বিষয়বস্তুতে চলুন

শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ (দশম সম্ভার)/বাল্যকালের গল্প/কলকাতার নূতন-দা

উইকিসংকলন থেকে

কলকাতার নূতন-দা

 সেদিন কনকনে শীতের সন্ধ্যা। আগের দিন খুব এক-পশলা বৃষ্টিপাত হওয়ায় শীতটা যেন ছুঁচের মত গায়ে বিঁধিতেছিল। আকাশে পূর্ণচন্দ্র। চারদিক জ্যোৎস্নায় যেন ভাসিয়া যাইতেছে। হঠাৎ ইন্দ্র আসিয়া হাজির। কহিল, “—তে থিয়েটার হবে যাবি?”

 থিয়েটারের নামে একেবারেই লাফাইয়া উঠিলাম।

 ইন্দ্র কহিল, “তবে কাপড় পরে শীগ্‌গির আমাদের বাড়ি আয়।”

 পাচ মিনিটের মধ্যে একটা র‍্যাপার টানিয়া লইয়া ছুটিয়া বাহির হইলাম। সেখানে যাইতে হইলে ট্রেনে যাইতে হয়। ভাবিলাম উহাদের বাড়ির গাড়ী করিয়া ষ্টেশনে যাইতে হইবে—তাই তাড়াতাড়ি।

 ইন্দ্র কহিল, “তা নয়। আমরা ডিঙিতে যাব।”

 আমি নিরুৎসাহ হইয়া পড়িলাম। কারণ, গঙ্গার উজান ঠেলিয়া যাইতে হইলে বহু বিলম্ব হওয়াই সম্ভব। হয়ত বা সময়ে উপস্থিত হইতেই পারা যাইবে না।

 ইন্দ্র কহিল, “ভয় নেই, জোর হাওয়া আছে, দেরী হবে না, আমার নতুন-দা কোলকাতা থেকে এসেচেন, তিনি গঙ্গা দিয়ে যেতে চান।”

 যাক, দাঁড় বাঁধিয়া পাল খাটাইয়া ঠিক হইয়া বসিয়া আছি—অনেক বিলম্বে ইন্দ্রের নতুন-দা ঘাটে পৌঁছিলেন। চাঁদের আলোকে তাঁহাকে দেখিয়া ভয় পাইয়া গেলাম। কোলকাতার বাবু—অর্থাৎ ভয়ঙ্কর-বাবু। সিল্কের মোজা, চকচকে পাম্পসু, আগাগোড়া ওভারকোটে মোড়া, গলায় গলাবন্ধ, হাতে দস্তানা, মাথায় টুপি—পশ্চিমের শীতের বিরুদ্ধে তাঁহার সতর্কতার অন্ত নাই। আমাদের সাধের ডিঙিটাকে তিনি অত্যন্ত ‘যাচ্ছেতাই’ বলিয়া কঠোর মত প্রকাশ করিয়া ইন্দ্রর কাঁধে ভর দিয়া আমার হাত ধরিয়া অনেক কষ্টে অনেক সাবধানে নৌকার মাঝখানে জাঁকিয়া বসিলেন।

 “তোর নাম কি রে?”

 ভয়ে ভয়ে বলিলাম—“শ্রীকান্ত।”

 তিনি দাঁত খিঁচাইয়া বলিলেন, “আবার শ্রী―কান্ত! শুধু কান্ত। নে, তামাক সাজ। ইন্দ্র, হুঁকো-কল্‌কে রাখলি কোথায়? ছোঁড়াটাকে দে, তামাক সাজুক!”

