বিষয়বস্তুতে চলুন

শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ (দশম সম্ভার)/অনুরাধা/তিন

উইকিসংকলন থেকে

তিন

 বাবুদের বাড়ির সদর অধিকার করিয়া বিজয় চাপিয়া বসিল। গোটা-দুই তাহার নিজের জন্য, বাকিগুলা হইল কাছারি। বিনোদ ঘোষ কোন একসময়ে জমিদারী সেরেস্তায় চাকরি করিয়াছিল, সেই সুপারিশে নিযুক্ত হইল নূতন গোমস্তা। কিন্তু ঝঞ্ঝাট মিটিল না। প্রধান কারণ, গগন চাটুয্যে টাকা আদায় করিয়া হাতে হাতে রসিদ লিখিয়া দেওয়া অপমানকর জ্ঞান করিত, যেহেতু তাহাতে অবিশ্বাসের গন্ধ আছে—সেটা চাটুয্যে বংশের অগৌরব। সুতরাং তাঁহার অন্তর্ধানের পরে প্রজারা বিপদে পড়িয়াছে, মৌখিক সাক্ষ্য-প্রমাণ লইয়া নিত্যই হাজির হইতেছে, কাঁদা-কাটা করিতেছে—কে কত দিয়াছে কত বাকি রাখিয়াছে নিরূপণ করা একটা কষ্টসাধ্য জটিল ব্যাপার হইয়া উঠিয়াছে। বিজয় যত শীঘ্র কলিকাতার ফিরিবে মনে করিয়াছিল তাহা হইল না, একদিন দুইদিন করিয়া দশ-বারোদিন কাটিয়া গেল। এদিকে ছেলেটা হইয়াছে সন্তোষের বন্ধু, বয়সে তিন চার বছরের ছোট, সামাজিক ও সাংসারিক ব্যবধানও অত্যন্ত বৃহৎ, কিন্তু অন্য সঙ্গীর অভাবে সে মিশিয়া গেছে ইহারই সঙ্গে। ইহারই সঙ্গে থাকে বাটীর ভিতরে, ঘুরিয়া বেড়ায় বাগানে বাগানে নদীর ধারে—কাঁচা আম কুড়াইয়া পাখীর বাসা খুঁজিয়া। খায় অধিকাংশ সময়ে সন্তোষের মাসির কাছে, ডাকে তাহারি দেখাদেখি মাসিমা বলিয়া। বাহিরে টাকা-কড়ি হিসাব-পত্র লইয়া বিজয় বিব্রত, সকল সময়ে ছেলের খোঁজ করিতে পারে না, যখন পারে তখন তাহার দেখা মিলে না। হঠাৎ কোনদিন হয়ত বকাঝকা করে, রাগ করিয়া কাছে বসাইয়া রাখে, কিন্তু ছাড়া পাইলেই ছেলেটা দৌড় মারে মাসিমার রান্নাঘরে। সন্তোষের পাশে বসিয়া খায় দুপুরবেলা ভাত, বিকালে তাহারি সঙ্গে ভাগাভাগি করিয়া লয় রুটি ও নারিকেল নাড়ু।

 সেদিন বিকালে লোকজন তখনো কেহ আসিয়া পৌঁছায় নাই, বিজয় চা খাইয়া চুরুট ধরাইয়া ভাবিল নদীর ধারটা খানিক ঘুরিয়া আসে। হঠাৎ মনে পড়িল সমস্তদিন ছেলেটার দেখা নাই। পুরাতন চাকরটা দাঁড়াইয়াছিল, জিজ্ঞাসা করিল, কুমার কোথায় রে?

 সে ইঙ্গিতে দেখাইয়া কহিল, বাড়ির মধ্যে।

 ভাত খেয়েছিল?

 না।

 জোর করে ধরে এনে খাওয়াস্‌নে কেন?

 এখানে খেতে চায় না, রাগ করে ছড়িয়ে ফেলে দেয়।

 কাল থেকে আমার সঙ্গে ওর খাবার জায়গা করে দিস্, বলিয়া কি ভাবিয়া আর সে বেড়াইতে গেল না, সোজা ভিতরে গিয়া প্রবেশ করিল। সুদীর্ঘ প্রাঙ্গণের অপর প্রান্ত হইতে পুত্রের কণ্ঠস্বর কানে গেল—মাসিমা, আর একখানা রুটি আর দুটে নারকোল-নাড়ু—শীগ্‌গির!

 যাহাকে আদেশ করা হইল সে কহিল, নেবে আয় না বাবা, তোদের মত আমি কি গাছে উঠতে পারি?

