শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ (দশম সম্ভার)/পত্র-সঙ্কলন/দিলীপকুমার রায়কে লেখা
মণ্টুরাম,—তোমার বই এবং ছোট্ট চিঠিখানি পেলাম। কাল দিনে রেতে বইখানি পড়ে শেষ করলাম। চমৎকার লাগলো। তবে দু’একটা ত্রুটিও আছে। ভারতের বড় বড় গাইয়ে বাজিয়ের মধ্যে আমার নাম না দেখতে পেয়ে কিছু ক্ষুণ্ণ হোলাম। তবে নিশ্চয় জানি এ তোমার ইচ্ছাকৃত নয়, অনবধানতাবশতঃই হয়ে গেছে, এবং ভবিষ্যতে এ ভ্রম যে তুমি শুধরে দেবে, তাতেও আমার লেশমাত্র সংশয় নেই। ওটা দিয়ো, ভুলো না। রায় বাহাদুর মজুমদার মশায়ের রাঙা জবা মুটো মুটো মুটোর উল্লেখ কই? ওটাও চাই। কারণ, তিনিও ক্ষুণ্ণ হয়েছেন বলেই আমার বিশ্বাস। এ তো গেল বইয়ের ত্রুটির কথা, একটা মতভেদের বিষয়ও আছে। তুমি পূজনীয় রবিবাবুর একটা উক্তি তুলে দিয়েছ যে, “আমরা সর্ব্বসাধারণকে অশ্রদ্ধা করি বলেই তাদের চিঁড়ে-মুড়কির বরাদ্দ করি, বাইরের প্রাঙ্গণে আর সন্দেশগুলো বাঁচিয়ে রাখি” ইত্যাদি ইত্যাদি। এই কথাটা শুনতে ভালো এবং যিনি লেখেন তাঁরও মানসিক ঔদার্য্য এবং নিরপেক্ষতাও প্রকাশ পার সত্য, কিন্তু আসলে এতবড় ভুল বাক্যও আর নেই। শিক্ষা সভ্যতা এবং কালচারের জন্য সন্দেশই চাই, চিঁড়ে-মুড়কি খাওয়াবার চেষ্টা করলে তারা পেট কামড়ানিতে সারা হয়। আর সর্ব্বসাধারণ মানেই ছোটলোক। তারা চিঁড়ে-মুড়কিতেই thrive করে। একটা concrete দৃষ্টান্ত নাও। সাধারণ মানে ছোটলোক, মা—ও ছোটলোক। এই মা—র পয়সা হওয়ায় ও তোমাদের মত দু’চারজনের প্রশ্রয় পাওয়ায় আজকাল তারা 3rd Class ছেড়ে 2nd Class compartmentএ উঠতে আরম্ভ করেছে। (1st Classএ সাহেবের ভয়ে ওঠে না, এই যা কতক রক্ষে) আচ্ছা, কোন compartmentএ জন দুই-তিন মা—কে ঘণ্টা ৩।৪ ঢুকিয়ে রাখবার পরে আর সাধ্য নাই কারও যে সে ঘর ব্যবহার করে। হাতে-মাটির জন্যে এক ঝুড়ি মাটি থেকে সুরু করে ছোলাসেদ্ধ, পকোড়া, থুথু, গয়ার এবং হেগেমুতে এমন কাণ্ড করে রেখে বেরিয়ে যাবে যে, সে দৃশ্য যে দেখেচে সে আর ভুলবে না। আসল কথা, অন্দরে শোবার ঘরে বসে সন্দেশ ভোজন করার যোগ্যতা আগে অর্জ্জন করা চাই। নইলে অন্দরের দোর খোলা পেয়ে একবার তারা জিঁ হিঁ হিঁ হিঁ হিঁ করে ঢুকে পড়লে আমরা আর বাঁচবো না। অতএব এরূপ অশ্রদ্ধেয় বাক্য আর কখনো বোলো না।
তোমার concertএ যেতে পারিনি শরীর একটু অসুস্থ ছিল বলে। আজও একটা হেতু এই যে, মেদিনীপুরের প্রতি বৎসরেই কোথাও-না-কোথাও বন্যা হবেই। হতে বাধ্য। Govt. তার কোন উপায় করে না, করবে না। এ হয়েছে দেশের উপরে একটা স্থায়ী tax, এমন কোরে বছর বছর বন্যাপীড়িতের সাহায্য করার সার্থকতা কি? Govt.