোক্ত যমুনাবতীই গ্রন্থের শেষ পরিচ্ছেদে সেই ত্রিপূর্ণির ঘাটের অনির্দিষ্ট ব্যক্তির অপরিজ্ঞাত ভগ্নীরূপে দাড়াইয়া যাইত এবং ঠিক মধ্যাহ্নকালে ওড়ফুলের মালা-বদল করিয়া যে গান্ধৰ্ব বিবাহ ঘটিত তাহাতে সহৃদয় পাঠকমাত্রেই তৃপ্তিলাভ করিতেন । কিন্তু বালকের প্রকৃতিতে মনের প্রতাপ অনেকটা ক্ষীণ । জগৎ-সংসার এবং তাহার নিজের কল্পনাগুলি তাহাকে বিচ্ছিন্নভাবে আঘাত করে ; একটার পর আর-একটা আসিয়া উপস্থিত হয়। মনের বন্ধন তাহার পক্ষে পীড়াজমক । সুসংলগ্ন কার্যকারণস্বত্র ধরিয়া জিনিসকে প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত অনুসরণ করা তাহার পক্ষে দুঃসাধ্য। বহির্জগতে সমুদ্রতীরে বসিয়া বালক বালির ঘর রচনা করে, মানস-জগতের সিন্ধুতীরেও সে আনন্দে বসিয়া বালির ঘর বাধিতে থাকে। বালিতে বালিতে জোড়া লাগে না, তাহা স্থায়ী হয় না— কিন্তু বালুকণর মধ্যে এই যোজনশীলতার অভাব-বশতই বাল্যস্থাপত্যের পক্ষে তাহ৷ সর্বোৎকৃষ্ট উপকরণ । মুহূর্তের মধ্যেই মুঠা মুঠা করিয়া তাহাকে একটা উচ্চ আকারে cछ्प्लङ्घजोप्ञ छ्फु। 〉○・ পরিণত করা যায়— মনোনীত না হইলে অনায়াসে তাহাকে সংশোধন করা সহজ এবং শ্রান্তি বোধ হইলেই তৎক্ষণাৎ পদাঘাতে তাহাকে সমভূমি করিয়া দিয়া লীলাময় স্বজনকর্তা লঘুহৃদয়ে বাড়ি ফিরিতে পারে। কিন্তু, যেখানে গাথিয়া গাঁথিয়া কাজ করা আবশ্যক সেখানে কর্তাকেও অবিলম্বে কাজের নিয়ম মানিয়া চলিতে হয়। বালক নিয়ম মানিয়া চলিতে পারে না— সে সম্প্রতিমাত্র নিয়মহীন ইচ্ছানন্দময় স্বৰ্গলোক হইতে আসিয়াছে। অামাদের মতো সুদীর্ঘকাল নিয়মের দাসত্বে অভ্যস্ত হয় নাই, এইজন্য সে ক্ষুদ্র শক্তি-অনুসারে সমুদ্রতীরে ৰালির ঘর এবং মনের মধ্যে ছড়ার ছবি স্বেচ্ছামত রচনা করিয়া মর্তলোকে দেবতার জগৎলীলার অনুকরণ করে । এইজন্যই আমাদের শাস্ত্রে ঈশ্বরের কার্যের সহিত বালকের লীলার সর্বদা তুলনা দেওয়া হইয়া থাকে, উভয়ের মধ্যেই একটা ইচ্ছাময় আনন্দের সাদৃশু আছে। পূর্বেদ্ধত ছড়াটিতে সংলগ্নতা নাই, কিন্তু ছবি আছে। কাজিতলা, ত্রিপূর্ণির ঘাট এবং ওড়বনের ঘটনাগুলি স্বপ্নের মতো অদ্ভুত, কিন্তু স্বপ্নের মতো সত্যবৎ । স্বপ্নের মতো সত্য বলতে পাঠকগণ আমার বুদ্ধির সজাগতা সম্বন্ধে সন্দিহান হইবেন না। অনেক দার্শনিক পণ্ডিত প্রত্যক্ষ জগৎটাকে স্বপ্ন বলিয়া উড়াইয়। দিয়াছেন । কিন্তু, সেই পণ্ডিত স্বপ্নকে উড়াইতে পারেন নাই। তিনি বলেন, প্রত্যক্ষ সত্য নাই– তবে কী আছে ? না, স্বপ্ন আছে। অতএব দেখা মাইতেছে, প্রবল যুক্তির দ্বারা সত্যকে অস্বীকার করা সহজ, কিন্তু স্বপ্নকে অস্বীকার করিবার জো নাই। কেবল সজাগ স্বপ্ন নহে, নিদ্রাগত স্বপ্ন সম্বন্ধেও এই কথা খাটে। সুতীক্ষুবুদ্ধি পণ্ডিতেরও সাধ্য নাই স্বপ্নাবস্থায় স্বপ্নকে অবিশ্বাস করেন। জাগ্রত অবস্থায় তাহারা সম্ভব সত্যকেও সন্দেহ করিতে ছাড়েন না, কিন্তু স্বপ্নাবস্থায় তাহারা চরমতম অসম্ভবকে অসংশয়ে গ্রহণ করেন । অতএব বিশ্বাসজনকতা-নামক যে গুণটি সত্যের সর্বপ্রধান গুণ হওয়া উচিত সেটা যেমন স্বপ্নের অাছে এমন আর কিছুরই নাই। Y 8 লোকসাহিত্য এতদ্বারা পাঠক এই কথা বুঝিবেন যে প্রত্যক্ষ জগৎ আমাদের কাছে ৰতটা সত্য, ছড়ার স্বপ্রজগৎ নিত্যস্বপ্নদর্শী বালকের নিকট তদপেক্ষা অনেক অধিক সত্য। এইজন্য অনেক সময় সত্যকেও আমরা অসম্ভব বলিয়া ত্যাগ করি, এবং তাহারা অসম্ভবকেও সত্য বলিয়া গ্রহণ করে । বৃষ্টি পড়ে টাপুর-টুপুর নদী এল বান। শিবু ঠাকুরের বিয়ে হল তিন কন্তে দান। এক কন্তে রাধেন বাড়েন এক কন্তে খান । এক কন্তে না খেয়ে বাপের বাড়ি যান । এ বয়সে এই ছড়াটি শুনিবামাত্র বোধ করি প্রথমেই মনে হয় শিবু ঠাকুর যে তিনটি কন্যাকে বিবাহ করিয়াছেন তন্মধ্যে মধ্যম কন্যাটিই সর্বাপেক্ষা বুদ্ধিমতী । কিন্তু এক বয়স ছিল যখন এতাদৃশ চরিত্রবিশ্লেষণের ক্ষমতা ছিল না। তখন এই চারটি ছত্র আমার বাল্যকালের মেঘদূতের মতো ছিল । অামার মানসপটে একটি ঘনমেঘান্ধকার বাদলার দিন এবং উত্তালতরঙ্গিত নদী মূর্তিমান হইয়া দেখা দিত। তাহার পর দেখিতে পাইতাম সেই নদীর প্রাস্তে বালুর চরে গুটিদুয়েক পানসি নৌকা বাধা আছে এবং শিবু ঠাকুরের নববিবাহিতা বধূগণ চড়ায় নামিয়া রাধাবাড়া করিতেছেন। সত্য কথা বলিতে কী, শিবু ঠাকুরের জীবনটিকে বড়ো মুখের জীবন মনে করিয়৷ চিত্ত কিছু ৰাকুল হইত। এমন-কি, তৃতীয়া বধূঠাকুরানী মর্মাস্তিক রাগ করিয়া দ্রুতচরণে বাপের বাড়ি-অভিমুখে চলিয়াছেন, সেই ছবিতেও আমার এই স্থখচিত্রের কিছুমাত্র ব্যাঘাতসাধন করিতে পারেন নাই। এই নিবোধ তখনো বুঝিতে পারিত না, ঐ একটিমাত্র ছত্রে হতভাগ্য শিবু ঠাকুরের জীবনে কী এক হৃদয়বিদারক শোকাবহ পরিণাম স্থচিত হইয়াছে। কিন্তু পূর্বেই বলিয়াছি, চরিত্রবিশ্লেষণ অপেক্ষ চিত্রবিরচনের দিকেই তখন মনের গহিট ছিল । এখন ছেলেভুলানো ছড়া N (R বুঝিতে পারিতেছি, হতবুদ্ধি শিবু ঠাকুর তদীয় কনিষ্ঠ জায়ার অকস্মাৎ পিতৃগৃহপ্রয়াণ-দুগুটিকে ঠিক মনোরম চিত্র হিসাবে দেখেন নাই। " এই শিবু ঠাকুর কি কস্মিন কালে কেহ ছিল এক-এক বার এ কথাও মনে উদয় হয়। হয়তো বা ছিল। হয়তো এই ছড়ার মধ্যে পুরাতন বিস্মৃত ইতিহাসের অতি ক্ষুদ্র এক ভগ্ন অংশ থাকিয়া গিয়াছে। অার-কোনো ছড়ায় হয়তো বা ইহার আর-এক টুকরা থাকিতে পারে। এপার গঙ্গা, ও পার গঙ্গা, মধ্যিখানে চর । তারি মধ্যে বসে আছে শিব সদাগর । শিব গেল শ্বশুরবাড়ি, বসতে দিল পি-ড়ে । জলপান করিতে দিল শালিধানের চি“ড়ে ॥ শালিধানের চি“ড়ে নয় রে, বিন্নিধানের খই। মোটা মোট সবরি কলা, কাগমারে দই । ভাবে-গতিকে আমার সন্দেহ হইতেছে শিবু ঠাকুর এবং শিবু সদাগর লোকটি একই হইবেন। দাম্পত্য সম্বন্ধে উভয়েরই একটু বিশেষ শখ আছে এবং বোধ করি আহার সম্বন্ধেও অবহেলা নাই। উপরন্তু গঙ্গার মাঝখানটিতে যে স্থানটুকু নির্বাচন করিয়৷ লওয়া হইয়াছে তাহাও নবপরিণীতের প্রথম প্রণয়যাপনের পক্ষে অতি উপযুক্ত স্থান । এই স্থলে পাঠকগণ লক্ষ্য করিয়া দেখিবেন, প্রথমে অনবধানতাক্রমে শিৰু সদাগরের জলপানের স্থলে শালিধানের চি°ড়ার উল্লেখ করা হইয়াছিল কিন্তু পরক্ষণেই সংশোধন করিয়া বলা হইয়াছে “শালিধানের চি“ড়ে ময় রে, বিল্পিধানের খই’ । যেন ঘটনার সত্য সম্বন্ধে তিলমাত্র স্খলন হুইবার জো নাই । অথচ এই সংশোধনের দ্বারা বর্ণিত ফলাহারের খুব যে একটা ইতর-বিশেষ হইয়াছে, জামাই-অাদর সম্বন্ধে শ্বশুরবাড়ির গৌরব খুব উজ্জলতররূপে পরিস্ফুট X&p 평 লোকসাহিত্য হইয়া উঠিয়াছে, তাহাও বলিতে পারি না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে শ্বশুরবাড়ির মর্যাদা অপেক্ষা সত্যের মর্যাদা