 ওরে বাবা, মানুষ চাকরকেও ত এমন বিকট ভঙ্গী করিয়া আদেশ করে না! ইন্দ্র অপ্রতিভ হইয়া কহিল, “শ্রীকান্ত, তুই এসে একটু হাল ধর্, আমি তামাক সাজচি।”

 আমি তাহার জবাব না দিয়া তামাক সাজিতে লাগিয়া গেলাম। কারণ তিনি ইন্দ্রর মাসতুতো ভাই, কোলকাতার অধিবাসী এবং সম্প্রতি এল. এ. পাশ করিয়াছেন। কিন্তু মনটা আমার বিগড়াইয়া গেল। তামাক সাজিয়া হুঁকা হাতে দিতে তিনি প্রসন্ন-মুখে টানিতে টানিতে প্রশ্ন করিলেন, “তুই থাকিস্ কোথায় রে, কান্তে? তোর গায়ে ওটা কালোপানা কি রে? র‍্যাপার? আহা র‍্যাপারের কি শ্রী! তেলের গন্ধে ভূত পালায়! ফুটচে—পেতে দে দেখি, বসি।”

 “আমি দিচ্চি, নতুন-দা। আমার শীত করচে না—এই নাও”—বলিয়া ইন্দ্র নিজের গায়ের আলোয়ানটা তাড়াতাড়ি ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিল। তিনি সেটা জড়ো করিয়া লইয়া বেশ করিয়া বসিয়া সুখে তামাক টানিতে লাগিলেন।

 শীতের গঙ্গা। অধিক প্রশস্ত নয়—আধ ঘণ্টার মধ্যেই ডিঙি ওপারে গিয়া ভিড়িল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই বাতাস পড়িয়া গেল।

 ইন্দ্র ব্যাকুল হইয়া কহিল, “নতুন-দা, এ যে ভারি মুস্কিল হ’লো—হাওয়া পড়ে গেল। আর ত পাল চলবে না।”

 নতুন-দা জবাব দিলেন, “এই ছোঁড়াটাকে দে না, দাঁড় টানুক।”

 কলিকাতাবাসী নতুন-দাদার অভিজ্ঞতায় ইন্দ্র ঈষৎ ম্লান হাসিয়া কহিল, “দাঁড়! কারুর সাধ্যি নেই, নতুন-দা, এ রেত টেলে উজোন বয়ে যায়। আমাদের ফিরতে হবে।”

 প্রস্তাব শুনিয়া নতুন-দা একমুহূর্ত্তেই একেবারে অগ্নিশর্ম্মা হইয়া উঠিলেন, “তবে আনলি কেন হতভাগা? যেমন করে হোক তোকে পৌঁছে দিতেই হবে। আমার থিয়েটারে হারমোনিয়াম বাজাতেই হবে। তারা বিশেষ করে ধরেছে।

 ইন্দ্র কহিল, “তাদের বাজাবার লোক আছে নতুন-দা। তুমি না গেলেও আটকাবে না।”

 “না! আটকাবে না? এই মেড়োর দেশের ছেলেরা বাজাবে হারমোনিয়াম! চল্, যেমন করে পারিস্ নিয়ে চল্।” বলিয়া তিনি যেরূপ মুখভঙ্গী করিলেন তাহাতে আমার গা জ্বলিয়া গেল। ইহার বাজনা পরে শুনিয়াছিলাম, কিন্তু সে-কথার আর প্রয়োজন নাই।

 ইন্দ্রর অবস্থা সঙ্কট অনুভব করিয়া আমি আস্তে আস্তে কহিলাম, “ইন্দ্র, গুণ টেনে নিয়ে গেলে হয় না?

 কথাটা শেষ হইতে না হইতেই আমি চমকিয়া উঠিলাম। তিনি এমনি দাঁত-মুখ ভ্যাংচাইয়া উঠিলেন যে, সে মুখখানি আমি আজও মনে করিতে পারি। বলিলেন, “তবে যাও না, টানো গে না হে! জানোয়ারের মত বসে থাকা হচ্ছে কেন?"