কে তারা একটা কথা জোর করে বলবে না, এক কোদাল মাটি কেটে রেলের রাস্তা ভেঙে যে জল বার করে দেবে তা দেবে না, পাছে সাহেবরা ধরে জেলে দেয়। তারা জানে কলকাতার ভদ্রলোকের মহাকর্ত্তব্য হচ্চে তাদের খাওয়া-পরা দেওয়া, যেহেতু তাদের ঘরে-দোরে জল উঠেছে। তা ছাড়া পদ্মার চরে মো—রা কেন দল বেঁধে বাস করে জানো? শুধু এইজন্যে যে বর্ষায় তাদের ঘর-দোর ভেসে গেলেই পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোকদের টাকা দিতে হবে। শুধু out of malice এবং spite তারা গিয়ে ঐরকম ভয়ানক জায়গায় বাস করেছে। এ ছাড়া তাদের আর কোন উদ্দেশ্য নেই। আমি নিশ্চয় জানি এ-সম্বন্ধে তোমার সঙ্গে আমার কোনপ্রকার মতভেদ হবার আশঙ্কা নেই। কারণ, তুমি বুদ্ধিমান, যা সত্যি কথা তা বুঝবেই।
তুমি বিলেত যাচ্চো খবরের কাগজে দেখলাম। আশীর্ব্বাদ করি তোমার যাত্রা নির্ব্বিঘ্ন হোক, উদ্দেশ্য সফল হোক। আমার বয়স হয়েছে, ফিরে এসে যদি আর দেখা না হয় এই কথাটি মনে রেখো আমি চিরদিন তোমার শুভকামনা করে গেছি। আশা করি তোমার কুশল।
শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
পুঃ—আগামী ৩১শে ভাদ্র আমার বয়স পঞ্চাশ হবে। ১লা আশ্বিন যাবো কলকাতায় তোমাদের সঙ্গে দেখা করতে।
পরম কল্যাণবরেষু,—মণ্টু, তোমার চিঠি পেয়ে যে কত আনন্দ পেলাম তা তোমাকেও জানানো শক্ত। তুমি যে আমাকে শ্রদ্ধা কর, ভালবাসো, এও যদি না বুঝবো ত বুঝবো সংসারে কি?
তোমার বিদায়-অভিনন্দনে যাঁরা যোগ দিয়েছিলেন তাঁদের মুখে কি কি হয়েছিল সব শুনেছি। তুমি বিদেশে যাচ্ছো, কিন্তু একটু শীঘ্র করে ফিরে এসো। তুমি কাছাকাছি নেই মনে হলে কষ্ট হয়।
‘মনের পরশে’র শেষ অংশ অর্থাৎ তৃতীয় অংশটা যে আমার কত ভাল লেগেছিল তা বলতে পারিনে। সত্যকার ব্যথা ও দুঃখের মধ্য দিয়ে সমস্ত পৃথিবীময় মানুষে যে মানুষের কত আপনার, এই কথাটি কত সহজেই না তোমার বইয়ের শেষটুকুতে ফুটে উঠেছে। তাই আমার কেবলি মনে হয়েছিল, তুমি বুঝি কার যথার্থ জীবনের দুঃখের কাহিনীটি লিপিবদ্ধ করে গেছ। কিন্তু এই লিপিবদ্ধ করার প্রণালীটি তোমাকে আর একটুখানি যত্ন নিয়ে শিখতে হবে। তোমার বাবাকে আমি জানতাম না, তাঁর অন্তরঙ্গদের মুখে শুনি, তাঁর মানুষের বেদনা বোঝবার অনুভূতি খুব বড় রকমের ছিল। এইটি হয়ত তুমি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছ। তোমাকে এই বস্তুটিকে মনের মধ্যে দিবারাত্রি লালন করে পূর্ণ মানুষ করে তুলতে হবে। তবেই ত হবে।
বেশ, আমার চিঠির মধ্যে থেকে যা ইচ্ছে তুমি প্রকাশ করতে পারো। অনুমতি দিলাম।
তুমি আমার অতিশয় স্নেহের জিনিস। আজ বলে নয়, অনেক দিন থেকে। বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে আমার বাড়িতে এসে হৈ হৈ করে লুচি খেয়ে যেতে, তখন থেকে।
তোমাকে আমার সমস্ত হৃদয় দিয়ে আশীর্ব্বাদ করি, এ-জীবনে তুমি সফল হও, নীরোগ হও, দীর্ঘজীবী হও। ······· আশীর্ব্বাদক—শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
