বিষয়বস্তুতে চলুন

শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ (দশম সম্ভার)/পত্র-সঙ্কলন/রাধারাণী দেবীকে লেখা

উইকিসংকলন থেকে

(১)
পরম কল্যাণীয়াসু,
সামতাবেড়

 ······ষোড়শী দেখে খুসি হয়েছ শুনে আমিও খুসি হোলাম। বাস্তবিক কি চমৎকার অভিনয় করে শিশির (শ্রীশিশিরকুমার ভাদুড়ী)। আরও চমৎকার তার শেখানোর পদ্ধতি। ········অদ্ভুত ধৈর্য্যের সঙ্গে শিশির শেষের লক্ষ্যটায় লেগে থাকতে পারে। তারই বাহাদুরি।

 আমার লেখা ‘সাহিত্যের রীতি-নীতি’ পড়ে তুমি ক্ষুণ্ণ হয়েছো লিখেচো। তোমার মনে হয়েচে যে রবিবাবুকে আমি অযথা কটূক্তি করেছি। কিন্তু কোথায় যে শ্লেষ অথবা বিদ্রূপ আছে লেখাটা আরও একবার পড়েও ত আমি খুঁজে পেলাম না। তাঁকে আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধাভক্তি করি—আমার গুরুস্থানীয় তিনি, এ ত তুমি জানোই। তবে হয়ত লেখার দোষে যা বলতে চেয়েছি বলতে পারিনি—আর এক রকমের অর্থ হয়ে গেছে। দোষ যদি কিছু হয়েও থাকে সে আমার অক্ষমতার, আমার অন্তরের নয়।

 তোমরা একটা কথা তেমন জানো না যে আমার ভাষার ওপরে অধিকার সত্যিই কম। বিনয়ের জন্যে বলছিনে, তোমার মত আত্মীয়ার কাছে মিছে বিনয় করে লাভ কি বলত? তবুও বলচি এ কথা আমার যথার্থ-ই মনের কথা। ভাষার উপরে দখল এতই অল্প যে দু ছত্র কবিতা পর্য্যন্ত মেলাতে পারিনে,—কথা খুঁজে পাইনে। তাই যে কেউ যেমন তেমন কবিতা লিখলেও বিস্মিত হয়ে যাই। এই কারণেই বলতে চাইলাম এক, আর হয়ে গেল অন্য। তোমরা দুঃখিত হয়ে ভেবে নিলে—দাদা বুড়ো মানুষ হয়েও আর এক বুড়োকে আক্রমণ করেছে।

 সে যাই হোক, নবীন লেখকদের প্রতি আমার আন্তরিক স্নেহ এবং টান আছে। তাদের ভুলচুক হয় জানি, কিন্তু তাই বলে তাদের লোকসমাজে অশ্রদ্ধেয় প্রতিপন্ন করলে আমার অত্যন্ত ব্যথা লাগে। তা ছাড়া কত বড় অন্যায় অপবাদ তাদের দেওয়া হয়, যখন ইঙ্গিত করা হয় এরা গরীব বলেই এই সব নোঙরা ব্যাপার ঘাঁটাঘাঁটি করে অর্থ রোজগার করতে চায়। আমি ভাল করেই জানি বিরুদ্ধদলের লোকেরা এই রমকই কথা বলে বেড়ায়।

 কোনদিন যদি তোমার বড়দাকে ভাল করে জানতে পারো ত বুঝবে—বিদ্বেষ বলে জিনিসটা তার মধ্যে নেই বললেও অতিশয়োক্তি হবে না। একটা কথা তোমাকে জানাই, কারুকে বোলো না। ‘পথের দাবী’ যখন বাজেয়াপ্ত হয়ে গেল তখন রবিবাবুকে গিয়ে বলি যে আপনি যদি একটা প্রতিবাদ করেন ত একটা কাজ হয় যে পৃথিবীর লোকে জানতে পারে যে গভর্নমেণ্ট কি রকম সাহিত্যের প্রতি অবিচার করেছে। অবশ্য বই আমার সঞ্জীবিত হবে না। ইংরাজ সে পাত্রই নয়। তবু সংসারের লোকে খবরটা পাবে। তাঁকে বই দিয়ে আসি। তিনি জবাবে আমাকে লেখেন—“পৃথিবী ঘুরে ঘুরে দেখলাম ইংরাজ রাজশক্তির মত সহিষ্ণু এবং ক্ষমাশীল রাজশক্তি আর নেই। তোমার বই পড়লে পাঠকের মন ইংরাজ গভর্নমেণ্টের প্রতি অপ্রসন্ন হয়ে ওঠে। তোমার বই চাপা দিয়ে তোমাকে কিছু না বলা, তোমাকে প্রায় ক্ষমা করা। এই ক্ষমার উপর নির্ভর করে গভর্নমেণ্টকে যা’তা’ নিন্দাবাদ করা সাহসের বিড়ম্বনা।”