 তার পরে, একবার ইন্দ্র, একবার আমি, গুণ টানিয়া অগ্রসর লইতে লাগিলাম। কখনো বা উঁচু পাহাড়ের উপর দিয়া, কখনো বা নীচে নামিয়া এবং সময়ে সময়ে সেই বরফের মত ঠাণ্ডা জল ঘেসিয়া অত্যন্ত কষ্ট করিয়া চলিতে হইল। আবার তারই মাঝে মাঝে বাবুর তামাক সাজার জন্য নৌকা থামাইতে হইল। অথচ বাবুটী ঠায় বসিয়া রহিলেন—এতটুকু সাহায্য করিলেন না। ইন্দ্র একবার তাঁকে হালটা ধরিতে বলায় জবাব দিলেন, তিনি দস্তানা খুলে এই ঠাণ্ডায় নিমোনিয়া করতে পারবেন না। ইন্দ্র বলিতে গেল, “না খুলে―”

 “হাঁ, দামী দস্তানাটা মাটি করে ফেলি আর কি!―নে—যা করচিস্ কর্।”

 বস্তুতঃ, আমি এমন স্বার্থপর অসজ্জন ব্যক্তি জীবনে অল্পই দেখিয়াছি। তাঁরই একটা অপদার্থ খেয়াল চরিতার্থ করিবার জন্য আমাদের এত ক্লেশ সমস্ত চোখে দেখিয়াও তিনি এতটুকু বিচলিত হইলেন না। অথচ আমরা বয়সে তাঁহার অপেক্ষা কতই বা ছোট ছিলাম। গাছে এতটুকু ঠাণ্ডা লাগিয়া তাঁহার অসুখ করে, গাছে এক ফোঁটা জল পাগিয়া দামী ওভারকোট খারাপ হইয়া যায়, পাছে নড়িলে-চড়িলে কোনরূপ ব্যাঘাত হয়, এই ভয়েই আড়ষ্ট হইয়া বসিয়া রহিলেন এবং অবিশ্রাম চেঁচামেচি করিয়া হুকুম করিতে লাগিলেন। আরও বিপদ—গঙ্গার রুচিকর হাওয়ায় বাবুর ক্ষুধার উদ্রেক হইল এবং দেখিতে দেখিতে সে ক্ষুধা অবিশ্রাম বকুনির চোটে একেবারে ভীষণ হইয়া উঠিল; এদিকে চলিতে চলিতে রাত্রিও প্রায় দশটা হইয়া গেছে—থিয়েটারে পৌছিতে রাত্রি দুটো বাজিয়া যাইবে শুনিয়া বাবু প্রায় ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিলেন। রাত্রি যখন এগারটা, তখন কোলকাতার বাবু কাবু হইয়া বলিলেন, “হাঁ রে ইন্দ্র, এদিকে খোট্টা-মোট্টাদের বস্তি-টস্তি নেই? মুড়ি-টুড়ি পাওয়া যায় না?”

 ইন্দ্র কহিল, “সামনেই একটা বেশ বড় বস্তি নতুন-দা, সব জিনিস পাওয়া যায়।”

 “তবে লাগা লাগা—ওরে ছোঁড়া—ঐ—টান্ না একটু জোরে—ভাত খাস্‌নে? ইন্দ্র, বল্ না তোর ঐ ওটাকে একটু জোর করে টেনে নিয়ে চলুক।”

 ইন্দ্র কিংবা আমি কেহই তাহার জবাব দিলাম না। যেমন চলিতেছিলাম তেমনিভাবেই অনতিকাল পরে একটা গ্রামে আসিয়া উপস্থিত হইলাম। এইখানে পাড়টা ঢালু এবং বিস্তৃত হইয়া জলে মিশিয়াছিল। ডিঙি জোর করিয়া ধাক্কা দিয়া সঙ্কীর্ণ জলে তুলিয়া দিয়া আমরা দু’জনে হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিলাম।

 বাবু বলিলেন, “হাত-পা একটু খেলানো চাই। নাবা দরকার।”

 অতএব ইন্দ্র তাঁহাকে কাঁধে করিয়া নামাইয়া আনিল। তিনি জ্যোৎস্নার আলোকে গঙ্গার শুভ্র সৈকতে পদচারণা করিতে লাগিলেন।

 আমরা দু’জনে তাঁহার ক্ষুধা-শান্তির উদ্দেশ্যে গ্রামের ভিতরে যাত্রা করিলাম। যদিচ বুঝিয়াছিলাম, এত রাত্রে এই দরিদ্র ক্ষুদ্র পল্লীতে আহার্য্য সংগ্রহ করা সহজ ব্যাপার নয়, তথাপি চেষ্টা না করিয়াও ত নিস্তার ছিল না। অথচ, তাঁর একাকী থাকিতেও ইচ্ছা নাই। সে ইচ্ছা প্রকাশ করিতেই ইন্দ্র তৎক্ষণাৎ আহ্বান করিয়া কহিল, “চল না নতুন-দা, একলা তোমার ভয় করবে,—আমাদের সঙ্গে একটু বেড়িয়ে আসবে, এখানে চোর টোর নেই, ডিঙি কেউ নেবে না—চল।”

 নতুন-দা মুখখানা বিকৃত করিয়া বলিলেন, “ভয়! আমরা দর্জিপাড়ার ছেলে—যমকে ভয় করিনে তা জানিস্! কিন্তু তা বলে ছোটলোকদের dirty পাড়ার মধ্যেও আমরা যাইনে। ব্যাটাদের গায়ের গন্ধ নাকে গেলেও আমাদের ব্যামো হয়।” অথচ তাঁহার মনোগত অভিপ্রায়—আমি তাঁহার পাহারায় নিযুক্ত থাকি এবং তামাক সাজি।

 কিন্তু আমি তাঁর ব্যবহারে মনে মনে এত বিরক্ত হইয়াছিলাম যে, ইন্দ্র আভাস দিতেও আমি কিছুতেই একাকী লোকটীর সংসর্গে থাকিতে রাজী হইলাম না। ইন্দ্রের সঙ্গেই প্রস্থান করিলাম।

 দর্জিপাড়ার বাবু হাততালি দিয়া গান ধরিয়া দিলেন,—“ঠুন্ ঠুন্ পেয়ালা—”

 আমরা অনেকদূর পর্য্যন্ত তাঁহার সেই মেয়েলি নাকি-সুরে সঙ্গীতচর্চা শুনিতে শুনিতে গেলাম।

 ইন্দ্র নিজেও তাহার ভ্রাতার ব্যবহারে মনে মনে অতিশয় লজ্জিত ও ক্ষুদ্ধ হইয়াছিল। ধীরে ধীরে কহিল, “এরা কোলকাতার লোক কি-না, জল-হাওয়া আমাদের মত সহ্য করতে পারে না—বুঝলি শ্রীকান্ত!”

 আমি বলিলাম,—“হুঁ।”

 ইন্দ্র তখন তাঁহার অসাধারণ বিদ্যা-বুদ্ধির পরিচয়—বোধ করি আমার শ্রদ্ধা আকর্ষণ করিবার জনই—দিতে দিতে চলিল। তিনি অচিরেই বি. এ. পাশ করিয়া ডেপুটী হইবেন, কথা-প্রসঙ্গে তাহাও কহিল। যাই হোক, এতদিন পরে এখন তিনি কোথাকার ডেপুটী কিংবা আদৌ সে কাজ পাইয়াছেন কি না সে সংবাদ জানি না। কিন্তু মনে হয় যেন পাইয়াছেন, না হইলে বাঙালী ডেপুটীর মাঝে মাঝে এত সুখ্যাতি শুনিতে পাই কি করিয়া? তখন তাঁহার প্রথম যৌবন। শুনি, জীবনের এই সময়টায় নাকি হৃদয়ের প্রশস্ততা, সমবেদনার ব্যাপকতা যেমন বৃদ্ধি পায়, এমন আর কোনকালে নয়। অথচ, ঘণ্টা-কয়েকের সংসর্গেই যে নমুনা তিনি দেখাইয়াছিলেন, এতকালের ব্যবধানেও তাহা ভুলিতে পারা গেল না, তবে ভাগ্যে এমন সব নমুনা কদাচিৎ চোখে পড়ে,—না হইলে, বহু পূর্ব্বেই সংসারটা রীতিমত একটী পুলিশ থানায় পরিণত হইয়া যাইত। কিন্তু যাক সে কথা।