রক্ষার প্রতি কবির অধিক লক্ষ দেখা যাইতেছে। তাও ঠিক বলিতে পারি না । বোধ করি ইহাও স্বপ্নের মতো । বোধ করি শালিধানের চি’ড়া দেখিতে দেখিতেই পরমুহূর্তে বিন্নিধানের খই হইয়া উঠিয়াছে। বোধ করি শিবু ঠাকুরও কখন এমনি করিয়া শিৰু সদাগরে পরিণত হইয়াছে কেহ বলিতে পারে না । শুনা যায়, মঙ্গল ও বৃহস্পতির কক্ষমধ্যে কতকগুলি টুকরা গ্রহ আছে। কেহ কেহ বলেন, একখানা অস্তি গ্রহ ভাঙিয়া খণ্ড খণ্ড হইয়া গিয়াছে। এই ছড়াগুলিকেও সেইরূপ টুকরা জগৎ বলিয়া আমার মনে হয়। অনেক প্রাচীন ইতিহাস প্রাচীন স্মৃতির চুর্ণ অংশ এই-সকল ছড়ার মধ্যে বিক্ষিপ্ত হইয়া আছে, কোনো পুরাতত্ত্ববিৎ আর তাহাদিগকে জোড়া দিয়া এক করিতে পারেন না, কিন্তু আমাদের কল্পনা এই ভগ্নাবশেষগুলির মধ্যে সেই বিস্মৃত প্রাচীন জগতের একটি স্বদূর অথচ নিকট পরিচয় লাভ করিতে চেষ্টা করে । অবশু, বালকের কল্পনা এই ঐতিহাসিক ঐক্য-রচনার জন্য উৎসুক নহে । তাহার নিকট সমস্তই বর্তমান এবং তাহার নিকট বর্তমানেরই গৌরব । সে কেবল প্রত্যক্ষ ছবি চাহে এবং সেই ছবিকে ভাবের অশ্রাম্পে ঝাপসা করিতে চাহে না । নিম্নোদধূত ছড়াটিতে অসংলগ্ন ছবি যেন পাখির বাকের মতো উড়িয়া চলিয়াছে। ইহাদের প্রত্যেকের এই স্বতন্ত্র দ্রুতগতিতে বালকের চিত্ত উপযুপরি নব নব অঘিাত পাইয়া বিচলিত হইতে থাকে। নোটন নোটন পায়রাগুলি বোটন রেখেছে। বড়ো সাহেবের বিবিগুলি মাইতে এসেছে । দু পারে দুই রুই কাৎলা ভেসে উঠেছে। দাদার হাতে কলম ছিল ছুড়ে মেরেছে । ছেলেভুলানো ছড়া ר צ ও পারেতে দুটি মেয়ে নাইতে নেবেছে । ঝুম্ ঝুমু চুলগাছটি ঝাড়তে নেগেছে । কে রেখেছে কে রেখেছে, দাদা রেখেছে। অাজ দাদার ঢেলা ফেলা, কাল দাদার বে । দাদা যাবে কোনখান দে। বকুলতলা দে । বকুলফুল কুড়তে কুড়তে পেয়ে গেলুম মালা । রামধন্থকে বাদি বাজে সীতেনাথের খেলা ॥ সীতেনাথ বলে রে ভাই চালকড়াই খাব । চালকড়াই খেতে খেতে গলা হল কাঠ । হেথা হোথা জল পাব চিৎপুরের মাঠ । চিৎপুরের মাঠেতে বালি চিক্‌ চিক্‌ করে । সোনা-মুখে রোদ নেগে রক্ত ফেটে পড়ে ॥ ইহার মধ্যে কোনো ছবিই অণমাদিগকে ধরিয়া রাখে না, আমরাও কোনো ছবিকে ধরিয়া রাখিতে পারি না । বোটনবিশিষ্ট নোটন পায়রাগুলি, বড়ো সাহেবের বিবিগণ, দুই পারে ভাসমান দুই রুই কাতলা, পরপারে স্নাননিরত দুই মেয়ে, দাদার বিবাহ, রামধতুকের বাদ্য-সহকারে সীতানাথের খেলা, এবং মধ্যাহ্নরৌদ্রে তপ্তবালুচিকণ মাঠের মধ্যে খরতাপক্লিষ্ট রক্তমুখচ্ছবি— এ-সমস্তই প্লের মতো। ও পারে যে দুইটি মেয়ে নাহিতে বসিয়াছে এবং দুই হাতের চুড়িতে চুড়িতে ঝুম ঝুন শব্দ করিয়া চুল ঝাড়িতেছে তাহারা ছবির হিসাবে প্রত্যক্ষ সত্য, কিন্তু প্রাসঙ্গিকতা হিসাবে অপরূপ স্বপ্ন । এ কথাও পাঠকদের স্মরণে রাখা কর্তব্য যে, স্বপ্ন রচনা করা বড়ে৷ কঠিন । হঠাৎ মনে হইতে পারে যে, যেমন-তেমন করিয়া লিখিলেই ছড়। লেখা যাইতে পারে । কিন্তু সেই যেমন-তেমন ভাবটি পাওয়া সহজ নহে। সংসারের সকল কার্যেই আমাদের এমনি অভ্যাস হইয়া গেছে যে, সহজ ૨ ছেলেভুলানো ছড়া Y 2 আজ সুবলের অধিবাস কাল স্ববলের বিয়ে । স্থবলকে নিয়ে যাব আমি দিগনগর দিয়ে । দিগনগরের মেয়েগুলি নাইতে বসেছে। মোটা মোটা চুলগুলি গো পেতে বসেছে। চিকন চিকন চুলগুলি ঝাড়তে নেগেছে । হাতে তাদের দেবশাখা মেঘ নেগেছে। গলায় তাদের তক্তিমালা রক্ত ছুটেছে। পরনে তাদের ডুরে শাড়ি ঘুরে পড়েছে। দুই দিকে দুই কাতলা মাছ ভেসে উঠেছে। একটি নিলেন গুরুঠাকুর একটি নিলেন টিয়ে । টিয়ের মার বিয়ে । নাল গামছা দিয়ে । অশথের পাতা ধনে । গৌরী বেটি কনে ॥ নকা বেটা বর । ঢ্যাম্ কুড় কুড়, বাদি বাজে, চড়কডাঙায় ঘর । এই-সকল ছড়ার মধ্য হইতে সত্য অন্বেষণ করিতে গেলে বিষম বিভ্রাটে পড়িতে হইবে । প্রথম ছড়ায় দেখিয়াছি আলোচাল খাইয়া সীতারাম-নামক নৃত্যপ্রিয় লুব্ধ বালকটিকে ত্রিপূর্ণির ঘাটে জল খাইতে যাইতে হইয়াছিল ; দ্বিতীয় ছড়ায় দেখিতে পাই সীতানাথ চাল কড়াই খাইয়া জলের অন্বেষণে চিৎপুরের মাঠে গিয়া উপস্থিত হইয়াছিল ; কিন্তু তৃতীয় ছড়ায় দেখা যাইতেছে, সীতারাম ও নহে, সীতানাথও নহে, পরন্তু কোনো এক হতভাগিনী ভ্রাতৃজায়ার বিদ্বেষপরায়ণ। ননদিনী জস্তিফল-ভক্ষণের পর তৃষাতুর হইয়া হরগৌরীর মাঠে পান খাইতে গিয়াছিল এবং পরে অসাবধান ভ্রাতৃবধূর তুচ্ছ অপরাধটুকু দাদাকে २ ● লোকসাহিত্য বলিয়। দিবার জন্ত পাড় তোলপাড় করিয়া তুলিয়াছিল। এই তো তিন ছড়ার মধ্যে অসংগতি । তার পর প্রত্যেক ছড়ার নিজের মধ্যেও ঘটনার ধারাবাহিকতা দেখা যায় না। বেশ বুঝা যায়, অধিকাংশ কথাই বানানো। কিন্তু ইহাও দেখিতে পাই, কথা বানাইতে গেলে লোকে প্রমাণের প্রাচুর্ধ-দ্বারা সেটাকে সত্যের অপেক্ষা অধিকতর বিশ্বাসযোগ্য করিয়া তোলে, অথচ এ ক্ষেত্রে সে পক্ষে খেয়ালমাত্র নাই। ইহাদের কথা সত্যও নহে, মিথ্যাও নহে ; দুইয়ের বার। ঐ-যে ছড়ার এক জায়গায় স্ববলের বিবাহের উল্লেখ আছে সেটা কিছু অসম্ভব ঘটনা নহে। কিন্তু সত্য বলিয়াও বোধ হয় না। দাদা দাদা ডাক ছাড়ি, দাদা নাইকে বাড়ি । সুবল সুবল ডাক ছাড়ি, সুবল অাছে বাড়ি ॥ যেমনি স্ববলের নামটা মুখে আসিল অমনিই বাহির হইয়া গেল, “আজি সুবলের অধিবাস, কাল স্ববলের বিয়ে । সে কথাটাও স্থায়ী হইল না, অনতিবিলম্বেই দিগনগরের দীর্ঘকেশ মেয়েদের কথা উঠিল। স্বপ্নেও ঠিক এইরূপ ঘটে । হয়তো শব্দসাদৃপ্ত অথবা অন্য কোনো অলীক তুচ্ছ সম্বন্ধ অবলম্বন করিয়া মুহূর্তে মুহূর্তে একটা হইতে আর-একটা কথা রচিত হইয়া উঠিতে থাকে। মুহূর্তকাল পূর্বে তাহাদের সম্ভাবনার কোনোই কারণ ছিল না, মুহূর্তকাল পরেও তাহারা সম্ভাবনার রাজ্য হইতে বিনা চেষ্টায় অপস্থত হইয়া যায়। স্ববলের বিবাহকে যদি বা পাঠকগণ তৎকালীন ও তৎস্থানীয় কোনো সত্য ঘটনার আভাস বলিয়া জ্ঞান করেন তথাপি সকলেই একবাক্যে স্বীকার করিবেন ‘নাল গামছা দিয়ে টিয়ের মার বিয়ে’ কিছুতেই সাময়িক ইতিহাসের মধ্যে স্থান পাইতে পারে না। কারণ, বিধবাবিবাহ টিয়ে-জাতির মধ্যে প্রচলিত থাকিলেও নাল গামছার ব্যবহার উক্ত সম্প্রদায়ের ছেলেভুলানো ছড়া ૨ છે মধ্যে কম্মিন কালে শুনা যায় নাই। কিন্তু ষাহাদের কাছে ছন্দের তালে তালে সুমিষ্ট কণ্ঠে এই-সকল অসংলগ্ন অসম্ভব ঘটনা উপস্থিত করা হইয়া থাকে তাহার। বিশ্বাসও করে না, সন্দেহও করে না, তাহার মনশ্চক্ষে স্বপ্লবৎ প্রত্যক্ষবৎ ছবি দেখিয়া যায় । বালকের ছবিও অতিশয় সহজে স্বল্লায়োজনে দেখিতে পায়। ইহার কারণ পূর্বে একস্থলে বলিয়াছি, ইচ্ছাশক্তি সম্বন্ধে বালকের সহিত দেবতার একটা সাদৃশ্ব দেখা যায়। বালক যত সহজে ইচ্ছামাত্রই স্বজন করিতে পারে আমরা