পরম কল্যাণীয়েষু,—মণ্টু, কতদিন থেকে তোমার চিঠির জবাব দিতে পারিনি। না জানি কত রাগই তুমি কোরেছ। সেদিন তোমাদের থিয়েটার রোডের বাড়িতে গিয়েছিলাম। কিন্তু না ছিলে তুমি, না ছিলেন তোমার মাতুল তকু। সাহেবের বাড়ি, অপেক্ষা করা রীতি-বিরুদ্ধ কি না স্থির হোলো না। আমার সঙ্গে যিনি ছিলেন তিনি পাকা লোক। দালালি কাজে সাহেবের বাড়িতে তাঁর যাতায়াত আছে। তিনি বললেন card রেখে যাওয়াই etiquette,—হাঁ করে বসে থাকলে এরা রাগ করে। কিন্তু card না থাকায় আমরা নিঃশব্দে ফিরে এলাম।
কালও অনেক রাত্রি পর্য্যন্ত তোমার ‘দুধারা’র অনেক জায়গা আর একবার পড়ে গেলাম। বাস্তবিকই বইখানি ভালো। অবহেলা কোরে যেমন-তেমনভাবে পড়ে যাবার জিনিস নয়, মন দিয়ে পড়বার মতই বই। কিন্তু জানো ত আজকাল প্রশংসাপত্রের দাম নেই। কারণ, কথার দাম যাঁদের আছে তাঁরা নিজেরাই তার অমর্য্যাদা করেন। তাই সহজে আমি কথা কইনে। কিন্তু আমার কথায় যারা বিশ্বাস করেন তাঁদের সকলকেই বলি মণ্টুর এ বইখানি যেন তাঁরা শ্রদ্ধার সঙ্গে আদ্যোপান্ত একবার পড়ে দেখেন। আমার নিজের তো পেশাই এই, তবুও এতে এমন ঢের কথা আছে যা আমিও ইতিপূর্ব্বে চিন্তা করে দেখিনি।
‘ভারতবর্ষে’ (জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৫) তোমার চাকর গল্পটা পড়লাম। গল্পের দিক দিয়ে এ তেমন ভালো হয়নি, কিন্তু একটা জিনিস দেখচি তোমার চমৎকার develope করে উঠছে, সে তোমার dialogue। গল্প লেখবার কৌশল অথবা পদ্ধতি এবং এই dialogueএর ধারা,—তোমার লেখায় যেদিন এ দুটোর একটা মিল হয়ে উঠবে সেদিন তুমি সত্যিই বড় সাহিত্যিক হবে। একটা কথা ভুলো না মণ্টু, লেখার মধ্যে লিখে যাওয়াও যেমন শক্ত, লেখার মধ্যে না-লিখে থেমে থাকাও তেমনি শক্ত। কিন্তু এ বস্তুটা কাউকে শেখানো যায় না, আপনি শিখতে হয়। আমি নিশ্চয় জানি এ শিখে নিতে তোমার বাধবে না। আজ তোমাকে যারা বিদ্রূপ করে, তারাই একদিন প্রকাশ্যে না হোক মনে মনেও এ সত্য স্বীকার করবে। আমাদের যাবার দিন নিকটবর্ত্তী হয়ে আসচে, আমরা হয়ত এ চোখে দেখে যেতে পাবো না, কিন্তু ততদিন পরেও আমাকে যদি তোমার মনে থাকে তো আমার এই কথাটা তোমার স্মরণ হবে।
আ—র (আশালতা সিংহ) প্রবন্ধগুলো পড়লাম। ছেলেমানুষের লেখা,—এর ভাল-মন্দ এখনো বিচার করবার সময় আসেনি। বয়সের সঙ্গে আড়ম্বরের আতিশয্যগুলো কেটে গেলে লেখা হয়ত এর ভালোই হবে। ছেলে বয়সের একটা মস্ত দোষ এই যে, অনেক বই-পড়ার অভিমানটা এদের পেয়ে বসে। তাই নিজের লেখার মধ্যে নিজের কিছুই থাকে না, থাকে শুধু মুখস্থ করা পরের কথা। থাকে কারণে-অকারণে যেখানে-সেখানে গুঁজে দেওয়া বিদ্যের বাচালতা। মেয়েটিকে তুমি অতো দ্রুতবেগে লিখতে বারণ কোরো। লেখার দ্রুতগতি কেরানীর qualification—লেখকের নয়। এ-কথা ভোলা উচিত নয়। অল্প বয়সে গল্প লেখা ভালো, কবিতা লেখা আরো ভালো, কিন্তু সমালোচনা লিখতে যাওয়া অন্যায়। তা উপন্যাসের ওপরেই হোক, বা নারীর ওপরেই হোক।
