শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ (দশম সম্ভার)/পত্র-সঙ্কলন/কালিদাস রায়কে লেখা
সামতাবেড়
ভাই কালিদাস, তোমার চিঠি পেলাম। আমার একটা দুর্নাম আছে যে আমি জবাব দিইনে। নেহাৎ মিথ্যে বলতে পারিনে, কিন্তু যে বিষয়টি নিয়ে তুমি নিমন্ত্রণ পাঠিয়েছো, তারও যদি সাড়া না দিই তো শুধু যে অসৌজন্যের অপরাধ হবে তাই নয়, কোনদিক থেকেই যে যতীনকে সমাদর করবার অংশ নিতে পারলাম না, সে দুঃখের অবধি থাকবে না। অনেকেই জানে না যে যতীনকে [ কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী ] আমি সত্যিই ভালোবাসি। শুধু কেবল কবি বলে নয়, তাঁর ভেতরে এমন একটি স্নেহ-সরস বন্ধু-বৎসল ভদ্র মন আছে যে, তার স্পর্শে নিজের মনটাও তৃপ্তিতে ভরে আসে।
যতীন জানেন, আমি তাঁর কবিতার একান্ত অনুরাগী। যখন যেখানেই তাদের দেখা পাই, বার বার করে পড়ি। স্নিগ্ধ সকরুণ নির্ভুল ছন্দগুলি কানে কানে যেন কত কি বলতে থাকে।
কারও সম্বন্ধেই নিজের অভিমত আমি সহজে প্রকাশ করিনে―আমার সঙ্কোচ বোধ হয়। ভাবি আমার মতামতের মূল্যই বা কি, কিন্তু যদি কখনো বলতেই হয় তো সত্যি কথাই বলি। যতীনকে স্নেহ করি, কিন্তু স্নেহের অতিশয়োক্তি দিয়ে তাঁকেও খুশি করতে পারতাম না সত্যি না হলে। যাক এ-কথা।
তোমাদের অনুষ্ঠানটি ছোট,—হবেই তো ছোট। কিন্তু ভাই বলে তার দামটি ছোট নয়। এ তো ঢ্যাঁঢরা দিয়ে বহু লোক ডেকে এনে উচ্চ কোলাহলে “জয়, যতীন বাগচীকি জয়!” বলার ব্যাপার নয়, এ তোমাদের ছোট্ট রসচক্রের প্রীতি-সম্মিলন। কোন একটি বিশেষ দিনে ও বিশেষ স্থানে জন-কয়েক সত্যিকার সাহিত্য-রসিক ও সাহিত্য-সেবী একসঙ্গে মিলে আর একজন সত্যিকার সাহিত্য-সেবককে সাদরে আহ্বান করে এনে বলা—“কবি, আমরা তোমার সাহিত্য-সাধনায় আনন্দ লাভ করেছি, তোমার বাণীপূজা সার্থক হয়েছে,—তুমি সুখী হও, তুমি দীর্ঘায়ু হও, আমরা তোমাকে সর্বান্তঃকরণে ধন্যবাদ দিই, তুমি আমাদের অভিনন্দন গ্রহণ কর।” এই তো? আয়োজন সামান্য বলে তোমরা ক্ষুণ্ণ হয়ো না।
কিন্তু তবুও সম্মিলনে একটু ত্রুটি ঘটলো, আমি যেতে পারলাম না। কারণ, আমি বোধ করি তোমাদের সকলের চেয়ে বয়সে বড়। ········
অনেকে উপস্থিত আছো, এই সুযোগে একটা দুঃখের অনুযোগ জানাই। কালিদাস, তুমিও তো প্রায় সাবালক হতে চললে। আগেকার দিনের সকল কথা তোমার স্মরণে না থাকলেও কিছু কিছু হয়ত মনেও পড়বে। এদিনের মতো সেদিনে আমরা এমন করে পরস্পরের ছিদ্র খুঁজে বেড়াতাম না। এক আধটা ব্যতিক্রম হয়ত ঘটেচে, কিন্তু এখনকার সঙ্গে তার তুলনাই হয় না। সাহিত্য-সেবকদের মাঝখানে ভাবের আদান-প্রদান, একের কাছে অপরের দেওয়া এবং পাওয়া চিরদিনই চলে আসচে এবং চিরদিনই চলবে। কিন্তু তরুণ দলের মধ্যে আজকাল একি হতে চললো? নিন্দে করার একি উদ্দাম উৎসাহ, গ্লানি প্রচারের একি নির্দ্দয় অধ্যবসায়! কেবলি একজন আর একজনকে চোর প্রতিপন্ন করতে চায়। খবরের কাগজে কাগজে যত দেখি ততই যেন মন লজ্জায় দুঃখে পরিপূর্ণ হয়ে আসে। ক্ষমা নেই, ধৈর্য্য নেই, বেদনা-বোধ নেই, হানাহানির নিষ্ঠুরতার যেন শেষ হতেই চায় না। কোথায় কার সঙ্গে কার কতটুকু মিলেচে, কার লেখা থেকে কে কতখানি নকল করেছে, রুক্ষ কটু-কণ্ঠে এই খবরটা বিশ্বের দরবারে ঘোষণা করে যে এরা কি সান্ত্বনা অনুভব করে আমি ভেবেই পাইনে। ঘরে-বাইরে কেবলি জানাতে চায় যে, বাঙলাদেশের সাহিত্যিকদের বিদেশের চুরি করা ছাড়া আর কোন সম্বলই নেই।
যতীনকে জিজ্ঞেসা করলেই জানতে পারবে, অতি পরিশ্রমে খুঁজে খুঁজে এই গোয়েন্দাগিরির কাজটা তখনও আমাদের সাহিত্যিক মহলে প্রচলিত হয়ে ওঠেনি। যাই হোক, কামনা করি তোমাদের রসচক্রের রসিকদের মধ্যে যেন এ ব্যাধি প্রবেশ করবার দরজা খুঁজে না পায়।
কবি নই, মনের মধ্যে কথা জমে উঠলেও তোমাদের মত প্রকাশের ভাষা খুঁজে পাইনে, গুছিয়ে বলা হয় না। তাই চিঠি লেখা হয়ে যায় আমার চিরদিনই এলোমেলো।.........ইতি—৫ই ভাদ্র, ১৩৩৮[১]
—শরৎদা
- ↑ ‘রসচক্র’ নামক সাহিত্যিকদের সভায় কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর সম্বর্দ্ধনা সভায় যোগদান করিতে না পারায় সম্পাদক কবিশেখর শ্রীকালিদাস রায়কে লিখিত।