 কিন্তু ভগবানও যে তাঁহার উপর ক্রুদ্ধ হইয়াছিলেন, সে খবরটা পাঠককে দেওয়া আবশ্যক। এ অঞ্চলের পথ-ঘাট, দোকান-পত্র সমস্তই ইন্দ্রর জানা ছিল। সে গিয়া মুদীর দোকানে উপস্থিত হইল, কিন্তু দোকান বন্ধ এবং দোকানদার শীতের ভয়ে দরজা-জানালা রুদ্ধ করিয়া গভীর নিদ্রায় মগ্ন। এই গভীরতা যে কিরূপ অতলস্পর্শী, সে-কথা যাহার জানা নাই তাহাকে লিখিয়া বুঝানো যায় না। ইহারা অম্লরোগী, নিষ্কর্মা জমিদারও নয়, বহুভারাক্রান্ত, কন্যাদায়গ্রস্ত বাঙালী গৃহস্থও নয়, সুতরাং ঘুমাইতে জানে। দিনের বেলা খাটিয়া-খুটিয়া রাত্রিতে একবার ‘চার-পাই’ আশ্রয় করিলে, ঘরে আগুন না দিয়া, শুধু মাত্র চেঁচাচেঁচি ও দোর নাড়ানাড়ি করিয়া জাগাইয়া দিব, এমন প্রতিজ্ঞা যদি স্বয়ং সত্যবাদী অর্জুন জয়দ্রথ-বধের পরিবর্ত্তে করিয়া বসিতেন, তবে তাঁহাকেও মিথ্যাপ্রতিজ্ঞা-পাপে দগ্ধ হইয়া মরিতে হইত, তাহা শপথ করিয়া বলিতে পারা যায়।

 তখন উভয়েই বাহিরে দাঁড়াইয়া তারস্বরে চীৎকার করিয়া এবং যত প্রকার ফন্দি মানুষের মাথায় আসিতে পারে তাহার সবগুলি একে একে চেষ্টা করিয়া আধঘণ্টা পরে রিক্ত-হস্তে ফিরিয়া আসিলাম। কিন্তু ঘাট যে জনশূন! জ্যোৎস্নালোকে যতদূর দৃষ্টি চলে, ততদূরই সে শূন্য। ‘দর্জিপাড়া’র চিহ্নমাত্র কোথাও নাই। ডিঙি যেমন ছিল তেমনি রহিয়াচে—ইনি গেলেন কোথায়? দুইজনে প্রাণপণে চীৎকার করিলাম—“নতুন-দা”! কিন্তু কোথায় কে! ব্যাকুল আহ্বান শুধু বাম ও দক্ষিণের সু-উচ্চ পাড়ে ধাক্কা খাইয়া অস্পষ্ট হইয়া বারংবার ফিরিয়া আসিল। এ অঞ্চলে মাঝে মাঝে শীতকালে বাঘের জনশ্রুতিও শোনা যাইত। গৃহস্থ কৃষকেরা দলবদ্ধ ‘হুড়ারে’র জ্বালায় সময়ে সময়ে ব্যতিব্যস্ত হইয়া উঠিত। সহসা ইন্দ্র সেই কথাই বলিয়া বসিল,— “বাঘে নিলে না ত রে!” ভয়ে ভয়ে সর্ব্বাঙ্গ কাঁটা দিয়া উঠিল—সে কি কথা! ইতিপূর্ব্বে তাঁহার নিরতিশয় অভদ্র ব্যবহারে আমি অত্যন্ত কুপিত হইয়া উঠিয়াছিলাম সত্য, কিন্তু এতবড় অভিশাপ ত দিই নাই!