‘শরৎচন্দ্র ও গল্স্ওয়ার্দ্দি’ প্রবন্ধ পড়লাম। গল্স্ওয়ার্দ্দি নামটাই শুধু শুনেচি, তাঁর কোন বই আমি পড়িনি। সুতরাং তাঁর সঙ্গে কোথায় আমার মিল কোথায় গরমিল কিছুই জানিনে। প্রবন্ধের মধ্যে আমার সুখ্যাতি আছে, আর আছে গল্সওয়ার্দ্দির রাশি রাশি কোটেশন্। তার থেকে কোন অর্থই আমার আদায় হোলো না। এইটুকুই বুঝলাম আ— তাঁর বই পড়েচেন এবং গল্স্ওয়ার্দ্দি ভদ্রলোক যেই হোন অনেক ভালো ভালো বচন দিয়ে গেছেন। এবং সে-সব পড়লে জ্ঞান জন্মায়।
মেয়েটি যে জীবনে সুখী নয় এ-কথা শুনে ক্লেশ বোধ হয়। কিন্তু এ সমাজে মেয়ে-জন্মের এমনি অভিশাপ যে, এর থেকে নিষ্কৃতিরও পথ নেই। মেয়েটির লেখা পড়ে মনে হয় ভারি বুদ্ধিমতী। কিন্তু জীবনে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে যে বস্তু পাওয়া যায় তার নাম অভিজ্ঞতা। শুধু বই পড়ে একে পাওয়া যায় না, এবং না-পাওয়া পর্য্যন্ত জানাও যায় না এর মূল্য কত। কিন্তু এ-কথাও মনে রাখা উচিত যে, অভিজ্ঞতা, দূরদর্শিতা প্রভৃতি কেবল শক্তি দেয়ই না, শক্তি হরণও করে। তাই বয়স কম থাকতেই কতকগুলো কাজ সেরে নেওয়া উচিত। এই যেমন গল্প লেখা। আমি অনেক সময়ে দেখেচি কম বয়সে যা লেখা যায় তার অনেক অংশই আবার বয়স বাড়লে লেখা যায় না। তখন বয়সোচিত গাম্ভীর্য্য ও সঙ্কোচে বাধে। মানুষের মধ্যে শুধু লেখকই থাকে না, ক্রিটিক্ও থাকে। বয়সের সঙ্গে এই ক্রিটিক্টি বাড়তে থাকে। তাই বেশি বয়সে লেখক যখন লিখতে চায় ক্রিটিক্টি প্রতি হাতে তার হাত চেপে ধরতে থাকে। সে লেখা জ্ঞান বিদ্যে-বুদ্ধির দিক দিয়ে যত বড়ই হয়ে উঠুক রসের দিক দিয়ে তার তেমনি ত্রুটি ঘটতে থাকে। তাই আমার বিশ্বাস যৌবন উত্তীর্ণ করে দিয়ে যে-ব্যক্তি রস-সৃষ্টির আয়োজন করে সে ভুল করে। মানুযের একটা বয়স আছেই যার পরে কাব্য বলো উপন্যাস বলো আর লেখা উচিত নয়। রিটায়ার করাই কর্ত্তব্য। বুড়ো বয়সটা হচ্চে মানুষকে দুঃখ দেবার বয়স, মানুষকে আনন্দ দেবার অভিনয় করা তখন বৃথা।
সেদিন বাট্রাণ্ড রসেলের An Outline of Philosophy বইখানি পড়লাম। এ বইখানি শক্ত, অঙ্কশাস্ত্র প্রভৃতির বিশেষ জ্ঞান না থাকলে সকল কথা ভালো বোঝা যায় না, বুঝতেও পারিনি। কিন্তু মুগ্ধ হয়ে যেতে হয় মানুষটির সরলতা দেখলে, এবং অনভিজ্ঞ মানুষকে সোজা করে বুঝিয়ে দেবার চেষ্টা দেখে। আনাড়ি লোকদের ওপর এঁর অশেষ করুণা। আহা! এ বেচারারা দুটো কথা বুঝুক,—সত্যিকার এই ইচ্ছেটুকু যেন এঁর লেখার ছত্রে ছত্রে অনুভব করা যায়। ভাবি, যাঁরা