বিষয়বস্তুতে চলুন

শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ (দশম সম্ভার)/পত্র-সঙ্কলন/ভূপেন্দ্রকিশোর রক্ষিত রায়কে লেখা

উইকিসংকলন থেকে

১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৬

(১) ভূপেন,

 একখানি মাসিক পত্রের তুমি সম্পাদক, catchwordএর মোহ যেন তোমাকে না পেয়ে বসে। কারণ, এ-কথা তোমার কিছুতেই ভোলা উচিত নয় যে, বিপ্লব এবং বিদ্রোহ এক বস্তু নয়। কোথাও দেখেচ কি বিপ্লব দিয়ে পরাধীন দেশ স্বাধীন হয়েছে? ইতিহাসে কোথাও এর নজির আছে? বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন দেশেই Govt.-এর form অথবা সামাজিক নীতিরও পরিবর্ত্তন করা যায়, কিন্তু বিপ্লব দিয়ে পরাধীন দেশকে স্বাধীন করা যায় বলে আমার মনে হয় না। তার কারণ কি জানো? বিপ্লবের মাঝে আছে class war, বিপ্লবের মাঝে আছে civil war আত্মকলহ ও গৃহবিচ্ছেদ দিয়ে আর যাই কেন করা যাক, দেশের চরম শত্রুকে পরাভূত করা যাবে না। বিপ্লব ঐক্যের পরিপন্থী।

সামতাবেড়, ১০ই চৈত্র, ১৩৩৬

(২) ভূপেন,

 নববর্ষের সূচনায় তোমাদের ‘বেণু’কে আমি সমস্ত অন্তর দিয়ে আশীর্ব্বাদ করি। যে-জাতির সাহিত্য নেই, তাদের দারিদ্র্য যে কত বড়, এই পুরানো সত্যটা আমরা বর্ত্তমান কালে নানা উত্তেজনায় প্রায় ভুলে যাই। তার ফল হয় এই যে, হীনতার অন্ধকার জাতীয় জীবনে নিরন্তর গাঢ়তর হয়েই উঠতে থাকে। সমাজের মধ্যে আবর্জ্জনা অনেক জমেছে, বেদনা ও দুঃখেরও সীমা নেই, এ-কথা আমরা সবাই জানি, কিন্তু তোমরা যে কয়টি ছেলের দল এই ছোট কাগজখানিকে কেন্দ্র কোরে একসঙ্গে মিলেছো—তোমরা যে নর-নারীর যৌন-সমস্যাকেই সকল বেদনার পুরোভাগে স্থাপন করনি, এইটিই আমার সবচেয়ে আনন্দের হেতু। পরাধীনতার দুঃখই তোমাদের সকল ব্যথার বড় হয়ে তোমাদের এই পত্রিকায় বারে বারে ফুটে ওঠে। প্রার্থনা করি, এ কাগজে এ নীতির যেন ব্যতিক্রম না হয়।


সামতাবেড় 

(৩) পরম কল্যাণবরেষু,

 ভূপেন, কিছুদিন পূর্ব্বে তোমার চিঠি পেয়েছি। ·······সাহিত্য নিয়েই তোমাদের সঙ্গে পরিচয়, এবং নিজের দেশকে সমস্ত মন দিয়ে ভালোবাসা এই জানি, কিন্তু কোন্ অপরাধে যে আবদ্ধ হয়ে আছো ভেবে পাইনে। প্রার্থনা করি, যেন অচিরে মুক্তি পেয়ে আবার কর্ম্মের মধ্যে, সাহিত্যের মধ্যে ফিরে আসতে পারো।

 ‘শেষপ্রশ্ন’ উপন্যাসটা যে তোমার এতখানি ভালো লেগেছে, এতে ভারি আনন্দ পেলাম। এর ভেতর সামাজিক অনেক প্রশ্নের আলোচনা আছে, কিন্তু সমাধানের ভার তোমাদের হাতে। ভবিষ্যতের এই সুকঠিন দায়িত্বের সম্ভাবনাই হয়ত তোমাদের এতবড় আনন্দ দিয়েছে। অথচ, আমার ধারণা এ বই বহু লোককেই নিরাশ করবে, তারা কোন আনন্দই পাবে না। একে তো গল্পাংশ নিতান্ত কম, তাতে আবার ভেবে ভেবে পড়তে হয়, হু হু করে সময় কাটানো বা ঘুমের খোরাকের মত নিশ্চিন্ত আরামে অর্দ্ধেক চোখ বুজে উপভোগ করা চলে না। এ ভালো লাগবার কথা নয়। তবুও লিখেছিলাম এই ভেবে যে, কেউ কেউ তো বুঝবে, আমার তাতেই চলে যাবে। সকল প্রকার রস সকলের জন্যে নয়। অধিকারী ভেদটা আমি মানি।

 আরও একটা কথা মনে ছিলো, সে অতি-আধুনিক সাহিত্য। ভেবেছিলাম এইদিকে একটা ইসারা রেখে যাবো। বুড়ো হয়েছি, লেখার শক্তি অস্তগতপ্রায়, তবু, ভাবী-কালের তোমরা এই আভাসটুকু হয়ত পাবে যে নোঙরা না করেও অতিআধুনিক সাহিত্য লেখা চলে। কেবল কোমল, পেলব রসানুভূতিই নয়, intellect-এর বলকারক আহার্য্য পরিবেশন করাও আধুনিক কালের রস-সাহিত্যের একটা বড় কাজ। এর পরে তোমরাও যখন লিখবে তোমাদেরও অনেক পড়তে হবে, অনেক চিন্তা করতে হবে। শুধু চিত্ত-বিনোদনের হাল্কা ভারটুকু বয়ে দিয়েই অব্যাহতি পাবে না। জেলের মধ্যে আছো, হাতে সময় অপরিসীম, এ বৃথা যেন নষ্ট ক’রো না, এই তোমার প্রতি আদেশ। এই নির্জ্জন বাস পরবর্ত্তী কালে যেন তোমার কল্যাণের দ্বার মুক্ত করে দিতে পারে। বহুর সাহচর্য্যে বহু মানবকে যেন চিনতে পারো। মানুষের স্বরূপের জ্ঞানটাই সাহিত্যের আসল মালমসলা। এই সত্যটি কোনদিন ভুলো না।········ইতি—৪ঠা জ্যৈষ্ঠ ’৩৮[]

শুভানুধ্যায়ী

শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


  1. (১), (২) ও (৩) এই পত্র কয়টী ‘বেণু’ পত্রের সম্পাদক শ্রীভূপেন্দ্রকিশোর রক্ষিত রায়কে লিখিত।