 সহসা উভয়েরই চোখে পড়িল কিছুদূরে বালুর উপর কি একটা বস্তু চাঁদের আলোয় চক্‌ চক্ করিতেছে। কাছে গিয়া দেখি, তারই সেই বহুমূল্য পাম্প-সুর এক-পাটি। ইন্দ্র সেই ভিজা বালির উপরেই একেবারেই শুইয়া পড়িল—“শ্রীকান্ত রে! আমার মাসিমাও এসেচেন যে! আমি আর বাড়ি ফিরে যাব না।”

 তখন ধীরে সমস্ত বিষয়টাই পরিস্ফুট হইয়া উঠিতে লাগিল। আমরা যখন মুদির দোকানে দাঁড়াইয়া তাহাকে জাগ্রত করিবার ব্যর্থ প্রয়াস পাইতেছিলাম, তখন এইদিকের কুকুরগুলার যে সমবেত আর্ত্ত-চীৎকারে আমাদিগকে এই দুর্ঘটনার সংবাদটাই গোচর করিবার ব্যর্থ প্রয়াস পাইতেছিল, তাহা জলের মত চোখে পড়িল। এখনও দূরে তাহাদের ডাক শুনা যাইতেছিল। সুতরাং আর সংশয়মাত্র রহিল না যে, নেকড়েগুলো তাঁহাকে টানিয়া লইয়া গিয়া যেখানে ভোজন করিতেছে, তাহারই আশেপাশে দাঁড়াইয়া সেগুলো এখনও চেঁচাইয়া মরিতেছে।

 অকস্মাৎ ইন্দ্র সোজা হইয়া দাঁড়াইয়া কহিল, “আমি যাব।”

 আমি সভয়ে তাহার হাত চাপিয়া ধরিলাম—“পাগল হয়েচ ভাই!”

 ইন্দ্র তাহার জবাব দিল না। ডিঙিতে ফিরিয়া গিয়া লগিটা তুলিয়া লইয়া কাঁধে ফেলিল। একটা বড় ছুরি পকেট হইতে বাহির করিয়া বাঁ হাতে লইয়া কহিল, “তুই থাক্, শ্রীকান্ত; আমি না এলে ফিরে গিয়ে বাড়িতে খবর দিস্—আমি চললুম।”

 তাহার মুখ অত্যন্ত পাণ্ডুর, কিন্তু চোখ দুটো জ্বলিতে লাগিল, তাহাকে আমি চিনিয়াছিলাম। এ তাহার নিরর্থক আস্ফালন নয় যে, হাত ধরিয়া দুটো ভয়ের কথা বলিলেই মিথ্যা দম্ভ মিথ্যায় মিলাইয়া যাইবে। আমি নিশ্চয় জানিতাম, কোনমতেই তাহাকে নিরস্ত করা যাইবে না—সে যাইবেই। ভয়ের সহিত চির-অপরিচিত, তাহাকে আমিই বা কেমন করিয়া কি বলিয়া বাধা দিব! যখন সে নিতান্তই চলিয়া যায়, তখন আর থাকিতে পারিলাম না—আমিও যা হোক হাতে করিয়া অনুসরণ করিতে উদ্যত হইলাম। এইবার ইন্দ্র মুখ ফিরাইয়া আমার একটা হাত ধরিয়া ফেলিল। বলিল, “তুই ক্ষেপেচিস্ শ্রীকান্ত? তোর দোষ কি? তুই কেন যাবি?”