বাস্তবিকই পণ্ডিত, জ্ঞানী, তাঁদের লেখার সঙ্গে ফোক্কড়দের লেখার কতই না প্রভেদ। এটা কতই না স্পষ্ট হয়ে ওঠে এঁর লেখার পাশাপাশি H. G. Wellsএর লেখা পড়লে। এর কেবলই চেষ্টা বড় বড় কথা শুধু চালাকি আর ফুক্কড়ি করে মেরে দেবো। রসেলের On Education বইটা কিনে এনেচি। ভাবচি কাল পোড়ব। আসচে বছরে যদি বিলেতে যাই শুধু এই লোকটিকে একবার দেখে আসবার জন্যেই যাব।
সেদিন জনকয়েক ছেলে এসে তোমার মনের পরশের ভারি সুখ্যাতি করছিলো। তারা বলে এ বইটির সম্বন্ধে আমি যা বলেছিলাম তা বাস্তবিক সত্য। শুনে বড় খুশি হয়েছিলাম। ······· শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
মণ্টু,—তোমার নামে তো আর ওয়ারেণ্ট ছিল না যে সাধু হতে গেলে? ব্যস্, আর না। এই পত্র পাবা মাত্র চলে আসবে। আবার না হয় দিন-কতক পরে যেয়ো ক্ষতি নেই। আমি অভিজ্ঞ ব্যক্তি, আমার কথাটা শুনো। তোমার বয়সে আমি চার-চারবার সন্ন্যাসী হয়েছি। ও অঞ্চলে বোধ করি মাছি আর মশা কম, নইলে হিন্দুস্থানী······দের পিঠের চামড়া ছাড়া কার সাধ্য সে দংশন সহ্য করে! এ বাঙ্গালীর পেশা নয় বাপু, কথা শোন, চলে এসো। তুমি এলে এবার একসঙ্গে বর্ষার পরে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতবর্ষ একবার বেড়াতে যাবো। তুমি সঙ্গে না থাকলে খাতির পাওয়া যাবে না, খাওয়া-দাওয়ারও তেমন সুবিধে ঘটবে না। কবে আসচো পত্রপাঠ লিখে পাঠাবে। আমি ইষ্টিসানে যাবো।
আর একটি কথা। বারীন (বারীন্দ্রকুমার ঘোষ) শুনেছি যে-কোন গাছের পাতা তোমার নাকের ডগায় রগড়ে দিয়ে যে-কোন ফুলের গন্ধ শুঁকিয়ে দিতে পারে। উপেন বাঁড়ুয্যে বলে এটা সে কর্ত্তার (শ্রীঅরবিন্দ) কাছ থেকে মেরে নিয়েচে। আসবার সময় এটা তুমি শিখে নেবে। হঠাৎ সে মানবে না, কিন্তু ছেড়ো না। দিন-কতক তার আন্দামানের বাঁশীর খুব তারিফ করতে থাকবে এবং বইখানা সর্ব্বদাই হাতে হাতে নিয়ে বেড়াবে। এবং এ-বই এতদিন যে পড়োনি এই বলে মাঝে মাঝে তার সুমুখে অনুতাপ প্রকাশ করবে। খুব সম্ভব এই হলেই ‘বিভূতি’টা হস্তগত করে নিতে পারবে। উত্তর-ভারত বেড়াবার সময়ে এটা বিশেষ কাজে লাগবে।
অনিলবরণ’ (অনিলবরণ রায়) শুনেছি নাকি মাটির গুঁড়োকে চিনি করে দিতে পারে। বেশীক্ষণ থাকে না বটে, কিন্তু ৫।৭ ঘণ্টা চিনির মত দেখাতেও হয়, খেতেও লাগে। এটাও নিশ্চিত শিখে আসবার চেষ্টা কোরো। হঠাৎ টাকাকড়ি ফুরিয়ে গেলে পথে ঘাটে বিদেশে, বুঝেচ ত? এটা শেখাই চাই। অনিলবরণ লোকটি সরল এবং ভালো মানুষ,—একান্তই যদি শেখাতে আপত্তি করে তো খুব ভূত-পেত্নীর গল্প করবে। হলফ করে বলবে যে পেত্নী তুমি চোখে দেখেচো। তার পরে ভাবতে হবে না,—অনায়াসে কৌশলটা মেরে নিতে পারবে, আর এ দুটো যদি সত্যি শিখে নিতে পারে। ত ওখানে কষ্ট করে থাকবারই বা দরকার কি?
