শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ (দশম সম্ভার)/পত্র-সঙ্কলন/মতিলাল রায়কে লেখা
১৭ই আশ্বিন, ১৩৪১
পরম শ্রদ্ধাস্পদ সম্পাদক মহাশয়,—একটা প্রশ্ন আছে। প্রশ্নটা সাহিত্য নিয়ে। আপনি বলতে পারেন, তবে খাঁটি সাহিত্যিকের কাছে না গিয়ে আমার কাছে কেন? তারও কারণ আছে। লোকে আপনাকে ঠিক কি বলে জানে জানিনে, কিন্তু আমি জানি আপনাকে সত্যবাদী, জিতেন্দ্রিয় সাধু মানুষ বলে। কর্ম্ম নেই, অথচ কর্ম্মকে আপনি ত্যাগ করেননি। এ-ও তেমনি। সেই কর্মহীন কর্ম্মই আপনার ‘প্রবর্ত্তকে’র সম্পাদনা। তাই, বহু বিভিন্ন বিষয়ে বহু লেখাই আপনাকে লিখতে হয়, দেখি, বহু চিন্তা আপনার মনের মধ্যে আসে আর যায়, চলার পথ তাদের অবারিত, কিন্তু পথ জুড়ে অন্য পথচারীর পথ আগলানোর অধিকার তাদের নেই।
প্রবর্ত্তকের সম্পাদনায় কেবলমাত্র যদি কাব্য এবং গল্প-উপন্যাস নিয়ে থাকতেন, সাহিত্য-ঘটিত প্রশ্ন হলেও এ জিজ্ঞাসা আপনাকে করতাম না। যদি নিজের কাগজের মারফতে একটা উত্তর দেন অত্যন্ত সুখী হবো। এ বিশ্বাস আছে, উত্তর দিলে সত্য উত্তরই পাবো, ফাঁকির কারবার আপনার নেই!
আচার্য্যগণ বলেন, কলা-সাধনার মূল সূত্র হ’লো সত্য, শিব এবং সুন্দর। অর্থাৎ, সাধনা হয় যেন সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত, সুন্দরের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং তার ফল যেন হয় কল্যাণময়। যারা বিজ্ঞানের সাধক (তত্ত্বজ্ঞান বলচিনে,—বলচি সাধারণ সাংসারিক অর্থে) অর্থাৎ, বৈজ্ঞানিক যাঁরা তাঁদের একমাত্র মন্ত্র হ’লো সত্য। সাধনার ফল সুন্দর-অসুন্দর, কল্যাণ-অকল্যাণকর—কোনটাতেই তাঁদের গরজ নেই। হয় ভালোই, না হলেও অপরাধ নেই।
অথচ, সাহিত্য-সেবায় বহুদিন ব্রতী থেকে নিরন্তর অনুভব করি এখানে সত্য এবং সুন্দরে বাধে পদে পদে বিরোধ। জগতে যা ঘটনায় সত্য, সাহিত্যে হয়ত সে সুন্দর নয়, এবং যা সুন্দর সে হয়ত সাহিত্যে একেবারে মিথ্যা। যাকে সত্য বলে জানি, তাকে মূর্ত্তি দিতে গিয়ে দেখি সে হয়ে ওঠে বীভৎস কদাকার, আবার অসত্যকে বর্জ্জন করেও পাইনে সুন্দরের রূপ। তেমনি মঙ্গল-অমঙ্গলও। সাহিত্যে এ প্রশ্ন অবান্তর স্বীকার না করেও ত পারিনে।
জিজ্ঞাসা করি, সত্য যদি হয় সুন্দরের পরিপন্থী, কল্যাণ-অকল্যাণ হয় গৌণ, সাহিত্য-সাধনায় এ সমস্যার মীমাংসা কোন্ পথে?[১] ইতি—
ভবদীয়
শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
- ↑ ‘প্রবর্ত্তক’-সম্পাদক শ্রীমতিলাল রায়কে লিখিত।