 তাহার কণ্ঠস্বর শুনিয়া একমুহূর্ত্তেই আমার চোখে জল আসিয়া পড়িল। কোনমতে গোপন করিয়া বলিলাম, “তোমারই বা দোষ কি ইন্দ্র? তুমিই বা কেন যাবে?”

 প্রত্যুত্তরে ইন্দ্র আমার হাতের বাঁশটা টানিয়া লইয়া নৌকায় ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিয়া কহিল, “আমারও দোষ নেই, ভাই, আমিও নতুন-দাকে আনতে চাইনি। কিন্তু, একলা ফিরে যেতেও পারব না, আমাকে যেতেই হবে।”

 কিন্তু আমারও যাওয়া চাই। কারণ, পূর্ব্বেই একবার বলিয়াছি, আমি নিজেও নিতান্ত ভীরু ছিলাম না। অতএব বাঁশটা পুনরায় সংগ্রহ করিয়া লইয়া দাঁড়াইলাম এবং আর বাক্‌বিতণ্ডা না করিয়া উভয়েই ধীরে ধীরে অগ্রসর হইলাম।

 ইন্দ্র কহিল, “বালির উপর দৌড়ানো যায় না—খবরদার সে চেষ্টা করিস্‌নে। জলে গিয়ে পড়বি।”

 সুমুখে একটা বালির উপরে ঢিপি ছিল। সেইটা অতিক্রম করিয়া দেখা গেল, অনেকদূরে জলের ধার ঘেসিয়া দাঁড়াইয়া ৫।৭টা কুকুর চীৎকার করিতেছে। যতদূর দেখা গেল, একপাল কুকুর ছাড়া, বাঘ ত দূরের কথা, একটা শৃগালও নাই। সন্তর্পণে আরও কতকটা অগ্রসর হইতেই মনে হইল, তাহারা কি একটা কালো-পানা বস্তু জলে ফেলিয়া পাহারা দিয়া আছে। ইন্দ্র চীৎকার করিয়া ডাকিল—“নতুন-দা!”

 নতুন-দা একগলা জলে দাঁড়াইয়া অব্যক্ত-স্বরে কাঁদিয়া উঠিলেন—“এই যে আমি।”

 দু’জনে প্রাণপণে ছুটিয়া গেলাম, কুকুরগুলা সরিয়া দাঁড়াইল এবং ইন্দ্র ঝাঁপাইয়া পড়িয়া আকণ্ঠ-নিমজ্জিত মূর্চ্ছিত প্রায় তাহার দর্জিপাড়ার মাসতুত ভাইকে টানিয়া তীরে তুলিল। তখনও তাঁহার একটা পায়ে বহুমূল্য পাম্প-সু, গায়ে ওভার-কোট, হাতে দস্তানা, গলায় গলাবন্ধ এবং মাথায় টুপি;—ভিজিয়া ফুলিয়া ঢোল হইয়া উঠিয়াছে। আমরা গেলে সেই যে তিনি হাততালি দিয়া “ঠুন্ ঠুন্ পেয়ালা” ধরিয়াছিলেন, খুব সম্ভব সেই সঙ্গীতচর্চ্চাতেই আকৃষ্ট হইয়া গ্রামের কুকুরগুলা দল বাঁধিয়া উপস্থিত হইয়াছিল এবং এই অশ্রুতপূর্ব্ব গীত এবং অদৃষ্টপূর্ব্ব পোষাকের ছটায় বিভ্রান্ত হইয়া এই মহামান্য ব্যক্তিটীকে তাড়া করিয়াছিল।