অনেককাল তোমাকে দেখিনি। ভারি দেখবার ইচ্ছে হয়, গান শোনাবার সাধ হয়। কবে আসবে জানিয়ো। আমার স্নেহাশীর্ব্বাদ জেনো।—শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
পুঃ—‘বিভূতি’ দুটো আদায় করে আনাই চাই। সময়ে অসময়ে ভারি কাজে লাগে। যাই হোক শীঘ্র চলে এসো। সন্ন্যাসী হওয়া ভারি খারাপ মণ্টু, আমার কথা বিশ্বাস কর। আজকালকার দিনে কিচ্ছু মজা নেই। কবে আসবে নিশ্চয় লিখো।
পরম কল্যাণীয়েষু,—মণ্টু তোমার চিঠি পেলাম।·······
তোমার চিঠির আবশ্যকীয় অংশগুলোর একটা একটা করে জবাব দিই। তোমাদের নতুন কাগজ আমাকে পাঠিও। আমি ছাড়া পরিচিত যারা, তাঁদেরও নেবার জন্যে বলে দেবো। তোমার লেখা বেরুবে, ওটা পড়বার আমার সত্যি আগ্রহ হয়। তুমি লিখেচো সাহিত্য ব্যাপারে আমার কাছে তুমি ঋণী,—অন্ততঃ এর সংযম সম্বন্ধে। ঋণের কথা আমার মনে নেই, কিন্তু এই কথাটা তোমাদের অনেকবার বলেচি যে, কেবল লেখাই শক্ত নয়, না-লেখার শক্তিও কম শক্ত নয়। অর্থাৎ ভেতরের উচ্ছ্বাস ও আবেগের ঢেউ যেন নিরর্থক ভাসিয়ে নিয়ে না যায়। আমি নিজেই যেন পাঠকের সবখানি আচ্ছন্ন করে না রাখি। অ-লিখিত অংশটা তারাও যেন নিজেদের ভাব, রুচি এবং বুদ্ধি দিয়ে পূর্ণ করে তোলবার অবকাশ পায়। তোমার লেখা তাদের ইঙ্গিত করবে, আভাস দেবে, কিন্তু তাদের তল্পি হইবে না। জলধর-দা (রায় বাহাদুর জলধর সেন) তাঁর কি-একটা বইয়ে মরা-ছেলের বাপ-মায়ের হয়ে পাতার পর পাতা এত কান্নাই কাঁদলেন যে পাঠকেরা শুধু চেয়েই রইলো, কাঁদবার ফুরসৎ পেলে না। বস্তুতঃ লেখার অসংযম সাহিত্যের মর্যাদা নষ্ট করে দেয়।······· বাঁড়ুজ্যে চমৎকার লিখতেই পারেন কিন্তু চমৎকার না-লিখতে পারেন না। আর এক ধরণের অসংযম দেখতে পাই অ―র লেখায়। ছেলেটি লেখে ভালো, বিলেতেও গেছে,—এ যাওয়াটা ও একটা মুহূর্ত্তের জন্যেও ভুলতে পারে না। বিলেতের ব্যাপার নিয়ে ওর লেখায় এমনি একটা অরুচিকর ভক্তিগদ্গদ্ ‘আদেক্লেপণা’ প্রকাশ পায় যে পাঠকের মন উৎপীড়িত বোধ করে। আমার গিরীন মামাকে মনে পড়ে। একবার বৈষ্ণব মেলা উপলক্ষে আমরা শ্রীধাম খেতুরিতে গিয়েছিলাম। মামার বিশ্বাস ছিল খেতুরির প্রসাদ খেলে অম্বল সারে। ষ্টিমার থেকে গঙ্গার তীরে নেমেই মামা অ্যাঃ—করে উঠলেন। দেখি ভয়ার্ত্ত মুখে এক পা উঁচু করে আছেন।
কি হ’লো?
বড্ড কাঁচা শ্রীগু মাড়িয়ে ফেলেচি।
তাঁর ভয় ছিল, ভক্তিহীনতা প্রকাশ পেলে হয়ত অম্বল সারবে না। তোমার ‘দোলা’র ব্যাপারটাও বিলেতের। সেদিন কয়েকটা অধ্যায় পড়েছিলাম। তাতে এই অহেতুক ভক্তিবিহ্বলতা, অকারণ অসংযত বিবরণের ঘটাপটা নেই। মনে হয় এও বিলেতে গেছে, জানেও অনেক কিছু, কিন্তু জানানোর মাতামাতি নেই। এইটুকু সর্ব্বদাই মনে রেখো মণ্টু। আমি আশীর্ব্বাদ করছি একদিন তুমি বড় হবে। অ—র লেখার সম্বন্ধে আমার অভিমত কেউ যদি challenge করে বলে কই দেখাও দিকি? আমাকে প্রত্যুত্তরে হয়ত শুধু এই কথাই বলতে হবে যে, এ-সব জিনিস