 ভাবতে পারো বিনা অপরাধে কেউ কাউকে এত বড় কটূক্তি করতে পারে? এ চিঠি তিনি ছাপাবার জন্যেই দিয়েছিলেন, কিন্তু আমি ছাপাতে পারিনে এই জন্যে যে কবির এত বড় সার্টিফিকেট তখুনি স্টেট্‌সম্যান প্রভৃতি ইংরাজি কাগজওয়ালারা পৃথিবীময় তার করে দেবে। এবং এই যে আমাদের দেশের ছেলেদের বিনা বিচারে জেলে বন্ধ করে রেখেচে এবং এই নিয়ে যত অন্দোলন হচ্ছে সমস্ত নিষ্ফল হয়ে যাবে। ঠিক বলতে পারিনে হয়ত এই কথা আমার মনের মধ্যে অলক্ষ্যে ছিল যখন সাহিত্যের রীতি-নীতি লিখি। তাতেই বোধ হয় কোথাও কোন জায়গায় একটু-আধটু তীব্রতার ঝাঁঝ এসে গেছে। যাই হোক যা হয়ে গেছে তার আর উপায় কি ভাই?······· ইতি— ১০ই অক্টোবর, ১৯২৭

বড়দাদা 


(২)
সামতাবেড়
পরম কল্যাণীয়াসু,

 রাধু, তোমার আগেকার চিঠি যথাসময়েই পেয়েছিলাম এবং নূতন বছরের আরম্ভে যে আশীর্ব্বাদ চেয়েছিলে তা মনে মনে দিতে কোন কৃপণতা করিনি, শুধু প্রকাশ্যে জানানোটা ঘটে ওঠেনি ভাই। “এই কালই জবাব দেবো” এই একটা প্রতিজ্ঞা প্রত্যহ সকালে উঠেই করেচি এবং করতে করতে মাস দেড়েক কেটে গেলো। এমনি স্বভাব। অথচ তোমাদের আজও এ জ্ঞান আজ জন্মালো না যে ভাবো—“দাদাটি তোমাদের স্বর্গে গেছেন—আর তাকে স্মরণ করাই বা কেন, আর তার আশীর্ব্বাদ চাওয়াই বা কিসের জন্যে।” আর কদিনই বা বাকি আছে বোন—একটু আগে থেকেই না হয় ভাবলে। কি এমন ক্ষতি? আরও তো কেউ কেউ এইটাই স্বীকার করে নিয়ে একেবারে নিরুদ্দেশের আড়ালে মিলিয়ে গেছেন। তোমরা পারো না?

 একটা কথা লিখেচো দেখলাম যে—কমলের স্রষ্টা রমার স্রষ্টা তো নয় যে—ইত্যাদি। তার মানে যে রমার স্রষ্টাই তোমাদের বুঝতেন—তোমাকে আদর করতে পারতেন, কিন্তু কমলের কথা যিনি লিখতে আরম্ভ করেছেন তাঁর কাছে আর ভরসা করবার কি আছে? এই না কি?

 কিন্তু একটা কথা ভুলে গেলে যে পল্লী-সমাজের রমা পল্লী-সমাজেরই মানুষ। যাদের অস্তিত্ব নিত্য নিয়ত আমরা অনুভব করি। সুখে দুঃখে ভালোতে মন্দতে যাদের আমরা কাছে পাই। কিন্তু শেষ প্রশ্নের কমলের কাছে সে প্রত্যাশা করা চলে কি কোরে?

 আরও একটা কথা রাধু। লোকে লিখতে বলে—না লিখলেও দেখি চলে না—কিন্তু এই প্রাচীনকালে আগেকার দিনের অর্থাৎ যৌবনের সে শক্তি পাবো কোথায়? তাই এখন এই শেষ বয়সের জোর করে লেখার শতেক ত্রুটি শতেক অভাব লোকের চোখে পড়ে। লেখার দৈন্য এখন নিজেই অনুভব করি। ভাষার সে শ্রীও নেই, বাঁধুনিও গেছে। সব যেন এলো-মেলো শিথিল হয়ে দেখা দিচ্চে—না? দেবার কথাও। আসলে আমি ত সাহিত্যিক নই দিদি। এ যেন আমার এম-এস-সি পাশ করে ওকালতি পেশা ধরা। সাহিত্যের মধ্যে আমি কোনোদিন তেমন আনন্দও পাইনে, যেমন পাই বিজ্ঞানের মধ্যে। এইজন্যেই হয়ত আমি তৈরি হয়েছিলাম, কিন্তু গ্রহের ফেরে হয়ে গেলো ঠিক উল্টো। ভাবি, আবার যদি কখনো জন্ম হয়, সেবার যেন না এত বড় ভুল আর ঘটে। ········ইতি ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ’৩৮[]

বড়দা 

  1. (১) ও (২) সংখ্যক পত্র দুইটা শ্রীমতী রাধারাণী দেবীকে লিখিত।