 এতটা আসিয়াও আত্মরক্ষার কোন উপায় খুঁজিয়া না পাইয়া, অবশেষে তিনি জলে ঝাঁপ দিয়া পড়িয়াছিলেন, এবং এই দুর্দ্দান্ত শীতের রাত্রে তুষার-শীতল জলে আকণ্ঠ মগ্ন থাকিয়া এই অর্দ্ধ-ঘণ্টাকাল ব্যাপিয়া পূর্ব্বকৃত পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিতেছিলেন। কিন্তু প্রায়শ্চিত্তের ঘোর কাটাইয়া তাঁহাকে চাঙ্গা করিয়া তুলিতেও সেরাত্রে আমাদিগকে কম মেহন্নত করিতে হয় নাই। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্য্য এই যে, বাবু ডাঙ্গায় উঠিয়াই প্রথম কথা কহিলেন, “আমার এক-পাটি পাম্প?”

 সেটা ওখানে পড়িয়া আছে—সংবাদ দিতেই তিনি সমস্ত দুঃখ-ক্লেশ বিস্মৃত হইয়া তাহা অবিলম্বে হস্তগত করিবার জন্য সোজা খাড়া হইয়া উঠিলেন। তার পরে কোটের জন্য, গলা-বন্ধের জন্য, মোজার জন্য, দস্তানার জন্য একে একে পুনঃপুনঃ শোক প্রকাশ করিতে লাগিলেন; এবং সে-রাত্রে যতক্ষণ পর্য্যন্ত না ফিরিয়া গিয়া নিজেদের ঘাটে পৌঁছিতে পারিলাম, ততক্ষণ পর্য্যন্ত কেবল এই বলিয়া আমাদের তিরস্কার করিতে লাগিলেন—কেন আমরা নির্ব্বোধের মত সে-সব তাহার গা হইতে তাড়াতাড়ি খুলিতে গিয়াছিলাম। মা খুলিলে ত ধূলাবালি লাগিয়া এমন করিয়া মাটি হইতে পারিত না। আমরা খোট্টার দেশের লোক, আমরা চাষার সামিল, আমরা এ-সব কখনো চোখে দেখি নাই—এই সমস্ত অবিশ্রাম বকিতে বকিতে গেলেন। যে দেহটাকে ইতিপূর্ব্বে একটা ফোঁটা জল লাগাইতেও তিনি ভয়ে সারা হইতেছিলেন, জামা-কাপড়ের শোকে সে দেহটাকেও তিনি বিস্মৃত হইলেন। উপলক্ষ যে আসল বস্তুকেও কেমন করিয়া বহুগুণে অতিক্রম করিয়া যায়, তাহা এই-সব লোকের সংসর্গে না আসিলে, এমন করিয়া চোখে পড়ে না।

 রাত্রি দু’টার পর আমাদের ডিঙি আসিয়া ঘাটে ভিড়িল। আমার যে র‍্যাপারখানির বিকট গন্ধে কলিকাতার বাবু ইতিপূর্ব্বে মূর্ছিত হইতেছিলেন, সেইখানি গায়ে দিয়া, তাহারই অবিশ্রাম নিন্দা করিতে করিতে, পা মুছিতেও ঘৃণা হয় তাহা পুনঃ পুনঃ শুনাইতে শুনাইতে ইন্দ্রর খানি পরিধান করিয়া তিনি সে-যাত্রা আত্মরক্ষা করিয়া বাটী গেলেন। যাই হোক, তিনি যে দয়া করিয়া ব্যাঘ্র-কবলিত না হইয়া সশরীরে প্রত্যাবর্ত্তন করিয়াছিলেন তাঁহার এই অনুগ্রহের আনন্দেই আমরা পরিপূর্ণ হইয়া গিয়াছিলাম। এত উপদ্রব-অত্যাচার হাসিমুখে সহ্য করিয়া আজ নৌকা-চড়ার পরিসমাপ্তি করিয়া এই দুর্জ্জয় শীতের রাত্রে কোঁচার খুট মাত্র অবলম্বন করিয়া কাঁপিতে কাঁপিতে বাড়ি ফিরিয়া গেলাম।