এমন কোরে দেখানো যায় না। ও রসজ্ঞ পাঠকের মন আপনি অনুভব করে। অ—দেবীর উপন্যাসে দেখতে পাবে বেদ-বেদান্ত উপনিষৎ, পুরাণ, কালিদাস, ভবভূতি, সবাই ঢোকবার জন্যে যেন ঠেলাঠেলি লাগিয়ে দেয়। ছত্রে ছত্রে গ্রন্থকারের এই মনোভাবটি ধরা পড়ে,—দ্যাখো তোমরা আমি কি বিদুষী! কি পড়াটাই পড়েছি, কি জানাটাই জেনেছি! এই আতিশয্য যেন কোনমতেই না লেখার মধ্যে ধরা পড়ে। ওদের এমনি সহজে আসা চাই যেন না এলেই নয়। এই না-এলেই-নয় জিনিসটাই লেখার বড় কৌশল। এ শেখানো যায় না—আপনি শিখিতে হয়। আর শেখা যায় শুধু সংযমের অভ্যাসে। পাঠককে তাক লাগিয়ে দেবার সদিচ্ছার বাহুল্যে তার স্বকীয় কল্পনার খোরাকে কখনো কৃপণতা কোরব না, এই তত্ত্বটি লেখবার সময়ে একটি মিনিটের জন্যেও ভুললে চলবে না। অথচ, বড় ভাব, বড় তত্ত্ব, বড় idea, বড় প্রকাশ, এই নিয়েই চলা চাই লেখা,—জল পড়ে, পাতা নড়ে, লাল ফুল, কালো জল, আর জায়ে জায়ে ঝগড়া, আর বৌয়ে বৌয়ে মনোমালিন্য, কিংবা প্রভাত মুখুয্যের (প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়) বর্ণনার নিপুণতা,—ঘরের মধ্যে ক’টা আলমারি, ক’টা সোফা, প্রদীপে ক’টা শলতে দেওয়া এবং আনলায় ক’টা এবং কি পাড়ের কোঁচানো শাড়ি—এ-সকলের দিনও গেছে, প্রয়োজনও শেষ হয়েছে। ও কেবল লেখার ছলে সাহিত্যকে ঠকানো।
তোমার লেখার মধ্যে আজকাল আমি অনেক আশা অনেক ভরসা পাই। অথচ, মনের মধ্যে বেদনা বোধ করি যে এ তুমি ছেড়ে দিলে। আশ্রমে বাস করে সে বস্তু কখনো হবে না। জীবনে যে ভালোবাসলে না, কলঙ্ক কিনলে না, দুঃখের ভার বইলে না, সত্যিকার অনুভূতির অভিজ্ঞতা আহরণ করলে না, তার পরের-মুখে-ঝাল খাওয়া কল্পনা সত্যিকার সাহিত্য কতদিন জোগাবে? নাকটেপা-প্রাণায়ামের যোগবলে আর যা-কিছুই হোক এ বস্তু হবে না। নিজের জীবনটাই হোলো যার নীরস, বাঙলাদেশের বালবিধবার মতো পবিত্র, সে প্রথম যৌবনের আবেগে যত কিছুই করুক, দু’দিনে সব মরুভূমির মত শুষ্ক শ্রীহীন হয়ে উঠবে। ভয় হয়, ক্রমশঃ হয়ত তোমার লেখার মধ্যেও অসঙ্গতি দেখা দেবে। সবচেয়ে জ্যান্ত লেখা সেই, যা পড়লে মনে হবে গ্রন্থকার নিজের অন্তর থেকে সব-কিছু ফুলের মতো বাইরে ফুটিয়ে তুলেছে। দেখোনি বাঙলাদেশে আমার সব বইগুলোর নায়ক-নায়িকাকেই ভাবে এই বুঝি গ্রন্থকারের নিজের জীবন, নিজের কথা। তাই সজ্জনসমাজে আমি অপাংক্তেয়। কতই না জনশ্রুতি লোকের মুখে মুখে প্রচলিত। আমার কথা যাক। তোমার নিজের কথায় একদিন আমি ভেবেছিলাম, মণ্টু যে ব্যারিষ্টার হয়ে আসেনি সে ভালোই হয়েছে। না-ই করলে ও রাশি রাশি টাকা রোজগার, না-ই চড়ে বেড়ালো মটরগাড়ী, না-ই হোলো হাই সার্কেলের কেও-কেটা। ওর অভাব নেই, যা-আছে বেশ চলে যাবে,—শুধু সঙ্গীত ও সাহিত্যে দেশকে অনেক কিছু যেন মণ্টু দিয়ে যেতে পারে। সে নিরানন্দ দেশের আনন্দের ভোজ,—সেই আমাদের ঢের। আমি আরও একটা কথা ভাবতাম। মণ্টু এই যে দেশে দেশে ঘুরে বেড়ায়, ও অনেক