তেমন পারি না। ভাবিয়া দেখো, একটা গ্রন্থিবাধা বস্ত্রখণ্ডকে মুণ্ডবিশিষ্ট মনুষ্য কল্পনা করিয়া তাহাকে আপনার সস্তানরূপে লালন করা সামান্ত ব্যাপার নহে। আমাদের একটা মৃতিকে মানুষ বলিয়া কল্পনা করিতে হইলে ঠিক সেটাকে মানুষের মতো গড়িতে হয়— যেখানে যতটুকু অমুকরণের ত্রুটি থাকে তাহাতেই আমাদের কল্পনার ব্যাঘাত করে। বহির্জগতের জড়ভাবের শাসনে আমরা নিয়ন্ত্রিত ; আমাদের চক্ষে যাহা পড়িতেছে আমর কিছুতেই তাহাকে অন্যরূপে দেখিতে পারি না। কিন্তু শিশু চক্ষে যাহ! দেখিতেছে তাহাকে উপলক্ষমাত্র করিয়া আপন মনের মতো জিনিস মনের মধ্যে গড়িয়া লইতে পারে, মচুন্যমূতির সহিত বস্ত্রখণ্ডরচিত খেলনকের কোনো বৈসাদৃশ্য তাহার চক্ষে পড়ে না, সে আপনার ইচ্ছারচিত স্বষ্টিকেই সম্মুখে জগজল্যমান করিয়া দেখে । কিন্তু তথাপি ছড়ার এই-সকল অযত্বরচিত চিত্রগুলি কেবল যে বালকের সহজ স্বজন-শক্তি-দ্বারা স্বজিত হইয়া উঠে তাহা নহে ; তাহার অনেক স্থানে রেখার এমন সুস্পষ্টতা আছে যে, তাহারা আমাদের সংশয়ী চক্ষেও অতি সংক্ষেপ বর্ণনায় ত্বরিত-চিত্র অনিয়া উপস্থিত করে । 한 এই ছবিগুলি একটি-রেখা একটি-কথার ছবি । দেশলাই যেমন এক আঁচড়ে দপ, করিয়৷ জলিয়া উঠে বালকের চিত্তে তেমনি একটি কথার টানে একটি ૨૨ লোকসাহিত্য সমগ্র চিত্র পলকের মধ্যে জাগাইয়া তুলিতে হয় । অংশ যোজনা করিয়া কিছু গড়িয়া তুলিলে চলিবে না । চিৎপুরের মাঠেতে বালি চিকচিক্‌ করে। এই একটিমাত্র কথায় একটি বৃহৎ অন্তর্বর মাঠ মধ্যাহ্নের রৌদ্রালোকে আমাদের দৃষ্ট্রিপথে আসিয়৷ উদয় হয় । পরনে তার ডুরে শাড়ি ঘুরে পড়েছে । রে শাড়ির ডোর রেখাগুলি ঘূর্ণাজলের আবর্তধারার মতো তন্ত গাত্রষষ্টিকে যেমন ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেষ্টন করিয়া ধরে তাহ ঐ এক ছত্রে এক মুহূর্তে চিত্রিত হইয়া উঠিয়াছে। আবার পাঠাস্তরে আছে— পরনে তার ডুরে কাপড় উড়ে পড়েছে। সে ছবিটিও মন্দ নহে । আয় ঘুম আয় ঘুম বাগদিপাড়া দিয়ে। বাগদিদের ছেলে ঘুমোয় জাল মুড়ি দিয়ে । ঐ শেষ ছত্ৰে জাল মুড়ি দিয়া বাগদিদের ছেলেট। যেখানে-সেখানে পড়িয়া কিরূপ অ কাতরে ঘুমাইতেছে সে ছবি পাঠকমাত্রেই উপলব্ধি করিতে পারিবেন। অধিক কিছু নহে, ঐ জাল মুড়ি দেওয়ার কথ। বিশেষ করিয়া বলাতেই বাগ দি সন্তানের ঘুম বিশেষরূপে প্রত্যক্ষ হইয়াছে। আয় রে আয় ছেলের পাল মাছ ধরতে যাই। মাছের কাটা পায়ে ফুটল দোলায় চেপে যাই । দোলায় আছে ছ পণ কড়ি গুনতে গুনতে যাই । এ নদীর জলটুকু টলমল করে । এ নদীর ধারে রে ভাই বালি ঝুরুঝুরু করে । চাদমুখেতে রোদ লেগেছে রক্ত ফুটে পড়ে । ছেলেভুলানে। ছড়া ३७ দোলায় করিয়া ছয় পণ কড়ি শুনিতে শুনিতে যাওয়াকে যদি পাঠকের ছবির হিসাবে অকিঞ্চিৎকর জ্ঞান করেন তথাপি শেষ তিন ছত্রকে র্তাহারা উপেক্ষা করিবেন না। নদীর জলটুকু টলমল করিতেছে এবং তীরের বালি ঝুরুঝুরু করিয়া খসিয়া খসিয়া পড়িতেছে, বালুতটবর্তী নদীর এমন সংক্ষিপ্ত সরল অথচ মুম্পষ্ট ছবি আর কী হইতে পারে । এ তে এক শ্রেণীর ছবি গেল। আর-এক শ্রেণীর ছবি আছে যাহা বর্ণনীয় বিষয় অবলম্বন করিয়া একটা সমগ্র ব্যাপার আমাদের মনের মধ্যে জাগ্রত করিয়া দেয়। হয়তো একটা তুচ্ছ বিষয়ের উল্লেখে সমস্ত বঙ্গগৃহ বঙ্গসমাজ জীবস্ত হইয়া উঠিয়া আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে । সে-সমস্ত তুচ্ছ কথা বড়ে বড়ে সাহিত্যে তেমন সহজে তেমন অবাধে তেমন অসংকোচে প্রবেশ করিতে পারে না। এবং প্রবেশ করিলেও আপনিই তাহার রূপান্তর ও ভাৰাস্তর হইয়া যায়। দাদা গো দাদা শহরে যাও । তিন টাকা করে মাইনে পাও ॥ দাদার গলায় তুলসীমালা । বড বরনে চন্দ্রকলা ॥ হেই দাদা তোমার পায়ে পড়ি। বড এনে দাও খেলা করি । দাদার বেতন অধিক নহে– কিন্তু, বোমটির মতে তাহাই প্রচুর । এই তিন টাকা বেতনের সচ্ছলতার উদাহরণ দিয়াই ভগ্নীটি অকুনয় করিতেছেন— হেই দাদা তোমার পায়ে পড়ি । বড এনে দাও খেলা করি । চতুরা বালিকা নিজের এই স্বাৰ্থ-উদ্ধারের জন্য দাদাকেও প্রলোভনের ছলে আভাস দিতে ছাড়ে নাই যে বউ বরনে চন্দ্রকলা’। যদিও ভগ্নীর খেলেনাটি ૨૬, লোকসাহিত্য তিন টাকা বেতনের পক্ষে অনেক মহার্ঘ তথাপি নিশ্চয় বলিতে পারি তাহার কাতর অনুরোধ রক্ষা করিতে বিলম্ব হয় নাই, এবং সেটা কেবলমাত্র সৌভ্রাত্রবশত নহে। উলু উলু মাদারের ফুল । বর আসছে কত দূর ॥ বর আসছে বাঘ নাপাড়া । বড়ো বউ গো রাম চড়া । ছোটো বউ লো জলকে যা । জলের মধ্যে দ্যাকাজোকা । ফুল ফুটেছে চাকা চাকা । ফুলের বরণ কড়ি । নটে শাকের বড়ি ॥ জামাতৃসমাগমপ্রত্যাশিনী পল্লীরমণীগণের ঔৎসুক্য এবং আনন্দ-উৎসবের ছবি আপনি ফুটিয়াছে এবং সেই উপলক্ষে শেওড়াগাছের-বেড়া-দেওয়া পাড়াগায়ের পথঘাট, বন, পুষ্করিণী, ঘটকক্ষ বধূ এবং শিথিলগুন্ঠন ব্যস্তসমস্ত গৃহিণীগণ ইন্দ্রজালের মতো জাগিয়া উঠিয়াছে। এমন প্রায় প্রত্যেক ছড়ার প্রত্যেক তুচ্ছ কথায় বাংলাদেশের একটি মৃতি, গ্রামের একটি সংগীত, গৃহের একটি অস্বাদ পাওয়া যায়। কিন্তু সে-সমস্ত অধিক পরিমাণে উদ্ধত করিতে আশঙ্কা করি, কারণ, ভিন্নরুচিহি লোক: । ছবি যদি কিছু অদ্ভূত গোছের হয়, তাহাতে কোনো ক্ষতি নাই বরঞ্চ ভালোই। কারণ, নূতনত্বে চিত্তে আরো অধিক করিয়া আঘাত করে । ছেলের কাছে অদ্ভুত কিছু নাই ; কারণ, তাহার নিকট অসম্ভব কিছু নাই । সে এখনো জগতে সম্ভাব্যতার শেষসীমাবতী প্রাচীরে গিয়া চারি দিক হইতে মাথা ঠুকিয়। ফিরিয়া আসে নাই। সে বলে, যদি কিছুই সম্ভব হয় তবে 卸 লোকসাহিত্য وفي ج প্রথমত, টিয়েপাখি নৌকা চড়িয়া আসিতেছে এমন দৃপ্ত কোনো বালক তাহার পিতার বয়সেও দেখে নাই ; বালকের পিতার সম্বন্ধেও সে কথা খাটে । কিন্তু সেই অপূর্বতাই তাহার প্রধান কৌতুক। বিশেষত, হঠাৎ যখন অগাধ জলের মধ্য হইতে একটা স্ফীতকায় বোয়াল মাছ উঠিয়া, বলা নাই কহ। নাই, থমকা তাহার নৌকাখানা লইয়া চলিল, এবং ক্রুদ্ধ ও ব্যতিব্যস্ত টিয়া মাথার রোয় ফুলাইয়া, পাখী ঝাপটাইয়া, অত্যুচ্চ চীৎকারে আপত্তি প্রকাশ করিতে থাকিল, তখন কৌতুক আরো বাড়িয়া উঠে। টিয়া বেচারার দুৰ্গতি এবং জলচর প্রাণীটার নিতান্ত অভদ্র ব্যবহার দেখিয়া অকস্মাৎ ভেঁাদড়ের দুনিবার নৃত্য-পৃহাও বড়ো চমৎকার । এবং সেই আনন্দনৰ্তনপর নিষ্ঠুর ভোঁদড়টিকে নিজের নৃত্যবেগ সম্বরণপূর্বক খোকার নৃত্য দেখিবার জন্য ফিরিয়া চাহিতে অনুরোধ করার মধ্যেও বিস্তর রস আছে। যেমন মিষ্ট ছন্দ শুনিলেই তাহাকে গানে বাধিয়া গাহিতে ইচ্ছা করে তেমনি এই-সকল ভাষার চিত্র দেখিলেই ইহাদিগকে রেখার চিত্রে অনুবাদ করিয়া ভাকিয়া ফেলিতে ইচ্ছা করে । কিন্তু হায়, এ-সকল চিত্রের রস নষ্ট না করিয়া ইহাদের বাল্য সরলতা, উজ্জল নবীনতা, অসংশয়তা, অসম্ভবের সহজ সম্ভবত রক্ষা করিয়া আঁকিতে পারে এমন চিত্রকর আমাদের দেশে কোথায় এবং বোধ করি সর্বত্রই দুর্লভ । থোক যাবে মাছ ধরতে ক্ষৗরনদীর কুলে। ছিপ নিয়ে গেল কোলা ব্যাঙে, মাছ নিয়ে গেল চিলে । থোকা ব'লে পাখিটি কোন বিলে চরে । থোকা ব’লে ডাক দিলে উড়ে এসে পড়ে ॥ ক্ষীরনদীর কূলে মাছ ধরিতে গিয়া খোকা যে কী সংকটেই পড়িয়াছিল তাহা কি তুলি দিয়া না আঁকিলে মনের ক্ষোভ মেটে ? অবশু, ক্ষীরনীর ভূগোলবৃত্তাস্ত থোকাবাবু আমাদের অপেক্ষ অনেক ভালো জানেন সন্দেহ নাই ; কিন্তু যে নদীতেই হউক, তিনি ষে প্রাজ্ঞোচিত ধৈর্ষাবলম্বন করিয়া পরম ছেলেভুলানো ছড়া 있 গম্ভীরভাবে নিজ আয়তনের চতুর্গুণ দীর্ঘ এক ছিপ ফেলিয়া মাছ ধরিতে বসিয়াছেন তাহাই যথেষ্ট কৌতুকাবহ, তাহার উপর যখন জল হইতে ড্যাব চক্ষু মেলিয়া একটা অত্যন্ত উৎকট গোছের কোলা ব্যাঙ থোকার ছিপ লইয়া টান মারিয়াছে এবং অন্য দিকে ডাঙা হইতে চিল আসিয়া মাছ ছে৷ মারিয়া লইয়া চলিয়াছে, তখন র্তাহার বিব্রত বিম্মিত ব্যাকুল মুখের ভাব— একবার বা প্রাণপণ শক্তিতে পশ্চাতে ঝু”কিয়া পড়িয়া ছিপ লইয়া টানাটানি, একবার বা সেই উডউীন চোরের উদ্দেশে দুই উৎসুক ব্যগ্র হস্ত উধেবর্ণ উৎক্ষেপ—এ-সমস্ত চিত্র সুনিপুণ সহৃদয় চিত্রকরের প্রত্যাশায় বহুকাল হইতে প্রতীক্ষা করিতেছে । ć আবার থোকার পক্ষীমূর্তিও চিত্রের বিষয় বটে। মস্ত একটা বিল চোখে পড়িতেছে । তাহার ও পারটা ভালো দেখা যায় না। এ পারে তীরের কাছে একটা কোণের মতো জায়গায় বড়ো বড়ো ঘাস, বেতের ঝাড় এবং ঘন কচুর সমাবেশ ; জলে শৈবাল এবং নালফুলের বন, তাহারই মধ্যে লম্বচঞ্চু দীর্ঘপদ গম্ভীরপ্রকৃতি ধ্যামপরায়ণ গোটাকতক বক-সারসের সহিত মিশিয়। খোকাবাবু ডানা গুটাইয়। নতশিরে অত্যন্ত নিবিষ্টভাবে চরিয়া বেড়াইতেছেন, এ দৃশুটিও বেশ— এবং বিলের অনতিদূরে ভাদ্রমাসের জলমগ্ন পক্কশীর্ষ ধান্তক্ষেত্রের সংলগ্ন একটি কুটির ; সেই কুটির-প্রাঙ্গণে বাশের বেড়ার উপরে বাম হস্ত রাখিয়া দক্ষিণ হস্ত বিলের অভিমুখে সম্পূর্ণ প্রসারিত করিয়া দিয়া অপরাহের অবসান-স্বর্যালোকে জননী তাহার খোকাবাবুকে ডাকিতেছেন ; বেড়ার নিকটে ঘরে-ফেরা বাধা গরুটিও স্তিমিত কৌতুহলে সেই দিকে চাহিয়া দেখিতেছে এবং ভোজনতৃপ্ত খোকাবাবু নালবন শৈবালবনের মাঝখানে হঠাৎ মায়ের ভাক শুনিয়া সচকিতে কুটিরের দিকে চাহিয়া উড়ি-উড়ি করিতেছে, সেও স্বন্দর দৃপ্ত— এবং তাহার পর তৃতীয় দৃশ্বে পাখিটি মার বুকে গিয়া তাহার কাধে মুখ লুটাইয়াছে এবং দুই ডানায় তাহাকে অনেকটা ঝাপিয়া ফেলিয়াছে এবং ー&b" লোকসাহিত্য নিমীলিতনেত্রে মা দুই হস্তে স্বকোমল ভানা-মৃদ্ধ তাহাকে বেষ্টন করিয়া নিবিড় স্নেহবন্ধনে বুকে বাধিয়া ধরিয়াছেন, সেও স্বন্দর দেখিতে হয়। জ্যোতিবিদগণ ছায়াপথের নীহারিকা পর্যবেক্ষণ করিতে করিতে দেখিতে পান, সেই জ্যোতির্ময় বাষ্পরাশির মধ্যে মধ্যে এক-এক জায়গায় যেন বাষ্প সংহত হইয়া নক্ষত্রে পরিণত হইবার উপক্রম করিতেছে। আমাদের এই ছড়ার নীহারিকারাশির মধ্যেও সহসা স্থানে স্থানে সেইরূপ অর্ধসংহত আকারবদ্ধ কবিত্বের মূর্তি দৃষ্টিপথে পড়ে। সেই-সকল নবীনস্থষ্ট কল্পনামগুলের মধ্যে জটিলতা কিছু নাই— প্রথম বয়সের শিশু-পৃথিবীর ন্যায় এখনো সে কিঞ্চিৎ তরলাবস্থায় আছে ; কঠিন হইয় উঠে নাই। একটা উদদ্ভুত করি— জাদু, এ তো বড়ে রঙ্গ জাদু, এ তো বড়ো রঙ্গ । চার কালো দেখাতে পার যাব তোমার সঙ্গ । কাক কালো, কোকিল কালো, কালো ফিঙের বেশ । তাহার অধিক কালো, কন্যে, তোমার মাথার কেশ ৷ জাদু, এ তো বড়ো রঙ্গ জাদু, এ তো বড়ো রঙ্গ । চার ধলো দেখাতে পার যাব তোমার সঙ্গ । বক ধলো, বস্ত্র ধলো, ধলে রাজহংস । তাহার অধিক ধলো, কন্যে, তোমার হাতের শঙ্খ ॥ জাদু, এ তো বড়ো রঙ্গ জাদু, এ তো বড়ো রঙ্গ । চার রাঙা দেখাতে পার যাব তোমার সঙ্গ । জবা রাঙা, করবী রাঙা, রাঙা কুসুমফুল । তাহার অধিক রাঙা, কন্যে, তোমার মাথার সি“দুর । ছেলেভুলানো ছড়া २ > জাদু, এ তো বড়ে রঙ্গ জাদু, এ তে বড়ে রঙ্গ । চার তিতে দেখাতে পার যাব তোমার সঙ্গ ॥ নিম তিতে, নিস্থন্দে তিতে, তিতে মাকাল ফল । তাহার অধিক তিতো, কন্তে, বোন-সতিনের ঘর । জাদু, এ তো বড়ে রঙ্গ জাদু, এ তো বড়ে রঙ্গ । চার হিম দেখাতে পার যাব তোমার সঙ্গ ॥ হিম জল, হিম স্থল, হিম শীতলপাটি । তাহার অধিক হিম, কন্তে, তোমার বুকের ছাতি । কবিসম্প্রদায় কবিত্বস্বষ্টির আরম্ভকাল হইতে বিবিধ ভাষায় বিচিত্র ছন্দে নারীজাতির স্তবগান করিয়া আসিতেছেন, কিন্তু উপরি-উদ্ধৃত স্তবগানের মধ্যে যেমন একটি সরল সহজ ভাব এবং একটি সরল সহজ চিত্র আছে এমন অতি অল্প কাব্যেই পাওয়া যায়। ইহার মধ্যে অজ্ঞাতসারে একটুখানি সরল কৌতুক আছে। সীতার ধচুক-ভাঙা এবং দ্রৌপদীর লক্ষ্যবেধ পণ খুব কঠিন পণ ছিল সন্দেহ নাই। কিন্তু এই সরলা কন্যাটি যে পণ করিয়া বসিয়াছে সেটি তেমন কঠিন বলিয়া বোধ হয় না। পৃথিবীতে এত কালো ধলে রাঙা মিষ্টি আছে যে তাহার মধ্যে কেবল চারিটি মাত্র নমুনা দেখাইয়া এমন কন্যা লাভ করা ভাগ্যবানের কাজ। আজকাল কলির শেষ দশায় সমস্ত পুরুষের ভাগ্য ফিরিয়াছে, ধনুৰ্ভঙ্গ লক্ষ্যবেধ বিচারে -জয় এ-সমস্ত কিছুরই আবশ্যক হয় না ; উলটিয়া তাহারাই কোম্পানির কাগজ পণ করিয়া বসেন, এবং সেই কাপুরুষোচিত নীচতার জন্য তিলমাত্র অত্মগ্লানি অনুভব করেন না । ইহা অপেক্ষ আমাদের আলোচিত ছড়াটির নায়ক-মহাশয়কে যে সামান্য সহজ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া কন্যা লাভ করিতে হইয়াছিল সেও অনেক ভালো। যদিও পরীক্ষার শেষ ফল উক্ত ছড়াটির মধ্যে পাওয়া যায় নাই তথাপি অনুমানে বলিতে পারি লোকটি পুর। নম্বর পাইয়াছিল। কারণ, দেখা যাইতেছে, প্রত্যেক শ্লোকের চারিটি উত্তরের মধ্যে চতুর্থ উত্তরটি দিব্য সন্তোষজনক হইয়াছিল। কিন্তু, পরীক্ষয়িত্রী যখন স্বয়ং সশরীরে সম্মুখে উপস্থিত ছিলেন তখন সে উত্তরগুলি জোগানো আমাদের নায়কের পক্ষে যে কিছুমাত্র কঠিন হইয়াছিল তাহ আমরা বলিতে পারি না ; ও যেন ঠিক বই খুলিয়৷ উত্তর দেওয়ার মতে । কিন্তু, সেজন্য নিষ্ফল ঈর্ষ প্রকাশ করিতে চাহি না । যিনি পরীক্ষক ছিলেন তিনি যদি সস্তুষ্ট হইয়া থাকেন তবে আমাদের আর-কিছু বলিবার নাই । প্রথম ছত্রে কন্যা কহিতেছেন— জাদু, এ তো বড়ো রঙ্গ জাছ এ তো বড়ো রঙ্গ । ইহা হইতে বোধ হইতেছে, পরীক্ষা আরো পূর্বেই আরম্ভ হইয়াছে এবং পরীক্ষার্থী এমন মনের মতন আনন্দজনক উত্তরটি দিয়াছে ধে, কন্যার প্রশ্নজিজ্ঞাসার ইচ্ছা উত্তরোত্তর বাড়িয়া উঠিতেছে । বাস্তবিক এমন রঙ্গ আর-কিছু নাই। o যাহা হউক, আমাদের উপরে এই ছড়াটির রচনার ভার থাকিলে খুব সম্ভব ভূমিকাটা রীতিমত ফাদিয়া বসিতাম ; এমন আচমক মাঝখানে আরম্ভ করিতাম না। প্রথমে একটা পরীক্ষণশালার বর্ণনা করিতাম, সেটা যদি-বা ঠিক সেনেট হলের মতো ন হইত, অনেকটা ইণ্ডন গার্ডেনের অনুরূপ হইতে পারিত । এবং তাহার সহিত জ্যোৎস্নার আলো, দক্ষিণের বাতাস এবং কোকিলের কুহুধ্বনি যোগ করিয়া ব্যাপারটাকে বেশ একটু জমজমাট করিয়া তুলিতাম— আয়োজন অনেকরকম করিতে পারিতাম, কিন্তু এই সরল সুন্দর কন্যাটি যাহার মাথার কেশ ফিঙের অপেক্ষা কালো, হাতের শাখা রাজহংসের অপেক্ষা ধলে, সি°থার সি“দুর কুমুমফুলের অপেক্ষ রাঙা, স্নেহের কোল ছেলেদের কথার অপেক্ষ মিষ্ট এবং বক্ষস্থল শীতল জলের ছেলেভুলানো ছড়া . \9צ অপেক্ষ স্নিগ্ধ, সেই মেয়েটি— ষে মেয়ে সামান্ত কয়েকটি স্তুতিবাক্য শুনিয়া সহজ বিশ্বাসে ও সরল আনন্দে আত্মবিসর্জন করিতে প্রস্তুত হইয়াছে— তাহাকে আমাদের সেই বর্ণনাবহুল মাজিত ছন্দের বন্ধনের মধ্যে এমন করিয়া চিরকালের মতো ধরিয়া রাখিতে পারিতাম না। কেবল এই ছড়াটি কেন, আমাদের উপর ভার দিলে আমরা অধিকাংশ ছড়াই সম্পূর্ণ সংশোধন করিয়া নূতন সংস্করণের যোগ্য করিয়া তুলিতে পারি। এমন-কি, উহাদের মধ্যে সর্বজনবিদিত নীতি এবং সর্বজনদুর্বোধ্য তত্ত্বজ্ঞানেরও বাস নির্মাণ করিতে পারি। কিছু না হউক, উহাদিগকে আমাদের বর্তমান শিক্ষা ও সামাজিক অবস্থার উন্নততর শ্রেণীতে উত্তীর্ণ করিয়া দিতে পারি। বিবেচনা করিয়া দেখুন, আমরা যদি কখনো বর্তমান সভ্যসমাজে চাদকে নিমন্ত্রণ করিয়া আনিতে ইচ্ছা করি তবে কি তাহাকে নিম্নলিখিতরূপে তুচ্ছ প্রলোভন দেখাইতে পারি— অায় অায় চাদামামা টী দিয়ে যা । চাদের কপালে চাদ টী দিয়ে ষা । মাছ কুটলে মুড়ো দেৰ, ধান ভানলে কুঁড়ো দেব, কালে গোরুর দুধ দেব, । দুধ খাবার বাটি দেব, চাদের কপালে চাদ টী দিয়ে যা । এ কোন চাদ! নিতান্তই বাঙালির ঘরের চাদ । এ আমাদের বাল্যসমাজের সর্বজ্যেষ্ঠ সাধারণ মাতুল চাদ । এ আমাদের গ্রামের কুটিরের নিকটে বায়ু-আন্দোলিত বাশবনের রন্ধগুলির ভিতর দিয়া পরিচিত স্নেহহাস্তমুখে প্রাঙ্গণধূলিবিলুষ্ঠিত উলঙ্গ শিশুর খেল দেখিয়া থাকে ; ইহার সঙ্গে আমাদের গ্রামসম্পর্ক আছে। নতুবা, এতবড়ো লোকটা যিনি সপ্তবিংশতি নক্ষত্রসুন্দরীর অন্তঃপুরে বর্ষ যাপন করিয়া থাকেন, যিনি সমস্ত স্বরলোকের স্বধারস আপনার অক্ষয় রৌপ্যপাত্রে রাত্রিদিন রক্ষা করিয়া আসিতেছেন, সেই শশলাঞ্ছন হিমাংশুমালীকে মাছের মুড়ো, ধানের কুঁড়ো, কালে গোরুর দুধ খাবার বাটির প্রলোভন দেখাইতে কে সাহস করিত ! আমরা হইলে বোধ করি পারিজাতের মধু, রজনীগন্ধার সৌরভ, বউ-কথাকও’এর গান, মিলনের হাসি, হৃদয়ের আশা, নয়নের স্বপ্ন, নববধূর লজ্জা প্রভৃতি বিবিধ অপূর্বজাতীয় দুর্লভ পদার্থের ফর্দ করিয়া বসিতাম– অথচ চাদ তখনো যেখানে ছিল এখনো সেখানেই থাকিত । কিন্তু ছড়ার চাদকে ছড়ার লোকেরা মিথ্যা প্রলোভন দিতে সাহস করিত না— খোকার কপালে টী দিয়া যাইবার জন্য নামিয়া আসা চাদের পক্ষে যে একেবারেই অসম্ভব তাহা তাহারা মনে করিত না । এমন ঘোরতর বিশ্বাসহীন সন্দিগ্ধ নাস্তিক-প্রকৃতি তাহারা ছিল না। সুতরাং ভাণ্ডারে যাহা মজুত আছে, তহবিলে যাহা কুলাইয়। উঠে, কবিত্বের উৎসাহে তাহার অপেক্ষ অত্যন্ত অধিক কিছু স্বীকার করিয়া বসিতে পারিত না। আমাদের বাংলাদেশের চাদামামা বাংলাদেশের সহস্ৰ কুটির হইতে স্বকণ্ঠের সহস্র নিমন্ত্রণ প্রাপ্ত হইয়া চুপিচুপি হাস্ত করিত ; হা’ও বলিত না, না’ও বলিত না ; এমন ভাব দেখাইত যেন কোনদিন, কাহাকেও কিছু সংবাদ না দিয়া, পূর্বদিগন্তে যাত্রারম্ভ করিবার সময়, অমনি পথের মধ্যে কৌতুকপ্রফুল্প পরিপূর্ণ হাস্তমুখখানি লইয়া ঘরের কানাচে আসিয়া দাড়াইবে ।  আমরা পূর্বেই বলিয়াছি, এই ছড়াগুলিকে একটি আস্ত জগতের ভাঙা টুকরা বলিয়। বোধ হয়। উহাদের মধ্যে বিচিত্র বিস্মৃত সুখদুঃখ শতধা-বিভক্ত হইয়া রহিয়াছে। যেমন পুরাতন পৃথিবীর প্রাচীন সমুদ্রতীরে কর্দমতটের উপর বিলুপ্তবংশ সেকালের পাখিদের পদচিহ্ন পড়িয়াছিল— অবশেষে কালক্রমে কঠিন চাপে সেই কর্দম, পদচিহ্নরেখা-সমেত, পাথর হইয়া গিয়াহুে— সে চিহ্ন ছেলেভুলানো ছড়া \סAC( আপনি পড়িয়াছিল এবং আপনি রহিয়া গেছে— কেহ খোস্তা দিয়ে খুদে নাই, কেহ বিশেষ যত্নে তুলিয়া রাখে নাই— তেমনি এই ছড়াগুলির মধ্যে অনেক দিনের অনেক হাসিকান্ন। আপনি অঙ্কিত হইয়াছে, ভাঙাচোরা ছন্দগুলির ধ্যে অনেক হৃদয়বেদনা সহজেই সংলগ্ন হইয়া রহিয়াছে। কত কালের এক-টুকর। মানুষের মন কালসমুদ্রে ভাসিতে ভাসিতে এই বহুদূরবর্তী বর্তমানের তীরে অসিয়া উৎক্ষিপ্ত হইয়াছে ; আমাদের মনের কাছে সংলগ্ন হইবামাত্র তাহার সমস্ত ৰিন্থত বেদন জীবনের উত্তাপে লালিত হইয়া আবার অশ্রুরসে সজীব হইয়া উঠিতেছে। , ও পারেতে কালো রঙ, বৃষ্টি পড়ে ঝম্ ঝম্‌, এ পারেতে লঙ্কা গাছটি রাঙা টুক্‌টুক্‌ করে । গুণবতী ভাই অামার, মন কেমন করে । এ মাসটা থাকৃ দিদি, কেঁদে ককিয়ে । ও মাসেতে নিয়ে যাব পান্ধি সাজিয়ে ॥ হাড় হল ভাজ-ভাজা, মাস হল দড়ি । আয় রে অায় নদীর জলে ঝাপ দিয়ে পড়ি ॥ এই অন্তর্ব্যথা, এই রুদ্ধ সঞ্চিত অশ্রুজলোচ্ছ্বাস, কোন কালে কোন গোপন গৃহকোণ হইতে কোন অজ্ঞাত অখ্যাত বিস্মৃত নববধূর কোমল হৃদয়খানি বিদীর্ণ করিয়া বাহির হইয়াছিল ! এমন কত অসহ কষ্ট জগতে কোনো চিহ্ন না রাখিয়া অদ্ভূত দীর্ঘনিশ্বাসের মতো বায়ুস্রোতে বিলীন হইয়াছে ! এটা কেমন করিরা দৈবক্রমে একটি শ্লোকের মধ্যে আবদ্ধ হইয়া গিয়াছে। ও পারেতে কালো রঙ, বৃষ্টি পড়ে ঝম্ ঝম্‌। এমন দিনে এমম অবস্থায় মন-কেমন না করিয়া থাকিতে পারে না। চিরকালই A38 W লোকসাহিত্য এমনি হইয়া আসিতেছে। বহুপূর্বে উজয়িনী-রাজসভার মহাকবিও বলিয়। शॆिब्रi८छ्ब মেঘালোকে ভবতি স্থখিনোহপ্যন্যথাবৃত্তিচেত: | • • • • • • • • • • • • • • কিং পুনরুদূরসংস্থে । কালিদাস যে কথাটি ঈষৎ দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন মাত্র এই ছড়ায় সেই কথাটা বুক ফাটিয়া কাদিয়া উঠিয়াছে— গুণবতী ভাই আমার, মন কেমন করে. . . হাড় হল ভাজা ভাজা, মাস হল দড়ি । আয় রে আয় নদীর জলে ঝাপ দিয়ে পড়ি ॥ ইহার ভিতরকার সমস্ত মর্মাস্তিক কাহিনী, সমস্ত দুর্বিষহ বেদনাপরম্পরা কে বলিয়া দিবে ? দিনে দিনে রাত্রে রাত্রে মুহূর্তে মুহূর্তে কত সহ করিতে হইয়াছিল— এমন সময়, সেই স্নেহস্মৃতিহীন স্থখহীন পরের ঘরে হঠাৎ একদিন তাহার পিতৃগৃহের চিরপরিচিত ব্যথার ব্যর্থ ভাই আপন ভগিনীটির তত্ত্ব লইতে আসিয়াছে— হৃদয়ের স্তরে স্তরে সঞ্চিত নিগুঢ় অশ্রুরাশি সেদিন আর কি বাধা মানিতে পারে ! সেই ঘর, সেই খেলা, সেই বাপ-মা, সেই মুখশৈশব সমস্ত মনে পড়িয়া আর কি এক দণ্ড দুরন্ত উতলা হৃদয়কে বাধিয়া রাখা যায়! সেদিন কিছুতে আর একটি মাসের প্রতীক্ষাও প্রাণে সহিতেছিল না— বিশেষত, সেদিন নদীর ও পার নিবিড় মেঘে কালো হইয়া আসিয়াছিল ; বৃষ্টি ঝম্‌ঝম্ করিয়া পড়িতেছিল ; ইচ্ছা হইতেছিল বর্ষার বৃষ্টিধারামুখরিত, মেঘচ্ছায়াখামল, কুলে-কুলে-পরিপূর্ণ অগাধ শীতল নদীটির মধ্যে ঝাপ দিয়া পড়িয়া এখনই হাড়ের ভিতরকার জালাট নিবাইয়া আসি ৷ ইহার মধ্যে একটি ব্যাকরণের ভুল আছে, সেটিকে বঙ্গভাষার সতর্ক অভিভাবকগণ মার্জন করিবেন, এমন-কি, তাহার উপরেও একবিন্দু অশ্রুপাত করিবেন। ভাইয়ের প্রতি গুণবতী’ বিশেষণ প্রয়োগ করিয়া । ছেলেভুলানো ছড়া °金 উক্ত অজ্ঞাতনামী কস্তাটি অপরিমেয় মূর্খতা প্রকাশ করিয়াছিল। সে হতভাগিনী স্বপ্নেও জানিত না, তাহার সেই একটি দিনের মর্মভেদী ক্ৰন্দনধ্বনির সহিত এই ব্যাকরণের ভুলটুকুও জগতে চিরস্থায়ী হইয়৷ যাইবে। জানিলে লজ্জায় মরিয়া যাইত। হয়তো ভুলটি গুরুতর নহে ; হয়তো ভগিনীকে সম্বোধন করিয়া কথাটা বলা হইতেছে এমনও হইতে পারে । সম্প্রতি যাহারা বঙ্গভাষার বিশুদ্ধিরক্ষাব্রতে ভাষাগত প্রথা এবং পুরাতন সৌন্দর্যগুলিকে বলিদান করিতে উদ্যত হইয়াছেন ভরসা করি তাহারাও মাঝে মাঝে স্নেহবশত আত্মবিশ্বত হইয়া ব্যাকরণলঙ্ঘন-পূর্বক ভগিনীকে ভাই বলিয়া থাকেন, এমন-কি, পত্নীশ্ৰেণীয় সম্পর্কের দ্বারা প্রতিপূর্ণ ভ্রাতৃসম্বোধনে অভিহিত হইলে তৎক্ষণাৎ তাহাদের ভ্রম সংশোধন করিয়া ८तिम न्ब1 ।। আমাদের বাংলাদেশের এক কঠিন অন্তরূবেদন আছে– মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠানো । অপ্রাপ্তবয়স্ক অনভিজ্ঞ মূঢ় কন্যাকে পরের ঘরে যাইতে হয়, সেইজন্য বাঙালি কন্যার মুখে সমস্ত বঙ্গদেশের একটি ব্যাকুল করুণ দৃষ্ট নিপতিত রহিয়াছে। সেই সকরুণ কাতর স্নেহ, বাংলার শারদোৎসবে স্বগীয়তা লাভ করিয়াছে। আমাদের এই ঘরের স্নেহ, ঘরের দুঃখ, বাঙালির গৃহের এই চিরন্তন বেদন হইতে অশ্রুজল আকর্ষণ করিয়া লইয়া বাঙালির হৃদয়ের মাঝখানে শারদোৎসব পল্লবে ছায়ায় প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। ইহা বাঙালির অম্বিকাপূজা, এবং বাঙালির কন্যাপূজাও বটে। আগমনী এবং বিজয়া বাংলার মাতৃহৃদয়ের গান। অতএব সহজেই ধরিয়া লওয়া যাইতে পারে যে, আমাদের ছড়ার মধ্যেও বঙ্গজননীর এই মর্মব্যথা নানা আকারে প্রকাশ পাইয়াছে। আজ দুর্গার অধিবাস, কাল দুর্গার বিয়ে । দুর্গ যাবেন শ্বশুরবাড়ি সংসার কাদায়ে । top লোকসাহিত্য মা কাজেন মা কাদেন ধুলায় লুটায়ে সেই-যে মা পলাকাটি দিয়েছেন গলা সাজায়ে ॥ বাপ কাদেম বাপ কঁাদেন দরবারে বসিয়ে সেই-যে বাপ টাকা দিয়েছেন সিন্ধুক সাজায়ে । মাসি র্কাদেন মাসি র্কাদেন হেঁশেলে বসিয়ে সেই-যে মাসি ভাত দিয়েছেন পাথর সাজিয়ে ॥ পিপি কঁ}দেন পিসি কাদেন গোয়ালে বসিয়ে সেই-ষে পিসি দুধ দিয়েছেন বাটি সাজিয়ে ॥ ভাই র্কাদেন ভাই কাদেন আঁচল ধরিয়ে সেই-যে ভাই কাপড় দিয়েছেন আলনা সাজিয়ে ॥ বোন কাদেন বোন কাদেন খাটের খুরো ধরে সেই-যে বোন— এইখানে, পাঠকদিগের নিকট অপরাধী হুইবার আশঙ্কায় ছড়াটি শেষ করিবার পূর্বে দুই-একটি কথা বলা আবশ্যক বোধ করি। ষে ভগিনীটি আজ খাটের খুরা ধরিয়া দাড়াইয়া দাড়াইয়া অজস্র অশ্রমোচন করিতেছেন তাহার পূর্বব্যবহার কোনো ভদ্রকন্যার অনুকরণীয় নহে। বোনে বোনে কলহ না হওয়াই ভালো, তথাপি সাধারণত এরূপ কলহ নিত্য ঘটিয়া থাকে। কিন্তু তাই বলিয়া কন্যাটির মুখে এমন ভাষা ব্যবহার হওয়া উচিত হয় না যাহা আমি অদ্য ভদ্রসমাজে উচ্চারণ করিতে কুষ্ঠিত বোধ করিতেছি। তথাপি সে ছত্রটি একেবারেই বাদ দিতে পারিতেছি না কারণ তাহার মধ্যে কতকটা ইতর ভাষা আছে বটে কিন্তু তদপেক্ষ। অনেক অধিক পরিমাণে বিশুদ্ধ করুণরস আছে। ভাষান্তরিত করিয়া বলিতে গেলে মোট কথা এই দাড়ায় যে, এই রোরুদ্যমান বালিকাটি ইতিপূর্বে কলহকালে তাহার সহোদরাকে ভর্তৃখাদিক। বলিয়া অপমান করিয়াছেন। আমরা সেই গালিটিকে অপেক্ষাকৃত অনতিরূঢ় ভাষায় পরিবর্তন করিয়া ছেলেভুলানো ছড়া רכא নিয়ে ছন্দ পূরণ করিয়া দিলাম— 鹹 বোন কাদেন বোন কাদেন খাটের খুরো ধরে সেই-যে বোন গাল দিয়েছেন স্বামীখাকী বলে । ম। অলংকার দিয়াছেন, বাপ অৰ্থ দিয়াছেন, মাসি ভাত খাওয়াইয়াছেন, পিসি দুধ খাওয়াইয়াছেন, ভাই কাপড় কিনিয়া দিয়াছেন— আশা করিয়াছিলাম এমন স্নেহের পরিবারে ভগিনীও অনুরূপ কোনো প্রিয়কাৰ্য করিয়া থাকিবেন । কিন্তু হঠাৎ শেষ ছত্রটা পড়িয়াই বক্ষে একটা আঘাত লাগে এবং চক্ষুও ছলছল করিয়া উঠে। মা-বাপের পূর্বতন স্নেহব্যবহারের সহিত বিদায়কালীন রোদনের একটা সামঞ্জস্ত আছে– তাহ প্রত্যাশিত। কিন্তু যে ভগিনী সর্বদা ঝগড়া করিত এবং অকথ্য গালি দিত, বিদায়কালে তাহার কান্না যেন সব চেয়ে সকরুণ ৷ হঠাৎ আজ বাহির হইয়া পড়িল যে, তাহার সমস্ত দ্বন্দ্বকলহের মাঝখানে একটি সুকোমল স্নেহ গোপনে সঞ্চিত হইতেছিল —সেই অলক্ষিত স্নেহ সহসা সুতীব্র অনুশোচনার সহিত আজ তাহাকে বড়ে কঠিন আঘাত করিল। সে খাটের খুৱা ধরিয়া কাদিতে লাগিল । বাল্যকালে এই এক খাটে তাহারা দুই ভগিনী শয়ন করিত, এই শয়নগৃহই তাহাদের সমস্ত কলহবিবাদ এবং সমস্ত খেলাধুলার লীলাক্ষেত্র ছিল। বিচ্ছেদের দিনে এই শয়ন-ঘরে আসিয়া, এই খাটের খুরা ধরিয়া, নির্জনে গোপনে দাড়াইয়া, ব্যথিত বালিকা যে ব্যাকুল অশ্রপাত করিয়াছিল, সেই গভীর স্নেহ-উৎসের নির্মল জলধারায় কলহভাষার সমস্ত কলঙ্ক প্রক্ষালিত হইয়। শুভ্ৰ হইয়া গিয়াছে। এই-সমস্ত ছড়ার মধ্যে একটি ছত্রে, একটি কথায়, স্থখদু:খের এক-একটি বড়ো বড়ো অধ্যায় উহ রহিয়া গিয়াছে। নিম্নে ষে ছড়াটি উদ্ভূত করিতেছি তাহার দুই ছত্রে আদ্যকাল হইতে অন্তকাল পর্যন্ত বঙ্গীয় জননীর কত দিনের শোকের ইতিহাস ব্যক্ত হইয়াছে— \ob- লোকসাহিত্য দোল দোল দুলুনি । রাঙা মাথায় চিরুনি । বর আসবে এখনি । নিয়ে যাবে তখনি ॥ কেঁদে কেন মর। আপনি বুঝিয়া দেখো কার ঘর কর । একটি শিশুকন্তকেও দোল দিতে দিতে দূরভবিষ্যৎবর্তী বিচ্ছেদসম্ভাবনা স্বতই মনে উদয় হয় এবং মায়ের চক্ষে জল আসে। তখন একমাত্র সাস্বনার কথা এই যে, এমনি চিরদিন হুইয়া আসিতেছে। তুমিও একদিন মাকে কাদাইয়া পরের ঘরে চলিয়া অসিয়াছিলে— আজিকার সংসার হইতে সেদিনকার নিদারুণ বিচ্ছেদের সেই ক্ষতবেদনার সম্পূর্ণ আরোগ্য হইয়া গিয়াছে— তোমার মেয়ে ও যথাকালে তোমাকে ছাড়িয়া চলিয়া যাইবে এবং সে দুঃখ ও বিশ্বজগতে অধিক দিন স্থায়ী হইবে না। পু"টুর শ্বশুরবাড়ি-প্রয়াণের অনেক ছবি এবং অনেক প্রসঙ্গ পাওয়া যায়। সে কথাটা সর্বদাই মনে লাগিয়া অাছে। পুটু যাবে শ্বশুরবাড়ি সঙ্গে যাবে কে । ঘরে আছে কুনো বেড়াল কোমর বেঁধেছে । । আম কঁঠালের বাগান দেব ছায়ায় ছায়ায় যেতে । চার মিনসে কাহার দেব পান্ধি বহাতে । সরু ধানের চি-ড়ে দেব পথে জল খেতে । চার মাগী দাসী দেব পায়ে তেল দিতে । উড়কি ধানের মুড়কি দেব শাশুড়ি ভুলাতে ॥ ১ নিত্যানন্দবিনোদ গোস্বামী সংকলিত 'ছেলেভুলানো ছড়া'য় পাঠান্তর ভ্রষ্টব্য। ছেলেভুলানো ছড়া, \So শেষ ছত্ৰ দেখিলেই বিদিত হওয়া যায়, শাশুড়ি কিসে ভুলিবে এই পরম দুশ্চিম্ভ। তখনো সম্পূর্ণ ছিল। কিন্তু উড়কি ধানের মুড়কি দ্বারাই সেই দুঃসাধ্য ব্যাপার সাধন করা যাইত এ কথা যদি বিশ্বাসযোগ্য হয়, তবে নিঃসন্দেহ এখনকার অনেক কন্যার মাতা সেই সত্যযুগের জন্য গভীর দীর্ঘনিশ্বাসসহকারে আক্ষেপ করিবেন। এখনকার দিনে কস্তার শাশুড়িকে যে কী উপায়ে ভুলাইতে হয় কন্যার পিতা তাহা ইহজন্মেও ভুলিতে পারেন না। কন্যার সহিত বিচ্ছেদ একমাত্র শোকের কারণ নহে, অযোগ্য পাত্রের সহিত বিবাহ সেও একটা বিষম শেল। অথচ, অনেক সময় জানিয়া শুনিয়া মা-বাপ এবং আত্মীয়ের স্বার্থ অথবা ধন অথবা কুলের প্রতি দৃষ্টি করিয়া নিরুপায় বালিকাকে অপাত্রে উৎসর্গ করিয়া থাকেন। সেই অন্যায়ের বেদন সমাজ মাঝে মাঝে প্রকাশ করে । ছড়ায় তাহার পরিচয় আছে। কিন্তু পাঠকদের এ কথা মনে রাখিতে হইবে যে, ছড়ার সকল কথাই ভাঙাচোরা হাসিতে কান্নাতে অদ্ভুতে মেশানে । ডালিম গাছে পরভু নাচে । তাক্‌ধুমাধুম বাদি বাজে । আয়ী গো চিনতে পার ? গোটা দুই অন্ন বাড়ো ৷ অন্নপূর্ণ। দুধের সর। কাল যাব গো পরের ঘর } পরের বেটা মারলে চড় । কানতে কানতে খুড়োর ঘর । খুড়ো দিলে বুড়ে বর ॥ ২ পাঠ্যস্তর ; অন্নব্যঞ্জন 8 o লোকসাহিত্য হেই খুড়ে তোর পায়ে ধরি। খুয়ে আয় গা মায়ের বাড়ি। মায়ে দিল সরু শাখা বাপে দিল শাড়ি । ভাই দিলে হুড়কে ঠেঙা ‘চল শ্বশুরবাড়ি’ । তখন ইংরাজের আইন ছিল না। অর্থাৎ দাম্পত্য অধিকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠার ভার পাহারাওয়ালার হাতে ছিল না। সুতরাং আত্মীয়গণকে উদযোগী হইয়া সেই কাজটা যথাসাধ্য সহজে এবং সংক্ষেপে সাধন করিতে হইত। অামার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে বোধ হয় ঘরের বধু-শাসনের জন্য পুলিসের আইনের চেয়ে সেই গার্হস্থ্য আইন, কন্‌স্টেবলের হ্রস্ব যষ্টির অপেক্ষ সহোদর ভ্রাতার হুড়কে ঠেঙা, ছিল ভালো। আজ আমরা স্ত্রীকে বাপের বাড়ি হইতে ফিরাইবার জন্য আদালত করিতে শিখিয়াছি, কাল হয়তো মান ভাঙাইবার জন্য প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট দরখাস্ত দাখিল করিতে হইবে । কিন্তু হাল নিয়মেই হউক আর সাবেক নিয়মেই হউক, নিতান্ত পাশব বলের দ্বারা অসহায়া কন্যাকে অযোগ্যের সহিত যোজনা— এতবড়ো অস্বাভাবিক বর্বর নৃশংসতা জগতে আর অাছে কি ন সন্দেহ । বাপ-মায়ের অপরাধ সমাজ বিস্তৃত হইয়া আসে, কিন্তু বুড়া বরটা তাহার । চক্ষুশূল । সমাজ স্বতীব্র বিদ্রুপের দ্বারা তাহার উপরেই মনের সমস্ত আক্রোশ মিটাইতে থাকে। তালগাছ কাটম বোসের বাটম গৌরী এলঙ ঝি। তোর কপালে বুড়ে বর আমি করব কী । টঙ্কা ভেঙে শঙ্খা দিলাম কানে মদনকড়ি । বিয়ের বেলা দেখে এলুম বুড়ে চাপদাড়ি । ৩ পাঠাস্তর : হেন ছেলেভুলানো ছড়া 8X চোখ খাও গো বাপ-মা, চোখ খাও গো খুড়ে । এমন বরকে বিয়ে দিয়েছিলে তামাকখেগো বুড়ে। বুড়োর হ'কো গেল ভেসে, বুড়ে মরে কেশে। নেড়ে চেড়ে দেখি বুড়ে মরে রয়েছে। ফেন গালবার সময় বুড়ে নেচে উঠেছে ৷ বৃদ্ধের এমন লাঞ্ছনা আর কী হইতে পারে! এক্ষণে বঙ্গগৃহের যিনি সম্রাট, যিনি বয়সে ক্ষুদ্রতম অথচ প্রতাপে প্রবলতম, সেই মহামহিম খোকা-খুকু বা খুকুনের কথাটা বলা বাকি আছে। প্রাচীন ঋগবেদ ইন্দ্র-চন্দ্র-বরুণের স্তবগান উপলক্ষে রচিত— আর মাতৃহৃদয়ের যুগলদেবতা খোকা এবং পু"টুর স্তব হইতে ছড়ার উৎপত্তি। প্রাচীনত হিসাবে কোনোটাই নূ্যন নহে। কারণ, ছড়ার পুরাতনত্ব ঐতিহাসিক পুরাতনত্ব মহে, তাহ সহজেই পুরাতন । তাহা আপনার আদিম সরলতাগুণে মানবরচনার সর্বপ্রথম। সে এই উনবিংশ শতাব্দীর বাষ্পলেশশূন্য তীব্র মধ্যাহরৌদ্রের মধ্যেও মানবহৃদয়ের নবীন অরুণোদয়রাগ রক্ষা করিয়া আছে। এই চিরপুরাতন নববেদের মধ্যে যে স্নেহগাথা, যে শিশুস্তবগুলি রহিয়াছে তাহার বৈচিত্র্য সৌন্দর্য এবং আনন্দ-উচ্ছাসের আর সীমা নাই। মুগ্ধহৃদয়৷ বন্দনাকারিণীগণ নব নব স্নেহের ছাচে ঢালিয়া এক খুকুদেবতার কত মূর্তিই প্রতিষ্ঠা করিয়াছে— সে কখনো পাখি, কখনো চাদ, কখনো মানিক, কখনো ফুলের বন । ধনকে নিয়ে বনকে যাব, সেখানে খাব কী । নিরলে বসিয়া চাদের মুখ নিরখি । ኻ ভালোবাসার মতো এমন স্বইছাড়া পদার্থ আর কিছুই নাই। সে আরম্ভকাল হইতে এই স্বষ্টির আদি-অস্তে অভ্যস্তরে ব্যাপ্ত হইয়া রহিয়াছে তথাপি স্থষ্টির নিয়ম সমস্তই লঙ্ঘন করিতে চায়। সে যেন স্থষ্টির লৌহ 8२ লোকসাহিত্য পিঙ্করের মধ্যে আকাশের পাখি। শতসহস্ৰ বার প্রতিষেধ প্রতিরোধ প্রতিবাদ প্রতিঘাত পাইয়াও তাহার এ বিশ্বাস কিছুতেই গেল না যে, সে অনায়াসেই নিয়ম না মানিয়া চলিতে পারে। সে মনে মনে জানে ‘আমি উড়িতে পারি’, এইজন্তই সে লোহার শলাকাগুলাকে বারংবার ভুলিয়া যায়। ধনকে লইয়। বনকে যাইবার কোনো আবশুক নাই, ঘরে থাকিলে সকল পক্ষেই স্থবিধা । অবশু, বনে অনেকট নিরাল পাওয়া যায় সন্দেহ নাই, কিন্তু তাহ ছাড়া আর বিশেষ কিছু পাওয়া যায় না। বিশেষত নিজেই স্বীকার করিতেছে, সেখানে উপযুক্ত পরিমাণে আহার্য দ্রব্যের অসম্ভাব ঘটিতে পারে। কিন্তু তবু ভালোবাসা জোর করিয়া বলে, “তোমরা কি মনে কর অামি পারি না ? তাহার এই অসংকোচ স্পর্ধাবাক্য শুনিয়া আমাদের মতো প্রবীণবুদ্ধি বিবেচক লোকেরও হঠাৎ বুদ্ধিভ্রংশ হইয়া যায়— আমরা বলি, তাও তো বটে, কেনই বা না পরিবে ? যদি কোনো সংকীর্ণহৃদয় বস্তু-জগৎ-বদ্ধ সংশয়ী জিজ্ঞাসা করে ‘খাইবে কী’, সে তৎক্ষণাৎ অম্লানমুখে উত্তর দেয়, ‘নিরলে বসিয়া চাদের মুখ নিরখি।” শুনিবামাত্র আমরা মনে করি, ঠিক সংগত উত্তরটি পাওয়া গেল। অন্যের মুখে যাহা ঘোরতর স্বতঃসিদ্ধ মিথ্যা, যাহা উন্মাদের অত্যুক্তি, ভালোবাসার মুখে তাহ অবিসম্বাদিত প্রামাণিক কথা । ভালোবাসার আর-একটি গুণ এই যে, সে এককে আর করিয়া দেয়। ভিন্ন পদার্থের প্রভেদসীম। মানিতে চাহে না। পাঠক পূর্বেই তাহার উদাহরণ পাইয়াছেন ; দেখিয়াছেন একটা ছড়ায় কিছুমাত্র ভূমিকা না করিয়৷ খোকাকে অনায়াসেই পক্ষীজাতীয়ের শামিল করিয়া দেওয়৷ হইয়াছে— কোনো প্রাণীবিজ্ঞানবিৎ তাহাতে আপত্তি করিতে আসেন না । আবার পরমুহূর্তেই থোকাকে যখন আকাশের চন্দ্রের অভেদ আত্মীয়রূপে বর্ণনা করা হয় তখন কোনো জ্যোতিবিদ তাহার প্রতিবাদ করিতে সাহস ছেলেভুলানো ছড়া 8\○ করেন না। কিন্তু সর্বাপেক্ষ ভালোবাসার স্বেচ্ছাচারিতা প্রকাশ পায় যখন সে আড়ম্বর-পূর্বক যুক্তির অবতারণা করিয়া ঠিক শেষ মুহূর্তে তাহৰে অবজ্ঞাভরে পদাঘাত করিয়া ভাঙিয়া ফেলে। নিম্নে তাহার একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যাইতেছে । চাদ কোথা পাব বাছা, জাদুমণি' মাটির চাদ নয়ট গড়ে দেব গাছের চাদ নয়ই পেড়ে দেব— তোর মতন চাদ কোথায় পাব। তুই চাদের শিরোমণি । ঘুমো রে আমার খোকামণি । চাদ আয়ত্তগম্য নহে, চাদ মাটির গড়া নহে, গাছের ফল নহে, এ-সমস্তই বিশুদ্ধ যুক্তি, অকাট্য এবং নৃতম— ইহার কোথাও কোনো ছিদ্র নাই। কিন্তু এতদূর পর্যন্ত আসিয়া অবশেষে যদি খোকাকে বলিতে হয় যে তুমিই চাদ এবং তুমি সকল চন্দ্রের শ্রেষ্ঠ, তবে তো মাটির চাদও সম্ভব, গাছের চাদও আশ্চর্য নহে। তবে গোড়ায় যুক্তির কথা পাড়িবার প্রয়োজন কী ছিল ? এইখানে বোধ করি একটি কথা বলা নিতান্ত অপ্রাসঙ্গিক হইবে না। স্ত্রীলোকদের মধ্যে যে বহুল পরিমাণে যুক্তিহীনতা দেখা যায় তাহা বুদ্ধিহীনতার পরিচয় নহে । তাহারা যে জগতে থাকেন সেখানে ভালোবাসারই একাধিপত্য । ভালোবাসা স্বগের মানুষ । সে বলে, আমার অপেক্ষ আর কিছু কেন প্রধান হইবে ? আমি ইচ্ছা করিতেছি বলিয়াই বিশ্বনিয়মের সমস্ত বাধা কেন অপসারিত হইবে না ? সে স্বপ্ন দেখিতেছে এখনো সে স্বৰ্গেই আছে। কিন্তু হায়, মর্ত-পৃথিবীতে স্বর্গের মতো ঘোরতর অযৌক্তিক পদার্থ ৪ নয়=নাহয়, নহে যে —এরূপ বিভিন্ন অর্থ হইতে পারে ·俄8 লোকসাহিত্য আর কী হইতে পারে! তথাপি পৃথিবীতে যেটুকু স্বৰ্গ আছে সে কেবল রমণীতে বালকে প্রেমিকে ভাবুকে মিলিয়া সমস্ত যুক্তি এবং নিয়মের প্রতিকুল ম্রোতেও ধরাতলে আবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছে। পৃথিবী যে পৃথিবীই এ কথা তাহারা অনেক সময় ভুলিয়া যায় বলিয়াই, সেই ভ্রমক্রমেই পৃথিবীতে দেবলোক স্থলিত হইয়া পড়ে"। ভালোবাসা এক দিকে যেমন প্রভেদসীমা লোপ করিয়া চাদে ফুলে খোকায় পাখিতে এক মুহূর্তে একাকার করিয়া দিতে পারে, তেমনি আবার আর-এক দিকে যেখানে সীমা নাই সেখানে সীমা টানিয়া দেয়, যেখানে আকার নাই সেখানে আকার গড়িয়া বসে । এ পর্যন্ত কোনো প্রাণীতত্ত্ববিৎ পণ্ডিত ঘুমকে স্তন্যপায়ী অথবা অন্য কোনো জীবশ্রেণীতে বিভক্ত করেন নাই। কিন্তু ঘুম নাকি থোকার চোখে আসিয়৷ থাকে, এইজন্য তাহার উপরে সর্বদাই ভালোবাসার স্বজনহস্ত পড়িয়া সেও কখন একটা মানুষ হইয়া উঠিয়াছে। হাটের ঘুম, ঘাটের ঘুম, পথে পথে ফেরে । চার কড়া দিয়ে কিনলেম ঘুম, মণির চোখে আয় রে । রাত্রি অধিক হইয়াছে, এখন তো আর হাটে ঘাটে লোক নাই। সেইজন্য সেই হাটের-ঘুম, ঘাটের-ঘুম নিরাশ্রয় হইয়া অন্ধকারে পথে পথে মানুষ খুঁজিয়া খুঁজিয়া বেড়াইতেছে। বোধ করি সেইজন্যই তাহাকে এত স্থলভ মূল্যে পাওয়৷ গেল। নতুবা সমস্ত রাত্রির পক্ষে চার কড়ার কড়ি এখনকার কালের মজুরির তুলনায় নিতান্তই যৎসামান্ত । শুনা যায় গ্রীক কবিগণ এবং মাইকেল মধুসূদন দত্তও ঘুমকে স্বতন্ত্র মানবী রূপে বর্ণনা করিয়াছেন, কিন্তু নৃত্যকে একটা নির্দিষ্ট বস্তুরূপে গণ্য করা কেবল আমাদের ছড়ার মধ্যেই দেখা যায় । ছেলেভুলানো ছড়া 8 © ' থেনা নাচন থেনা। বট পাকুড়ের ফেনা । বলদে খালো চিনা, ছাগলে খালো ধান । সোনার জাদুর জন্তে যায়ে নাচ না কিনে অণন ॥ কেবল তাহাই নহে। খোকার প্রত্যেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মধ্যে এই নৃত্যকে স্বতন্ত্র সীমাবদ্ধ করিয়া দেখা সেও বিজ্ঞানের দূরবীক্ষণ বা অণুবীক্ষণের দ্বারা সাধ্য নহে, স্নেহবীক্ষণের দ্বারাই সম্ভব । হাতের নাচন, পায়ের নাচন, বাট মুখের নাচন— নাট। চক্ষের নাচন, কাটালি ভুরুর নাচন । বঁশির নাকের নাচন, মাজা বেঙ্কুর নাচন— অণর মাচন কী । অনেক সাধন ক’রে জাদু পেয়েছি । ভালোবাসা কখনো অনেককে এক করিয়া দেখে, কখনো এককে অনেক করিয়া দেখে, কখনো বৃহৎকে তুচ্ছ এবং কখনো তুচ্ছকে বৃহৎ করিয়া তুলে। ‘নাচে রে নাচে রে জাদু, নাচনখানি দেখি !’ নাচনখানি ! যেন জাদু হইতে তাহার নাচনখানিকে পৃথক করিয়া একটি স্বতন্ত্র পদার্থের মতো দেখা যায় ; যেন সেও একটি অাদরের জিনিস। ‘খোকা যাবে বেডু করতে তেলিমাগীদের পাড়া । এ স্থলে 'বেডু করতে না বলিয়া বেড়াইতে’ বলিলেই প্রচলিত ভাষার গৌরব রক্ষা করা হইত, কিন্তু তাহাতে খোকাবাবুর বেড়ানোর গৌরব হ্রাস হইত। পৃথিবীমৃদ্ধ লোক বেড়াইয়া থাকে, কিন্তু খোকাবাবু ‘বেডু করেন। উহাতে খোকাবাবুর বেড়ানোটি একটু বিশেষ স্বতন্ত্র এবং স্নেহাস্পদ পদার্থরূপে প্রকাশ পায় । খোকা এল বেড়িয়ে । দুধ দাও গো জুড়িয়ে ॥ 邻够 লোকসাহিত্য দুধের বাটি তপ্ত । খোকা হলেন খ্যাপ্ত । খোকা যাবেন নায়ে | লাল জুতুয়া পায়ে । অবশ্য, খোকাবাৰু ভ্রমণ সমাধা করিয়া আসিয়া দুধের বাটি দেখিয়া ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিয়াছেন, সে ঘটনাটি গৃহরাজ্যের মধ্যে একটি বিষম ঘটনা এবং তাহার যে নৌকারোহণে ভ্রমণের সংকল্প আছে ইহাও ইতিহাসে লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিবার যোগ্য— কিন্তু পাঠকগণ শেষ ছত্রের প্রতি বিশেষ লক্ষ্য করিয়া দেখিবেন। আমরা যদি সর্বশ্রেষ্ঠ ইংরাজের দোকান হইতে আজানুসমুখিত বুট কিনিয়া অত্যন্ত মচ মচ শব্দ করিয়া বেড়াই তথাপি লোকে তাহাকে জুতা অথবা জুতি বলিবে মাত্র। কিন্তু খোকাবাবুর অতি ক্ষুদ্র কোমল চরণযুগলে ছোটো-ঘুটি-দেওয়া অতিক্ষুদ্র সামান্ত মূল্যের রাঙা জুতাজোড়া সেট হইল ‘জুতুয়া' ! স্পষ্টই দেখা যাইতেছে জুতার আদরও অনেকটা পদসম্রমের উপরেই নির্ভর করে, তাহার অন্য মূল্য কাহারও খবরেই আসে না। সর্বশেষে, উপসংহারকালে আর-একটি কথা লক্ষ্য করিয়া দেখিবার অাছে। যেখানে মানুষের গভীর স্নেহ, অকৃত্রিম প্রীতি, সেইখানেই তাহার দেবপূজা। যেখানে আমরা মানুষকে ভালোবাসি সেইখানেই আমরা দেবতাকে উপলব্ধি করি ; ঐ-যে বলা হইয়াছে ‘নিরলে বসিয়া চাদের মুখ নিরখি’, ইহা দেবতারই ধ্যান। শিশুর ক্ষুদ্র মুখখানির মধ্যে এমন কী আছে যাহা নিরীক্ষণ করিয়া দেখিবার জন্য, যাহা পরিপূর্ণরূপে উপলব্ধি করিবার জন্য অরণ্যের নিরালার মধ্যে গমন করিতে ইচ্ছা হয়— মনে হয়, সমস্ত সংসার, সমস্ত নিত্যনৈমিত্তিক ক্রিয়াকর্ম এই আনন্দভাণ্ডার হইতে চিত্তকে বিক্ষিপ্ত করিয়া দিতেছে ! যোগীগণ যে অমৃত-লালসায় পানাহার ত্যাগ করিয়া অরণ্যের মধ্যে অক্ষুব্ধ অবসর অন্বেষণ করিতেন, জননী নিজের সস্তানের d