 জবাব হইল—পারবে মাসিমা, কিছু শক্ত নয়। এই মোটা ডালটায় পা দিয়ে এই ছোট ডালটা ধরে এক টান দিলেই উঠে পড়বে।

 বিজয় কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। রান্নাঘরের সম্মুখে একটা বড় আম গাছ, তাহার দু’দিকের দুই মোটা ডালে বসিয়া কুমার ও বন্ধু সন্তোষ। পা ঝুলাইয়া গুঁড়িতে ঠেস্ দিয়া উভয়ের ভোজন-কার্য্য চলিতেছে, তাহাকে দেখিয়া দু’জনেই ত্রস্ত হইয়া উঠিল। অনুরাধা রান্নাঘরের দ্বারের অন্তরালে সরিয়া দাঁড়াইল।

 বিজয় জিজ্ঞাসা করিল, ওই কি ওদের খাবার জায়গা নাকি?

 কেহ উত্তর দিল না। বিজয় অন্তরালবর্ত্তিনীকে উদ্দেশ করিয়া বলিল, আপনার ওপর দেখচি ও খুব অত্যাচার করচে।

 এবার অনুরাধা মৃদুকণ্ঠে জবাব দিল, বলিল, হাঁ।

 তবু ত প্রশ্রয় কম দিচ্ছেন না—কেন দিচ্চেন?

 না দিলে আরও বেশি উপদ্রব করবে সেই ভয়ে।

 কিন্তু বাড়িতে ত এ-রকম উৎপাত করে না শুনেচি।

 হয়ত করে না। ওর মা নেই, ঠাকুরমা প্রায়ই শয্যাগত, বাপ থাকেন বাইরে কাজ-কর্ম্ম নিয়ে, উৎপাত করবে কার ওপর?

 বিজয় ইহা জানে না তাহা নয়, তথাপি ছেলেটার যে মা নাই এই কথাটা পরের মুখে শুনিয়া তাহার ক্লেশ বোধ হইল, কহিল, আপনি দেখচি অনেক বিষয় জানেন, কে বললে আপনাকে? কুমার?

 অনুরাধা ধীরে ধীরে কহিল, বলবার বয়েস ওর হয়নি, তবু ওর মুখ থেকেই শুনতে পাই। দুপুরবেলা রোদ্দুরে ওদের আমি বেরোতে দিইনে, তবু ফাঁকি দিয়ে পালায়। যেদিন পারে না আমার কাছে শুয়ে বাড়ির গল্প করে।

 বিজয় তাহার মুখ দেখিতে পাইল না, কিন্তু সেই প্রথম দিনটীর মত আজো সেই কণ্ঠস্বর বড় মধুর লাগিল; তাই বলার জন্য নয়, কেবল শোনার জন্যই কহিল, এবার বাড়ি ফিরে গিয়ে ওর মুস্কিল হবে।

 কেন?

 তার কারণ উপদ্রব জিনিসটা নেশার মত। না পেলে কষ্ট হয়, শরীর আই-ঢাই করে। কিন্তু সেখানে ওর নেশার খোরাক যোগাবে কে? দু’দিনেই ত পালাই পালাই করবে।

 অনুরাধা আস্তে আস্তে বলিল, না ভুলে যাবে।—কুমার নেবে এসো বাবা, রুটি নিয়ে যাও।

 কুমার বাটি হাতে করিয়া নামিয়া আসিল এবং মাসির হাত হইতে আরও কয়েকটা রুটি ও নারিকেল-নাড়ু লইয়া তাঁহারই গা ঘেঁষিয়া দাঁড়াইয়া আহার করিতে লাগিল, গাছে উঠিল না। বিজয় চাহিয়া দেখিল, সেগুলি তাহাদের ধনী-গৃহের তুলনায় পদ-গৌরবে যেমনি হীন হোক, সত্যকার মর্য্যাদায় কিছুমাত্র খাটো নয়। কেন যে ছেলেটা মাসির রান্নাঘরের প্রতি এত আসক্ত বিজয় তাহার কারণ বুঝিল। সে ভাবিয়া আসিয়াছিল কুমারের লুব্ধতায় তাঁহার অহেতুক ও অতিরিক্ত ব্যয়ের কথা তুলিয়া প্রচলিত শিষ্টবাক্যে পুত্রের জন্য সঙ্কোচ প্রকাশ করিবে এবং করিতেও যাইতেছিল, কিন্তু বাধা পড়িল। কুমার বলিল, মাসিমা, কালকের মত চন্দ্রপুলি করতে আজও যে তোমাকে বলেছিলুম, করোনি কেন?

