শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ (দশম সম্ভার)/পত্র-সঙ্কলন/অবিনাশচন্দ্র ঘোষালকে লেখা
কল্যাণীয়েষু,—লক্ষ্য করিয়া আসিতেছি দেশের সাপ্তাহিক পত্রগুলি ক্রমশঃ দশের উৎসুক ও উৎকণ্ঠ দৃষ্টি লাভ করিতেছে। পূর্ব্বেকার উপেক্ষা অবহেলার ভাব আর নাই। অর্থাৎ মানুষের নিত্যকার প্রয়োজনে এইগুলির প্রয়োজনীয়তাও মানুষে এখন উপলব্ধি করিতেছে। আনন্দের কথা। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠার আসনটী কেবলমাত্র দখল করিয়া রাখিলে চলিবে না, কাজের মধ্য দিয়া স্বকীয় মর্য্যাদা প্রতিদিন প্রমাণিত করিতে হইবে; নিরন্তর মনে রাখিতে হইবে তোমার কর্মশীলতা সাধারণের সৌভাগ্য ও কল্যাণ সমৃদ্ধ করিতেছে। আর কোন পন্থায় নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখিয়া চলা কাগজের পক্ষে শুধু ব্যর্থতা নয়, বিড়ম্বনা।
কাগজ পরিচালনার কাজ কেবলমাত্র দায়িত্বপূর্ণই নয়, নানাভাবে বিঘ্নসঙ্কুল। বিবিধ প্রতিকূলতার সম্মুখীন হইতে হয়। অধিকাংশই সাময়িক নিঃসন্দেহ, তথাপি সংযম ও সহিষ্ণুতার অত্যন্ত প্রয়োজন। জানি নির্ভীক আলোচনা সাপ্তাহিকের প্রাণ, কর্ত্তব্যবিমুখতা অপরাধ, তবু বলি তার চেয়েও মহার্ঘ তোমার আপন চরিত্র ও মর্য্যাদা। ইতি—৭ই শ্রাবণ, ১৩৪২
শুভাকাঙ্ক্ষী— শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
কল্যাণীয়েষু,—‘বাতায়নে’র প্রত্যেকটি সংখ্যাই আমি মনোযোগের সঙ্গে পড়েছি, আলস্য বা উপেক্ষায় কোনদিন দূরে ঠেলে রাখিনি।
সকল বিষয়েই যে একমত হতে পেরেছি তা নয়, এর সমালোচনার ভাষা মাঝে মাঝে কঠোর ও সুতীক্ষ্ণ ঠেকেছে, কিন্তু অকারণ বিদ্বেষ বা ব্যক্তিগত ঈর্ষার আক্রমণে কোন আলোচনাই কোনদিন কলঙ্কিত হতে দেখেছি বলে আমার মনে পড়ে না। এটা আনন্দের কথা। কিন্তু যদি কখনো এমন ঘটেও থাকে, যা আমার চোখে পড়েনি, তার সম্বন্ধে এই কথাই আজ বলবো যে, যা হয়ে গেছে সে যাক, কিন্তু নূতন বৎসরের প্রারম্ভে তোমাদের সর্ব্বদাই মনে রাখা চাই যে, লেখায় অসহিঞ্চুতা যদি-বা সহা যায়, ক্রুরতা, নীচতা, অসত্য অপবাদে মানুষকে হীন প্রতিপন্ন করবার প্রয়াস দীর্ঘদিন পাঠকসমাজ সইতে পারেন না, তাঁদের চোখে ধীরে ধীরে লেখক আপনিই হয়ে আসে ছোট, তার স্বরূপ ধরা পড়ে। তখন কাগজের মর্য্যাদা হয় নষ্ট, উদ্দেশ্য হয় শিথিল, আলোচনা হয় নিষ্ফল পণ্ডশ্রম—সর্ব্বপ্রকারেই তার কল্যাণের সামর্থ্য যায় ক্ষীণ হয়ে। এর চেয়ে অবনতি কাগজের আর নেই। কেবল অসত্য বা অন্যায়ের জন্যই নয়, নিশ্চয় জেনো কুশ্রীতা কখনো দীর্ঘজীবী হয় না।[১]
শুভাকাঙ্ক্ষী— শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
- ↑ (১) ও (২) সংখ্যক পত্র দুইটী ‘বাতায়ন’-সম্পাদক শ্রীঅবিনাশচন্দ্র ঘোষালকে লিখিত।