জাত অনেক সমাজ অনেক লোকের সঙ্গে বাঙলাদেশের একটা স্নেহ ও শ্রদ্ধার বাঁধন বেঁধে দিচ্চে। ওকে সবাই চেনে, সবাই ভালোবাসে। মণ্টুর সঙ্গে গেলে কোথাও আদরের অভাব ঘটবে না। কিন্তু সে আশা সে আনন্দে ছাই পড়লো। যার দেহের মনের আনন্দের সামাজিকতার স্বাধীনতার সীমা ছিল না, সে আজ এমনি দাসখত লিখে দিলে যে এক-পা বাড়াতে গেলেও আজ চাই ওর permission—ছাড়পত্র। এই হোলো ওর মুক্তির সাধনা। গেলো দেশ, রইলো ওর কাল্পনিক স্বার্থ—সেই হোলো ওর বড়ো। আমিও অনেক পড়েচি, অনেক দেখেচি, অনেক কিছু করেচি—এ-কথা আমিও তো ভুলতে পারিনে। তাই, যে যা বলে মেনে নিতে পারিনে, আমার বাধে। কিন্তু এ নিয়ে আলোচনা নিষ্ফল। আমার ছেলেবেলার একটা কথা চিরদিন মনে থাকবে। মামার সঙ্গে তার গুরুদাসের (গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়) বাড়ি দুর্গাপূজোর নেমন্তন্ন খেতে গেছি। গিয়ে দেখি গুরুদাসের প্রচণ্ড ক্রোধে মাথার বড় বড় কেশর ফুলে উঠেচে। একজন ছাত্র নাকি বলেছিল গঙ্গাস্নানে পাপ ক্ষয় হয় সে বিশ্বাস করে না। গুরুদাস ক্ষিপ্ত হয়ে চীৎকার করে বলচেন যে, স্নানের প্রয়োজন নেই, শুধু তীরে দাঁড়িয়ে গঙ্গা বলে গঙ্গা দর্শন করলে শুধু তার নিজের নয়, সাতপুরুষ যে পাপমুক্ত হয়ে অক্ষয় স্বর্গ-বাস করে এতে সন্দেহের অবকাশ কোনখানে? কোন্ পাষণ্ড এ শাস্ত্রবাক্য অস্বীকার করতে পারে! বলতে বলতে তিনি রাগে বাড়ির মধ্যে চলে গেলেন। মনে আছে সেই ছেলেবয়সেই মনে মনে বোললাম, এই গুরুদাস! সেকালের এম. এ.-তে Mathematics-এ First, বড় উকিল, বড় Jurist, বড় জজ, University-র ভাইস-চ্যান্সেলার। ধার্ম্মিক, সত্যবাদী—তিনি ভণ্ডামি করেননি, যা সত্য বলে বিশ্বাস করতেন তাই বলেচেন,—তাই এই ভীষণ ক্রোধ। দেখি এ নিয়ে Sir Oliver Lodge-এর সঙ্গেও তর্ক চলে না, আমার প্রজা গৌর মাঝির সঙ্গেও না। এ অন্ধ বিশ্বাস। তাকেই নানা যুক্তি, নানা কথার মারপ্যাঁচ লাগিয়ে সত্যি বলে মেনে নেওয়া। বিদ্যে-সিদ্যে থাকলে কথায়-বার্ত্তায় রঙ চঙ লাগাতে পারে, না থাকলে সোজা কথায় সহজ করে বলে। প্রভেদ ঐটুকু। ঐ Sir Gooroodas! তোমার কাছে এ-সব বলতেও ভয় হয়, কারণ সকলেই জানে যে, আশ্রমবাসীরা অত্যন্ত ক্রোধী হয়। তারা কথায় কথায় গাল-মন্দ করে তেড়ে মারতে আসে।·······কোন আশ্রমের পরেই আমি প্রসন্ন নই, কিন্তু কোন-একটা বিশেষ আশ্রমের পরেই আমার কিছুমাত্র বিদ্বেষ বা আক্রোশ নেই। আমি জানি ও সবই সমান। সবই ভুয়ো।
আশ্রম যাক·······আসল কথা তুমি নিজে। তোমাকে যে অত্যন্ত স্নেহ করি এ মিথ্যে নয়। ভারি দেখতে ইচ্ছে হয়। গান শুনতে, গল্প করতে। ভারি বুড়ো হয়ে পড়েছি, আর ক’টা দিনই বা বাঁচবো, এদিকে আসবে না একবার? আমার স্নেহাশীর্ব্বাদ জেনো।—শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়[১]
- ↑ (১) হইতে (৫) সংখ্যক পত্রগুলি শ্রীদিলীপকুমার রায়কে লিখিত। ‘মণ্টু’ দিলীপবাবুর ডাক-নাম।