 মাসিমা কহিল, অন্যায় হয়ে গেছে বাবা, সাবধান হইনি। সমস্ত দুধ বেড়ালে উল্টে ফেলে দিয়েচে—কাল আর এমন হবে না।

 কোন্ বেড়ালটা বল ত? শাদাটা?

 সেইটেই হবে বোধ হয়, বলিয়া অনুরাধা হাত দিয়া তাহার মাথার এলো-মেলো চুলগুলি সোজা করিয়া দিতে লাগিল।

 বিজয় কহিল, উৎপাত ত দেখচি ক্রমশঃ জুলুমে গিয়ে ঠেকেচে।

 কুমার বলিল, খাবার জল কৈ?

 ঐ যাঃ—ভুলে গেছি বাবা, এনে দিচ্চি।

 তুমি সবই ভুলে যাও মাসিমা। তোমার কিচ্ছু মনে থাকে না।

 বিজয় বলিল, আপনার বকুনি খাওয়াই উচিত। ত্রুটি পদে পদে।

 হাঁ, বলিয়া অনুরাধা হাসিয়া ফেলিল। অসতর্কতাবশতঃ এ-হাসি বিজয়ের চোখে পড়িল। পুত্রের অবৈধ আচরণে ক্ষমা ভিক্ষা করা আর হইল না, পাছে তাহার ভদ্রবাক্য অভদ্র ব্যঙ্গের মত শুনায়, পাছে এই মেয়েটীর মনে হয় তাহার দৈন্য ও দুর্দ্দশাকে সে কটাক্ষ করিতেছে।


 পরদিন দুপুরবেলা অনুরাধা কুমার ও সন্তোষকে ভাত বাড়িয়া দিয়া তরকারি পরিবেশন করিতেছে, তাহার মাথার কাপড় খোলা, গায়ের বস্ত্র অসংবৃত, অকস্মাৎ দ্বারপ্রান্তে মানুষের ছায়া পড়িতে অনুরাধা ফিরিয়া চাহিয়া দেখিল ছোটবাবু। শশব্যস্তে মাথায় আঁচল তুলিয়া দিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল।

 বিজয় বলিল, একটা অত্যন্ত জরুরি পরামর্শের জন্য আপনার কাছে এলুম। বিনোদ ঘোষ গ্রামের লোক, অনেকদিন দেখচেন, ও কি-রকম লোক বলতে পারেন? ওকে গণেশপুরের নতুন গোমস্তা বহাল করেচি, সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা যায় কি না—আপনার কি মনে হয়?

 বিনোদ এক সপ্তাহের অধিক কাজ করিতেছে, যথাসাধ্য ভালো কাজই করিতেছে, কোন গোলযোগ ঘটায় নাই, সহসা হন্তদন্ত হইয়া তাহার চরিত্রের খোঁজ-তল্লাস করিবার এখনই কি প্রয়োজন হইল অনুরাধা ভাবিয়া পাইল না; মৃদুকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, বিনোদদা কি কিছু করেচেন?

 এখনো কিছু করেনি, কিন্তু সতর্ক হওয়া ত প্রয়োজন।

 তাঁকে ভালো লোক বলেই ত জানি।

 সত্যি জানেন, না, নিন্দে করবেন না বলেই ভালো বলচেন?

 আমার ভালো-মন্দ বলার কি কিছু দাম আছে?

 আছে বই কি। সে যে আপনাকেই প্রামাণ্য সাক্ষী মেনে বসেচে।

 অনুরাধা একটু ভাবিয়া বলিল, উনি ভালো লোকই বটে। শুধু একটু চোখ রাখবেন। নিজের অবহেলায় ভালো লোকও মন্দ হয়ে ওঠা অসম্ভব নয়।

 বিজয় কহিল, সত্যিই তাই। কারণ অপরাধের হেতু খুঁজতে গেলে অনেক ক্ষেত্রেই অবাক্ হতে হয়।

 ছেলেকে উদ্দেশ করিয়া বলিল, তোর ভাগ্য ভালো যে হঠাৎ এক মাসিমা পেয়ে গেছিস্, নইলে এই বন-বাদাড়ের দেশে অর্দ্ধেক দিন না খেয়ে কাটাতে হ’তো।

 অনুরাধা আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করিল, আপনার কি এখানে খাবার কষ্ট হচ্চে?

 বিজয় হাসিয়া বলিল, না এমনিই বললুম। চিরকাল বিদেশে বিদেশে কাটিয়েচি, খাবার কষ্ট বড় গ্রাহ্য করিনে। বলিয়া চলিয়া গেল। অনুরাধা জানালার ফাঁক দিয়া দেখিল তাহার স্নান পর্য্যন্ত এখনো হয় নাই।